২১ জুলাই ২০২২

সিগমা আউয়াল এর গল্প " মেঘের কোলে পাহাড়" পর্ব ১





মেঘের কোলে পাহাড়  পর্ব (১


সিগমা আউয়াল 


        পাহাড়ের মুখে মেঘ জমে থাকে ।বেশ খানিকটা উপরে দিকে । যত উপরের দিকে ওঠা যায় ততো তুলোতুলো মেঘগুলো জমাট বেঁধে  ভাসতে থাকে ।অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকে মীলা ।মনে হচ্ছে মেঘের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে । আঁকাবাঁকা পাহাড়ী রাস্তা ধরে উপরে দিকে গাড়ি উঠছে । নীচের দিকে তাকালে সবুজের সমারোহ  । মেঘ গুলো মাঝে মধ্যে ভাসতে ভাসতে আটকে যাচ্ছে  গাছের সাথে । 
   এক পশলা বৃষ্টি হয় সেখানে, অথচ নীচে  কোন বৃষ্টি নেই । মেঘ - বৃষ্টির এই অদ্ভূত খেলা দেখে মীলা রোমাঞ্জিত হয়। পাশে  পাহাড়ের গায় বেয়ে কোথাও কোথাও ঝর্ণা নামছে । খাঁশিয়া বউ - মেয়েরা পানি নিচ্ছে দৈনন্দিন কাজে ।  পাথর ভাঙা সিড়ির মতো  জায়গায় কাপড় ধুচ্ছে । শোঁশো  শব্দ বেশ কিছুক্ষণ আগে থেকেই  পাচ্ছিলো মীলারা । কাছে আসতে দেখে বেশ বড় ঝর্ণা । ভালোলাগার অনুভূতিটা  দ্বিগুন হলো ।  দু/ তিন মাইল পার হবার পর সামনে একটা বাজার পড়ে ।  ডাঁওকি  বাজার । 

     পুরুষ বিক্রেতা থেকে মহিলা  বিক্রেতা সংখ্যা  বেশির ।  নানা রকম পাথরের  গহনা ,মশলা , চাল ডাল সবই পাওয়া যাচ্ছে ,অনেকটা হাটের মতো । পাহাড়ি মোরগ  - মুরগী । সব চেয়ে যেটা মজার সেটা হচ্ছে কোন সমান্তরাল জায়গায় না । পাহাড়ের খাঁজে বা পাথরের  স্তরেস্তরে  হাট  । মীলা  বাচ্চাদের হাত ধরে ওঠে । বাজারে ওরা সবাই একটা  চায়ের দোকানে বসে । শিলংএর  খাস চায়ের পাতার চা খায় ।ভারি সুন্দর তার সুবাস । অল্প স্বল্প কিছু  সৌখিন জিনিস পত্র কিনে নিয়ে আবার ওরা গাড়িতে ওঠে । সন্ধ্যার নামার  আগেই  পৌঁছতে হবে । এরকম চড়াই- উতড়াই পথে রাত হওয়া ঠিক না । সেপ্টেম্বরের শেষ এখনো কি বর্ষাকাল ?  
      নানা ধরনে জীব জন্তুর গল্প শুরু করে দিলেন কবীর সাহেব (মীলার স্বামী )। বেশ খানিকটা মন:ক্ষুন হয়ে বললেন -- যাতায়াতের  আরো বেটার সুযোগ সুবিধা থাকতে তোমার হঠাৎ বাই রোড়ের আসার ইচ্ছে হলে কেন বুঝলাম না ।এরকম বিপদজনক রাস্তায় কেউ শখ করে আসে ? তাও বর্ষা এখনো শেষ হয়নি । 
--- বারে বর্ষা কিছুটা আছে বলেই না এখন এলাম । পাহাড়ি  ঝর্ণা , প্রকৃতির আসল সৌন্দর্য তো এই সময় দেখতে হয় ।কি সুন্দর সবুজ চারিদিকে দেখো মন দিয়ে দেখো, তোমারও ভালো লাগবে । বাচ্চারা হৈচৈ করে যাচ্ছে । কবীর জার্নালে মুখ গুঁজে আছে ।মাঝে মধ্যে ড্রাইভারের  সঙ্গে  কথা বলছে । চোখ দিয়ে রাস্তা নিরিখ করছে । গম্ভীর থমেথমে মুখ । প্লেনে আসলে ভালো হতো বার বার একই কথা বলে এখন ক্লান্ত ।

কবি রাজ রিডার এর কবিতা "এত লাশ কোথায় গেল?"





এত লাশ কোথায় গেল?

রাজ রিডার


এত লাশ কোথায় গেল?
আমাদের ত্রিশ লক্ষের বেশি লাশ কোথায় গেল?
মায়ের পেটেই যে শিশুটি থেকে গেল সে কোথায়?
যাদের পরিচয়পত্র ছিল না তাদের লাশ কোথায়?

পানিতে ভাসছিল যে লাশ...মিশে গেল পানিতে পানিতে
মাটিতে পুঁতে দিল যে লাশ...মিশে গেল মাটিতে মাটিতে
আগুনে পুড়ে গেল যে লাশ...ছাই হয়ে উড়ে গেল বাতাসে বাতাসে 
যে লাশের কিছুই হলো না...পড়ে রইলো
চলে গেল শুকুনের পেটে পেটে
এমন লাশের হিসাব কে দিতে পারে?

আমার কাছে লাশেদের হিসাব নাই...আছে মানুষের খোঁজ
আমার কাছে মাথার খুলির হিসাব নাই...আছে মায়া-মমতার
আর এসব গণনা করবে কোন মায়ের লাল?




কান পেতে দেখো
সময়ের দেয়ালে
বোমার ঝলকানিতে
তরবারির রক্তে
ভেসে যাওয়া নদীতে
মিশে যাওয়া মাটিতে
জোয়ার আর ভাটিতে
শুনতে পাবে লাশেদের কথা
কান পেতে দেখো বাতাসে
পেয়ে যাবে খোঁজ মানুষের
পেয়ে যাবে খোঁজ লাশেদের।

লাশেরা কথা বলে না।
তুমি যে দেখেও দেখো না—তাই তুমি লাশ
তুমি যে লাশেদের কথা বলো না—তাই তুমি লাশ
লাশেদের রুহু যে তোমার শরীরে প্রবেশ করে না—তাই তুমি লাশ
আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তুমিই জিন্দা লাশ।

কবি তাহেরা আফরোজ এর কবিতা প্রেমের গান"




প্রেমের গান

তাহেরা আফরোজ


তুমি বলেছিলে, গান শোনাবে 
এমন একটি গান, যা কেবলই আমার হবে 
আমার জন্য তোমার কন্ঠ নিঃসৃত সুর 
তোমার কন্ঠে উচ্চারিত গানের প্রতিটি বাণী 
আমার জন্য 
আমার জন্য তোমার সবটুকু গাওয়া। 
তুমি শিল্পী নও
কিন্তু তোমার প্রেমের তানপুরায় যে সুর ওঠে 
তা যেন শ্রেষ্ঠ সুর হয়ে বাজে আমার ধ্যাণে 
আমার শরীরের প্রতিটি শিরা উপশিরায়
তোমার আবেশ জড়ানো কন্ঠ 
আমাকে মোহাবিষ্ট করে রাখে সমস্ত দিন 
আমি অপেক্ষায় থাকি 
তুমি বলেছিলে, গান শোনাবে 
কেবলই আমার জন্য তোমার সেই গান।

২০ জুলাই ২০২২

মমতা রায়চৌধুরী এর ধারাবাহিক উপন্যাস উপন্যাস টানাপোড়েন ১৮৯




উপন্যাস 


টানাপোড়েন ১৮৯

কখন যে কি হয়

মমতা রায়চৌধুরী



ফিরতে ফিরতে রাত নটা হলো। স্টেশনে এসে রেখা মনে মনে ভাবছে মনোজ একবারও তো আজকে ফোন করল না যদিও ওই সময়টা ফোনটা অফ রেখেছিল। ও কি এসেছে বাড়িতে?
এদিকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। ও বাবা এদিকে বিদ্যুৎও চমকাচ্ছে। ভারী বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে ।তাড়াতাড়ি পা চালালো। "টোটো টোটো অ্যাই টোটো। "কি ব্যাপার আজকে একটা চেনা টোটো দেখতে পাচ্ছি না ।তখনো যাবার সময় অচেনা টোটো। টোটোওয়ালা কাছে এগিয়ে এসে বলল" হ্যাঁ দিদি ,বলুন।"
বলছি "বি ব্লক যাবে?"
"না দিদি।'
এদিকে বৃষ্টি ভালই পড়তে শুরু করেছে । রেখা কি করবে ছাতাও তো আনে নি । এদিকে লোকজনের সমাগমও কম। মনোজকে ফোন করবে? করেই বা কি করব বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে আবার ও আসবে?'
আবার একটা টোটো দেখতে পেল।" এই টোটো যাবে?"
"কোথায়?"
"বি-ব্লক যাব।"
"না দিদি।'
"কেনো যাবেন না কেন?"
"ওদিকে অবরোধ চলছে।"
রেখা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল
"অবরোধ !কিসের?"
টোটোওয়ালা কোন কথা না বলেই বেরিয়ে গেল।
ভারী চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ালো তো।
ইতিমধ্যে রেখা দেখতে পেলো  "এক তরুণ তরুণী খুব ক্লোজ দাঁড়িয়ে আছে, ছাতা মাথায় দিয়ে।"রেখা একটু আশার আলো দেখলো জনসমাগম স্টেশন চত্বরে এরকম দু-একজনকে দেখতে পেলে ভালই লাগে।
রেখা ভাবল এরাও বোধহয় টোটো করে যাবে একটু এগিয়ে গেল। কিন্তু অবাক হয়ে গেল মাঝবয়সী লোকের সঙ্গে কুড়ি বাইশ বছরের একটি মেয়ে লেপ্টে আছে।
দেখেই কেমন রেখার গাটা ঘিনঘিন করে উঠলো।আর মনে মনে ভাবলো
"কোন বাবা মায়ের সন্তান এরকম বিপথে চালিত হচ্ছে কে জানে?লাজ লজ্জা বলে ও তো কিছু নেই।'
এখানে তো ভালবাসার চিহ্ন নেই লোকটাকে তো দেখেই মনে হচ্ছে তার জিভ যেন লকলক করছে, এতটাই লালায়িত যে এক নিমিষে এর সমস্ত শরীরটাকে গিলে খেয়ে নেবে।
মেয়েটা মাঝে মাঝে অস্বস্তিতে দূরে সরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে কিন্তু তার চেষ্টা বৃথা।
এক সময় কথা শুনতে পেল লোকটা বলছে "আমার কথা না শুনলে তোমার সমস্যার সমাধান হবে না।"
রেখা ভাবলো "মেয়েটা কি সমস্যার মধ্যে আছে।
যার জন্য মাঝ বয়সী লোকের সঙ্গে আজ নিজেকে হারিয়ে যেতে দিতে হচ্ছে।"
"তুমি আজ আমাকে সময় না দিলে তোমার ওদিকে সব শেষ।"
মেয়েটা কেমন উদাসিন ভাবে বলল আপনি আমাকে সাহায্য করুন আমি পরে আপনার সব কথা শুনব ।এই মুহূর্তে আমার মন মেজাজ কিচ্ছু ভালো নেই।"
"মামদো বাজী নাকি? দিলে তবেই তো কিছু পাওয়া যায়? দুনিয়াটাই গিভ এন্ড টেক পলিসি তে চলে বুঝলে সোনা বলেই আবার মেয়েটিকে কাছে টেনে নিল।'
রেখা ভাবল "মেয়েটা নির্ঘাত বড় সমস্যার মধ্যে আছে।"
আরো কত কিছু বকে যেতে লাগল সব কথাগুলো  স্পষ্ট হয়ে ধরা দিল না। 
রেখা মত ভাবছে না ওদের কথা এখন একটাই চিন্তা সে টোটো ,অটো যদি না পায় তাহলে কি করে বাড়ি যাবে?"
এমন সময় একটা অটো দেখতে পেল।
হ্যাঁ চেনা অটো ই  মনে হচ্ছে।
বীজন মনে হচ্ছে।
অটো তো রেখার দিকেই এগোচ্ছে ।রেখাও একটু এগিয়ে যাবার চেষ্টা করল।
"দিদি, উঠুন ,উঠুন।"
"আরে বিজন বাঁচিয়েছ ভাই ।কখন থেকে অপেক্ষা করছি জানো, একটা টোটো, বা  একটা অটো ও পাচ্ছি না ।যাও বা টোটো পেলাম ।তারা যাবে না কেউ।"
"আরে দিদি, যাবে কি করে আমাদের ওই দিকটা তো আজকে অবরোধ চলছিল এই উঠলো।"
"দাদা ,একটু সরে সরে বসুন দিদিকে জায়গা দিন।"
"দিদি কোথায় গিয়েছিলেন, এত রাত 
হল ।ভিজেও তো গেছেন।'
"আর ব'লো না আমাদের স্কুল থেকে প্রতিনিধিত্ব করতে হচ্ছিল কলেজে ।একটা প্রোগ্রাম ছিল সেখানে তো বড়দি আমাকে সিলেক্ট করে পাঠিয়েছেন ।সেই জন্যই তো দেরি হল।"
"বসতে খুবই অসুবিধা হচ্ছিল রেখার কিন্তু কিছু করার নেই যে।তেই হবে এভাবে।"
রেখার বিরক্তি সূচক অভিব্যক্তি বিজন আয়নাতে দেখতে পেয়ে বলল "দাদা, আপনারা একটু চেপে আসুন না ,মহিলা বসেছেন।"
বিজন এর বলাতে লোকগুলো একটু চেপে বসলো।
তবে কথা শোনাতে  ছাড়েনি বিজন কে।
"টোটো অটোতে তো এভাবেই বসতে হয় দাদা ।না হলে তো যাদের অসুবিধা হয় তারা প্রাইভেট কারে গেলেই পারেন?"
বিজন বলল "এভাবে বলবেন না ।সবাই প্রাইভেটকারে গেলে আমাদের কি হবে?,'
সবাই যদি একটু কম্প্রোমাইজ করে চলি তাহলেই তো হয়। চ"
ভদ্রলোক দুজনের  দুটো গালে চুন কালি লাগিয়ে দিল 
রেখাকে কিছু বলতে হলো না। রেখা শুধু মনে মনে ভাবল চেনা অটো অথবা টোটোতে  তো এটাই সুবিধা।
নামানোর সময় বিজন হাঁক দিলো' দাদা ,নামুন বুদ্ধ পার্ক এসে গেছেন।"
তখন মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
লোক দুটো নেমে যাওয়ার পর বিজন বলল "দিদি পোশাক আশাক দেখে ভদ্রলোক মনে হয় কিন্তু ভেতরটা দেখুন  কত ইতর শ্রেণীর।আমরা কোন ক্লাসে যেন পাঠ্য বইতে পড়েছিলাম  বিদ্যাসাগর মহাশয়ের এরকম একটা গল্প । শুধুমাত্র শিক্ষাদীক্ষা ,পোশাক-আশাক পড়লেই ভদ্রলোক হওয়া যায় না ম।নটাকে অনেক উন্নত করতে হয় শিক্ষা নাকি মানুষের ভেতরে চেতনা আনে।"
রেখা বলে কথাটা তুমি ঠিকই বলেছ প্রকৃত শিক্ষা কজন পায় বলো শুধু ডিগ্রি লাভ করলেই তো হয় না।
"হ্যাঁ দিদি আজকে এই সবকিছু বিচার হয় আমরা অটো চালাই টোটো চালাই। আমাদেরকে কেউ মানুষ বলে ভাবেই না ।আমরা হচ্ছি ছোটলোক।
কি বৃষ্টি শুরু হল দিদি দেখুন ।পর্দাটা চেপে ধরুন যেটুকু সামলানো যায় ।আমি দ্রুত টানার চেষ্টা করছি ঠি।"
ঠিক আছে বিজন ।তোমাকে অত তাড়াহুড়ো করতে হবে না ।তুমি দেখে চলো।"
বিজন তখনওবকবক করে চলেছে কিন্তু রেখার মনটা তখন চলে গেছে সেই স্টেশন চত্বরে মাঝ বয়সী লোকদের কান্ড-কারখানা দেখে মেয়েটাকে কি অসহায় মনে হল ।আসলে আমরা সবসময় যেন সত্যিই অসহায় ।কবে আমরা প্রকৃত মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারবো কে 
জানে ?সমাজব্যবস্থার গভীরে তো অসুখ দানা বেঁধেছে  জানিনা মেয়েটা কি শেষ পর্যন্ত নিজেকে বাঁচাতে পারবে কে জানে?"
"দিদি , নামুন  এসে গেছেন।"
"ও আচ্ছা আচ্ছা এই নাও ভাড়া।"
"দিদি বেশি দিয়েছেন  আপনি বোধহয় ভুল করে দিয়েছেন এই নিন ফেরত নিন 
" ভুল করে দিই নি আমি ইচ্ছে করে দিয়েছি ওটা তুমি রাখো।"
"দিদি আমার ভারতেই হয় আমি কেন নেব?"
"আমিতো তোমাকে ইচ্ছে করে দিলাম,,। বললাম তো" তুমি বল তো কতবড় উপকারটা করেছো আমার। এই ঝড়ো হাওয়া আর বৃষ্টির সময় একটা টোটো ,অটো পাচ্ছিলাম না। তুমি আমাকে দেখতে পেয়ে আমার কাছে এলে তাহলে আমার উপকার করলে না বিজন ?
বিজন হেসে বলল "দিদি উপকার যখন করেছি উপকার টা  বিক্রি করতে চাই না.। আপনি রাখুন এটা।"
রেখা কেমন বোকা বনে গেলো। সত্যিই তো তাই আমরা উপকার এর মধ্যে দিয়ে নিজের অহংকার এ জাহির করতে চেয়েছি। ছি: ছি: ছি:নিজেকে খুব লজ্জিত বলে মনে হলো ।
"দিদি আসছি।"
মুখের ভাষা যেন আর বেরোলো না  একজন অটো ওয়ালা "ও রেখাকে শিক্ষা দিয়ে গেল সত্যিই তো আমাদের মতো ভদ্র শিক্ষিত সমাজ যারা আমরা নিজেদেরকে সবথেকে উচ্চ শ্রেণীর সভ্য মানুষ বলে অভিহিত করে থাখি। আদৌ কি আমরা  সত্যিই সেই পদমর্যাদার অধিকারী ? প্রায় ই প্রশ্ন জাগে মনে। রেখা অনেকক্ষণ অটোটা চলে যাবার পর তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল ।ভিজে গেছে রেখা এমন সময় পার্থ হাঁক দিল "বৌদি একি এতো ভিজে গেছ।শরীর খারাপ হবে তখন কি দেখছিলে  আর কি ভাবছিলে?
রেখা জিজ্ঞেস করে তোমার দাদা ফিরেছে?"
" একটু আগেই ফিরেছে। তাও কতক্ষণ হবে 40 45 মিনিট হবে।'
"ও আচ্ছা।"
"মিলিরা খুব জ্বালাতন করেছে পার্থ না?"
" না ,না ওরা কিছু করেনি ।তবে কিছুটা একটু এদিক-ওদিক করছিল খুঁজছিল  আমরা এসে আদর করলাম তো তখন চুপ করে আছে। দেখুন দরজাটা খুলে দেখতে পাবেন। তাই।শাটার নামিয়ে দিলাম ভিজে যাচ্ছিল ।কিছুটা খোলা 
আছে ।কথার আওয়াজ পেলেই বেরিয়ে আসবে দেখুন না বলতে না বলতেই দুটো কিউকিউ আওয়াজ করতে লাগল। সঙ্গে তুতু ও বেরিয়ে আসলো ।রেখা বললো কি হয়েছে ?তারপর কলাপসিবলগেটটা খুলল।
"খোলার সঙ্গে সঙ্গেই তুতু ঘরে ঢুকে গেল।'
মনোজ তখন খেলা দেখছে টিভিতে বলল সব মিটলো তোমার।
 রেখা নল" তুমি একটাও ফোন করোনি কেন আমাকে?"
"অফিসের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম তারপর যখন সময় পেলাম তখন ভাবলাম হয়তো সে সময় কাজে ব্যস্ত থাকবে শুধু শুধু তোমাকে ডিস্টার্ব করা আর তাছাড়া আজকে আমার অফিসে প্রচুর কাজও ছিল। "
"তুমি তুতু কে ঘরে ঢোকাও নি কেনো?"
"ওকে ঢুকাতে হয় নিজের থেকেই,।কাছে আসলো না। মনোজ বলল 'ঠিক আছে,,,। তুমি ফ্রেশ হয়ে এসো।"
 "আমি চা করছি। তারপর দুজনে মিলে আড্ডা দেবো।"

কবি মিতা নূর এর কবিতা "খুব ভালোবাসি' কালো টিপ "




খুব ভালোবাসি' কালো টিপ 


 মিতা নূর   



চোখের সমুদ্র নোনাজলের ভাসাস্বরে বলি,
শত'শত  ব্যাথার ঢেউ বুকের ভেতর  বয়ে গেলেও, 
আমি-সারাজীবনই তোমার পাশেই আছি"
সমুদ্রের গাঙচিল হয়ে।
ডানা ভাঙা পাখির মতো ছটফট করে মরি! 
তবু চাই দূর থেকেই আকড়ে ধরে রাখতে,  তুমি জানো.?
আমার এই ছোট্ট বুকের চিলেকোঠায়, 
তোমাকে অনুভব করতেই, 
তোমার নিঃশ্বাসে শিউরে ওঠে আমার শরীর।
তোমার ঠোঁটের শব্দ ছোঁয়া পাগল করে দেয় আমাকে। 
তুমি চলে গেছো যতটা  চোখের সীমানার বাহিরে, 
ঠিক ততটা মনের গভীরে  আছো!
দূরে গিয়েও কতটা কাছে মিশে আছো এখনো। 
তুমি শুধু আমার রাগ টাই দেখতে পেলে,
ভালোবাসা নয়!  
তুমি বুঝতে পারো?  
এই রাগের দৃষ্টিতে ছিল তোমাকে হারিয়ে ফেলার ভয়!
তুমি কখনো বুঝোনি,  হয়তো বুঝেও না বুঝার ভান করে ছিলে। 
তুমিই আমার খুব কাছের, খুব'আপন একজন"
তোমার কাছে বেশি কিছু চাইনি তো...! 
যেটুকু পেলে  একটু স্বস্তি ফিরে পাওয়া যায়, 
সেটুকুই আমি চেয়ে ছিলাম, 
যেটুকু পেলে হাতের আঙুলের শূন্যস্থান পুরন করা যায়। 
সেটুকুই আমি চেয়েছি...!
আমার শুকনো মরুর মাঝে, বর্ষার প্রথম জলের মতন তুমি ছিলে। 
আমি তোমাকেই চেয়ে ছিলাম-চাই,
দৃষ্টিহীন এই আমি, তোমার চোখেই  আমার পৃথিবী দেখতে  চেয়ে ছিলাম। 
তুমি জানো না.? 
আজ তোমার এই  দূরত্ব, আমাকে তোমার আরো খুব কাছে টেনে নিয়েছি।
আমি আজন্মকাল আছি অপেক্ষায়, তোমার মনের চৌকাঠে, 
হোকনা বুকের ভেতর পাহাড় কষ্ট...! 
তবু মনের ভিতরে অভিমানের মেঘ,আর- মুখে একগাল হাসি নিয়ে বলবো'
ভালোবাসি তোমায়, খুব ভালোবাসি কালো টিপ।  
হুমম,এটাই সত্যি !! 

কবি দুর্গাদাস মিদ্যা এর কবিতা "তবুও"




তবুও


দুর্গাদাস মিদ্যা



গভীর এক সত্যতায় জীবন ছুটে যায়
দিন থেকে দিনান্তের  প্রান্তসীমায়। 
ছায়াছবির মতো কত মানুষের আনাগোনা। 
কেউ অচেনা থেকে যায় কেউ চেনা হয়ে থাকে বন্ধুর মতন। 
ক্রমন্বয়ে কত ছায়া কত রোদ
ঘুরপাক খায়, কখনো সখনো
বিধ্বংসী ঝড়ে তছনছ হয়ে যায় সব 
তবুও জায়মান থাকে জীবন- উৎসব। 

বাবুল চৌধুরী এর কবিতা "অকস্মাৎ !"





অকস্মাৎ !

বাবুল চৌধুরী


তেমার জন্ম হঠাৎ সুখের দৈবক্রমে 
আমার জন্ম অপ্রয়োজনে অকস্মাৎ।

ঘুনেধরা সময়ের খোলস জীবনে
দৈবাৎ বেঁচে থাকার উপলব্ধ আপোষ।
রোজনামচার হালখাতায় প্রক্ষেপিত সংযোজন,
আমরণ বেঁচে থাকবার
নতুন নুতন ক্ষোভ আক্ষেপ।

দীপ্যমান স্বল্পায়ু সুখের উচ্ছাসে 
পালাক্রমে সুখ আসে দুঃখের বিমূর্ত অবকাশে, ঘুচে যায় আনন্দ আবেশ।
স্মৃতিরা উদ্বেলিত বিস্মৃতির দেয়াল ঘেঁষে,
মূর্ছণার তার ছেড়ে তেল নুনের 
পরবাস্তব প্রয়োজনে। 

অফুরান আকাঙ্ক্ষারা হেরে যায় 
মহাকৃপণ সময়ের সল্পতার দানে।
যা পেয়েছি মহাকালের উচ্ছিষ্ট সময়ের সামান্য নিমেষ,
সহসাই উবে যায় সীমাহীন শূন্যতায়।

দিশাহীন মোহাবৃত লোভাতুর ইচ্ছেরা 
অকারণ অহমিকার প্রগল্ভতায় পুড়ে যায় 
যেন উনুনের ছাই।
নিজকে বিলিয়ে দিয়ে 
না পাবার মিথ্যা ক্ষেদে হুতাসিত প্রাণ 
হতাসাবৃত উঁইপোকার ঢিবি যেমন।

সবই গেল বিফলে অকারণে 
না থাকে তার কোনো অবশেষ,
আচমকাই জ্বলেছিল যে আলো 
তবুও কাটেনি সেই আঁধারের নুন্যতম রেশ....
কালের ঢেউয়ে মিশে পিচাশ সময় গুলো
আলোয়ার পিছে ছুটে চলে,
অকালে কর্পূরমিশ্রিত সময় ফুরিয়ে যায়,
দৈবাৎ কখনো এসে নির্মম সত্যের হেমলক করে পান।
সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে
সব কিছু ফেলে দিয়ে 
অকস্মাৎ চলে যাওয়া......।

         ........অধোমক্তি ।
         

কবি ফারজানা পরী  এর কবিতা "নিজেকে পেরিয়ে





নিজেকে পেরিয়ে 

 ফারজানা পরী 


চোখ ভাঙা ঘুমে তোমার মুখ আঁকছি রোজ 
তুমি এসে দরজায় দাঁড়ালে হয় কবিতার ভোর
অথচ স্বপ্ন ভেঙে গেলে বুঝি তুমি কতটা নিখোঁজ। 
তবুও ক্লান্ত মনে প্রেমের প্রদীপ পুড়ি নিঝুম নিশিথে
অবগাহন করি ব্যথার সমুদ্রে... 
আরও মুগ্ধ হই নিজেকে পেরিয়ে
দেখি তোমার নীল চোখের মায়া আমার লজ্জার আবরণ খুলছে জলন্ত ঠোঁটের নোনা চুম্বনে। 

আমি দ্বিধা সংকোচ ভুলে গিয়ে গলতে গলতে বিলীন হই তোমার ভিতরে।

কবি জাবেদ আহমেদ এর কবিতা "পাগল না"





পাগল না

জাবেদ আহমেদ 



জানি দুশমন
জামানা, 
তবুও তোমাকে
যাবেনা ভুলা,
তুমিহীন জীবন কি
বুঝিনা গো,

 ভাগ্য গুণে মিলেছিলে
হারিয়ে ও ভুলিনি গো,

যখনতখন সাথে গো
অনুভূতি তোমার,

মন পাগল আমার
মান্নত তুমি আমার
আমার খোদার কাছে,

শ্বাস আমার জীবন গো
আমার জিহাদ কসম
তুমি গো পাগল মন,

নিঃস্ব হবো লুন্ঠিত হবো
সর্বহারা খুঁজে তোমায়।

১৯ জুলাই ২০২২

কবি হুমায়ূন কবীর মিঠু এর কবিতা  "প্রেমের কথোপকথন"




প্রেমের কথোপকথন

হুমায়ূন কবীর মিঠু 


তোমাকে ছুঁয়ে থাকার সাধ
আমার আজন্ম লালিত, 
লতা গুল্মের মতো বেয়ে বেয়ে
এক পূর্ণাঙ্গ রূপ নিয়েছে
হৃদয় গহীনে।
কী এক অপার্থিব চাওয়া
পূর্ণগ্রাস করেছে অন্তর! 
নিরন্তর যাপিত জীবনের 
এক অলৌকিক মহাকাব্য।
তোমাতে হারিয়েছি সেই কবে  কখন!!
এখন শুধুই মনের আলপনাতে জলচ্ছবি মুখর 
ভালবাসার ক্যানভাসে
প্রেমরঙের কথোপকথন।
বৈষ্ণবী এঁকেছিল কন্ঠনালিতে তিলক!!
আর তুমি আমার স্ব-তৃষিত ওষ্ঠে পঞ্চমীর চাঁদ,
আমি না হয় একটি জনম
বৈষ্ণব হয়ে রই...
তবু ভরবে না মন ভালবাসা যে এমনই--
ঐ যে তিলক তোমার সেথা শত সহস্র আমার ভালবাসা বিনির্মাণ!
আমি অবলীলায় বলি তুমি আমার তিলক প্রিয় তিলোত্তমা, 
আমার সারাবেলা।।
প্রিয়তমা আমার মনহারা, ভালবাসি তোমায় 
তোমায় মনহারা মন না মানা বাঁধনছাড়া প্রেমে!!
আনমনা ছন্নছাড়াতে তুমি বেশ!
আদুরে তোমার কপল গলের  তিলক ছন্দের বহমান প্রেমেই আর এক জনম আমি না হয় রই বৈষ্ণবধরা!!
তুমি প্রেমিকা আমার মৌন তারা!
তুমি প্রেমময় প্রেমের ধারা।।
আবহমান আমি তোমার সেই সঙ্গধারা!!
প্রেম তোমার! 
তুমি আমার! 
প্রেমিক তোমার!
আমি তোমার!
মনময়না পাখি আমার!
মনপাখি ময়না আমার!
ভালবাসি তোমায়!
ভালবাসি তোমায়!

১৮ জুলাই ২০২২

মমতা রায়চৌধুরী এর ধারাবাহিক উপন্যাস উপন্যাস টানাপোড়েন 188






উপন্যাস 

টানাপোড়েন ১৮৮

নতুন অভিজ্ঞতা

মমতা রায় চৌধুরী


বারোটার লোকাল ধরবে বলে রেখা তড়িঘড়ি দরজা লাগাতে শুরু করলো অলরেডি এগারোটা বেজে গেছে না এরপর আর লেট করা যাবে 
না ।টোটো আবার ঠিক সময় না পাওয়া গেলে এই ট্রেনটা না পেলে মুশকিল হয়ে যাবে। এক এক করে ঘরের দরজা লাগাচ্ছে আর ভাবছে ।এর ই মধ্যে তুতুটা কিউ কিউ করছে।
রেখা বলল" কি হয়েছে বলো তো 
তোমার ?দেখছো তো এখন আমি ব্যস্ত 
আছি ।চলো তোমাকে বেরোতে হবে ,ঘরের দরজা লাগাবো তো ?চলো ,চলো, চলো ।"
কি বুঝলো কে জানে ?তারপর নিজের থেকেই দরজার দিকে এগোতে থাকলো।। তুতু  একবার করে রেখার দিকে' দেখতে লাগলো এবার জুতো পায়ে গলিয়ে নিল ডাইনিং টেবিল থেকে জলের বোতলটা নিল আর একবার দেখে নিল রান্নাঘরের জানলাটা ঠিক দেয়া হয়েছে কিনা ,ড্রইং রুমের জানালা ঠিক দেয়া হয়েছে কিনা ।এই সময় যখন তখন ঝড় জল হতে পারে। না সব ঠিকঠাক আছে। ফ্রিজটা অফ করে দিল।
কলাপসিবল গেট টেনে তালা লাগিয়ে দিল। তালা লাগাতে লাগাতে ভাবছে আবার পার্থকে ফোন করতে হবে ?
আজ সেন্টুদা থাকলে এই অসুবিধা হতো না অলরেডি ১১.১০ বেজে গেছে বেজে গেছে।না ধারে কাছে পার্থকে দেখতে পাচ্ছে না।
এরমধ্যে রেখার পায়ে-পায়ে ঘুরতে লাগল মিলি ,পাইলট ,তুলি। রেখা এবার বিরক্ত হচ্ছে বলল "আমাকে আর বিরক্ত ক"রো না  তোমরা ।দেখছো তো এক জায়গায় যাচ্ছি। রেখা আবার ভাবলো না এদের প্রতি অযথা বিরক্ত কেন হচ্ছে আবার সবার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিল এবার ভাবল যে ফোনটা করতে হবে পার্থকে ।ফোন করতে যাবে ঠিক সেইসময় পার্থ এসে হাজির বলল" কাকে ফোন করছ?"
"কাকে আবার তোমাকে?"
"কেন?'
"দেরি হচ্ছে তো যদি ট্রেন মিস করি ওই জন্য টেনশন হচ্ছিল।"
"এই নাও চাবিগুলো। পার্থ হাত বাড়িয়ে চাবির গোছা বুঝে নিল।"
"আর শোনো রান্নাঘরে ওদের খাবার রাখা আছে।"
"আমি আসছি পার্থ।"
তোমাকে কি ড্রপ করতে হবে বৌদি?
রেখা বললো" না ,না সময় আছে তো। টোটো ঠিক পেয়ে যাবো।"
"না ,কোন হেজিটেট করো না আমার কিন্তু কোনো অসুবিধে নেই।"
"না গো দরকার হলে নিশ্চয়ই বলতাম শুধু শুধু কেন তোমাকে আমি কতদুর টেনে নেব বল?'
"ঠিক আছে বৌদি। বেস্ট অফ লাক।"
কথা বলতে বলতেই একটা টোটো সামনে দিয়ে যাচ্ছে রেখা পার্থ দুজনে একসঙ্গে বলে উঠলো "অ্যাই টোটো, দাঁড়াও।'
টোটোওয়ালা  কাছে আসলো। রেখা দেখল চেনা নয়।"
বলল "স্টেশন যাব।"
রেখা টোটো তে উঠে বসলো। টোটোয়ালা।তখনও দাঁড়িয়ে।
রেখা বলল 'চলুন?.
"উনি যাবেন না? 
রেখা বলল-কে ?এখানে আর কেউ যাবে না।
টোটোওয়ালা বলল "শুধু আপনি একা যাবেন?'
টোটোওলার একটা কোথাও ভুল হয়েছে ।আসলে পার্থ আর রেখা দুজনে একসঙ্গে টোটো কে ডেকেছিল তো এইজন্য।
রেখা স্টেশনে পৌঁছানোর পর ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে প্ল্যাটফর্মের দিকে এগোচ্ছে তখন খবর হচ্ছে ট্রেন নৈহাটিতে ঢুকছে।
রেখা দেখলো অনেক সময় আছে।
ভাবল একবার মনোজকে ফোন করে দেখবে।।ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে নিয়ে প্ল্যাটফর্মের একটা জায়গা দিতে বসল। মনোজকে ফোন করতে যাবে নম্বরটা খুঁজছে। একটা নম্বর ভেসে উঠলো। ভালো করে খেয়াল করল এটা বড়দির নম্বর।
আবার কেন বড়দি ফোন করলেন কনফার্ম হওয়ার জন্য যে আমি যাচ্ছি কিনা কিন্তু বড়দি সেটা ভালো জানেন যে আমি যখন কথা দিয়েছি তাহলে যাব। বোধহয় অন্য কোন কারণে রেখা মনে মনে এটাই ভাবলো ।তারপর যখন আবার ফোনটা রিং হল তখন ধরে বলল" হ্যালো'
হ্যাঁ রেখা বেরিয়েছো?
"হ্যাঁ ,ট্রেন ধরবো বলে বসে আছি প্লাটফর্মে।"
"না তুমি যাবে আমি জানি, সে কারণে আমি ফোন করিনি। তবু একবার জিজ্ঞেস করলাম। যে কারণে ফোন করেছি ,সামনে কিন্তু রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী আছে, মনে আছে তো তোমার?"
"হ্যাঁ সে ,কি আর ভোলা যায়?
রবীন্দ্রনাথেই আমাদের বাঁচা , কথা বলা । আমাদের দিকভ্রষ্ট বাঙালির পথ প্রদর্শক।"
"যা বলেছ একদম হক কথা।"
"আমিই  ফোন করতাম বড়দি।"
"কেন?"
"এই তো এই ব্যাপারে। এই স্কুল ছুটি প্রোগ্রাম কি স্কুলে হবে? সেই কারণেই করতাম।"
"সে স্কুল ছুটি হোক অনুষ্ঠান তো করতেই হবে।'
"তুমি অ্যারেঞ্জ করে উঠতে পারবে তো সেটাই এখন ভাবনা।'
"হ্যাঁ ,আমি হয়তো বেশি মেয়ে পাব না কিন্তু যারা মোটামুটি পার্টিসিপেট করে ওদের সঙ্গে আমি ফোনে কন্টাক্ট করে নেব।'
"বা হ ,বাহ  দারুন ব্যাপার ।আমি তো এই জন্যই তোমার উপর এতটা ভরসা করি রেখা।"
"এরমধ্যে  হুইসেল দিল ট্রেন ঢুকছে। বড়দি, আমি এখন ফোনটা রাখি আমার ট্রেন ডুকছে।"
"হ্যাঁ , হ্যাঁ রাখো রাখো সাবধানে।"
রেখা ফোনটা রেখে দ্রুত ছুটল কারণ ট্রেন দিয়ে দিয়েছে ওভারব্রিজ পার করে যেতে হবে।
রেখা হাঁপাতে হাঁপাতে গিয়ে দুই নম্বর প্লাটফর্মে উপস্থিত হল তারপর ট্রেনে উঠল।'
"ট্রেনে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ট্রেন ছেড়ে 
দিল ।"রেখা মনে মনে ভাবল আরেকটু হলে ট্রেন মিস করত ।এতক্ষণ ধরে প্লাটফর্মে বসে থেকে যদি ট্রেন মিস হতো এর থেকে দুর্ভাগ্যের বিষয় আর কি হতে পারত।'
যাক এই সময় ট্রেন টা একটু ফাঁকা আছে। উঠে জায়গা পেয়ে গেল। রেখা ভাবল একটা লম্বা ঘুম দেবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। একটা লম্বা ঘুমের শেষে ট্রেন যথারীতি নির্দিষ্ট সময়ে কৃষ্ণনগর স্টেশনে থামলো। রেখা তাড়াতাড়ি জায়গা ছেড়ে উঠে প্লাটফর্মে নামলো ।তারপর ভাবল আজকে মূল গেট দিয়ে না বেরিয়ে অন্য আরেকটি গেট  দিয়ে বেরোবে। ঠিক তাই।
বেরিয়েই ই একটি  টোটোওলাকে জিজ্ঞেস করল "যাবেন?"
টোটোওয়ালা বলল' হ্যাঁ যাবো। কোথায় যাবেন?"
"কৃষ্ণনগর সরকারি কলেজ।"
'হ্যাঁ চলুন।"
লোকটা হ্যাঁ চলুন বলে বসেই রইল তখন রেখা বলল' কি হল যাবেন না?'
"দাঁড়ান আর কয়জন প্যাসেঞ্জার নি ই ।"
রেখা কথা বাড়ালো না। কারণ জানে কথা বাড়িয়ে কোন লাভ নেই এজন্য চুপচাপ বসে রইলো আর ভাবতে লাগলো রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী প্রোগ্রামের কথা। আজ নাচের জন্য সোহিনী প্রিয়াঙ্কা দেবাংশী ওদেরকে  ফোন করতে হবে।। আর কবিতার জন্য রাজশ্রী, কেয়া, মিত্রা, সমিয়া, আর গানের জন্য স্নিগ্ধা,সহেলি অদ্রিজা ওদেরকে বলতে হবে। রেখা টোটোতে বসে বসেই একটা ছক করে ফেলল । আজই বাড়িতে এসে এদেরকে ফোন করতে হবে। এবার রেখা বিরক্ত হয়ে টোটোওলা কে তাড়া দিল ও আপনি যদি না যান বলুন। আমি নেমে যাব।"
টোটা ওয়ালা এবার বুঝতে পারল যে ভীষণভাবে রেগে গেছে ,সেইজন্য টোটোওয়ালা আর কথা না বাড়িয়ে টোটো ছেড়ে দিল  রেখা বুঝল এরা  শক্তের ভক্ত।
রেখা যখন কলেজে পৌঁছাল ।সেখানে গিয়ে দেখল কর্তৃপক্ষ তখনও হাজির হয়নি। রেখা এএসআই ম্যাডামকে ফোন করল।
হ্যালো'
"আমি এস এন জি  থেকে বলছি।"
"হ্যাঁ বলছি এখনো তো কেউ এসে পৌঁছায়নি বুঝতে পারছিনা কোন জায়গাটা ঠিক হবে?
আপনি দেখুন কলেজের দোতলায় উঠে যান ওখানে একটা ছোট প্যান্ডেল মত করা আছে ওখানেই সব ব্যবস্থা করতে হবে।"
"ব্যবস্থা মানে?"
'যে সমস্ত প্রতিযোগী আসবে তাদেরকে আপনারাই ঠিকঠাক করে বসিয়ে ওদের টপিক দিয়ে দেবেন ।তারপর নির্দিষ্ট সময় পর সেটা তুলে আপনারাই মূল্যায়ন করবেন।"
'ও আচ্ছা। আর কোনো স্কুল থেকে আসবে?'
'হ্যাঁ ,
ডি এ ন  বয়েস স্কুল থেকে আসবেন দুজন
 টিচার ।"
"আচ্ছা ,আচ্ছা ঠিক আছে।"
"চিন্তা করবেন না ,আমাদেরও প্রতিনিধি থাকবে আর কোন অসুবিধা হলে আমাদেরকে ফোন করবেন।"
Ok'
ফোনটা রাখতে রাখতে ই প্রতিযোগী রা  চলে আসলো ।ইতিমধ্যে দুজন ভদ্রলোক আসলেন তাদের সঙ্গে পরিচয় হতে জানা গেল উনারাও জাজমেন্টে আছেন।
তাদের মধ্যে একজন অখিল বাবু বললেন"আপনি রেখা চৌধুরী না?"
রেখা একটু অবাক হয়ে বলল 'কেন বলুন তো?'
আপনার মত লেখিকার সঙ্গে আজকে আমরা একসঙ্গে কাজ করে সময় কাটাবো, এত সৌভাগ্যের ব্যাপার।'
রেখা বলল"এভাবে বলবেন না আমি তো আপনাদের মতই।"
 আমার লেখা পড়েছেন?
"যথেষ্ট বলতে পারি কোনদিন তো সামনাসামনি দেখা হয়নি।
নাইস টু মিট ইউ।'
'আমিও ভীষণ খুশি।'
এসআই অফিস থেকে দুজন প্রতিনিধি এসে ড্রইং শিট দিয়ে গেলেন। তারপর প্রতিযোগীদের স্কুল তাদের নাম কন্টাক্ট নম্বর ,ক্লাস, সব লিখে নেয়া হলো। নির্দিষ্ট টাইম দিয়ে শুরু হয়ে গেল প্রতিযোগিতা।
নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হলে তাদের ড্রইং শিট তুলে নেয়া হলো ।তারপর সমস্ত প্রতিযোগীদের জন্য ছিল টিফিন এর ব্যবস্থা  তাদেরকে একটু বসতে বলা হলো এবং পাশের রুমে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বাংলার উন্নয়নের জন্য যে সমস্ত প্রকল্পগুলো চালু করেছেন সে সম্পর্কে তাদেরকে ভালো করে দেখানো হলো।
প্রতিযোগীরা ভীষণ খুশি তারপর তারা বাড়ি চলে গেল। জাজমেন্ট এর দায়িত্বে যাঁরা ছিলেন তাঁরা সকলে একমত হয়ে মূল্যায়ন করলেন ।পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত একটা গ্রুপের মধ্যে ফেলা হয়েছে নবম থেকে দ্বাদশ পর্যন্ত একটি গ্রুপের মধ্যে ফেলা হয়েছে। তাদের মূল্যায়ন করা হয়েছে। মূল্যায়ন কপি এসডিও  সাহেবের কাছে পাঠানো হয়েছে ।এবার তাদের জন্য যে পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয়েছে সেটা পরে সেই কন্ট্রাক নম্বরে প্রতিযোগীদেরকে জানিয়ে দেয়া হবে।
ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম এসে ক্যামেরাবন্দি করে নিয়ে গেলেন।
সব কাজ শেষে সকলের জন্য ছিল টিফিন এর ব্যবস্থা  ।প্রত্যেকের হাতে প্যাকেট ধরিয়ে দেয়া হলো। রেখা তখন ট্রেন ধরবে বলে ছুটছে। একজন ভদ্রলোক বললেন "ম্যাডাম আপনার টিফিন বাক্স টা নিয়ে যান। রেখার তখন তাড়া তখন সেই ভদ্রলোক ছুটে গিয়ে রেখার হাতে দিয়ে আসলেন।"
রেখা জানে এই ট্রেনটা মিস করলে তার অনেক রাত হয়ে যাবে তাই মরি-বাঁচি করে এসে ছুটতে শুরু করল টোটো ধরবে বলে। রেখা টোটো পেয়েও গেল তারপর বসে বসে ভাবতে লাগলো জীবনে কত কিছু শেখার বাকি আছে। "যতদিন বাঁচি ততদিন শিখি। একটা নূতন অভিজ্ঞতা হল রেখা র । আর ওই অখিল বাবু কি অমায়িক।
কে দেখে কতটা খুশি হয়েছিলেন সত্যি তো তাই ছোটবেলায় আমরাও তো ভাবতাম লেখক মানেই কোনো ভিনগ্রহের বাসিন্দা লেখিকা আশাপূর্ণা দেবীর মধ্যে দিয়ে আমাদের সেই ছোটবেলার কিশোরের ছবিগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।এটাই  রেখার জীবনের প্রাপ্তি। টোটোওয়ালা বলল এসে গেছে এসে গেছে নামুন।
রেখা একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল ও আচ্ছা আচ্ছা বলে তাড়াতাড়ি নেমে পড়ল। ওবাবা মোদীকে মেয়েগো করেছে বৃষ্টি হবে নাকি কোথাও কোথায় বৃষ্টি হয়ে গেছে একটা ঝড়ো ঠান্ডা হাওয়া বইছে এমন সময় একটা ছোট্ট শিশু এসেরে খাড়া চুল টেনে ধরলো রেখা একটু থমকে গেল কি সারল্য মাখা মুখ ভিক্ষা চাইছে রেখার তখন ট্রেন ধরার তারা কিন্তু তবুও দাঁড়িয়ে আশেপাশে খোঁজার চেষ্টা করলে সঙ্গে আর কে আছে দেখল দূরে ওর মা মায়ের জীর্ণশীর্ণ বস্ত্র পরিয়ে তার ভাবনা চিন্তার কোনো অবকাশ ছিল না বাচ্চাটার হাতে 100 টাকা ধরিয়ে দিয়ে চলে আসলো। কি আজব আমাদের দেশ ছোট্ট শিশুর যেখানে তার শৈশবের দিনগুলো হেসে-খেলে বেড়ানোর কথা সেখানে তার জীবন জিজ্ঞাসা এসে 
দাঁড়িয়েছে ।খাব কি? প্রশ্ন তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে । অথচ অন্নর অধিকার আমাদের মৌলিক অধিকার । এই অধিকারের দাবিতেইএ শিশু যেন কতটা পরিণত হয়ে গেছে। এক বিচিত্র অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হল রেখাকে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়েরেখা এ কথাই ভাবতে ভাবতে প্ল্যাটফর্মের দিকে পা বাড়ালো।

কবি জাহানারা বুলা এর কবিতা "সময় একটি নক্ষত্র"





সময় একটি নক্ষত্র

জাহানারা বুলা



সময় শুধু ভালো না লাগার কক্ষপথে ঘুরে বেড়ায়
নক্ষত্রটি গুলতি মেরে উড়িয়ে দেওয়া যেত যদি

যদি এই খারাপ লাগাগুলো ঝরে পড়তো 
অতল কোনো পাত্রে, সমুদ্র বা মাঠে 
আমার ঘরের ছাদও যদি হতো ঝরে পড়ার 
উপযোগী জায়গা 
বলতাম- ঝরে পড়

আমি নাহয় ঘর ছেড়ে বিবাগী হয়ে যেতাম
দ্বারে দ্বারে মুঠো চালের পরিবর্তে 
ভালোলাগা ভিক্ষা করে ফিরতাম। 

ভালোলাগা ভোরের শিশিরের মত
বেলা উকি দিলেই কাতর প্রাণে
কোন মেঘের আড়ালে যে পালিয়ে যায় কে জানে।

মাথার উপরে অশুভ কালো মেঘও যে ভর করে থাকে
হাত বাড়ানো মানা
ভালো লাগা তাই হাতড়ে পাওয়া যায় না।

কবি পরাণ মাঝি এর কবিতা "সোয়েটার"





সোয়েটার 

পরাণ মাঝি 



এই পয়লা ফাল্গুন দিনে  জড়িয়ে ধরো না আমাকে
পুড়ে যাবে , ঘেমে যাবে শরীর ---
টুপটাপ করে গড়িয়ে পড়বে অযাচিত প্রেম, ভিজে ভিজে পুড়বো আমিও!

তারপর --
হয়ত বিরক্ত হবে, ছুঁড়ে ফেলবে। ভাববে আপদ গেল।

না গো --
যত দূরেই ছুড়ে দাও না কেন আমাকে 
ঘুরে ফিরে ঠিক আবার আসবো কাছে ।

জেনে রেখো ---দিন বদলায় , তারিখ বদলায় না; ঋতুও ---

আগামী হেমন্তের শেষে পড়বে মনে আবারও
আমি শীতার্ত প্রেম তোমার; কেবল উষ্ণতা দান করি 
                     ভীষণ ভালোবাসি তোমার সকল কাজ কারবার 
                    আমি আর কেউ নই, সামান্য সোয়েটার তোমার!!