২৬ নভেম্বর ২০২১

সজল কুমার মাইতি





ভয়
মূল রচনা  - খলিল জিব্রান
অনুবাদ  - সজল কুমার মাইতি



কথায় বলে 
নদী সাগরে মিলনের আগে 
ভয়ে কাঁপতে থাকে।
ফেলে আসা পথ
ফিরে ফিরে দেখতে থাকে 
সেই পাহাড়ের চূড়া থেকে।
এ সেই গাঁয়ের মধ্য দিয়ে 
বনরাজির মধ্যে এঁকে বেঁকে চলা
এক সুদীর্ঘ পথ।
তারও সম্মুখে 
এক বিশাল মহাসাগরে মিলে 
অদৃশ্য হয়ে যায়।
এছাড়া তো
নদীর আর কোন পথ নাই
ফিরে যেতে পারে না।
কেউ কখনও 
ফিরে যেতে পারে না 
সম্ভব ও নয়।
নদীকে তাই
জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি 
নিতেই হয়।
সাগরে মিলন
কেবল আশঙ্কার অবসান
হয়তো ঘটবে তাই।
নদী জানতে পারবে
সাগরের সাথে মিলনই তো
মহাসাগর সৃষ্টি করে।




[ খলিল জিব্রানের জন্ম হয় 1883 সালে লেবাননে। তার জীবনের অনেকটা সময় আমেরিকায় কেটেছে। তিনি একজন লেখক ও শিল্পী। আরবি ও ইংরেজিতে তার অনেক সাহিত্যকৃতি রয়েছে। 1923 সালে তার বিখ্যাত রচনা  ' দি প্রফেট' এর জন্য তিনি খ্যাতির শিখরে পৌঁছন। 1931 সালে তার মৃত্যুর মাধ্যমে এক বিরল প্রতিভার অবসান হয়।]




মূল কবিতা 


Fear

Khalil Gibran



It is said that before entering the sea
a river trembles with fear.
She looks back at the path she has traveled,
from the peaks of the mountains,
the long winding road crossing forests and villages.
And in front of her,
she sees an ocean so vast,
that to enter
there seems nothing more than to disappear forever.
But there is no other way.
The river can not go back.
Nobody can go back.
To go back is impossible in existence.
The river needs to take the risk
of entering the ocean
because only then will fear disappear,
because that’s where the river will know
it’s not about disappearing into the ocean,
but of becoming the ocean.


[Kahlil Gibran (1883–1931) was a Lebanon-born writer and artist who became known for his mystical Arabic and English works. He earned his fame following the 1923 publication of 'The Prophet'.]

অলোক কুমার দাস




মা 


গোপনে তুমি হৃদয় মন্দিরে
কে দিলো এত সৌরভ , এতো প্রাণ,
এর সন্ধান পাইনে,
কে এলো এই গভীর রাতে?
সবই তো ঠিকি আছে
            শুধু তুমি নেই ।

আছো বিস্মৃতির অন্তরালে ।
দেখি তোমার মুখ খানি।
লাল পেড়ে শাড়িতে 
কপালে সেই টিপ,
            হাসিটাও একই রকম ।

তবে কি আমার মনের
বয়স কমে গেলো ? 
চশমা চোখে ভাবি ।
না, তুমি আমার হৃদয়ে ...!

মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন"৫২

কান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক।  তার নিত্যদিনের  আসা  যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কথা  নিয়ে  কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন  চলবে...





 টানাপোড়েন ৫২

ভাবনা


                                         কাল থেকেই মনটা খুবই খারাপ লাগছে। মনের কি দোষ? সব সময় একটা টানাপোড়েন চলতে থাকে। কি সংসারে, কি অফিসে ,কি বন্ধু-বান্ধব সর্বত্র।
ঘুম থেকে উঠে মনোজ এইসবই ভেবে চলেছে।
গতরাত্রে ভালো করে ঘুম হয় নি। সারারাত ফোনে ডিস্টার্ব করেছে তিথি। রেখার সাথে সেভাবে কথা বলা হয় নি।
রেখাটা না থাকলে সংসারটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে ফেলল। ঠিক তখনই মিলি আর তার বাচ্চারা চিৎকার করে উঠল। মনোজ তড়িঘড়ি করে ঘড়ি দেখছে ' এই যা খেতেই দেয়া হয় নি।'
 সিগারেটটা ফেলে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ছুটলো। একটা পাত্রে দুধ গরম বসিয়ে দিল। অন্য দিকে মিলির জন্য একটু খাবার বসিয়ে দিল। ঘরেতে ক্রিম ক্রেকার বিস্কিট ছিল, সঙ্গে সঙ্গে ৬বিস্কিট নিল। গরম দুধে  বিস্কিটগুলো ফেলে দিল। তারপর একটু হাওয়া করে ঠান্ডা করলো ,ঈষদুষ্ণ গরম অবস্থায় নিয়ে গিয়ে বাচ্চাদের খাওয়ালো। বাচ্চাদের খাওয়াতে খাওয়াতে মেটে সেদ্ধ হয়ে গেল। অন্যদিকে কালকের ফ্রিজের ভাতটা গরম করে নিয়ে তার সাথে মিশিয়ে ভালো করে মেখে এবার মিলিকে খেতে দিল।   
খাবার খেয়ে বাচ্চাগুলো কি সুন্দর খেলাধুলা করতে লাগলো আর মিলিও যথারীতি খেয়ে-দেয়ে একটু ঘুরতে বেরিয়ে গেল। ছোট ছোট বাচ্চাদের ,ছোট ছোট পায়ে চলা ,খেলা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে মনোজ দেখলো ।তারপর ওদেরকে একটু আদর করলো। ওদিকে ফোন বাজতে শুরু করেছে। ফোনের আওয়াজ শুনলেই আজকাল মনোজের বুক ধড়ফড় করে ওঠে।
বেশ কয়েকবার রিং হওয়ার পর মনোজ ফোনটা রিসিভ করে বলল' হ্যালো'।
রেখা বলল  'আমি রেখা বলছি।'
মনোজ বলল  'হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি বলো।
রেখা বলল ' তুমি তো আমাকে ভুলেই গেছো? তুমি তো ফোনও করলে না ।আমি ফোন করলাম তাতেও তুমি রিসিভ করলে না।
মনোজ বলল 'ফোন রিসিভ না করলে আর ফোন না করলেই ভুলে যায় বুঝি?'
রেখা চুপ করে আছে।
মনোজ বলল 'তুমি এতদিন পর বাবার বাড়িতে গেছ,তোমাকে ডিস্টার্ব করা কি ঠিক? তুমি একটু স্মৃতিচারণ করো দিনগুলো নিয়ে।'
রেখা বলল শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করো না।'
মনোজ বলল 'কেন আমি আবার কি করলাম?'
রেখা বলল 'সত্যি করে বল তো আমার কথা তোমার মনে পড়েছে, না তুমি অন্য কারো সঙ্গে গল্পে মেতে ছিলে?'9
মনোজ বলল তোমার মনে তো সব সময় ওই রকমই টানাপোড়েন চলতে থাকে।
রেখা বলল 'মোটেই না।'
রেখা বললো  'কি করছিলে এখন?'
মনোজ বলল 'তোমার সঙ্গে গল্প করছি।'
রেখাগবললো  'আরে বাবা আমার সঙ্গে গল্প করার আগে কি করছিলে?'
মনোজ বলল  'মিলি আর ওর বাচ্চাদের খেতে দিচ্ছিলাম।'
রেখা বলল  'ওরা সবাই ঠিক আছে তো?'
মনোজ বলল  ,কেন আমার ওপর তোমার বিশ্বাস নেই।'
রেখা বললো 'নাইনটি নাইন পারসেন্ট'।
মনোজ বলল ' এক পারসেন্ট নয় কেন?'
রেখা হেসে বলল ' মাঝে মাঝেই একটা ফোন এসে যে তোমাকে ডিস্টার্ব করে,.?'
মনোজ বলল  'কবে আসবে?'
রেখা বলল  'ভেবেছিলাম আরো দুদিন থেকে যাব।'
মনোজ বললো 'থেকে যাও।'
রেখা বলল " কি করে থাকবো? স্কুল খুলে যাচ্ছে তো?'
মনোজ বললো 'সেটা অবশ্য ঠিক।'
রেখা বলল  'কবে নিতে আসবে?'
মনোজ বলল  'কবে আসবে বলো?'
রেখা বলল '১৫ তারিখ?'
মনোজ বলল 'ঠিক আছে ।আমি পার্থকে বলে  গাড়ি পাঠিয়ে দেবো।
তুমি রেডি হয়ে থেকো।'
রেখা বলল  'ok'
মনোজ বলল' কেমন লাগছে ওখানে?'
রেখা বলল 'খুব ভালো লাগছে। এখনো তো গ্রাম ঘুরতে পারি নি ,বৃষ্টি হচ্ছে?'
মনোজ বললো 'আমাকে ছেড়ে তো দিব্যি আছো? অথচ বল তুমি আমাকে ছেড়ে থাকতে পারো না?'
রেখা বলল  'কেন সে কথা কি মিথ্যে বলেছি নাকি?'
মনোজ বলল 'গিয়ে অব্দি তো সে ভাবে ফোনই করলে না?'
রেখা বললো' তুমি যেন কত করেছ?'
মনোজ বলল 'সেই তো ,যত দোষ নন্দ ঘোষ'।
রেখা বলল 'সোমু ফোন করেছিল তোমাকে?'
মনোজ বলল-'হ্যাঁ ,পরে দেখলাম।'
রেখা বলল 'ও আমাকেও ফোন করেছিল?'
মনোজ বলল'কেন কি বলছিল'?
রেখা বলল 'সে অনেক কথা।'
মনোজ বলল  'আজ ওর কোর্টের ডেট ছিল?'
রেখা বলল  'আমাকে তাই বলল? তোমাকে জানাতে ।তুমি যেতে পারবে কিনা?'
মনোজ বলল 'চেয়েছিলাম যেতে কিন্তু কি করে যাব বল? আজ যেতে পারি নি।'
রেখা বলল 'ও এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ডিভোর্সটা কে নিয়ে...। ওকে ব্যাপারটা নিয়ে বললাম একটু ভাবতে তাই এমন কথা শোনাল আমাকে?'
মনোজ বলল  ,'আর তাছাড়া ভালো লাগে না ।জান  তো কোর্টে যেভাবে বলা হয় ,ওর তো সে ব্যাপারে কোনো লজ্জা ঘেন্না নেই।'
রেখা বলল  'ফোনেতে যেভাবে নির্লজ্জের মতো বলছিল..।'
মনোজ বলল  'কাকিমা কাকু কিছু বলছিলেন না?'
রেখা বলল ' তা আর বলছিলেন না?'জন খাট
কাকিমা বললেন  'কিরে ননী, জামাই ফোন করেছে?'
রেখা বলল 'হ্যাঁ কাকিমা।'
কাকিমা বললেন  'জামাই কবে আসবে আগে থেকে যেন জানায় ।আমি সেই ভাবে রান্না করবো।'
রেখা বলল 'শুনতে পাচ্ছ তো কাকিমার কথা?'
মনোজ বলল ' আমি তো যাবো না কাকিমাকে বলে দাও।'
রেখা বলল  'কাকিমা ,ও তো আসবে না?'
কাকিমা বললেন আসবে না মানে তোকে তো একা ছাড়বো না?
রেখা বলল ' না কাকিমা, ও গাড়ি পাঠিয়ে দেবে।ওর একটু অসুবিধা আছে?'

কাকিমার কথাটা শুনে মন খারাপ হে গেল আর বললেন' আগেরবারও এসে কিছু খেলো না এবারও যা ভালো বুঝিস তোরা করিস?'±

রেখা বলল 'তুমি এত টেনশন করো না তো? ঠিক আছে ফোনটা ছাড়ছি। মিলি ওর বাচ্চাদের ঠিক সময়ে খেতে দিয়ে দিও আর তুমিও ঠিক সময়ে খাবার খেয়ে নিও।'
মনোজ বললো ok
মনোজ এবার ফোনটা রেখে টানটান হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। কি মনে হতেই আবার উঠে বসল ।বালিশের পাশটা থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে সিগারেট ধরালো ।সে ভেবেছিল একটু ঘুমিয়ে নেবে কিন্তু ঘুম তো আসবে না রাগটা না থিতলে । রেখা কেও কথাটা বলতে পারলাম না। তিথি কেন আমার সঙ্গে এরকম করছে। সিগারেটটা ধরিয়ে জানলার কাছে এসে দাড়ালো হঠাৎই চোখ আটকে গেল মনোজের চৈতিদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে। চৈতি কেন বারবার চোখের জল মুছছে? সেদিন রেখা বলছিল চৈতির মা এসেছিল কিছু কথা বলতে? তাহলে কি খুবই সমস্যায় পড়েছে?'
ভাবতে ভাবতে মনোজ সিগিরেটাটা শেষ করল। ইতিমধ্যে দেখতে পেল রোগা একজন ভদ্রলোকে চৈতি দের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসলেন।
কেএই ভদ্রলোক? যে হয় হোক, চৈতিদের চেনা-জানা লোক ছাড়া অন্য কেউ হবে না।'
মনোজের গা টা ম্যাজম্যাজ করছেো ।খুব ভোরে বিছানা ছাড়া তো কোনো দিনের অভ্যাস ছিল না। ছোটবেলায় বাবা-মার কাছে এর জন্য কত বকা শুনেছি
হঠাৎই আকাশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে শিকড় গজিয়েছে বিদ্যুৎ। তার ঝলকানিতে চমকে উঠছে প্রকৃতি।
মনোজ জানলার ধারে দাঁড়িয়ে ভাবছে তাদের দাম্পত্য জীবনের সুখ স্মৃতি কথা।

রাবেয়া পারভীন এর ছোট গল্প" স্মৃতির জানালায়"৩য়





স্মৃতির জানালায়  
( ৩য় পর্ব)  

 
সংসারে উদাসীনতার জন্য রেহানা  মাঝেমাঝে অভিযোগ করে  বলে 
- আপনিতো চিরকাল  নিজের কাজ নিয়ে থাকলেন  আমার দিকে তো আর তাকিয়ে দেখলেন না
মৃদু হেসে মাহ্তাব  সে সব কথার জবাব দিয়ে দেন। রেহানা বড় ভালো মেয়ে। সহজ সরল। এমন পতি পরায়না স্ত্রী  খুবই বিরল। কিন্তু তারপরও কি মাহ্তাব সুখি হয়েছেন ?  যখনি রেহানার কথা ভাবেন  তখনি বিদ্যুৎ  ঝলকের মত  তার চোখে ভেসে উঠে অনেক দিন আগে হারিয়ে যাওয়া এক নারীর মুখ। ব্যাথায় টন্ টন্ করে উঠে বুকের বাম পাশটা।  একটা দীর্ঘশ্বাস  পড়ল  সমস্ত  বুক কাঁপিয়ে। শবনম!  এক অসাধারণ নারীর নাম। উচ্চশিক্ষিতা  ব্যাক্তিত্বসমন্না অপরূপ সৌন্দর্য, কি ছিলোনা তার!  চমৎকার গানের গলা।  খুব ভালো কবিতা লিখতো  সে।  প্রতিটা কবিতা কাগজে ছাপতে দেয়ার আগে মাহতাবকে পড়ে শোনাত । মন্ত্রমুগ্ধের মত  তাঁর কাছে বসে কবিতা শুনত মাহতাব আর মুগ্ধ  হয়ে সেই কবিতা পাঠরতা অসাধারণ রমনীর  মুখাবয়বের দিকে চেয়ে থাকত। কবিতা পড়া শেষ হবার পরেও দৃষ্টি  ফিরতোনা। মিষ্টি  লাজুক  হাসি হেসে শবনম বলত
- এমন করে তাকিয়ে  আছো কেন ?  কবিতাটা কেমন হয়েছে বলবে না?
 কি বলবে মাহ্তাব,  বলার ভাষা যে হারিয়ে যেত। আহা শবনম !  সেই শবনম!   এতো বছর পরেও  যার স্মৃতি  এতটুকু ম্লান হয়নি।  পিতার খুশির দিকে চেয়ে তিনি ত্যাগ করেছিলেন  শবনমকে। পিতার পছন্দে  বিয়ে করেছিলেন  অল্পশিক্ষিতা  অতিসাধারণ এক গ্রাম্যবালা  রেহানাকে। পিতাকে কষ্ট দেওয়ার কথা তিনি ভাবতেই  পারেন নি। উফ্ কেন যে  ঘুরে ফিরে আজকে আবার এসব মনে পড়ে গেল?  অফিসে  এসে চেয়ারে বসে  পিছনে হেলান দিয়ে তিনি চোখ বুজে রইলেন। তাঁর মন হু হু করে ছুটে চলে গেছে  পঁয়ত্রিশ  বছর  পেছনে।


 চলবে......

শাহীন রহমান





ফিরে এসো ব্যথারছলে


কুসুম বীথি ভরবে যেদিন,আকুল হয়ে ফাগুন বনে, 
সেদিন 'প্রিয়' ফিরে এসো, ফুলেল পথে আমার ঘরে। 
উঠোন জুড়ে জ্বলবে সখা,রঙবেরঙা মোমের আলো,
শুন্য গৃহ রাখবো আমি, গভীর ভালোবাসা'য় ভরে। 

অনেক দিনের বিরহ'তে,পথটা তোমার হয় যদি ভুল,
ধুলোয় ঝরা পলাশ ফুলে,বাড়িয়ে দিয়ো রাঙা চরণ। 
ডাহুক যুগল গান শোনাবে,জোনাকি'রা দেখাবে পথ,
জোছনাধোয়া কোমল রাতে,শেফালী'রা করবে বরণ। 

গল্প হবে অনেক সখা,হারিয়ে যাওয়া সেসব দিনের, 
শাওন রাতে অঝোর ধারায় বৃষ্টি ভেজা টিনের চালে 
অশ্রু ঝরা কপোল খানি ভাসিয়ে নিতো ঝুম বরষায়,
নীড়হারানো বেজোড় ঘুঘু,ভিজতো বসে কদম ডালে। 

ওই দূরের ঘাটে খেয়ামাঝি হাকতো বসে,কে পার হবা ? 
আকাশ ছোঁয়া ব্যথা নিয়ে,গুড়গুড়িয়ে ডাকতো দেয়া। 
স্বজন হারা একলা বুড়ী,ক্ষুধায় কাতর জাগতো নিশি,
এমনি করেই হারিয়ে যেতো,এই জীবনে কালের খেয়া। 

সখা,ফিরে এসো ফিরে এসো,এসো 'প্রিয়' আমার ঘরে, 
এই বিরহীনি একলা জাগে,কপোল ভেজে অশ্রুজলে। 
কত ফাগুন পেরিয়ে গেলো,শিউলি ঝরা ভোরের মত,
ফিরে এসো প্রাণের দোসর,ফিরে এসো ব্যথার ছলে।

রুকসানা রহমান




নীলহংসী শূণ্যে পাল টানে


দুঃখের আড়ালে কেশদাম উড়িয়ে সোনালী কাঁচুলি বেঁধে, নীলহংসী শূণ্যে পাল টানে কিসের আহব্বানে।
আবেগী,স্বপ্নের কি সীমারেখা আছে। 
কেন জ্বলে উঠেছিলো ঝলসানো রৌদ্রময়তা তাবুতে ?
যে অনিঃশেষ মোহমায়া বন্ধনে,স্লেজ ঠেলে নিয়তির
পোষ্টারে এঁকে গেছে দহন...
তবুও কিসের আসায় রাত্রি ভাষায় খোঁজে অমৃত প্রেম ?
ভুলের হাহাকারে পড়ে থাকে মন ছেঁড়া
শূণ্যপালে।

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক গল্প "অলিখিত শর্ত" পর্ব ২০

 স্বপ্নসিঁড়ি সাহিত্য পত্রিকার পাতায় লেখক শামীমা আহমেদ'র  নতুন ধারাবাহিক  উপন্যাস "অলিখিত শর্ত"




শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত 
                                              (পর্ব ২০)
   শামীমা আহমেদ 



                                                     সন্ধ্যায়  লক খুলে শিহাব ঘরে ঢুকেই সোফায় বসে পড়লো। শরীরে রাজ্যের ক্লান্তি! কত যে দৌড়াদৌড়ি গেলো সারাটাদিন! 
মোবাইলটা  হাতেই ধরা ছিল। কোন দ্বিধা না করেই সে শায়লাকে মেসেঞ্জারে কল দিল। 
যেন সারাদিনের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো শায়লাকে জানাতেই হবে।
শায়লা মায়ের সাথে  ড্রয়িংরুমে সন্ধ্যার  চা নিয়ে বসেছে  সাথে মুচমুচে পাপড় ভাজা । সামনে টিভি চলছিল। 
মেসেঞ্জার কলে শিহাবের মুখ ভেসে উঠল।  শিহাবের নাম দেখে  শায়লা দ্রুত মায়ের কাছ থেকে উঠে নিজের ঘরে চলে এলো।রিসিভ করতেই শিহাব জানতে চাইলো,
সকালে ভালোভাবে বাসায় পৌছে ছিলেন তো?
শায়লা সারাদিনে সকালের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। মনে পড়তেই বলে উঠলো, আরে হ্যাঁ হ্যাঁ,এখান থেকে এখানে, এতো চেনা পথ।
আপনি কখন এলেন?চা খেয়েছেন?
এইতো সবেমাত্র ঘরে ঢুকেছি।সেই যে সকালে বেরিয়েছি নানান সব কাজ সেরে মাত্র ফিরলাম।
আজ গাজীপুরে ফ্যাক্টরিতে গিয়েছিলাম।এতো দিক দেখতে হয়! এক কর্মচারীর,কাজ করতে গিয়ে মেশিনে হাত ইঞ্জুরি।তাকে নিয়ে সারাদিন হাসপাতাল ডাক্তার থানা পুলিশ করা।আর সাংবাদিকদের খোঁচাখুঁচিতো  আছেই। সারাক্ষণ টিকটিকির মত লেগে থাকে। এমনিতে কোন খোঁজ থাকে না, কিন্তু মালিক পক্ষের বিপক্ষে কিছু লিখতে হলে তখন সবার আগে ক্যামেরা  নিয়ে হাজির। আরে সব টাকা খাওয়ার ধান্দা,বুঝলেন! সারাটাদিন লেগে গেলো সব কিছু সমাধান করতে। তা আপনি কেমন আছেন?
শায়লা বুঝতে পারছে,,শিহাব খুবই ক্লান্ত।তাইতো এত লাগামহীন কথা বলছে।এই সময়টা তার পাশে কেউ থাকা খুব প্রয়োজন।
শায়ল চুপ করেই রইলো।শিহাব এক নিঃশ্বাসে সব বলে যাচ্ছিল।বেশ হাঁপাচ্ছিল।
শায়লার খুব মায়া লাগল।আহা, মনের ভেতর কত কথা জমে আছে, কাকে বলবে? ঘরে ফিরে সারাদিনের ঘটে যাওয়া কথাগুলো অন্তত  শোনার জন্যতো একজন মানুষ  থাকতে হয় । আরে ঝগড়া করতেও তো একটা মানুষ লাগে।
শায়লার চোখে পানি চলে এলো।কোথায় যেন কষ্টের কাঁটা বিঁধলো।
শুধু খুব আস্তে করে  বললো, ঠিক আছে, ফ্রেশ হয়ে একটু বিশ্রাম করেন। একটু চা বানিয়ে বসে টিভি দেখেন।
শিহাবের কানে যেন কথাটা পৌছুলো না।
আচ্ছা, কিছু মনে না করলে একটা কথা বলতে পারি?
অবশ্যই, বলুন,
আপনার ফোন নাম্বারটা কি দেয়া যাবে?সব জায়গায় তো আর নেটওয়ার্ক থাকে না। সারাদিন খুব ইচ্ছে করছিল আপনাকে সবকিছু জানাই। ওয়ার্কাররা একেবারে তেড়ে আসছিল।
শায়লা বুঝে নিল সারাদিন তার যেমন গেছে  শিহাবের হয়তো তেমনি অনুভব হয়েছে।প্রতিটি মূহুর্তে তার শিহাবের কথা মনে পড়ছিল।শায়লা ভেবেছিল বুঝি তারই এমনটি হচ্ছে।
আচ্ছা,আমি নাম্বার লিখে দিচ্ছি।
শিহাব জানালো, আর হ্যাঁ,আমার নাম্বার শেষে টু ফাইভ সিক্স।
আচ্ছা রাখছি।
শায়লা একেবারে স্থির হয়ে বসে রইল।চোখ বন্ধ করে সে শিহাবের কিচেনে নিজেকে ভেবে নিল।চুলায় চা বসিয়েছে আর শিহাব বারান্দায় চায়ের জন্য অপেক্ষা করছে।বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। বারান্দার গাছগুলো বৃষ্টির পানিতে ভিজে একাকার।ঘরে শিহাবের প্রিয়  গজল  হালকা টোনে বাজছে।চায়ের সাথে পাপড় ভাজা হয়েছে। শিহাবের খুব প্রিয়! যখনি দেয়া হবে তখনই বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলবে! শায়লা কেনাকাটায় পাপড় আনতে ভুলে না।কারণ শিহাবকে চমকে দিয়ে খুশি করা,শায়লার এই দৃশ্যটা খুব পছন্দের!
শায়লার দু'গাল বেয়ে বৃষ্টিধারা নেমে এলো।নিজেকেই  নিজে জিজ্ঞেস করে,কেন এমন হয়? যার যেখানে থাকবার ইচ্ছে সে কেন সেখানে পৌছুতে  পারে না?
সন্ধ্যায় শায়লার ঘরের বাতিটা দেয়া হইনি।অন্ধকার ঘরে একা বসে শায়লা।দু'দিন আগেও অজানা অচেনা একটা মানুষের জন্য এমনভাবে অনুভব করবে শায়লা, তা কখনোই ভাবেনি। 
রাতের খাবার পর্ব শেষ  করে শায়লা ঘরে এলো।অচেনা একটা নাম্বার থেকে কল এলো। শায়লা শেষ ডিজিট তিনটি মিলিয়ে নিলো।টু ফাইভ সিক্স। শিহাবের নাম্বার। 
শায়লা রিসিভ করেই জানতে চাইলো, রাতের খাবার খেয়েছেন তো?নাকি আলসেমি করেছেন?
না খেয়েছি।
মা অনেককিছু রান্না করে পাঠিয়েছেন।
বৃদ্ধ মাকে কেন এত কষ্ট দিচ্ছেন?
মা ইচ্ছে করেই এসব করে
একা ছেলের জন্যতো করবেই,মায়েরাতো ছেলেকে বউয়ের হাতে তুলে দিয়ে বিশ্রাম নিতে চায়।
কি আর করা? আমার মায়ের সে ভাগ্য নেই।থাক সে কথা।আপনার কথা বলেন।

শায়লা নিজেকে আর আড়ালে রাখতে চাইল না।যদিও এমন কোন সুন্দর অতীত বা বর্তমানকে ঘিরে তার জীবন চলা নয়,তবু শিহাবতো আপন হয়ে এগিয়ে এসেছে,  তাকে কিছু বলেতো হালকা হওয়া যায়।
জীবনে কাউকে না কাউকে তো আপন ভেবে নিতে হবে।নয়তো একটা মানুষের বেঁচে থাকা অসম্ভব।সে দম আটকে মারা যাবে।খুব অল্পদিনের পরিচয়ে শিহাব তার খুব আপনজন হয়ে উঠেছে।
শায়লা আর কোন ভুমিকা না করে তার জীবনে ঘটে যাওয়া নির্জলা সত্যটা খুলে বললোএবং সে যে এখন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে সেটাও জানালো।
সবটা শুনে শিহাব এতটুকু অবাক হলো না।তার নিজের জীবনের চলা দিয়েই বুঝেছে এই পৃথিবীতে যেমন বিচিত্র মানুষ আছে তেমনি বিচিত্র তাদের জীবনকাহিনী। তবে কেউ পরিপূর্ণভাবে সুখী নয় এটা  বলা যায়।সবটা শুনে শিহাব শায়লাকে কানাডায় যাওয়ার ব্যাপারে মতামত দিল। দুটো ফুটফুটে  শিশু মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত  হচ্ছে।একজন পিতা তাদের জন্য একজন মা এনে দেয়ার চেষ্টায় সাত সাগর পেরিয়ে এসেছে।শিহাবের চোখে  আরাফের মুখটা ভেসে উঠল।  আরাফও তো মায়ের আদর বঞ্চিত।বাবা হয়ে সে কিছুই করতে পারছে না।শায়লার মাঝে মাতৃসুলভ একটা মায়া জড়িয়ে আছে। 
শিহাবকে খুবই পজিটিভ মানুষ মনে হলো।
শায়লা  ভাবলো অন্যের সমস্যা খুব দ্রুতই সমাধান করা যায়। কিন্তু শায়লাতো শিহাবের মতই একজন,,  না না ছি! এসব কি ভাবছে।
আড়ালে থেকেও শিহাব যেন শায়লাদের পরিবারের একজন সদস্য হয়ে উঠেছে। এমনভাবে নিয়মিত যোগাযোগে আছে যেন শায়লার  খোঁজখবর নেয়াটা তার দায়িত্বে পড়ছে। শায়লাও কল্পনায় কল্পনায় একাকী এই মানুষটার ছায়াসঙ্গী হয়ে উঠেছে,যেন টেবিলে খাবার সাজিয়ে প্লেটে খাবার তুলে দেয়ার অপেক্ষা করছে। 



চলবে....

শামরুজ জবা




ভুল প্রেম


কত প্রাণ দেখলাম এ ধরায়
 কত বিরহে, কত আনন্দে 
কত বসন্তে- বৈশাখে- বরষায়, 
সুখে- দুঃখে কত হাস্য- লাস্য উপমায়! 
এ এক আশ্চর্য  সম্পর্ক-
স্বপ্নে- গন্ধে অপরূপ মধুরিমায়।

প্রেমিক যে জন বেসেছে ভাল
দেখেছি দিনশেষে-
চোখে তার ঘন রাতের কালো
কখনো আবার বিপুলা অশ্রু রাশি রাশি, 
কখনো অকারণ জীবনের বলিদান;
আস্থা- অহম রুগ্ন- শীর্ণ পরবাসী-
কোন এক অচেনা মোহনায়
জানিনা এর শেষ কখন কোথায়।

কখনো অজান্তে-
ঋষিবর প্রেমিকের অবুঝ চোখের জলে 
আমার দুটি চোখ ভেসেছে ব্যথায়
জ্বলেছে বুনো আগুন কোমল বুকের তলে। 
ভেবেছি একা-- কোন সে মোহ মায়ায়
নিরন্তর ভাসা এই ভালবাসায়!

মাঝে মাঝে মনে হয়--
বহু মানবের প্রেম দিয়ে ঢাকা, 
বহু দিবসের সুখে- দুঃখে আঁকা
এই প্রেম প্রেম খেলার করি প্রতিবাদ;
আবার ভাবি গোপনে নিরালায়--
কেন মিছে এত ক্রোধ, এত দ্রোহ?
যার যা আছে থাক না তা থাক-
ধীর পায়ে নেমে আসা শুদ্ধতায়।

 আজ বলি আপনার মনে একা-
থেমে যাক ভুল প্রেম, ব্যথা- ক্রন্দন
সত্যালোকে ভরে থাক জীবন
 ছিঁড়ে যাক মরীচিকাময় মিছে বন্ধন।

২৫ নভেম্বর ২০২১

কবি জাফর রেজা কবিতা



শাড়ি


আপনি শাড়ি পরেন না কেনো
শাড়িতে আপনাকে খুব মানাবে
আর যদি কপালে থাকে একটি লাল টিপ 
আরও অনেক- অনেক...
বাকিটুকু আর বলতে পারলাম না হয়তো সে বুঝে নিয়েছে। 

শাড়ি আমি সেদিনই পরবো
যেদিন আপনি থেকে তুমি হবো। 

তারপর শুরু হয় আমার অপেক্ষা 
ধানসিঁড়ির পাড়ে বসে বসে ভাবি
সেদিনের পর থেকে সে কেনো আসেনা ? 
নিজেকে প্রবোধ দেই তার আসা না আসায় আমার কি যায় আসে?
কিন্তু ভাবনাটা মন থেকে তাড়াতে পারিনা
তার অপেক্ষায় থাকি।
নাহ্, এবার তাকে তুমি বলেই ডাকবো। 
প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে সে এলো
পরনে ঢাকাই শাড়ি কপালে লাল টিপ।
এতোদিন কোথায় ছিলে ? 
কতোদিন তোমার অপেক্ষায় । 

এই জন্যই আসিনি, 
জানতাম আজ তুমি বলবে। 
কষ্ট যে আমার হয়নি তা নয়
কষ্ট আমারও হয়েছে,
কিন্তু তোমার তুমি ডাকের জন্য
কষ্টটা সামলে নিয়েছি। 

আকাশের নিচে ধানসিঁড়ি
ধরনীতে মুখোমুখি আমরা দুজন।

মমতা রায় চৌধুরী





টানাপোড়েন ৫১
বিরক্ত






                                                   ঠাৎ রেখার ফোনে ফোন বেজে উঠলো"দুর্গে দুর্গে দুর্গতিনাশিনী মহিষাসুরমর্দিনী জয় মা দুর্গে'। রিং হয়ে কেটে গেল। আচ্ছা জ্বালাতন মূলত এ বাড়িতে এসে একটু ভালো করে ঘুমাতে পারবো না। কাঁথাটা মুড়ি দিয়ে ,আবার শুয়ে পরল। 
আবারো রিং হয়ে যাচ্ছে ।
বাধ্য হয়েই রেখাকে ফোনটা রিসিভ করতে হলো' ।বলল-হ্যালো"।
অপরপ্রান্ত থেকে বলল  'দিদি  জামাইবাবু আছে?'
রেখা বলল  'কে রে সোমু?'
সোমদত্তা বলল"হ্যাঁ দিদি।'
ততক্ষণে কাকিমা এসে হাজির। কাকিমা ইশারায় বোঝাতে চাইলেন ,সোমু হলে ,তুই এখানে আছিস বলবি না।
রেখা ফোনটা মিউট করে বলল ' কি করে বলব ?এবার তো জানতে চাইবে জামাইবাবুকে ফোনটা দে। তাহলে কি বলবো?'
কাকিমা ইশারায় বোঝাতে চাইল' কায়দা করে কিছু একটা বলতে।'
রেখা বললে ' কেন রে?":
সোমদত্তা বলল 'আজকে কেসের ডেট আছে না?'
রেখা এবার হ্যালো হ্যালো করে শুনতে না পাবার নাটক করলো।
কাকিমা ওদিক থেকে হাসতে লাগলো। কাকিমা যে সোমুর ওপর ভীষণ বিরক্ত বোঝা গেল।
ফোনটা ছেড়ে রেখা কাকিমাকে বলল'এবার তো মনোজকে ফোন করবে ।ও যদি বলে দেয়।'
কাকিমা বলল' বলে বলুক গে।'
রেখা মনোজকে ফোন করল। মনোজের ফোন রিং হয়ে গেল। ধরল না।
রেখা  'ভাবলো ৯টা বাজে,।ও  কি করছে?''
আবার ফোন করল রিং হয়ে গেল।
কাকিমা জিজ্ঞেস করলেন "কিরে জামাইকে ফোন করছিস?'
রেখা বলল" হ্যাঁ,কিন্তু রিং হয়ে গেল জানো কাকিমা?'
কাকিমা বললেন 'চিন্তা করিস না। পুরুষ মানুষ ।দেখ কিছু একটা করছে হয় তো ,শুনতে পায় নি।'
রেখা বলল  'গতকালকেও তো ফোন করি নি ।ফোনটা করা উচিত ছিল কাকিমা ।কি করছে ,কে জানে?'
কাকিমা বললেন 'আয় তো ননী ,জল খাবারটা খেয়ে নে'।'
রেখা বলল  'কাকুকে আগে দাও।'
কাকু বললেন সবাই একসাথে খাব। কেউ কারোর আগে-পরে নয় ,আয় ননী।‌'
রেখা বলল 'আজ জলখাবারের কি মেনু কাকিমা?'
কাকিমা বললেন ,' হিঙের কচুরি আর হচ্ছে আলু চচ্চড়ি।'
রেখা বল ল  'দারুন ব্যাপার। ছুটে গিয়ে আগে একটা গরম পুরি তুলে নিয়ে খেতে শুরু করল।
কাকিমা বললেন 'এই তো আমরা পুরনো ননী ফিরে পেলাম'
কাকু উৎসুকভাবে  বললেন ' কেন কি করেছে ননী ? 
কাকিমা বললেন ও যখন ছোট ছিল। আমরা যখন বাড়িতে ওর পছন্দ মাফিক কোন খাবার বানাতাম। তখন কি করত?'
কাকু হো হো করে হেসে বললেন  'দু'চারটে তুলে নিত।'
কাকিমা বললেন 'ওটা দেখে আমার সেই ছোট্টবেলার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল।'
কাকু বললেন  'একবার মনে আছে ওর মা এজন্য কে একদিন মেরেছিল?'
কাকিমা বললেন  'মনে আর নেই।এক চোখে হাত দিয়ে চোখের জল মুছছিল, আর এক হাত দিয়ে খাচ্ছিল।'
কাকু বললেন 'তখন আমরা ওর কান্নার আওয়াজ শুনে কি করেছিলাম?'
কাকিমা বললেন  'এসে খুব বকাবকি করছিলে তোমরা আমাদের ওপর?'
কাকু বললেন ' আর কি?'
কাকিমা বললেন  'ওর খাবার ইচ্ছে মঞ্জুর হয়ে গেছিল যখনই কিছু হবে ও খেতে চাইলে ওকে দিতে হবে।''
রেখা বলল  'আর সেই নিয়ে সোমু আমার সাথে কি ঝগড়াটাই না করেছিল।'
কাকিমা বললেন  'সেই দিনগুলো কত ভালো ছিল বল?'
কাকু বললেন 'একান্নবর্তী পরিবার দাদা ভাইয়ের সম্পর্ক কত দৃঢ় ছিল।'
কাকিমা বললেন 'পরস্পর পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ,আস্থা ,ভালোবাসা পরিবারকে কতটা এগিয়ে নিয়ে যেত।'
রেখা খেতে খেতে বলল' অথচ কাকিমা দেখো আমরা জয়েন্ট পরিবারের মেয়ে হয়েও যে পরিবারে বিয়ে হয়ে গেলাম ।সেখানে কোন মূল্য নেই।'
কাকিমা বললেন  'মন খারাপ করিস না মা।'
আবার ফোন বেজে উঠলো' দুর্গে ,দুর্গে, দুর্গতিনাশিনী মহিষাসুরমর্দিনী জয় মা দুর্গে...'।
কাকিমা বললেন 'এবার তোর রিংটোনটা আমার জানা হয়ে গেল।'
রেখা বলল 'বোধহয় তোমাদের জামাই ফোন করেছে।'
রেখার আবার ফোন বেজে উঠল।
রেখা ফোন ধরে বলল 'হ্যালো বলো।'
সোমদত্তা বলল ' দিদি আমি।'
রেখা  মিউট করে কাকিমাকে বলল  'কাকিমা সোমু ফোন করেছে, কি বলব ( ইশারায়)?'
কাকিমা বললেন ' কি বলি বল তো ?যদি সেরকম কিছু জিজ্ঞেস করে বলে দে আর কিছু বলার নেই।'
রেখা বলল  'হ্যাঁ বল।'
সোমদত্তা বলল 'জামাইবাবুকে তো পেলামই না ফোনে ।তাহলে কি আজকে কোর্টে  আসতে পারবে না জামাই বাবু?'
রেখা বলল ' তুই তো আমাকে আগে জানাস নি কোর্টের  ব্যাপারে? আমি তো কিছু জানি না ।'
সোমদত্তা বলল ' কি জানি আজকে ফাইনাল ডিসিশন নেবেন কিনা জজ?'
রেখা বলল  'এসবের কি দরকার ছিল সোমু?'
সোমদত্তা বলল তুই বুঝবি না দিদি?
রেখা বলল  'আমার বুঝে কাজ নেই বোন? তবে তুই যেটা করছিস, সেটা মোটেই ঠিক করলি না?'
সোমদত্তা বলল  'দিদি ,আমি তোর কাছ থেকে কোন এডভাইস চাই নি।'
রেখা বলল 'আমি তোর ভালোর জন্যই বলছি ,এখনো সময় আছে।'
সোমদত্তা বলল ' আমার পক্ষে ফেরা সম্ভব নয়?'
কাকিমা নিজেকে কন্ট্রোলে না রাখতে পেরে বললেন 'অসভ্য মেয়ে কোথাকার? কি করে আমার পেটে জন্ম নিয়েছে জানি না।'
রেখা বলল  'কাকিমা তুমি চেঁচিয়ো না ।তোমার প্রেসার বেড়ে যাবে।'
সোমদত্তা বলল ' তুই ওখানে আছিস? ভালোই
আছিস তাই না?'
রেখা বলল  'বাবার বাড়িতে আসলে সবাই ভালই থাকে বোন। তুইও চলে আয়।''
সোমদত্তা বলল ' বাড়িটা কি আর আমাদের জন্য ?আমরা নিজের মেয়ে হয়েও এত আদর পাই না। আর তুই...?'
রেখা বলল ' সেটা তোর দুর্ভাগ্য।'
সোমদত্তা বলল  'তোর কপালটা সবদিক থেকেই ভালো দিদি।'
রেখা বলল  'তোকে একদিনই বলেছি এডজাস্ট করতে শেখ।'
কাকিমা বললেন'একই বাড়ির মেয়ে হয়ে দিদির কাছ থেকে কিছু শিখতে পারো নি? শুধু বড় বড় কথা।'
সোমদত্তা বলল'ছোট থেকেই দেখে আসছি দিদিকে সবাই বেশি পছন্দ করে।'
কাকিমা বললেন 'পছন্দ করার মত ওর অনেক গুণ আছে তাই?'
এর মধ্যেই পাবলো বায়না ধরেছে দিদুনের সাথে কথা বলব ?ফোনটা আমাকে দাও মাম মাম।'
সোমদত্তা বলছে' আমাকে বিরক্ত করো না ।মার খেয়ে মরে যাবে তুমি।'
রেখা বলল  'এসব কি বলছিস তুই সোমু'?
সোমদত্তা বলল 'ঠিকই তো বলছি দিদি ।বড়দের সঙ্গে কথা বলার সময় ছোটরা কেন কথা বলবে?'
রেখা বললো ' আহা,ঠিক আছে ।তুই অন্য সময় ওকে এগুলো শেখাবি ।এখন তোর বাবাকেও কাছে পাচ্ছে না ।একটু দিদার সাথে কথা বলবে দে না ফোনটা?'
সোমদত্তা বলল 'তোমার তো বাচ্চাকাচ্চা হয় নি। তুমি বুঝবে কি করে?'
কাকিমা রেখার কাছ থেকে ফোনটা নিয়ে বলেন ''তুমি তো একদম সার্থক মা হয়েছ, তুমি তো সব বোঝো?'
সোমদত্তা বললো  'মা ,তুমি আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলবে না?'
কাকিমা বললেন 'তোমাকে তো কেউ ফোন করতে যাই নি ।তুমি কেন সবাইকে বিরক্ত করো ফোন করে।'
সোমদত্তা বলল ' দরকার ছিল বলেই করেছি ।না হলে করতাম না।'
কাকিমা বললেন  'সে জন্যই তো বলছি ,দরকারের সময় তোমার মনে পড়ে,। বাকি সময়েগুলো তো তোমার মনে পড়ে না কিছু?'
রেখা বলল  'কাকিমা ছেড়ে দাও।ও তো ছোট ,বুঝতে পারছে না।'
কাকিমা বললেন  'তুই থাম তো ননী ।বড্ড বাড় বেড়েছে ওর।'
সোমদত্তা বলল  'সামনের সপ্তাহে আমি পাবলোকে  তোমার কাছে রাখতে যাচ্ছি।'
কাকিমা বললেন ' খবরদার এমুখো হবে না।'
সোমদত্ত বলল  'মা?'
কাকিমা ফোনটা কেটে দিলেন। কেঁদে ফেললেন।
রেখা কাকিমাকে ধরে বসালো।
কাকিমাকে কেদেঁ কেঁদে বললেন  'কি শত্তর জন্ম দিয়েছি রে ননী?'
রেখা বলল ' সব ঠিক হয়ে যাবে কাকিমা ।তুমি এত কষ্ট পেয়ো না।'
কাকু ও ঘর  থেকে বলেন  'কী হয়েছে রে ননী?'
রেখা বলল  'কিছুই না কাকু?'
কাকু আবার বললেন 'কাকিমার চেঁচানোর আওয়াজ পেলাম। নিশ্চয়ই সোমু ফোন করেছিল ‌। '
রেখা আর কাকিমা চুপ করে রয়েছে।
কাকু আবার উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন' 'বলতে পারিস ননী ও সবাইকে কেন এত বিরক্ত করে ্?''
কাকিমা বললেন ' তুমি  অস্থির হোয়ো না ।শরীর খারাপ হবে?'
কাকু বললেন 'আমার এই দুই সন্তান সব সময় আমাদেরকে একটা টানাপোড়েনের যন্ত্রনায় রেখে দেয়,। হায় ভগবান আমাদেরকে মুক্তি দাও।'(কপাল চাপড়াতে লাগলেন)
 রেখা কাকার কাছে  গিয়ে বলল  'কাকু এরকম করলে কিন্তু আমি থাকবো না ।তুমি শান্ত হও।'
কাকু বললেন  'শান্ত হবো একবারে চিতায় গিয়ে।
বেশ আনন্দে ছিলাম ননী মা ,তুই আসাতে। কপালেতে সুখ সহ্য হবে না রে ।বলেই গান ধরলেন 'এই তো 'জীবন। হিংসা বিবাদ লোভ ,ক্ষোভ বিদ্বেষ।চিতাতেই সব শেষ'।
হঠাৎই কেমন একটা থমথমে পরিবেশ হয়ে গেল।

আমিনুর রহমান জুন্নুন ( ইংল্যান্ড লুটন শহর )





কই রইলায় বন্ধুরে


কই রইলায় কই রইলায় বন্ধুরে
ও বন্ধু আমারে ভুলিয়া
আমি রইলাম বন্ধু তোমার 
স্মৃতির চাদর জড়াইয়া।

ফুল বাগানে ফুটেরে ফুল 
ভমর আসে উড়িয়া
আমি রইলাম তোমার আশায় 
মনের ভাগান সাজাইয়া।

কোনবা দোষে গেলায় তুমি
আমায় ফাঁকি দিয়া
কথা ছিলো রইবায় তুমি
অন্তরে অন্তর মিশাইয়া।

চাদনী রাতে কাছে আইসা 
গেলায় ভালোবাসিয়া 
হাতে খোসবো চন্দন দিয়া
কেন গেলায় লুকাইয়া।

তোমার প্রাণে রইলাম তাকাই
আগুন দাও নিবাইয়া
জুন্নুন বলে পাগল মনরে
আর দিওনা জালাইয়া।

লেখক শান্তা কামালী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "বনফুল"২৯

চোখ রাখুন স্বপ্নসিঁড়ি সাহিত্য পত্রিকার পাতায় লেখক শান্তা কামালী'র  নতুন ধারাবাহিক  উপন্যাস "বনফুল" 





বনফুল 
( ২৯ তম পর্ব ) 


                                                          জুঁই, পলাশ, অহনা আর সৈকতকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে নিজের  বাসায় ফিরলো, আজকে জুঁই ভীষণ খুশি... 
বাবা-মার সাথে অনেকটা সময় বসে গল্প করলো জুঁই, ঘড়িতে এগারোটা বাজতেই ময়না টেবিলে খাবার পরিবেশন করলো।
 জুঁই বাবা-মায়ের সাথে  ডিনার শেষ করে গুডনাইট বলে উপড়ে উঠে এলো।

 অনেক ক্ষণ কি যেন আকাশ কুসুম চিন্তা করে দাঁতব্রাস করে ড্রেস চেঞ্জ করে বিছানায় শুয়ে পলাশকে ফোন দিলো।ওপাশ থেকে পলাশের কণ্ঠস্বর শুনে জুঁই বাস্তবে ফিরে এলো। 
পলাশ প্রশ্ন করছে জুঁই তোমাকে একটু অন্যমনষ্ক লাগছে, জুঁই কথাটা এড়িয়ে গেলো....। 
জুঁই পলাশকে প্রশ্ন করলো তুমি খেয়েছ?
পলাশ বললো হ্যাঁ, তুমি?
 জুঁই ও উত্তর দিলো আমিও খেয়েছি। জুঁই বললো, জানো,আমার না আজ খুব ইচ্ছে করছে লং-ড্রাইভে যেতে। পলাশ বললো, আমরা অন্য একদিন নিশ্চয়ই যাবো আজ নয়। কাল ভোরে সৈকত  ট্রেন  ধরবে, তাই একটু তারাতাড়ি ঘুমাতে হবে। জুঁই তুমি কিছু মনে করো না ।

 সৈকতও ফোনে অহনার সাথে কথা বলছিল, সৈকত বুঝতে পারছে অহনা ভিতরে ভিতরে কাঁদছে....
 সৈকত বললো আমি তো মাস দুয়েকের মধ্যে ঢাকায় আসছি, তাহলে এতো কান্না কিসের! ফোনে তো প্রতিদিনই কথা হবে, মনেই হবে না আমরা দূরে আছি,প্লিজ তুমি স্বাভাবিক ভাবে কথা না বললে আমি কি সকালে যেতে পারবো? অহনা বিষয়টা বুঝতে পেরে নিজেকে স্বাভাবিক করে নিলো।ঠিক আছে তুমি ভালো থেকো, এই বলে শুভ রাত্রি জানিয়ে ফোন রাখলো অহনা।
ভোর বেলা পলাশ  সৈকতকে সুর্বণা এক্সপ্রেসে উঠিয়ে দিয়ে এলো। 
রাতে ভালো ঘুম হয়নি বলে পলাশ শুয়ে ঘন্টা দুয়েক ঘুমিয়ে নিলো। জুঁই ঘুম থেকে উঠে পলাশকে ফোন দিয়ে বললো আজ ওরা বাইরে লাঞ্চ করবে,একটায় পলাশকে  পিক আপ করবে।

বেলা বারোটায অহনা একবার ফোন দিয়েছিলো সৈকতকে তখন সৈকত জানালো ও ফেনি পার হয়েছে।



চলবে...

রুকসানা রহমান




কোন এক শ্রাবণে


শ্রাবণ নিশীথে কে তুমি অসময়ে এসে দাঁড়ালে শিয়রে
আমাকে  আজ যেতে হবে, কি ভাবে হেঁটে যাবো
ঐ-শ্রাবণ মাঠে।

আজও কি হবেনা তারসাথে দেখা, অথচ তাকে
সন্ধান করি, স্পর্শ করি  দেহের ভিতরে প্রতিটি শ্রাবণের বাতাসের জলতরঙ্গ। 

 বৃৃষ্টি ভেঁজা আচঁলে কবিতা  লিখেছিলে
আমার ঈশ্বরী নেমে এলো মর্তে, আলতা রাঙানো
পায়ে নূপুরের ছন্দে খোপায় শিউলি ফুল যা কিছু
আমার কল্পনা ঠিক তেমনই আমার ঈশ্বরী।

কাজল চোখে চোখ রাখতেই সেদিন আকাশ হয়েছিল
 আয়নায় পরম প্রেমের দৃশ্যমঞ্চের মিলনের 
স্পন্দনের ভিতর নতুন  এক রূপান্তর  অপার মুগ্বতায় শ্রাবণের দিগন্ত সূচনার সৌরভ ছড়িয়ে।
 
কথা দিয়েছিলো কিন্তু সে আর এলোনা 
বাতাসে ছড়িয়ে দেওয়া হয়নি ভালোবাসার সেই আদিম তৃষ্ণা।
রেখে গেলো স্মৃতির স্বপ্নের লেখা আচঁলে ,আকস্মিক আঘাত।
প্রতিটি বছর ছুটে যাই সেখানে গভীর বেদনার
নকশাআঁকি কষ্টের চূড়ায়, বিনম্র ইচ্ছে-দুঃখ যাতনায়।

ঐ শোন-গভীর অপেক্ষার সুবিন্যাস্ত শ্রাবণ মাঠে 
আজও তার মৃদু পায়ের শব্দ ভেসে আসছে
এই অস্হিরতা,দিশেহারা মন শ্রাবণের মহাপ্লাবনে
ভেসে যেতে চায়।

কে তুমি আমাকে অসাড় করে রেখেছো শয্যায়...?
একটিবার যেতে দাও, কথা দিলাম ফিরে আসবো
তখন না হয় বাঁশিটি বাজিও।

তুমিও শুনলেনা জীবনের শেষ আর্তি,ধীরে,ধীরে
নাড়ীর স্পন্দন টুকু কমিয়ে দিচ্ছো
আর কোনদিনই যাওয়া হবেনা একটিবার তাকে
দেখার বাসনাটুকু ও কেড়ে নিচ্ছো...?

এতো আলো,তবু কেন আজ শ্রাবণ জানালা নিঝুম আধাঁরে  ঢাকা
আমার দু'চোখের পাতা ঘুমিয়ে পড়ছে কেন..?
কিছুতেই খুলছেনা শেষ বাঁশিটি বাঁজিয়ে ফেললে...!?

তবুও নৈঃশব্দ নৈবেদ্য তমসার শ্রাবণ মাঠে 
বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে আমার আত্মা তাকে খুঁজে
স্পর্শ করতে চায় তার অতলান্ত চোখ।

সে হারিয়ে ফেলেছে ঢেউয়ের মাতালত্ব স্বপ্নভূমি
সেই উজানে ভেসে গেছে আমার সাজানো
ভালোবাসার তরী,তার আপন স্বভাবে।
প্রতিক্ষায় থাকবো আদি, অনন্ত কাল
,যদি সে ফিরে আসে কোন এক শ্রাবণে...