০৫ ডিসেম্বর ২০২১

হাবিবুর রহমানের নতুন ধারাবাহিক "ইউএন মিশ‌নে হাই‌তি‌তে গমন"/১

শুরু হলো হাবিবুর রহমানের নতুন ধারাবাহিক "ইউএন মিশ‌নে হাই‌তি‌তে গমন"। এ এক মন কলম ধাড়ক । যার কলম থেকে ঝরে পড়ে জীবনদর্শনের কালি                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                 

                                                                                                                                                                                                                                          


ইউএন মিশ‌নে হাই‌তি‌তে গমন-১ম পর্ব
            মোঃ হা‌বিবুর রহমান



                                                          ম‌নের গভী‌রের অন্তস্থল থে‌কে প্র‌তি‌নিয়ত স‌ন্দিহান ভ‌রে ‌যেন জানতে চে‌য়ে জিজ্ঞাসা কর‌ছে, হে ম‌নের অ‌ধিপ‌তি তু‌মি আজ ‌কি লিখবে? ভ্রমণ কা‌‌হিণী, বর্ণনামূলক না‌কি ধর্মীয় কোন বিষ‌য়ের অবতারনা ক'র‌বে? যা‌হোক, 'আ‌মি' নামক ম‌নের এ অ‌ধিপ‌তি কে-সে প্র‌শ্নের উত্তর আজও আ‌‌বিস্কার ক'র‌তে পা‌রি‌নি। ম‌নের গভী‌রের দ্বিধাদ্ব‌ন্দ্বে সৃষ্ট এমন স‌ন্দেহটি এতক্ষণে মোটা‌মো‌টি মুক্ত হ'য়ে চূড়ান্তভা‌বে ভাবলাম-হয় ভ্রমণ বিষয়ক, নাহয় বর্ণনামূলক কিংবা বাস্তবধর্মী হবে অবশ‌্যই আমার আজ‌কের লেখার উপজীব্য বিষয়টি। 

ত‌বে এমূহূর্তে তিন-চার‌টি বিষয় ম‌নের গভীর থে‌কে যেন কড়া নাড়‌ছে এবং আমা‌কে বল‌ছে যে, না তু‌মি আজ আমার সম্ব‌ন্ধেই লেখো, তাই অ‌নেকক্ষণ নিশ্চুপ থে‌কে মন‌কে বললাম, হে মন তু‌মি ঠিক ক‌'রে আমার হেড অ‌ফিস‌কে জানাও। হা, সমগ্র দে‌হের হেড অ‌ফিস না‌মে খ্যাত-ম‌স্তি‌স্ক ই‌তোম‌ধ্যে মনকে এমর্মে খবর পা‌ঠি‌য়ে‌ছে যে, তু‌মি আজ ভ্রমণমূলক কিছু একটা লি‌খে ফে‌লো। 

হেড অ‌ফি‌সের আ‌দেশ শি‌রোধার্য যা অমান্য করার সাহস ও সা‌ধ্যি কোনটাই আমার নেই। ত‌বে এত বয়স হ'ল আস‌লে 'আ‌মিটা' কে এখন পর্যন্ত না পারলাম জান‌তে, না পারলাম তা বুঝ‌তে। তাই কথাটা বার বার বল‌ছি। বোধ হয় এখন কিছুটা বেলাই‌নে চ‌'লে যা‌চ্ছি। এইতো ব‌ুঝি হঠাৎ ক‌'রেই আধ্যা‌ত্মিকতার দি‌কেই যা‌চ্ছিলাম, তাই হেড অ‌ফিস আমা‌কে সং‌কেত পাঠা‌লো এব‌লে যে, তু‌মি আজ‌কের ট‌পি‌তেই থাকো। ‌যেই হুকুম সেই কাজ।

১৯৯৪ সা‌লের ‌০৬ সে‌প্টেম্বর সকাল বেলা আনুমা‌নিক দশটার মত হবে। আমার আব্বা ও প‌রিবা‌রের দু' সদস্য এ‌সে‌ছে হযরত শাহ্জালাল আন্তর্জা‌তিক বিমান বন্দরে আমা‌কে বিদায় জানা‌তে। আমার ছোট প‌রিবারের সব‌চে‌য়ে ক্ষু‌দে সদস্য‌টির বয়স তখন মাত্র বছর খা‌নে‌কের কিছু বেশী হ‌বে। এখন সে বাংল‌া‌দেশ সেনাবা‌‌হিনীর মেজর পদবীর একজন অ‌ফিসার, আলহামদু‌লিল্লাহ। বাকী সদস্যা‌টি কে হ'তে পা‌রেন তা সহজেই অনু‌মেয়।

মা‌র্কিন মুল্লুক থে‌কে তদানীন্তন ক্লিনটন প্রশাসন (সরকার) ইউএসএর বিমান বা‌‌হিনীর বিশালাকার একটা বিমান পা‌ঠিয়েছে আমা‌দের নেবার জন্য। হাই‌তির রাজধানী, পোর্ট অব প্রিন্স আমা‌দের গন্তব্যস্থল। এর আ‌গে এত বড় বিমান আর দেখার সৌভাগ্য হয়‌নি আমার। দেখ‌তে ঠিক তি‌মি মা‌ছের সদৃশ। বোধ ক‌'রি এই মাছ নকল ক‌'রেই মা‌র্কিনীরা এত বড় আকা‌শ যান তৈরী ক‌'রে‌ছে। সে এক তাজ্জ্বব ব্যাপার! লে‌জের দিক থে‌কে ডজন খা‌নেক জীপ অকস্মাৎ বের ক‌'রে নি‌য়ে এ‌সে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জা‌তিক বিমান বন্দ‌রে দি‌ব্যি চা‌লি‌য়ে বেড়া‌চ্ছে যা আমা‌দের মত অন্য বাঙ্গালী‌দেরও দারুনভা‌বে নজর কে‌ড়েছি‌লো।

সা‌থে ক‌য়েকটা হেলিকপ্টারও (সি-৫) না‌মের এই বিশাল আকাশযা‌নে বহন ক‌'রে এ‌নেছিল ওরা যা এখনও আমার ম‌নে পড়ে। ম‌নে ম‌নে ভাব‌ছিলাম, কোন দে‌শে চ‌'লে‌ছি? একটু ভয় ভয় ক'র‌ছি‌লো আবার কি‌ঞ্চিত শিহরিতও হ'চ্ছিলাম। এর আ‌গে বেশ ক‌য়েকবার ডমে‌স্টিক ফ্লাই‌টে শুধুমাত্র ঢাকা-য‌শোর ক‌'রে‌ছি কিন্তু তখন অ‌ব্দি আন্তর্জা‌তিক বিমা‌নে ভ্রমণ করা কপা‌লে জো‌টে‌নি।

চল‌বে........

রাবেয়া পারভীন।





স্মৃতির জানালায় 
(৫ম পর্ব)


মেয়েটি উচ্চকন্ঠে ডাকল,
- বাবলু এই বাবলু
ডাক শুনে একটি আট নয় বছরের ছেলে এসে ঘরে ঢুকল।ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বোঝা গেল ছেলেটি  মেয়েটির ভাই। কাছে এসে ছেলেটি মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল  
- কেন ডেকেছো আপা ?
- কাজেম কো বলো আমাদের কে চা নাস্তা দিতে।
-আচ্ছা
বলে বলে ছেলেটি বেরিয়ে গেল। মাহতাবের দিকে তাকিয়ে মেয়েটি বলল
- আব্বা এলে যে আপনার কথা বলব,  আপনার নামটাই তো জানা হলোনা।
আবার ঢোক গিলে মাহতাব
-আমার নাম মাহতাব উদ্দীন। 
- আমার নাম শবনম।  আপনি কোথায় থাকেন ?  
-বকসীবাজার  মেসে থাকি।
-গ্রাম থেকে এসেছেন বুঝি ?
-হ্যাঁ 
- কে কে আছেন  বাড়ীতে ?
- বাবা  আর দুই বোন।
-আর মা ?  
- মা নেই ,  অনেক আগেই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।
বলতে গিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো মাহতাবের। এতক্ষনে তাঁর মনে হলো বুকও বুঝি শুকিয়ে  যাচ্ছে। আস্তে  করে বলল
-আমাকে  এক গ্লাস  পানি দিবেন ? 
- এক্ষুনি আনছি।
শবনম উঠে পানি আনতে গেল  এবং ফিরে এলো কাজের ছেলেটিকে সাথে  নিয়ে। ছেলেটির হাতে নাস্তার ট্রে। শবনম  ট্রে  টা নিজের হাতে নিয়ে মাহতাবের সামনে  টি টেবলের উপর রাখলো। কাজেম কে বলল 
- কাজেম তুই শিপলু বাবলু কে  ডেকে নিয়ে  আয়
মাহতাব পানির গ্লাস নিয়ে ঢকঢক করে পানি খেল। শবনমের সাবলীল ব্যাবহার  তার ভয় কমিয়ে দিচ্ছিল। সে স্বাভাবিক  হয়ে বসে শবনমের হাত থেকে সেমাই এর প্লেট নিয়ে খেতে লাগল। দুটি ছেলে এসে ঘরে ঢুকল,  একজনকে আগেই দেখেছিলেন  বাবলু, পাশের জন সম্ভবত  শিপলু। বয়স তের চৌদ্দ  হবে। শবনম পরিচয় করিয়ে দিল
- এরা আমার ছোট দুই ভাই  শিপলু আর বাবলু। শিপলু ইনি তোমাদের একজন ভাইয়া,  আব্বার ছাত্র।
ছেলেগুলি  মাহতাবকে ছালাম দিয়ে নাস্তা খাওয়ায় মনোযোগ দিল। এখন মাহতাবের আর মনেই হলোনা  এই বাড়ীতে সে প্রথম এসেছে। মনে হচ্ছে এদের অনেকদিন  ধরে চেনে। কত যেন আপন। চা খাওয়া শেষ হলে সেদিনের মত উঠে পড়ল মাহতাব। শবনমের কাছে বিদায় নিল। বলল
- আমি তাহলে আজকে যাই, স্যাররকে বলবেন
-ঠিক আছে যান,  আবার আসবেন। অনেক ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে ফেলেছি কিছু মনে করবেন না।
মৃদু হেসে বাসা থেকে বেরিয়ে এলো মাহতাব। রাস্তায় হাটতে হাটতে মনে হলো এতোক্ষন ধরে ঘটে যাওয়া  ঘটনাটি যেন বাস্তব নয় স্বপ্ন। কিছুক্ষন আগে দেখা মেয়েটিকে  সে কি সত্যিই দেখেছে?  নিজের গায়ে চিমটি কাটলো সে। তারপর নিশ্চিত  হলো স্বপ্ন নয়  এতোক্ষন যা ঘটেছে সব সত্যি। তারপর কতদিন পেরিয়ে গেছে কখন যে শবনমের সাথে  তার বন্ধুত্ব হয়ে গেছে গিয়েছিলো বুঝতেই পারেনি।
 চলবে.....

সামরিন শিরিন




এই পথটা ভীষণ প্রিয় 



এই পথটা ভীষণ প্রিয়। 
এ পথে অলীক মুখোশ ভেসে বেড়ায়
এক পরপত্যেস মুখ। 
এই পথের পা'য়ে পা'য়ে
এক ধোঁয়াশা গল্পের ভাংচুর। 
এই পথ মাড়িয়ে নিত্য হাঁটে চলে 
এক ছায়াশরীর। 
অথবা কারো বুকের ভেতর। 
এই পথের একেবারে যেই শেষ 
সেখানে হু হু করে নেমে আসে রোজ তুমুল বৃষ্টি ঝড়! 
অথবা কারো দুচোখ ভেঙ্গে। 
এই পথ, আচানক কিছু 
হারিয়ে ফেলার গল্প। 
এখানে স্থবির সোনালু গন্ধ অনেক মায়ায়।
এই পথ খুব বোকাটে, বিমূঢ় 
বিচ্ছিরি, বিবাগীনি। 

এই পথটা ভীষণ প্রিয়। 
এপথের হাওয়ায় হাওয়ায় উড়তে থাকে
পাষণ্ড এক অশ্বারোহীর ক্ষূরধুলি।

নূরজাহান শিল্পী ( ইংল্যান্ড )






অযাচিত অভিমান


উপচে পড়া জলের কথা তুমিই বলো
আমিতো জানি শুধু কান্নার রং গুলো
আমার ইচ্ছেরা অমাবস্যার আঁধারে লুকায়
নিজেকে বড় বেমানান লাগে ভরা পূর্ণিমায়
আমার কিছু নির্ঘুম রাত আছে কিছু কষ্টের কাহন জমা তাতে
মন খারাপের গল্প আছে
একাকিত্বের খরায় জলের গহীন রচে
জোসনার আমন্ত্রণে হৃদয় খুঁজি
ভালোবাসা বুকে নিয়ে ঘুরে চলছি আজন্ম সূর্য পথে
অপেক্ষার নাম হয়েছে দীর্ঘশ্বাস
গড়িয়ে পড়া অশ্রুগুলো মিথ্যে নয়
নির্বাক! সেও তো বোঝে ক্ষোভ
চোখের পাতায় অভিমান
সেও বুঝে উপলব্ধি বোধ
জড়িয়ে ধরে রোজ
আজ পালিয়ে বেড়ায় ক্ষত নিয়ে লৌকিক আঁধারে
মুমূর্ষ শহরের ইট পাথরের জীর্ণ দেয়ালে প্রতিধ্বনি  শুনি
মন ভালো নেই মন ভালো নেই...

মেহবুবা হক রুমা




সোনার আংটি


একটা সোনার আংটি 
হাতের আংগুল 
দখল করলো ভালোবাসায়।
সোনার ধরন ভালো ছিল না,
আংটির গড়ন তেমন ভালো ছিল না,
তবুও  সুন্দর হাতের সাথে মানিয়ে গেল।
মানিয়ে নেওয়া মেনে নেওয়ার জীবন হলো শুরু।
মেনে নেওয়াটা সবসময় একতরফা,
একজন যখন সব একাই মানতে থাকে,
সে একাই ক্লান্ত হয়, পরিশ্রান্ত হয়, একসময় তার ইচ্ছে
করে হাল ছাড়া মাঝি হতে,,
নৌকা যেদিকে খুশি যাক,
যেভাবে খুশি চলুক,,হালছাড়া নৌকা চলে না
গন্তব্যহীন ভাবে ভাসতে থাকে ভাসতে থাকে।
ভাসতে ভাসতে কোন এক বৈশাখী ঝড়ের তান্ডবে
নৌকাডুবি।
একটা মৃত লাশ ভাসতে ভাসতে নদীর কিনারায়।
অভাবী রহিম মিয়া দেখে মরা লাশ হাতে সোনার
আংটি।
দ্রুত আংটিটা খুলে নিল, লোকজন জড় হলো লাশের
খোঁজ খবর শুরু।
রহিম মিয়া বাড়ি ফিরলো বুকটা দুরুদুরু।
বউয়ের হাতে তুলে দিল সোনার আংটি,
খুশিতে আটখানা হয়ে বউ বলে উঠলো,
আহারে সোনার আংটি,
আমার কত্ত দিনের সখ,কত্ত দিনের স্বপন।
বউ মুখের সুখের হাসিতে, আংটিটা মরা লাশের
কথাটা রহিম মিয়া করে গেল গোপন।

শহিদ মিয়া বাহার




গোধূলি  বেলায় 


আজ এই গোধূলি বেলায়
কি আবির ছড়ায়ে যায়
আহা একি  মমতায়, 
একি মিতালি হাওয়ায়  হৃদয়ে জড়ায়!

কত গোধূলির রঙ মাখিয়েছি গায়
কত শত সহস্র আবির 
এভাবেই পার হয়ে যায়
কত শত বিবাগী রাতের মলিন  জোছনা
না ফোটা রেণু-ফুল হাছনা হেনা 
মরমে মরে মনের যাতনা
কাহারে কাঁদায়  মাটিতে লুটায় এই বসুধায় ?
কত ঐ বৈরাগী রাত করেছি ভোর
কত সে তপ্ত  দুপুর
করেছি পার একা নিরালায়
পড়ন্ত বেলায়
কেউ নাই আজ------কেউ নাই পাশে
নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে
এই মন তাহারেই শুধু চায়!

 অস্ত গেল সূর্য আজ এমন সাঁঝে 
 এ কেমন বীণা বাজে
আধো আধাঁরে, হৃদয়ে আবার?
মনে পড়ে ক্ষণে ক্ষণে
রেখেছি যতনে
তোমার হৃদয়খানি হৃদয়ে আমার!




শায়লা শিহাব কথন
অলিখিত শর্ত (পর্ব ২৩)
শামীমা আহমেদ 

শিহাবের সাথে কথা হওয়ার পর আজ দুপুরটা শায়লার বেশ অস্থিরতায় কেটেছে। দুপুরে শিহাবের কথাগুলোতে শায়লা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি। কোথায় যেন একটা ভাললাগা মায়া ভালবাসা জমেছে তার জন্য আর তাকে কাছে পাওয়ার উদগ্রীব বাসনায় মনটা বারবার উদাস হয়েছে।খুব গোপন একটা অনুভুতিতে বারবার শিহরিত হতে থাকে তনুমন।মনে হচ্ছে শিহাবের স্পর্শ সে অনুভব করছে।শিহাবের নিঃশ্বাস সে শুনতে পাচ্ছে। শিহাবকে ভীষণ কাছে পেতে ইচ্ছে করছে।
দুপুরে খাবারের টেবিলে মা বিষয়টি খেয়াল করলেন।মায়েদের চোখ বোধহয় কিছুই এড়ায় না। তবে সবটা তারা বুঝে উঠতেও পারেন না।তারা খুব সরলভাবেই সবকিছু দেখেন।নোমান সাহেবের সাথে শায়লার বিয়ে পর্বটা হয়েছে তা প্রায় বছর ঘুরে আসছে। কাগজপত্র পাঠাতে কী এতদিন লাগে? মা মাঝে মাঝে বেশ চিন্তিত হয়ে উঠেন। মা তো বুঝতে পারছেন না শায়লার অনীহাতেই বিষয়টি পিছিয়ে যাচ্ছে। আজকাল শায়লাকে বেশ  আনমনা লাগে।মা ভাবছে হয়তো নতুন জীবন সাজানো নিয়ে শায়লা ভাবনায় ডুবে আছে।কিন্তু শায়লা যে ভীষণভাবে শিহাবের মাঝে ডুবে  আছে সেটা আর মাকে কোনদিন খুলে বলা হয় না। নাহ! কোনদিন তা বলাও হবে না। 
দুপুরের খাবার খেয়ে শায়লার নিজের রুমে আসতে প্রায় তিনটা বেজে গেলো। শায়লা টেবিল থেকে মোবাইলটা নিয়ে বিছানায় এলো। বিছানায় শুয়ে জানালায় আকাশের দিকে চোখ পড়লো।সাদা তুলোর মত মেঘ উড়ে উড়ে যাচ্ছে।আহ!  একাকী উড়ে বেড়ানো!ওদের কত স্বাধীনতা! কিন্তু শায়লার  শৃঙ্খলিত জীবন।তবে ইচ্ছে করলে শিহাব  তাকে মুক্ত জীবন দিতে পারে।শিহাবের কথা মনে পড়তেই শায়লা ভাবলো কী জানি দুপুরের খাবার খেয়েছে কিনা? নাকি একা একা আলসেমিতে ঘুমিয়েই কাটাচ্ছে? 
শায়লা মেসেজ পাঠালো,
দুপুরের খাবার খেয়েছেন?
তৎক্ষনাৎ উত্তর ভেসে এলো। হয়তো চোখটা ফোনের দিকেই ছিল।
হ্যাঁ,খেয়েছি।
কি খেলেন আজ? 
সেদিন মা আর ভাবী অনেক খাবার পাঠিয়েছে। সেগুলোই চলছে।
আচ্ছা, আপনাদের জিগাতলার বাসায় আর কে কে থাকেন? 
শিহাব বুঝে নিলো, শায়লা তার সম্পর্কে  জানতে চাইছে।
শায়লাকে আর অন্ধকারে না রেখে  শিহাব একে একে সবার কথা বললো।সাথে আরাফের নামটিও জুড়ে দিলো।
শায়লা সবাইকে মিলাতে পারল কিন্তু আরাফ কে সেটা বুঝতে পারছে না। জানতে চাইল আরাফ কে?
আমার ছেলে।বয়স তিন বছর।ওকে একমাসের রেখে ওর মা চলে যায় বা বলা যায় চলে যেতে বাধ্য করা হয়।
শায়লার কানে যেন কিছুই ঢুকছিল না।
শায়লার ভাবনায় শুধুই শিহাব। তার ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে শুধুই শিহাব।অন্য সবকিছুই যেন অগ্রাহ্য।
শিহাব শায়লার প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায়।
শায়লা কিছুটা নীরব থেকে জানতে চাইল আরাফ কার কাছে থাকে?
আমার মায়ের সাথে।তবে ভাবীই ওর মায়ের সবটুকু আদর ভালবাসা দিয়ে যাচ্ছে।
আরাফের একটা ছবি পাঠাবেন? খুব দেখিতে ইচ্ছে হচ্ছে।
শিহাব ওর মোবাইলে সেভ করে রাখা আরাফের ছোট্ট বেলার দুটো ছবি শায়লাকে সেন্ড করে।আর লিখে পাঠালো রিশতিনার স্মৃতি বয়ে নিয়ে চলছি।
আরাফের ছবি দেখে শায়লা বুঝে নিল আরাফ তার মায়ের মত হয়েছে।কারণ শিহাবের সাথে মুখটা মিলছে না।খুব মায়াভরা মুখটা! শায়লা  চোখে পানি ধরে রাখতে পারলো না।সব মেয়েই মনের ভেতর একটা ঘুমন্ত মাতৃত্ববোধ লালন করে। তবে সবার প্রকাশভঙ্গী এক নয়। আরাফকে দেখে শায়লার ইচ্ছে করছিল  এখুনি দৌড়ে গিয়ে বাচ্চাটাকে জড়িয়ে ধরি। এমন ফুটফুটে একটা শিশু  মায়ের আদর বঞ্চিত।
শায়লা পরম মমতায় ছবি দুটো সেভ করে রাখলো।শায়লা  বুঝতে পারে শিহাবের খুবই দূর্বলতম জায়গা এটা।যাক আর এ প্রসঙ্গে বেশিদূর না আগানোই ভালো।
শায়লা প্রসঙ্গ পাল্টালো।
আচ্ছা, আপনি কি কখনো সাগর দেখেছেন?
আমার খুব ইচ্ছে সাগরের বেলাভুমিতে হেঁটে বেড়াবো আর সাগরের ঢেউয়ে ঢেউয়ে পানি এসে পা ছুঁয়ে যাবে। 
হ্যাঁ, একবার গিয়েছিলাম। কলেজ থেকে একদল বন্ধুরা মিলে। সেই তারুণ্য ভরা মনে সবার চোখেই একটা স্বপ্ন ছিল জীবনসঙ্গিনীর সাথে আবার আসবে।অনেকেই গিয়েছে এরপর।আমার আর যাওয়া হয়নি।
শায়লা ভীষণ আবেগতাড়িত হয়ে উঠে।বলে ফেলে আপন মনে, আমার খুবই ইচ্ছে তোমার সাথে সাগর দেখতে যাবো। তোমাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে পাশাপাশি দুজনে হাঁটবো।  সাগরের ঢেউ বারবার বেলাভুমিতে আছড়ে পড়বে আর আমাদের পা ছুঁয়ে যাবে। উত্তাল বাতাসে এলোমেলো চুলে আমার মুখটা ঢেকে গেলে তুমি তা যত্ন করে সরিয়ে দিবে। আর আমি চোখ বন্ধ করে তোমার ছোয়া অনুভব করছি। প্রচন্ড বাতাস এলে তোমার বুকে মুখ লুকাচ্ছি।
দু'প্রান্তে দুজনেই নীরব। শিহাব শায়লাকে ভেবে নিচ্ছে নীল শাড়িতে।গলায় ঝিনুকের মালা। বাতাসে এলোমেলো চুলে বারবার শায়লার মুখটা ঢেকে যাচ্ছে আর শিহাব হাত দিয়ে তা সরিয়ে দিচ্ছে। শিহাব শায়লার উষ্ণতা অনুভব করছে।যেন খুব কাছে দুজনে। শিহাব তার শক্ত হাতের বাঁধুনিতে শায়লাকে জড়িয়ে আছে। যেন আর কিছুতেই সে শায়লাকে হারিয়ে যেতে দিবেনা।
সাগরের বিশাল বুক যেন ভালোবাসার এক অতল গহ্বর। মানুষ  সেখান থেকে  তার খুব সামান্যই তুলে আনতে পারে। 
কল্পনায় দুজন হারিয়ে গেলেও দুজনারই জীবন অতীতে বাঁ ধা।কল্পনায় হিমালয় পার হওয়া যায়  কিন্তু মানুষের মনের সাড়া পাওয়া অধরাই থেকে যায়।
চলবে....

শ্রী স্বপন দাস




আমরা কোথায়

মানুষ কেমন যেন হয়েছে দিশেহারা
তবে কি সমাজ হয়েছে, দুর্নীতি ভরা।
চাকরি বাকরি ব্যবসা পত্তর,সবই কেমন শূন্যে ভরা
সুষ্ঠু সমাজে চলছে ক্ষরা,জঞ্জাল পূর্ণ মস্তিষ্ক ভরা।
চতুর্থ পর্ব আসছে ,জলজ্যান্ত করোনা
যশ আম্ফানের ঘটনা,প্রকৃতি কখনো আর এনোনা।

শ্রমিক কৃষক ডাক্তার শিক্ষক,ভাই ও হে!
উন্নত সমাজের আর দর্শন নাহি রে।
দেশের সকল নেতার মুখে শুনি উন্নতি আর উন্নতি
বাস্তবে দেখি,দেশ ভরা দুর্নীতি আর দুর্নীতি।

ভোটের সময় শোনা যায় উন্নয়নের খবর
পরিশেষে বোঝা যায়, নগদ/সম্পত্তির কত বহর।
মিডিয়া খবরের কাগজ টিভি তে দেখি সব কুকীর্তি
জানিনা, হে ভগবান,আদৌ হবে কি
দেশের উন্নতি।

৩০ নভেম্বর ২০২১

bvn

LOVE

কবি শুভমিতা বিশ্বাস এর কবিতা




সে কি জানে?
শুভমিতা বিশ্বাস


ঘর ভর্তি লোকের মাঝেও 
যার দিকে তাকালে,
নিমেষেই অভিমান বুঝতে পারি
তাকে আমি নিজের প্রতিটা অঙ্গ ভাবি।

সে কাদলে মনে হয়, পৃথিবীর সব নদীর জল 
আমার বুকে এসে ধাক্কা মারছে
আর সে হাসলে,
স্বর্গের চেয়েও ওপরে উঠে যাই আমি!


বাজার,দোকান,রাস্তায় একটু একা হলেই 
তার ভাবনা আমার ভিতর রিনঝিন করে ঝরে যায়...

তার শূন্যতাকে, আমি এক মুহুর্ত বইতে পারিনা
সে কি জানে?

মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন" ৫৮

কান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক।  তার নিত্যদিনের  আসা  যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কথা  নিয়ে  কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন  চলবে...






টানাপোড়েন (৫৮)
পরিষ্কার  স্থানে পাবে মুক্ত ঘ্রান

রেখা আজ শীতের সকালের প্রথম আলোর স্পর্শ সারা শরীরে মেখে নিল। শ্বশুরবাড়িতে ব্যস্ততায় সূর্যের প্রথম আলোর স্পর্শ মাখার সুযোগই হয় না। আজ রেখা ভীষণ খুশি। মনের গভীরে এত খুশির মাঝে শুধুই উঁকি - নীল সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে  ইচ্ছে করছে, সারা মনটাকে নীল নীলাভ করে নিতে।
এমন সময় শুনতে পেল ভোলা কাকা চেঁচিয়ে বলছে'ছোট বৌদি, ছোট বৌদি ,আজকে আমাদের গ্রামে না চাঁদের হাট বসেছে?'
কাকিমা বললেন 'কেন রে কি হয়েছে? কোথায় বসেছে?'
ভোলা কাকা বলল 'আরে বাবা, আমাদের মিলনের দোকানে।'
কাকিমা অবাক হয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে খুন্তি হাতে বললেন  'কার দোকান ?মিলনের দোকান!'
ভোলা বললো ' তাহলে আর কি বলছি তোমায়?'
ছাদ  থেকে তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে রেখা সব শুনছে।
কাকিমা বললেন  'কেন  রে মিলন কি করেছে?'
রেখা মনে মনে ভাবল এই ভোলা কাকা হচ্ছে এবিপি আনন্দের রিপোর্টার ।সব খবর আগে ভোলা কাকার কাছে।
ভোলা কাকা বলল 'মিলনের চায়ের দোকান আছে না?'
কাকিমা  বললেন'' হ্যাঁ ,,আমাদের মিলন তো খুব ভালো ছেলে। চায়ের দোকান আছে ,কি হয়েছে তাতে?'
ভোলা কাকা বলল 'কি হয়নি বলো?'
কাকিমা বললেন ' সেই থেকে হেঁয়ালি করে যাচ্ছিস বাবা , আমার রাজ্যের কাজ পড়ে রয়েছে ।এবার বল তো কি হয়েছে?'
ভোলা বলল 'ছোট বৌদি, একটু চা হবে গো?'
কাকিমা বললেন 'খুব হবে ।একটু বোস।'
কাকিমা রান্নাঘরে ঢুকে ফ্লাক্স থেকে চা কাপে ঢেলে ভোলাকে দিলেন।
ভোলা কাকা গরম চা পেয়ে খুব খুশি হলেন, আর  সঙ্গে সঙ্গে একটু চুমুক দিয়ে বলল  ' ছোট বৌদির হাতে চা না খেলে  সারাটা দিন কেমন যেন  লাগে।'
কাকিমা বললেন  'তা তো বুঝলাম ।কালকে ওই যে সকাল বেলা বেরিয়ে গেলি ,বাজার-টাজার করে দিয়ে ।তোর যে খাবার রাখা ছিল ,সেটা কি মাথায় ছিল ?'
ভোলা কাকা জিভ কেটে বলল' আমি কান ধরছি ছোট বৌদি ।আমার ভুল হয়ে গেছে।'
কাকিমা বললেন 'খুব হয়েছে। এবার বল তো সারাটা দিন কোথায় ছিলিস?'
ভোলা কাকা বলল' আরে ওই পাশের গ্রামে গিয়েছিলাম মাছ ধরতে।'
কাকিমা বললেন' সে কি রে ?তা কতগুলো মাছ পেয়েছিস বাবা।'
ভোলা কাকা বলল মাথা চুলকে 'কই আর পেলাম ।সারাটা দিনই শুধু এমনি ছিপ ফেলে কেটে গেল।'
কাকিমা বললেন' সে তো হবেই ।তুই আবার কবে থেকে মাছ ধরার পোকা হয়ে গেলি বল তো?'
ভোলা কাকা হে হে হে করে হেসে উঠলো।
আর বলল' তবে বৌদি চা না খেয়ে তো আর আমি বেরোয় নি ।চা টা কিন্তু সুপার ছোটবৌদি ।তোমার হাতে।'
কাকিমা বললেন 'নে হয়েছে ভোলা আর প্রশংসা করতে হবে না  এবার আসল কথাটা খুলে বল তো?'
ভোলা বলল ' আরে বাবা, বলার জন্যই তো আমি আসলাম ।রোসো,রোসো।'
ভোলা কাকা বলল ''আমাদের মিলন চায়ের দোকানের সঙ্গে সঙ্গে আর কি কাজ করে সেটা তো জানো?'
কাকিমা বললেন  'হ্যাঁ ও তো নিজের দোকানের সামনে ছাড়াও নিয়মিত চারিদিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার গুরুদায়িত্ব নিজের ঘাড়ে তুলে নিয়েছে।'
ভোলা কাকা বলল  'হ্যাঁ ,সেই জন্যই তো সাড়া ফেলে দিয়েছে চারিদিকে।'
রেখা যেন কেমন একটা মজার বিষয় পেল ও বসে পড়ল বিষয়টা শোনার জন্য।
কাকিমা বলল  'হ্যাঁ ,তাতে কি হয়েছে বল?'
ভোলা কাকা বলল  'একটা নতুন বুদ্ধি খাটিয়েছে তাতে দেখা গেছে ওর চায়ের দোকানে যারা আড্ডা দিতে আসেন,সেখানকার চা খেতে আসা মানুষের হাতে তুলে দিয়েছে একটি করে পরিচ্ছন্নতার স্টিকার লাগানো কাপে গরম চা।
কাকিমা বললেন 'বলিস কি রে?'
ওদিকে ঘর থেকে কাকু শুনছেন ।শুনে বললেন ' কি বলছিস রে?'
ভোলা কাকা ঘরে ঢুকে একটু গলা বাড়িয়ে বলল ,' হ্যাঁ গো দাদা। এতেই তো সাড়া পড়ে গেছে চারিদিকে।'
রেখা বলল ' তারপর কি হলো সেটা বলো?'
ভোলা কাকা বলল  'স্টিকারে কি লেখা ছিল জানো?'
কাকু কাকিমা সবাই বললেন ,' কি করে জানবো সেটাই তো জানার চেষ্টা করছি?'
ভোলা বলল প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া চায়ের কাপে যে স্টিকার লাগানো ছিল তাতে লেখা ছিল পরিষ্কার রাখলে স্থান ,তবেই পাবে মুক্ত ঘ্রাণ।'
রেখা বলল ' কি সুন্দর শব্দচয়ন গো?'
কাকিমা বললেন' হ্যাঁ, হারুদা  মারা যাবার পর আর তো পড়াশোনাটা বেশি দূর চালাতে পারে নি ।কিন্তু ওর উচ্চমাধ্যমিক পাস এবং ফায়ার এন্ড সেফটি ট্রেনিং কোর্স করা আছে।'
রেখা বলল' বাহ শুনতেও কত ভাল লাগে। এটা আমাদের গ্রামের গর্ব।'
ভোলা কাকা'   তারপর ওই শোনো কি হয়েছে?'
মা বললেন বল?
ভোলা বলল আজকে যেন  চায়ের দোকানের আড্ডায় দেখা গেল বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষজনদের।
কাকিমা বললেন যেমন-
ভোলা কাকা বলল 'এই  কলেজে পড়ান তাদের কি বলে?
রেখা বলল ' অধ্যাপক বা প্রফেসর।'
ভোলা কাকা বলল  'একদম ঠিক   মামনি।'
এছাড়া কবি ,তারপরে হচ্ছে শিক্ষক সঞ্চালক এরকম গুণীজনের সমাবেশ।
রেখা বলল  'কি অবাক কান্ড তাহলে তো মিলনদার নাম অনেক দূর পর্যন্ত চলে যাবে গো?'
কাকিমা বলল ' হ্যাঁ, ঠিক তাই।
রেখা বলল' এই কাজগুলো কখন করে?'
ভোলা কাকা বলল  'সকাল-বিকেল বা রাতে নিজের দোকানের কাজের শেষে।
রেখা বলল  'পুরো বাজার সংলগ্ন এলাকা পরিষ্কার কর
ভোলা কাকা বলল ' তাহলে আর কি বলছি তোমাদের?'
রেখা বলল ,' এটা তো একদম অভিনব ব্যাপার'
ভোলা কাকা মাথা নেড়ে বলল ‌'আরো বলেছে সামনে যে শুভ নববর্ষ আছে ,সেই নববর্ষের দিন এইভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মধ্যে দিয়ে স্বচ্ছতার বার্তা সকলের উদ্দেশ্যে দিতে চাইছে।'
রেখা বলল ও অধ্যাপক কবি কোথাকার?'
ভোলা কাকা বলল 'আরে বাবা ,আমাদের মিলনের নাম অনেক দূর অব্দি ছড়িয়েছে ।তাই তারা শহর থেকে এসেছেন মিলনের কাজ স্বচক্ষে দেখার জন্য।'
কাকিমা বললেন  ,'একজন সামান্য চা বিক্রেতা সে যদি চা বিতরণ করার মধ্যে দিয়ে স্বচ্ছতার বার্তা দিয়ে আনন্দ অনুভব করতে পারে ,তাহলে প্রত্যেকের উচিত সেই প্রচেষ্টা চালানো।'
রেখা বলল' এই মিলনদার জন্য  আমাদের এই গ্রামের নাম কিন্তু অনেক দূরে পর্যন্ত ছড়িয়ে যাবে।'
কাকিমা বললেন  ,'সবার প্রচেষ্টা যদি এরকম থাকত ?তাহলে সুন্দর হয়ে উঠত আমাদের এই পৃথিবী।'
রেখা বলল  'সারা পৃথিবীর মানুষ  যদি শোনে এবং সবাই যদি সচেষ্ট হয় পৃথিবীকে সুস্থ রাখার জন্য অর্থাৎমিলনদার মতোই যদি সকল এগিয়ে আসে তাহলে পৃথিবী এভাবে অশান্ত হয়ে উঠবে না ,শান্ত হবে।
কাকীমা বললেন ' একদম ঠিক বলেছিস ননী?
রেখা বলল ' নচিকেতার এই গানটা মনে পড়ে কাকিমা'? 
কাকিমা বললেন 'কোন গানটা বল তো?'
রেখা বলল 'একদিন ঝড় থেমে যাবে... পৃথিবী আবার শান্ত হবে।
কাকিমা বললেন ' একদম ঠিক বলেছিস। হ্যাঁ গানটা শুনেছি।'
এর ভেতর জুড়েই শুভ চেতনা  আসত তো?'
কাকু বললেন 'বৃথা আশা মরিতে মরিতেও মরে না' 
এই আশাতেই বুক বাঁধি আমরা সকলে।''
কাকিমা বললেন 'মিলনের জন্য গর্ববোধ হচ্ছে।'
 কাকু বললেন 'একদিন আমাদের এই গ্রামের নাম  উজ্জ্বল হয়ে থাকবে সকলের স্মৃতি কোঠায়'।

মমতা রায়চৌধুরী। ৬০

কান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক।  তার নিত্যদিনের  আসা  যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কথা  নিয়ে  কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন  চলবে...
 মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন"




টানাপোড়েন ৬০
চিন্তামুক্ত


আজ সকাল থেকেই শরীরটা কেমন ম্যাচম্যাচ করছে মনোজের। মাথা তুলতে কষ্ট হচ্ছে। আজ রেখা যদি পাশে থাকতো? আজ খুব রেখার কথা মনে হচ্ছে। বাপের বাড়ী গেছে বলে আমাকে ভুলেই গেল। হঠাৎই  ফোন বেজে ওঠে। মনোজের ইচ্ছে করছে না ফোনটা তুলতে। আবার ফোন বেজে উঠল।
এবার মনোজ বিরক্তির সঙ্গে ফোনটা রিসিভ করে বলল 'হ্যালো'।
অপরপ্রান্ত থেকে কণ্ঠ ভেসে আসলো ' কি করছো?'
মনোজ বুঝতে পারল রেখার গলা নয়, কিছুক্ষন চুপ করে থাকলো। শরীরটা ভালো নেই বকবক করতে আর ইচ্ছে করছে না। শণি যেন মনোজের পেছন ছাড়ছে না।
অপরপ্রান্ত থেকে আবার বলল'কি ব্যাপার উত্তর দিচ্ছ না যে?'
মনোজ বললো ' কি উত্তর দেব?'
তিথি বলল 'যা জিজ্ঞেস করলাম।'
মনোজ বললো 'শুয়ে আছি।'
তিথি বলল' কি ব্যাপার অফিস যাও নি।'
মনোজ বলল  'না'।
তিথি বলল  'যাক ,তাহলে একটু মন খুলে কথা বলতে পারবো। নইলে তো শুধু কাজের দোহাই।'
মনোজ বললো 'আমার কথা বলার মানসিকতা নেই।'
তিথি বলল' কেন তোমার পাশে বউ আছে বুঝি?'
মনোজ বলল' তা আমার যখন বউ আছে। সে তো থাকবে , এটাই স্বাভাবিক নয় কি?  এক প্রশ্ন কেন রোজ করো?'
তিথি বিরক্তির সঙ্গে বলল' বৌ এর কথা বললে তোমার গায়ের এত ফোসকা পড়ে কেন বল তো?'
মনোজ বলল'  তোমাকে হাজার বার বলেছি যে রেখা সম্পর্কে তুমি কোন কথা বলবে না। তোমার মুখে মানায় না।'
তিথি বলল 'তাহলে এবার আমার কথা বলি?'
মনোজ  বলল 'আমি তো তোমাকে বললাম, আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।'
তিথি বলল 'তা বললে তো হবে না।তুমি রোজ আমাকে এভোয়েড করবে ?এটা তো আমি মেনে নিতে পারব না।'
মনোজ বলল 'এই তুমি আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলবে না। তোমার সাথে আমার কোন লেনাদেনা নেই।'
তিথি বলল' তাই নাকি?'
মনোজ বললো' হ্যাঁ,তাই।'
তিথি  বলল'কেন তুমি রেগে যাচ্ছ বল তো?
রাগার মতো তো আমি কিছু বলি নি।'
মনোজ বলল' তুমি যখন কথা বলো ,তখন রাগার মতই কথা বলো।'
তিথি বলল'তাহলে তোমার কাছে কিছু পার্সেল যাবে তখনই বুঝতে পারবে?'
মনোজ বললো 'পারসেল??'
তিথি বলতো 'আমাদের কিছু ঘনিষ্ঠ মু'হূর্তের?'
মনোজ বলল 'ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে কবে..?
তিথি বলল 'তুমি যদি আমার কথা মত চলো ।তাহলে আমি এসব কিছুই করবো না।'
মনোজ এবার একটু ভয় পেয়ে গেল তবে কি কলেজ লাইফে এক্সকার্শন এর সেই ফটোগুলো..

মনোজ একটু নরম হয়ে বলল 'দেখ তিথি নতুন করে তুমি আমার জীবনে আর কোন ঝামেলা বাধিয়ো না ।আমি যখন সংসারী হয়েছি ।তুমি তোমার মত সেটেল হবে না কেন ?তুমি আমার পেছনে কেন পড়ে আছ বলো?'
তিথি বললো  'এখন তো বেশ মিষ্টি মিষ্টি করে বলছো?
এমনি তে আজকে আমার শরীরটা খুব খারাপ আমি অফিস যেতে পারি নি। আমার বকবক করতে ভালো লাগছে না।
তিথি বলল'' বেশ আমি আজকে ফোনটা রাখছি?'
মনোজ যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। কি মাছের কাঁটা যে ফুটল কিছুতেই বেরোচ্ছে না ‌।এ যে কি যন্ত্রণা ?কাকে বোঝাবো? (মনে মনে ভাবতে লাগল।)
ফোনটা কেটে কেটে দেওয়ার পর আবার রেখার কথাই ভাবতে লাগলো। গতকাল কতবার রেখাকে ফোন করা হয়েছে ফোনই ধরল না। ওকি এখানকার কথা সব ভুলে গেল। মিলিদের নিয়ে এত ভাবে অথচ ওদের খোঁজ টা পর্যন্ত নেওয়ার সময় নেই।
এর মধ্যেই মিলিদের আওয়াজ পাওয়া গেল চিৎকার করছে খাবার জন্য।
যাক তবুও আজ সুমিতা কাজে এসেছিল ওকে দিয়ে ওদের খাবারটা করিয়ে নেওয় হয়েছে ।তাই নিশ্চিন্ত ।ভোরবেলা টুংটাং করে ফোনটির আওয়াজে মাথাটা ধরেছিল। মাথা তোলা যাচ্ছিল না ।
এখন যে ভাবেই হোক উঠে ওদেরকে খাবার দিতে হবে অবলা জীব ওরা তো বুঝবে না?
মনোজ আস্তে আস্তে উঠলো। তারপর বাচ্চাদের জন্য দুধ রুটি ভালো করে মেখে খেতে দিল।
অন্যদিকে রেখা বাড়িতে ফিরে কাকিমাকে জিজ্ঞেস করলঃ' কার ফোন এসেছিল গো কাকিমা?'
কাকিমা তখন রান্নাঘরে মাংস কষাচ্ছিল। পেঁয়াজ রসুন আদা ও মসলার ভালো গন্ধ বেরিয়েছে। কড়াইতে খুন্তির টুং টা্্ আওয়াজ হতে লাগল।
রেখা  রান্না ঘরে উঁকি দিয়ে বলল 'ও কাকিমা, এত জরুরি তলব করেছিলে কেন ভোলা কাকাকে দিয়ে?'
কাকিমা বললেন 'আরে তোর কতবার ফোন এসেছে জানিস?'
রেখা বলল' কে করেছিলো ফোন?'
কাকিমা বললেন 'তা তো দেখি নি?'
কাকিমা বললেন 'সকাল থেকে ফোন দেখার কি আমার সুযোগ আছে বল?'
এর মধ্যে বেসিনের জলের কোলটা ছেড়ে দিয়েছে তো  হোস হোস শব্দে জল বেরোচ্ছে। রেখা রান্নাঘরে ঢুকে কাকিমাকে বললো' কি ভালো গন্ধ বেরোচ্ছে কাকিমা ।একটু ঘ্রাণ যেন ভেতরে নিয়ে নিল।  গন্ধেই অর্ধভোজন।
কাকিমা বললেন 'তোর জন্য একটু কষা মাংস তুলে রাখলাম খাবি?'
রেখা খুব খুশি হয়ে বলল 'তাই বুঝি? দাও দাও দাও আমার জিভ থেকে জল পড়ছে টস টস করে।'
কাকিমা বললেন 'আমি জানি তো?'
রেখা বলল 'তুমি এতজনের কথা মাথায় রাখ কাকিমা ?আই অ্যাম  প্রাউড অফ ইউ।'
রেখা কষা মাংসের বাটিটা তুলে নিয়ে  খুব মিস করেছি বলতে লাগলো। আর বলল' কাকিমা সত্যিই যেমনি সুন্দর তুমি রান্নাও করো, তেমনি তোমার সুন্দর ব্যবহার।'
কাকিমা গ্যাসটা সিম করে দিয়ে বলল' ,আমি ওদিকে যাচ্ছি। ননী তুই রান্না ঘরে আছিস তো?'
রেখা বলল 'তুমি না থাকলে আমি রান্না ঘরে একা একা থাকবো ?আমার ভালো লাগবে না।'
রেখা বেশ আয়েশ করে কষা মাংসটা খেতে লাগলো।
কাকিমা বললেন' ননী কার ফোন এসেছিল একটু দেখে নেে।'
রেখা খেতে খেতে বলল'  হ্যাঁ দেখে নিচ্ছি। একটু হুঁশ হাস শব্দ করে বলল ও কাকিমা তোমার হাতে জাদু আছে।'
কাকিমা বললেন "কিরে ঝাল হয়েছে?'
রেখা বলল  'না ,না ,না । বোধহয় একটু ওই চেরা কাঁচালঙ্কা মুখে লেগেছে।'
কাকিমা একটু চিন্তিত ভাবে বললেন 'তাই বল ঝাল হলে তো তোর কাকু খেতে পারবে না।'
রেখা মুখটা ধুয়ে এসে দোপাট্টায় হাত মুছতে মুছতে বলল ' দেখি কে ফোন করল?'
রেখা ঘরে গিয়ে ফোন খুঁজতে লাগল। যেখানে ফোনটা ছিলো ,সেখানে না পেয়ে ঘর থেকে বলল  'কাকিমা ,কাকিমা। ও কাকিমা?'
কাকিমা গেটের ধারে দাঁড়িয়ে কার সঙ্গে কথা বলছিলেন ,ওখান থেকে উত্তর দিলেন' কি হলো রে ননী?"
রেখা বলল বাইরে বেরিয়ে এসে' ও কাকিমা ফোনটা কোথায়?'
কাকিমা বললেন' না ওই দেখ ভোলাকে বলেছিলাম ফোনটা ধরতে। না ধরে ফোনটা কোথায় রেখে গেছে ,দাঁড়া দেখছি।'
কাকিমা ঘরে এসে এদিক ওদিক ঘুরে ফোন পেলেন ফ্রিজের উপর।
কাকিমা বললেন 'এই দেখ ভোলার কাজ, ব্যাটাকে যা বলব তার উল্টো কাজ করবে জানিস?'
রেখা ফোনটা বের করে দেখছে স্কুল থেকে বড়দির ফোন, রিম্পাদির ফোন, মনোজের ফোন।
রেখা ভাবল বড়দিকে ফোন করা যাবে না ।ফোন করলেই কিছু-না-কিছু কাজের কথা বলবেন।
তার চেয়ে মনোজ ও  রিম্পা দি কে ফোন করা যাক।
রেখা প্রথমে ফোন করল মনোজকে। মনোজের ফোনে রিং হয়ে যাচ্ছে। ফোন তুলছে না কেন? আবার ফোন করল। এবারও রিং হয়ে কেটে গেল। এবার খুব চিন্তা হচ্ছে রেখার। মনোজ কোন অসুবিধায় নেই তো? ঠিক আছে তো? ছি ছি ছি ছি কাল থেকে মনোজের কোন খবর নি।  এটা একদম ঠিক কাজ হয় নি। এখানে এসেছে কি হলো বুঝে উঠতে পারছে না রেখা।'
আবার ফোন করল রেখা। এবার মনোজ ফোন তুলে কাতর কন্ঠে বলল 'হ্যালো'
রেখা বলল'কি হয়েছে তোমার? এভাবে কথা বলছ কেন?
মনোজ কিছুক্ষন চুপ করে থাকলো ।একটু অভিমান মনের ভেতরে দানা বেঁধেছে।
রেখা আবার বলল 'কি গো ,কি হয়েছে তোমার?
ঠিক আছ তুমি? শরীর খারাপ?'
মনোজের মনে মনে খুব রাগ হল। কালকে এতবার ফোন করা হল ফোন ধরল না ।আর এখন জিজ্ঞেস করছে কী হয়েছে তোমার? কিন্তু কথাটা চেপে রেখে বলল' হ্যাঁ, জ্বর এসেছে। প্রচন্ড মাথা যন্ত্রণা।'
রেখা বলল 'ডাক্তার কাকুকে ফোন করেছিলে? ওষুধ খেয়েছো?'
মনোজ বলল 'হ্যাঁ, খেলাম।'
রেখা বলল'কিন্তু তোমার পাশে তো এখন একজনকে থাকার দরকার। চৈতির মা কে বলবো?'
মনোজ বলল 'না, না।'
রেখা বললো 'তাহলে কি করে হবে বলো ?রাত্রে জ্বর বাড়লে তখন কি করবে?'
মনোজ বলল' কিচ্ছু হবে না।'
রেখা বললো 'তাহলে পার্থকে ফোন করি ,।ও থাকুক এসে।'
মনোজ আবার বলল 'ওসব কিছু লাগবে না রেখা?'
রেখা বললো 'তাহলে কি লাগবে তোমার?'
মনোজ বলল 'তুমি?''
রেখা বলল'এই ইয়ার্কি মেরো না তো?'
মনোজ বললো 'ও আমার কথা তোমার ইয়ার্কি মনে হচ্ছে ।ঠিক আছে। তাহলে চুপ করলাম।'
রেখা বলল' শোনো তোমার এখন মাথা কাজ করছে না ।আমি পার্থকে ফোন করে দিচ্ছি।'
মনোজ বলল 'তুমি‌ কি আসবে না ?ওখানেই থাকবে?'
রেখা বলল 'বা রে ,তুমি গাড়ি পাঠাবে ।তারপর তো যাবো?'
মনোজ বলল''এখন গাড়ি পাঠাবো?'
রেখা বলল 'পাগল নাকি ?তুমি এখন গাড়ি পাঠাবে ।আমি কখন ফিরব?
শোনো কিছু খেয়েছো?'
মনোজ বলল'খেতে ভালো লাগছে না।'
রেখা বলল 'আমি পার্থকে ফোন করে দিচ্ছি। ও কিছু খাবার নিয়ে যাবে।'
রেখা ফোন কেটে দিয়ে পার্থর ফোন নম্বর*৫৬৭৮ ডায়াল করলো।
পার্থ ফোন ধরে বলল' হ্যালো'।
রেখা বলল 'আমি রেখা বৌদি বলছি।'
পার্থ সোফায় হেলান দিয়ে বসেছিল ,হঠাৎ তড়িৎ করে উঠে পড়ে বলল'বৌদি বলুন?'
রেখা বলল 'হ্যাঁ, বলছি ভাই ,আজকে একটু তোমার দাদার কাছে গিয়ে থাকতে পারবে ? যদি তোমার কোন অসুবিধা না থাকে?'
পার্থ বলল 'না সেরকম কোনো অসুবিধে নেই ।কেন কি হয়েছে বৌদি?'
রেখা বললো' আসলে ওর খুব জ্বর এসেছে ।একজন থাকা দরকার?'
পার্থ বলল 'না ,না ,না ।আপনি চিন্তা করবেন না ।আমি যাব।'
রেখা বলল 'অসংখ্য ধন্যবাদ ভাই।'
পার্থ বলল 'না 'না ,বৌদি ।এভাবে কেন বলছেন ?আমরা তো প্রতিবেশী পাশাপাশি থাকি ।এটুকু না করলে হয়?'
রেখা বলল'আর একটা কাজ দেবো?'
পার্থ বলল 'বলুন?'
রেখা বলল 'একটু দাদার জন্য তরকা রুটি নিয়ে যেও।জ্বরের মধ্যে এটা খেতে খুব ভালোবাসে?'
পার্থ বলল 'আপনি কোন চিন্তা করবেন না বৌদি ।আমি রাত্রিতে আপনাকে পরে ফোন করে জানাবো ,কেমন আছে দাদা ।কেমন?'
রেখা বললো 'তুমি আমাকে চিন্তামুক্ত করলে ভাই ।ভালো থেকো।'
পার্থ বলল 'আপনিও ভালো থাকবেন বৌদি।'
ফোন কাটার পর কাকিমা বললেন' কি হয়েছে রে? জামাইয়ের কিছু হয়েছে?'
রেখা বলল' ওর খুব জ্বর কাকিমা?'
কাকিমা বললেন''খুব চিন্তার ব্যাপার রে ।একা বাড়িতে থাকে?'
রেখা বলল ''না, পাশের পার্থকে বললাম থাকতে?'
কাকিমা বললেন 'বেশ করেছিস ,।তাহলে একটু চিন্তা মুক্ত হওয়া গেল।'

মমতা রায়চৌধুরী ৫৯

কান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক।  তার নিত্যদিনের  আসা  যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কথা  নিয়ে  কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন  চলবে...
 মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন"




টানাপোড়েন (৫৯)
স্মৃতিমেদুর দিন


গোধূলি বেলায় নদীর ধারে চারিদিকে সবুজের সমাহার ম্লান সূর্যের আলো জলের উপর পড়ে নানা রকম চিত্র অংকিত হচ্ছে ।আপন মনে রেখা চলে গেল সেই নদীর ধারে ।যেখানে শৈশব, বাল্য ,কৈশোর কেটেছে সেই স্মৃতিমেদুর জায়গায় গিয়ে বসেছে আজ রেখা। কত না বলা কথা রয়ে গেছে মনের অজান্তে। আজ বলতে ইচ্ছে করছে আকাশ বাতাস নদীকে সাক্ষী রেখে । নদীর ধারে বসে আপন মনে পাদুটোকে জলে ডুবিয়ে দিয়ে জলকেলি করতে করতে ভাবছিল ভুল করেছে বর্তমানের কথা বর্তমানে বলতে হয় ।কালকে বললে তার কোন মূল্য থাকে না ।শোনার লোকও থাকে না। মনের গভীরে শুধু থেকে যাবে প্রিয় মানুষকে বলার না বলা কথা।
পরক্ষণে রেখা ভাবছেন কেন এসব ভাবছে রেখা।
স্বামীর সংসার জীবনে ভালোই আছে। তবে তার মনে কি কোন ক্রাইসিস রয়েছে ,যার জন্য আজ বারবার তার শৈশব বিজড়িত গ্রামে এসে পুরনো দিনের কথা বেশি করে মনকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে।
হঠাৎই মনে পড়ে গেল নীলদার কথা। নীলদা বলেছিল
'কি রে ননী নদীর ধারে একা বসে পা দুটোকে জলে ডুবিয়ে কার কথা ভাবছিস?
অমনি রেখা সেদিন বলেছিল' কার কথা আবার ভাববো ?'
নীল দা বলেছিল 'ও তাই বুঝি? তাই  তুই একা একা এখানে এসে বসেছিস?'
রেখা বলেছিল' কেন জায়গাটা কি শুধু তুমি একাই এসে বসতে পারো?'
নীলদা বলেছিল' তুই এখন তো বড় হচ্ছিস। যেখানে সেখানে একা একা যাবি কেন? ওয়েট কর কাকিমাকে গিয়ে সব বলছি।'
কতবার এভাবে নীলদা রেখাকে রাগিয়ে দিত। কখনো কখনো রেখা ভয় পেয়ে চুপ হয়ে যেত। কারণ রেখার মা এ ব্যাপারে ভীষণ কড়া ছিলেন। শুধুমাত্র কাকিমা 'জেঠিমা, জেঠুদের আদর,আহ্লাদ দেবার জন্য মা বেশি কিছু বলতে পারতেন না।
যখন রেখা ফুঁপিয়েকেঁদে উঠত।
ঠিক তখনই নীলদা গিয়ে বলতো 'পাগলি কোথাকার। 'আমি কাকিমাকে গিয়ে বলব তোর কথা? কি সুন্দর আমরা দুজন এখানে  এসে গল্প করব। নদীতে ঢিল ছুড়ে  কাগজের নৌকা ভাসিয়ে দিয়ে দেখতেই থাকব। কত ভালো লাগে বল।'
রেখা তখন বলতো 'তুমি আমার সাথে দুষ্টুমি করছিলে?' বলেই নীলদার পিঠের উপর দু চার ঘা মারতো।
নীলদাও তারিয়ে তারিয়ে মার খাওয়াটা উপভোগ করত।
রেখা গাল ফুলিয়ে বলতো 'তোমার সাথে আর কথা বলবো না?'
নীলদা অমনি পকেট থেকে নারকেলের নাড়ু বা তিলের নাড়ু বের করে বলতো ' কাল এগুলো পাবি না।'
রেখা এই নাড়ু খেতে খুব ভীষণ ভালোবাসতো।
তখনই বলতো 'নীলদা, না না না তুমি আমাকে ওই গুলো দাও।'
নীলদা বলতো 'তাহলে বল কথা বন্ধ করবি না তো?'
রেখা ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাত।

আজ কত বছর হয়ে গেছে নীলদার সাথে কোন যোগাযোগ নেই ।কিন্তু মন থেকে  তাকে কিছুতেই সরিয়ে দিতে পারে নি রেখা। মনের কোনে যেন কোথায় আলাদা একটা সফট কর্নার তৈরি করে রেখেছে।তাই আজ ঘুরে ফিরে শুধু নীলদার কথাই মনে হচ্ছে ।
এমন সময় ভোলা কাকা এসে ছুটতে ছুটতে এসে চেঁচিয়ে বলল 'মামনি তুমি এখানে বসে আছো , ওদিকে তোমার বাড়িতে ডাক পড়েছে।
রেখার হঠাৎই চমক ভেঙ্গে বলল ' আমায় কেন গো ?ভোলা কাকা।'
ভোলা কাকা বলল ' জানি না তো মামনি।'
রেখা বলল 'একটুখানি যে এসে বসব নিরিবিলিতে সে উপায়ও নেই ।'
 কাকা বলল 'তুমি আজকে ফোন নিয়ে আসো নি?'
রেখা বলল'ফোন আনলে ফোনের আওয়াজে বিরক্ত লাগে।আজ শুধু নিজেকেই জানার জন্য এখানে এসে বসেছি।'
ভোলা কাকা বলল' তোমায় অনেক বার ফোন বেজেছে ।এই জন্যই ছোট বৌদি তোমার কাছে পাঠালো।'
রেখা বলল 'কে ফোন করেছে?'
ভোলা কাকা বলল ' সে তো বলতে পারব না মামনি।'
রেখা বলল  'ঠিক আছে ।যাচ্ছি।'
ভোলা কাকা বললেন  'না তোমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে বলেছে ।চলো।'
রেখা বলল  'আমি কি ছোট বাচ্চা নাকি আমি কি যেতে পারবো না ভোলা কাকা?'
ভোলা কাকা বলল 'ছোট বৌদির নির্দেশ আমি তোমাকে ছেড়ে যেতে পারবো না। আমার সাথে চলো।'
রেখা আবার চলে গেল সেই বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়।
একদিন চারিদিকে অন্ধকার আর মাতাল বৃষ্টি ।নীল বৃষ্টিতে ভিজে গেছে। কয়েকদিনের জন্য গিয়েছিল বেড়াতে । বেড়াতে বলাটা ঠিক হবে না। একটা কাজে গেছিল। ৪-৫ দিন দেখা হয় নি রেখার সাথে। তাই বৃষ্টিতে ভিজে  যখন রেখার কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল ।গ্রামের রাস্তায় অসম্ভব  পিচ্ছিল রাস্তা ছিল ।তার ওপর কাদা ।অনবরত  পা ,মাথা দিয়ে টপটপ করে জল পরছিল । গায়ের পোষাক ভিজে একাকার। ভিজে জামা কাপড়ে একটু শীত শীত করছিল। বাজারের কতগুলো ঘর বৃষ্টির ছাঁট ঢুকবে বলে একটু করে নামানো ছিল ।বাজারের লোক নেই। দু একজন লোক ছিল। তাদের মধ্যে কেউ বিড়ি বাঁধছিল ,কেউ রাখি করছিল।কেউ হিসেব  করছিল। এসব পার করে হঠাৎ করে এসে হাজির হয়েছিল রেখাদের বাড়িতে।
দরজার কাছে এগিয়ে ডাকছিল 'কাকিমা ,কাকিমা?'
রেখার মা সাড়া দিয়ে বলেছিল 'কি হয়েছে নীল?'
নীল নিরুত্তর দেখে গেটের দরজা টা খুলে ভেতরে আসতে বলে রেখার মা। 
 নীল ভিজে একশা হয়ে গেছে ।এক্ষুনি ওর চেঞ্জ করার দরকার জামাকাপড় ।
সেদিন অবশ্য রেখার মা কিছু বলেন নি কারণ নীলের মা বাড়িতে ছিলেন না।
রেখা পাশের ঘরে ছিল হঠাৎ এই নীলের গলার আওয়াজ শুনতে পেয়ে ভেতরে ভেতরে একটা ধুকপুকানি শুরু হয়েছিল।
কতদিন যেন নীলকে দেখেনি প্রায় একযুগ সমান হবে। আসলে নীল এসেছিল রেখাকে দেখার জন্য।
এই কদিনের অনুপস্থিতিতে রেখা কতটা চেঞ্জ হয়েছে রেখা কেমন দেখতে হয়েছে সেইসব ভাবনায় মশগুল ছিল।
তাই রেখা যখন দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়ে, নীল এক ফাঁকে এসে রেখাকে দেখে নিয়েছিল ।ইশারায় কথা বলেছিল। বৃষ্টির সন্ধ্যায় আর মায়াবী আলোয় রেখার টুকটুকে ফর্সা গাল দুটো লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠেছিল।
আসলে এই কদিনে একদিন ও  নীলকে দেখতে পায় নি ।তাই তার মনের ভেতরে  ক্ষোভ দানা বেঁধেছিল খুব। কিন্তু নীলকে দেখার পর রেখার মন প্রাণ বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস আর একরাশ অভিমান এসে গ্রাস করে।
খুব রাগ হয়েছিল নীল এর উপর কিন্তু রেখা প্রকাশ করতে পারে নি।
উল্টে নীল যখন রেখাকে বলেছিল তাকে কখনো মিস করে কিনা ? রেখা নিরুত্তর ছিল। এরইমধ্যে রেখার মা নীলকে হাঁকডাক করতে থাকে বলেন '  নীল
নীল খাবে এসো?'
নীল বলেছিল  :না ,কাকিমা খাব না?'
রেখার মা বলেছিল 'কেন?'
নীল বলেছিল ' বাড়িতে গিয়ে খাব।'
রেখার মা একটু অবাক হয়ে বলেছিলেন'দিদি বাড়িতে নেই। তাই বলে  আমরা কি বানের জলে ভেসে গিয়েছি।'
মিলার কোন কথা বাড়াতে পারে নি।
হঠাৎই নীল রেখাকে একটা শাখের আঙটি উপহার দিয়ে বলেছিল   'এই ননী আংটিটা পড়বি।'
সেই আংটি আজও সে রেখে দিয়েছে। 
এইসব ভাবনার মাঝে হঠাৎ ভোলা কাকা এসে  বলল 'মামনি হল তোমার? কি এত ভাবছো বলতো ?'
রেখা বলল 'কিছু নয় তো কাকা,,।
ভোলা কাকা বলল 'তাহলে বাড়ি চলো ।ওদিকে ছোট বৌদি ডেকে ডেকে হয়রান হয়ে গেল।'
রেখা বলল ' আসলে কাকা শৈশব ,বাল্যে কাটানো  স্মৃতি কিছুতেই ভুলতে পারছি না ।তাই বারবার সেই চেনা জায়গা গুলোতে এসে বসছি।'
স্মৃতিমেদুর দিনগুলি আজও যেন কাছে ডাকে। আজ যেন রেখার একলা আকাশ থমকে গেছে রাতের স্রোতে ভেসে। এ যেন ক্লান্ত মন খুঁজেছে যখন ঘরের কোণ ,তখন যেন সে হাতছানি দিয়ে ডেকেছে।রেখার একলা আকাশ চাঁদ চিনেছে যেন তার কাছে এসে ই  ।