২৫ নভেম্বর ২০২১

মহুয়া চক্রবর্তী






সাধের বাগানে
 

আমার সাধের বাগান সাজিয়ে ছিলাম
মনের মত করে,
ভালোবাসা ও অতি যত্ন দিয়ে একটু একটু করে।
সেদিনের কোন সে ঝরের ভুল ঝরিয়ে দিল ফুল
যেদিন প্রথম মাধুরী মেলেছিল তার মুকুল।
নব প্রভাতের তারা
সন্ধ্যাবেলায় হয়েছে পথহারা।
সে কি মায়া,  নাকি স্বপ্ন ছায়া , নাকি শুধুই ছলনা
তারে বোঝা গেল না ও যে চিরবিরহের সাধনা।
তবে কেন সে সাজালো মোরে মিছে মায়ার সাজে
আমি যে আজও একা আপন ভুবনে বসে আছি
পাওয়া না পাওয়ার মাঝে।
আমি কি শুধুই যাব স্রোতে ভেসে
দুর দয়াহিন দেশে।
জানিনা দিন অবসানে কোনখানে পাবো ঠাঁই।
বিধাতার নিঠুর বিদ্রুপে নিয়ে এলো চুপে চুপে
হৃদয়হীন মানুষগুলোকে আজ দেখি 
নানা সাজে নানারূপে।
সেদিন আমার দুঃখ জোয়ারের জলস্রোতে
ধুয়ে নিয়ে যাবে মোরে এই সব লাঞ্ছনা হতে।
কৃপা কণা দিয়ে আর ফিরে দেখোনা
দীর্ঘশ্বাসের মাঝেও কখনো আর 
আমায় মনে রেখো না।
যেদিন চলে যাব সরে তখন চিনবে মোরে
অবহেলা আর ছলনা দিয়ে 
সেদিন আর আমায় বাঁধতেত পারবে না।

শামীমা আহমেদ




শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত 
( পর্ব ১৯)
শামীমা আহমেদ 

শাওয়ার থেকে বেরিয়ে শিহাব দ্রুত তৈরি হয়ে নিলো।সারাদিনের কাজের ম্যাপটা একবার এঁকে নিলো মনে মনে। শায়লার সাথে দেখা করা, হসপিটালে যাওয়া, কুরিয়র অফিসে গিয়ে আবার বাসায় ফেরা তারপর গুলশানে যাওয়া। আপাতত দিনের প্রথম ভাগে যা যা করণীয় তার ছক কেটে মাথায় বসিয়ে নিল ।শিহাব কোন কিছুই ঝোঁকের মাথায় করে না।খুব ধীর স্থিরভাবে ভেবে চিন্তে করে। রিশতিনাকে নিয়েও তার কোন তাড়াহুড়া ছিল না কিন্তু কিভাবে কি ঘটে গেলো!  আজ তাই  পরিস্থিতি সবকিছুর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলো।
পোষাকের ব্যাপারে ভীষণ চুজি শিহাব,
বাইকে লং ড্রাইভে যেতে হলে ধুলাবালি এড়াতে জিন্সের ভারী শার্ট প্রেফার করে। শার্ট আয়রন করাই ছিল। সাথে ব্ল্যাক প্যান্ট। আজ কেডস পরতে মন চাইছে। সাদা নীল কম্বিনেশনের নতুন এডিডাস কেডস প্যাকেট থেকে বের করে নিলো। হায়! নয়টা বেজে গেছে! শিহাব চট করে তৈরী হয়ে এক ঘড়া পারফিউম ঢেলে  দ্রুতই ছুটলো গন্তব্যের দিকে। আয়নায় তাকানোর সময় নেই।শিহাব রুম লক করে নীচে নেমে এলো।
পথটা শায়লার চেনাই ছিল ।রিকশা একটানে চলে এলো।শুধু শায়লার মনের ভেতরের অস্থিরতা উৎকন্ঠা সামনের সবকিছুকে অদৃশ্য করে রাখল।
আফা কোন গেটে নামবেন? রিকশাওয়ালার কথায় শায়লা নিজেকে রিকশায় আবিষ্কার করলো!
ওহ! এখানেই এখানেই।রাখেন রাখেন।
শায়লা রিকশাভাড়া চুকিয়ে নামল।
আশেপাশে উৎসুক মানুষের দৃষ্টি। এটা এই দেশে খুবই কমন দৃশ্য। একজন মহিলা দেখবে আর তাকাবে না সেটা আমাদের দেশে খুবই রেয়ার ঘটনা।শায়লা দেখলো হ্যাঁ, কোনায় একটা চায়ের টং ঘর দেখা যাচ্ছে জনাকয়েক মানুষ দাঁড়িয়ে  তবে কোনো  মুখ চেনা লাগছে না। শায়লা তাই সেখানেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। 
অনেক অফিসযাত্রী মানুষজন কর্মক্ষেত্রে ছুটছে। শায়লার নিজের অফিস টাইমের কথা মনে পড়লো।
হঠাৎই  উল্কার বেগে একেবারে উর্ধ্বশ্বাসে একটা লেটেস্ট মডেলের বাইক এসে থামল। শায়লা খুবই নিখুঁত  দৃষ্টি ফেলে  হেলমেটের আড়ালের মুখটা চিনে নেয়ার চেষ্টা করছে। লোকটি বাইকটা সাইড করে স্টার্ট বন্ধ করলো।চাবিটা হাতে  নিয়ে  হেলমেট খুলে সানগ্লাসে ঢাকা চোখের একটা লুক এদিক সেদিক ঘুরছে। শায়লা এফবির পিকের সাথে মেলাতে চাইছে। হু, বুঝা গেলো ইনিই সেই কাংখিত ব্যক্তি। শায়লার ভেতরে ধক ধক শব্দ স্পষ্ট! দেখলো অপূর্ব মুখশ্রী! হিরো হিরো টাইপ।নীল জিন্স শার্টের সাথে শুভ্র মুখখানি যেন এক খন্ড শরতের আকাশ! বেশ পরিপাটি পোষাকের  ব্যক্তিটি তার দিকেই এগিয়ে আসছে আর সুগন্ধি তা জানান দিচ্ছে। শায়লা কিছুক্ষণের জন্য  যেন এই মহাবিশ্বের বাইরে ছিটকে পড়েছিল।একেবারে ভাবলেশহীনতায় হাত পা অবশ হয়ে আসছিল।
শায়লার কাছে এসে বেশ কনফিডেন্স নিয়েই লোকটি বললেন, আমি শিহাব। আসতে একটু দেরি হয়ে গেলো, আমি দুঃখিত! অনেক রাতে ঘুমিয়েছি।উঠতে তাই লেট হয়ে যায়।
শায়লা বলে উঠল,না না, ঠিক আছে। আমি শায়লা।
আমি বুঝেছি।
কিভাবে বুঝলেন,শাড়ির রংতো বলিনি।
ফেসবুকের ছবির সাথে মিলিয়েছি। কোন ধরণের ভনিতা বা অতিনাটকীয় কোন ভাব নেয়নি বলে শায়লা খুব দ্রুতই সহজ হয়ে গেলো।
দুজনে টি স্টলের দিকে এগিয়ে গেলো। আশেপাশে মানুষের চোরাচাহনী, চাপা হাসি, হাত আড়াল করে বিড়বিড় করে পাশের জনকে কিছু বলা।যেন তারা অনেক কিছুর সাক্ষী হয়ে যাচ্ছে। কার বউ আর কার স্বামী আজ ঘর পালিয়ে এখানে দেখা করতে এসেছে তারা যেন তার চাক্ষুষ সাক্ষী হয়ে রইল!
মামা, দুই কাপ চা দেন, বলে শিহাব  শায়লাকে লক্ষ্য করে কথা বলতে শুরু করলো, ওদের আদা লাল চা  খুব ভালো হয়। আমি সকালে কাজে বেরুলে এখানে একটু থেমে যাই।
পারিপার্শ্বিক পরিবেশের  লোকজনের তুলনার শায়লা আর শিহাবের বেশভূষা বেশ উন্নত। বুঝাই যাচ্ছে এমন একটা যায়গায় তারা এসেছে লোক চক্ষুর আড়াল হয়ে নিছক সময় কাটাতে।
ধোঁয়া ওড়া চা এলো।হাত বাড়িয়ে শিহাব প্রথম কাপ হাতে নিয়ে শায়লাকে এগিয়ে দিল। শায়লা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে শি্হাবকে এক নজর দেখে নিল।বেশ সাবলীল ভঙ্গীতে কথা বলছে। আর হাইটটাও  তার বরাবরই মনে হচ্ছে।শায়লাও নিজেকে স্বাভাবিক করে নিল। আড়ষ্টতা নিয়ে থাকলে শিহাবকে মানুষ খারাপ ভাবতে পারে। জনসমক্ষে মানসন্মান রক্ষা করা শুধু যে মেয়েদের জন্যই, সেটা নয়, ভদ্র পুরুষদেরও সেটা রক্ষা করতে হয়। আর যাদের আত্মসম্মান জ্ঞান নেই তারা তো চিরকালের বেহায়া।সমাজ সংসার এদের কাছে তুচ্ছ।ব্যক্তিত্বহীন এইসব পুরুষের কর্মকান্ডে লজ্জিত হয় হয় দেশ সমাজ তথা পরিবারের লোকজন। সন্তানের নিস্পাপ মুখটাও এরা ভুলে যায়।

শিহাব নীরবতা ভাঙল,
আপনার মা কেমন আছেন? কি হয়েছে উনার?
শায়লা বললো, না না তেমন কিছু না, রুটিন একটা চেকাপের জন্য টেস্টগুলো করা।
শিহাব বললো, তাও তো ভালো! আমার মাকে তো চেকাপের জন্য রাজীই করানো যায় না।
এরপর টুকটাক কিছু কথা হলো। এই পারিবারিক অন্য খোঁজ খবর নেয়া । 

আপনারা কতদিন উত্তরায়? কোথায় পড়াশুনা করেছেন?বাবা কী করতেন? কবে মারা গেলেন?
শায়লা একের পর এক উত্তর দিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু শিহাবকে নিয়ে তার কোন প্রশ্ন মনে আসছে না। নাকি শিহাবই তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে?
স্টলের ক্রেতা বিক্রেতা সবাইকে স্বাভাবিক দেখালেও কানটা কিন্তু তাদের দিকেই খোলা!কোন প্রেমালাপ হচ্ছে কিনা কিংবা কথা থেকে কোন ক্লু ধরা যায় কিনা? এরা যে স্বামী স্ত্রী নয় সেটা তারা শতভাগ নিশ্চিত। বিদেশে হলে এসব ওরা একেবারেই ওভারলুক করে।
কিন্তু আমাদের দেশের মানুষের প্রতিবেশীর ঘর নিয়েই বেশি কৌতুহল।  
শায়লা চায়ের পোকা হলেও খুব গরম চা সে খেতে পারে না৷ প্রচন্ড গরম কাপটা ধরে সে দাঁড়িয়েই আছে। 
শিহাব চায়ে চুমুক দিতে দিতে কথার ফাঁকে ফাঁকে শায়লাকে আপাদমস্তক দেখছে। যদিও সানগ্লাসের আড়ালে তার চোখের দৃষ্টি বুঝা মুশকিল।
ছেলেরা কিন্তু খুব সহজেই মেয়েদের স্টাডি করে নিতে পারে।যেখানে মেয়েরা শুধু তাদের ড্রেস আপ আর প্রেজেন্ট করা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সেখানে ছেলেরা একটা মেয়েকে পাঁচবার এসেস করে ফেলে।
শিহাব বুঝে নিলো শায়লা খুবই সিম্পল  এবং সহজ সরল একটা মেয়ে। পোশাকের শালীনতায় সভ্যতা ভব্যতা স্পষ্ট হয়। একটা শাড়ি পরার ধরণেই একটা মেয়ের চারিত্রিক গুনাবলী বুঝা যায়। অবশ্য যদি সে সেটাতে  কোন চালাকির আশ্রয় না নেয়।
শিহাব ইশারায়  শায়লাকে খেয়াল করিয়ে দিল, চা খেয়ে নিতে। শায়লাকে চায়ে ব্যস্ত করে আবার এক ঝলক দেখে নিল শায়লাকে।নেভি ব্লু শাড়িটায় শায়লাকে খুব সুন্দর লাগছে। চোখ দুটোতে বেশ গভীরতা আছে। ফিগারের ব্যাপারে অতটা সচেতন না হলেও অতিরিক্ত কিছু চোখে পড়ছে না।হাইট নরমাল বাঙালি মেয়েদের তুলনায় একটু লম্বাটে ধরা যায়, যেহেতু পায়ে ফ্ল্যাট জুতা।
শিহাব শায়লার মুখটায় রিশতিনাকে ভেবে নিলো। এমনি হয়তো লাগতো রিশতিনাকে।
যদিও শাড়ি পরায় রিশতিনা অতটা এক্সপার্ট ছিল না। 
শায়লা  চায়ে চুমুক দিলো। নিজের বোকামিতে লজ্জা পেল। দুজনে চা শেষ  করলো। খুব বেশি ব্যক্তিগত কথায় শিহাব যেতে চাইল না। শত হলেও একেবারেই অচেনা একজন মহিলা । আর এখানে ওরা স্থায়ী বাসিন্দা। 
শায়লার চা খাওয়ার অপেক্ষায় শিহাব বলে উঠল, চলেন লুবানার দিকে যাওয়া যাক।আপনাকে নামিয়ে আমার কুরিয়র অফিসে যেতে হবে।
শায়লা ইতস্তত করছিল।কিভাবে  অচেনা একজন মানুষের সাথে বাইকে চড়ে যাবে!  
না না! আমি চলে যেতে পারবো। আপনি কুরিয়র অফিসে চলে যান।
আরে নাহ! মায়ের রিপোর্টটা জেনে যাই। আসেন। শায়লা বুঝতে পারলো আশেপাশের লোকজন থেকে বাঁচতে শিহাব তাড়া দিচ্ছে।শায়লা শিহাবকে অনুসরণ করে  এগিয়ে এলো। শায়লার বাইকে চড়ার অভিজ্ঞতা একেবারেই নেই।কিভাবে মানুষ খোলাভাবে এত স্পীডে বাইক চালাতে পারে সে অবাকই হয়। যখনি রিকাশায় করে কোথাও গিয়েছে পাশে সিগনালে কোন বাইক থামতে দেখলেই খুব ইচ্ছে হতো একটু চড়বার! 
আজ অজান্তেই তা ঘটে যাচ্ছে। শায়লা পিছনের সীটে উঠে বসলো।শিহাব তাকে বেশ ফ্রি করে দিলো।বললো  ভয় পাবেন না। আমাকে শক্ত করে ধরে বসবেন। শায়লা শিহাবের জিন্সের শার্টের কলার শক্ত হাতে খামচে ধরল।খুব স্বল্প সময়ের পথ। শিহাব চোখের পলকে একেবারে রকেটের বেগে লুবানার গেটে পৌছে গেলো। 
খুবই সাধারণভাবে নেমে দুজন রিপোর্ট কালেকশন বুথে গিয়ে  রিপোর্টগুলো কালেক্ট করলো। শিহাব একে একে সব কয়টা রিপোর্ট খুলে দেখলো। শিহাব কোন জড়তা বোধ করলো না বা অনুমতি নেবার প্রয়োজন মনে করলো না। তারওতো মা আছে।একজন মায়ের মেডিকেল রিপোর্ট পুত্রসম সন্তান শিহাব তা  দেখতেই পারে।
শিহাব সব দেখে শায়লাকে জানালো, আলহামদুলিল্লাহ,আপনার আম্মার সব রিপোর্ট ভালো এসেছে। আল্লাহ উনাকে দীর্ঘজীবী করুন। 
শিহাব সব কয়টি রিপোর্টের প্যাকেট নিজের সাথে নিয়ে নিলো।
দুজনে বেরিয়ে এলো। একটা রিকশা ডেকে শায়লাকে ইশারায় উঠতে বললো। শায়লা ধন্যবাদ দেয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। রিকশায়  উঠতেই হাতে প্যাকেটগুলো দিয়ে বললো, সাবধানে যাবেন।আপনার আম্মাকে আমার সালাম জানাবেন। আবার দেখা হবে। বলে নিজের বাইকের দিকে এগিয়ে গেলো।
সো মাচ কেয়ারিং পার্সন!! 
শায়লা একরাশ মুগ্ধতা আর কৃতজ্ঞতার অনুভুতিতে বিগলিত হয়ে  গেলো! মুখে বিজয়িনীর হাসি ফুটে উঠল!
আফা কোনদিকে জাইবেন?
ওহ! সাত নম্বরে চলো।
শায়লা দ্রুত মিলিয়ে যাওয়া বাইকটির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। 
চলবে....

২৩ নভেম্বর ২০২১

মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন"৫০

কান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক।  তার নিত্যদিনের  আসা  যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন "। 






টানাপোড়েন ৫০

উদাসী মন তারে খোঁজে


                                                                 ঠাৎই শীতের সকালে বৃষ্টি শুরু হল। ভোর থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। আবহাওয়া দপ্তর থেকে জানিয়েছে নিম্নচাপের জন্য। রেখা যেন আজ 16 বছরের তরুণী সেই আগের মতই বিছানায় পড়ে রয়েছে ,কিছুতেই উঠতে ইচ্ছে করছে না। আজ কোন তাড়া নেই, কারোর জন্য চিন্তা -ভাবনা নেই। শুধুই একান্তে নিজেকে জানা। উদাসী বাউল মন টাকে খুঁজে বেড়ানো।তাই জানলার কাছে মাঝে মাঝে গিয়ে মনে হচ্ছে  বৃষ্টি হাতে নিয়ে অনাবিল আনন্দ অনুভব করতে। 
এমন সময় কাকিমা এসে ডাকছেন ' ননী, ননী, ননী?'
রেখা বলল ' কি কাকিমা?'
কাকিমা বললেন 'তোর ফোন বাজছে?'
রেখা আলস্য জড়িত কন্ঠে বলল ' এত সকালে কে ফোন করছে?"
মনে মনে ভাবল মনোজ ফোন করল ,নাকি রিম্পাদি এই দুজন ছাড়া  আর কে ফোন করার আছে?
এমন সময় আবার ফোন বেজে উঠলো।
ফোনটা রিসিভ করতেই কণ্ঠ ভেসে আসলো
'হ্যালো রেখা ,আমি বড়দি বলছি'।
রেখা এবার বড়দির' গলার আওয়াজ পেয়ে বিছানায় উঠে বসলো, বলল ' 'হ্যাঁ, বলুন দিদি।'
বড়দি বললেন "১৬ * তারিখ থেকে তো স্কুল খুলে যাচ্ছে ।একটা তো মোটামুটি রুটিন তৈরি করা হচ্ছে যারা দূরের টিচার অনেকে বলছেন যে ওদেরকে সময়টা একটু বাড়িয়ে দিতে অর্থাৎ সাড়ে নটায় স্কুলে আসার কথা সেখানে ওরা সাড়ে দশটায় আসতে চাইছে?
তুমি তাহলে সাড়ে নটায়  আসবে তো?'
রেখা বলল  'দিদি ,আমাকে 10:30 থেকেই রাখুন না ,তাহলে আমার সুবিধা হয়।'
বড়দি বলেন ' বুঝতে পারছি কিন্তু আপনি তো ল্যাঙ্গুয়েজ এর টিচার। ক্লাস শূরু ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়েই হবে ।সেই ক্ষেত্রে আপনাকে তো আসতেই হবে।'
রেখা বলল 'কিন্তু দিদি তা কি করে হয়?  আমাদের কি প্রতিদিনই সাড়ে নটায় যাওয়া সম্ভব ?এটা যদি হয় যে বাধ্যতামূলক সকলের, সেটা তখন মেনে নেয়া যায়।'
বড়দি বললেন  'তাহলে তো আমি স্কুল চালাতে পারবো না।'
রেখা বলল 'আপনি আমাকে কি করে  লোকাল টিচার ভাবলেন ,আমি বুঝতে পারলাম না। আমার বাড়ি থেকে স্কুলে ডিস্টেন্স টা তো কম নয়?'
বড়দি বললেন ' হ্যাঁ সেটা আমি জানি ।
রেখা বলল '  বাচ্চাকাচ্চা নেই সেইজন্য?'
বড়দি বললেন 'রেখা তুমি রেগে যাচ্ছ'।
রেখা বলল  'একটু রেগে যাচ্ছি দিদি। সব সময় আমাদেরকে কম্প্রোমাইজ করতে হয় ।এইজন্য
জানি আপনি যেখানে বসে আছেন ,সেখান থেকে কাজ করাটা ওটা কঠিন ব্যাপার ।কিন্তু আমাদের কথাগুলো তো ভাবতে হবে দিদি?  হ্যাঁ সপ্তাহে ক'দিন যেতে হবে বলুন ¿আমি ঠিক যাবো । কিন্তু বাকি কটা দিন আমাকে একটু দেরিতে আসতে বলুন ,বাকিদের মতো।'
বড়দি বলেন' আচ্ছা দেখছি, অন্য কারো সাথে তিনদিন করা যায় কিনা?'
রেখা বলল  'অসংখ্য ধন্যবাদ দিদি।'
ফোনটা কাটার পর রেখা বলল ' আচ্ছা তো ,আমাকেও লোকাল টিচার এর মধ্যে ফেলে দিলেন দিদি। লোকাল টিচার আর বাইরে টিচার কি সবাইকে একদিন করে আসতে বললে তো কারোর কোন অভিযোগ থাকে না। কাকিমা বললেন ' কী হয়েছে রে?'
রেখা বললো  'শুনলে না আমাকে সাড়ে নটা থেকে স্কুলের টাইম করে দিয়েছে আর কিছু টিচারের সাড়ে দশটা থেকে।'
কাকিমা বললেন 'এ আবার কি কথা সবার ক্ষেত্রে এক হওয়া উচিত।'
রেখা বলে  'কি সুন্দর ঘুমচ্ছিলাম কোন বাইরের টান ছিল না। কি করতে হবে না করতে হবে কোনো দায়িত্ব নেই। কি সুন্দর সেই শৈশবের দিনের মতো একটা দিন পেলাম ।তাও সাতসকালে মেজাজটা বিগড়ে গেল।
কাকিমা বললেন' ঘুমো  তো ঘুমো?'
রেখা বলল '  ঘুম তো কেটে গেল কাকিমা? আর ঘুম হবে না।'
কাকিমা বললেন  'দিল তো আমার মেয়ের মেজাজটা বিগড়ে?' '
রেখা বলল  'কাকিমা ,আজকে বুলু জেঠিমার
 কাছে নিয়ে যাবে?'
কাকিমা বললেন ' যা বৃষ্টি পড়ছে এর মধ্যে বেরোবি? 'শুধু বুলু জেঠিমা কেন আরো কত জায়গা আছে অমিয়  কাকার বাড়ি যাবি না? কত ভালবাসতেন তোকে?'
রেখা বলল'  'যেতে তো সব জায়গায় ইচ্ছে করছে কাকিমা? কিন্তু এই দুদিনে কি ঘুরবো বলো?
কাকিমা বলেন এই দুদিন থাকবি? তারমধ্যে তো একদিন হয়ে গেল আজকে ধরে।"
রেখা বলে ' কি করবো বলো, স্কুল খুলে যাচ্ছে দীর্ঘ প্রায় এক বছরের পর ।স্কুলে যাওয়া হয় না সেভাবে । এখন তো রেগুলার মাফিক স্কুল শুরু হয়ে যাচ্ছে।
কাকিমা বললেন  ,'কিছু তোর বলার নেই। কি বলবো বল? তুই এসেছিস আমাদের কত ভালো লাগছে।'
রেখা বলল ' সময় পেলে চেষ্টা করবো আসার।'
কাকিমা বললেন-'আসবি। তোদের ই তো বাড়ি? আমরা আর কতদিন?'
রেখা মনে মনে ভাবল ' কাকিমা ছেলের নামে তো লিখে রেখেছ? যদিও জমি ফেরত চেয়ে মামলা করেছ।'
রেখা বলল কাকিমা  'বিপাশা কতদিন পর এসেছিল গো?'
কাকিমা বলেন  ,'বিপাশা না তোর কাকার অসুস্থ হবার আগে এসেছিল ।কী একটা দরকারে তখন আমাদের সঙ্গেও দেখা করে গেছে।'
রেখা বলল-'হ্যাঁ বিপাশা আমাকে ফোন করেছিল?'
কাকিমা বলল  'বিপাশা মেয়েটা কত ভালো বল অথচ  শুনতে পায় যে ওর পর নাকি ওকে অতটা পছন্দ করে না।
রেখা বলল-কি বলছ কাকিমা?'
কাকিমা বললেন  'হ্যাঁ রে ,ঠিকই বলছি ও যতবার আসে ওর বর সঙ্গে আসে না ।তারপর কোথায় কারো কাছে কিছু বলেছে কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে।'
রেখা বলে অথচ দেখো বিপাশার ভেতরে কত কোয়ালিটি ছিল ।অমি ও কাকা ঠিকঠাক করে ওকে যদি পড়াশুনা ও আরো অনেক দূর যেতে পারত কিন্ত ও  বিএড বা পিএইচডি যদিও করত?'
কাকিমা বললেন হ্যাঁ ঠিকই বলেছিস অমিয়দাকে  দোষ দিয়ে লাভ নেই রে, ওই তো দোকান থেকে যায় তাই দিয়ে সংসার চলে।
রেখা বলল তা ঠিকই বলেছ দেখেছি
কাকিমা বললেন'জানিস ননী বিপাশা নাকি একটা গানের স্কুল খুলেছে?
দেখা বলল  "আরিব্বাস দারুন ব্যাপার তো?'
কাকিমা বললেন  'হ্যাঁ রে ওর গানের গলা খুব সুন্দর ছিল ।গানটা তো ভালোই গাইত?'
রেখা বললো  'হ্যাঁ তা ঠিক বলেছ? কাকা দেখো ওই দোকান থেকে আয়ের ভেতরে মেয়েকে গান শেখানো ,পড়াশোনা করানো সব ই  তো করিয়েছেন বল?'
কাকিমা বললেন' হ্যাঁ রে'। সবাই কত সংসারে কত প্রতিবন্ধকতা ।তারা তো সংসার করছে আর তোর বোনটাকে দেখ?
রেখা বলল  'ওদের ভেতরে কি সমস্যা হয়েছে সেটা কি তোমাকে জানিয়েছিল কখনো কাকিমা?'
কাকিমা বললেন 'না রে সেরকম কিছু বলে নি।'
রেখা বলল  'আমিও অনেক ওকে বুঝিয়েছি কিন্তু ও আমাকে সব সময় উল্টো কথা বলেছে।'
কাকিমা বললেন  'ও তো ভালো কথা শুনবে না ।ও যেটা ভালো বুঝবে সেটাই। তুই বল পার্থ মতো ছেলে হয়?
রেখা বলে  'আমিও তো সেটাই ভাবার চেষ্টা করেছি ।পার্থ যখন হসপিটালে ভর্তি হয়েছিল  'সেটা কি তুমি জানতে কাকিমা?'
কাকিমা বললেন ,' , না তো?
রেখা বলল  'ও আমাকে ফোন করেছিল। দেখতেও গিয়েছিল ,ভেবেছিলাম ,তোমাকে জানাব কিন্তু ..?তোমাদের জামাই বলল 'কাকিমা, কাকু ব্যাপারটা নিতে পারবেন না থাক।'
কাকিমা বললেন 'কেন রে কি হয়েছিল?'
রেখা বলল  'তোমাকে বলি নি?আমিও আর আগ বাড়িয়ে কিছু বলব না ।যাইহোক পার্থ তো এখন ভালোই আছে।'
কাকিমা বললেন  'সুখে থাকতে ভুতে কিলোয়'। ওর 
কাকিমা বললেন 'যা ভাল বোঝে করুক আর কি বলব?'
এমন সময় মুষলধারে বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো। কাকিমা বলেন ' দেখ মনে হচ্ছে যেন বর্ষাকাল।'
এমন সময় ভোলা কাকা এসে বলল 'মামনি, দেখো কেমন বৃষ্টি হচ্ছে,?'
রেখা বলল 'কিন্তু তুমি তো ভিজে গেছ কোথায় গিয়েছিলে?''
ভোলা বলল 'এই জমি দেখতে গেছিলাম।
কাকিমা বললেন 'ভোলা খেয়ে যাবে কিন্তু আবার পালিয়ে যেও না।'
রেখার দুহাত বাড়িয়ে বৃষ্টির ছাঁটে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে চাইল,।
এমন সময় গুনগুনিয়ে গান গেয়ে উঠল  ' দেখেছ কি তাকে, ওই নীল নদীর ধারে ।বৃষ্টি পায়ে পায়ে তার কি জানি কি নাম ।জলে ভেজা...
সেই রামধনুকে চায়'।
রেখার কাছে আজকে যেন সব কিছুই ফিকে ধূসর  মনে হচ্ছে। আজ যেন সেই রামধনুর রঙকে বারবার খুঁজে পেতে চাইছে।'
উদাসী বাউল মন পৌঁছে যায় তার নীল নদীর ধারে। সেখানে গেলে কি খুঁজে পাবে তারে?

গোলাম কিবরিয়া শরীফ




সম্ভ্রম 



কোন ও এক রাতে
ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠা জংলার বাঘ..... 
মেতে ওঠে লালসায় - 
ওকে ভিক্ষা দাও। 

নিরবতা যখন ভীতি ছড়ায় -
আলোটা তখন শেকলে বন্দী, 
জোনাকীর ক্ষীন প্রচেষ্টা -
তামাশার সাথে করে সন্ধি .....

ঠিক তখন ই মুগ্ধ  তুমি
প্রানবন্ত, উচ্ছল ছলনায় -
নিজেকে বোঝাও  -
"ভালো আছি বেশ! "

জ্বলজ্বলে মশাল হাতে, 
উত্তাল দেশপ্রেমিক -
সীমানায় আছে,  শুধু কালো ধোঁয়া ...
আলো  নিভে গেছে সেই কখন! 

অন্ধকার, ঘুটঘুটে অন্ধকার ...

তবু প্রচেষ্টা নিরন্তর -
মেহেদী রাঙানো কোমল হাত -
ধরে আছে ব্যানারের লাঠি! 
মায়াভরা প্রেমিকের  সুদৃঢ় হাত -
ছেড়ে দিয়েছে সেই কবে!  

সে তো বিজ্ঞাপনের পন্য -
জানেনা সে নিজেও! 

তবু যায়..নিরালায়,  
চুক্তি হয়, চুপিসারে। 
ভালো থেকো, প্রিয় বোন -
স্বেচ্ছার অভিসারে ....

রুকসানা রহমান




সতী দাহ 


উত্তুরে হাওয়া তখনো যৌবন ছোঁয়নি
তবু লাল বেনারশি আর সিঁথীতে সিঁদুর পড়ে
চলে যেতে হলো অচেনা সংসারে।

যৌবনের কড়া নাড়তেই, সাদাথান আর ঘটি ভর্তি
জলের ধারায় ধুয়ে দিলো সব সিঁদুর।
তারপর প্রস্তুতি নিতে হলো সহপমরণের।

ধর্মের নামে চলে নারী হত্যার মহাজজ্ঞ
সতীত্ব রক্ষার নামে জীবন্ত তুলে দেয় জলন্ত চিতায়। মানুষ তো নই ছিলাম যেন পুরুহিত তন্ত্রের দাসী 
ওরা মানুষ হওয়ার আগেই পুরুষ হয়ে ওঠে, ধার্মিক হওয়ার আগে পুরুহিত সাজে।

নিষ্ঠুর-নির্মম প্রথার বলি হতে সাজালো বিধবাকে লালশাড়ি আর সিঁদুর পড়িয়ে টানতে টানতে নিয়ে গেলো গঙ্গার পাড়ে,
যেখানে সাজানো চিতায় স্বামীর মরদেহ,
ওখানে ছুঁড়ে ফেলা হবে লেলিহান আগুনের কুন্ডে
জীবন্ত শরীর।

তখনই তোমাকে খুব মনে পড়ছিলো মা, আর
চিৎকার করে ডাকছিলাম তোমায়, 
মা দেখো, তোমার আদরের মেয়ে বিয়ে নামক দাসত্বের বলি, জীবন্ত পুড়ছি আমি আর আমার নারীত্ব।

বাচঁতে বড় ইচ্ছে করে মা,
এখনো হয়নি যাওয়া মল্লিকা বনে, মেঘচুলে জড়াইনি শিউলির মালা।

তুমি শুনবে না জানি, পৌঁছুবেনা অস্ফুট স্বর,
তবু তোমার নামের জপ করি।
হয়তো,সেদিন ঈশ্বরের চোখে ছিলো জল।
তাইতো নির্মম-নির্দয় আর নিষ্ঠুর প্রথার অবসান করতে ঈশ্বর পাঠালেন এক মানব দূত।

নারীর আর্তনাদ তাকে ব্যথিত করে তুলেছিলো,
এই জঘন্য কুপ্রথার বিরুদ্ধে বিল্পব করে বন্ধ করেছিলেন সতীদাহ,
 দেখালেন আলোকিত সমাজের দিশা,
এনে দিলেন বেঁচে থাকার অধিকার।
তাইতো হে রাজা রামমোহন তুমি আজও নারীত্বের অলঙ্কার।

লেখক শান্তা কামালী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "বনফুল" ২৮

চোখ রাখুন স্বপ্নসিঁড়ি সাহিত্য পত্রিকার পাতায় লেখক শান্তা কামালী'র  নতুন ধারাবাহিক  উপন্যাস "বনফুল" 





বনফুল
শান্তা কামালী
( ২৮ তম পর্ব ) 


তিথি আর শিমূল সৈকত আর অহনার জন্য চা,মিষ্টি নিয়ে এলো। ওদের  বাবা মা'য়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো পলাশ। তারপর ঘর থেকে পোশাক চপাল্টে এসে ওরা বেরোতে যাবে,এমন সময় গাড়ি নিয়ে এসে হাজির জুঁই। পলাশের মা জুঁই কে বুকে জড়িয়ে ঘরে এনে একটু মিষ্টিমুখ করালো,তিথি ও জুঁই কে খুব আদর করে বললো, ভাইয়া তোমার অনেক নাম করেছে  কিন্তু পরিচয় আগে হয়নি,খুব ভালো লাগছে তোমাকে। আবার এসো।
ওরা গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে গেলো। একটু পরেই ওরা পৌঁছে গেলো জুঁইদের বাড়িতে। 

জুঁইয়ের আব্বু আম্মু পলাশ কে খুব আপ্যায়ন করে ঘরে নিয়ে বসালেন। তারপর, মিষ্টিমুখের পালা শেষ করে কফি খেতে খেতে জুঁইয়ের আব্বু পলাশ কে বললেন, টিভি তে লাইভ দেখলাম।খুব ভালো লাগলো, গর্ব হচ্ছে তোমার জন্য। একটা কথা তোমাকে জিজ্ঞেস করছি,যদি  দেশের থেকে ও ভালো বিদেশি ভার্সিটির সুযোগ আসে,তুমি কি রাজি আছো?
পলাশ বললো সে-তো অতি উত্তম হবে, কিন্তু..... 
কোনো কিন্তু নয়,তোমার ইচ্ছে টাই বড়ো ব্যাপার। সেটা তোমার আছে কি-না, সেটা বলো।
পলাশ বললো, সুযোগ এবং সামর্থ্য পেলে অবশ্য ই যাবো। কিন্তু, আমার.... 
আবারও কিন্তু! তোমার ইচ্ছে টাই শেষ কথা । জুঁইয়ের আব্বু বেশ জোর দিয়ে পিতা সুলভ ধমক দিতেই, পলাশ চুপ করে ঘাড় নেড়ে সায় দেয়। 
জুঁইয়ের আব্বু খুব শান্ত ভাবে বললেন, তবে মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নাও।অনেক বিদেশি ভার্সিটির সুযোগ আসবে।তারা তোমার মতো মানুষের জন্য হাত পেতে আছে। এই বলে উনি উঠে গেলেন ঘর থেকে। আর পলাশরাও রাত নয় টা বেজে গেছে দেখে উঠে  পড়লো। 
জুঁই ড্রাইভার কে গাড়ি বের করতে বলে নিজেও ওদের কে নিয় পৌঁছে দিতে বেরিয়ে পড়লো।

এস, কামরুন নাহার





আনন্দে আজ মন ভাসে


আনন্দে আজ মন ভাসে গো
সুখের নেশায় চোখ হাসে, 
আর মন হাসে, 
দৃষ্টি গোচর হয় বুঝি আজ
লাল সবুজের ও'ই চাষে।
আনন্দে আজ মন ভাসে
গো, মন ভাসে!
আনন্দে আজ মন ভাসে।

দুঃখ দুয়ার খুলে রাখি 
বজ্রধ্বনি লুন্ঠিতে,লুন্ঠিতে
আসবে যত আসুক বাঁধা
ছুঁড়ে দেব তীরের ধাঁধা, 
আত্মশক্তির বিশ্বাসে। 
আনন্দে আজ মন ভাসে 
গো মন ভাসে!
আনন্দে আজ মন ভাসে

আলো-আঁধারীর মেঘের স্রোতে টাপুর-টুপুর বৃষ্টি আসে।
হৃদয় গহীন পাড় ধ্বসে যায়
স্বপ্ন ভাঙ্গা নিঃশ্বাসে বুক 
ফিনকি ছোটে খুন হাসে
আনন্দে আজ মন ভাসে
গো মন ভাসে!
আনন্দে আজ মন ভাসে।

রক্তে ভেসে সিক্ত মাটি 
ধুলোর পথে জল ছিটায়, 
রিক্তবক্ষ অমানিশার মাঝেও 
নেয় দুঃখ শুষে, 
কষ্টগুলো পাঁজর ভাঙ্গে 
মর্যাদাহীন বিশ্বাসে।
আনন্দে আজ মন ভাসে গো
 মন ভাসে,  
আনন্দে আজ মন ভাসে।

রাঙ্গা প্রভাত ঊষার দুয়ারে,
বন্দীশালা অগ্নিতে, 
দাহ নিয়ে চোখ দু'টো আজ
পুড়ে মরে রাত্রিতে
ও-ই লাভার স্রোতে গা-ভাসে।
তাই আনন্দে আজ মন ভাসে 
গো মন ভাসে,
আনন্দে আজ মন ভাসে ।

আলমগীর হোসাইন





সুরভী খুজেঁ 


যন্ত্রনার বাষ্প দাহে তোমার সুরভী খুজেঁ
কষ্টসাধ্য পথের দিশা মিললেও ধন্য হবো
বিষাদের ছায়া হতে দুরের অজানা  পথের
মৃত্তিকার মসৃণ ধুলোয় মিশে সাথে রবো।

কঠিনথেকে কঠিনতর হয়ে উঠে প্রেমী মন
হতাশায় বিবেকহীন হয়ে পড়ে যখন তখন
বাচাঁর স্বপ্ন সখের বসতি নড়বড়ে দেখে
বেমালুম ভুলে যায় জীবনের সকল মানেই।

কতো স্বপ্ন ভাঙার গল্প ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে
কে কার খবর রাখে মিছে মায়ার এ ভবে
তোমার কাহিনীও মিশে যাবে দুর  আকাশে
ব্যর্থ এ প্রেমী অনন্ত অপেক্ষায় ডুবে যাবে।

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক গল্প "অলিখিত শর্ত"১৮

 স্বপ্নসিঁড়ি সাহিত্য পত্রিকার পাতায় লেখক শামীমা আহমেদ'র  নতুন ধারাবাহিক  উপন্যাস "অলিখিত শর্ত"




শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত 
                                              (পর্ব ১৮)
   শামীমা আহমেদ 



                                                পু, আম্মার রিপোর্টগুলো আজ নিয়ে এসো।আর আমাকে কল দিয়ে জানিও। ডাইনিং টেবিলে এ চায়ের কাপ হাতে তাড়াহুড়োয় রাহাত কথাটা শায়লাকে জানালো। শায়লা টেবিলের ওপ্রান্তে গভীর চিন্তামগ্ন।কি জানি রাহাতের কথা তার কানে পৌছুল কিনা! 
রাহাত অফিসের জন্য তৈরি হতে নিজের রুমে চলে গেলো।সকাল আটটায় গাড়ি নিচে চলে আসে। না অফিস থেকে কোন গাড়ির ব্যবস্থা  নেই। কয়েকজন কলীগ মিলে একজন কলীগের গাড়ি শেয়ার করে।সেই কলীগ একটু সেক্টরের ভেতরের  দিকে থাকে।একে একে তিনচারজন কলীগকে সে তুলে নেয়।খুব সুন্দর একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ওদের মাঝে। আসলে এরা সবাই মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান।জীবনে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আজ এই অবস্থানে। একটা উন্নত জীবনের জন্য কতই না পরিশ্রম রাতজাগা পড়াশুনা।প্রতিযোগিতায় নিজের শক্ত অবস্থান করতে দিনরাত্রিকে এক করা।ওরা কেউই ওদের অতীত ভুলেনি।কারো কারো জন্য অতীত একটা বিশাল শিক্ষাক্ষেত্র। বর্তমান সময়ে চোখ বন্ধ করে  যখন অতীতের  দিকে তাকায় আরো এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণায় চলে দিবারাত্রির পরিশ্রম।প্রায়ই ওরা একসাথে খেতে যায়,বেড়াতে যায়। যার গাড়ি সেই বন্ধুকে, তার  ফ্যামিলিকে মিলিতভাবে  উপহার দেয়। 

শায়লা আজ যেন অন্য এক ভুবনে বাস করছে! নানারকম রোমাঞ্চ আবার দূর্ভাবনায় আছন্ন হয়ে আছে। বয়সের এই জায়গায় দাঁড়িয়ে এমন অনুভুতিও যে কল্পনাপ্রবণ করে তুলবে শায়লা কখনো ভাবেনি।  সে কি নিজে থেকে সেধেই এই সিচুয়েশনকে ডেকে আনছে? তবে কেন এত  দ্রুত সব কিছু ঘটে যাচ্ছে!যেখানে নিজেকে গুটিয়ে রাখতে চেয়েছিল, আজ শিহাবের এক কথাতেই দেখা করতে রাজী হয়ে গেলো।তবে কী শিহাবের প্রতি তার আস্থা জন্মেছে? শিহাব কি তার নিজের একাকীত্বে শায়লাকে সঙ্গী করতে চাইছে?কেনইবা সে এভাবে দেখা করার প্রস্তাব এগিয়ে দিলো?আর শায়লা তা নির্দ্বিধায়  গ্রহণ করলো।
নীচ থেকে গাড়ির হর্ণ বেজে উঠলো! রাহাত অফিস ব্যাগ নিয়ে  রুম থেকে বেরিয়ে এলো। ওর অফিস গুলশানে।।একটু আগেই বেরুতে হয়।নয়তো বনানীর বিশাল জ্যামে আটকে যেতে হয়।রাতে আবার একসঙ্গে সবার ফেরা।
আপু আসি।মায়ের খেয়াল রেখো।বলে রাহাত দোতালা থেকে নেমে গেলো। দরজা লাগানোর  শব্দে শায়লা নিজের মাঝে ফিরে এলো!
নাহ! এত আনমনা হয়ে যাওয়ার কি আছে। শুধু দেখা করতেইতো যাওয়া। অচেনা কোন যায়গায়তো নয়। কত অপরিচিত  ডাক্তারের সাথেওতো কথা বলতে হয়।একসময় পরিবারের সব দায়িত্ব একার কাঁধে তুলে নিয়েছিল। একা একা অনেক পথ চলেছে। আজীবনের জন্য না হউক কিছুটা সময় কেউ সঙ্গ দিতে চাইলে কেন তা গ্রহন করবে না?ভেতরে ভেতরে নানান ভাঙা গড়ায় শায়লা এক পা দু পা করে নিজের ঘরে এলো। শিহাবের মেসেজ এসে আছে।
শুভ সকাল। 
কেমন ঘুম হলো?
কখন বেরুচ্ছেন?
শায়লা মেসেজ সিন করলো। হাত কিছুতেই কিবোর্ড বাটনে যাচ্ছে না। মোবাইলটা  মনে হচ্ছে অত্যন্ত  ভারী।শায়লার হাত কাঁপছে! 
শিহাবের কল চলে এলো।
কি হলো কোন রিপ্লাই নেই যে?
আমাকে ঠিক সময়টা না জানালে কিভাবে বের হবো?
ওপ্রান্তে শিহাবের খুবই সহজ করে বলে উঠা।
শায়লা  কাঁপা গলায় বললো, সাড়ে নয়টা। 
ওকে।তাহলে আমি নাস্তাটা করে শাওয়ারে ঢুকছি।ও আচ্ছা, আপনি কোথায় থাকবেন? মানে আপনার বাসার কাছাকাছি হয় এমন কোথাও।(কোন মহিলার বাসা কোথায় জানতে চাওয়া শিহাব মনে করে এটা ভীষণ একটা অভদ্রতা।)
আপনি সেখানে দাঁড়ালেন, আমি একটানে বাইকে চলে আসবো।শিহাবের কন্ঠে জিজ্ঞাস্য আছে কিন্তু কোন আবেগ নেই।শায়লাকে আসতে বলা হচ্ছে কিন্তু তাতে কো উচ্ছ্বাস নেই।যেন ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্ট নেয়ার মত করে এসিস্ট্যান্টের কাছে  সময় আর সিরিয়াল নম্বর, ফ্লোর নম্বর জেনে নিচ্ছে।
শায়লা হালকা গলায় বলে উঠল,
আপনিই বলুন কোথায়? 
তাহলে উত্তরা মেডিকেলের সামনে একটা চায়ের টং ঘর আছে। আমি ওখানে সকালের চা খাই।ওদের ধোঁয়া ওড়া আদা লাল চা,,একেবারে সকালের আলসেমিটা কাটিয়ে দেয়।
শায়লা  কিছুই  আমলে নিল না।মাথার ওপর দিয়ে সব চলে গেলো।শুধু জায়গাটা জেনে রাখলো।
শায়লা আনমনে বললো, ঠিক আছে। আমি চলে আসবো।
ওকে বাই, বলে শিহাব ওপ্রান্তে মিলিয়ে গেলো।
শিহাবের দৃঢ় কন্ঠ শায়লাকে সাহস যোগালো। শিহাবের কেন এই দেখা করতে চাওয়া! শায়লা তার উত্তর খুঁজে ফিরে।
সে মনস্থির করে নিলো যে সে যাচ্ছে।
ওহ! শাড়ির কথাতো জানানো হলোনা।কিন্তু নিজেই তো ঠিক করেনি কোন শাড়িটা পড়বে।
মনে পড়লো কোটা শাড়িটার কথা। যেদিন
ছোটবোন নায়লার বিয়ের কথা পাকাপাকি করার জন্য মোর্শেদদের বাড়ি থেকে সবাই এসেছিল, সেদিন শায়লা সোনালী চিকন পাড়ের কালচে নীল রঙের একটা কোটা শাড়ি পরেছিল।খুবই সুন্দর লাগছিল তাকে। ওবাড়ির লোকজন সবাই 
চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে শায়লাকে দেখছিল।
শায়লা ঠিক করলো সেই শাড়িটাই পরবে।
শায়লা তার আলমারির দিকে এগিয়ে গেলো।
মা এখনো ঘুমিয়ে আছে। মা উঠলে তার নাস্তা দিতে হবে।শায়লা গোসলে ঢুকে গেলো। 
সাড়ে আটটা বাজছে। সময় আছে। গোসল সেরে রেগুলেটর ঘুরিয়ে ফ্যানের স্পীড বাড়িয়ে দিলো চুল শুকাতে। শায়লা এখন আর হেয়ার ড্রায়ারটা খুব একটা ইউজ করে না। এখন অফিসের তাড়া নেই। শায়লা শাড়ি পরে নিল।অনেকদিন পর।শেষ কবে শাড়ি পরেছিল মনে নেই।আয়নায় নিজেকে দেখে নিল। নীল শাড়িটায় তাকে বেশ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে।।আর কোন প্রসাধনী নয়  শুধু কাঠমেরুণ লিপস্টিকটা দেয়া।  ক'দিন আগেই আইভ্রুটা ফ্রেস করে আসা ছিল। শায়লা চুল আঁচড়ে ডাইনিং এ চলে এলো।
মা উঠেছে। মা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
শায়লা মাকে সহজ করতে বলে উঠলো,
আজ শাড়ি পরলাম মা।তুমি তো আমাকে শাড়ি পরা দেখতে চাও।তাই পরলাম। কেমন লাগছে মা?
মায়ের চোখে পানি এসে গেলো।
শায়লা মায়ের ওষুধের বক্স এগিয়ে দিল।।নাস্তার আগের ওষুধ খেয়ে নিতে।
শায়লা বারবার ডাইনিংয়ের বড় ঘড়িটা দেখছে। নয়টা বাজছে।
কাজের বুয়া রেনুর মা এলো।শায়লাকে শাড়ি পরা দেখে  সে এতটাই আশ্চর্যান্বিত হয়েছে যে, তার চোখ দুটো  যেন ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে! মুখে মন্তব্যও বেরিয়ে এলো! "আফারে একদম পরির লাহান লাগতাছে! আহা আম্মা আফার কেমুন একটা বিয়ে দিলেন, জামাই রইল  সাত সমুদ্দুর পাড়ে।এইসময় জোড়া কইতর একসাথে ঘুরবো কতই না সুন্দর লাগবো!"
শায়লা নিজের ঘরে চলে এলো। শিহাবের উপস্থিতি তাকে আছন্ন করে রেখেছে। শিহাবের মুখচ্ছবি চোখের পর্দায় ভাসে।সুদূর কানাডার হাতছানি আজকাল আর তাকে ভাবায় না।
শায়লা গতকালের হ্যান্ড ব্যাগটা হাতে নিল।
ব্যাগটা আড়ং থেকে কেনা। তার চাকরীক্ষেত্রের কলীগরা তার বিদায়ে উপহার দিয়েছি স্মৃতিচিহ্ন  হিসেবে। শায়লা ব্যাগের  চেইন খুলে টেস্টের রিপোর্টের মানি রিসিটটা আছে কিনা চেক করে নিলো।গতকালই সব পেইড করা। আজ শুধু রিপোর্টগুলো আনা। গতকাল এই সময়টাতেও শায়লা জানতো না আজ তার জীবনের মোড় অন্যদিকে ঘুরে যাচ্ছে! কার জন্য কোন সকাল শুভ বারতা নিয়ে আসে সেটা তো তার অজানাই থাকে।আমরাই কেউই কি কখনো জানি একটু পরেই আমাদের জীবনে কী ঘটতে যাচ্ছে?

নয়টা  পঁচিশ বেজে গেছে।শায়লা শেষ বারের মত আরেকবার আয়নায় নিজেকে দেখে নিল।
মাকে জানিয়ে নীচে নেমে এলো। শায়লার পা চলছে না।ভেতরে হাতুরি পেটানোর মত বেদম শব্দে কানে তালা লাগার উপক্রম!  শায়লা একটা রিকশা  দাঁড় করালো। 
কোথায় জাইবেন?
রিকশাওয়ালার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শায়লা রিকশায় উঠে বসলো।রিকশা চলছে উত্তরা সাত নম্বর সেক্টর পার্ক রোড  থেকে বাংলাদেশ মেডিকেলের টি স্টলের দিকে..
চলবে....

রাবেয়া পারভীন এর ছোট গল্প" স্মৃতির জানালায়"(২য় পর্ব)





স্মৃতির জানালায় 
(২য় পর্ব)


তিনি তাঁর কৈশোরে যৌবনে আজকের এই সফলতার স্বপ্ন দেখতেন  এবং মনে মনে দৃঢ় হতেন যে লক্ষে  একদিন পৌছাতেই হবে। অথচ  তাঁর ছেলেরা  কাজের প্রতি যেন কোন আগ্রহই নেই। না চাইতেই  সব পেয়ে পেয়ে  ছেলেগুলি এমন হয়েছে। হঠাৎ গাড়ী চলতে শুরু করতেই  চমক ভাংলো মাহতাব সাহেবের। যানজটে আটকে থাকতে  থাকতে অস্থির  লাগছিল ।  পিছনের সীটে  বড় ছেলে মোহন মুখ ভার করে  বসে আছে। মোহন যে গাড়ীতে বসে আছে  সেটা এতক্ষন মনেই ছিলনা মাহ্তাবের। তিনি  পিছন ফিরে  মোহনকে দেখলেন। কয়েকদিন  ধরেই  দেখছেন  ছেলেটা খুব মুখ ভার করে থাকে। অফিসের কর্মচারীদের উপর খুব  হম্বি তম্বি করে। কি হয়েছে  ছেলেটার ?  মোহন কি  দাম্পত্য  সমস্যায়  ভুগছে ? কি জানি হতেও  পারে। কিন্তু পিতা হয়ে  পুত্রকে কি তিনি এ কথা জিজ্ঞেস  করবেন ?  নাহ্ এসব নিয়ে কোন প্রশ্ন  তিনি ছেলেকে করতে পারবেন  না। চিরকালই তিনি সন্তানদের সাথে  যথেষ্ট দুরত্ব বজায় রেখে চলেছেন। ছেলেরা তাকে যথেষ্ট  ভয় করে।  এটুকু ভয় না থাকলে ছেলেরা তাঁকে মান্য  করবে কেন ? নানা রকম ঠুনকো পারিবারিক  সমস্যা  নিয়ে ভাববার তাঁর সময় নেই । তাঁর অন্য  অনেক কাজ আছে। আজীবন তিনি  কাজের মধ্যে ডুবে রয়েছেন। যতদিন তিনি বেঁচে আছেন  আরো অনেক কাজ করতে হবে। নিজের জন্যে  পরিবারের জন্যে  মানুষের  জন্যে , যাতে  মৃত্যুর পরেও মানুষের  মন থেকে তিনি হারিয়ে  না যান। এই ইচ্ছেটাকে সামনে রেখেই  তিনি ছুঁটে চলেছেন অবিরাম।  বয়স তো আর কম হয়নি, মাঝে মাঝে ক্লান্ত হয়ে পড়েন কিন্তু এই ক্লান্তিকে তিনি  আমল দেননা । পারিবারিক ক্ষুদ্র যে সব সমস্যা  আছে সে সব তিনি  তাঁর স্ত্রী রেহানার উপড় ছেড়ে দিয়েছেন।  সে কতটুকু কি করতে পারে  তাঁর খবরও তিনি ঠিকমত  রাখতে পারেন না।
 চলবে.....

২২ নভেম্বর ২০২১

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক গল্প "অলিখিত শর্ত"১৭

 স্বপ্নসিঁড়ি সাহিত্য পত্রিকার পাতায় লেখক শামীমা আহমেদ'র  নতুন ধারাবাহিক  উপন্যাস "অলিখিত শর্ত"






শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত 
                                              (পর্ব ১৭)
   শামীমা আহমেদ 


                                                         অফিস থেকে বেরুতে বেরুতে  শিহাবের সন্ধ্যে হয়ে গেলো।এরই মধ্যে বন্ধুদের কয়েকবার কল চলে এলো।'সন্ধ্যার চা' অর্থাৎ  ইভিনিং টি  পানের নিমন্ত্রণ।বুঝে গেলো শিহাব আজ আর এদের হাত থেকে তার নিস্তার নেই।এখুনি বাসায় ফেরা হচ্ছে না।হাতের কাজগুলো গুছিয়ে নিয়ে নিজেকে একটু ফ্রেশ করে নিল।এমনিতেই সারাক্ষনই বন্ধুদের টিপ্পনী  শুনতে হয়।শিহাব নাকি মেয়েদের পটাতে ওস্তাদ।কিন্তু এটা সম্পূর্ণই ওদের ভুল ধারণা। মেয়েরা নিজে থেকেই শিহাবের দিকে আকৃষ্ট হয়।তার লুক,বিহেভিয়ার, আইডোলজি কেয়ারিং এটিটিউট,কঞ্জারভেটিভনেস এ মেয়েরা,এমনকি অনেক  মহিলারাও ভীষণ দূর্বল হয়ে পড়ে।
শিহাব তাই খুবই সংযত হয়ে চলাফেরা করে।
একটু সরলতায় কথা বললে অনেকেই সেটা দূর্বলতা ভেবে নেয়। এই জীবনে রিশতিনা এসেছিল খুবই অল্প সময়ের ভালোলাগায় আবার হারিয়েও গেছে খুব দ্রুত সময়ে।তার পর থেকেইতো একাকী জীবন। তবে শিহাব ইচ্ছে করলে দিনে চার পাঁচজনে মেয়ের সাথে ডেট করা তার কাছে কোন ব্যাপারই না। হ্যান্ডসাম লুক, আর্থিক স্বচ্ছলতা, সানগ্লাস পরে বাইক চালানোয় মনে হয় একেবারে স্বয়ং সালমান খানের আদলে একজন নায়কের উপস্থিতি, সর্বোপরি সিঙ্গেল লাইফ! স্ত্রী আছে না নেই,চলে গেছে না গত হয়েছে, ফিরে আসবে  নাকি আর ফিরবে না ডিভোর্স  না সেপারেশন হয়েছে? আজকাল মেয়েরা এসব ভ্রুক্ষেপ করে।সুপুরুষ দেখলে তারা মৌমাছির মত ঘিরে ধরতে চায়! কিন্তু সবাইতো আর শিহাবের মনের ভেতরের সবটা জানে না। শিহাব এসব কখনো ভাবনায়ও আনে না।শুধু ভাবে যার এত এত আছে তবুও তার একান্ত নিজের বলে কেউ নেই।এটা কী নিয়তি নাকি তার ভূলের মাশুল।
বন্ধুরা সব অপেক্ষায়। দিনশেষে বড় বড় হোটেল রেস্টুরেন্টে বসে আড্ডা দেয়া একেবারে একঘেয়েমিতে ধরে গেছে। সারাদিনের অফিসের পর তা একেবারে দমবন্ধ লাগে।তাইতো সব বন্ধুরা দূরে একটা খোলা একটা জায়গায়  আড্ডা বসায়।সেখানে পাশেই একটা চায়ের দোকান, ছোট্ট সাইনবোর্ডে লেখা 'মায়ের দোয়া' টী স্টল।এর  স্পেশালিটি হচ্ছে গরুর খাঁটি দুধের মালাই চা। এরা দুধটাকে বেশ ঘন করে তা দিয়ে চা বানায়। উপরে দুধের মালাই ভাসিয়ে দেয়া! আহ! সেই চা খেলে ঠোঁটে  লেগে থাকে।
আকাশে যখন বিশাল চাঁদ উঠে, সেই খোলা যায়গায় আলো আঁধারিতে চা খেতে শিহাবের যেমন ভালো লাগে তেমনি মনটা বিষাদে ভরে যায়। একাকীত্বের এ যন্ত্রণা কাউকে বলা যায় না শুধু বলতে ইচ্ছে করে ঐ চাঁদটিকে।বাইরে বন্ধুদের সাথে গল্পে হাসি আনন্দে মেতে থাকে।কখন যে  বেশ কয়েককাপ চা চালান হয়ে যায় তার খেয়ালই থাকে না।

শিহাব সাততলা থেকে নেমে এলো। বাইকে স্টার্ট দিয়ে চললো উত্তরা দিয়া বাড়ির দিকে। সেখানে বন্ধুদের সাথে নিয়মিত দেখা হওয়া।
বন্ধুরা সব ধনীর ঘরের সন্তান।সবাই পৈতৃক ব্যবসার মালিক। খুবই বিলাসিতায় জীবনযাপন। চারিত্রিক দিক দিয়েও বেশ খোলামেলা। কিন্তু শিহাব এর মাঝেও নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে।কোন বন্ধুর প্রোরচনায় কোন নারীদেহের প্রলোভনে কোথাও পা বাড়ায়নি।শিহাবের সকল কিছু ইচ্ছা বাসনা তাড়না কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে।মনের  সুক্ষ্ম অনুভুতির অনুভবে তাইতো শিহাব আজো রিশতিনার ছোঁয়া  খুঁজে ফিরে।কামুক পুরুষের  মত শুধু নারীর দেহভোগ  করতে সে শিখেনি। অনেক বন্ধুকে দেখেছে প্রয়োজন ফুরালে প্রেমিকাকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে, অস্বীকার করতে। শিহাব অন্য এক ধাতুতে গড়া এক লৌহ মানব।যে নিজেকে দিনদিন কঠিন থেকে কঠিনতর করছে।
আড্ডা শেষে বাসায় ফিরতে ফিরতে  শিহাবের রাত দশটা বেজে গেলো। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।তবুও আলসেমিকে প্রশয় দিল না। একেবারে ফ্রেস হয়ে বিছানায় চলে এলো।চায়ের কারণে একেবারেই ক্ষুধা নেই। তাছাড়া সবকিছু গুছিয়ে নিতেও ইচ্ছে করছে না।
হঠাৎ  মোবাইল বেজে উঠলো। মায়ের ফোন।

কেমন আছিস বাবা?
এই তো মা ভালো আছি। 
তোমরা? আরাফ কেমন আছে?
ভালো।ঘুমিয়ে গেছে।
রাতের খাবার কি খেয়েছিস?
এইতো খাবো মা।
শোন,কাল কুরিয়ারে কিছু খাবার পাঠাচ্ছি।
সুমাইয়া আজ সারাদিন সব গুছিয়েছে।
কুরিয়ার থেকে সময় করে নিয়ে আসবি।ওরা ফোন দিবে।সাবধান দেরি করবি না।তবে সব নষট হবে।
মা কেন এসব করো?
মা হলে বুঝতি,কেন করি।
আচ্ছা ঠিক আছে মা।আমি নিয়ে আসবো।
আচ্ছা রাখি।
শিহাব ভেবে নিল কাল তাহলে অফিসে যাওয়া আগেই সুন্দরবন কুরিয়ারে যেতে হবে।সেক্টর ৯ এ। খাবারগুলো আবার বাসায় রেখে  একটু গুলশানের দিকে যেতে হবে।কিছু জরুরি কাজ আছে।
শায়লার মেসেজ এলো।
রাতের খাবার খেয়েছেন?
শিহাবের হাত থেকে আর ফোনটি রাখার ফুসরৎ মিললো না।
না, মানে খাইনি, খাবো,আবার খেতে ইচ্ছেও করছে না।
খেতে ইচ্ছে করছে না নাকি খাবার গুছিয়ে নিতে আলসেমি করছেন?
দুটোই। 
না, এটা তো ঠিক না।
তাহলে চলে আসেন,গুছিয়ে দিয়ে যান।
শায়লা কথাটা বেশ সহজভাবেই নিলো। বললো হ্যাঁ, বাসার ঠিকানাটা দিন চলে আসি।
আরে না না বলেন কি! 
আচ্ছা, কেন আপনি একা সেটা কি বলা যায়?
হ্যাঁ, বলা যায়, তবে এভাবে না কখনো দেখা হলে সামনাসামনি তখন বলবো।
দেখা হবে কিভাবে? 
শিহাব হয়তো জানে না ভেতরে ভেতরে শায়লা শিহাবকে দেখার জন্য কেমন উদগ্রীব  হয়ে আছে।খুবই রহস্যজনক একজন মানুষ। অন্য সব পুরুষদের মত নয়।যারা পরিচয়ের দুদিন পরেই দেখা করার জন্য নানান বাহানা খোঁজে।
হবে কোন একদিন। একসাথে দেখা করে চা খাবো।চলে আসবেন তো? আপনাকে একটা বিশেষ চা খাওয়াবো। সেখানে আমরা সব বন্ধুরা চা খাই।
এভাবে থাকতে কি আপনার ভালো লাগে?
না লাগে না।কিন্তু থাকতে হয়।
শিহাবের হঠাৎ সকালের কথা মনে পড়লো।
আচ্ছা আপনার মায়ের রিপোর্ট আনতে কখন যাবেন?
এইতো দশটার পরে।আচ্ছা আমিও তখন বেরুবো।মা খাবার পাঠিয়েছে কুরিয়রে।চিনবেন হয়তো।সুন্দরবন কুরিয়রে।সেটা আনতে বেরুবো। আপনি চাইলে তখন আপনার সাথে দেখা করতে পারি।
শায়লার মনে একটা চাপা উত্তেজনা আর ভয় মিশ্রিত আবেগের শিহরণ বয়ে গেলো।
কিন্তু শিহাব নির্বিকারভাবেই সব বলছে।যেন কোন ব্যবসায়িক কারণে মিট করা।
আপনি কোথায় থাকবেন তাহলে আপনাকে
আমার বাইকে তুলে নিলাম।তারপর লুবানায় চলে গেলাম।
শায়লা ভীষণ  বিস্মিত হয়ে গেলো।তার জীবনে আচমকা এই লোকটির এমন আগমন, আবার এতটাই আন্তরিকতাপূর্ণ ব্যবহারে শায়লা জীবনের অন্য একটি মানে খুঁজতে লাগলো। ভেবে নিল আমরা যেখানে শেষ বলে ধরে নেই , সেখান থেকেও যে আবার কিছু শুরু হতে পারে সেটা বুঝার ক্ষমতা আমাদের নেই।
কি হলো? বললেন না কোথায় থাকবেন? আর আপনাকে কিভাবে চিনে নিবো? মানে কী রঙের শাড়িতে থাকবেন?

শাড়ি? শায়লা ভাবলো শাড়ি পরা হয়না বহুদিন।এভাবে কেউ তাকে শাড়িতে দেখতে চায়নি , তার জন্য কেউ ছুটে আসবে, অপেক্ষায় থাকবে!
শায়লা ভাবছে সে স্বপ্ন দেখছে নাতো!
শায়লা জানালো, আমি সকালে জানাবো কী রঙের শাড়ি পরবো।
শিহাব আচ্ছা বলে বিদায় নিয়ে নিলো। হাতে টিভির রিমোট নিলো।আজ একটা ইংলিশ মুভি দেখবে। মুভি শেষ করে তখন কিছু খেয়ে নিবে। শিহাব সিগারেটের প্যাকেটের দিকে হাত বাড়ালো।

নির্ঘুম শায়লার পৃথিবীটা আজ উলোটপালোট হয়ে গেছে! শায়লা শুনেছে মনের খুব গভীর থেকে কিছু চাইলে সেটা নাকি  একদিন মিলে যায়। শিহাবের মুখখানি বারবার তার সামনে ভাসছে। গত একবছরে শায়লার তার জীবনে ঘটে যাওয়া সবকিছুকে সে বিচ্ছিন্ন একটা দূর্ঘটনা ভেবে নিচ্ছে।মনে হচ্ছে এটাই যেন ঘটবার কথা ছিল। তার গাড়িটি ভূল পথে চলে গিয়েছিল। কল্পনায় শায়লা লাল নীল অনেককিছু ভেবে নিচ্ছে।
হঠাৎ টুং করে মেসেজ এলো, রাত তিনটা। শিহাবের মেসেজ।
ঘুমাননি?
শায়লা মিথ্যে করে বললো, হ্যাঁ ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।আপনার মেসেজের শব্দে জাগলাম।
ঘুমিয়ে পড়েন। আমি মুভি দেখা শেষ করলাম। কাল সকালে দেখা হচ্ছে । 






চলবে.....

আমির হাসান মিলন




প্রশান্তি 
  

তোমাকে যখন দেখি , 
আমার বুকের প্রশান্তে প্রবল ভু-কম্পন সৃষ্টি হয় 
হৃদয় ছিটকে গিয়ে চাঁদের মতোন 
পৃথিবী মঙ্গল এর মাঝে স্থবিরতা প্রাপ্ত হয় । 

তোমাকে না দেখে, 
আমার ভিতর কোন এক সুদুর সুখের অব্যক্ত ব্যথায় 
শীতের সন্ধ্যার তারার মতো লাস্যময়ী হয়ে উঠে 
নিজেকে পেয়ে খুঁজে পাই হারানো সুর । 

তোমাকে যখন দেখি , 
হৃদপিণ্ড থেকে আমার উল্কা বৃষ্টি শুরু হয় 
হৃদয়ের অনু ছিঁড়ে ছিঁড়ে 
পাকস্থলীতে ভস্মের মহাস্তুপ সৃষ্টি করে । 

তোমাকে না দেখে,
আমার দুটি চোখ চৈতি পৃথিবীর মতো খর হয়ে উঠে
সেখানে দুঃখের অশ্রু প্রতিহিংসার তাপে 
বাষ্পীভূত হয়ে লীন হয় । 

অসামান্য রূপের আলোক ছটায় 
আলোকিত না হয়ে , ডুবে থাকি আরাধনায় ।

সাফিয়া খন্দকার রেখা




রঙচঙা এক মৃত্যু নিয়ে
শহরময় হাঁটিস


পাথর সমান ভারি যখন মেঘ
চোখে তখন বাঁধনহারা বেগ,
যখন আমার শ্বাসরুদ্ধ অভাব
তখন তোর বেহায়াপনা স্বভাব। 
ইচ্ছে হলে টগবগিয়ে হৃদপিণ্ড ফোটে
তোর আকাশে হাজার শত অলি এসে জোটে,
দাড়িয়ে থাকি দূরে দেখতে থাকি তোকে
ভুল করে তুই ঢুকে পরিস নিত্যনতুন শোকে।
প্রেম নিয়ে তুই খেলতে থাকিস কাটাকুটি খেলা 
যেনো মোমের পুতুল নাচতে থাকে প্রেমযমুনায় ভেলা।
অভাব ঠোঁটে চুমু খেয়ে টলতে থাকিস নেশায় 
নষ্ট প্রেমের হাওয়া এসে উম্মাদনা মেশায়।
উম্মাদ তুই ভাবতে থাকিস এইতো মহা সুখ 
আকড়ে ধরে জাপটে তোকে মস্ত এক অসুখ। 

পরগাছারা শেকরবিহীন তৃষ্ণা নিয়েই বাঁচে
নিজে পোড়ে পোড়ায় হৃদয় মিথ্যা প্রেমের আঁচে।
দূর থেকেই তাকিয়ে দেখি নষ্ট একটা তুই
তোর আঙিনায় কেমন ছিলাম ভালোবাসার ভুঁই।
ফিরিয়ে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফিরিয়ে নিয়ে মায়া
পেছন ফিরে দেখি তুই এক অমাবস্যা কায়া। 
রঙচঙা এক মৃত্যু নিয়ে শহরময় হাঁটিস 
পুষে রাখা দগদগে দাগ হাড়গোড় সব চাটিস।
মনেপ্রাণে ভাবছিস তুই পেলবতা মাখিস!
এই দরোজায় ঐ দরোজায় হৃদয় ছুঁয়ে থাকিস!!
অপগণ্ড মূর্খ তুই হৃদয় পোড়া ছাই
খুঁজে দেখ তোর জন্য কারো মায়া নাই,
আদ্যোপান্ত তোকে জানিস নিত্য আমি পড়ি
ঘৃণার এক বিষবৃক্ষ নিজের ভেতর  গড়ি।