২২ জানুয়ারি ২০২২

কবি সেলিম সেখ এর কবিতা





বীর সৈনিক
সেলিম সেখ


ওহে বীর সৈনিকের দল তোমরা অবিচল,
রক্ষা করতে জন্মভূমিকে বদ্ধপরিকর।

তোমরা রণবীর,করনি নত শির,
দেশের মান রক্ষা করতে হয়েছো সৈনিক। 

 শত্রুদের করেছো পরাজয়,
তাই আজ করছে তারা ভয়। 

সৈনিক তুমি তোমার সাহসে দেশ যে সাহস পাই, 
দেশের ভিটে রক্ষা করো প্রাণ যদি চলে যায়। 

ওই দেখো ভাই বীর সৈনিক হারাচ্ছে আজ প্রাণ, 
ওদের রক্ত সাক্ষ্য দেবে আমরা দিয়েছি বলিদান। 

দেশরক্ষায় লিখিয়েছে নাম ওরা সকলেতে, 
তাইতো আজ পড়ে রয়েছে দেশের কোলেতে। 

ওদের বুকের ওপর থাকবে যেদিন দেশের পতাকা, 
ফুল দিয়ে শেষ বিদায় দেবে, দেবে শহীদের মর্যাদা। 

যুদ্ধের সময় তোমরা যদি না দেখাতে বীরত্ব, 
দেশ আজ হতোনা পরাধীনতা থেকে মুক্ত। 

তোমাদের আত্ম বলিদান ভুলবে না কভু দেশ, 
যতদিন থাকবে এই প্রাণটুকু অবশেষ।

২১ জানুয়ারি ২০২২

কবি আব্দুস সালাম এর কবিতা




রূপকথার বক
আব্দুস সালাম 


করোনা মাখানো শ্বাসকষ্টের সংসার শব্দহীন যাতনাগুলো   বৃষ্টিবাদলে   ঝাপটা খায়
 চুমু খায় বিপন্ন বিশ্বাস 

শব্দের আলনায় টাঙিয়ে রাখি স্বপ্ন
 রক্তাক্ত বিবেক চড়ে জীবনের পিঠে 
চুরমার হওয়া মানুষ ভাষণ শোনে অন্ধকারের
  তার পর আত্মক্ষরণের পুকুরে  সেরে নেয়  স্নান 

 বসবাসের ঠিকানায় দাফন হয় সভ্যতা ভাবের ঘরে রুদালীরা  আসে
  অলীক কান্নার বাষ্পায়নে মুখর করে মহল্লা
 দুঃখের প্রহসন সাজায় ,
মৃত শবের উপর ভনভন করে মাছি
ভাঙা রেলিঙে বসে শিকার খোঁজে প্রত্যাশার বক

 আমাদের আশ্বাস গুলো ঢেউয়ে ঢেউয়ে মাতোয়ারা 
 প্রার্থনার ঘরে বসে আছে অলীক ভগবান বিশ্বাসের চাতালে  মাথা ঠুকি দুবেলা
 নিদ্রালু চোখে পুরোহিত ছিটিয়ে দিচ্ছে শান্তিজল 
রূপকথার পাতালপুরীতে তলিয়ে যাচ্ছে আমাদের  সব আহ্লাদ




১২/০১/২০২২

কবি সুবর্ণ রায় এর কবিতা




প্রেম
 সুবর্ণ রায়


একটা ঘর থেকে আর একটা ঘরে 
একটু একটু করে চলে যাচ্ছে অন্ধকার…

একটা ঘরে একটু একটু আলোর ছায়া
একটা ঘরে দীর্ঘ হচ্ছে আঁধারের মায়া

দুয়ারে এসে দাঁড়িয়ে আছে ভোরবেলা
তুমি আড়মোড়া ভাঙবে না প্রিয়!

২০ জানুয়ারি ২০২২

কবি মুনতাহা জামান মনি  এর কবিতা




এলোমেলো পথ
মুনতাহা জামান মনি 


বলেই তো ছিলেম আমি!
আমার পথ এতটা মসৃণ  নয়
যতটা তুমি ভাবো।

বহুদূর  হাঁটা তো দূরের কথা 
হয়ত একটু  হেঁটেই হোঁচট  খাবে
যতটাই কাছে টানো দূরত্ব  বাড়াই তবে।

দেখোনা নিজের  দৃষ্টিতে - আমাকে
বড্ড  গোলাটে  মনে হবে,
আমার দৃষ্টিতে  দেখতে জানলে
সুন্দর  সঠিক  লাগবে অনুভবে।

মানুষ  হলে-ও  মানুষ  আলাদা নিজের  মত
পূস্প যেখানে  গোছায় গোছায়
কাটা ও বিরাজমান  তত।

কড়া  নেড়ে  হৃদ দূয়ারে
জোর  খাটানো  ইচ্ছে গুলো
মরে গেছে  সে-ই  কবে। 

এই তো  বেশ আছি
হেসেই  ব্যাথা  উড়াবো,
যখন  আমি বন বিলাসী   হব
ফুল কুড়াবো -ছেড়ে  দিলেই  তবে।

মানি জামানের ধারাবাহিক উপন্যাস /৪





ধারাবাহিক উপন্যাস

সেদিন গোধূলি সন্ধ্যা ছিল
( ৪ র্থ পর্ব ) 
মনি জামান


মেবিন আর নিলয় অপেক্ষা করছে চারুর জন্য,ট্রেন থেকে নেমে ষ্টেশনে ওরা দুজন প্রায় তিরিশ মিনিট বসে আছে কিন্তু চারু এখনো এলো না।মেবিন ফোনটা হাতে নিয়ে ফোন করলো ওর বান্ধবী চারুর কাছে চারু ফোন রিসিভ করে বলল,কোথায় তোরা এখন,মেবিন বলল,ষ্টেশনে বসে আছি প্রায় আধা ঘন্টা হবে।আমরা ট্টেন থেকে নেমেই তোর জন্য অপেক্ষা করছি।
চারু বলল,নিলয় এসেছে নাকি ওর তো আসার কথা,মেবিন বলল,কি জানি,চারু বলল,তোরা অপেক্ষা কর আমি এখুনি চলে আসছি তোদের নিতে।
মেবিন ফোনটা কেটে দিলো চারুর আসবার অপেক্ষায় নিলয় আর মেবিন বসে রইলো আর বার বার ঘড়ি দেখছে মেবিন।নিলয় আর মেবিন দুজনেরই ট্রেন জার্নিতে রাতে ঠিকমত ঘুম হয়নি মেবিন নিলয় স্বপ্ন ঘুমে আছন্ন ছিল গোটা রাত জুড়ে।
প্রায় আধা ঘন্টা পরে চারু ওর বাবার গাড়ি নিয়ে হাজির হলো স্টেশনে,নিলয়কে দেখেই চারু মেবিনকে বলল,তুই যে বললি নিলয় আসিনি এইতো নিলয় খুব ভালো লাগছে নিলয়কে দেখে।
মেবিন স্বভাব সুলভ হেসে বলল,আরে বললে তুই তো প্যাচাল করতি তাই তোর জন্য সারপ্রাইজ রেখেছিলাম,চারু এক গাল হেসে বলল,হয়েছে এবার গাড়িতে উঠে বসো বস,নিলয় আর মেবিন চারুর গাড়িতে উঠে বসলো,চারু ড্রাইভারকে  বলল,গাড়ি ছাড়তে ড্রাইভার গাড়ি ছাড়লো।মেবিন চারুকে বলল,স্টেশন থেকে  তোদের বাসায় যেতে কত সময় লাগবে
চারু বলল,মাত্র আধা ঘন্টা কেন সমস্যা হচ্ছে তোর মেবিন বলল,খুব ঘুম পাচ্ছে গো চারু বলল,কি ব্যাপার সারারাত বুঝি!মেবিন চারুকে একটা ছোট্ট চড় দিয়ে বলল,খুব ফাজিল হয়েছিস তাই না।
চারু আর মেবিন দুজনেই হেসে উঠলো,
চারু আবার বলল,সত্যি করে বল আমাকে সব মেবিন বলল,কি বলবো সেটাই তো বুঝতে পারছিনা গো।চারু বলল,না বুঝার ভান করছিস না সব আমাকে বল চারু একটু অভিমানের সুরে বলল ঠিক আছে না বলিস শুনবো না আর তোদের কথা।
আমি তো তোর বেষ্ট বান্ধবী হতে পারলাম না,মেবিন চারুকে বলল,এই ফাজিল এখানে শুনবি না বাসায় চল তারপর সব তোকে বলবো।
চারু আর মেবিনের কথোপকথনে সময়টা কখন যে পার হয়ে গেলো একটুও টের পাইনি,এর মধ্য গাড়ি এসে থামলো চারুদের বাসার সামনের গেটে।
চারু গাড়ি থেকে নেমেই মেবিনকে বলল, নিলয় আর তুই নেমে আয়,মেবিন ও নিলয় দুজনেই গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো।চারু ড্রাইভারকে বলল,ব্যাগ পত্র নামিয়ে বাড়ির ভিতর আসতে,বলেই নিলয় আর মেবিনকে সাথে নিয়ে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করলো।চারুর মা ওদের জন্য অপেক্ষা করছিল ওদের দেখেই স্বাগতম জানালো এবং নিলয় আর মেবিনকে জিজ্ঞেস করলো তোমরা কেমন আছো,বাড়ির সবাই কেমন আছে নিলয় আর মেবিন সব বললো,চারুর মা মেবিনকে বলল,এই বুড়ো মেয়েটার কথা বুঝি মনে নেই আজ মনে পড়লো।
মেবিন বলল,মনে আছে আন্টি আর আছে বলেই তো মেয়েকে দেখতে এলাম।
চারুর মা চারুকে বলল,তুই ওদের নিয়ে রুমে নিয়ে আয় আমি নাস্তা নিয়ে আসি বলেই রান্না ঘরে চলে গেলো।
নিলয় আর মেবিন চারুর রূমে এসে বসলো,চারু নিলয় আর মেবিনকে ওয়াস রূম দেখিয়ে দিয়ে বলল,তোরা ক্লান্ত তাড়াতাড়ি ফ্রেস হয়ে নে মেবিন আর নিলয় দুজন ওয়াস রূমে গিয়ে ফ্রেস হয়ে তারপর এসে সোফায় বসলো,চারু মেবিন আর নিলয় খোশ গল্পে মেতে উঠলো,চারু হেসে বলল,কেমন কেটেছে তোদের দুজনের বল শুনি একটু,মেবিন বলল,কেমন কাটবে আর সবার যে রকম কাটে আমাদেরও তাই কেটেছে,এমন সময় চারুর মা ওদের জন্য নাস্তা বানিয়ে এনে টেবিলে দিয়ে বলল,নাস্তা সেরে নাও তারপর তোমরা গল্প কর বলেই রূমের দিকে চলে গেলো,চারু মেবিন ও নিলয়কে মেবিনকে সাথে নিয়ে নাস্তার টেবিলে এসে বসলো,তারপর নাস্তা পরিবেশন করার ফাকে ফাকে চারু দুষ্টমির তীর ছুড়ছে মেবিনের দিকে।
চারু নিলয়কে বলল,দুলাভাই কেমন কাটলো তোমার লং জার্নিটা বলো শুনি নিলয় কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না বলে দিলো ফাটাফাটি।চারু হেসে বলল,ওটা অমন বলেই,,,আবার হাহাহা করে হেসে উঠলো। মেবিন চারুকে বলল,শোন ইদানীং খুব ফাজিল হয়েছিস তুই!এটা ভালো হচ্ছে না কিন্তু।চারু বলল,ওমা কি বলিস সত্যকে সত্য বলা কি মহা অন্যায়!মেবিন বলল,হয়েছে এবার থাম তো তুই।
চারু আবার নিলয়কে বলল,দুলাভাই আরব্য রজনীর হাজার রাতের গল্পটা তুমি বলো আমি শুনি আমি জানি মেবিন কখনো বলবে না আমাকে,নিলয়ের কেন জানি দুলাভাই শব্দটা মারাত্মক ভালো লেগে গেলো কি একটা যাদু যাদু ভাব আছে দুলাভাই শব্দটার ভিতর।
চারু বলল,কি হলো দুলাভাই বলো শুনি!মেবিন চারুকে বলল,থামবি চারু পরে একসম সব শুনিস,চারু মেবিনকে বলল,আমি চিনি না তোকে তুই বলবি আর আমি শুনবো,আমি তো চিনি তোকে।নিলয় মেবিন আর চারু নাস্তা শেষ করলো তারপর চারু মেবিনকে বলল,আয় তোর রূম দেখিয়ে দেই এখন ঘুমাবি ঘুম থেকে উঠলে ঘুরতে বের হবো,চারু নিলয়ের রূমটাও দেখিয়ে দিল মেবিন আর নিলয় ওদের রূমে গেল ঘুমাতে।

চলবে.....

মমতা রায় চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস ৯৫ পর্ব




উপন্যাস 

টানাপোড়েন ৯৫

অপ্রত্যাশিত
মমতা রায় চৌধুরী

নদীর মনের ভেতরের তারগুলি ক্রমশ এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। কেমন যেন একটা বেসুরোভাব । হৃদয়তন্ত্রীতে যেন আর কোনো সুরেলা সুর  বেরোবে না। তার সঙ্গেই কেন এরকম হচ্ছে। নদীর স্বচ্ছন্দ গতিপথ কেন বারবার আটকে যাচ্ছে?তার ভেতরের সাজানো বাগান টা কেন এমনি করে তছনছ হয়ে যাচ্ছে?'
অনেক রাত অব্দি জানলার কাছে দাঁড়িয়ে  সিগারেটের পর  সিগারেট খেয়ে যাচ্ছে ।ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে যাচ্ছে চারিদিকটা। তার জীবনটা তো এরকম হওয়ার কথা ছিল না।
প্রথমে তার জীবন থেকে তার সব থেকে কাছের মানুষ তার বাপি চলে গেল। বাপিকে তো আর সেখান থেকে ফেরানো যাবে না। ইচ্ছে করলো বাপি কে স্পর্শ করা যাবে না।
এরপর মা ও তার থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে।
হঠাৎই নিচে ঝর্ণা মাসির কথার আওয়াজ পাওয়া গেল। 'বৌদি এখন কেমন বোধ করছ?'
নদী কথাগুলো না শোনার চেষ্টা করছিল। তবুও কথাগুলো কানে শোনা যাচ্ছিল ভাসা ভাসা।
রুপসা অনেক ক্লান্ত স্বরে বলল' ভাল ।'
তারপর হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে কাঁচের জলের ক্লাসটা নিতে যাচ্ছে ।
তখনই ঝর্ণা ছুটে এসে বলল' একি আমি রয়েছি তো ?তুমি কেন নিতে যাচ্ছো আবার কিছু একটা অঘটন ঘটাবে নাকি?'
রুপসা একটু মলিন হেসে বলল' তুমি আর কত করবে ঝর্ণা?'
ঝর্ণা বললো 'আমি তো কাজ করতেই এসেছি।'
রুপসা বলল 'তা হলেও তুমি না থাকলে আজকে আমি নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারতাম না।'
তারপর উৎসুকভাবে এদিক-ওদিক দেখতে 
লাগল ।কাউকে খোঁজার চেষ্টা করছে যেন।
ঝর্ণা বললো 'তুমি কি মামনিকে  খোঁজ করছ?'
রুপসা বলল 'আজকের জন্মদিনটা মাটি হয়ে গেল ।জন্মদিনটা মাটি হয়ে গেল ঝরনা।'
ঝর্ণা বললো 'সব ঠিক হয়ে যাবে বৌদি?'
রুপসা বলল 'আমি জানি আমার মেয়েটা আমাকে কখনো ক্ষমা করতে পারবে না।'
ঝরনা একটু চুপ করে রইলো।
রুপসা জানলার দিকে তাকিয়ে আছে শূন্য দৃষ্টিতে চারপাশটা যেন মনে হচ্ছে শুধু ফাঁকা, শুধুই অন্ধকার, শুধুই অস্তিত্বহীন টিকে থাকা।
ঝর্ণা বললো' বৌদি আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে।'
রুপসা বলল 'কি করে হবে ঝরনা? আমার মেয়ের একটা স্পেশাল দিন। আমি মা হয়ে তার কাছে থাকতে পারলাম না ।এর থেকে কষ্ট আর কি আছে বলতে পারো তুমি?'
ঝর্ণা বললো 'আজকে তুমি অফিস থেকে বের হতে পারলে না কেন বৌদি?'
রূপসার চোখে জল। 'তোমার দাদা মরে গিয়ে আমাকে মেরে গেছে। কেন যে আমি এই অফিসে চাকরি নিলাম?'
ঝর্ণা বললো 'কিছু খারাপ কিছু ঘটেছে?'
রুপসা তখনও শূন্য দৃষ্টিতে বিহ্বলভাবে তাকিয়ে আছে ঝর্ণার দিকে।
ঝর্না এবার বৌদির কাছে এসে  মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল' কি করবে বলো ?আমরা তো নারী। আমরা জানি আমাদের শত প্রতিবন্ধকতা জীবনে আসে ।এই প্রতিবন্ধকতাকে ঠেলে আমাদের এগিয়ে যেতে হয়। সমাজ আমাদেরকে অন্য দৃষ্টিতে দেখে।
রুপসা বলে' আমি এভাবেই একদিন শেষ হয়ে যাবো জানো?'
ঝরনা বৌদির মুখে হাত দিয়ে বলে' খবরদার বৌদি এভাবে কথা বলবে না তুমি?'
রুপসা বলে 'ঝরনা আজকে তুমি আমার কাছে আছো বলে ,তোমার সঙ্গে দুটো কথা বলে আমি শান্তি পাই।'
ঝরনা বলে' তুমিও তো আমাকে কোন পাঁক থেকে তুলে এনেছ বৌদি ।আমার নতুন জীবন দিয়েছ।'

রূপসা বলে 'কিন্তু আমার জীবন যে পাঁকে পরিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।'
ঝরনা বলছে 'বৌদি তুমি এভাবে কেঁদো না ।আমি জানি তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে।'
রূপসা বলছে' আমার হৃদয়খানা টুকরো টুকরো হয়ে গেছে ঝরনা। আমার একমাত্র মেয়ে সে যদি আমাকে ছেড়ে চলে যায় । আমি বাঁচতে পারব না।'
ঝরনা বলছে 'না না আমাদের মামনি সে রকম মেয়েই না। ঠিক তোমাকে বুঝতে পারবে। একদিন দেখো বৌদি।'
রুপসা কেমন হাপুস নয়নে কাঁদছে ঝরনার বুকে মাথা রেখে।
' আমি আজকে যা কিছু করছি সব আমার মেয়ের জন্য করছি। আমার জীবনের কি আছে তুমি বল তো?'
ঝরনা বলছে' কেঁদো না বৌদি।  মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ক্রমশ সান্তনা দিচ্ছে। আর বলছে চুপ চুপ।'
নদীর হঠাৎ করেই কথাটা কানে আসে। নদী ভাবতে থাকে তাহলে কি সে মামনিকে কী ভুল বুঝছে?'
ভাসা-ভাসা কথাগুলো কানে আসছে। একটু কৌতুহলী হয়ে উঠছে নদী।
সবকিছু যেন কেমন তালগোল পাকিয়ে
 যাচ্ছে ।নদীর হাত থেকে সিগারেটটা পড়ে
 গেল ।আর ইচ্ছে করলো না তুলে আর একবার সুখটান দিতে। আজকাল তো এই সুখটানেই বেঁচে আছে নদী।
এমন সময় সমুদ্র ফোন করে। রিং হয়ে যাচ্ছে নদীর ফোনে। নদী তাকিয়ে দেখে সমুদ্রর ফোন। 
আর মনে মনে বলে'এই শালা, আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দেবে না এক দন্ড।
কারণে-অকারণে ফোন করতেই হবে।'
নদী ভাবছে সত্যিই আজকাল ও যেন কি সব শব্দ উচ্চারণ করে ফেলে ,এটা তো তার ডায়রিতে কখনো ছিল না। দ্রুত কি পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে নদী। তবে কি এখনো তার ভেতরে একটু-আধটু সংস্কার বা নীতিবোধ কাজ করছে? যার জন্য এই শব্দ উচ্চারণ করার পরও কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে।'
আবার পরক্ষনেই নদী ভাবছে 'একটু বেশিই  রিয়াক্ট করে ফেলছে সমুদ্রের প্রতি। ওই তো আপদে-বিপদে অনেক থেকেছে।  তাই বলে নদীর জীবনে কোন প্রাইভেসি থাকতে পারে না?'
দু'তিনবার রিং হয়ে কেটে গেল। আবার ফোন বাজছে।
এবার নদী বিরক্ত হয়ে ফোনটা রিসিভ করল বলল 'কেন রে তুই ,সবসময় আমাকে এত জ্বালাস ?কি দরকার তোর?'
সমুদ্র একটু হকচকিয়ে যায় তারপর কিছুক্ষন নিরুত্তর থেকে বলে 'একটা খারাপ খবর আছে নদী?'
নদী বলল 'কোনো সুখবর থাকে না আমার জন্য।
তবুও বল শুনি?'
সমুদ্র বলল' এক্সিডেন্ট'।
নদী যেন আকাশ থেকে পড়ে ছিঃ ছিঃ ছিঃ।না জেনেবুঝে কেন সমুদ্রকে এতগুলো কথা শোনালো ।
তারপর একটু নরম সুরে বলল  'কার এক্সিডেন্ট?'
সমুদ্র বলল'আজ অরুনাভদার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে?'
নদী বলল 'কি বলছিস তুই?
নদীর কাছে এটা একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত অপ্রত্যাশিত তাই হতভম্ব ভাবে প্রশ্ন করল
'কখন ,কিভাবে?'
সমুদ্র বলল 'মেডিকেল কলেজের সামনেই। মারাত্মক চোট পেয়েছে। মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়েছে।'
নদী বলল 'এ বাবা, কি কথা শোনাচ্ছিস?'
সমুদ্র বলল 'আমরা প্রায় সবাই যাচ্ছি।  তুই কি আসবি?'
নদী বলল' আলবত যাব।'
সমুদ্র বলল 'অরুনাভদা কতটা প্রগ্রেসিভ জানিস তো সমস্ত ব্যাপারে ?পড়াশোনা বল ,কালচারাল বল...।'
নদী বলল' ঠিক আছে। তুই আমার বাড়ির সামনে চলে আয় ।আমি তোর সঙ্গে বাইকে চলে যাব।'
সমুদ্র বলল' ওকে।'
নদী ভাবছে  'এই তো কদিন আগে অরুনাভদার সঙ্গে কথা বলতে বলতে হাঁটছিলো ,কত মজার কথাই জানে। মন খারাপের দিনগুলোতে অরুনাভদা যেন মুশকিল আসান।
 ওয়ারড্রব থেকে জিন্সের প্যান্ট টা বের করে পরতে গিয়ে বোতাম লাগাতে লাগাতে ভাবছিল এসব কথা।
সঙ্গে একটা কুর্তি পরে নিল আর একটা উইন চিটার পরে নিল।, ঠান্ডা আছে, বাইকে গেলে লাগবে ঠান্ডাটা।
এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে নিল প্যান্টের 
পকেটে । সমুদ্র আর তীর্থ যা হ্যাংলা ।ওদের কাছে চাইলেও সহজে পাওয়া যাবে না ।যদিও চটাতে চাইবে না ।দেবে। তবুও লক্ষীর ভান্ডার পূর্ণ করে নিয়ে যাওয়া ভালো।
দরজাটা লক করে ফোনটা বুকপকেটে নিয়ে তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে নামছে, জুতোর আওয়াজ শুনে রুপসা ঝরনাকে ধাক্কা দিয়ে ব্যাপারটা বোঝার জন্য বাইরে যেতে বলল ইশারায়।
এরমধ্যে গেটের কাছে এসে হর্ণ বাজাচ্ছে সমুদ্র।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে নদী হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল
ঝরনা মাসিকে দেখে।
ঝর্ণা বললো 'কোথায় যাচ্ছো মামনি?'
নদী বলল' একটু দরকার আছে মাসি ,বেরোচ্ছি।'
ঝর্ণা বললো' রাত হয়ে যাচ্ছে এখন বেরোলে?'
নদী একটু বিরক্ত হয়ে বলল 'ঝরনা মাসি কলকাতা শহরে এই সময়টা রাত নয়। বলো সন্ধ্যে। তারপর ঝর্নাকে বলল 'সরো ,সরো ,
সরো ।আমার তাড়া আছে।'
সমুদ্র তখনও হর্ন বাজিয়ে যাচ্ছে।
নদী বলল চেঁচিয়ে 'এই দাঁড়া নেমে গেছি।'তারপর মুখ ফিরিয়ে ঝরনা মাসিকে বলল'আমার ফিরতে দেরী হতে পারে?'

কবি রাজেশ কবিরাজ এর কবিতা




আবার মনে পড়ে 
রাজেশ কবিরাজ

আমি শহরের মানুষের ভালোবেসে দেখেছি
পাইনি গ্রামের মানুষের সেই স্বাদ,
সেই স্নেহভরা মায়াবী হাত ।  সেই হাত -
কবে ছেড়ে এসেছি  আমি ! তারপর
শেষ হয়ে গেছে কত অন্ধকার ভয়ঙ্কর  রাত ।

তারপর ভুলক্রমে এক অচেনা রূপসী
নারীকে ভালোবেসে দেখেছি, তারা শুধু 
খোঁজে রুপ আর কোটি কোটি  টাকা ।
তারা চেনে না'কো কোনদিন মানুষের মন,
ভালোবেসে দেখেছি সেই রূপসীদের প্রতিক্ষণ ;
তারা করেছে আমায় বারবার বোকা,
তাই এখন খুব ভালোবাসি থাকতে  একা একা ।

আমাকে দেখেনা আর খোলা সবুজ মাঠ,
আমিও দেখি না সেই পুরাতন খেয়াঘাট ।
সেই খেয়াঘাট, যে ঘাটের এপার ওপার -
দাঁড়িয়ে থাকে কত অচেনা মানুষ,
অনেক প্রতীক্ষায় সেই বয়ে চলা বিশাল
জলাধারী ঘোষখালি নদী হবে বলে  পার ।

আমাকে টানে আমার সেই ফেলে আসা
মাতৃতুল্য আগলে রাখা সেই সবুজ গ্রাম,
সোনালী ধানের ক্ষেত, সেই -
চেনা মানুষের মুখ প্রতিনিয়ত  বার বার ।

তারা আমাকে বলেছিল জাপ্টে ধরে
আমাদের ছেড়ে যাস না এই বিদেশে,
তবে যাচ্ছিস যখন যা, বাধা দেব না ।
তারা বলেছিল আমায় ভালো থাকিস  বারবার,
মনে পড়ে যদি আসিস আমাদের দেখতে আবার ।

কবি শামরুজ জবা'র কবিতা




আমরা বাঙালী 
 শামরুজ জবা 

পরিচয়ে আমরা বাঙালী, বাংলা আমাদের ভাষা,
এই ভাষাতে কথা বলে মিটাই মনের আশা। 
বাংলা আমার জন্মভূমি, বাংলা আমার দেশ,
এই দেশেতে বসত করে সুখে আছি বেশ।
অল্প আয়াসে শস্য ফলে,উর্বর বাংলার মাটি,
ফলে, ফুলে ভরা অপরূপ সৌন্দর্যের ঘাটি। 
হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান সকলে ভাই ভাই, 
একে - অপরের বিপদ - আপদে সবাই এগিয়ে যাই। 

বাঙালী পরিচয়ে আমরা চলি এক সাথে, 
বাধা পেলে প্রতিহত করি শক্ত হাতে। 
শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করে দিয়েছি বীরত্বের পরিচয়,
কখনই আপোষ করিনি আমরা ছিনিয়ে এনেছি জয়।

আমরা বাঙালী বীরের জাতি ইতিহাসের কথা, 
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু আমাদের মহান নেতা। 
আজও আমাদের অধিকার কেও করতে পারেনি খর্ব,
বাঙালী বলে পরিচয় দিতে তাই করি সকলেই গর্ব।

শামীমা আহমেদ/পর্ব ৫৪




শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত 
(পর্ব ৫৪)
শামীমা আহমেদ 



রাহাতের সাথে কথা শেষ  করে তাকে বাসায় নামিয়ে ঘরে ফিরতে ফিরতে শিহাবের  প্রায়  রাত সাড়ে দশটা বেজে গেলো। সপ্তাহ শেষে   দুজনে  একসাথে আজ বেশ কিছুটা সময় কাটালো  "টেবিল টপ" রেস্টুরেন্টটায়। শিহাব রাতের মত কিছু খাবার খেয়ে নিয়েছে। সেখানে রাহাতকে ডিনার করাতে চাইলেও একেবারেই রাজি  করানো গেলো না।রাহাত জানালো,সারাদিনের ক্লান্তির পর সে বাসায় ফিরবে।মা আর শায়লা আপুর সাথে রাতের খাবার খাবে।শিহাব জানালো,আমার জন্যতো এখানে আর কেউ অপেক্ষায়  নেই। আমাকে এভাবেই জোড়াতালি দিয়ে জীবন কাটাতে হচ্ছে।এভাবেই মানিয়ে নিতে হচ্ছে।
রাহাত শিহাবের কষ্ট  বুঝতে পারলো।তাকে আশ্বাস দিলো, শীঘ্রই আপু আপনার জন্য খাবার নিয়ে অপেক্ষায় থাকবে। দিনশেষে আপনি যখন ঘরে ফিরবেন আপু আপনার দরজা খুলবে। আপনাকে অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতে কাপড় এগিয়ে দিবে।আপনার পছন্দের খাবার রান্না করবে।আপনারা একসাথে বসে কফি খাবেন।একসাথে ঘুরে বেড়াবেন! রাহাতের কথায় শিহাবের চোখ চকচক করে উঠছিল!  সুন্দর আগামীর আশায় তার মনে স্বপ্নেরা উঁকি দিচ্ছিল।শিহাব বুঝতে পারলো হয়তো এতদিন সে রাহাতের মতই কাউকে মনে মনে খুঁজছিল যার কাছে মন খুলে সব কথা বলা যায়। যে তার না বলা কথাগুলোর বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য এগিয়ে আসবে।চমৎকার কিছু সময় কাটলো দুজনের। শিহাব মনের ভেতর অপার এক আনন্দ নিয়ে আজ ঘরে ফিরলো।মনে হলো সত্যিই পৃথিবীটা খুবই সুন্দর! এখনো সব বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে ভালবাসার জন্য মানব হৃদয় উদ্বেলিত হয়।এখনো নিঁখাদ ভালোবাসার মূল্যায়ন হয়। তার  মনে হলো  নিজের প্রতিজ্ঞা ভেঙে সে কোন ভুল করেনি।হয়তো এমনই হয়,খারাপ সময় খুব বেশিদিন থাকেনা।শুধু শক্ত মনে দুঃসময়টাকে মোকাবেলা করতে হয়।শিহাব শায়লাকে ভেবে স্বপ্নের দোলায় দুলছে আজ।মনে হচ্ছে শায়লা তাকে ঘিরে আছে।শায়লার নিঃশ্বাস,শায়লার মাঝে গোলাপের সুরভির উন্মাদনা খুঁজে পাচ্ছে। খালি ঘরটাতে ঢুকেও  শিহাবের মনটা  আজ  আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে আছে! যেন ঘরময় শায়লার উপস্থিতি সে টের পাচ্ছে।যেন এক্ষুনি শায়লা এসে বলবে, আহ! শিহাব,কত ক্লান্ত তুমি আজ, এ কথা বলেই হাতটা এগিয়ে সবকিছু নিয়ে শিহাবকে ভারমুক্ত করবে। আর শিহাব শায়লার অমন অপরূপ মায়াভরা কান্তির মুখাবয়াবে তাকিয়ে দিনের সব ক্লান্তি ভুলে যাবে। চট করে সে এক টানে শায়লাকে বুকে টেনে নিবে।শায়লার শত আপত্তিতেও একটি গাঢ় চুম্বনে তাকে আবেশিত করবে। শায়লার ছাড়িয়ে নেয়ার শত চেষ্টাকে ব্যর্থ করে শিহাব শক্ত করে তাকে বুকের সাথে বেঁধে রাখবে। যেন কত যুগের জমাটবাঁধা ব্যথার বরফ শায়লার বুকের উষ্ণতায় গলতে শুরু করবে। 
রাহাত আজ এমনি করে শায়লাকে কাছে পাওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।বয়সে ছোট হলেও  রাহাত সবই বুঝতে পারছে।শিহাবের মন চাইছিলো রাহাতকে অতীতের সব খুলে বলতে কিন্তু রাহাত যেন শিহাবের সব কষ্ট বুঝে নিয়ে তা লাঘব করার জন্য নিজেকে প্রত্যয়ী করে তুললো। শিহাব ভাবলো,
রাহাতের মত এমন একটা ছোট ভাই আছে বলেই শায়লাকে পাওয়ায় আর কোন বাধা থাকলো না। আর শায়লার মত বোন যার আছে সেই ভাইতো পৃথিবীর ভাগ্যবানদের একজন। এমনি নানান ভাবনায় শিহাব মনের অজান্তেই নিজেকে শায়লার পরিবারের একজন ভেবে নিলো। বহুদিন শিহাব নিজ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন।মা,বাবা,আরাফ, ভাবী,ভাতিজা, ভাতিজি, ভাইয়া  সবাইকে ভীষণভাবে মিস করছে আজ। ছোটবেলা থেকে বেড়ে ওঠা নিজেদের বাড়িঘর এলাকা সব ফেলে এসে অচেনা মানুষজনের সাথে থাকতে হচ্ছে।তবে শিহাব আশায় বুক বাঁধলো,শায়লাকে নিয়ে আবার তাদের পরিবার হাসি আনন্দে মেতে উঠবে। রিশতিনার সেই ঘটনাটির পর শিহাবদের পরিবারের আনন্দ যেন থমকে আছে।শায়লার প্রতি শুধু শিহাবের অগাধ বিশ্বাস শায়লা সবাইকে আপন করে নিবে,মা ভাবী তারাও শায়লার আপনজন হয়ে উঠবে! শিহাবের মনে হলো চারদিকের ছড়ানো ছিটানো সব দুঃখ কষ্ট গুলো যেন নিমেষেই দূর হয়ে যাচ্ছে, এক সুখের হাতছানিতে সবকিছু  এক কেন্দ্রে একীভুত হচ্ছে। শিহাবের মনের ভেতর নানান কথার ঝড় উঠেছে।শায়লাকে সব বলতে হবে।আজ রাতেই শায়লাকে সব বলবে সে।
শিহাব ফ্রেশ হয়ে স্লিপিং স্যুট পরে নিলো। ঘুমানোর আগে এক কাপ র'কফি হলে দারুন হতো।কিন্তু আলসেমিয়ে তা আর হলোনা।এখন শায়লার দিকেই মনের পাল্লা ভারী হয়ে আছে।কাল সকালে শায়লাকে নিয়ে জিগাতলার বাসায় যাবে। শায়লার সাথে এ ব্যাপারেও একটু কথা বলে নিতে হবে।ওকে মানসিকভাবে তৈরি  করে নিতে হবে।তবে বাসার সবকিছু আগে থেকে জানাবে না,তাহলে শায়লার কাছে কোন কিছুই নতুন মনে হবে না। আরাফের সাথে শায়লার প্রথম দেখা হওয়ার ক্ষণটার জন্য শিহাব উদগ্রীব হয়ে আছে। শায়লাকে বলবে কাল তুমি সবুজ রংয়ের একটা শাড়ি পরবে।শিহাবের মায়ের সবুজ রংটা খুব পছন্দ।
শিহাব ঘড়ি দেখলো। রাত প্রায় বারো টা ছুঁইছুঁই।নিশ্চয়ই শায়লা অপেক্ষায় আছে।শিহাব দেখেছে যত রাতেই শায়লাকে সে নক দেয় না কেন,শায়লা থেকে তার রিপ্লাই আসবেই।কিভাবে যে  ঘুমায় বুঝিনা! সে নাকি জেগে জেগে ঘুমায়! এ এক অদ্ভুত জীবনযাপন!
শায়লা ঘুমিয়েছো?
উহু,,
কেন ঘুমাওনি?
তোমার জন্য অপেক্ষায়। 
আমি যদি নক না দিতাম?
সারারাত অপেক্ষায় থাকতাম।জেগে থাকতাম।
কি বলো? এমনটি করলে শরীর খারাপ করবে।
হউক,তোমার জন্য আমি জেগেই থাকবো।
তারপর সারাদিন ঘুমাবে? তাহলে সংসার দেখবে কে? 
রাতজেগে থাকাটাই আমার আসল সংসার বুঝলেন জনাব।
শিহাবের হাতে মেসেজ লিখে যেন মন ভরছে না। লেখায় কি আর সব অনুভুতি প্রকাশ করা যায়? শিহাব কল দেবার অনুমতি চাইল।
শায়লা সম্মতি জানাতেই মেসেঞ্জারে শিহাবের মুখটা ভেসে উঠলো।যে মুখটা দেখবার জন্য শায়লা দিনরাত অপেক্ষায় থাকে,কিছুদিন না দেখলে আকুল হয়ে উঠে,একটিবার দেখবার জন্য মন ছটফট করতে থাকে।
শায়লার নীরবতায় শিহাব কথা বলা শুরু করলো,
শায়লা তুমি কি বুঝতে পারছো আমরা একটু একটু করে কোনদিকে এগিয়ে যাচ্ছি?
কোনদিকে আবার? ভাললাগছে এটাইতো সব! এই যে কথা বলছি, আর কি লাগবে?
নাহ,এটাই সব না। কাল আমাদের পরিবারের সবার সাথে পরিচয় হবে এরপর তুমি শুধুই আমার হবে,শুধুই আমার।
কথাগুলো বলতে বলতে যেন শায়লাকে তার খুব কাছে পাওয়ার অনুভুতিতে  শিহাব ওপ্রান্ত থেকে অস্ফুট এক মায়াজড়ানো কন্ঠে শায়লাকে জড়িয়ে নিতে চাচ্ছে।বারবার বলছে,শায়লা আমি টের পাচ্ছি তুমি আমার খুব কাছে চলে এসেছো!আমি তোমার সবটা ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছি!
শায়লা বুঝতে পারছে না শিহাবের এই মনের অবস্থায় তার কি করা উচিত।তার ভেতরেও অনেক কিছু ভেঙে মুচড়ে যাচ্ছে। অনেক অপ্রকাশিত অনুভুতির প্রকাশে শায়লাকে আপ্লুত করে তুলছে। দেহের শিরা উপশিরায় রক্তের স্রোত বাড়ছে। হৃদ কম্পনের আওয়াজ যেন শুনতে পাচ্ছে,আর তা ক্রমশই বেড়ে চলছে। শায়লা বুঝতে পারছে না কেন তার নিজের উপর কোন নিয়ন্ত্রণ থাকছে না।অন্ধকারেও শায়লার চোখ শিহাবকে দেখতে পাচ্ছে।মনে হচ্ছে শিহাব তার খুব কাছে এসে বসেছে।খুব কাছে,নিঃ শ্বাসের দূরত্ত্বে তাকে উষ্ণতায় বাঁধতে চাইছে। শায়লা শক্ত করে চোখ বন্ধ করে অনুভবের পূর্ণতায় এক সুখানুভবে নিজেকে ভরিয়ে নিলো।
দুজনেই কিছুক্ষন নীরব  রইল। শায়লা কল কেটে দিলো। বেড সুইচে ঘরে আলো জ্বালালো। মুখে হাত বুলিয়ে দেখলো বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে কপালে। নিজেকেও কেমন যেন নিস্তেজ লাগছে। গলা শুকিয়ে কাঠ! শায়লা পাশে রাখা এক গ্লাস পানি গলায় চালিয়ে নিলো।ভীষণ ইচ্ছে করছিল,এখন শিহাবকে কাছে পেতে। হঠাৎই আয়নায় চোখ পড়লো শায়লার।নিজেকে দেখে নিযেই লজ্জা পেয়ে গেলো।শায়লা দ্রুত ঘরের  বাতি নিভিয়ে দিয়ে দু'হাঁটুর উপর মাথা গুঁজে বসে রইল।ভেতরে এক চাপা উত্তেজনা।যেন শিহাবের ছুঁয়ে যাওয়া অনুভব! শায়লার ভেতর থেকে কান্নার সাগর উগড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে।নিজেকে অসহায় লাগছে।শিহাবের কাছে আশ্রয় খুঁজে ফিরছে। শায়লা মনের অজান্তেই কয়েকবার শিহাব শিহাব বলে ডেকে উঠলো।কিন্তু শব্দগুলো যেন কন্ঠ থেকে বেরুলো না তবুও শায়লার এ ডাক যেন শিহাবের কানে গিয়ে ঠিকই পৌছুলো। 
তক্ষুণি শিহাবের মেসেজ এলো।
শায়লা কি করছো?আমি তোমার ডাক শুনেছি।এইতো আমি, দেখো তাইতো সাড়া দিলাম!
শিহাব এক মূহুর্ত দেরি না করে  আবার মেসেঞ্জারে কল দিলো। শিহাবের ভরাট কন্ঠে 
শায়লা ! ডাকটিতে শায়লা যেন আরো বেশি আবেগাপ্লুত হলো! শায়লা বুঝতে পারে  না, কেন, যত রাত বাড়ে আর ততই আবেগের এমন চেপে বসা। এমন আবেগী কন্ঠে নিজেকে সঁপে দেয়া।বাইরে রাতের আঁধার যতই ঘন হতে থাকে চাওয়া পাওয়ার প্রাবল্য ততই যেন ঘিরে ধরতে থাকে ।মনে হয় যেন শত্রুপক্ষের প্রবল আক্রমণে প্রতিপক্ষকে জয় করে নিতে চাইছে।শায়লা বুঝেনা,  দিনের আলোয় লুকিয়ে থাকা অনুভুতিগুলি যেন রাত হলেই প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। ওদের পাওনাগুলো বুঝে নিতে চায়। বিনিময়ে জীবনাতিপাতে বেঁচে থাকার রসদ যোগায়।শায়লা জীবনের এই বাঁকগুলো  ঠিক বুঝে উঠতে পারে না।কেন দিন আর রাতের এই বৈষম্যের খেলা? কেন একজন মানুষের ক্সছেই সবটা সমর্পিত থাকে।কেন হাজারো মানুঢের চলাচলেও শুধু একজিন মানুষই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এসবের উত্তরে শুধু শিহাব ন্সমটই যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে! শায়লা কোথায় যেন  ভাবনার অতলান্তে ডুবেছে সাথে কিছু লজ্জাও মিশেছে।
শিহাব ওপ্রান্তে অপেক্ষায়।শায়লা,আমি তোমার জন্য নতুন করে বাঁচবার প্রেরণা পেয়েছি।তুমি আমাকে কখনো ছেড়ে যেও না।



চলবে....

১৬ জানুয়ারি ২০২২

মমতা রায় চৌধুরী/৯৪




উপন্যাস 

টানাপোড়েন ৯৪

উচ্ছ্বলহীন নদী

মমতা রায় চৌধুরী

কি কুক্ষণে নদী স্বপ্ন দেখেছিল, তার স্বপ্ন যে বাস্তবায়িত হবে না সেটা তারা আগেই ভাবা উচিত ছিল। নইলে আজকে একটি বিশেষ দিনে কত কিছু ভেবে রেখেছিল, সে সবই চোরাবালিতে ডুবে গেল। মাকে নিয়ে হাজারো স্বপ্ন এঁকে ছিল মনের ভেতর ।হাজারো রং মশাল এর আলোতে জ্বলজ্বল করছিল তার মায়ের মুখচছবি । আজ একি দৃশ্য! মাকে যখন গাড়ি থেকে ধরাধরি করে নামাচ্ছিল, নদী অধীর আগ্রহে ছুটে গিয়েছিল সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নিচে ।
নদীর বিদ্যুৎ গতিতে নদীটাকে ঝরনা আটকানোর চেষ্টা করছিল ।
ঝর্ণা বললো 'কোথায় যাচ্ছো মামনি? কোথায় যাচ্ছ?'
নদী কোন কথার উত্তর না দিয়ে শুধু সামনের দিকে গাড়িটাকে হাতের ইশারায় দেখিয়ে ছুটতে শুরু করল।
ঝর্না বুঝতে পারল' আজ যেটা ঘটেছে সেটা কিছুতেই নদীর সামনাসামনি আসতে দেয়া যাবে না ।নদীকে আটকাতেই হবে।'
 ভড়ন্ত বর্ষার নদী উদ্দাম তার গতিবেগ, উচ্ছ্বল তার জলধারা, তার গতিকে রুদ্ধ করবে 
কে ? বাঁধ দিয়ে আটকাতে গেলেই সে  সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। ঝরনার নদীকে আটকানোর চেষ্টা বৃথা হল ।আর কপাল চাপড়ে বলতে লাগল 'এরপর কি হবে ? কে জানে?
কিন্তু একি নদী হঠাৎ থমকে দাঁড়াল কেন?'
ঝরনা বেশ ভয় পেয়ে গেল। কালবৈশাখী ঝড় আসার আগে যেমন চারিদিকটা থমথমে থাকে ঠিক সে রকম।
নদী ভালো করে তার মাকে পরখ করতে লাগলো 'তার মায়ের কোথাও লাগে নি তো ?তাহলে কি হয়েছে?'
যে দুজন ব্যাপ্তি সঙ্গে এসেছিলেন, শুধু বললেন 'ওনার এখন রেস্ট এর দরকার ।ডিস্টার্ব করবেন না।'
নদী বলল' মায়ের কি  খারাপ কিছু হয়েছে?
হঠাৎ করে এরকম কিভাবে হল?'
ঝরনা ততক্ষণে নদীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
ঝর্ণা বললো' চলো, মামনি ভেতরে চলো।মা ঠিক হয়ে যাবে। মায়ের কিছু হয়নি।'
নদী বলল' তাহলে কেন মাকে সবাই ধরে নিয়ে যাচ্ছে?'
ঝর্ণা বললো' তুমি এসব কিছু বুঝবে না। তুমি ছোট আছো চলো?'
ঝরনা মনে মনে ভাবল' আজকের দিনটা এরকম কিছু না ঘটলেই ভালো হতো।'
ঝরনা জানে বৌদি কতটা অসহায়। বৌদি কেঁদে কেঁদে অনেক কথাই ঝরনাকে বলেছে। কিন্তু উপায় নেই। আজকে দাদা যদি বেঁচে থাকতেন হয়তো এরকম কিছু ঘটতো না। মানুষের ভাগ্য যে কোথায় কাকে টেনে নিয়ে যায়। সংসারটাকে বাঁচানোর তাগিদে আজকে বৌদিকে বলি দিতে হচ্ছে।
ঝরনার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।
ঝরনা জানে বৌদি কতটা অসহায়। তাই এ সমস্ত দিকগুলো ঢাকার জন্য নদীকে  নিয়ে ওপরে চলে আসলো।
নদী কেমন অসহায় ভাবে তাকিয়ে ছিল তার মায়ের দিকে ।সেই দৃষ্টিতে কি ছিল বোঝা মুশকিল হচ্ছিল। 
ঝর্ণা নদীকে যেন বুঝে উঠতে পারছিল না। তার ভেতরে রাগ ,দুঃখ ,অভিমান, আক্রোশ, ঘৃণা কি জমা ছিল?'
মনের ভেতরের সেই অভিব্যক্তি যখন তার চোখে-মুখে ফুটে উঠেছিল, সত্যিই ঝরনা কিন্তু ভয় পেয়ে গেছিল।
হঠাৎই লোকগুলো যাবার সময় বলল 
'কালকে  ম্যাডামকে অফিসে যেতে হবে না। মিস্টার মালহোত্রা মানে আমাদের বস রেস্টে থাকতে বলেছেন।'
নদীর কানে কিন্তু সেই কথাগুলো এসেছে।
নদী মনে মনে ভাবছে 'কি এমন হয়েছে যার জন্য মাকে রেস্টে থাকতে হচ্ছে ?কোন আঘাতের বা অ্যাক্সিডেন্টের তো চিহ্ন দেখতে পেলাম না ।'
কেনই বা মিস্টার মালহোত্রা এ পরামর্শ দিলেন?
তবে কি কোন অন্ধকার অধ্যায় শুরু হতে চলেছে তাদের পরিবারে?
নদী আর  নিতে পারছে না।
নদী আজ আবার সিগারেট ধরিয়েছে। ধোয়া গুলো শুধু ছুঁড়ে দিচ্ছে বাইরে দিয়ে জানলার দিকে। আর ভাবছে কদিন আগেই সৌম্যর বাবার কথা অর্ঘ্য বলছিল। ওর বাবা নাকি মাঝেমধ্যেই জীবনটাকে উপভোগ করে তারিয়ে তারিয়ে। অফিসের মহিলা সহকর্মীর সঙ্গে মাঝেমধ্যেই জড়িয়ে যান। সৌম্যর বাবা নাকি একটি বড় উঁচু পদে আছে। স্বাভাবিকভাবেই চাকরিটার অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখতে মহিলাদের নাকি একটু-আধটু মক্ষীরানী হতেই হয়।
কেমন যেন ঘুনে ধরা পোকাদের মতো কিলবিল করছে এই সমাজের মানুষেরা। নদী ভাবছে  ' তার মাকে কি…?'
নদী ভাবতে পারছে না 'তার মা এরকম কাজ করতেই পারে ।'
আবার পরক্ষণেই ভাবছে যদি তাই হয় তাহলে তার মাকে নিয়ে দেখা স্বপ্নগুলো যে ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।কি  দরকার মায়ের এসব করার?
এলোমেলো ভাবনাগুলো কুরে কুরে খাচ্ছে
নদীকে ।একটা সিগারেট শেষ হয়েছে আর একটা ধরিয়েছে। জন্মদিনটা কি তাহলে ধোঁয়াশার মধ্যে দিয়েই কাটবে। এর ভিতরে তো কোন সোনালী রোদ্দুর উঁকি মারবে না। কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল একটু উষ্ণতার জন্য যে পরম আকাঙ্ক্ষা তার সন্ধান পাবে কিনা জানে না। চিরতরে হিমশীতল হয়েই থাকবে।
এরমধ্যে ঝরনা নিচ থেকে ডাকছে ' মামনি মামনি…?'
নদী সিগারেটটা ফেলে দিল। সে ঝর্নাকে ও ভালোবাসে। তাই ঝর্নাকে ছোট করতে চায় না।
ঝরনা ও বুঝতে পেরেছে নদী স্বাভাবিক নেই। কারণ ঝরনা জানে নদী আজকাল সিগারেট খায় আর ওর মুড অফ থাকলে এটি করে থাকে ।তাই নিজের সম্মান আর নদীর সম্মান বাঁচিয়ে রাখতে নিচ থেকেই মামনি বলে ডাকতে থাকে।
নদী শুধু বলে সিঁড়ির কাছে এসে 'কেনো ডাকছো ঝরনা মাসি?'
ঝরনা বলে 'এস মামনি খাবে এসো?'
নদী বলে' আমার খাবার ইচ্ছে নেই মাসি?'
ঝরনা বলে 'না সোনা, এরকম করলে হয় না। তুমি তো কখন একটুখানি পায়েস খেয়েছ বলো?'
নদী বলে' অনেকটাই পায়েস খেয়ে ফেলেছি মাসি খিদে নষ্ট হয়ে গেছে।'
ঝরনা বলে শরীর খারাপ হয়ে যাবে নিচে এসো খেয়ে যাও।
নদী বলে ', আমি পরে খাব এখন আমাকে একটু আমার মত থাকতে দাও।'
ঝরনা শুধু বলে "তাহলে আমাকে কথা 
দাও "তোমাকে কখন ডাকতে আসবো?'
নদী বলে তোমাকে ডাকতে আসতে হবে না আমি ঠিক নিজে চলে যাব।
ঝরনা বলে "ঠিক আছে তাহলে তোমাকে পরে ডাকতে আসবো?'
নদীর মনের ভেতরে হঠাৎ এই প্রশ্ন জেগে ওঠে তার মা কেমন আছে কিন্তু সেটা প্রকাশ করতে পারল না। মা নামের অস্তিত্বটুকু ক্রমশ তার কাছ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে ।একটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে গেছিল সেটা  যেনো আরও মজবুত হলো।
নদী 18  পা দিয়েছে। কাজেই এখন ওর অভিভাবক ও নিজে। ওর যেটা ভালো লাগবে সেটাই করবে।
ডিসেম্বর প্রায় শেষ হয়ে এল কলকাতায় এখন কদিন ধরেই থার্মোমিটারে পারদ দশ এগারো । দিল্লিতে হয়তো  একেবারে থরহরি কম্প। নদী ভাবছে
এক্সকারশনে যাবে কি যাবে না যে একটা দ্বিধা দ্বন্দ্ব ছিল মনের ভেতরে এখন সেটা পুরো ঝেড়ে ফেলে দিয়ে সে ঠিক করে নিয়েছে সে যাবে।
ওয়ারড্রব খুলে নদী মিনিটখানেক চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো বাবার দেয়া লাস্ট গিফট টা বারবার নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলো। বাবার গন্ধ খুঁজে খুঁজে নিজেকে শৈশবের দিনগুলো নিয়ে যেতে চাইলো। কিন্তু পারল না মনের ভেতরে একটা যেন কাঁটা বিঁধে আছে কিছুতেই সরিয়ে ফেলতে পারছে না।
এরমধ্যে আবার ঝরনা মাসি ডাকতে শুরু করলো "মামনি মামনি এসো খেয়ে যাও।'
এবার নদী আর কোন বিরক্তি প্রকাশ করলো না।
শুধু বলল' যাচ্ছি মাসি?'
হ্যাঙ্গার থেকে আর একবার বাবার দেয়া পশমিনা কাশ্মীরি শালটার গন্ধ শুকলো। এখনো যেন তার ভেতরে স্যান্ডেল উড এর গন্ধ লেগে আছে।
নদীর ভেতরটা আজ সুখ স্মৃতিগুলো যেন এখন মাতালের ঘুমে ডুবে যেতে বসেছে।
নদী ওয়ারড্রব বন্ধ করে এবার নিচে নেমে আসলো। 
ঝরনা নদীর চোখমুখে একটা অন্যরকম ছবি যেন দেখতে পেল। ছবিতে স্পষ্ট করে কিছু বোঝা যাচ্ছে না কিন্তু যে টুকু বোঝা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে এই কয়েক ঘন্টার মধ্যে নদী অনেক অনেক বড় হয়ে গেছে। নদীর সামনে ঝরনা পছন্দের খাবারগুলো রাখতে থাকলো। ফ্রাইড রাইস ,মটন কষা, আর হচ্ছে পাবদা মাছের ঝাল রাখল। ঝরনা লক্ষ্য করলো নদীর ভেতরে কিন্তু কোন উচ্ছ্বাস নেই। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই যেন তার উৎসাহে ভাটা পড়ে গেছে।
নদী বলল 'ঝরনা মাসি এতো খাবারের আমার দরকার নেই, পেট ভর্তি নিয়ে  কথা। এত রকম রেখো না?'
ঝর্ণা বললো 'মামনি তোমার মা নিজে বলেছে এতকিছু রান্না করতে?'
নদী বলল ' আমার তো খিদে নেই তোমাকে বললাম। তুমি বললে মাসি ,তাই আমি খেতে এসেছি ।যেকোনো একটা জিনিস দাও আমাকে খেতে।'
ঝর্ণা বললো 'মামনি আমি নিজে হাতে রান্না করেছি একটু টেস্ট করে দেখো?'
নদী কিছুক্ষণ ঝরনার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল দেখল ঝর্ণা মাসির মুখে একটা আলাদা রকম দীপ্তি ,প্রত্যাশা।'
নদী বলল' ঠিক আছে, অল্প অল্প দাও।'
ঝর্ণা বললো 'কেমন হয়েছে মামণি?'
নদী বলল' তোমার হাতের রান্না কোন দিন খারাপ হয়েছে মাসি?'
ঝরনা খুব খুশি হলো আর বলল ' আজকে বৌদি সুস্থ থাকলে তোমাকে নিজে হাতে খাওয়াতো।'
নদীর চোখমুখে থমথমে ভাব লক্ষ্য  করলো ঝর্ণা।
নদী শুধু হাত নেড়ে মায়ের প্রসঙ্গ টানতে নিষেধ 
করল।
নদী বলল' মাসি তুমি খেয়েছ?'
ঝর্ণা বললো 'বৌদিকে কিছু না খাইয়ে তো খেতে পারব না মামনি।'
নদী কোন কথার উত্তর দিল না। ডাইনিং এরচেয়ারটাকে জোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বেসিনে হাত ধুয়ে ওপরে চলে গেল।
ঝরনা  চেয়েছিল বিষয়টাকে স্বাভাবিক করতে কিন্তু না ,নদীর কোন ইচ্ছেই নেই।
নদী খাওয়া শেষ করে ওপরে উঠে গেল।
আর ঝর্ণা বসে বসে ভাবতে লাগল  'এরপর কি হবে ? '
নদী একবারও ওর মায়ের কথা জিজ্ঞেস করল না মা কেমন আছে ?মা এর খাবারটা  কি করে খাওয়াবে? অথচ মা তো মেয়ে অন্তপ্রাণ। কিন্তু আবার দূরত্ব সৃষ্টি হল।

মমতা রায় চৌধুরী/৯৩




উপন্যাস 

টানাপোড়েন ৯৩
ধূসর স্বপ্ন

মমতা রায় চৌধুরী

সারা সন্ধ্যে তো নদীর একটা উত্তেজনার মধ্যে দিয়ে কাটলো। মায়ের জন্য ভালোবাসা ,মায়ের গন্ধ বারবার চোখে মুখে মেখে নেওয়া, মায়ের দেওয়া জিনিসগুলো বারবার ছুঁয়ে ছুঁয়ে
 দেখা ।আজ শুধু তার হৃদয়াকাশে শুধু মা আর 
মা । কখন মা আসবে? কেন মাকে এত ভুল বুঝেছে সে? এসব ভাবতে ভাবতেই সে বারবার ব্যালকনিতে গিয়ে উঁকি মারছে ।মায়ের গলা শুনতে পাবে বলে কিংবা যে গাড়ি এসে মাকে ছেড়ে দিয়ে যাবে ,সেই শব্দটা শোনার জন্য ইচ্ছে করছে। মা যখন আসবে মাকে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরবে । অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর,আবার ধীরগতিতে ঘরে  এসে ওয়ারড্রবটা খুলে মায়ের দেয়া সেই দুলটি পরছে ।
অনেকদিন আগে নদী বলেছিল ' তার একটা ইউনিক ডিজাইন এর দুল চাই?'
 আর তার এইটিন ইয়ার্সএ প্রথম গিফট ,তার ভালোলাগার গিফট ,তার মা তাকে দিয়েছে। এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ যেন কেমন একটা তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব এসেছে ।
ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছে নদীর সেই ছেলেবেলার মা-বাবার সঙ্গে ঘুরতে যাওয়া নেতারহাট। আবছা ভাবে মনে আছে নেতারহাট এর সেই উঁচু উঁচু গাছগুলো যেন নীল আকাশ ছুঁতে 
চাইছে ,চারিদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ উপত্যাকা , সবুজের বন্যা।তার মধ্যে রয়েছে টলটলে জলের হ্রদ। তার বাপি তাকে ডাকছে  'মামনি ,মামনি, দেখ এই জায়গাটা কত সুন্দর। আয় আয় আমার কাছে আয়।'
বাবা দুই হাত বাড়িয়ে ডাকছে। নদী ও বাবার কাছে যাবার জন্য ছুটছে ,এই করতে করতে তার ঘুম ভেঙে গেছে। সে দেখছে, সে আছে বেলেঘাটার কাছে দেশবন্ধু পার্কের সেই ফ্ল্যাটে।
কতদিন বাপিকে দেখে নি। বাপির সঙ্গে কথা বলে নি ।বাপিকে কাছে পেতে চাইলেও বাপিকে ছুঁতে চাইলেও আর সেভাবে বাপিকে পায় না ।
'কেন এত তাড়াতাড়ি বাপিকে তারাদের দেশে চলে যেতে হলো? 'দুই চোখ জলে ভরে উঠলো।
 মনটা কিছুক্ষণের জন্য বিষাদে পরিপূর্ণ হয়ে
 গেল ।এর মধ্যেই গেটের বাইরে গাড়ির হর্ন পাওয়া গেল। যদিও ওই মাঠে অনেক গাড়ি এখানে পার্কিং হয় ।তবুও মা যে গাড়িতে আসে, সে গাড়ির আওয়াজটা যেন একটু 
অন্যরকম ।নদী তার উপলব্ধিতে বুঝেছে। অন্তত তার কাছে তাই মনে হয়। তাই সে ছুটে যায় ব্যালকনিতে, গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখে।
'হ্যাঁ ,সত্যি গাড়ি থেকে তার মা নামছে।
তার মা এখনো কত সুন্দরী।'
মায়ের মত রঙ টা যদি নদীর হতো, মায়ের মত চুল, মায়ের মত চোখ।
সব বন্ধুদের কাছে শুনেছে নদীর মা সুন্দরী।
বন্ধুদের কাছে শোনা প্রশংসাসূচক বাক্য তার মায়ের জন্য তার গর্ব বোধ হতো। সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল। বাপি মারা যাবার পর সবকিছু যেন ওলটপালট হয়ে গেল। 

এর মধ্যে ফোন বেজে উঠলো'রিংটোনে' আয় খুকু আয়,,..।,'
নদী জানলার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল ছুটে এসে ফোনটা রিসিভ করতে গেল। সে স্বগোক্তিতে বলল 'ঠিক মামনি ফোন করেছে?'
সো উচ্ছ্বসিত ভাবে নামটা খেয়াল না করেই বললো" হ্যালো' মামনি'।
অপরপ্রান্ত থেকে উত্তর আসলো' না রে ,আমি মাসিমনি বলছি স্রোতস্বিনী সোনা।"
নদীর স্রোতস্বিনী নামটা মাসিমনির দেওয়া।
নদী বলল' হ্যাঁ , মাসিমনি বলো।'
বিপাশা বলল'তোর ভাইয়েরা তোকে উইশ করবে?'
নদী বলল 'দাও না।
টুবলু টুকাইকে বিপাশা ডাকছে' আয় ,আয় ,আয়। দিদি ভাইকে উইশ করবি আয়।'
টুবলু টুকাই একসঙ্গে বলল। ' হ্যাপি বার্থডে দিদিভাই।'
নদী বলল' থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ।'
টুবলু বলল' দিদিভাই ,আজকে কি কি রান্না হয়েছে?'
নদী বললো  'বলবো কেন? তোরা আসিস নি কেন?'
টুকাই বলল 'দিদিভাই ,মা তো  নিয়ে গেল না?'
টুবলু বলল' এই  ভাই,মিথ্যা কথা বলছিস কেন?
তোর তো অ্যাক্টিভিটি টাস্ক জমা দেবার ছিল বল?'
টুকাই ঢোঁক গিলে বলল' হ্যাঁ, দিদিভাই, অ্যাক্টিভিটি টাস্ক ও  জমা দেবার ছিল?'
তখন নদী হেসে ফেললো 
 'তা বেশ তোরা কবে আসবি?'
কিছুক্ষণের জন্য তারা চুপ করে গেল। যেন মনে হলো দুই ভাই নিজেদের সঙ্গে চোখে চোখে কথা বলে নিল। তারপর বললো ,'দেখি কবে যাওয়া যায়?'
এবার টুকাই বলল 'এবার বলো না দিদিভাই, কি রান্না করেছে মাসিমনি,?'
নদী বলল ', আমি জানি না ।কী করে জানব? আমি  কি খেয়েছি? কি রান্না হয়েছে বলবো। তবে আমি প্রথম খেয়েছি পায়েস ।সেটা মামনি করে গেছে ।অপূর্ব হয়েছে, অপূর্ব ।কি মিস করছিলাম ভাই তোদের জন্য।'
টুকাই একটু চুপ থাকলো তারপর বললো 'ও  আর কি রান্না হয়েছে সেটাই জানো না?'
টুবলু  বলল'কেন দিদিভাই তুমি খাওনি?'
নদী বলল হ্যাঁরে সেজন্যই তো জানি না শুধু পায়েস খেয়েছি।'
টুকাই বলল' ও ও ও।'
 বিপাশা বলল 'নে অনেক হয়েছে, তোদের
 কথা ।এবার আমাকে একটু ফোন টা ছাড় তো?'
দুই ভাই মাকে ফোনটা দিয়ে দুজনেই একে ওকে ডেকে চলে গেল মাঠে খেলতে।
বিপাশা বলল 'হ্যাঁরে দিদি ফেরেনি?
নদী বললো ' না মাসিমনি।'
'সে কিরে ও কি এই সময়ে অফিস থাকে?'
নদী বলল' হ্যাঁ মাসিমনি কোন কোন দিন দেরিতে আসে।'
বিপাশা বলল 'ঠিক আছে, মা ঠিক সময়ে পৌঁছে যাবে ।তুমি চিন্তা ক'রো না কেমন ।ভালো থেকো আর তোমার জন্য একটা গিফট আছে। পরে পাঠিয়ে দেবো। অনেক আদর আর ভালোবাসা থাকলো। ভালো থেকো।'
নদী বললো' তুমিও ভালো থেকো মসিমনি।'
কথা বলতে বলতে রাত আটটা বাজে। নদী ভাবছে মা এখনো আসলো না আজ আমার জন্মদিন। এরইমধ্যে ঝরনা মাসি এসে ডাকছে মামনি মামনি মামনি এসো সেই একটু পায়েস খেয়েছো কিছু খেয়ে নাও বৌদি কিন্তু আমাকে এসে বকবে?
নদী বলল না মা আসুক তারপরে খাব।
ঝর্ণা বললো না বাবা-মা আসলে আবার কেউ একটু খেয়ে যাও।
নদী বলে আমায় ক্ষমা করো মাসি আজকে আমি মায়ের হাতে খাব।
ঝরনা বলে মাঝে মাঝে তুমি এমন ছেলেমানুষি করো না দেখো আমাকে কত কথা শুনতে হবে।
নদী  ঝরনাকে জড়িয়ে ধরে বলে 'তোমাকে কিছু বলবে না  মামনি, দেখো, আমি বলব সব দোষ আমার।'
ঝর্ণা বললো' হ্যাঁ সেইতো।'
ঝরনা চলে গেল নিচে। নদীর বন্ধুরা সবাই একে একে উইশ করতে থাকলো। এবার কোনো বন্ধুদের নেমন্তন্ন করেনি। মনটা খারাপ ছিল বলে নদী সেভাবে কিছু চায় নি।
নদীর বন্ধুরা সবাই এবার এক্সকার্শনে যাবে বলে ঠিক করেছে ।সেই জায়গাটা কোনটা হবে সে নিয়ে নিজেদের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব চলছে। কেউ বলছে সিমলিপাল ,কেউ বলছে নেতারহাট, কেউ বলছে অন্য কিছু?
নদীর কাছে অপশন চেয়েছে। নদী নিজেও দ্বন্দ্বে ।কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না।
এরমধ্যে নিচে একটা গাড়ির হর্ন শুনতে পেল নদী ছুটে গেল একেবারে উচ্ছ্বসিত ভাবে। ব্যালকনি থেকে  উৎসুকভাবে দেখছে' মা নামছে কিনা গাড়ি থেকে?'

'কিন্তু এ কি মাকে ওভাবে কয়েকজন ধরে নিয়ে আসছে কেন? কি হয়েছে মায়ের?'
নদী ব্যালকনি থেকে ছুটে আসলো ঘরে, ঘর থেকে ছুটে সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নেমে গেলো নিচে  বুকের ভেতরে তখন হাতুড়ির ঘা দিচ্ছে। ধুকপুকুনি শুরু হয়ে গেছে। পাগলের মত নদী ছুটছে তখন। 
ঝরনা মাসি নদীর পেছনে পেছনে ছুটছে ,আর বলছে 'কোথায় যাচ্ছ? কোথায় যাচ্ছ?'
নদী কোন কথাই শুনলো না। কয়েকজন এসে মাকে শুইয়ে দিল বসার ঘরটাতে।
 'নদী কিছু ভেবে পাচ্ছে না কি হয়েছে মায়ের? 'মায়ের চেহারাটা কেন এরকম অবিন্যস্ত বানকেন আলুথালু বেশ ?হাজারো প্রশ্ন ঘুরে বেড়ায় নদীর মনে  নদীর মন চলতে চলতে যেন কোথায় হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো। আজ তার জন্মদিনে অন্যভাবে মেতে উঠতে চেয়েছিল। তার মায়েরে এই অবস্থা দেখে তার দেখা রঙিন স্বপ্নগুলো যেন কোথায় হারিয়ে গেল।ফিকে হয়ে গেল তার জন্মদিনের সমস্ত কল্পনা। পরিণত হল ধূসর স্বপ্নে।

মমতা রায়চৌধুরী /৯২





উপন্যাস 



টানাপোড়েন ৯২

আনমনে জন্মদিন

মমতা রায়চৌধুরী




নদীর মন খারাপের জানালাগুলো একে একে বন্ধ করে দিতে লাগল ।কারণ ক্ষনেকের খুশি ভালোবাসা তার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো । বিপাশা মাসিমনিকে নিয়ে কি ভুল ধারণাটা রেখেছিল সে।
অথচ  তুলনা হয় না মাসিমনির। একটা কি কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বিপাশা মাসিমনি। মেসোমশাই তো একজন ঠক, প্রতারক , দুটো পুত্র সন্তান তার ভবিষ্যৎ কি হবে ? হাজারো চিন্তা মাসিমনির ।মনের ভেতরে রয়েছে দুঃখ-যন্ত্রণা, দুঃখ কষ্টগুলোকে যেন সে পাথর চাপা দিয়ে আছে, একেবারে হিমশীতল।
তাই কথা না বাড়িয়ে ঝরনা মাসি যখন বলল 'মামনি খেয়ে নেবে এস ?'
তখন শুধু নদী ওইটুকুই বলল ''ঠিক আছে তুমি খাবার টেবিলে আমাকে খাবার দাও।  আমি যাচ্ছি।'
নদী ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে খাবার টেবিলে বসল।
 খাবার টেবিলে বসে নদী জিজ্ঞাসা করল  'কি রান্না করেছ ঝরনা মাসি ? পায়েসের গন্ধ পেয়ে বলল 'মাসি পায়েস করেছ?'
ঝরনা মাসি বলল' তা করবো না। আজকে যে তোমার জন্মদিন মামনি।'

নদীর চোখে জল আসে ।'তোমাদের মনে আছে আজকে আমার জন্মদিন ।বাপি থাকলে রাত বারোটার সময় থেকেই শুরু হয়ে যেত হৈ-হুল্লোড় এখন তো আর বাপি….।'
ঝরনা বলে 'মন খারাপ করছো কেন 
মামনি ?তোমার মা সব আয়োজন করেছে। শুধু মায়ের আজকে বিশেষ কাজ না থাকলে বের হত না ।তাই আমাকে আগে একটু পায়েস খাইয়ে দিতে বলেছে। পরে মা আবার এসে তোমাকে পায়েস খাওয়াবে ।কাজেই দুঃখ ক"রো না।'
নদী হা  করে ঝরনার দিকে তাকিয়ে থাকে ।
তারপর আনমনে বলে' মা বলেছে তোমায়?'
ঝরনা বলে 'কালকেই তো বৌদি আমাকে বলল সব কিছু করে রাখবে কিন্তু ঠিকঠাক করে । পায়েস তো তোমার মায়ের হাতের করা।'
নদী ঝর্ণাকে  প্রণাম করে।
ঝরনা নদীকে কাছে টেনে আদর করে আশীর্বাদ করে আর বলে 'মাকে ভুল বুঝ না '।

নদী কথা না বাড়িয়ে যেটুকু পায়েস দিয়েছে সেই পায়েস এর ভেতর দিয়ে খুঁজে বেড়াতে থাকলো মায়ের গন্ধ ।সেই ছোটবেলায় মা কি সুন্দর
 নদীকে আদর করে, আশীর্বাদ করে পায়েস খাইয়ে দিত ।সেই কল্পনায় সুন্দর ছবিটাকে  মনের ক্যানভাসে আনমনে দাগ কাটতে থাকে। তারপর এক নিমিষে পায়েস   শেষ করে দেয়।
ঝরনা বলে 'মামনি তাহলে এবার তোমার খাবারগুলো দিই? '
নদী  পেটে হাত দিয়ে বলে' ' আর পারবো 
 না ।আমাকে ক্ষমা করো ।আমি একটু পরে খাব মা কখন আসবে গো?'
ঝরনা বলে 'ঠিক আছে তুমি পরেই খেয়ো।'
আর বৌদির তো আজকে তাড়াতাড়ি চলে আসার কথা ।তুমি তো জানো যে অফিসে কখন কি কাজ পড়ে যায়, ইচ্ছে থাকলেও তো বৌদি সবসময় বেরুতে পারে না, না?'
নদী ঘাড় নাড়ে শুধু। তারপর বলে 'পায়েসটা খুব ভালো হয়েছে মাসি।'
ঝরনা বলে 'বৌদি তো খুব ভালো রান্না করে। পায়েস তো ভালো হবেই ।তারপর তোমার জন্মদিন বলে কথা?'
ঝরনা নদীর সাথে কথা বলে এঁটো বাসনগুলো টেবিল থেকে তুলতে থাকে ,তারপর নাতা দিয়ে টেবিল মুছে নিয়ে চলে যায় রান্নাঘরে ।রান্না ঘরে জিনিসপত্র গোছাতে থাকে ।হঠাৎ করে রান্নাঘরে একটা ডিস পড়ে যাবার আওয়াজ শোনা
 গেল ।কিছু ভাঙলো কিনা কে জানে?
নদী আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে মন ভালো করার জায়গায় চলে যায় অর্থাৎ ছাদে। সেখানে গিয়ে আলসেতে দাঁড়িয়ে মনের ক্যানভাসে দাগ কাটতে থাকে ।বাল্যকালের স্মৃতিগুলো ,শৈশবের নানা কথা ভিড় জমাতে থাকে। নদী তখনও পর্যন্ত জানে না তার জন্য কি সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে। আফসোস করছে তার মাকে নিয়ে অ্যাতো বড় ভাবনা তার মনে জায়গা না দিলেই হত। এটা তো ঠিকই মায়ের একটা আলাদা জগত আছে। হঠাৎ নদীর ফোনে ফোন আছে।
নদীর ভালো লাগে না এই সময় ফোনটা রিসিভ করতে সে একান্তমনে শুধু নিজের কথাই ভাবতে চাইছে। 
শীতের কুয়াশা সরিয়ে সূর্যের মিঠে রোদ সারা আকাশ জুড়ে, তাই উষ্ণতাটুকু নদীর জীবনেও খুব দরকার। এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ খেয়াল করলো তীর্থ।
নদী ভাবল' আরে পার্কের ওখানে দাঁড়িয়ে কি করছে তীর্থ। এই সময় ওর এখানে কি কাজ?' একটু কেমন নদীর কৌতুহল হলো ব্যাপারটা দেখতে হয়। 
স্কুল লাইফের বন্ধু। 
কলেজের বন্ধু গুলোর থেকে অনেক আলাদা হয়। স্কুলের বন্ধুরা কলেজ লাইফের বন্ধুর ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে। কি যেন একটা নিষেধের কাঁটাতারের বেড়া। যখন খুশি উপড়ে দিতে চায়। আর তীর্থ মনের দিক থেকে খুবই একাকী। ছোটবেলায় মা মারা গেছে।বাবা  আবার বিয়ে করেছে। সৎ মায়ের কাছে আরশোলার মত জীবন। হয়তো মনের সেই কষ্টগুলোকে ভোলার জন্য মাঝে মাঝে প্রকৃতির কোলে নিজেকে ধরা দিতে চায় নানাভাবে নানা খেয়ালে। হয়তো কিছু কিছু সময় ওর খেয়ালিপনা গুলোকে পাগলামো মনে হতে পারে কিন্তু সত্যিই যদি খুব গভীর অনুভূতি দিয়ে ভাবা যায় তাহলে দেখা যাবে তীর্থ এখান থেকেই তার একাকিত্বের জীবন থেকে মুক্তি পাবার রসদ খুঁজে বেড়ায়।
নদী ছাদের থেকে ডাকল' অ্যাই তীর্থ ,তীর্থ,তীর্থ।'
নদীর কথা কিছু শুনতেই পারছে না  তীর্থ।
এমন সময় নদীর ফোনে ফোন আসে।,'রিং হতে থাকে।
'নদী এবার ফোনটাকে রিসিভ করে বলে 'হ্যালো'।
রুপসা বলে 'শুভ জন্মদিন মামনি অনেক অনেক ভালো থেকো সুস্থ থেকো আর তোমার মনের আশা পূর্ণ হোক। 
'নদী শুধু বলল থ্যাংক ইউ মামনি:
রুপসা বলে' খাবার খেয়েছো?'
নদী বলে' হ্যাঁ ,খেয়েছি পায়েস।'
রুপসা বলে 'আর কিছু খাও নি কেনো?'
নদী বলে' খিদে নেই।'
রুপসা বলে 'খিদে নেই কেন?'
নদী বলে 'অনেকটা পায়েস খেয়েছি । পায়েসটা খুব ভালো হয়েছে থ্যাংক ইউ মা।'
রুপসা বলল 'যাও নিচে যাও?¡ বাকি খাবারগুলো খাও ।,
নদী বলে' তুমি কখন আসবে?'
রুপসা বলল 'চেষ্টা করছি সন্ধ্যের মধ্যে ফেরবার।'
নদী বললো 'সাবধানে।'
রুপসা বলল' তোমার গিফট পছন্দ হয়েছে?'
নদী বলল 'না দেখা হয়নি।
  রুপসা বললো' ঠিক আছে, পরে দেখে নিও । 'তাহলে এখন ছাড়ছি কেমন মন খারাপ ক'রো না।'
নদীর মনটা যেন হঠাৎ করেই ফুরফুরে হয়ে গেল। তাই সে তরতর করে সে  নিচে নেমে আসলো। তার মা তার জন্য কি এনেছে? সরাসরি নিজের রুমে ঢুকে গেল। দেখল একটা কার্ডে খুব সুন্দর করে নিজের মনের কথা  প্রকাশ করেছে।
তারপর পি সি চন্দ্র জুয়েলার্সের প্যাকট। কৌতুহলী হয়ে বৃষ্টি খুলে ফেলল একটা খুব সুন্দর কানের দুল।।
নদী খুব খুশি হলো। তার মাকে কি একটা ফোন করবে?
মায়ের সাথে খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছে।
আবার মনের ভেতরে একটা কিন্তু কিন্তু ।রয়েছে।
সব কিন্তুর অবসান ঘটিয়ে মা কে ফোন করল। মায়ের ফোন বাজতেই ফোনটা রিসিভ করে বলল হ্যালো'।
নদী বলল 'আমি বলছি।'
রুপসা বলল' হ্যাঁ বল কি হয়েছে?'
নদী বলল'গিফটটা খুব সুন্দর হয়েছে।'
রুপসা বলল' তোমার পছন্দ হয়েছে তো মামনি?'
নদী বলল' হ্যাঁ।'
 রুপসা বলল 'ঠিক আছে রাখি এখন।'
নদী বলল ok
নদীর মনে কিছু কিছু দৃশ্য চিরদিনের মতো আঁকা হয়ে গেছে দাঁতে দাঁত চেপে ভুলতে চাইলেও যেন ভুলতে দিতে চাইছে না তার বারবার মনে হচ্ছে  মাকে নিয়ে এত কথা না বললেই পারতো ।মা আছে বলেই তার অস্তিত্ব। আসলেই ইদানিং মায়ের হঠাৎ হঠাৎ অফিসে বেরিয়ে যাওয়াটাই একদমই পছন্দ করছিল না অনেকে নানা রকম কথা ও বলছিল । সেই থেকে মানে মায়ের সঙ্গে একটা মনের দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল। মা তাকে বেশি সময় দিতে পারছিল না।
নদীর মনে হতে লাগল এভাবেই তার এতটা মায়ের সঙ্গে  দূরত্ব সৃষ্টি হলো। আসলে কিছু কিছু সম্পর্ক দীর্ঘদিনের অনভ্যাসে মরচে ধরিয়ে দেয়।'


মমতা রায় চৌধুরী/৯১





উপন্যাস 


টানাপোড়েন ৯১

অবচেতনে  দাগ 

মমতা রায় চৌধুরী





সকাল থেকে নদীর মেজাজটা খাট্টা হয়েছিল। 
আজকের দিনটা কি সকলেই বেমালুম ভুলে গেল?
বাপি মারা যাবার পর থেকেই সবকিছুই যেন কেমন হয়ে গেছে তার জীবনে। মা ও তার কর্ম নিয়ে ব্যস্ত। নদীর কি প্রয়োজন,কি পছন্দ-অপছন্দ
কিছুতেই এসে যায় না ।
মা আজকাল শুধু অফিস আর অফিস। আগের দিনগুলো কত ভালো ছিল ।মায়ের গন্ধ সারা দিনরাত মেখে থাকতো । আজকাল মায়ের গন্ধ
মনে করতে সময় লাগে। কত জ্বরের ঘোরে ভুল  বকেছে, মাকে কাছে পায় নি। অথচ একটা সময় ছিল বৃষ্টির দিনগুলোতে মায়ের কাজ ছাড়া হত না ।শীতের  রাতগুলোতে মায়ের গায়ে গা দিয়ে না শুলে যেন নদীর কিছুতেই ঠান্ডা কাটতো 
না ।আজ কোথায় গেল সেই সব দিনগুলো ?
বাপি অফিস থেকে এসেই প্রথমে নদীর খোঁজ করত ।আজ খোঁজ করার জন্য ঝরনা মাসি। নদীর কাছে আসে ঝরনা মাসি ।এসে জিজ্ঞেস করে   'আর কি লাগবে, না লাগবে? কিন্তু ঝর্ণা মাসির ক্ষমতা কতটুকু তার দাবি মেটানোর? বিশাল সমুদ্রে এক ফোটা জল।'
সারাদিন এলোমেলো ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে নদী। সে তো 18 বছরে পা দিয়েছে । তার স্বাধীন চিন্তা করার ক্ষমতা নিশ্চয়ই আছে ।সেও তো চায় শীতের রোদ্দুরে গায়ে তাপ নিতে। সেও চায় এরকম নীল আকাশ ,সোনালী রোদ্দুর, তার মনে ভেতরে দাগ কেটে যাক।
হঠাৎই সে ট্রামে চেপে বসে। আজ ভালো একটা নীল লং গ্রাউন্ পড়েছে। যদিও নদীকে ড্রেসটা ওর মা গিফট করেছে।
নদী সদ্য কলেজে গেছে। কলেজে অনেক বন্ধু হয়েছে কিন্তু শৈশবের বন্ধুগুলো যেন কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ।কালেভদ্রে দেখা হয় তিন্নি তৃষার সাথে। ওই হাই, হ্যালো এইটুকু।
তারমধ্যে তো তৃষা চলে গেছে ব্যারাকপুরে ওদের নিজেদের ফ্ল্যাটে ।আজকাল তৃষা ফোনও করে না। এসব কথা ভাবছে বসে বসে এর মধ্যেই তার নজরে আসে,শুধু সদ্য যুবকেরা নয, বয়সী লোক গুলো যেন নদীকে গোগ্রাসে গিলতে চাইছে। অথচ এরাই কখনো দেখা যায় যে কোনো বাড়িতে গেলে কত ভদ্রভাবে কথা বলে কিন্তু ট্রামে বাসে ওদের দৃষ্টিও নেকড়ের ছোবলের থেকেও ভয়ঙ্কর।
হঠাৎ একটি পুরুষ কন্ঠ নদীকে ডাকে"অ্যাই স্বরূপা, স্বরূপা, স্বরূপা।'
নদী প্রথমে ভাবতে পারে নি যে ,তাকে কেউ ডাকছে। ট্রামে  এমন কে আছে যে তাকে
 ডাকবে ?তাই প্রথমে গা করে নি
পরে এক ভদ্র মহিলা বললেন "'এই মেয়ে তোমাকে কেউ ডাকছে?"
নদী পেছনটা ঘুরে তাকায় দেখে' অরুনাভদা।'
অরুনাভ ও আরেকটু এগিয়ে  কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলে' কোথায় যাচ্ছ?'
নদী প্রথমত তার নামটা মনে হচ্ছিল ভুলে যেতে ব বসেছিল । নদীর ভালো নাম ধরে কেউ ডাকছে সে যেন একটু নস্টালজিক হয়ে যায়।
তার বাবার দেয়া ভালোবেসে বাবা মায়ের নামের সাথে মিলিয়ে নাম রেখেছিল নাকি?
কিন্তু এখন যেন মনে হচ্ছে এই নামটার অস্তিত্ব ক্রমশ অবলুপ্তির পথে।
আজ নদী নামে সে বেশি খ্যাত। কিন্তু স্কুল-কলেজ সার্টিফিকেটে তো তার সেই নামটি রয়ে গেছে।
অরুণাভ কাছে এসে হাত নেড়ে বলে 'কি ব্যাপার অন্য মনস্ক ?তোমাকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলাম বললে না তো?'
নদী বলে 'এলোমেলো ভাবনা। ভাবলাম একটু বেরিয়ে পড়ি ।সামনে নামবো কলেজ স্ট্রিটে।'
অরুণাভ বলে  ভাবনাগুলো কিন্তু থাকা 
ভালো। জানো সব সময় মানুষ ঘড়ি দেখে অর্থাৎ টাইম মিলিয়ে জীবনটাকে যেন একটা ছকে বেঁধে রাখতে চাইছে কিন্তু ছকে বাঁধা জীবনের বাইরে ও আলাদা একটা মাধুর্য আছে ,যে না বেরোবে সে কখনো উপলব্ধি করতে পারবে না।'
নদী একটু হাসে।
অরুণাভ বলে 'আজকে তুমি এত সেজেগুজে এসেছ ?কোনো 'কোন স্পেশাল ডে আছে?'
নদী বলে 'কেন শুধুমাত্র কিছু স্পেশাল দিনগুলোর জন্যই সাজতে হবে ।আমি যদি সেখানে কোন বৈচিত্র আনতে চাই, তাতে কি তোমার কোন অসুবিধা আছে?'
অরুনাভ ও হেসে বলে  'বেশ কায়দা করে উত্তর দিলে তো? গুড। আমার কোনো অসুবিধে নেই। বরং ভালো লাগবে।'
নদী একটু হাসে।
অরুণাভ বলে ' তোমার এলোমেলো ভাবনার সঙ্গে আজকে আমাকে নেবে?'
নদী কোন ভনিতা না করে বলল' না নেওয়ার কি আছে?"
অরুনাভ বলে অরুণাভ বলে তাহলে কিন্তু আমি তোমার সঙ্গে যাচ্ছি।'
স্বরূপা বলে ও শিওর। 
অরুনাভ বলে 'তাহলে চলো, আজ তোমার সাথে বাঁধি নানা ছন্দে।'
নদী বলে ও 'সিওর।'
আজকের বিশেষ দিনটা কি তাহলে এভাবেই বিশেষ হয়ে উঠবে ভাবতে থাকে নদী।
নদীর ধর্ম তো বয়ে চলা, গতি তার জীবন। তাকে আটকে দিলে তার ছন্দপতন ঘটে। তাই 18 বছর তার জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ।এইসব ভাবতে ভাবতে ট্রাম এসে দাঁড়াল কলেজ ট্রিটে।
নদী আগে হাঁটতে শুরু করল, অরুনাভ পেছনে
পেছনে।
অরুণাভ হঠাৎ বলে' এই নদী তুমি আগে আগে হেঁটে চলেছ আমি তো তোমার পেছনেই আছি।'
নদী শুধু হাসলো। তারপর তার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে তার সানগ্লাসটা বের করে চোখে দিল।
নদী বললো 'একা একা হাঁটার মধ্যে একটা আলাদা মজা আছে।'
অরুনাভ বলে 'তাহলে কি সেই মজায় আমি তোমার ব্যাঘাত ঘটালাম?'
নদী এর কোন উত্তর দেয় না।
নদী মনে মনে ভাবছে 'সারা কলেজের মেয়েদের কাছে যে ছেলেটি হার্ট থ্রব। আজ তারই সঙ্গে পথ চলছে।'
আপন মনে নদী একটু হেসে উঠলো।
অরুনাভ  থমকে দাঁড়ালো। তারপর বলল' হেসে উঠলে কেন ?কিছু অড ব্যাপার ঘটল কি!'
নদী বলল ', না, না।'
হঠাৎই কফি হাউজের সামনে এসে অরুনাভ  বলল 'ঢুকবে কফি হাউসে?'
নদী কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না ।এমন সময়ে নদীর ফোনে ফোন ঢুকলো। রিং হতে লাগলো। নদী ফোনটা রিসিভ করবে কি করবে না ভাবছে।
 এমন সময় অরুনাভ ও বললো 'তোমার ফোন বেজে যাচ্ছে ।দেখো ,আন্টি ফোন করল বোধহয়?'
নদী বলে 'সময় কোথায়?'
অরুনাভ ও বলল 'এভাবে বলছ কেন?'
নদী ভাবছে  'কথাগুলো কিভাবে সে অরুনাভকে বলবে ?জমানো ব্যথাকে তার অংশীদারে সামিল করবে?তাই নিজের দুঃখ নিজের কষ্টগুলো, যন্ত্রণা গুলোকে নিজের মনের ভেতরে রাখতে চায়। কথা না বাড়িয়ে ফোনটা চেক করলো।'
ফোনটা চেক করে দেখলো একটা আননোন নাম্বার।
দুটো মিসকল হয়ে আছে।
নদী ভাবছে ফোনটা কি ঘুরিয়ে করবে, না করবে না ?একটা দ্বন্দ্ব চলছে মনের ভেতরে ।
এমন সময় আবার নদীর ফোন বেজে উঠল।
নদী ফোনের নম্বরটা পরখ করে দেখলো সেভ করা আছে কিনা?'
নদী দেখলো না এই নম্বরে কোন কিছু সেভ করা নেই। তাহলে' কে এমন ফোন করছে বারবার?'
এবার ফোনটা রিসিভ করল বলল' হ্যালো'।
অপরপ্রান্ত থেকে উত্তর আসলো 'কে স্রোতস্বিনী?'
নদী বলল হ্যাঁ। তারপর যখন তার জন্মদিনের উইশ করলো তখন সে আনন্দে লাফিয়ে 
উঠল ।আজকে সকাল থেকে কেউ তাকে উইশ করে নি ।প্রথম মাসীমণি তাকে উইশ করেছে।
'শুভ জন্মদিন ।খুব খুব ভালো থেকো আর অনেক অনেক আনন্দে থেকো।'
নদী বলল ' অনেক ধন্যবাদ মাসীমণি।'
বিপাশা বলল'তোর কি আজকে নেট অফ আছে?'
বিপাশা বলল 'তোকে মেসেজ পাঠিয়েছি।'
নদী বলল' তাই?
বিপাশা বলল'আমি ভাবলাম রাগ করেছিস?'
নদী বললো 'কেন কেন,?'
বিপাশা বলল ' মনে হয়েছে তাই বললাম।'
নদী বলল' ঠিক আছে মাসিমনি।'
নদী মনের ভেতরে অজান্তে কিভাবে কালো পাহাড় গড়ে উঠেছিল। না জেনেবুঝে এভাবে মাসি র প্রতি, মায়ের প্রতি রাগ করা উচিত হয় 
নি ।
বিপাশা বলল 'ঠিক আছে ভালো থেকো কেমন? 'নদী বলল-'হ্যাঁ মাসিমনি আমি তোমার কথা মাথায় রাখবো।'
নদী নিজের মনে অনুতপ্ত হচ্ছে মাসিকে নিয়ে অনেকটা কষ্ট পেয়েছিল ,সেটা মনের ভেতরে রেখেছে কিন্তু এই ভাবনাগুলো একদমই ঠিক হয় নি। মাসির মনের ভেতরে রয়েছে দুঃখের পাহাড় ,যন্ত্রণাগুলো যেন কুরে কুরে খাচ্ছে।
 এবার অরুণাভ বললো ' তোমার কি কোন কারনে আজকে মনটা খারাপ?'
নদী বলল 'কেন?'
হঠাৎই নদী বলল 'আজকে থাক  আজকে কফি হাউসে ঢুকবো না ।একটু বাড়ি যাব।'
অরুনাভ বলল' বাহ খুব ভালো কথা।'
নদী খুব দ্রুত পায়ে বাড়িতে আসার রাস্তা ধরল। তার জন্মদিনেl প্রথম মাসিমনি উইশ করেছে ।সেই আনন্দে রাস্তা চলতে গিয়ে মনে হচ্ছে হে হাজারো পথ অতিক্রম করে ফেলেছে।
অরুনাভর   কাছে ব্যাপারটা কেমন রহস্যজনক মনে হলো।
নদী হাঁটতে-হাঁটতে বাড়ির রাস্তা ধরল।
বাড়িতে এসে কলিং বেল বাজাতে থাকে ঝরনা মাসি হাই তুলে দরজা খুলছে।
দেখলেই বোঝা যায় আরামে ঘুম দিচ্ছিল।
ঝর্ণা বললো' তুমি খাবে তো এসো?'
নদী বলল 'কি রান্না করেছো ?'
ঝর্ণা বললো 'অনেক কিছু রান্না হয়েছে?
আজকে যদি তোমার পছন্দের জিনিস রান্না না করি তাহলে বৌদি এসে আমাকে খুব বকবে তাই?'
নদী কেমন একটা বা অন্য ভাবনার জগতে চলে গেল ।তাহলে কি তারই মনের ভেতরে একটা আলাদা ঘুনের বাসা বেঁধেছিল। তবে কি নদীর আত্মবিশ্বাস হারিয়ে যেতে বসেছিল? তার অবচেতন মনে কি দাগ কেটে যাচ্ছিল, সে সেটাকে আবিষ্কারে নিমগ্ন। এবার শুধু মায়ের অপেক্ষায় থাকে। মা তার জন্যে কী সারপ্রাইজ দেয় সেটা দেখার জন্য।