২১ এপ্রিল ২০২২

মমতা রায়চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস ১৫৮




উপন্যাস 

টানাপোড়েন ১৫৮
ওয়ার্কশপ ও ভদ্রলোক
মমতা রায়চৌধুরী



বাপরে বাপ আজ কালীনারায়নপুরের আগে এসে ট্রেনটা এতটাই লেট খাইয়ে দিল। যার ফলে কৃষ্ণনগর স্টেশনে পৌঁছে রেখা ছুটতে শুরু করল অটো ধরার জন্য ।ওয়ার্কশপের টাইম ছিল সাড়ে দশটা । স্টেশনেই10:30 রেখা অটোতে গিয়ে বসলো ।অটোওয়ালাকে তাড়া দিতে লাগল' দাদা একটু তাড়াতাড়ি চলুন না ।'
অটোওয়ালা বিরক্ত হয়ে বলল" এই আপনাদের দোষ দিদি। সারা দুনিয়ায় লেট হলে কিছু বলবেন না ।ট্রেন তো লেট ছিল ট্রেনের ড্রাইভারকে কিছু বলেছেন? বা ব্যাংকে গিয়ে লেট হয় ,ব্যাংকে গিয়ে তাড়া দেন ?হসপিটালে গিয়ে লেট হলে তাড়া
 দেন ?যত তাড়া আপনাদের আমাদের গাড়িতে উঠলে।
রেখা দেখল কথাগুলো বেঠিক কিছু বলছে না। তবুও বললো 'এমনি ,এমনি কি আর তাড়া দিচ্ছি বলুন ?ট্রেন লেট ছিল বলেই তো ,আমার ওয়ার্কশপে পৌঁছাতে লেট হয়ে যাবে,
 দাদা ।সেজন্যই।'
অটওয়ালা বলল 'তাহলে অন্য অটোতে যান।'
লেখা মনে মনে ভাবল কি চ্যাটাং চ্যাটাং কথা রে বাবা।
রেখা বললো ' দেখুন আপনার সঙ্গে আমি তর্কে যেতে চাইনা ।আপনি যেতে পারবেন না ব্যস ,এত কথা বলেন কেন ?তাছাড়া আপনি তাহলে লিখিত দিন যে আপনি অটো চালাবেন না ।আমি অন্য অটোতে গিয়ে বসি।'
অটোওইয়ালা এবার চুপ করে গেল । এবার একটু নরম সুরে বলল' আসলে দিদি আমি তো কয়েকজন প্যাসেঞ্জার নেব?'
'ঠিক আছে ,এই কথাটা তো আপনি ভাল ভাবে বলতে পারতেন ।এতগুলো অকারণ  বাজে কথা।'
মেজাজটা বিগড়ে গেল রেখার । কিন্তু কিছু করার নেই ,বসেই থাকতে হবে।
অন্য অটোতে গেলেও একই হাল  হবে আর তাছাড়া এদের তো আবার লাইন আছে।
কি করবে আর রেখা চুপ করে বসে রইল। লেট এমনিতে হয়েই গেছে ,যা হবে ,হবে।
অটোওয়ালা হাঁক তে লাগলো' ডন বক্স স্কুল,কলেজস্ট্রিট , নেদেরপাড়া , বেজি খালি…।'
আস্তে আস্তে প্যাসেঞ্জার হতে লাগলো এবার অটোওয়ালা গাড়ি স্টার্ট করল।
রেখা দুর্গানাম জপতে লাগলো ।
ডন বক্স স্কুল এর কাছে না এসে অটো বেশ খানিকটা দুরে দাঁড় করিয়ে দিল। বলল 'দিদি নেমে যান।'
রেখা বললl' আর যাবেন না?'
"না আর যাবে না?"
অটওয়ালা যেভাবে কথাটা বলল রেখার আর কথা বাড়াতে ইচ্ছে করলো না।
রেখা ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে দ্রুত হাঁটতে লাগলো। বুকটা কেমন ঢিপ ঢিপ ঢিপ  করতে লাগলো।
"তার কি একাই লেট হল?' রুমে ঢুকতে 
 লজ্জা করছে।
রেখা মনে মনে সাহস আনলো। লজ্জার কি আছে ট্রেন লেট থাকলে রেখার তাতে দোষ কী।
আবার পরক্ষণেই ভাবছে লাস্ট একটা সেমিনারে একজন লেট করে ঢুকছিলেন বলে অনেক কথা শুনিয়েছিলেন আর  পি।
সে কথাটা মনে হতেই ভেতরে ভেতরে আবারো প্যালপিটিশন শুরু হয়ে গেল।
রিসেপশনরুমে ঢুকেই স্কুলের নাম নিজের নাম এন্ট্রি  করল।
তারপর জিজ্ঞেস করল কত নম্বর রুমে ওয়ার্কশপ শুরু হয়েছে?
একজন বললেন দোতালায় 10 নম্বর রুম।
তারমধ্যে দেখা গেল আরও কয়েকজন তারাও ভুলে 10 নম্বর রুমে?
রেখা এবার মনে মনে একটু সাহস পেল তার একার লেট হয়নি।
এবার যেন তেজোদীপ্ত ভঙ্গিতে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগলো।
10 নম্বর রুমে কাছে গিয়ে বলল'আসবো?'
একজন তাকিয়ে হেসে বললেন 'আসুন।'
রেখা নিজের জায়গা বেছে নিয়ে বসলো।
এখনো শুরু হয়নি ভেবে রেখা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে রুমাল বের করে ঘাম মুছতে লাগলো ।
অন্য কয়েকজন জিজ্ঞেস করলেন আসবো ?
ভদ্রলোক আবার হেসে বললেন 'আসুন ,আসুন।'
এবার ভদ্রলোকের দিকে তাকালেন এভাবে বলছেন । রেখাতাকিয়ে দেখছে তার চেনা পরিচিত পাশের স্কুলের মাস্টার মশাই ওই জন্য এরকম হাসছেন।
রেখানএবার খুশি হল।
ওয়ার্কশপটা ছিল কোভিদ সিচুয়েশনে স্কুল ছুটের সংখ্যা বেড়েছে তাদেরকে আবার কিভাবে স্কুলমুখী করা যায়। সে প্রসঙ্গে আলোচনা।
প্রথমে  গ্রুপ ঠিক করে দেয়া হল ।প্রতি গ্রুপে 5 জন 6 জন করে টিচার থাকবে।সেই গ্রুপ থেকে উক্ত বিষয়ের উপর একটা কাল্পনিক সার্ভে রিপোর্ট তৈরি করতে বলা হলো।তারপর সেই বিষয়গুলো নিয়ে পর্যালোচনা। সমস্যা ,সমাধান সিদ্ধান্ত এই তিনটি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দেয়া হলো।
প্রতি গ্রুপে নিজের নিজের গ্রুপ লিডার ঠিক করে নিল। সার্ভে রিপোর্ট করার পর একটা প্রতিবেদন তৈরি করতে বলা হলো।
আর সার্ভে রিপোর্ট করার পর টিফিন আওয়ার্স একটু বিরতি দেয়া হলো।
প্রত্যেকে মধ্যাহ্নভোজন পর্ব শেষ করে প্রতিবেদন সাবমিট করার কথা বলা হলো ।প্রতিবেদন সাবমিট করা হলে , সর্বপর্যায়ে একটা সিদ্ধান্তে আসা হলো ।এই সিদ্ধান্তের ওপর বেস করে নিজে নিজে স্কুলের ক্ষেত্রে সার্ভে রিপোর্ট তৈরি করা ,কতগুলো ছাত্র বা ছাত্রী স্কুলছুট হয়েছে ,তাদের একটা লিস্ট তৈরি করা ।দরকার হলে তাদের বাড়ীতে যাওয়া ,বাড়িতে গিয়ে গার্জেন কে বোঝানো ,স্টুডেন্টকে বোঝানো যে করেই হোক তাদের মোল্ড করে স্কুলে আনা।
এবং কতজন স্টুডেন্ট স্কুলে আনা যাচ্ছে, কতজন যাচ্ছে না ,সে বিষয়ে এস আই অফিসে সার্ভে রিপোর্ট পাঠানো।'
বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
সব কিছু মিটতে মিটতে সাড়ে পাঁচটা বেজে গেল এদিকে ছটাতে ট্রেন আছে।
রেখা জিজ্ঞেস করল "ওয়ার্ক শপ কদিনের জন্য?'
" আজকের যে বিষয়টা ওপর ওয়ার্কশপ ছিল, তা আজকেই শেষ হয়ে গেল ।নেক্সট আবার ওয়ার্কশপ আছে ।সেটা প্রতি স্কুলকে জানিয়ে দেয়া হবে ।সেটা অন্য বিষয়ের উপর হবে।'
রেখা বলল ok
রেখার একটু সাহস করে বলল' এবার কী আমরা যেতে পারি ?আসলে আমাদের ট্রেন আছে তো (ঘড়ির দিকে তাকিয়ে।)
'হ্যাঁ ,হ্যাঁ আসুন আসুন ।ট্রেন মিস করলে অনেকটা সময় পর ট্রেন আছে ।আপনাদের সকলকে অসংখ্য ধন্যবাদ ।আজকের ওয়ার্কশপে অ্যাটেন্ড করার জন্য।"
প্রত্যেকে এবার বেরিয়ে যাবার উপক্রম করলে উনি (আর পি)আর একবার বললেন 'শুনুন ,শুনুন আপনাদের জন্য একটা সার্টিফিকেট থাকবে, সেটা জানিয়ে দেয়া হবে কবে দেয়া হবে। আমরা স্কুলেও পাঠিয়ে দিতে পারি ।না হলে এই স্কুলে থাকবে ।আপনারা এসে কালেক্ট করে নেবেন।"
রেখা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল ওরে বাপরে অলরেডি 5:35 বেজে গেছে তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলো।
তার মধ্যে একজন ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন "আপনি ট্রেন ধরবেন?"
রেখা বলল ' হ্যাঁ'
ভদ্রলোক বললেন"ট্রেন ধরবো তো ,দেখুন ,এখন  সঙ্গে সঙ্গে সব জিনিস খেলে তবে তো ট্রেনটা পাবো ,না হলে মিস করলেই বুঝতে পারছেন?'
রেখা মনে মনে ভাবল বুঝতে পারছেনা তারপর বলল" হ্যাঁ ঠিকই বলেছেন।'
ভদ্রলোক বললেন "ভালোই হলো দুজনে একসঙ্গে তাহলে অটো ধরতে সুবিধা হবে  ওরা তো আবার প্যাসেঞ্জার ছাড়া যেতে চায়না।"
রেখা বললো" ঠিকই। চলুন ,চলুন।"
গেটের কাছে আসতে দেখল একটা অটো দাঁড়িয়ে আছে অটো ওয়ালা কে বলল" স্টেশনে যাবেন?'
"হ্যাঁ যাবো ।"
রেখা ভালো করে অটোতে উঠতে উঠতে তাকিয়ে দেখল আয়নায় অটো ওয়ালার মুখ দেখা 
যাচ্ছে ।' এ তো যে অটোতে এসেছিল,সেই অটোওয়ালা। আর মনে মনে ভাবল এ কি আবার ভোগাবে নাকি?'
এরই মধ্যে ওই ভদ্রলোক বললেন' আপনি চলুন দাঁড়িয়ে রইলেন কেন?'
'কয়েকজন দেখি?''
'মানে আমরা ট্রেন পাব না বুঝতে পারছেন?
'আপনারা ট্রেনের একদম মুখোমুখি টাইমে আসবে আর বলবেন ট্রেন পাবেন না ।সে দায়িত্ব আমার নয়।"
রেখা এবার মুখ খুলে বলল 'আজকে জানেন দাদা আসার সময় উনার অটোতে এসেছি ,এই একই রকম কথাবার্তা।'
ভদ্রলোক বললেন 'আপনি মানুষের সুবিধার জন্য রয়েছেন তো , অসুবিধা হলে আপনার অটোতে লোকে যাবে কেন বলুন তো?'
"তাহলে নেমে যান।'
রেখা বললো 'দেখলেন কি মেজাজ !এদের 
দাদা ।চলুন ট্রেন পাব ,না,পাব, তবু এর অটোতে যাব না ।চলুন তো নেমে যাই।'
ঠিক বলেছেন' চলুন দেখি টোটো তে যাব।'
এরই মধ্যে এক টোটোওয়ালা হাঁকছে' স্টেশন স্টেশন ,ট্রেন ধরাবে দ্রুত।"
রেখা নামতে যাচ্ছে তখন অটোআলা বলল নরম সুরে 'আমি তো এক্ষুনি ছাড়বো।'
"তখন থেকে আমরা বলছি ছাড়ুন আপনি তো ছাড়ছেন না।"
এবার অটোওয়ালা স্টার্ট দিল তখন রেখা ঈশারায় ভদ্রলোককে বললেন "চলুন।'
এবার অটোআলা খুব দ্রুত ছোটালো এবং দেখা গেল যে ঠিক ট্রেন ঢোকার 5 মিনিট আগে স্টেশনে পৌঁছে গেল।
রেখা আর ভদ্রলোক ভাড়া মিটিয়ে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল ।ঠিক তখনই অটোওয়ালা বলল "ট্রেনটা তাহলে ধরালাম তো দাদা ,দিদি?'
রেখা আর ভদ্রলোক পিছন ফিরে তাকালো না।
রেখা ভদ্রলোককে বলল 'দেখলেন এদের মেজাজ কত?'
ভদ্রলোক বললেন' যা বলেছেন। এদের মেজাজ লাটসাহেবকেও হার মানায়  ।দুজন হো ,হো ,হো ,করে হাসতে লাগলেন।'
ভদ্রলোক বললেন' ওই দেখুন দু'নম্বরে খবর হয়েছে। দ্রুত পা চালান।'
রেখা বললো' ও বাবা'।
ভদ্রলোক বললেন আপনি কি লেডিসে  উঠবেন?'
রেখা বলে "আমি তো লেডিসেই …
রেখার কথা সম্পূর্ণ না হতেই ভদ্রলোক বলেন "প্রতিদিন লেডিসে  ওঠেন ঠিক আছে,আজকে না হয় জেনারেল কম্পার্টমেন্টে উঠলেন গল্প করতে করতে যাব।
রেখা মনে মনে ভাবল তা অবশ্য ঠিক কারণ ডেলি প্যাসেঞ্জার যারা আছে প্রত্যেকে তো সাড়ে 4 টার ট্রেনে চলে গেছে একাই যেতে হবে।
রেখা একটু নিজের ওয়েট বাড়ালো তারপর বলল "আসলে আমি বরাবর লেডিসের উঠে অভ্যস্ত তো তাই কেমন একটু অস্বস্তি হয়। অন্য কম্পার্টমেন্টে  উঠতে।'
ভদ্রলোক আবার জিজ্ঞেস করলেন' চলুন না'।
রেখা আর কথা না বাড়িয়ে বগির কাছে আসতেই ভদ্রলোক বললেন ', আসুন, আসুন বলতে গেলে হাত ধরে টেনে তুললেন।'
কেমন একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো
 রেখা ।তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে পড়ল না উঠে উপায়ও ছিল না ।এমন জোরে হাত টেনে তুললেন ।এদিকে ট্রেন ছেড়ে দেবার হুইসেল বাজিয়ে দিলো।
ভদ্রলোক জায়গা পেয়ে রেখাকে জায়গা দিলেন এবং নিজেও জায়গাটা নিলেন।
"আপনি জানলার ধারে টা পছন্দ করেন 
তো "ভদ্রলোক বললেন।
রেখা অবাক হয়ে বলল" আপনি কি করে জানলেন?"
ভদ্র লোক হেসে বললেন' এগুলো তো জানা কথাই মেয়েরা স্বাভাবিকভাবে জানলার কাছে বসতে চায় ।পুরুষরা যে জানালার কাছে বসে না সেটা কিন্তু বলছি না। আসলে এখানে জানলার ধারে সিট পাওয়া গেছে ,অফার করা হচ্ছে ন্যাচারেলি আপনি জানলার ধার বেছে 
নেবেন ।কি রাইট ?আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বললেন।"
রেখা বেশ ভদ্র লোকের কথায় মুগ্ধ হল।
"একদম ঠিক বলেছেন আমি জানালার ধার টাই নেবো।'
ভদ্রলোক বললেন "বসুন ,বসুন ,বসুন।"
এরমধ্যে ট্রেন ছেড়ে দিল ভদ্রলোক মুখিয়ে রয়েছে রেখার সঙ্গে কথা বলার জন্য ।ঠিক সেইসময় রেখার ফোন বেজে উঠল ।রেখা ফোনটা রিসিভ করে বললেন "হ্যালো"
"কে বলছেন,?"
"আমাকে চিনতে পারছেন না ম্যাডাম?"
"ও আপনি ?আসলে এখানে একটু কথা হচ্ছে তো আমি ভালো বুঝতে পারছিনা।"
"বলুন ।"
"শুভ সন্ধ্যা ম্যাডাম।'
"হ্যাঁ শুভ সন্ধ্যা।"
"আপনার লেখা রেডি তো?"
"হ্যাঁ পুরোটা হয়নি।'
"কেন ম্যাডাম এনার্জি পাচ্ছেন না।"
ঠিক তা নয়। আসলে গতকাল একটা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম, ফলে ফিরতে দেরি হয়েছে। আর আজকে আবার একটা ওয়ার্কশপ থেকে ফিরছি। সেই জন্য ।ঠিক আছে ,আমি বাড়ি গিয়ে দেখছি।"
"ঠিক আছে, তাহলে আর কথা বাড়াবো 
না ।আপনি সাবধানে আসুন।"
পাশের ভদ্রলোক রেখার দিকে' মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন "আপনি লেখালেখি করেন?
আমি একজন লেখিকার সঙ্গে যাচ্ছি।'
রেখাএকটু মুচকি হাসল।
ভদ্রলোক বিশ্বাসের সঙ্গে বললেন"আপনার কন্টাক্ট নাম্বারটা দেয়া যাবে?"

Vghh

LOVE

কবি আইরিন মনীষা  এর কবিতা "বেদনার বালুচরে"





বেদনার বালুচরে
আইরিন মনীষা 

বেদনার বালুচরে আছি একাকী 
বেঁচে থাকা দায়
ভালো থাকার আয়োজনে নেই
আর  কোনো সায়।

ভাঙা মনে নেই আজ
আর কোনো শান্তি
ফেলে আসা দিন যেনো
শুধুই এক ভ্রান্তি।

সুখ পাখি রয়ে গেলো
এখনো সেই অধরা
ক্লান্ত শ্রান্ত মনে  তাই
নেই শান্তির  পসরা

দিন যায় রাত আসে
চোখে নেই ঘুম
ফেলে আসা দিনে যেনো 
স্মৃতি কথার ধুম।

আশা নেই তবু দেখি
স্বপ্নের এক ভোর
খুলে যদি কভু আবার
খুশি মাখা দোর।

কবি অনিক রায় এর কবিতা "বাক্সবন্দি  চিঠিগুলো"




বাক্সবন্দি  চিঠিগুলো
অনিক রায় 

১.
আমি দেয়ালে কার কপাল ভেবে চুমু খাই 
ঠোঁট ভ'রে যায় চুনে 
আমার একাকিত্ব, তুমুল হেঁসে হেঁসে শেষে ম'রে যায়
আমার কার্যকলাপ শুনে।

২.
আমার রক্তের ফেনায় না-পাওয়ার ক্লেদ 
শহরের শেষ রাত্রির অলিগলির মতো ব্যর্থ শূন্যতা।

৩.
কালো চোখের জল যাবি আর কোথা বল
আমার নরম দুই গাল ছেড়ে !  
যেদিকেই দৌড়ে যাই লুকাতে পারি নাই 
দুঃখরা ধেয়েছে আমাকে তেড়ে ।

৪.
জীবনানন্দ আমাদের চোখের সামনে 
বাদামের ঠোঙা হয়ে যাচ্ছেন।

৫.
আমার গোটা জীবন তার খসড়া খাতা ছিল তাই
হিসেব নিকেশ শেষে আমি কাগজের দরে 
কারওয়ান বাজারের ফুটপাতে বিক্রি হয়ে যাই।

৬.
মৃত্যু এসে বুকের কপাটে যদি কোনোদিন কড়া নাড়ে, 
পাঁজরের ভেতরে ইরারে ছাড়া সে পাবে আর খুঁজে কারে !

৭.
স্বর্গের সব অপ্সরীদের অবহেলায় রাখতে পারি 
এমনকি ত্রিলোকশ্রেষ্ট-সুন্দরী উর্বশীকেও দ্বিধাহীন, 
কিন্তু একটিবার তোমাকে না দেখিলে নারী 
নতুন নতুন মৃত্যুতে আমি ম'রে যাই প্রতিদিন।

৮.
আমার মতো ক'রে বুক কাঁপানো নিভৃতে অন্ধকার;
মোম জ্বেলে দেখেছি কি কেউ ইরার—
রক্তকরবীর মতো তাজা টকটকে লাল চোখ আর ?

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৯৫





ধারাবাহিক উপন্যাস 


শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৯৫)
শামীমা আহমেদ 

শায়লাদের বাড়ির মুখোমুখি "স্বপ্নবাড়ি" এপার্টমেন্টের সামনে এসে  শিহাব তার বাইক থামালো। স্টার্ট  বন্ধ করে বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে  শিহাব মোবাইলটা  হাতে নিলো। বেশ অনেকটা সময় যাবৎ মোবাইল দেখা হয়নি। অন করতেই, আজ সন্ধ্যা থেকে রাহাত আর শায়লার এতগুলো  মিসড কল দেখে সে ভীষণ অবাক হলো ! বিকেল থেকেই তার মোবাইলে একেবারেই চার্জ ছিল না।আর দোতালার হাসান সাহেবের সাথে কথা বলায় ব্যস্ত থাকায় চার্জে দিতেও দেরি হয়ে গিয়েছিল। শিহাব এর জন্য ভীষণ আফসোস  করতে লাগলো! কি জানি  কেন ওরা এত কল করেছিল ? তাহলে বাসায় কি অন্যরকম  কিছু ঘটেছে ? শায়লা কি তবে নোমান সাহেবকে মেনে নিতে না পেরে বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে ? সে কি তবে আমাকে খুঁজেছে ?শায়লাতো আমার বাসা চেনে সেখানে চলে এলেইতো হতো। বিল্লাল তাকে ঘরে বসাতে পারতো ।  বিল্লালের কাছে তো ফ্ল্যাটের  চাবি দেয়া আছে। তবে কি  রাহাতও শায়লার খোঁজ পেতে তাকে এতবার কল করেছিল ? শিহাবের মনে নানান প্রশ্নের উদ্রেক হচ্ছে আর পাশাপাশি নিজের উপর ভীষণ রাগ লাগছে। তারই জন্য  বারবার শায়লা তার কাছে এসেও ফিরে যাচ্ছে। শিহাব দেখল এতরাতে চারপাশে সুনশান নীরবতা। শিহাব একাই রাস্তায়  দাঁড়িয়ে আছে। যে কোন সময় টহল পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জেরার মুখে পড়তে পারে কিন্তু শিহাব তার জন্য একেবারে ভীত নয়। সে ভাবছে শায়লা বা রাহাতকে কি এত রাতে কল ব্যাক করবে ? কিন্তু  শায়লা এখন যদি তার বাসায় থাকে। হয়তো তার স্বামীর সাথে থাকবে। আর অন্য কোথাও  গেলে সেটাও জানতে হবে।শিহাব ভাবনার কোন কূলকিনারা করতে পারছিল না।  একটু পরে শিহাব মোবাইল থেকে মুখ তুলতেই দেখতে পেলো শায়লাদের দোতালা বাড়িটি  নানান রঙের বাতিতে লাইটিং করা হয়েছে । সে এতক্ষণ  একেবারেই এসব খেয়াল করেনি। শায়লাদের বাড়ির মেইন গেট বিয়ে বাড়ির মত করে সাজানো হয়েছে। শিহাব বুঝে নিলো বর আগমনের জন্য পরিপূর্ণ প্রস্তুতিই নেয়া হয়েছে।আর হবেই বা না কেন ? বাড়ির বড় মেয়ের বিয়ে বলে কথা !  সবার মাঝে তো আনন্দ থাকা স্বাভাবিক । সুদূর কানাডা থেকে বড় জামাই আসছে। অবশ্যই তাকে সর্বোচ্চ সন্মানিত  করা হবে। শিহাব তার সাথে নিজেকে তুলনা করে ভাবলো তার হয়তো এই মূহুর্তে  বিদেশ যাবার কোন প্রস্তুতি  নেই তবে শায়লাকে আর আরাফকে নিয়ে তারা কোনদিন বিদেশে কোথাও তো বেড়াতে যেতেই পারতো। এমন রঙিন ভাবনা মনের ভেতর খেলে গেলেও শায়লাকে না পাওয়ার উৎকন্ঠায় তা যেন ম্রিয়মাণ হয়ে গেলো। শিহাব  এবার মনস্থির  করলো, যা-ই হউক না কেন, সে এক্ষুনি  শায়লাকে কল দিবে। যদি সে তার স্বামীর সাথেও থাকে তবুও। প্রয়োজনে তার স্বামীকে জানাতে হবে, শায়লা আর সে দুজন দুজনকে  ভালবাসে। উনি চাইলেই তাকে কানাডায় নিয়ে যেতে পারেন না। এমনটি ভাবতেই হঠাৎ  শিহাব দেখলো একটা ছায়া তার দিয়ে ধেয়ে আসছে।  ছায়া থেকে উপরে মুখ তুলতেই শিহাব দেখলো একটা ছেলে রাস্তার ওপাশ থেকে ক্রস করে আসছে।মুখটায় আলো না পড়াতে  ঠিক বুঝা যাচ্ছে না কে ওমন করে দৌড়ে  আসছে।কিছু পরেই ছায়াটা তার কাছে আসতেই মুখটি স্পষ্ট হলো। শিহাব ভীষণ চমকে গেলো !  আরে এ যে রাহাত! কিন্তু  সে এমনভাবে দৌড়ে আসছে কেন ? 
কি এমন হয়েছে ? এখনতো তার আপু আর নতুন দুলাভাইকে নিয়ে আনন্দে সময় কাটানোর কথা! রাহাত এখন একেবারেই কাছে চলে এলো। রাহাত শিহাবের সামনে এসে দাঁড়িয়ে  ভীষণ ভাবে হাঁপাতে লাগল। কিছুটা সময় নিয়ে বললো, শিহাব ভাইয়া আপনি মোবাইল কল রিসিভ করছে না কেন ? আমি আর আপু আপনাকে সেই সন্ধ্যা থেকে কল করে যাচ্ছি।ফোন বন্ধ রেখেছেন কেন ? কি হয়েছে আপনার ? আরাফ কেমন আছে ? আপু আপনাকে নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তা করছে । কোথায় ছিলেন সারাদিন ? এখানে কখন এসেছেন ? শিহাব রাহাতের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল। রাহাত উত্তর শোনার জন্য অপেক্ষা না করে একের পর এক  প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। শিহাবও যেন  উত্তর দেওয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। তার ভাবনায় সে কিছু বলার মত উত্তর আসছে না। কেবল ভাবছে কেন এত হন্যে হয়ে দুই ভাইবোন তাকে খুঁজছে ? শিহাবের ভেতর থেকে অস্ফুট স্বরে কিছু একটা বেরিয়ে এলো, কেন, কেন তোমরা আমাকে এমন করে খুঁজছো ? শায়লার কি কিছু হয়েছে ?  শিহাবের মন অজানা আশংকায় ভীত হয়ে উঠলো !  তবে কি শায়লা আত্মহত্যা !  না,না,ছিঃ  এসব কি ভাবছে ? 
এবার রাহাত বলে উঠলো, আপুর কি হবে?আপু ভালো আছেন। শিহাব যেন একটু আশ্বস্ত হলো।রাহাত শিহাবকে সহজ করতে বললো, আপনার কোন  সাড়া না পেয়ে আপু একেবারে  অস্থির হয়ে আছে। নানান দুশ্চিন্তা করছে। শিহাবের ভেতরে একরাশ অভিমান জমা হলো। অনুযোগের সুরে বললো, এখন
তোমার আপু আমাকে নিয়ে কেন ভাববে ? তোমার আপুরতো এখন আর, আমায় নিয়ে, ভাবনায় ডুবে থাকার কথা নয়।
রাহাত খুব বুঝতে পারলো, শিহাব ভাইয়ার এই অভিযোগের তীর তারই প্রতি ছুড়েছে।রাহাত আজ সবই মেনে নিবে। এমন করে শিহাব ভাইয়াকে পেয়ে যাওয়া! এ যে সৃষ্টিকর্তার অসীম দয়া। রাহাত প্রতিটা ক্ষন অনুশোচনায় পুড়েছে। আজ তার কারণেই ঘটনাটা এত জটিলতায় এসে দাঁড়িয়েছে।  কিন্তু রাহাত এটা-ই ভীষণ অবাক হয়েছে কেমন করে নোমান সাহেবের কানাডা থেকে না আসা আশ্চর্যজনক ভাবে সবকিছু পালটে দিলো। সে শিহাবকে বললো, শিহাব ভাইয়া, এখানে না, আপনি বাসার ভেতরে চলুন। আপা, আপনার জন্য অপেক্ষায় আছে । শিহাব বুঝতে পারছে না,  এখন কেন সে ভেতরে যাবে ? বাড়িতে নতুন জামাই এসেছে। তার সামনে এভাবে তাকে নিয়ে যেতে চাইছে ! নাকি, শায়লা তার জন্য নোমান সাহেবকে গ্রহণ করায় সম্মতি দিচ্ছে না। নাকি, আমি গিয়ে বুঝালে শায়লা তাকে গ্রহণ করে নিবে।আজ রাহাতের এই ভিন্ন আচরণে শিহাব কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।  যেখানে, এই রাহাত তাকে এড়িয়ে সবকিছু করেছে । আবার আজ কোনো ট্রিকি গেম খেলছে নাতো ? নোমান সাহেবের কাছে নিয়ে তাকে 
অপমানিত করবে নাতো? শিহাব নানান ভাবনায় স্থির হয়ে রইল। কিন্তু  রাহাতের যেন আর ত্বর সইছে না।  পরক্ষনেই সে ভাবলো এখন যদি শিহাব ভাইয়াকে বলা হয় নোমান সাহেব আসেননি এখন আপনার সাথে আপুর বিয়ে হবে। এই কথাটিতে শিহাব ভাইয়া  আমাদের অন্যরকম ভাববে।  তবে যে করেই হউক, এবার আপু আর শিহাব ভাইয়াকে  মিলিয়ে দিতে হবে।মিথ্যে করে কিছু বলে হলেও তাদের চার হাত মিলিয়ে দিতে হবে। রাহাত তাই নোমান সাহেবের বিষয়টি এমনভাবে শিহাবকে জানালো, যেখানে আর কথার মাঝে কোন  ফাঁক রইল না।সে এবার মুখ ফস্কে  বলেই ফেললো,কানাডা থেকে নোমান ভাইয়া আসেননি,মানে আপু  তাকে আসতে নিষেধ করে দিয়েছে। সে জানিয়েছে, আপনাকে সে ভালবাসে, সে আর কাউকে গ্রহন করবে না। কানাডা যাবে না। কথাটিতে শিহাবের কেমন যেন খটকা লাগলো, সে রাহাতকে বললো,কিন্তু আমি তো জানি উনি ফ্লাইটে উঠে গিয়েছিলেন। রাহাত তৎক্ষনাৎ বুদ্ধি বাৎলে বললো,না, বাসার সবাইকে সান্ত্বনা দিতে এটা বলেছিলেন। উনি আসলে ফ্লাইটে উঠেননি। 
এবার রাহাত শিহাবকে আর কোন সন্দেহের প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে একেবারে খপ করে শিহাবের হাত ধরে ফেললো,  খুবই বিনীতভাবে বললো, শিহাব ভাইয়া আমার জন্যই আপনাদের এত ঝামেলায় পড়তে হয়েছে।আমি এর জন্য দুঃখিত।আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাইছি। আপনি ভেতরে চলুন। আপনার বাইক স্টার্ট দিয়ে বাসার কাছে নিয়ে আসুন। এখন অনেকরাত।এরপর বাইরে থাকলে আপনার আমার  অন্য ঝামেলায় পড়তে হবে। 
রাহাত এবার ওদের বাসার ছাদের দিকে তাকালো। দেখলো,বুবলী তেমনি ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখেমুখে বিস্ময়! কি হচ্ছে এসব! দূর থেকে সে কিছুই বুঝতে পারছে না। ঐ লোকটি কে ? যার সাথে রাহাত এত কথা বলছে ? আবার তাকে হাত ধরে অনুরোধ করছে ? এবার রাস্তা থেকে বুবলীর ফোনে রাহাতের কল এলো, বুবলী তা রিসিভ করতেই  রাহাত যেন  খুশির আবেগে কিছুই বলতে পারছিলো  না। বুবলী জানতে চাইল, রাহাত ভাইয়া কী হয়েছে ?  ঐ লোকটি কে ? 
রাহাত এবার নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, আরে এটাই শিহাব ভাইয়া! তুমি শায়লা আপুকে জানাও শিহাব ভাইয়া এসেছে। বাসার সবাইকে জাগিয়ে তোল।আমি এখুনি শিহাব ভাইয়াকে নিয়ে বাসায় আসছি। বুবলী ভাবলো এও কি সম্ভব! তবে অসম্ভবও কিছু নয় ! যেভাবে শায়লা আপু শিহাব ভাইয়ার জন্য ভেঙে পড়েছে আর এত রাতে শায়লা আপুর জন্য যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, তাদের দুজন দুজনকেই তো পাবে। এ এক দারুণ হৃদয়টান! বুবলীর মনের ভেতর পুলকিত হলো! সে দেখলো, বেশ হ্যান্ডসাম একজন লোক, উনিই তাহলে শিহাব সাহেব ! প্রথম দেখায় যে কেউ এমন লোকের প্রেমে পড়বে। তাইতো শায়লা আপু এত প্রেমে ডুবেছে।লাইটপোস্টের ঝকঝকে আলোতে দেখা যাচ্ছে নেভি ব্লু চেক শার্টে বেশ ক্যাজুয়াল পোষাকে কিন্তু বেশ স্মার্ট লুকের একজন মানুষ বাইকে স্টার্ট  দিচ্ছে। রাহাত তার খুব কাছে একেবারে লেপ্টে দাঁড়িয়ে আছে। যেন কিছুতেই হাতছাড়া  হয়ে না যায় ! রাহাতের কান্ড দেখে বুবলীর বেশ হাসি পাচ্ছিল। পরক্ষণেই ভাবলো, হবেই বা না কেন ? রাহাত ভাইয়া তার নিজের ভুলের জন্য যেভাবে বারবার নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছিল। সেই ভুলের সংশোধনের জন্য এটুকুতো করতেই হবে। যেন সে  শায়লার কাছে পণ করেছে, শিহাব ভাইয়াকে পাইয়ে দেয়ার।
বুবলী  দোতলায় নামার জন্য  পিছন ঘুরতেই দেখতে পেলো শায়লার হলুদের স্টেজটা  নানার রঙিন ফুলে যেন হাসছে ! বুবলী কল্পনায় সেখানে শায়লা আর শিহাবকে দেখতে পেলো যেন ! বুবলী নিজের মনের এমন ভাবনায় নিজের মনেই হেসে উঠলো ! সে ভাবলো, শায়লা আপুকে এক্ষুনি খবরটা দিতে হবে। সে  মুচকি হেসে , সিঁড়ি দিয়ে গটগট করে দোতলায় নেমে এলো। সে শায়লার ঘরের দরজায় বেশ অনেকবার নক করেও শায়লার কোন সাড়া না পেয়ে চিন্তিত হলো। বাড়ির সব লোকজন গভীর ঘুমের অতলান্তে। বুবলী বেশ অনেকটা সময় দরজায় নক করে হাতের মোবাইলের দিকে খেয়াল হলো। সে কন্ট্যাক্ট লিস্টে শায়লার নাম্বার খুঁজে নিয়ে শায়লাকে কল করলো। কিন্তু একের পর এক কল বেজেই যাচ্ছে। শায়লা কল রিসিভ করছে না। শায়লা কী ঘুমিয়ে না অন্যকিছু ? বুবলী ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলো। 
চলবে....

২০ এপ্রিল ২০২২

মমতা রায়চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৫৭





উপন্যাস 


টানাপোড়েন ১৫৭
ওয়ার্কশপে রেখার নাম
মমতা রায়চৌধুরী



মনের ভেতরে একটা কেমন গোপন যন্ত্রণা কুরে কুরে খাচ্ছিল রেখা ভেবে পাচ্ছিল না আসলে সেই যন্ত্রণাটা কি ?
আসলে কিছু কিছু যন্ত্রণা থাকে যেগুলো বোধের অতীত, শুধু নস্টালজিক হয়ে ফিরে আসে, ভাবায় কষ্ট দেয় ,কখনও বা সেই যন্ত্রণাগুলো সুখের স্বর্ণালী স্মৃতি হয়ে ফিরে আসে।
বড়দি ফোন করেছিল অনিন্দিতা ওর বাচ্চাটাকে নিয়ে খুব মানসিক কষ্টে আছে। কথাটা শুনে রেখার ভেতরে কেমন যেন একটা কষ্টের বোধগুলো দানা বেঁধে উঠেছে অথচ অনেক দিন অকারণে রেখার সাথে কত মনে দাগা দিয়ে কথা বলেছে। আজকে সে সব কষ্ট মনেই হচ্ছে না।  মনে হচ্ছে  এখানে একজন মায়ের কষ্ট অনেক বেশি।শুধু  একজন মা তার সন্তানকে ভালো দেখে তার যে মানসিক শান্তি হয়, সেই শান্তিটুকু ফিরে পাব অনন্দিতা। ঈশ্বর করুন ওর বাচ্চার যেন সব স্বাভাবিক থাকে ,ভালো থাকে, সমাজের উপযোগী হয়ে ওঠে। 
এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ মনে হল' স্বপ্নীল কেমন আছে কে জানে? কার থেকেই বা খবর পাবে?'
এত ভাবনা চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, ঘুম কিছুতেই আসতে চাইছে না ।অথচ কখন যে একসময় ঘুমিয়ে পরেছে বুঝতেও পারেনি।  ঘুম ভাঙ্গলো  অ্যালার্ম ঘড়ির আওয়াজে।
উঠতে ইচ্ছে করছে না ।শরীর ক্লান্ত ।ঘড়িটা দেখে নিয়ে এলার্ম টা বন্ধ করে আবার শুয়ে পড়লো।
শুয়ে থাকতে থাকতে মনে হল যে 'সে ঘুমায় নি অথচ ঘুমিয়ে পড়েছে ।এবার ঘুম ভাঙলো কলিং বেলের আওয়াজে। "ওম জয় লক্ষ্মী মাতা,, মাইয়া জয় লক্ষ্মী মাতা...।'এটা আবার কাদের বাড়ির কলিংবেলের আওয়াজ।  ভালো করে কান খাড়া করে শুনল। কাদের বাড়ির কলিংবেলের আওয়াজ এটা তো রেখার বাড়িরই । যা বাবা এটা আবার কবে হলো।
এবার না উঠে পারা যাচ্ছে না। উঠতে তো হবেই। স্কুলে  যেতে হবে। মাসি এসেছে নিশ্চয়ই।
ঘুমের জড়তা কাটিয়ে আস্তে আস্তে দরজাটা খুলল। রেখা অবাক হয়ে দেখে আর ভাবে
"ও মা মাসি কোথায়?'
পার্থ খুব হেসে হেসে বলল
'কি বৌদি অবাক হয়ে গেলেন?'
রেখা চোখ দুটো ভালো করে হাত দিয়ে রগড়ে  নিয়ে বললো  'না মানে ,আমি ভেবেছি মাসি ..।
এত সকালে তুমি আসবে বুঝতে পারি নি।'
"আরে আমি কি জানতাম?
ঠিক আছে ভেতরে এসো পার্থ ।
'ভেতরে যাবো না বাড়িতে গিয়ে এগুলো দিই।'হাতে ধরে থাকা শাক গুলোকে দেখিয়ে।
পার্থর হাতে দুই আঁটি পাটশাক।
আরে সকালবেলায় টাটকা পেলাম নিয়ে যাচ্ছিল এক মাসি। পরতা হল তাই নিয়ে নিলাম।
একদিন বলেছিলে যে পাটশাক খেতে ইচ্ছে করছে।তাই…।'
"বাববা ,পার্থ তোমার মনেও থাকে " একগাল হেসে রেখা বলল।
"'কেন মনে থাকবে না বৌদি?"
'ঠিক আছে ,এসো ভেতরে।  চা খেয়ে যাও।'
'না বৌদি, যাই ।আমাদের বাড়িতে কাজের মেয়েটা আসলো কিনা দেখি।'
"ঠিক আছে, তাহলে এসো।"
"অন্য দিন এসে চা খেয়ে যাব।"
"তাই হবে।"
দরজা বন্ধ করতে যাবে এমন সময় মাসী বললো 'ও বৌমা দরজা বন্ধ ক'রো না, এসে গেছি।'
"হাতে কি ওগুলো বৌ মা।"
"পাটশাক গো পার্থ দিয়ে গেল।"
"মাসি শাকগুলো নিয়ে যাও তো একটু কেটে দিও তো।"
ঘাড় নেড়ে পাট শাকের আঁটি  নিয়ে চলে গেল।
ওই দেখো ভুলে গেলাম?
মাসি বললো' কি ভুলে গেলে বৌমা?'
আরে সেদিন ইলিশ মাছ এনেছিল ।ওকে তো টাকা দেয়া হয়নি ।টাকাটা তো দিতে হবে ।কাজের কথা কিছুই বলতে পারলাম না।
মাসি বললো 'দেবে পরে।'
'আসলে ও আসলে এত হুটোপাটি করে না ,সবকিছুই ভুলে যাই।'
বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে গোপালকে ভোগ চাপিয়ে নিচে নেমে আসলো চা করতে। যা হয়ে গেলে একে একে ফ্রিজ থেকে কাটা সবজি গুলো বের করে রান্না চাপিয়ে দিল। রুটি হলো তারপর মিলিদের খাবার হল ।তারপর নিজেদের খাবার রেডি করল। এরই মাঝে মাসিকে চা জলখাবার দিয়ে দিল। আজকে মাসি খুব তাড়াতাড়ি কাজ করে চলে গেল। কোথায় যাবে তাড়া আছে।
এবাবা  মনোজ এখনো ঘুম থেকে উঠলো না।
কি কুম্ভকর্ণের ঘুম রে বাবা?
আজকে অফিস যাবে না, নাকি?
বলেই রেখা শোবার ঘরের দিকে পা বাড়ালো। বাইরে মিলিদের চিৎকার শোনা গেল। আপন মনেই রেখা বললো সবুর কর। খাবার আনছি রে বাবা। চেঁচাস না।'
রেখা ঘরে গিয়ে দেখে নাক ডেকে বিন্দাস ঘুমোচ্ছে।
রেখার দুই গালে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ বসল বিছানার উপর তারপর শেষে জোরে একটা ধাক্কা দিলো নাম ধরে ডেকে 
মানুষতো ঘুমের থেকে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো বড় বড় চোখ করে তারপর বলল 'কি হচ্ছে ?কি করছো?'
"তুমি উঠবে না আজকে?'
'হ্যাঁ, উঠব তো বলে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।'
"তাহলে তুমি আজকে অফিস যাচ্ছ না?'
মনোজের কানে কথাটা গেল তারপর ধরফর করে বিছানার উপর উঠে বসে বলল মানেটা কি অফিসে যাব না মানে?
মনোজ  দিকে তাকিয়ে রেখা  মাথা নেড়ে বলল' সে তো বটেই ।কখন অফিসে
 যাবে ?ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখো?'
মনোজ তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নেমে বাথরুমের দিকে ছুটল , আর বলতে লাগল বলতে গেল'তুমি আমাকে ডেকে দাও নি।'
'কতদিন বলেছি আমাকে ঠিক টাইমে ডেকে দেবে?'
রেখা বলে এটাই কপাল বুঝলে তুমি ঘুমোবে আর দোষ চাপাবে আমার ওপর?'
অন্যদিকে মিলিদের চিৎকারে আর টিকতে পারছে না দরজা মনে হচ্ছে ভেঙে ফেলবে।
রেখা বললো 'না  আগে ওদের খাবারটা দিয়ে আসি।'
ঈদের খাবার টা দিয়ে এসে বিছানাপত্র ছেড়ে নিয়ে মনোজের ব্রেকফাস্ট রেডি করে ফেলল তারপর ওয়ারড্রব খুলে মনোজের ড্রেস বের করে রাখল সোফার ওপর।
মনোজ বাথরুম থেকে বেরিয়েই বলল 'আমার ড্রেসটা বের করো রেখা তাড়াতাড়ি আর ব্রেকফাস্ট টা দাও।"
রেখা বললো' তুমি যত তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে আস্ তে  পারবে ,তত তাড়াতাড়ি তোমার ব্রেকফাস্ট দেবো।'
"আমি রেডি হয়ে গেছি।"
"আমিও তোমার খাবার নিয়ে বসে আছি।"
মনোজ তাড়াতাড়ি এসে খাবার টেবিলেই বসল আর এত তাড়াতাড়ি খেতে লাগল তাই দেখে রেখা বলল" এত তাড়াহুড়া করছো কেন তুমি ?"
মনোজ বলল' আমাকে এই ট্রেন পেতেই হবে।'
রেখা বললো "ঠিক পাবে ।এমন কিছু সময় নষ্ট হয় নি।"
মনোজ বলল 'পেলেই ভালো বুঝলে?"
রেখা নিজে ব্রেকফাস্ট না খেয়ে টিফিন বক্সে নিয়ে নিল আর সঙ্গে সঙ্গে টিফিন ভরতে ভরতে মনোজকে বলল' তুমি লাঞ্চে কি খাবে আজকে ?তোমাকে কি দিয়ে দেবো বাড়ির খাবার?"
মনোজ বেসিনে মুখ ধুতে ধুতে বলল", না না ,না ।আমি আজকে বাইরে খেয়ে নেব।"
মনোজ রেখাকে টাটা করে বেরিয়ে গেল।
রেখাও রেডি হয়ে সেন্টুদাকে মিলিদের খাবার বুঝিয়ে দিয়ে, ঘরগুলোতে তালা লাগিয়ে দিয়ে শুধু গেটের চাবিটা সেন্টু দার হাতে দিয়ে অটো ধরবে বলে ওয়েট করতে লাগলো।
অটো পেয়েও গেল ।যথারীতি নির্দিষ্ট টাইম স্টেশনে পৌঁছে ট্রেনে উঠে বসলো।
ট্রেনে উঠে যথেষ্ট ভিড় থাকায় বড়দিকে ফোন করতে পারলো না।
রেখা মনে মনে ভাবল' ভিড়টা কমলে জায়গা পেলে, দিদির কাছ থেকে জেনে নিতে হবে কোথায় ওয়র্কসপ টা হচ্ছে?'
কালকে বড়দি এত কথা বললেন অথচ ওয়ার্কশপ কোথায় হচ্ছে সেটা বলতেই ভুলে গেছেন আর আমারও জিজ্ঞেস করা হয়ে উঠলো না।'
এসব ভাবতে ভাবতেই ট্রেনের ভিড় ঠেলে ঠেলে সিটের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করল এর মধ্যে একজন মহিলা এমন ধাক্কা মারলো রেখা প্রায় একটা ছোট বাচ্চার উপর উল্টে পড়ে যাবার উপক্রম হল।
 রেখা বলল' দিদি, একটু ঠিক করে দাঁড়াতে পারেন না। কেউ এইভাবে ঠেলা মারে বলুন তো?'
তবে যাই হোক রেখা এতসব কথা বলার পরেও ভদ্রমহিলা একটা কথাও বলল 
না।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে সামনের কয়েকটা স্টেশন আসার পরই ফাঁকা হয়ে গেল।
অন্তত ঠিক করে দাঁড়াতে পারল রেখা তারপর জিজ্ঞেস করতে লাগল কে কোথায় নামবে?
জিজ্ঞেস করতে করতেই সিটে বসে থাকা প্রথম ভদ্রমহিলা উঠে দাঁড়ালেন বললেন "আপনি এখানে বসুন আমি সামনেই নামবো।"
এ যেন রেখার কাছে মেঘ না চাইতে জল।
রেখা এখন মনে মনে ভাবছে বসে একটু জল খেয়ে ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করেই বড়দিকে ফোনটা করবে এমন সময় রেখার ফোন বেজে উঠলো। রেখা ফোনটা রিসিভ করতে গিয়ে দেখল 'বড়দির ফোন?'
"হ্যালো দিদি,'
', হ্যাঁ, রেখা আমি বড়দি বলছি।"
"বুঝতে পেরেছি বলুন।'
আজকে ওয়ার্কশপটা কোথায় হচ্ছে সেটা তো তোমাকে বলা হয়নি ,তুমি যাবে কি করে ওখানে? এইজন্য ফোন করলাম।"
"আমিও ঠিক একই কথা ভাবছিলাম যে আপনাকে ফোন করে জানবো।তার
আগে আপনি ফোনটা করে ফেললেন।"
বড়দি হেসে বললেন' তাই কি টেলিপ্যাথি দেখো?'
'শোনো তুমি ডন বক্স স্কুলে চলে আসবে।'
'ঠিক আছে দিদি।
ওখানে গিয়ে অনিন্দিতার নামটা কাটিয়ে তোমার নামটা লিখে নিতে বলবে কেমন? 'Ok দিদি।'
"যে কটা দিন ওয়ার্কশপ হবে তুমিই যাবেi'
Ok
বড়দি হেসে ফোনটা নামিয়ে রেখে বললেন' বেস্ট অফ লাক।'
'থ্যাংক ইউ দিদি'।

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৯৪ 





ধারাবাহিক উপন্যাস 


শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৯৪)
শামীমা আহমেদ 



আজ সন্ধ্যার পর থেকেই রুহি খালা শায়লার মায়ের পাশে আছেন। শায়লার মায়ের দেখভাল করছেন। কানাডার বিষয়টি নিয়ে  শায়লার মায়ের কাছে তিনি যেমন লজ্জিত হয়েছেন তেমনি নোমান বাবাজির কান্ডে ভীষণ মর্মাহতও হয়েছেন। এমনটি বুঝাতে তিনি শায়লার মায়ের আশেপাশে ক্ষমার্হ আবেদনে ঘুরঘুর করছেন। এমন একটা বয়সে মেয়ের বিয়ে নিয়ে এমন কেলেংকারী তাও লোকজন আত্মীয়স্বজনের সামনে, কি জানি এতটা ধাক্কা তিনি সামাল দিতে পারবেন কিনা ?এসব ভেবেই রুহি খালা নিজের অপরাধবোধে নিজেই তাই অনুশোচনায় দগ্ধ হচ্ছেন। তবে শায়লা পারতপক্ষে রুহি খালার সামনে পড়ছে না।তাকে এড়িয়েই চলছে। যদিও এহেন ঘটনা তাকে দারুনভাবে বাঁচিয়ে দিয়েছে। তাইতো শিহাবকে আপন করে পাওয়ার স্বপ্নে সে বিভোর রয়েছে। যদিও  শিহাবের নীরবতায় তা অনিশ্চয়তার  মধ্যেই রয়েছে।
শায়লা নিজের ঘরে বিছানায় শুয়ে মোবাইলে  একদৃষ্টে শিহাবের ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল। কখন কোন অজান্তে তার চোখ জলে ভরে উঠলো। তার মনে নানান প্রশ্ননের উদয় হচ্ছে। কেন শিহাব আজ সারাদিন এতটা নীরব হয়ে আছে ? কানাডার বিষয়টি হয়তো তাকে অনেক উৎকন্ঠায় ফেলেছে। কিন্তু তাকে সবকিছু জানাতে রাহাত বারবার কল করে যাচ্ছে।হয়তো অভিমানে মোবাইল বন্ধ রেখেছে। শায়লা নিজের কাছেই নিজে প্রশ্ন করলো,আমি এখন কি করবো ? কিভাবে শিহাবকে বুঝাবো,তুমি যা ভাবছো তার কিছুই ঘটছে না এখানে। কেন তুমি মোবাইলটা বন্ধ রেখে সব যোগাযোগ বিছিন্ন করে রেখেছো ? শায়লার চোখের কোণ থেকে কান্নার ধারা গাল বেয়ে বিছানার বালিশে পড়ছে। শায়লা ফুল দিয়ে সাজানো খাটে মখমলী চাদরে শুয়ে একা একাই সময় পার করছে ।  অতৃপ্ত মনে বারবার শিহাবকে খুঁজে ফিরছে।শিহাবতো আজ তার পাশে থাকতে পারতো। নিবিড় বন্ধনে খুব কাছে নিতে পারতো। দুজনে আজ উন্মাতাল রাত কাটাতে পারতো। সেতো তাকে তেমন করেই চেয়েছিলো। কিন্তু কেন চাওয়া পাওয়ার মাঝে এতটা দূরত্ব হলো ?  শিহাব  তাকে এতদিন যত যত মেসেজ পাঠিয়েছে  শায়লার  মোবাইলের মেসেঞ্জারে সবগুলো তেমনিভাবেই আছে। শায়লা ভেবেছিল নোমান সাহেব এলে তাকে সব দেখাবে। তার জন্য শিহাবের মনে কতখানি ভালোবাসা আছে তা জানাবে। সেও যে শিহাবকে পাওয়ার জন্য কতটা  আকুল হয়ে আছে নোমান সাহেবকে সেটাও বুঝিয়ে দিবেন। আর এসব দেখে নিশ্চয়ই উনি আর শায়লাকে কানাডায়  নিয়ে যেতে চাইতেন না। কিন্তু  অসম্ভব এক সুসংবাদে এসবের কিছুরইতো প্রয়োজন পড়েনি। নোমান সাহেব স্বেচ্ছায় সরে গেছেন। উনি  এতে শায়লার কাছে ক্ষমা চাইলেও এটা তো শায়লার জন্য শাপে বর হয়েছে । আর এতো বিধাতারই খেলা।  আর এতেই শায়লা বুঝে নিয়েছে আর কোন বাধা রইল না। শিহাব শুধু  তারই হবে। কিন্তু শায়লা ভাবছে সবকিছু এত সহজেই সমাধান হলেও এত কাছে থাকা দুটো মানুষ কেন এক হতে পারছিনা ? কেন একটা দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে তাদের পড়তে হচ্ছে। শায়লা এটা খুবই খেয়াল করছে যে বুবলী  আপ্রাণ চেষ্টা করছে সবকিছুকে একটা সমাধানে আনতে কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। শায়লা জানে না কেন তার জীবনটা সরলরেখায় চলছে না। কেন বারবার তাকে বাধার সন্মুখীন হতে হচ্ছে। কই,নায়লার জীবনটাতো আর দশটা মেয়ের মতই এগুলো।পড়ালেখা, প্রেম, বিয়ে, ধনী পরিবারের বউ, স্বামীকে নিয়ে সুখী সংসার আর এখন অনাগত সন্তানের আনন্দে বিভোর ! যদিও নায়লার এই সুন্দর জীবনের জন্য শায়লাকে তার জীবনের অনেক স্যাক্রিফাইস করতে হয়েছে । শায়লা জানেনা, কেন কিছু মানুষের জন্য সুখটা চিরকাল মরীচিকা হয়ে থাকে।শায়লা শিহাবের মেসেজগুলো দেখছিলো আর কান্নায় ভেঙে পড়ছিলো।
শিহাব বারান্দায় বসে একে একে বেশ কয়েকটি  স্টিক একের পর এক টেনেই যাচ্ছিল। ধীরে ধীরে  আশেপাশের বাড়ি ঘরের বাতিগুলো নিভে যাচ্ছিল।মানুষ ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। কিন্তু শিহাবের চোখে একফোঁটাও ঘুম নেই।রাস্তায় নাইটগার্ডদের বাঁশি বাজিয়ে রাস্তা টহল দেয়া শুরু হয়ে গেছে। কিছু কুকুর একটানা ঘেউঘেউ করেই যাচ্ছে। শিহাব বুঝেনা এত নাইট গার্ডদের পাহারাতেও কেমন করে কুকুরগুলো ডেকে যায় ! অবাধ্য কুকুরগুলো হয়তো কিছুর প্রতিবাদ জানায়। শিহাব ভাবলো তবুওতো ওরা ওদের গলার স্বর উচ্চরবে কিছু বলতে পারে কিন্তু সে ? তার সামনে দিয়ে শায়লা আজ অন্যের বাহুলগ্না হয়ে গেলো কিন্তু সে কোন প্রতিবাদই করতে পারলো না।এই সমাজ সংসারকে চিৎকার করে গলা ফাটিয়ে বলতে পারলো না,তোমরা ভুল করছো। দুইটি সুন্দর মনের চাওয়াকে তোমরা গলা টিপে হত্যা করছো। শিহাবের চোখের সামনে বারবার শায়লার মুখটি ভেসে উঠছে !  আজ সকালে শায়লাতো চলে আসতেই চেয়েছিল।তার ভুল সিদ্ধান্তে আজ তার শায়লাকে হারাতে হলো। শিহাবের নিজের ভুলের কারণেই সবটা নয়,এতে রাহাতের বিশ্বাসঘাতকতাও দায়ী।  তার মনটা রাহাতের প্রতি ভীষণ অভিমানী হয়ে উঠলো। কেন রাহাত তার বোনের মনের দিকটায় দেখলো না। কেন সবকিছু জানানোর পরেও রাহাত তাকে এড়িয়ে গেলো।শিহাবের ভেতরে শায়লার জন্য অসহিষ্ণু মনটা ছটফট করতে লাগলো। আরেকটি সিগারেট ধরিয়ে সে গভীর ভাবনায় ডুবে রইল। কিন্তু হঠাৎই কোথা থেকে যেন তার মনটা বিদ্রোহী হয়ে উঠলো।
প্রতিবাদে ভেতর থেকে সাড়া মিললো। নাহ ! যে করেই হউক শায়লার একটা খবর তার নিতেই হবে। সেই দুপুরে একটা মেসেজ হয়েছে।মানুষের জীবনে মিরাকল অনেক কিছুইতো ঘটে!  নিশ্চয়ই শায়লা এখনো তারই অপেক্ষায় আছে ।  শিহাবের দৃঢ় বিশ্বাস  শায়লা কিছুতেই কানাডায় যাওয়া মেনে নিবে না। নিশ্চয়ই জোর করে কেউ তাকে নিয়ে যেতে পারবে না।শায়লাকে এতটা জানার পড়েও  যদি এখন সে নীরব থাকে তবে সারা জীবন এর জন্য পস্তাতে হবে। শিহাব ভাবলো, তার কি কোথাও কোন ভুল হচ্ছে ? তার এই আজকের ভুল যদি ভবিষ্যতে তাকে শায়লার কাছে কোন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায় ? যদি তাকে অপরাধী করে ?  এই দোটানায়  যদি শায়লা যদি অন্যরকম কোন সিদ্ধান্ত নেয় ? তবেতো সে  কোনদিন শায়লার ক্ষমা পাবে না।নাহ, শিহাব আর ভাবতে পারছে না। সে চট করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। নাহ, তার মন বলছে শায়লা তার জন্য  আকুল হয়ে আছে,তার মন বলছে শায়লা তারই পথপানে চেয়ে আছে ।  শিহাবের মন বলছে শায়লাকে একান্ত করে শুধু তারই পাবার অধিকার আছে কেননা সে শায়লাকে অনেক ভালোবাসে। সে এখুনি শায়লাদের বাসায় যাবে এবং যা হবার হবে,চাইলে ওরা থানা পুলিশও করতে পারে, শিহাব  তার পরোয়া করবে না। শায়লা যদি স্বেচ্ছায় তার কাছে আসে কেউ তাকে ফেরাতে পারবে না। মনের ভেতর এমনি 
এক সাগর ভালোবাসার আবেগের শক্তির জোরেই সে শায়লাকে তার করে নিবে। শিহাব  তৎক্ষনাৎ তার হাতের জলন্ত সিগারেটটি এস্ট্রেতে গুঁজে নিয়ে দ্রুততম পায়ের চলায় তার বেডরুমে চলে এলো। আলমারি খুলে নেভিব্লু ফুল স্লিভ একটি শার্ট 
বের করলো সাথে আয়রন করা  অফ হোয়াইট  কটন ফেব্রিকের একটা প্যান্ট। শিহাব খুবই ক্যাজুয়াল ভাবে শার্টটি পড়ে নিলো। শার্টের ফুল স্লিভ তিনটি  ভাঁজ করে গুটিয়ে নিলো।আজ আর শার্ট ইন করে পরার ইচ্ছে নেই। শিহাব তৈরি হয়ে আয়নায় একবার তার চোখ পড়তেই নিজেই যেন নিজের চোখের কাছে শপথ করে নিলো।শায়লাকে আমার করতেই যাচ্ছি। শায়লাকে নিয়েই আজ আমি ফিরবো। শিহাব মোবাইল চার্জার থেকে খুলে হাতে নিলো। পায়ে ক্রস বেল্টের জুতা পরে নিলো।বাইকের চাবি,হেলমেট  নিয়ে দরজা লক করে চাবি পকেটে পুরে সিঁড়ির দিকে এলো। বাড়ির লোকজন ঘুমের অতলান্তে। এত রাতে লিফট বন্ধ থাকায় শিহাব  একে একে সিঁড়ির বাতি জ্বালিয়ে নীচতলায় চলে এলো।কেয়ারটেকার বিল্লাল তার ঘরে গভীর নিদ্রায়। আজ হাসান সাহেবের বাসায় বেশ ভালোমন্দ খেয়ে আরামের ঘুম দিচ্ছে । শিহাব তাকে  ডেকে তুললো।যদিও তার চোখেমুখে বিস্ময় !  এতরাতে স্যার কোথায় যায় ? তবে কি তার মায়ের বাড়ির কোন খারাপ খবর ?  বিল্লাল শিহাবের দিকে তাকিয়ে কোন প্রশ্ন করার সাহস পেলো না। সে চাবি নিয়ে এসে দৌড়ে গেট খুলে দিলে শিহাব বাইকে স্টার্ট দিয়ে হর্ণ বাজিয়ে নিজের বাসা উত্তরা সেক্টর চোদ্দ থেকে সেক্টর সাতের দিকে ছুটে চললো। এত রাতে রাস্তা বেশ ফাঁকা। শিহাবের পৌঁছাতে পাঁচ মিনিটের বেশী লাগবে না। কিন্তু নাইট গার্ডের প্রশ্নের কাছে আজ তাকে একটা মিথ্যা কারণ  দেখাতে হলো। শিহাব ভাবলো, ওদেরকে  বললে ওরা বুঝবে না তার জীবনে এই রাতটায় কি ঘটে যাচ্ছে, কিভাবে তাদের বুঝাবে আর একটু সময় ক্ষেপণ করলে তার জীবনটা মূল্যহীন হয়ে যাবে। শিহাব ঊর্ধ্বশ্বাসে বাইক নিয়ে এগিয়ে গেলো। 

শায়লাদের বাসায় ছাদে গায়ে হলুদের স্টেজ করা হয়েছে।তা কাঁচা ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। বাড়ির লোকজন সবাই যার মত জায়গা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু রাহাত আর বুবলী  ছাদের এই ফাকা হলুদের স্টেজের সামনে চেয়ার পেতে বসে আছে । দুজনেই  শায়লাকে ভেবে বেদনায় ডুবে আছে। রাহাত শায়লার আজকের এই পরিণতির জন্য  বারবার নিজেকে দায়ী করছে । বুবলী তাকে বুঝানোর চেষ্টা করছে।আশা ছাড়তে নিষেধ করছে। সে শুধু বলছে আমরা আরেকটু অপেক্ষা করি। নিশ্চয়ই কোন কারণে শিহাব ভাইয়ার মোবাইল বন্ধ আছে।আমাদের ধৈর্য্য ধরতে হবে।এত রাতে আর নয় সকাল হলে আবার কল দিয়ে দেখতে হবে কল রিসিভ করে কিনা। মোবাইলটা কোন কারণে মিসিংওতো হতে পারে। বুবলীর কথা রাহাত কানে তুলছে কিনা বুবলী তা বুঝতে পারছে না। রাহাত আর বুবলী  দুজনে পাশাপাশি বসে আছে, এতে যেন বুবলীর মনে অন্যরকম এক ভাললাগা কাজ করছে। এতটা কাছে এমন রাতের নির্জনতায় রাহাতের সাথে কোনদিন তার সময় কাটবে সে তা কোনদিনই ভাবে নি।যদিও সে ছোটবেলায় কল্পনায়  রাহাতকে নিয়ে সে অনেককিছুই ভেবেছিলো। ইশারা ইঙ্গিতে তা বুঝিয়েও ছিলো। কিন্তু তখন রাহাতদের পরিবারে এক দুঃসময় চলছিল।রাহাতের বাবার মৃত্যু তাদেরকে হঠাৎই দারিদ্র্যের মাঝে ফেলে দিয়েছিল। বুবলী তার মায়ের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সেই দুঃসময়ে রাহাতের পাশে দাঁড়াতে পারেনি।তাদের স্বচ্ছল পরিবারের পক্ষ থেকে এতটুকুও সহযোগিতা করতে পারেনি।কিন্তু তবুও আজো রাহাতের প্রতি বুবলীর সুপ্ত ভালোবাসাটা তা জানান দিয়ে যায়। যদিও আজ রাহাতদের অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে আর সেই সাথে রাহাতও কেমন যেন বদলে গেছে। আর তার জীবনেও পাভেল এসেছে । তাকে ভালবাসার কথা জানিয়েছে। তবে বুবলী তাকে ফিরিয়ে দেয়নি।বুবলী জানে কেউ যখন কাউকে ভালোবাসার কথা জানায় মনের কতটা গভীর থেকে তা জানায় আর তার সাড়া না মিললে মনটা কতটা ভেঙে চুড়ে যায়। তাইতো বুবলী পাভেলকে ফিরিয়ে দেয়নি।পাভেল যেন তাকে পেয়ে জীবনের পূর্ণতা পায় বুবলীর সেটাই চাওয়া।তাইতো বুবলীর আঙুলে পাভেলের মায়ের পরিয়ে দেয়া আংটিতে সে ভালবাসার বন্ধন ধরে রেখেছে। বুবলী আর পাভেল ওরা সহপাঠী । মাস্টার্স শেষ হলেই ওদের বিয়ে। তবে আজ রাহাত ভাইয়ার এত কাছাকাছি এসে শায়লা যেন তার সেই অতীতেই বারবার ফিরে যাচ্ছে।
শায়লার প্রতি এমন একটা ভুল করে রাহাত বুবলীর কাছে সান্ত্বনা খুঁজে ফিরছে । এক সময় সে কান্নায় ভেঙে পড়ে।যদিও রাহাত ভাবছে তার এই নির্ভরতায় বুবলী আবার অন্য মানে করছে কিনা। তাহলেতো আবার অন্য কোন ভুল বুঝাবুঝি হতে পারে। কিন্ত রাহাত নিজেকে কিছুতেই প্রবোধ দিতে পারছে না। একসময় সে ভীষণ আপ্লুত হয়ে বুবলীর হাতে হাত রাখে। বুবলী চমকে উঠে ! তবে এটা যে রাহাত তার অবচেতন মনেই করেছে বুবলী  তা বুঝতে পারে। বুবলীর এক কাজিন রাহাতের কলীগ।তার কাছ থেকেই বুবলী জেনেছে,রাহাত তার অফিস কলীগ একটি মেয়ের সাথে ভীষণ ভাবে ইনভলভড।হয়তো তারা বিয়ে করবে।মেয়েটির নাম দিহান। বুবলী সবটা জেনেই রাহাতের প্রতি তার দূর্বলতাটাকে মন থেকে সরিয়ে ফেলতে চাইছে। রাহাত তখনো বুবলী থেকে হাত ছাড়িয়ে নিচ্ছে না। এতরাতে ছাদে দুজনে একাকী হাত ধরে বসে থাকাটা কেউ দেখে ফেললে ভীষণ একটা হৈচৈ পড়ে যাবে। বুবলী  হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললো,চলো রাহাত ভাইয়া আমরা ওখানে ছাদের কিনারার দেয়ালের কাছে দাঁড়িয়ে গল্প করি। রাহাতের যেন সম্বিৎ ফিরে এলো ! সে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে একটু দূরত্ব করে দাঁড়ালো।এরপর দুজনে হেঁটে হেঁটে ছাদের কিনারায় গেলো। দোতালার ছাদ থেকে বাসার সামনের রাস্তার বাতিতে সবই দিনের আলোর মত ঝকঝক করছিলো। রাহাতদের বাড়ির বিপরীতে  "স্বপ্নবাড়ি" এপার্টমেন্টে র সামনেই একটা লাইটপোস্টে র বাতিতে বাড়ির সামনে আলোর বন্যা বয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎই রাহাত দেখলো, বাইকে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে শিহাব মোবাইল দেখছে !

শিহাব তার মোবাইল হাতে নিলো। সে  অনেকক্ষণ পরে তার মোবাইল চেক করছিলো, সে ভীষণ অবাক হলো ! তার মোবাইলে সন্ধ্যা থেকে রাহাতের পাঁচটি মিসড কল আর শায়লার তিনটি মিসড কল। কেন ওদের এত কল শিহাব বুঝতে পারছে না। তার মনে নানান ভাবনার উঁকি দিচ্ছে। তবে কি ওদের পরিবারে কিছু ঘটেছে ? তা জানতে এত রাতে কল দেয়া কি ঠিক হবে ? 

শিহাবকে বাসার সামনে দেখে রাহাত আর এক মূহুর্তও  দেরী না করে বাতাসের বেগে নিচে রাস্তায় নেমে এলো। বুবলী  রাহাতের এমন কান্ডে অবাকের চেয়েও আরো  বেশী  কিছু হয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল।


চলবে....

কবি কংকা চৌধুরী গুপ্তা এর কবিতা "ভালোবাসার কবিতা"





ভালোবাসার কবিতা
কংকা চৌধুরী গুপ্তা
( ইংল্যান্ড ) 

আমি, তোমার কাছে একটু 
ভালোবাসা গচ্ছিত রেখেছিলাম। 
আর তুমি দিয়েছো 
আমাকে বেঁচে থাকার জন্য প্রেরণা।

আমি , তোমার কাছে ভরসা করে 
এক মুঠো বিশ্বাস জমা রেখেছিলাম।
তাইতো আমি বিশ্বস্ত হয়েছি।
আর তুমি হয়েছো আদর্শ।

আমি, তোমার কাছে কিছু অভিমান লুকিয়ে রেখেছিলাম।
আর তুমি অনুযোগ না করে
পুঞ্জীভূত অভিমান সরিয়ে 
 বাড়িয়েছো ভালোবাসার হাত।

আমি , কিছু কান্না জমা রেখেছিলাম।
কিন্তু তুমি কান্না সরিয়ে 
আমাকে অনন্ত সুখ দিয়েছো।
কান্না চেপে নিরবে হৃদয়ে।

আমি , অনেক খানি সুখ 
তোমায় দেব বলে যতনে রেখেছিলাম।
কিন্তু তুমি আমার সুখেই 
সুখি হয়ে দিয়েছো মহত্ত্বের পরিচয়।

 

কবি তাহের আহমেদ লস্কর এর কবিতা "বৃথা স্বপ্ন "




বৃথা স্বপ্ন 

তাহের আহমেদ লস্কর 


উড়ি স্বপ্নের শহরে   
ভর করে স্বপ্ন ডানা,
কে দেবে আমারে 
স্বপ্নপুরের ঠিকানা ?

স্বপ্নে লাগে প্রেমবাতাস   
স্বপ্নে হৃদয় হয় শীতল, 
স্বপ্ন মম কষ্টের আকাশ   
স্বপ্ন যোগায় বুদ্ধি বল । 

স্বপ্নের ঘোড়া স্বপ্নে চড়ি  
স্বপ্নে গড়ি তাজমহল,  
স্বপ্নে বৃথা প্রেমে পড়ি  
স্বপ্নে পুড়ায় প্রেমানল । 

স্বপ্নভোরে রঙিন ফুলে  
গাঁথি স্বপ্নের মালা, 
স্বপ্নে মম হৃদয় জ্বলে 
স্বপ্ন দেয় জ্বালা ।

১৮ এপ্রিল ২০২২

কবি মহুয়া চক্রবর্তী এর কবিতা "পরিচয়"





পরিচয়
মহুয়া চক্রবর্তী 

আমি কে কিবা আমার পরিচয়
সারাজীবন ভেবেই মরলাম 
কি আছে আমার বিষয়-আশয়।
এই মানবজমি জ্ঞানের অভাবে 
অজ্ঞানেতেই রয়ে গেল
তিল তিল করে এবার 
যাবার সময় যে ঘনিয়ে এলো।

যতই আমি আমার আমিকে 
খুজেঁ মরি শত মানুষের ভিড়ে
ততোই আজ একাকিত্ত এসে
ভিড় করে আমার মনের ঘরে।
আমি যেন এক আঁধারের পথে 
হেটে চলেছি বহুকাল ধরে
আজ আর কেউ সঙ্গী নেই 
আমার হাতদুটো ধরবার। 

নিজের অহং ত্যাগ করো একটি বার ভাবো
টাকা-পয়সার রূপের ছটা কিছুইতো স্থায়ী নয়
একদিন এই মানব দেহ মাটিতেই বিলীন হয়। 

মানুষ হয়ে এই পৃথিবীতে জন্মেছিলেম আমি
আজ মান আর হুশ ভুলে
আমার আমি'তে মত্ত হয়েছি আমি। 

জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালো এবার
নিজের মনের মাঝে,
প্রভুর নাম স্মরণ করো
ও মন তুমি সকাল সাঁঝে।
তবেই তুমি হবে পার এই ভবসিন্ধু হতে
এক টুকরো সাদা কাপড় ছাড়া
কিছুই যে যাবেনা তোমার সাথে।

মমতা রায় চৌধুরী এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৫৬




উপন্যাস 


টানাপোড়েন ১৫৬
সমস্যা
মমতা রায় চৌধুরী



বাড়িতে ফিরে রেখার তখনো ঘোর কাটেনি। উত্তেজনা টা যেন রয়েই গেছে। মনোজ বলল'উফ কি ভালো খেলাম রিম্পাদির বাড়ি।'
রেখা কোন কথার উত্তর দিচ্ছে না বলে মনোজ আবার বলল'কি ভালো খেলাম বলো রিম্পাদির বাড়ি?'
হ্যাঁ, রিম্পা দি এরকমই।
'বড়ো আন্তরিক তাই না?'
'একদমই তাই।'
'মানুষটাই অন্যরকম।'
রেখা হঠাৎ করে জানলার কাছে দাঁড়িয়ে গান গেয়ে উঠলো
"ঘরেতে ভ্রমর এলো গুনগুনিয়ে..।'
বাববা ,রাত্রিতে তুমি হঠাৎ  গান শুরু করলে যে?'
'মনেতে পুলক তাই মশাই।'
'ও তাই?'বলেই মনোজ রেখার দিকে এগোতে লাগলো।
রেখা বলল' ভালো হবেনা কিন্তু। ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকো।"
মনোজ বললো কেন কেন কি সুন্দর ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে, ঝরঝরে মেজাজ, খেয়ালী মন বলেই রেখাকে বাহু বন্ধনে জড়াল।
রেখা বলল-'হঠাত তোমারই  বা মনে এত প্রেম জেগে উঠল কেন?'
মনোজ হেসে রেখার গাল দুটোকে ধরে একটু আদর করে দিয়ে বলল'বসন্তের মধুমাস না তাই?'
'হ্যাঁ ,হ্যাঁ বুঝেছি।'
'বসন্ত চলে যেতে বসেছে বুঝেছ মশাই।'
'সে যাক। তবে আমাদের কাছে বসন্ত ।'ফুল ফুটুক না ফুটুক ,আজ বসন্ত'।
বসন্তের একটা গান গাও।
তাহলে তুমিও গলা মেলাও।
'   ...তোমার অশোকে কিংশুকে অলক্ষ্য রং লাগল আমার অকারণের সুখে…।'

হঠাৎ একটা কিসের' কিউ, কিউ 'আওয়াজে রেখা গান বন্ধ করে দিল। মনোজ ইশারায় বললো কি হলো বন্ধ করলে বেশ তো চলছিল।'
রেখা আঙ্গুল দিয়ে দরজার দিকে ইঙ্গিত করে বললো 'কেমন আওয়াজ পাচ্ছো না কিউ কিউ কিউ?'
'কই কোথায় আওয়াজ? তুমি একটু যেন সব কিছুতে বেশি শুনছো। কর্নন্দ্রিয়  খুব ভালো কাজ করছে।'
'তুমি মজা করছ ভালো করে কান খাড়া করে শোনো?'
মনোজ অনেকক্ষণ কান খাড়া করে শুনে বলে 'হ্যাঁ তাই তো ।চলো, চলো ,চলো গিয়ে দরজা খুলি।'
কলাপসিবল গেট খুলল, তারপর দরজা 
খুলল ।দেখছে হ্যাঁ বাচ্চাগুলো ও রকম আওয়াজ করছে।'
রেখা বলল 'ওরে দুষ্টুরা ,বাচ্চাদের আজকে ভালো করে আদর করা হয়নি বুঝেছো ?আদর খাবার জন্য এরকম করছে?'
মনোজ বলল' খিদে পেয়েছে।'
'ঠিক আছে তুমি বিস্কিট দাও দেখি 
তারপর 'আওয়াজ করে কিনা।
'হয় তো খিদেও পেয়েছে।'
মনোজ ঘর থেকে বিস্কিট এনে দিল। ওরা খেলো তারপর রেখা মনোজ যখন দরজা লাগিয়ে  দিচ্ছে তখন আবার ' কিউ , কিউ, কিউ 'আওয়াজ করছে।'
'দেখলে আবার আওয়াজ করছে।'
'ওমা তাই তো !কি অবাক কান্ড।'
'এবার দেখ তো ওদের আদর করে।'
শান্ত ভাবে দাঁড়িয়ে লেজ নাড়াতে লাগলো।
এগিয়ে গিয়ে বাচ্চাদের খুব ভালো করে আদর করলো।
তারপর দরজা বন্ধ করে ভেতরে ঢুকলো।
মনোজ বললো 'ঠিকই তো দেখো এখন আর কোন আওয়াজ নেই গো?'
রেখা বলল' এদের ছেড়ে আমরা কোথায় ও যেতে পারবো?'
'একদমই তাই।'
তারপর মনোজ বড় একটা হাই তুলে বলল
' না গো খুব ঘুম পাচ্ছে?'
'সেকি রাতে কিছু খাবে না?'
মনোজ পেটটাকে দেখিয়ে বলল
' যা খাইয়ে দিয়েছে? এরপর আর কোনো ইচ্ছে নেই?'
'তুমি তো ঘুমিয়ে পড়লেই  হল ।আমার তো আর ঘুমোলে হবে না ।কালকে স্কুলে যাব। কালকের রান্নার সবজিগুলো  কেটে রেডি করে রাখতে হবে।'
'তুমি ভুল করেছো মাসিকে বললেই পারতে ,মাসি কেটে রেখে দিত।'
'সেটাই ভুল হয়ে গেছে।'
'মাঝে মাঝে পরামর্শগুলো নেবে আমার কাছ থেকে বুঝলে?'
'হুঁ'
' না যাই রান্নাঘরে।'
রেখা রান্নাঘরে গেল ফ্রিজটা খুলল।
তখন মনোজ বলল' শোনো কালকে হালকা কিছু রান্না করবে । রিচ খাবার করবে না।'
'তাহলে কি খাবে ?'ফ্রিজ থেকে সবজি বের করতে করতে বলল রেখা।
'ওই তো ডাল করো তাহলেই হবে।'
রেখা হাসতে হাসতে বলল' বাহ শুধু ডাল দিয়ে ভাত খেয়ে নেবে, দারুন ব্যাপার তো?'
রেখা বুঝে নিল এবার আপন-মনে রেখা সবজি কাটতে বসল।
"হ্যাঁ ,মুগডাল করবে মাছের মাথা তো আছেই ফ্রিজে। তার সঙ্গে বেগুন ভাজা আর পাট শাকের ঝোল।'
এমন সময় রেখার ফোন বেজে উঠল"প্রাণ চায় চক্ষু না চায়, মরি একি তোর দুস্তর লজ্জা….।'
মনোজ ঘর থেকে চেঁচাতে লাগল' রেখা রেখা রেখা রেখা.আ .আ .আ….।'
রেখা সাড়া দিল 'কি হয়েছে?'
'তোমার ফোনের কান্না।'
'কে করেছে?'
"ধেত্ততেরি 'আমি জানি না ।তুমি এসে দেখো।'
রেখা বেগুন কাটছিল বেগুন টা নামিয়ে রেখে আস্ তে আস তে  আবার সেই ফোনের রিংটোন বেজে উঠলো 'প্রাণ চায় চক্ষু না….।'
রেখা এসে ফোনটা ধরল বলল 'হ্যালো'।
'কিরে পৌছে গেছিস?'
'ও রিম্পা দি সরি গো ।তোমাকে বলতে ভুলে গেছি অনেকক্ষণ পৌছে গেছি।'
'ঠিক আছে ,ঠিক আছে ।ওইটাই খবর নেবার জন্য । ভালো থাকিস ।শুভরাত্রি।'
'হ্যাঁ গো ,তুমিও ভালো থেকো আর তোমার বাড়ির খাবার খেয়ে তো কতবার মনোজ নাম করছে তার ঠিক-ঠিকানা নেই ।'
রিম্পা দি হো হো হো করে হেসে উঠল আর বলল 'ওকে আবার একদিন আসতে বলবি।'
'হুঁ''
শুভরাত্রি।
ফোনটা কেটে দিয়ে রেখা রান্না ঘরের দিকে যাবে বলে পা টা  বাড়িয়েছে ,ঠিক তখন আবার ফোন বেজে উঠল।
রেখা ফোনটা রিসিভ করে বলল ''হ্যালো'
'আমি বড়দি বলছি।'
'হ্যাঁ বলুন দিদি। আসলে আপনার  যে নম্বরটা সেভ করা আছে সেটা থেকে করেননি তো…।'
'হ্যাঁ ,আমি অন্য একটা নম্বর থেকে ফোন করছি 
তোমার শরীর ঠিক আছে তো?'
'হ্যাঁ দিদি তবে একটু টায়ার্ড আছি।'
'কেন বলুন তো দিদি।'
'না পরপর দুদিন স্কুলে আসলে না। জানালে না।'
'আসলে দিদি ,হঠাৎ করেই ঠিক হয়েছিল তাই দেশের বাড়িতে গেছিলাম।'
'ও ওখানে তো তোমার কাকু কাকিমা থাকেন তাই না?  সবাই ভাল আছেন তো?'
'হ্যাঁ ,ওই মোটামুটি আছেন দিদি।'
'আর আজকে স্কুলে আসলে না কেনো?'
'আসলে দিদি আজকে আমার একটা সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ছিল ।ওখান থেকে আমাকে একটা সম্মাননা দেয়া হয়েছে, আমার লেখার জন্য।'
বড়দি বললেন 'কনগ্রাচুলেশন্স।'
'থ্যাংক ইউ দিদি।'
'তুমি এভাবে আগামী দিনগুলোতে এগিয়ে যাও আরো সম্মাননা তোমার ভান্ডারে আসুক। ঈশ্বরের কাছে এই প্রার্থনা করি।'
'থ্যাংক ইউ দিদি।'
'রেখা একটা বিশেষ কাজের জন্য তোমাকে আমি ফোনটা করেছি কালকে যদি না আসো তাহলে ভীষণ অসুবিধায় পড়তে হবে।'
"কি দিদি?'
'আসলে একটা ওয়ার্কশপ আছে সেটা অনিন্দিতা ই জেদ করেছিল যাবে  তাই ওর নামটা পাঠানো হয়েছিল কিন্তু ও কালকে স্কুলে আসেনি ।আজকে সন্ধ্যের দিকে ফোন করে আমাকে জানালো ওর বাচ্চাকে নিয়ে একটু প্রবলেম আছে। তাই ও অ্যাটেন্ড করতে পারবে না।'
'কি হয়েছে ওর বাচ্চার দিদি।'
'আর বোলো না ।ও তো কিছুদিন যাবত এসেই বলছিলো যে ওর বাচ্চা কথা বলছে না।'
'কেন তুমি ব্যাপারটা জানতে না?'
'আপনি তো জানেন দিদি, ও কি কারনে আমার প্রতি এতটা রাগ ,আমি জানিনা ।আমার সামনেও কখনো ওর ফ্যামিলির কথা আর বলে না ।আর আমিও কোন ইন্টারেস্ট দেখাই না।'
'হ্যাঁ ওর বাচ্চার দু'বছর কমপ্লিট হয়ে গেছে আড়াই বছর হয়ে গেছে এখন অব্দি কোন কথা বলে না।
কিন্তু ও সব বোঝে নাকি?'
'এইরকম একটা ভাষা ভাষা কথা শুনছিলাম তবে স্পষ্ট করে আমি কিছু জানি না দিদি।'
"ওইটা নিয়েই এখন নাকি ওর কি মনে হয়েছে ওর হাজবেন্ড আর ও মিলে ডিসিশন নিয়ে একটা স্কুলে ভর্তি করেছে।'
"বাহ ,ভাল করেছে তো দিদি।'
'হ্যাঁ সে তো ভালো করেছে কিন্তু ওখানে আর একটা কান্ড হয়েছে। ক'দিন হয়েছে তিন চারদিন স্কুলে গেছে এর মধ্যে ও নাকি অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে মারামারি করেছে।
গত পরশু দিন নাকি একটা বাচ্চাকে ঠেলে ফেলে দিয়েছে।'
'ও বাবা কি সাংঘাতিক?'
'স্বাভাবিক ভাবেই প্রিন্সিপাল কল করেছেন।'
'ও বাবা তাই নাকি?'
'আর বোলো না'
'প্রিন্সিপাল কল করার পর কি বলছেন দিদি?'
'ওনারা বলছেন বাচ্চা কে অন্য জায়গায় ভর্তি করিয়ে দিতে ।এই স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেয়া হবে।'
'তাড়িয়ে 'দেয়া হবে এই শব্দ টা কখনো ব্যবহার করতে পারেন?'
'হ্যাঁ ও দুঃখ করে কাঁদছিল আমার কাছে। তখন 'আমি বললাম এটা তো ওনারা বলতে পারেন না।'
এই সমস্যা থেকে ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে।'
'তা আমি বললাম  ভেঙে পড়ার কোনো কারণ নেই ।তোর বাচ্চাতো এমনি সুস্থ-স্বাভাবিক সবই আছে অত চিন্তা করিস না বরং বলে আসতে পারতিস  সকল শিশুর শিক্ষার অধিকার 
রয়েছে ।কখনো বলতে পারেন না যে স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেবো ,সে যদি লেখাপড়া শিখতে চায়।'
"তা তো ঠিকই দিদি।'
'এইরকম একটা সমস্যা চলছে।'
ওকে বেশি জোরজবস্তি করলাম না ,. ও একটা মেন্টাল প্রেসারে আছে বাচ্চাকে নিয়ে।'
'তাহলে শেষ পর্যন্ত কি হলো দিদি?'
'ওকে স্পিচ থেরাপির ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বললাম।'
'বাহ দারুন সিদ্ধান্ত।'
'এখন দেখা যাক ও কি করে?'
'হ্যাঁ ওর একবার স্পিচ থেরাপির সঙ্গে কথা বলা উচিত আর একবার এমনি ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত।'
'যাই হোক তা কালকে তুমি আসছো তো সিওর?'
'এখন অব্দি তো ঠিকই আছে।'
'ব্যস এটুকু হলেই যথেষ্ট  আমি তো তোমাকে
 চিনি '।বড়দি হাসতে হাসতে বললেন।
'তাছাড়া তুমি আসলে কোন সমস্যা হবে না ।আর আমি জানি  তুমি সমস্যায় ফেলবে ও না।'
রেখা বললেন 'আমি চেষ্টা করি দিদি।'
'ব্যস ,এই চেষ্টাটাই রেখো সব সময়।'

কবি সেলিম সেখ এর কবিতা "মায়ের কোল"




মায়ের কোল
সেলিম সেখ

ওই দেখো খোকন সোনা
মায়ের কোলে বসে,
বলছে সে অনেক কিছু
আপন-মনে খুশে।

মিষ্টি মধুর চেহারা তার
জুড়াতো মায়ের কোল,
মা হীনা আঁখিতে তার
আসতো দুখের জল।

মায়ের কোলে মাথা রেখে
পেত সে চিরসুখ,
মা যে নেই এখন
রয়ে গেছে তাই দুখ।

দুঃখ ভরা জীবন নিয়ে 
চলে সমুখ পানে, 
মা হীনা জীবন যে তার 
দুর্বিষহ তা জানে।

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৯৩





ধারাবাহিক উপন্যাস 


শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৯৩)
শামীমা আহমেদ 

খুবই অনিচ্ছা সত্বেও শিহাব দোতালার
হাসান সাহেবকে তার ঘরে প্রবেশের জন্য স্বাগত জানালো। যদিও এই মূহুর্তে শিহাবের মনের সবকিছু ভীষণ এলোমেলো  হয়ে আছে তবুও সামাজিকতা মেনে হাসান সাহেবের সাথে কিছু কথা চালিয়ে যেতে হবে। বিল্লাল খাবারের ট্রে  ডাইনিং টেবিলে রাখলো।  হাসান সাহেব বিল্লালকে তার  খাবার নেয়ার জন্য বাসায় যেতে বললে বিল্লাল বিদায় হলো। এবার শিহাব, হাসান সাহেবকে উদেশ্য করে বললেন, এসবের কী দরকার ছিলো ?  আর আমি একা মানুষের জন্য এত খাবার !
এবার যেন হাসান সাহেব তার মনোবাসনা প্রকাশের একটা মওকা পেলো। খুবই বিগলিতভাবে বললেন, না,  না,এ আর এমন কি।আজকের সামান্য আয়োজন। প্রতিদিন তো আর এমনটা হয়না।
সামান্য আয়োজন ! শিহাব অবাক হলো, এই যদি হয় সামান্য আয়োজন তবে অসামান্য বলতে কী বুঝবো ? শিহাব শুনেছে,
হাসান সাহেব একটা ওষুধ কোম্পানীতে চাকরী করেন।স্বল্প বেতনভোগী হলেও নানান হাসপাতাল আর ডাক্তারদের সাথে তার দারুন সখ্যতা।সবার সাথেই কমিশন পাইয়ে দেয়ার আর নিজের পকেটে ভরার লাইনঘাট তার ভালই জানা। ছেলেকে একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াচ্ছে যা ভীষণ ব্যয়বহুল।
শিহাব আরাফের কথাও একঝলক ভেবে নিলো।আরাফকেও স্কুলে দিতে হবে।আরাফের তিন শেষ হয়ে চা'রে পড়েছে।
হাসান সাহেব কিছু একটা বলার জন্য যেন উসখুস করছেন। কিন্তু অনেকরাত হয়ে গেছে।শিহাব এখনো খায়নি তাই কথা শুরুও করতে পারছে না। কিন্তু শিহাব বুঝতে পারছে এমনি এমনি তিনি তার বাসায় আসেননি।নিশ্চয়ই কিছু একটা বলার অভিপ্রায়ে এত কিছুর অবতারণা। 
শিহাব তাকে সহজ করতে বলে উঠলো, হাসান সাহেব, কিছু বলবেন ?
না না তেমন কিছু না। আপনি খেয়ে নিন। আমি ড্রইং রুমে বসছি। বলেই তিনি উঠতে চাইলেন। শিহাব বললো,না,এখন খেতে ইচ্ছে করছে না। সন্ধ্যায় ভাবী অনেক নাস্তা করিয়েছে। সেগুলোতে এখনও পেট ভরে আছে। 
তক্ষুনি যেন হাসান সাহেবের শিহাবের সেই কথা মনে পড়ে গেলো, আচ্ছা তখন আপনি বলছিলেন আপনার পরিবারের কে যেন অসুস্থ ? আপনার মা ? 
না, না,  আমার মা ভালো আছেন। শিহাব যতই কথা সংক্ষিপ্ত করতে চাইছেন কিন্তু হাসান সাহেব বারবার আঠার মত লেগে থাকতে চাইছেন।শিহাব বুঝতে পারছে নিশ্চয়ই কোন উদ্দেশ্য নিয়ে তার এখানে আসা।
তাহলে কে অসুস্থ ? আপনার বাবা ?
তার আবার প্রশ্ন। 
এবার শিহাব তাকে শান্ত করতে জানালো, আমার ছেলে আরাফ। সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে কপালে কেটে গেছে। হাসপাতালে আছে।
শুনে হাসান সাহেব ভীষণ ব্যথিত হলেন। আহা ৷ এত ছোট বাচ্চাটা। তা শিহাব সাহেব বাচ্চার মাকে কি খবর দিয়েছেন ?  শুনেছি উনি দেশের বাইরে থাকেন। শিহাব বুঝতে পারলো, সব খবরই সে রাখে তাহলে।
শিহাব বেশ স্পষ্ট করেই বললো, না জানাইনি।
এবার যেন তার আফসোসের পাল্লা বোঝাই হলো।আহা,মা ছাড়া বাচ্চাটা এমন ব্যথা পেলো। তা আমি শুনেছি, উনি এখানে এসেছিলেন। দুদিন থেকে চলেও গেছেন। আপনি নাকি তাকে চলে যেতে বলেছেন।
শিহাব এবার ভীষণ অবেক হলো!ঘরের কথা বাইরে জানলো কিভাবে ?
শিহাবের মনে কৌতুহল হতেই সে সন্দিগ্ধ মনে জানতে চাইলো, আপনি কিভাবে জানলেন এইকথা ? 
হাসান সাহেব এবার যেন ধরা পড়ে গেছেন এমন অভিব্যক্তি দিয়ে নিজেকে বাঁচাতে তার স্ত্রীর উপর তা চাপিয়ে দিলেন,, ইয়ে মানে,আপনার ভাবী বলেছে । যাওয়ার সময় আপনার মিসেস, বিল্লালকে বলে গেছে,উনি একেবারেই চলে যাচ্ছেন।বিল্লাল যেন তার স্যারকে দেখে রাখেন।  এবার শিহাব বুঝতে পারলো,তাহলে বিল্লালই হচ্ছে সবকিছুর মেসেঞ্জার। শিহাব বুঝতে পারছে না, অন্যের ব্যাপারে মানুষের কেন এত কৌতুহল ! 
এবার হাসান সাহেব তার মনের কথাটা বলার জন্য যেন উপযুক্ত যুক্তিটা খুঁজে পেলেন। তিনি অকপটে বলেই ফেললেন, দেখুন আপনার স্ত্রী এত ছোট একটা বাচ্চা রেখে চলে গেছেন,আপনিও একা একা কষ্ট করছেন। এভাবে আর কতদিন থাকা যায় বলুন। ঘর সংসার তো করতে হয়। বাচ্চাটাকেও তাহলে কাছে এনে রাখতে পারতেন। শিহাব হাসান সাহেবের  কথায় বেশ অবাক হচ্ছেন ! মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়ে কথা বলতে এ দেশের  মানুষ অনুমতি নেবারও প্রয়োজন মনে করে না।
হাসান সাহেব বলেই যাচ্ছেন, তা আপনার ভালোর জন্যই একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলাম।যদি সহজভাবে নেন তো বলতে পারি।
শিহাবের প্রান্ত থেকে উত্তরের অপেক্ষা না করেই তিনি বলে চললেন,আমার শ্যালিকা চৈতীকে তো একটু আগেই দেখেছেন।
শিহাব কিছুক্ষন আগে হাসান সাহেবের দরজায় কথা বলার সময় একটি মেয়েকে দেখেছিল। তাহলে তার নাম চৈতী ! 
শিহাবের আর বুঝতে কিছু বাকী রইল না। হাসান সাহেবের আগমনের হেতু আর ইনিয়ে বিনিয়ে এত কিছু বলার পেছনের কারণ।
শিহাব ভাবলো, ঐটুকু মেয়ে মাত্র মাস্টার্স পড়ছে কেমন করে এরা আমার সাথে এমন সম্পর্ক ভাবে ? শিহাবের ভাবনা শিহাবের মনের ভেতরেই রইল।
হাসান সাহেব বললেন,নাহ,এখুনি কিছু জানাতে হবে না।আপনি সময় নেন। হাসান সাহেব হাত কচলাতে কচলাতে  বললেন, বলছিলাম কি,ওরা দুইবোন, এক বিল্ডিংয়ে থাকলে ভালোই হতো।বাপ মা মরা ওরা এই দুটি বোন। আর আপনাকেও আমি ভায়রা  করে নিতে পারলে আমি খুবই খুশী হতাম! আপনাকে আমার খুবই পছন্দ শিহাব সাহেব।এতদিন হয় আপনি এখানে আছেন কোনদিন কোন খারাপ  কিছু  শুনিনি। এতসব কথা বলে এবার হাসান সাহেব শিহাবের ফ্ল্যাট থেকে বেরুনোর জন্য আগালো।পরক্ষণেই তিনি তার শ্যালিকার  দুইটি  থ্রী আর সাইজের রঙিন ছবি শিহাবের বিছানায় বালিশের পাশে রেখে গেলেন। শিহাব বাধা দিয়ে কিছু বলতে চাইতেই হাসান সাহেব শিহাবের বাসা থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। শিহাব ভাবলো,এতো দেখছি আরেক মহা যন্ত্রণা ! শিহাব এগিয়ে গিয়ে ছবি দুটো হাতে নিলো। একটি ছবিতে  ডাগর চোখের  মেয়েটি রঙিন ঝলমলে শাড়িতে  তার কলেজের বাগানের সামনে দাঁড়িয়ে, আরেকটি ছবিতে ঘরে সোফায় বড় বড় চুল ছেড়ে গালে হাত দেয়া ভঙ্গিমায় মায়া ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।শিহাব মনে মনে ভাবলো, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হলেও আজো মেয়েদের বিয়ের পাত্র খোঁজে সেই সনাতন প্রথা রয়ে গেছে। শিহাব ছবি দুটো উল্টো করে তার সাইড টেবিলে রেখে দিলো। তবে একবার ভাবলো, এখুনি বিল্লালকে ডেকে ছবি দুটো ফেরত পাঠাতে।কিন্তু  এতে তারা অপমানিত বোধ করতে পারেন। কাল সকালেই তবে ফিরিয়ে দেয়া হবে।  শিহাব ছবি দুটো খাটের  সাইড টেবিলে রাখতেই তার মোবাইলের দিকে চোখ পড়লো। হাতে নিতেই দেখতে পেলো,মোবাইল একেবারে ডার্ক এন্ড ডেড হয়ে আছে। তার মনে পড়লো হাসপাতালে থাকতেই ফোনের চার্জ ফুরিয়ে গিয়েছিল। এসে আর হাসান সাহেবের জন্য চার্জে দেয়ার একটু  সময় মিলেনি। আরাফেরও খবর নেয়া হয়নি।শিহাব দ্রুতই মোবাইল চার্জে লাগিয়ে দিলো। টেবিলের খাবার সব ফ্রিজে তুলে রেখে সময় দেখলো,রাত বারোটা। শিহাব একটা সিগারেট  ধরিয়ে বারান্দায় এসে বসলো।শায়লার কথা খুব  মনে পড়তে লাগলো। শায়লা নিশ্চয়ই তার স্বামীর সাথে এখন গল্প করছে। কিন্তু কেমন করে শায়লা তাকে এভাবে ভুলে আছে? এ কথা ভেবে শিহাব ভেতরে অস্থিরতায় খুব ঘন ঘন সিগারেটে টান দিতে লাগলো।
রাহাত অনেকবার ফোন করেও  শিহাবের মোবাইলে কল পৌছাতে পারেনি।বারবার তা বন্ধ পাচ্ছিল। রাহাত একথা শায়লাকে জানাতে শায়লা ভীষণ চিন্তিত হলো।সে নিজেও কয়েকবার ট্রাই করে শিহাবের মোবাইল বন্ধ পেলো। শিহাব বাইক চালিয়ে চলাচল করে। পথে কিছু হলোনাতো আবার ?
শায়লা অজানা আশংকায় কোন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যেন না ঘটে মনে মনে এমনটি ভাবছিল। বুবলী অনেক অনুরোধ করে শায়লার মুখে একটু খাবার দিয়েছে। শায়লা তার নিজের ঘরে সাজানো খাটের এক কিনারায় শুয়ে রইল। দেয়াল ঘড়িতে চোখ যেতেই দেখলো রাত্রি বারোটা। শায়লা ভীষণ অবাক হলো, আজ দুপুরের পর থেকে শিহাব তার সাথে একেবারেই যোগাযোগে নেই ।  তবে কী আরাফ বেশী অসুস্থ হলো ? 
শায়লা কিছুই বুঝতে পারছে না কি করবে ? সারাটাদিন নানান ঘটন অঘটনের মধ্যে দিয়ে কেটেছে।কিন্তু এমনি ভাবে শিহাব কোনদিনই নীরব থাকেনি। শায়লা শিহাবের অফিস থেকে পাঠানো শিহাবের কালো শার্ট পরা সেই সেল্ফিটির দিকে একমনে তাকিয়ে রইল।


চলবে...