২৩ এপ্রিল ২০২২

মমতা রায় চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস ১৬০





উপন্যাস 


টানাপোড়েন ১৬০
নানা রকম
মমতা রায় চৌধুরী



আজ এতটাই ট্রায়াড ছিল রেখা যে বিছানায় শুতে না শুতেই ঘুমিয়ে পড়ল। মনোজ ড্রইংরুমে বসে খেলা দেখছিল টিভিতে। তারপর যখন ও শোবার ঘরে আসলো দেখল রেখা নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে ভোস ভোস করে। মনোজ আপন মনে বলল আমাকে বলে আমি নাকি নাক ডাকি। আর আজ যে ম্যাডাম নাক ডাকছে তার প্রমান রাখতেই হবে। বলেই ফোনটা নিয়ে ভিডিও করলো।
তারপর রেখাকে ডাকলো 'কি গো এত নাক ডেকে ঘুমোচ্ছ?"
কোনো আওয়াজ  না পেয়ে  রেখাকে ধাক্কা মারলো।" কিগো এত নাক ডাখছ কেন? তুমি  নাকি ঘুমানোর সময় নাক ডাক না?"
রেখা অবাক হয়ে তাকিয়ে ঘুমের ঘোরে বলল "বেশি বাজে ব'কো না তো? আমি নাক ডাকি না তোমার মত।"
মনোজ  খুব জোরে হো হো হো করে হেসে উঠলো কিন্তু তাতেও রেখার কোনো হেলদোল নেই ।তখন ও ঘুমিয়ে যাচ্ছে ,সঙ্গে নাক ডাকছে।
মনোজ বলল "আজকে আর কিছু বলছি না । ঘুমাচ্ছে ঘুমাক।যেদিন আবার তাকে (মনোজকে) বলবে, এই ভিডিওটা দেখাবে। এটাই মনোজের ব্রম্ভাস্ত্র।"
মনোজও সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল।
রেখা আজকে এতটাই ঘুমিয়েছে যে মাসি আসার আগেই ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম থেকে উঠে পরলো। বেশ ঝরঝরে মনে হচ্ছে শরীরটা। চনমনে মন। রেখা সকাল সকাল প্রাতঃক্রিয়া সেরে, ফ্রেশ হয়ে গোপালভোগকে ভোগ চাপিয়ে রান্নাঘরে ঢুকলো।
চায়ের জল গ্যাসের চুলায় বসাতে না বসাতে কলিং বেলের আওয়াজ,"ওম জয় মা লক্ষী মাতা…।"
রেখা তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজাটা খুলল"দেখল মাসি নয় মাসির বৌমা এসেছে। কি ব্যাপার তুমি ?মাসি কোথায়?"
কাজের ব্যাপারে মাসির বৌমার চেয়ে মাসি অনেক বেশি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।
মাসির বৌমা বলল "মায়ের খুব জ্বর কাজে আসতে পারবেনা তাই বলতে আসলাম।"
ওমা তাই বুঝি? কখন থেকে?"
"রাত থেকে।"
"ওষুধ খাওয়াও নি মাসিকে?'

"হ্যাঁ ওষুধের দোকান থেকে বলে নেয়া হয়েছে"।
"ঠিক আছে দেখো। মাসি কেমন থাকে আমাকে খবর দিও।"
"আচ্ছা।"
রেখা দেখল মাসির বৌমার চোখ মুখ শুকিয়ে যায়। সত্যিই তো তাই। গরীবের সংসার নুন আনতে পান্তা ফুরায়। তারমধ্যে স্বামী অকেজো হয়ে পড়ে আছে। শাশুড়িমার রোজগারে সংসার চলছে। বাড়িতে এতগুলো প্রানী।
রেখা মাসির বৌমার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ। তারপর হঠাৎ মনে হল এই যা কিছু টাকা দিয়ে দিলে হতো? যাক চলে যখন গেছে পরের দিন আসলে ,দিয়ে দেবে'। প্রান্তিক খেটে খাওয়া মানুষগুলোর কথা ভাবতে ভাবতে রেখার মনে হলে অনেক কাজ পড়ে আছে।
না যাই গিয়ে কাজে হাত লাগাই।'
এর মধ্যেই মিলি আর  তার বাচ্চাগুলো এসে রেখার চারপাশে ঘুরঘুর করতে লাগল আর ওদের ভাষায় কিছু বলতে লাগলো। রেখা ওদেরকে ধরে একটু আদর করলো তারপর ভাবলো যা প্রতিদিন মাসিকে বলা হয় বিস্কিট দিতে। আজ তো আর মাসি আসবে না।তাই রেখা  বিস্কুট দিলো।
ভাগ্যিস আজকে তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙেছে নইলে যে কি হতো?'
রান্নাঘরে গিয়ে চটপটএকদিকে মিলিদের জন্য খাবার বসাল ,অন্যদিকে নিজেদের, সিমে দিয়ে বাকি কাজগুলো করতে লাগলো।
কাজ শেষে একবার   ঘরে গিয়ে মনোজকে ডাকলো"কিগো আজকে কি ঘুম ভাঙবে না কি ?
মনোজ ঘুমের জড়তা নিয়ে বলল" হ্যাঁ ,উঠব না কেন?"
" উঠছো না কেনো তাহলে ? ওঠো,।
আমার কিন্তু অত সময় নেই ডাকার। চা রেখে গেলাম খেয়ে নিও।"
আজ আবার মাসি আসবে না।'
 মনোজের কানে কথাটা যেতে লাফিয়ে উঠল" হ্যাঁ
সে কি কথা?কি  হয়েছে?'
"মাসীর শরীর খারাপ। জ্বর এসেছে।'
তুমি যদি তাড়াতাড়ি না উঠ, আমি খাবার দাবার গুছিয়ে দিতে পারব না ।আমার নিজের স্কুল আছে।"
"অ্যাই না ,না আমি উঠে পড়ছি।"
"ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি করো।'
এরমধ্যে আবার কলিং বেলের আওয়াজ "ওম জয় মা লক্ষী মাতা…।"
রেখা বলল "দরজাটা খোলো"।
মনোজ সিগারেট ধরিয়ে ছুটল বাথরুমের দিকে।
রেখা বুঝল নির্ঘাত বড় বাথরুম পেয়েছে।
অগত্যা রেখাতেই দরজা খুলতে হলো?
দরজা খুলে রেখা তো অবাক 'একি পার্থ এ সময়? 
এই জানো তো আমার লজ্জার শেষ নেই। সেদিন থেকে তোমার ইলিশ মাছের দাম আর পাটশাকের দাম দেয়া হয়নি।"
পার্থ বলল "সে সব পরে হবে ।আগে বলো তো দাদা কোথায়'?"
"ও তো  বাথরুমে ঢুকলো।"
"ও ও ও"
"কেন কিছু হয়েছে
ভেতরে এসে বসো।'
'হ্যাঁ হয়েছে ,মানে দাদাকে বলা হয়েছিল না ,সেই ডাক্তারের ঠিকানা টা দেওয়ার জন্য।"
বৌদি তো এখন ভেঙে পড়ছে আস্তে আস্তে।'
'কেন ভেঙে পড়ার কি আছে সব ঠিক হয়ে যাবে। 'ভয় পেয়েছে হয়তো কোন কারনে। বাচ্চা তো?
"সব আমরা বুঝতে পারছি বৌদি । কিন্তুযে বাচ্চা এত কথা বলে, এখন আস্তে আস্তে কথা বলছে না।"
"ওমা সেকি গো ?"
"হ্যাঁ,তবে আর বলছি কি?"
এমনিতেই সারা বাড়ি ও মাথায় করে রাখে দেখেছো তো ?আমাদেরকে কাকু কাকু বলে অস্থির করে রাখত আর সেই বাচ্চা যদি এখন কথা না বলে ,কেমন খারাপ লাগে বলো?'
"হ্যাঁ ,সে তো একটা চিন্তার ব্যাপারই বটে।"
"দাদা ,বৌদি তো দুজনারি প্রায় মাথা খারাপের মত অবস্থা।"
'তো ,হবেই না? মা বাবা তো?'
রেখা বললো "একটু ওয়েট করো ।আমি ওকে তাড়া দিই। বলি পার্থ এসেছে ।তবে তাড়াতাড়ি বের হবে।"
পার্থ একটু  ম্লান হাসলো।
রেখে আস্তে আস্তে বাথরুমের দিকে এগোলো তারপর বাথরুমের দরজায় কড়া নেড়ে বলল" কি গো একটু তাড়াতাড়ি করো?'
মনোজ ভেতর থেকে জলের কল টা খুলেছে , তার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তারই মধ্যে বলল কেন আমাকে বাথরুমে ঢুকতে দেখলেই তাড়া দাও কেন?"
"দিচ্ছে কি আর সাধে পার্থ এসেছে চিৎকার করে বলল।"
"কে এসেছে.এ.এ ."মনোজ ভেতর থেকে বলল।
*"পার্থ।"
"ও আচ্ছা, বেরোচ্ছি।”
মনোজ ভেজা টাওয়ালটা জড়িয়ে এসে বলল " কি হয়েছে পার্থ ?"
আরে দাদা ওই ডাক্তারের ফোন নম্বর টা।
"এ বাবা ,আমার তো ফোন করা হয়নি।'
'ঠিক আছে, তুমি বসো ,আমি এক্ষুনি ফোন করছি।"
মনোজ সুরঞ্জনকে ফোন করল। রিং হয়ে গেল ধরল না আবার ফোন করল। এবার রিং হতেই অপরপ্রান্ত থেকে বলল ''হ্যালো"
"এই আমি মনোজ বলছি'।
"হ্যাঁ বল কেমন আছিস সবাই?"
"ভালো আছি ।তোরা!?'
"হ্যাঁ ভালোই আছি।"
"বলছি তোর একটা হেল্প লাগবে?"
"কি বল না?'
বলছি একটা বাচ্চার কাউন্সেলিং করাবে । ভালো ডাক্তারের নাম বলতো আর তার ফোন নম্বর ঠিকানা।"
 ডক্টর রাধাকান্ত দেব। কন্টাক্ট নম্বর########২৩৬৪
"অসংখ্য ধন্যবাদ রে।'
"বাবা, এর জন্য ধন্যবাদ   কবে থেকে এত ফরমালিটি শিখেছিস?'
মনোজ হো , হো,হো করে হেসে উঠলো।
"না রে খুব উপকার হলো"।
"কার জন্য দরকার?'
আরে না ,না আমাদের পাশের বাড়ির পার্থর ভাইপোর জন্য.
"ও ঠিক আছে ।সবাই ভালো 
থাকিস ।ছাড়ছি রে?"
"হ্যাঁ, হ্যাঁ রাখ।"
পার্থকে ফোন নম্বরটা দিয়ে দিল আর বলল' যোগাযোগ করে নিতে তাড়াতাড়ি।'
পার্থ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
ইতিমধ্যে রেখা পার্থর সামনে এক কাপ চা বিস্কিট এনে হাজির করল।
পার্থ এসে বলল 'বৌদি আবার চায়না হাজির করলেন।'
রেখা বলল "তা বললে তো হবে না ।তুমি প্রতিদিনই এড়িয়ে চলে যাচ্ছ।"
"আচ্ছা, দিন।'
মনোজ ঘর থেকে ড্রেস পরতে পরতে বলল' রেখা ,আমার ব্রেকফাস্ট রেডি করো।'
"রেডি করা আছে ।
তাড়াতাড়ি এসো।"
পার্থ বলল'বৌদি আসছি আমি  ।অন্য সময় হলে আরেকটু থাকতাম।'
"ঠিক আছে এসো ভাই আর কি বলব। যাও তাড়াতাড়ি গিয়ে কন্টাক নম্বরে যোগাযোগ করো।'
'বৌদি দরজাটা লাগিয়ে দিন।'
"ঠিক আছে যাচ্ছি।'
"তোমার হল?"রেখা দরজা বন্ধ করতে যেতে গিয়ে তাড়া দিল 
'আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা….।'
ড্রেস পরছে আর মনোজ গান করছে।
'ঠিক আছে ,তোমার গান করা শেষ হলে এসে খেয়ে নিও আমি গিয়ে তৈরি হচ্ছি।'
মানুষ তাড়াতাড়ি রুম থেকে বেরিয়ে টাই বাঁধতে বাঁধতে এসে বলল' এই না,না, না, খাবার দিয়ে যাও।'
"তুমি দেখছো যে আমি নানা রকম কাজে ব্যস্ত থাকি এতকিছু করার পর এবার নিজেকে তো তৈরি হতে হবে বল ,এত বায়না করলে তো হয় না?'"
'আরে বাবা রাগ করছ কেন? তোমার নিজের হাতে যত্ন করে বেড়ে দেওয়া  খাবার না খেলে আমার পেট ভরে না জান না ?"

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস ৯৭




ধারাবাহিক উপন্যাস 


শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৯৭)
শামীমা আহমেদ 



শায়লার বিয়ের উদ্দেশ্যে বিয়ে বাড়িতে আগত আত্মীয়স্বজনেরা ভীষণ  একটা ভ্যাবাচ্যাকা পরিস্থিতিতে পড়ে গেলো। এত রাতে এমন একটা খবরে তারা বুঝে উঠতে পারছে না কি ঘটতে যাচ্ছে! তারা বুঝতে পারছে না আজ দুপুরে কানাডা থেকে নতুন জামাই আসবে না জানালো কিন্তু  আবার কিভাবে সে এতো রাতে চলে এলো! তবে কি আগের খবরটা ভুল ছিল? নাকি ফ্লাইটের কোন ঝামেলা হয়েছিল। মুরুব্বিরা নানান প্রশ্নে বুবলীকে জর্জরিত করতে লাগল। বুবলী ভাবলো এইসকল প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে এখন তার রাত কাবার হয়ে যাবে। এর মাঝে যে কত ক্লাইমেক্স আর টানাপোড়েন গিয়েছে তা শুধু বুবলীই জানে। তবে এখন সে নিজের করণীয় কাজে মনযোগী হলো।  সে একটা দ্বিধার মধ্যে পড়ে গেলো। এখন সে কোনদিকে যাবে ? এদিকে শায়লা আপু শিহাব ভাইয়ার জন্য  নিজেকে আলুথালু বেশে ভাবলেশহীন হয়ে একেবারে আশাহীন হয়ে গিয়েছিল। এখন তার মনে আবার আশার আলো জাগাতে হবে। তাকে নতুন করে বাঁচবার পথে আগ্রহী করে তুলতে হবে।
তাকে হলুদের সাজে সাজাতে হবে। আবার ওদিকে নিচে শিহাব ভাইয়া দাঁড়িয়ে আছেন।এইমাত্র রাহাত তাকে নিয়ে আসতে নেমে গেলো। উপরের চেঁচামেচিতে সে শিহাবকে নিচে রেখেই চলে এসেছিল। বাচ্চাদের পাওনা আদায়ের পর সবাই আনন্দে হৈচৈ করে উপরে উঠে এসেছে। বুবলী শায়লাকে আর একা না রেখে তার মায়ের ঘরে বসিয়ে রেখে গেলো।  শিহাবকে রিসিভ করতে  ঘরের ফুলদানি থেকে একগোছা রজনীগন্ধা নিয়ে দ্রুত  সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই সে দেখতে পেলো শিহাব মেইন গেট পেরিয়ে বাসায় ঢুকেছে। রাহাত শিহাবের বাইকটি বাসার গ্যারাজে রাখছে। বুবলী  সামনাসামনি শিহাবকে দেখে কিছুটাক্ষন থমকে দাঁড়িয়ে রইল। এমন একজন হ্যান্ডসাম মানুষ তার সামনে দাঁড়িয়ে!  বুবলী  তার চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না।জাস্ট সিম্পলি শার্ট প্যান্ট পরা তবুও যেন মনে হচ্ছে একজন স্মার্ট হিরো! শিহাব এগিয়ে আসতেই বুবলী নিজেকে সামলে নিয়ে হাতের একগোছা রজনীগন্ধা শিহাবের হাতে তুলে দিলো। শিহাব ফুলের গোছা গ্রহণ করে
বুবলীকে ধন্যবাদ জানালো। বুবলী যেন কন্ঠস্বর শুনে আরো ফিদা হয়ে গেলো।তার মনে শায়লা আপুকে একটু একটু হিংসা হতে লাগল। সে ভাবতে লাগলো, ইস! কী দারুণ একজন হাজবেন্ড পেতে যাচ্ছে শায়লা আপু! সাথে সাথে বুবলীর নোমান সাহেবের কথা মনে হলো।তার মনে বেশ রাগ হতে লাগলো রাহাতের জন্য।কেন অমন একজন বয়সী মানুষের সাথে শায়লা আপুকে বিয়ে দেয়া হয়েছিল ! যাক, এবার তো সব ঝামেলা মিটেছে। বুবলী শিহাবকে উপরে যাওয়ার জন্য বললো। শিহাব চোখে সম্মতি জানালো। রাহাত বুবলীকে,আমার কাজিন, বলে  শিহাবের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো।  এবার সামনে বুবলী  আর পিছনে রাহাত যেন গার্ড অফ অনার দিয়ে শিহাবকে উপরে নিয়ে যাচ্ছে।দোতলায় উঠতেই দরজার সামনে অতিথিদের ভীড়। নতুন জামাইকে এক নজর দেখার জন্য চাচী খালা মামীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।  তাদের চোখে মুখে বিস্ময়!  অনেকেরই কোথায় যেন একটা খটকা লাগছে। আগে তারা কানাডার জামাইকে যেমন দেখেছে এবার যেন তার চেয়ে বয়স অনেক কমে গেছে ? তাদের  বিস্মিত চোখ ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে যেন! দিন দিন মানুষের বয়স কি বাড়ে না কমে ? এ আবার অন্য কেউ আসেনিতো ? অতিথিদের এমন আচরণে, এমন ঘোলাটে  পরিস্থিতিতে শিহাব ভীষণ লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করেই উপরে উঠে এলো। বুবলী সবাইকে আশ্বস্ত করতে লাগলো,এটাই শায়লা আপুর আসল হাজবেন্ড। তার নাম মিস্টার শিহাব। রাস্তায় জ্যামের কারণে, আমাদের বাসায় পৌঁছুতে একটু রাত হয়ে গেছে। বলেই বুবলী চট করে শিহাবের হাত ধরে অতিদ্রুত অতিথিদের কবল থেকে রক্ষা করতে শিহাবকে এক টানে ড্রইংরুমে নিয়ে বসালো।রাহাত তাকে অনুসরণ করে ভেতরে গিয়ে শিহাবের পাশে বসলো।বুবলীর কথায় স্বজনেরা খুব একটা সহজ হলো না। তাদের মনে চোখে মুখে একটা কিন্তু রয়েই গেলো। 
বুবলী সবাইকে জানালো, একটু পরে শায়লা আপু আর শিহাব ভাইয়ার গায়ে হলুদ হবে। সবাই তৈরি হয়ে নাও।শায়লা আপুর হলুদের জন্য যে যেমন পোশাক এনেছিলে পরে নাও আর ছাদে গিয়ে  তোমাদের গান নাচ প্র‍্যাকটিস করে নাও আর মুরুব্বিরা আপনারাও তৈরি হয়ে নেন।আপুকে হলুদ ছোঁয়াতে হবে। এ কথায় সবার মাঝে আনন্দের ঢেউ বয়ে গেলো! ভীষণ এক চটপটে মেয়ে বুবলী। যেমন তার বুদ্ধিমত্তা তেমনি সে করিৎকর্মা!  এক সাথে সবদিক সামাল দেয়ার অনন্য এক দক্ষতা তার। একই সাথে সে সবদিক ম্যানেজ করে চলছে। এবার এক দৌড়ে সে কিচেনে ঢুকে গেলো।চট করে দুই কাপ চা বানিয়ে ট্রে সাজিয়ে  নিয়ে ড্রইংরুমে নিয়ে  এলো। রাহাত তখনো শিহাব ভাইয়ার হাত ধরে বসে আছে।যেন নীরবে এখনো সে শিহাবের কাছে ক্ষমা চাইছে। শিহাব লজ্জাবনত হয়ে মাথা নিচু করেই বসে আছে। বুবলী দুজনকে সহজ করতে চায়ের ট্রে নিয়ে হাজির হলো।দুজনার হাতে চায়ের কাপ এগিয়ে দিতে চাইলে শিহাব আগে পানি খেতে চাইলো। বুবলী ফিক করে হেসে দিলো ! কি ? টেনশনে কি গলা শুকিয়ে গেছে ? গলা ভিজিয়ে নিতে হবে ? বুবলীর দুষ্টুমিতে শিহাবের মুখে লজ্জায় লাল আভা ফুটে উঠছে! বুবলী  শিহাবকে আর ঘাটালো না।তাকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিতেই শিহাব প্রায় এক নিঃশ্বাসে গ্লাসের পানিটা শেষ করলো।সবকিছু দেখে রাহাত ভাবলো, আহা,বেচারা,আপুকে পাওয়ার জন্য কতইনা ঝামেলা পোহালো। সে শিহাবকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিলো। তবে শিহাবের টেনশন দূর করতে  এখন একটা বেনসন স্টিকের অভাব ফিল করছে। একটা দুটো টান দিলে মাথাটা হালকা হতো।কিন্তু এ অবস্থায়  তা একেবারেই সম্ভব না।খুবই অনিচ্ছায় সে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চায়ের কাপে ঠোঁট ছোঁয়ালো।  বুবলী ইতিমধ্যে শায়লার কাছে গিয়ে হাজির ! সেখানে এক নদী ভাবাবেগে যেন কান্নার সাগর বইছে।শায়লার মা,মানে বুবলীর ফুপু মেয়ের এই অকস্মাৎ জীবনের মোড় ঘুরে যাওয়াতে অতি উচ্ছ্বাসে হত বিহ্বল হয়ে পড়েছেন।বিয়ে নিয়ে মেয়ের জীবনের উত্থান পতনে তিনি যেন আর কোন সমাধান খুঁজে পাচ্ছিলেন না। কেবলমাত্র সৃষ্টিকর্তার কাছেই তিনি এই বিপদ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজেছিলেন।বিধাতাও সদয় হয়ে যেন তার কথা শুনেছেন।তাইতো আজ শিহাবের মত এমন  রাজপুত্রের মত ছেলে তার মেয়ের জীবনসঙ্গী হবে। শায়লাও যেন তার আবেগ ধরে রাখতে পারছে না।একদিকে শিহাবের আগমনে সে আনন্দে দিশাহারা অন্যদিকে আবার শিহাবকে হারানোর ভয় ! বুবলী নানান কথায় মা মেয়ের এই যুগলবন্দী কান্না থামালো। বুবলী বললো, আপু,শিহাব ভাইয়া তোমাকে নিয়ে যাবার জন্য এসেছেন।ঐতো,ড্রইংরুমে বসে আছেন।তোমাকে এখুনি হলুদের সাজে তৈরি হতে হবে। বুবলীর এঘর ওঘর দৌড়াদৌড়ি বেড়ে গেলো। মায়ের ঘরের দরজা লাগিয়ে
সে খুব দ্রুতই  শায়লাকে ফুলের গহনা আর শাড়ি পরিয়ে দিলো। শায়লা একেবারে  নিশ্চুপ হয়ে রইল।তার ভেতরে অপার এক আনন্দ কিন্তু সারাদিনের উৎকন্ঠার মিশেলে কেমন যেন মিশ্র অনুভব ! শায়লাকে ফুলের গহনা আর হলুদ শাড়িতে যেন অপরূপা লাগছিল।
আজ সকালের পার্লারের সেই ফ্রেশনেশটাতে শায়লার  সৌন্দর্য যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। শায়লার মা অবিরল ধারায় কেঁদেই যাচ্ছেন। এযে আনন্দাশ্রু তা বুঝতে বুবলীর আর বাকী রইল না। এবার বুবলী ছুটলো ড্রইংরুমের দিকে। শিহাব ভাইয়াকেও  একটু তৈরি করতে হবে। কিন্তু এখন কেমন করে তা সম্ভব।তার জন্যতো কিছুই কেনাকাটা হয়নি। শিহাবের দিকে চোখ পড়তেই বুবলী যারপরনাই মুগ্ধতায় ডুবে গেলো! সেতো খেয়ালই করেনি সিম্পল একটা নেভিব্লু চেক শার্টে এত রাতেও শিহাব যেন সাদা খইয়ের মত ফুটে আছে! এই রুমে আসার উদ্দেশ্যই সে ভুলে গিয়েছে যেন! রাহাত যেন তাকে চেতনায় আনলো, কি হলো বুবলী ? আপুকে রেডী করেছো ? তাহলে চলো ছাদে হলুদের স্টেজে আপুকে নিয়ে যাও আমি শিহাব ভাইয়াকে নিয়ে আসছি। বুবলী যেন চেতনায় এলো! সে বলে উঠলো কিন্তু শিহাব ভাইয়াকেতো নতুন কিছু পরাতে হবে। রাহাত বুঝতে পারছে না কি করবে। বুবলী দুরদর্শিতার কাছে রাহাত যেন বারবার পরাজিত হচ্ছে।বুবলী রাহাতকে টেনে শায়লার ঘরে নিয়ে এলো। বিয়ের এত্ত এত্ত শপিংগুলো কি এমনিই থাকবে ? এক্ষুনি এখান থেকে সিল্কের ঘি রঙা পাঞ্জাবীটা শিহাব ভাইয়াকে পরিয়ে দাও আর হলুদের সবকিছু ছাদে পাঠিয়ে দাও।রাহাত ছোঁ মেরে পাঞ্জাবিটা নিয়ে গেলো আর শিহাবকে তা পরার জন্য অনুরোধ করতেই শিহাব তা পরে নিলো। শিহাব ভাবলো, এমনিতেই এই পরিবারটি আজ সারাদিন নানান দুশ্চিন্তার মাঝ দিয়ে গেছে। যার জন্য সেও অনেকটা দায়ী। এখন যদি তার সবকিছুতে একটু সম্মতি আর সহযোগিতা  ওদের আনন্দ দেয় শিহাব তা সানন্দেই গ্রহন করবে। রাহাত  ড্রইংরুম থেকে বেরিয়ে এলো।শিহাব পাঞ্জাবিটা পরে নিলো।
তাকে ভীষণ অবাক করে দিয়ে পাঞ্জাবিটা চমৎকারভাবে তার গায়ে ফিট হয়ে গেলো! রাহাত ভেতরে ঢুকেই আশ্চর্য হয়ে গেলো। পাঞ্জাবিটা সে নিজে কিনেছে কিন্তু তখন ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি এটা শিহাবের জন্যই যেন বানানো হয়েছে! আর ঘি রংএ শিহাব ভাইয়াকেতো খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। বুবলী  ওদের দরজায় নক করে জানান দিলো যে আমরা তৈরি, তোমরা তৈরি তো ? এত রাতেও শিশুদের চোখে মুখে আনন্দের ঝিলিক বয়ে যাচ্ছে।সবাই যার যার মত তৈরি  হয়ে নিয়েছে। মুরুব্বিরাও কম যায় না! তাদের সাজগোযে সবারই বয়স অর্ধেক কমে গেছে ! আর এই পরিবর্তিত রূপে কেউ যেন কাউকে চিনতে পারছে না। সবাই সবাইকে দেখে অবাক  হচ্ছে আর সারা বাড়িতে হাসির বন্যা বয়ে যাচ্ছে। কিশোরী মেয়েদের মেকাপ বক্সের আজ অর্ধেকটাই যেন খালি হয়ে গেছে। কিশোর ছেলেগুলো ওদের পিছনে লেগেই আছে। নানান টিপ্পনীতে ওদের অতীষ্ঠ করে তুলছে। কিছুতেই ওদের পিছু ছাড়ছে না। এই মাঝ রাতে সারা বাড়িতে বিয়েবাড়ির আমেজ ফুটে উঠেছে ! সারাদিনের প্রচন্ড খরার পরে যেন মধ্যরাতে মুষলধারায় বৃষ্টি নেমেছে আর সেই প্লাবনে সারা বাড়িতে আনন্দের জোয়ার  বয়ে যাচ্ছে ! হতাশাগ্রস্ত অতিথিরা যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে।সবাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে ছাদের দিকে চলছে। বুবলী এবার শায়লাকে তার মায়ের ঘরের দরজায় আনতেই রাহাত শিহাবকে ড্রইংরুমের দরজায় এনে দাঁড় করালো। মূহুর্তেই খুবই আশ্চর্যজনক ব্যাপার  ঘটে গেলো।  দুজনেই মুখোমুখি ঘরের, মুখোমুখি দরজায় দাঁড়িয়ে। যা এক অবিশ্বাস্য ঘটনা ! দুজনেই দুজনকে দেখে চমকে গেলো ! দুজনার চোখে রাজ্যের ভালোলাগা,ভালোবাসা, অভিমান প্রশ্ন জিজ্ঞাস্য অবশেষে এতটা কাছে আসার আনন্দে যেন বাকহীন হয়ে পড়েছে। রাহাত আর বুবলী  দুজনে যেন এই চার চোখের মহামিলনের সাক্ষী হয়ে রইল।শিহাব শায়লার  হলুদ শাড়িতে আর ফুলের সাজে দেখে মুগ্ধতায় আছন্ন হয়ে গেলো। সে থমকে দাঁড়িয়ে রইল। শায়লা ও অবাক দৃষ্টিতে শিহাবকে দেখছে। সে আজ পর্যন্ত শিহাবকে পাঞ্জাবিতে দেখেনি।ঘি রঙা পাঞ্জাবিতে শিহাবকে খুঁজে  পাওয়াই ভার! কেমন করে এমন হলো ? শায়লার চোখে বিস্ময় মিশ্রিত প্রশ্ন ! কেমন করে এই পোশাক তারই হলো ! রাহাত আর বুবলী  অপলক দৃষ্টিতে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎই  সেই গেট ধরার দলনেতা কিশোরীটির আগমনে ওদের ধ্যান ভাঙলো।  
কি হলো তোমরা কখন উপরে আসবে ? আমরা তোমাদের নাচ গান দেখাবো।বলেই মেয়েটি শিহাবের হাত ধরে টানতে লাগলো। এবার রাহাত আর বুবলী  ওদের নিয়ে গুটি গুটি পায়ে ছাদের সিঁড়ির দিকে আগালো। শায়লা  আর শিহাব এখন এক সুতা পরিমাণের ব্যবধানে দাঁড়িয়ে। দুজন যেন দুজনার স্পর্শ  পাচ্ছে,দুজন যেন দুজনার ঘ্রাণ শুষে  নিচ্ছে। শিহাবের  সংস্পর্শে শায়লার ভেতরে যেন গরম জলের নহর বয়ে গেলো আর শিহাবের ভেতরে যেন ভুমিধ্বসে বিরাট এক গহবর তৈরি হলো! দুজনের মনে একই ভাবনা, আজ থেকেই কি তবে আমরা দুজন দুজনে খুব নিবিড় করে পাবো!এতদিনের কষ্টের কি আজ অবসান হবে? পিছনে রাহাত আর বুবলী দাঁড়িয়ে। ওদেরও ইচ্ছে করছে ঠিক এই সময়টা অনন্তকাল ধরে চলুক।দুজনার ভেতরের নির্বাক কথা চলুক আজীবন। অথচ পরক্ষণেই এই নীরবতা কে খানখান করে ভেঙে দিয়ে  শিহাবের মোবাইল বেজে উঠলো ! এত রাতে কার ফোন ? শিহাবের মন অজানা আশংকায় কেঁপে উঠলো! আরাফ বা মায়ের কিছু হয়নি তো ! সে  মোবাইলে তাকাতেই দেখতে পেলো,  বন্ধু  রোমেলের কল! এত রাতে রোমেল। কেন কল করলো ? শিহাব কল রিসিভ করতেই,রোমেলের উত্তেজিত  কন্ঠস্বর! শিহাব, আমার কাজিন, তোমার সন্তানের মা  রিশতিনা একটু আগে  লন্ডনে  ওর বাসায় অনেক ঘুমের ওষুধ খেয়ে সুইসাইড  করেছে। তোমার প্রতি অভিমানে সে এই কাজ করেছে। যদি ওর কিছু একটা হয়ে যায় তবে এর জন্য তুমিই দায়ী থাকবে। আমি তোমাকে  ছাড়বো না।পুলিশকে  সব জানাবো। বলেই শিহাবের কোন উত্তর না শুনেই সে খট করে কলটা কেটে দিলো। ওপ্রান্তে কি খবর এলো! রাহাত আর  বুবলী যেন থমকে গেলো। শিহাব স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে  রইল। শায়লা শিহাবের মুখের অভিব্যক্তি দেখে তার কাছে খুব ঘনিষ্ঠ  হয়ে শক্ত করে তার হাতটা  ধরে চোখের ভাষায়  কিছু একটা সান্ত্বনা দিতে চাইলো।


চলবে....

Kjh

LOVE

কবি শরিফুর রহমান এর কবিতা "জীবন - তরী"





জীবন-তরী 
শরিফুর রহমান


এ জীবন-তরী কত করেছে আপন
ভালোবাসা কত প্রেম উছল-যৌবন, 
একে একে শুষে নিলো উতল-মৌবন
বেলা শেষে ধোঁয়াশায় বিরহ যাপন।

নিয়তির ছেঁড়া পালে নাবিক আশায়
জীবনের তরীখানি সাগরে ভাসায়,
বিষাদের বায়ু তেড়ে অকুলে শাসায় 
তবু দূরে আশা-দ্বীপ তরীকে হাসায়।

বড় বড় ঢেউগুলো ভেঙে পরে বুকে
শত ঘায়ে তরী তবু ঢেউ দেয় রুখে,
ধীরে ধীরে পঁচে কাঠ; ফুটো গলে ঢুকে
জলে ভরে তরী; তবু চলে হাসি মুখে।

গোধূলির পানে সাঁঝ দু-হাত বাড়ায়,
তরীখানি ভেসে ভেসে অকূলে হারায়।

কবি নাছিমা মিশু এর কবিতা "কদমে কদমে"





কদমে কদম 
নাছিমা মিশু


কদমে কদম মিলিয়ে চল না
এই আমার সাথে 
থমকে কেন দাঁড়িয়ে গেলে 
পাতা ঝরা খোলা প্রান্তরে
কন্ঠ মিলাও না
এই আমার সাথে 
বলতে পারি দুরন্ত কোনো হাওয়া ভাসিয়ে নিবে না
তোমার কন্ঠ রোধে
হাতে রেখে হাত চল না বরফ জড়ানো পথে 
এই আমার সাথে 
জমে পাথর হবে না 
শৈল চূড়া রশ্মি ছোঁয়ায় তুমি সরব রবে
কথাদের দিয়ে দাও ছুটি 
আবেশ অনুভবে খানিকটা হৃদয় ছুঁয়ে দাও না
গহীন অতলান্ত গহীন বাঁকে 
তোমায় খুঁজে পাবে 
যতটা এগুনো ততটা পিছন ফিরো না
অসম বেসুরো এক রেখা অস্পষ্ট মুছা মুছা 
নয়ন গোচর হবে 
আমার অস্পৃশ্য সুধা, তোমার অস্পষ্টতা 
তোমায়  আনন্দ কুঞ্জ সুধা আহরিত ঝিরিঝিরি আবেশী করে তুলবে 
তোমাতে দুঃসাহসী মুগ্ধ হওয়া 
এ যেন চলতি পথের দমকা হাওয়া
এই আমারি তিয়াসী বাসনায় ঠোকাঠুকি করত
ভেসে ভেসে যাওয়া 
আরশি ধর না
এই আমার আড়াল হয়ে 
গহীন গভীর হৃদ ছায়ায় দেখতে পাবে 
যেথায় ছিলে সেথায় আছো
মধ্য কিছু সময় গেলো 
এমনি কিছু অজয়া সময় কখনো কখনো থমকে দাঁড়ায়
ধরিত্রী তারে আপন করে তুলে নেয় আপন গহ্বরে
অভিযোগ অভিমান বিহীন বিশুদ্ধতায় তোমায় নির্দোষ রাজা সাজিয়ে।

২২ এপ্রিল ২০২২

মমতা রায় চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৫৯





উপন্যাস 


টানাপোড়েন ১৫৯
দিবসও রজনী আমি যেন কার..
মমতা রায় চৌধুরী
৪.৩.২২. সন্ধ্যে ৭.৩৯


আচ্ছা জ্বালাতনে পড়ল রেখা।' ভদ্রলোক এতো প্রশ্ন করছেন কেন? '
"ম্যাডাম বলুন না?"
"একটু-আধটু লেখালিখি করি।"
"Wow ,অসাধারণ ,কনগ্রাচুলেশন্স।"
ভদ্রলোক হাতটা বাড়িয়ে দিল হ্যান্ডসেক করবেন বলে।
রেখা দুই হাত জোড় করে নমস্কার জানালো।
"কোন পত্রিকায় বেরিয়েছে ম্যাডাম একটু বলুন না?"
"বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় পত্রিকায় ।কোনটা বলব বলুন?'
"ভদ্রলোক বললেন আপনার কন্টাক্ট নাম্বারটা দিতে বললাম দেবেন না?"
"কি করবেন আপনি কন্টাক্ট নম্বর নিয়ে ।
যদি লেখা পড়তে চান তাহলে তো পত্রিকাগুলো ঘাটলেই পেয়ে যাবেন।"
"না ফোন নম্বরটা থাকলে অন্তত বলতে পারব সবাইকে যে এরকম একজন বিখ্যাত লেখিকার কন্টাক্ট নম্বর আমার কাছে আছে। নিজেকে খুব প্রাউড ফিল করব।'
রেখা আর কি করবে  "বাধ্য হয়ে কন্টাক্ট নম্বর টা দিলো।
ভদ্রলোক বললেন অসংখ্য ধন্যবাদ।"
দেখতে দেখতেই ট্রেন পালপাড়া ক্রস করলো।
এরমধ্যে  রেখার ফোন বেজে উঠলো।
রেখা একটু জানলা দিয়ে অন্যমনস্ক ভাবে তাকিয়ে ছিল। তখন ভদ্রলোক রেখাকে বললেন  "আপনার ফোন বাজছে।'
রেখার যে ফোন বাজার আওয়াজ কানে আসে নি তা নয় ,কেন যেন ফোনটা বার করলো না। এখনও যেহেতু বেজেই যাচ্ছে ,তাই বাধ্য হয়ে  ফোনটা বার করলো।
ভদ্রলোক তখনও বলে যাচ্ছেন 'বোধহয় আপনার বাড়ি থেকে ফোন এসেছে না?'
রেখা মনে মনে ভাবলো যে এরকম অকারণ কৌতুহল মোটেই পছন্দ নয় কিন্তু কিছু করার নেই ফোনটা বের করে দেখছে বড়দি ফোন করেছে।
"হ্যালো দিদি।"
"তুমি এখনো বাড়ি পৌঁছাও নি?"
"না দিদি।"
"বেশ অনেকটা রাত হয়ে গেল না।"
"তা তো হবেই।"
"তাহলে ওয়ার্কশপ কদিনের?"
"আজকেই শেষ দিদি।"
"কি বলছ? "বড়দি অবাক হয়ে বললেন।
"হ্যাঁ আজকের ওয়ার্কশপ আজকেই শেষ হলো আর এরপরেও আরো অন্য কিছু হলে, সেটা ওনারা জানিয়ে দেবেন।'
বড়দি বললেন "তাই বল?'
রেখা বলল"আমি আপনাকে ফোন করতাম বেরিয়ে কিন্তু দিদি এমনিতেই মানে ট্রেন পেতে খুব অসুবিধা হচ্ছিল এমন টাইমে ছেড়েছেন যার জন্য এসে ট্রেনে বসেছি তার পরে ভাবলাম থাক বাড়িতে পৌঁছে ফোন করবো।"
"ঠিক আছে। সেজন্য নয়। আমিও ফোন করলাম যে দেখি কালকের প্রোগ্রামগুলো কিরকম আছে না আছে জানার জন্য।'
*ঠিক আছে রেখা, কালকে যদি সেরকম হয় তুমি পরের ট্রেনটা তে এসো ।আজকে তো ফিরছ লেট করে।"
রেখা হেসে বলল" থ্যাংক ইউ দিদি।"এ জন্য "আপনাকে এত ভালোবাসি।'
"না ,না তোমাদের সুবিধা-অসুবিধা তো দেখতেই হবে বলো ?এই দেখো অনিন্দিতা যেতে পারল না অথচ ওর কথা ছিল তোমাকে বললাম তুমি রাজি হয়ে গেল তা তোমার এইটুকু সুবিধা করবো না?'
"ঠিক আছে ,তুমি সাবধানে ফিরো। রাখছি তাহলে?"
ফোন রাখতে না রাখতেই ভদ্রলোক বললেন "আপনার স্কুলের বড় দি ফোন করেছিলেন?'
"হ্যাঁ, মাথা নাড়িয়ে রেখা বলল।
"যেটুকু কথাবার্তায় বুঝলাম আপনার বড়দি তো বেশ ভালো।"
"হ্যাঁ তা ভালো।
এই কথা বলতে বলতেই কল্যাণী স্টেশন এসে গেল। রেখা ব্যাগপত্র নিয়ে উঠে দাঁড়ালো।
ভদ্রলোক বললেন' "আপনি কল্যাণীতে থাকেন?'
রেখা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো।
ভদ্রলোক বললেন" নাইস টু মিট ইউ।
"খুব ভালো লাগলো।"
"আশা করি আবার দেখা হবে আপনার সাথে।"
রেখা বলল পৃথিবীটা অভিগত গোলক নিশ্চয়ই কোনোদিন কোথাও না কোথাও দেখা হবে। ভালো থাকবেন।"
ভদ্রলোক হা করে রেখার কথা শুনল আর বলল "হ্যাঁ আপনিও ভালো থাকবেন।'
রেখা আস্তে আস্তে সামনে এগিয়ে যেতে লাগলো ভদ্রলোক  উঠে রেখার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। এক সময় ট্রেন স্টেশনে থামলো।
ভদ্রলোক রেখাকে হাত নেড়ে বিদায় জানালো। রেখা ভদ্রতাবশত নিজেও হাত নেড়ে বিদায় জানালো।
তারপর দ্রুতবেগে হেঁটে অটো স্ট্যান্ডে আসল। 
চেনা  অটোওয়ালা নিজে থেকে ডাকলো" দিদি, ও দিদি আসুন, আসুন।"
রেখার  নিজেকে খুব টায়ার্ড মনে হচ্ছিল।
বলল" হ্যাঁ ,চলো।'
অটো ওয়ালা বলল 'আজকে আপনার লেট হল।
একটু কাজ ছিল?"
"তাই বলি যে টাইমে ফেরেন কিছুক্ষণ আপনার জন্য ওয়েট করছিলাম দেখতে  না পেয়ে চলে গেলাম।'
এরমধ্যে অটোওয়ালা হাঁকতে লাগলো  "বুদ্ধপার্ক কল্যাণী বি ব্লক' বাঘের মোর, আসুন ,আসুন ।কে যাবেন?"
রেখা অটোতে বসেই চোখটা যেন বুজে আসছিল।
কখন যে অটোতে ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতেই 
পারেনি ।যখন অটো রেখার বাড়ির কাছে এসেছে তখন অটোওয়ালা বলল' ও দিদি এসে গেছেন নামুন'।
রেখার বুকটা কেঁপে উঠলো তারপর বলল" হ্যাঁ এইতো নামছি।" ব্যাগ থেকে হাতরে পার্স বের করে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে , গেটটার কাছে 
আসলো । ঠিক তখনই মিলি আর মিলির বাচ্চারা জোরে চিৎকার করে উঠলো আর বাচ্চাগুলো কাছে এসে আদর করতে লাগল।
রেখা কিছুক্ষণ ওদেরকে আদর করলো আর বলল "অনেকক্ষণ তোদের দেখিনি তোরাও আমাকে দেখিস নি  বল ?খাবার খেয়েছিস তো?
আদর খেয়ে ওরা একটু শান্ত হল।
রেখা কলিং বেল বাজালো কিন্তু কেউ দরজা খুললো না । ভাল করে দেখল বাইরে থেকেই লক করা। রেখার কাছে একটা ডুপ্লিকেট চাবি ছিল সেই চাবিটা দিয়ে লক খুলল। তারপর ঢুকলো।
"কি ব্যাপার মনোজ কি ফেরেনি ব্যাগটা রাখতে রাখতে ড্রইংরুমে রেখা নানা কথা ভাবতে 
লাগলো ।তারপর দেখল না ,না মনোজের জিনিসপত্র রয়েছে ।তো ফিরে গেছে। তাহলে আবার কোথায় গেল?"
রেখা এবার ফোন করলো
"হ্যালো"
হ্যাঁ তুমি কোথায়?
"আমি এইতো পার্থদের বাড়ি।"
"ওখানে কি করছ?"
আরে সবাই তো স্কুলে যেতে ভয় পাচ্ছে । ওকে নিয়ে একটু সমস্যা হচ্ছে। তাই পার্থ ডেকেছে।'
"ও আচ্ছা আচ্ছা।"
"ফিরলে?"
" হ্যাঁ এইতো ফিরলাম।
"ঠিক আছে তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও।"
রেখা বলল 'ঠিক আছে।"
রেখা ফ্রেশ হতে গেল। বাথরুমের সাওয়ারটা খুলে দিয়ে  মাথার সামনে ভিজিয়ে সারা গায়ে ভাল করে স্নান করে নিচ্ছে। আর বেশ গান গাইছে "দিবস রজনী আমি যেন কার, আশায় আশায় থাকি।…. চঞ্চল হয়ে ঘুরিয়ে বেড়াই, সদা মনে হয়
যদি দেখা পাই..।'
বাথরুমের শাওয়ারের কলটা এতটাই স্পিডে চলছে ,আর আপন-মনে গান গেয়েই যাচ্ছে ওদিকে মনোজ ডুপলিকেট চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে এসে বাথরুমের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রেখার গান শুনে যাচ্ছে মুগ্ধ হয়ে ।একসময় রেখার গান থামলো শাওয়ার কল টা বন্ধ করলো রেখা বলছে "বাপরে বাপ এই ক'দিনের মধ্যে এত গরম পড়ে গেল বলতে বলতে  টাওয়াল গায়ে দিয়ে বের হতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই ভুত দেখার মত চমকে উঠলো।
"একি তুমি এখানে দাঁড়িয়ে কি করছো?'
'তোমার গান শুনছিলাম কতদিন পর বাথরুমে তুমি গান করলে।"
"বাববা যেন গান কখনো শোন নি ।বাথরুমের কাছে এসেই তোমাকে কান পেতে  গান শুনতে হচ্ছে ।'
"বলতে পারো সেরকমই।'
 "নাও হয়েছে ,হয়েছে ,চলো।"
রেখা ঘরে ঢুকে নাইটিটা পরে নিল। তারপর বলল "কি হয়েছে গো সোনাইয়ের।'
" আর ব'লো না সেই হারটা চুরি হয়ে যাবার পর থেকে  ওকে তো স্কুলে পাঠানো যাচ্ছে না।"
"  সে কি এখনো কি স্কুলে যায়নি? সেতো প্রথম প্রথম শুনেছিলাম যে স্কুলে যেতে চাইছে না ।'
"না গো ভেতরে একটা ভীতি কাজ করছে। যে ছেলে এত চনমনে এত কথা বলে ।না এখন আস্তে আস্তে একটু কমিয়ে দিয়েছে ।রেখা অবাক হয়ে বলল" কি বলছো তুমি?'
" হ্যাঁ আমি ঠিকই বলছি ।তাহলে তোকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। আর ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।'
" আমিও সেরকমই বলে আসলাম জানো ।"
এ বাবা এ তো ভারি চিন্তার ব্যাপার হলো' হ্যাঁ ওর মা-বাবা ও এখন খুব চিন্তিত আছে।"
তাই আমাকে ডেকেছিল কোন ডাক্তারের কাছে যাবে ?তা আমি বললাম একবার কাউন্সিলিং করানোর দরকার তা কোন ডাক্তারের কথা বললে আমি একবার সুরোকে ফোন করেছিলাম সুরো কে  ।তখন ফোন ধরতে পারেনি ।পরে রিং ব্যাক করেছিল ।'ও বলল খোঁজ নিয়ে ও 
জানাচ্ছে ।তারপর পুরো ডিটেলস এর ঠিকানা নিয়ে পার্থ দেরকে জানিয়ে দিতে হবে। যত তাড়াতাড়ি পারা যায় বাচ্চাটিকে সেখানে নিয়ে যেতে হবে  '
"একদমই তাই।'
" বাচ্চাদের দেখো কত রকম সমস্যা না?'
'আমাদের স্কুলের বড়দি ফোনে বলছিলেন অনিন্দিতার বাচ্চাটার সমস্যা ও কথা বলে না। সে তো এখন ওকে নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। স্কুল থেকে ওকে তাড়িয়ে দেবে বলেছে ।'
"এ বাবা কি বলছো তুমি?
" হ্যাঁ গো অনিন্দিতা তো এতদিন শুধু বাচ্চার খাওয়া-দাওয়া এসবের দিকে নজর দিয়েছে বাচ্চার কথা বলার দিকে কোনো নজরই ছিলনা" এখন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। দেখি ও বোধহয় কালকে স্কুলে গেলেই বুঝতে পারবো। আজকে বড়দি ফোন করেছিলেন কিন্তু আমি  ট্রেনে ছিলাম তো অপরদিকে আর ঘাঁটালাম না।"
"কি অবাক কান্ড দেখো?'
"ওদিকে তোমার নাতি নাতনীদের কান্ড শুনেছো?'
"ওরা আবার কী করল ওরা তো আমাদের ভাল বেবি।"
"সে তো ভালো বেবি বটেই। তাহলে আবার কি করেছ ওরা,?'
আজকে একটা মরা পাখি সেটাকে মুখে করে নিয়ে চলে এসেছে  গ্যারেজ রুমে। সেখানে এনে রেখে দিয়েছে আর কি দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। আমি তো গেটে পা দিয়েই সেই গন্ধ শুঁকে শুঁকে সেখানে গেলাম।
' যেন কত ভাল গন্ধ'!
তুমি গন্ধ শুঁকে শুঁকে ওখানে গেলে 
না গো ?তাছাড়া কি করব? 
"বাজে বন্ধ হোক যাই হোক গন্ধ শুঁকেই তোমাকে সেই জায়গা ঠিক করতে হলো।  তারপর সেটা ফেললাম জানো?"
"তা বেশ করেছো।'
রেখা একটু হাই তুলল।
বলল" রাত্রে কি খাবে?'
মনোজ বললো" যা খাওয়াবে ।'
"আমার না রান্না করতে ভালো লাগছে না ।খুব টায়ার্ড লাগছে।"
মনোজ বলল" ঠিক আছে ওট স খেয়ে নেব ।"
"আমি একটু 5 মিনিট গড়িয়ে নিই বুঝলে?"
ভালো হয় রবীন্দ্র সংগীতে।
 চালিয়ে দাও তো? আমার ঘুম গুরুদেবের গানেই ভাল হয় এবং একটু রিলাক্স হয়।"
"ঠিক আছে চালিয়ে দিচ্ছি ।তুমি কি গান 
শুনবে ?
"দাও না। রবি ঠাকুরের গান কোনটা 
 খারাপ লাগে নাকি?"
"দিবসও রজনী আমি যেন কার আশায় আশায় থাকি..
চঞ্চল হয়ে ঘুরিয়ে বেড়াই , সদা মনে হয় যদি দেখা পাই….।"

কবি বিশ্বজিৎ মণ্ডল এর কবিতা "গোপন তরবারি"





গোপন তরবারি
বিশ্বজিৎ মণ্ডল

অদূরে পড়ে আছে বিষাদ মাখা ছুরি
হত্যা আঁকতে গিয়ে বার বার থেমে গেছে
অপ্রতুল বজ্রপাতে______

পড়ে আসা বিকেলে কনে দেখা আলোয়
মিশে যাওয়ার কথা ছিল যাচিত রক্তপাতে
অথচ ঘূর্ণির মত অনাহুত পোস্টকার্ডটা এসে
বলে গেল____ন হন্যতে..... 

ওখানেই যত বিপত্তি______
ছুরি ছেড়ে উড়ে গেলে হননের পিপাসা
থুবড়ে পড়ে থাকে,গোপন তরবারি...

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৯৬




ধারাবাহিক উপন্যাস 

শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৯৬)
শামীমা আহমেদ 



রাতের বেলা বন্ধ ঘরে ফুলের সুবাস আর মখমলী চাদরের কোমলতায় বিছানার কিনারায় শায়লা  নিজের অজান্তেই গভীর ঘুমে ডুবে আছে। বাইরের হাঁকডাক তার মাঝে কোন প্রভাব ফেলছে না। শিহাবকে পাওয়া না পাওয়ার উৎকন্ঠায় ক্রমশ তার মন একটু একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। কল্পনায় শিহাবের স্পর্শ পাওয়ার প্রবল এক আকুতিভরা নিবেদনে নিজেকে বিলীন করা, আবেশের ঘোরলাগা এক মাদকতায়, কখন যেন  নিজের অজান্তেই গভীর ঘুমে সে অচেতন হয়ে আছে। ঘুমের অতলান্তে এক স্বপ্নরাজ্যে সে শিহাবের হাত ধরে এক বিশাল গোলাপ বাগানে হেঁটে চলেছে।গোলাপের আবেশিত ঘ্রাণে বারবার শিহাব যেন তার দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে।  আলতো করে তার ঠোঁট শায়লার গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে। দোল দেয়া বাতাসে শায়লার চুল এলোমেলো হয়ে উড়ছে । শিহাব অবাক দৃষ্টিতে তা দেখছে । শায়লার তাতে চোখ পড়তেই শিহাবের চোখের চাহনীতে  লজ্জায় বারবার সে কুঁকড়ে যাচ্ছে। শায়লা নিজেকে আড়াল করতে চারপাশে তাকালো, সে দেখলো  এক মোহনীয় পরিবেশে সে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশে পাখিদের ওড়াওড়ি! কতইনা রঙবাহারের পাখি আর তাদের কিচিরমিচির ডাকে কানে যেন তালা লাগার উপক্রম হলো ! শায়লা দেখলো একটু দূরেই আপন গতিতে কলকল করে বয়ে চলেছে  জলধারা !  যেন তার ভীষণ তাড়া। শায়লা দেখলো খুবই স্বচ্ছ সেই জলের তলদেশে রঙিন মাছেদের জলকেলি ! একটু বামে তাকাতেই দেখতে পেলো এ জলধারার উৎসমুখ। পাহাড়ের গা ঘেষে  ঝর্ণার স্রোতধারা যেন ভূতলের অমোঘ টানে নেমে এসেছে।শায়লার মন ছুটে গেলো সেই পাহাড়ি ঝর্ণার কাছে ! ঝর্ণা জলে শিহাবের মুখটি যেন ভাসছে। মিষ্টি  হাসিতে শায়লাকে কাছে টানছে।সে অপার মুগ্ধতায় আছন্ন হয়ে গেলো! তার চোখেমুখে বিস্ময় খেলে গেলো! কি এক আকর্ষণে সে এক দৃষ্টিতে সেদিকেই তাকিয়ে রইল। পাশে দাঁড়ানো শিহাবের অস্তিত্ব টেরই পেলো না। সে  চারপাশের সব কিছু বেমালুম  ভুলে গেলো। তার ভীষণ  ইচ্ছে হলো শিহাবের কাছে ছুটে  যেতে। শিহাব যেন তার জল তৃষ্ণা নিবারনে কাছে ডাকছে।শায়লা  সেদিকে  এক পা এগুতেই শিহাবের হাতের টান অনুভব করলো।  শিহাব তাকে পিছনে টেনে নিতে চাইছে। শায়লা ভীষণ চমকে গেলো! তবে ঐ ঝর্ণাধারায় সে কাকে দেখলো!  সহসাই শিহাব শায়লাকে তার বুকের কাছে টেনে নিলো! তবে সে কিছুই বুঝতে  পারছে না।  এখানে সে কিভাবে এলো ! তবে শিহাব তার সাথে আছে এটাতে সে নিশ্চিত। সে বেশ শক্ত করেই শিহাবের বাম হাতটি ধরে রেখেছে। শায়লা স্পষ্টই শুনতে পেলো, শিহাবের কন্ঠস্বর। শায়লা তোমাকে আমি অনেক ভালোবাসি।তোমাকে আমি আর হারিউএ যেতে দেবো না। তোমাকে আমার করে পেয়েছি। পৃথিবীতে আমার সব চাওয়ার আজ প্রাপ্তি হলো।  জল ভরা চোখে 
শায়লা  শিহাবের বুকে মুখ লুকালো। শায়লা যেন এক সাগর গোলাপের সৌরভে ডুবে  গেলো। শিহাবের স্পর্শ তাকে কি এক অস্থিরতায় ভরিয়ে দিলো। শায়লা চোখ বন্ধ দীর্ঘ নিঃশ্বাসে তার ভেতরটা ভরিয়ে নিচ্ছিল ! কতটা ক্ষন যে সে এভাবে নিস্প্রাণ হয়ে ছিলো সে তা অনুভবই করেনি। হঠাৎই  কেমন যেন একটা ভারহীন  অনুভবে শায়লা  চোখ মেলতেই দেখতে পেলো তার সামনে শিহাব নেই।চারদিকের এত সুন্দর পরিবেশটা নিমিষেই কালো অন্ধকারে ঢেকে গেছে। বাতাসের দাপাদাপিতে গাছপালার অবাধ্য চলাচল। পাখিদের কলকাকলি থেমে গেছে।ঝর্ণাধারা অলস ধারায় বয়ে চলছে। প্রচন্ড এক ঘূর্ণি বাতাসে গোলাপ বাগানটা তছনছ হয়ে গেলো। গোলাপ পাপড়িগুলো ছড়িয়ে পড়ছে মাটিতে। মূহুর্তেই শায়লার পৃথিবীটা উলোটপালোট হয়ে গেলো! এমন অবস্থায় শায়লা ভীষণ ভীত  হয়ে পড়লো । সে কেবল শিহাবকেই খুজে চলেছে। এইতো একটু  আগেই শিহাব এখানে ছিল! এখন সে কোথায় গেলো! শায়লা  উদ্ভ্রান্তের মত শিহাবকে খুঁজেতে লাগলো। এক্টা কালো আঁধারের চাদর যেন শিহাবকে গ্রাস করে নিলো।  বাতাসের তান্ডবে তার পরনের, শাড়ি এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। চুলগুলো  দিকবিদিকে উড়ছে। সে কিছুতেই  তা সামাল দিতে পারছে না। পায়ের নিচে গোলাপের কাঁটা বিঁধছে। সে কেবল বলেই চলেছে,,  শিহাব  আমাকে একা ফেলে তুমি কোথাও যেও না। আমি তোমাকে ছাড়া  বাঁচবো না। কিন্তু জনমানবহীন এই প্রান্তরে  কোন উত্তর ফিরে এলো না। শিহাব তুমি সাড়া দাও,এমনি আকুতিতে সে বারবার বলেই যাচ্ছে। শায়লা শিহাবকে দেখতে না  এবার কেঁদেই দিলো। ঝড়ো বাতাসের সাথে এবার আকাশের গগনবিদারী শব্দে শায়লা অতীষ্ঠ হয়ে গেলো। সে দিশাহীন হয়ে গেলো। সে থরথর করে কাঁপতে লাগলো। হঠাৎ দবকিছু কেমন যেন অদৃশ্য হয়ে গেলো। 
আচমকা  চোখ মেলতেই সে নিজেকে আলো আঁধারের মিশেলের  অচেনা এক পরিবেশে আবিস্কার করলো। তারপর চারপাশে তাকাতেই সে নিজেকে নিজের ঘরেই  দেখতে পেলো। যদিও টেবিল ল্যাম্পের আলোর স্বল্পতায় নিজের ঘরটা প্রথমে  অচেনাই  লাগছিলো। চারপাশে  তাকিয়ে বুঝতে পারলো সে তার বিছানায় শুয়ে আছে। তার হাত পা শরীর  অবসন্ন হয়ে বিছানায় লুটিয়ে আছে। সে  কিছুতেই নিজের শরীর নিজে টেনে  তুলতে পারছিল না। শায়লা এবার বেশ বুঝতে পারলো সে স্বপ্নে শিহাবের  মাঝে  হারিয়ে গিয়েছিল। পরক্ষণেই  তার গোলাপ বাগানের দৃশ্য  আর শিহাবের স্পর্শের ক্ষণটি তাকে চেতনায় এনে দিলো। সে খেয়াল করলো তার দরজায় মুহুর্মুহু বেশ জোরে  জোরে শব্দ হচ্ছে। ওপাশ থেকে কে যেন,  শায়লা আপু, শায়লা আপু করে ডেকে যাচ্ছে । কান পাততেই শায়লা কন্ঠস্বরটি চিনতে পারলো। বুবলী ! হ্যাঁ,বুবলীই তো! সে এক ঝটকায়  শোয়া থেকে উঠে বসলো। বুবলী বলেই চলেছে, শায়লা আপু শিহাব ভাইয়া এসেছে।তুমি দরজা খোল।দেখো,কে এসেছে ! আমাদের বাসায় শিহাব  ভাইয়া এসেছে।তুমি বেরিয়ে আসো।
শায়লা  খুব করে কান পেতে কথাগুলো  শুনলো। সে কি সঠিক  শুনছে না ঘুমের ঘোরে আবার স্বপ্ন দেখছে ! কিন্তু বুবলী ক্রমাগত  একই কথা বলে চলেছে। এবার শায়লা  তার মায়ের কন্ঠস্বর শুনতে পেলো।মা শায়লা, দরজা খোল মা। মায়ের কান্না গলায় ভীতির প্রকাশ! সাথে রাহাতের ডাকাডাকি  চলছেই,শায়লা আপু আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমার ভুল হয়ে ছিল।এই যে দেখো,শিহাব ভাইয়াকে  নিয়ে এসেছি। তুমি মোবাইল ধরে দেখো,আমি কল দিচ্ছি। শায়লা এবার নিজের মোবাইল খুঁজতে লাগলো।মোবাইল  বালিশের নিচে আড়াল হয়ে ছিলো। সে মোবাইলের আলো দেখে স্ক্রীনে চোখ রাখতেই দেখতে পেলো  রাহাতের বিশটা মিসড কল! এবার শায়লা  বুঝতে পারলো, সে কতটা গভীর ঘুমে চলে গিয়েছিল।  দরজার বাইরে ডাকাডাকির কন্ঠস্বর বেড়েই চলেছে। রাহাত বলেই চলেছে আপু, শিহাব ভাইয়া এসেছে। দরজা খোল।শায়লা এবার তড়িঘড়ি করে বিছানা  ছাড়লো। দরজা খুলতেই সে দেখতে পেলো, বাসার সবাই তার দরজায় দাঁড়ানো।শায়লা ভীষণ লজ্জা পেলো। বুবুলী শায়লাকে  জড়িয়ে ধরলো।সে কান্নায় ভেঙে পড়লো।শায়লা আপু,তুমি কেন দরজা খুলছিলে না।
শায়লা তার মাথায় হাত বুলিয়ে  শান্ত করলো। এবার বুবলী মুখতুলে বললো, শিহাব ভাইয়া এসেছে। বাসার মেইন গেটে দাঁড়িয়ে আছে।শায়লা অস্টম আশ্চর্য চোখে রাহাতের দিকে তাকালো ! রাহাত চোখ বন্ধ করে বুবলীর কথায় সম্মতি জানিয়ে খবরটির সত্যতা জানান দিলো। বুবলী শায়লার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে চোখেমুখে একরাশ হাসির ঝিলিক নিয়ে চারদিকের বাচ্চাদের বললো, এই সব বাচ্চারা তোমরা বাসার গেটে  যাও। নতুন বর এসেছে। সবাই গেট আটকাও। আমরা এত সহজে আপুকে নিতে দিবো না। সব বাচ্চারা হুরমুর করে নিচে নেমে গেলো। রাহাতও খুব দ্রুত নিচে  নেমে গেলো। বাসার ভেতরের চেঁচামেচিতে সে শিহাবকে গেটে দাঁড় করিয়ে রেখে উপরে ছুটে এসেছিলো। 
শিহাব বেশ অনেকক্ষন হলো বাসার মেইন গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। উপরে চিৎকার চেঁচামেচি শুনে রাহাত ছুটে গেছে। শায়লার মায়ের কিছু হলো  কিনা  না শায়লা  তার প্রতি অভিমানে কোন অঘটন  করলো কিনা ? শিহাবের ভীষণ টেনশন হচ্ছিল। তার ভুলের জন্যই আজ ওদের সাথে যোগাযোগটা ঠিকমত হয়নি। তাহলে কত আগেই সে চলে আসতে পারতো।  শিহাবেরও  উপরে ছুটে যেতে ইচ্ছে করচ্ছিল। কিন্তু কেমন করে সে এত রাতে অচেনা একটা বাসায় ঢুকবে। সে রাহাতের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। সে একমনে বিয়ে বাড়ির লাইটিং দেখতে লাগলো। সাজানো বিয়ের গেটটিতে তার দৃষ্টি থামল। গেটটি দেখে  শিহাব মনে মনে একটু হাসল। তারই জন্য এমন সাজানো গেট অপেক্ষা করছে সেতো ঘুণাক্ষরেও তা জানতো না। বিধাতার বেঁধে রাখা চমকে আমরা কতটাই না অবাক হই! এই সময়টায়  শায়লাকে এক নজর দেখার জন্য তার মনটা  ভীষণ উদগ্রীব হয়ে আছে। শায়লাকে কাছে পেলে তার সব ভুলের জন্য আগেই ক্ষমা চেয়ে নিবে। শিহাব  কায়মনোবাক্যে সৃষ্টিকর্তার কাছে নিবেদিত মনে বলেই যাচ্ছে,শায়লা যেন তাকে ভুল বুঝে কোন  ভূল সিদ্ধান্ত  না নেয়। শায়লার ভালোবাসার কাছে শিহাব বারবারই হার মেনেছে। কিন্তু সে শায়লাকে কখনোই ভালোমত বুঝাতে পারেনি শায়লার জন্য তার মনটা কতটা আবেগে ডুবে থাকে। ভাগ্য শায়লাকে  দূরে নিতে চেয়েও আজ আবার কাছে এনেছে। আজ যেন কোন অঘটনে শায়লাকে আবার হারাতে না হয়। চারপাশে মধ্যরাঙেতের শুনশান নীরবতা। শিহাব বাইকে পাশ ফিরে বসে নানান ভাবনার ডালপালা ছড়িয়ে শায়লাকে পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে। রাহাত কখন নিচে ফিরবে। তাদের পরিবারের একটা মতামত জানাবে।শিহাব নিজেকে আবার সামলে নিয়ে ধৈর্য্য ধরলো।এতটা কাছে যখন এসেছে নিশ্চয়ই বিধাতা তাকে ফেরাবেন না। আবার অপর পৃষ্ঠে এটাও ভাবছে,মানুষের তো তীরে এসেও তরী ডুবে।অনেকে সময়ের অবহেলায়ায় গন্তব্যের ট্রেন মিস করে।শিহাব  জানে না তার ভাগ্যে কোনটা লেখা ! হঠাৎই এত রাতের নীরবতা ভেঙে একঝাঁক শিশুর হৈচৈ শুনে শিহাব পিছন ফিরে তাকাতেই দেখতে পেলো, নানান বয়সী শিশু, কিশোর ছেলেমেয়েরা বাড়ির মেইন গেটে যেন মানব বন্ধন করে দাঁড়িয়ে আছে। শিহাব কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। এরই মাঝ দিয়ে রাহাত বাসার বাইরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। সবচেয়ে বড় কিশোরী মেয়েটি বলে উঠলো না না রাহাত ভাইয়া তুমি বাইরে যেতে পারবে না। তুমিতো আমাদের দলে। তুমি কেন বাইরে যাবে ? আমরা শায়লা আপুর বরকে এমনিতে বাসায় ঢুকতে দেবো না।আমরা গেট ধরেছি।
আমাদের টাকা দিয়ে তবেই দুলাভাইকে ঢুকতে দেবো।এমনিতেই অনেক দেরি করে এসেছে। তার জন্যও ফাইন হবে।এবার একজন কিশোর ছেলে বলে উঠলো,  হ্যা হ্যা, সব মিলিয়ে অনেক টাকা দিতে হবে। তার কথায় সবাই হ্যা হ্যা করে উঠলো!  বুঝা গেলো, এই দুইজন হচভহে এই বাহিনীর লিডার।তারা যা বলছে এরা তাতে শায় দিচ্ছে। শিহাব মনে মনে হাসলেও বাইরে সে ভাবলেশহীন ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। রাহাত বাইরে গিয়ে শিহাবকে এর থেকে উদ্ধারের চেষ্টা করতে চাইছে। কিছুতেই শিশুদের লিডারের সম্মতি মিলছে না। তখন রাহাত বুঝাতে চাইলো,দেখো শিশুরা, ওপাধে শিহাব ভসিয়া একা, তার দলে কেউ নেই,কিন্তু উনিই আমাদের আজকের সবচেয়ে বড় মেহমান। তাকে তো এভাবে বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা যায় না। আমি তারদিকে গিয়ে বুঝিয়ে তোমাদের ডিমান্ড আদায় করে দিচ্ছি। 
রাহাত ভাইয়া তুমি কিন্তু আমাদের ঠকাবে না, তাহলে তোমাকেও আটকে দিবো। আমাদের শায়লা আপুকে  নিয়ে যেতে দিবো না। রাহাত তাদের আশ্বস্ত করে বাইরে শিহাবের কাছে চলে এলো। শিহাব বুঝতে পারলো এদের থেকে সহনেই নিস্তার  মিলবে না। রাহাতের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করে পকেটে হাত দিলো। শিশুদের চাহিদা মত কিশোরী লিডারের কাছে নোট গুলো  গুঁজে দিলো। তারা বেশ সূক্ষভাবে নোট পরখ করে নিলো। তাদের চাহিদা মত আদায়ে সবাই তাদের বন্ধন ভেঙে শিহাবের ভেতরে যাওয়ার অনুমতি মিললো। রাহাত শিহাবেত বাইক বাসার ভেতরে পার্ক করে রাখলো। শিশুরা  টাকা পেয়ে হৈ হৈ করে উপরে উঠে  গেলো। রাহাত শিহাবকে নিয়ে সিড়ির দিকে আগাতেই সিঁডিতে বুবলী এক গোছা রজনীগন্ধা নিয়ে শিহাবকে উপরে যেতে আমন্ত্রণ  জানালো। শিহাব সলজ্জ চাহনিতে  ফুল গ্রহণ  করে সিঁড়িতে  প্রথম ধাপটি ফেললো।


চলবে...

কবি মালা মুখোপাধ্যায় এর কবিতা "শুধু একবার বলো, এবার এসো"





শুধু একবার বলো, এবার এসো
মালা মুখোপাধ্যায় 



খুব কম কিছু নয় আমার বয়স দেখতে দেখতে আশি পার , তোমরা এখনও মায়ায় বেঁধে রেখেছো, এবার আমাকে যেতে দাও, তোমরা সকলে একসঙ্গে বলো, শুধু একবার বলো, এবার এসো। 

আমার এখন আর সূর্যের আলো দেখার তাড়া নেই
সকাল হলে মাঠে মাঠে ঘুরে ঘুরে সবুজ মাঠ দেখারও তাড়া নেই।

অসাড় হয়ে বিছানায় , দুই দুনিয়ার মাঝে বসে আছি মাঝির অপেক্ষায়।

চোখ বুঁজেও দেখতে পাই বড় থালার মতো লাল টুকটুকে পুবের আকাশে রবি
আবার জোৎস্না রাতে তোমার রূপের ছটা শশীর গায়ে।

আজ আমার অফিস যাওয়ার কোনো তাড়া নেই।
দুটো ভাত মুখে দিয়ে বাসের অপেক্ষারও তাড়া নেই।

তাড়াহীন জীবন
অচল জীবন
তেজহীন জীবন
এই পৃথিবীতে "কে কার"
বুঝতে শেখা জীবন
এসেছি একা যাবো একা
অনুভবে জীবন
বেঁচে মরে থাকা জীবন
হোক অবসান।

নেমে আসুক শান্তি
শুধু সকলে বলো, 
একবার বলো, এবার এসো।

কবি সালমা খান  এর কবিতা "ত্রিমাত্রিক নদী"





ত্রিমাত্রিক নদী
সালমা খান 

আমাকে পাহাড় সমান ভালোবাসবে বলে 
তুমি সাগর ছেড়ে ময়ূরাক্ষী নদী হয়ে কেনই বা এলে এই লিমুইছড়ির গভীর অরণ্যে। 
প্রকৃতির আঁধারে নিজেকে বিলিন করে সুখ খুঁজে নিতে চাও ? 
পাখির ভেজা পালকে আমার গায়ে তোমার জলের ছাপ ,
কিচিরমিচির শব্দে কি যেনো বলতে চায় ,
আমি পাখির ভাষা বুঝিনা হয়ত হবে, তোমার আমার ভালোবাসার গোপন কথা। 
পাহাড়ের পাদদেশে পাথর নূড়ির ঘর্ষণ জেনেও কেনো আমার অঙ্গ ধুয়ে দাও ?
আমার বুকের মাটি নিয়ে তোমার বুক ভরাট করো পলিমাটিতে। 
শুষ্ক হাওয়ায় বালুচরে ঢেকে রাখো তোমার অর্ধেক নদীর শরীর।
ঘোর বর্ষায় হারিয়ে ফেলো সঠিক পথের স্মৃতি চিহ্ন। 
তুমি অবিরাম ছুটে চলো দিকবিদিক সুখের অন্বেষণে। 
আমাকে ভালোবেসে নয় , তোমার হীম শীতল জলের পরশে আমাকেই করো ক্ষয়,
আমিও অবিচল খাঁটি বিশ্বাস নিয়ে এক পায়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকি ,
নির্বিকার হয়ে অরণ্যের বোঝা মাথায় চেপে পথের পথিক হয়ে আসবে ফিরে আমার দিকে ছুটে। 
তোমার জলে পা ডুবিয়ে আকাশ ছুয়ে দেখি,
তোমার ছায়া পড়ে নীল জলের আয়নার মায়ামোহে ,
তোমার ত্রিমাত্রিক প্রেম সমস্ত নীল চুরি করে নেয় মেঘনীলে। 
আর আমার চখের গভীরে ভাসে তোমার ছোট ছোট ডিঙি নৌকা অথৈ জলে ।

২১ এপ্রিল ২০২২

মমতা রায়চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস ১৫৮




উপন্যাস 

টানাপোড়েন ১৫৮
ওয়ার্কশপ ও ভদ্রলোক
মমতা রায়চৌধুরী



বাপরে বাপ আজ কালীনারায়নপুরের আগে এসে ট্রেনটা এতটাই লেট খাইয়ে দিল। যার ফলে কৃষ্ণনগর স্টেশনে পৌঁছে রেখা ছুটতে শুরু করল অটো ধরার জন্য ।ওয়ার্কশপের টাইম ছিল সাড়ে দশটা । স্টেশনেই10:30 রেখা অটোতে গিয়ে বসলো ।অটোওয়ালাকে তাড়া দিতে লাগল' দাদা একটু তাড়াতাড়ি চলুন না ।'
অটোওয়ালা বিরক্ত হয়ে বলল" এই আপনাদের দোষ দিদি। সারা দুনিয়ায় লেট হলে কিছু বলবেন না ।ট্রেন তো লেট ছিল ট্রেনের ড্রাইভারকে কিছু বলেছেন? বা ব্যাংকে গিয়ে লেট হয় ,ব্যাংকে গিয়ে তাড়া দেন ?হসপিটালে গিয়ে লেট হলে তাড়া
 দেন ?যত তাড়া আপনাদের আমাদের গাড়িতে উঠলে।
রেখা দেখল কথাগুলো বেঠিক কিছু বলছে না। তবুও বললো 'এমনি ,এমনি কি আর তাড়া দিচ্ছি বলুন ?ট্রেন লেট ছিল বলেই তো ,আমার ওয়ার্কশপে পৌঁছাতে লেট হয়ে যাবে,
 দাদা ।সেজন্যই।'
অটওয়ালা বলল 'তাহলে অন্য অটোতে যান।'
লেখা মনে মনে ভাবল কি চ্যাটাং চ্যাটাং কথা রে বাবা।
রেখা বললো ' দেখুন আপনার সঙ্গে আমি তর্কে যেতে চাইনা ।আপনি যেতে পারবেন না ব্যস ,এত কথা বলেন কেন ?তাছাড়া আপনি তাহলে লিখিত দিন যে আপনি অটো চালাবেন না ।আমি অন্য অটোতে গিয়ে বসি।'
অটোওইয়ালা এবার চুপ করে গেল । এবার একটু নরম সুরে বলল' আসলে দিদি আমি তো কয়েকজন প্যাসেঞ্জার নেব?'
'ঠিক আছে ,এই কথাটা তো আপনি ভাল ভাবে বলতে পারতেন ।এতগুলো অকারণ  বাজে কথা।'
মেজাজটা বিগড়ে গেল রেখার । কিন্তু কিছু করার নেই ,বসেই থাকতে হবে।
অন্য অটোতে গেলেও একই হাল  হবে আর তাছাড়া এদের তো আবার লাইন আছে।
কি করবে আর রেখা চুপ করে বসে রইল। লেট এমনিতে হয়েই গেছে ,যা হবে ,হবে।
অটোওয়ালা হাঁক তে লাগলো' ডন বক্স স্কুল,কলেজস্ট্রিট , নেদেরপাড়া , বেজি খালি…।'
আস্তে আস্তে প্যাসেঞ্জার হতে লাগলো এবার অটোওয়ালা গাড়ি স্টার্ট করল।
রেখা দুর্গানাম জপতে লাগলো ।
ডন বক্স স্কুল এর কাছে না এসে অটো বেশ খানিকটা দুরে দাঁড় করিয়ে দিল। বলল 'দিদি নেমে যান।'
রেখা বললl' আর যাবেন না?'
"না আর যাবে না?"
অটওয়ালা যেভাবে কথাটা বলল রেখার আর কথা বাড়াতে ইচ্ছে করলো না।
রেখা ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে দ্রুত হাঁটতে লাগলো। বুকটা কেমন ঢিপ ঢিপ ঢিপ  করতে লাগলো।
"তার কি একাই লেট হল?' রুমে ঢুকতে 
 লজ্জা করছে।
রেখা মনে মনে সাহস আনলো। লজ্জার কি আছে ট্রেন লেট থাকলে রেখার তাতে দোষ কী।
আবার পরক্ষণেই ভাবছে লাস্ট একটা সেমিনারে একজন লেট করে ঢুকছিলেন বলে অনেক কথা শুনিয়েছিলেন আর  পি।
সে কথাটা মনে হতেই ভেতরে ভেতরে আবারো প্যালপিটিশন শুরু হয়ে গেল।
রিসেপশনরুমে ঢুকেই স্কুলের নাম নিজের নাম এন্ট্রি  করল।
তারপর জিজ্ঞেস করল কত নম্বর রুমে ওয়ার্কশপ শুরু হয়েছে?
একজন বললেন দোতালায় 10 নম্বর রুম।
তারমধ্যে দেখা গেল আরও কয়েকজন তারাও ভুলে 10 নম্বর রুমে?
রেখা এবার মনে মনে একটু সাহস পেল তার একার লেট হয়নি।
এবার যেন তেজোদীপ্ত ভঙ্গিতে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগলো।
10 নম্বর রুমে কাছে গিয়ে বলল'আসবো?'
একজন তাকিয়ে হেসে বললেন 'আসুন।'
রেখা নিজের জায়গা বেছে নিয়ে বসলো।
এখনো শুরু হয়নি ভেবে রেখা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে রুমাল বের করে ঘাম মুছতে লাগলো ।
অন্য কয়েকজন জিজ্ঞেস করলেন আসবো ?
ভদ্রলোক আবার হেসে বললেন 'আসুন ,আসুন।'
এবার ভদ্রলোকের দিকে তাকালেন এভাবে বলছেন । রেখাতাকিয়ে দেখছে তার চেনা পরিচিত পাশের স্কুলের মাস্টার মশাই ওই জন্য এরকম হাসছেন।
রেখানএবার খুশি হল।
ওয়ার্কশপটা ছিল কোভিদ সিচুয়েশনে স্কুল ছুটের সংখ্যা বেড়েছে তাদেরকে আবার কিভাবে স্কুলমুখী করা যায়। সে প্রসঙ্গে আলোচনা।
প্রথমে  গ্রুপ ঠিক করে দেয়া হল ।প্রতি গ্রুপে 5 জন 6 জন করে টিচার থাকবে।সেই গ্রুপ থেকে উক্ত বিষয়ের উপর একটা কাল্পনিক সার্ভে রিপোর্ট তৈরি করতে বলা হলো।তারপর সেই বিষয়গুলো নিয়ে পর্যালোচনা। সমস্যা ,সমাধান সিদ্ধান্ত এই তিনটি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দেয়া হলো।
প্রতি গ্রুপে নিজের নিজের গ্রুপ লিডার ঠিক করে নিল। সার্ভে রিপোর্ট করার পর একটা প্রতিবেদন তৈরি করতে বলা হলো।
আর সার্ভে রিপোর্ট করার পর টিফিন আওয়ার্স একটু বিরতি দেয়া হলো।
প্রত্যেকে মধ্যাহ্নভোজন পর্ব শেষ করে প্রতিবেদন সাবমিট করার কথা বলা হলো ।প্রতিবেদন সাবমিট করা হলে , সর্বপর্যায়ে একটা সিদ্ধান্তে আসা হলো ।এই সিদ্ধান্তের ওপর বেস করে নিজে নিজে স্কুলের ক্ষেত্রে সার্ভে রিপোর্ট তৈরি করা ,কতগুলো ছাত্র বা ছাত্রী স্কুলছুট হয়েছে ,তাদের একটা লিস্ট তৈরি করা ।দরকার হলে তাদের বাড়ীতে যাওয়া ,বাড়িতে গিয়ে গার্জেন কে বোঝানো ,স্টুডেন্টকে বোঝানো যে করেই হোক তাদের মোল্ড করে স্কুলে আনা।
এবং কতজন স্টুডেন্ট স্কুলে আনা যাচ্ছে, কতজন যাচ্ছে না ,সে বিষয়ে এস আই অফিসে সার্ভে রিপোর্ট পাঠানো।'
বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
সব কিছু মিটতে মিটতে সাড়ে পাঁচটা বেজে গেল এদিকে ছটাতে ট্রেন আছে।
রেখা জিজ্ঞেস করল "ওয়ার্ক শপ কদিনের জন্য?'
" আজকের যে বিষয়টা ওপর ওয়ার্কশপ ছিল, তা আজকেই শেষ হয়ে গেল ।নেক্সট আবার ওয়ার্কশপ আছে ।সেটা প্রতি স্কুলকে জানিয়ে দেয়া হবে ।সেটা অন্য বিষয়ের উপর হবে।'
রেখা বলল ok
রেখার একটু সাহস করে বলল' এবার কী আমরা যেতে পারি ?আসলে আমাদের ট্রেন আছে তো (ঘড়ির দিকে তাকিয়ে।)
'হ্যাঁ ,হ্যাঁ আসুন আসুন ।ট্রেন মিস করলে অনেকটা সময় পর ট্রেন আছে ।আপনাদের সকলকে অসংখ্য ধন্যবাদ ।আজকের ওয়ার্কশপে অ্যাটেন্ড করার জন্য।"
প্রত্যেকে এবার বেরিয়ে যাবার উপক্রম করলে উনি (আর পি)আর একবার বললেন 'শুনুন ,শুনুন আপনাদের জন্য একটা সার্টিফিকেট থাকবে, সেটা জানিয়ে দেয়া হবে কবে দেয়া হবে। আমরা স্কুলেও পাঠিয়ে দিতে পারি ।না হলে এই স্কুলে থাকবে ।আপনারা এসে কালেক্ট করে নেবেন।"
রেখা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল ওরে বাপরে অলরেডি 5:35 বেজে গেছে তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলো।
তার মধ্যে একজন ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন "আপনি ট্রেন ধরবেন?"
রেখা বলল ' হ্যাঁ'
ভদ্রলোক বললেন"ট্রেন ধরবো তো ,দেখুন ,এখন  সঙ্গে সঙ্গে সব জিনিস খেলে তবে তো ট্রেনটা পাবো ,না হলে মিস করলেই বুঝতে পারছেন?'
রেখা মনে মনে ভাবল বুঝতে পারছেনা তারপর বলল" হ্যাঁ ঠিকই বলেছেন।'
ভদ্রলোক বললেন "ভালোই হলো দুজনে একসঙ্গে তাহলে অটো ধরতে সুবিধা হবে  ওরা তো আবার প্যাসেঞ্জার ছাড়া যেতে চায়না।"
রেখা বললো" ঠিকই। চলুন ,চলুন।"
গেটের কাছে আসতে দেখল একটা অটো দাঁড়িয়ে আছে অটো ওয়ালা কে বলল" স্টেশনে যাবেন?'
"হ্যাঁ যাবো ।"
রেখা ভালো করে অটোতে উঠতে উঠতে তাকিয়ে দেখল আয়নায় অটো ওয়ালার মুখ দেখা 
যাচ্ছে ।' এ তো যে অটোতে এসেছিল,সেই অটোওয়ালা। আর মনে মনে ভাবল এ কি আবার ভোগাবে নাকি?'
এরই মধ্যে ওই ভদ্রলোক বললেন' আপনি চলুন দাঁড়িয়ে রইলেন কেন?'
'কয়েকজন দেখি?''
'মানে আমরা ট্রেন পাব না বুঝতে পারছেন?
'আপনারা ট্রেনের একদম মুখোমুখি টাইমে আসবে আর বলবেন ট্রেন পাবেন না ।সে দায়িত্ব আমার নয়।"
রেখা এবার মুখ খুলে বলল 'আজকে জানেন দাদা আসার সময় উনার অটোতে এসেছি ,এই একই রকম কথাবার্তা।'
ভদ্রলোক বললেন 'আপনি মানুষের সুবিধার জন্য রয়েছেন তো , অসুবিধা হলে আপনার অটোতে লোকে যাবে কেন বলুন তো?'
"তাহলে নেমে যান।'
রেখা বললো 'দেখলেন কি মেজাজ !এদের 
দাদা ।চলুন ট্রেন পাব ,না,পাব, তবু এর অটোতে যাব না ।চলুন তো নেমে যাই।'
ঠিক বলেছেন' চলুন দেখি টোটো তে যাব।'
এরই মধ্যে এক টোটোওয়ালা হাঁকছে' স্টেশন স্টেশন ,ট্রেন ধরাবে দ্রুত।"
রেখা নামতে যাচ্ছে তখন অটোআলা বলল নরম সুরে 'আমি তো এক্ষুনি ছাড়বো।'
"তখন থেকে আমরা বলছি ছাড়ুন আপনি তো ছাড়ছেন না।"
এবার অটোওয়ালা স্টার্ট দিল তখন রেখা ঈশারায় ভদ্রলোককে বললেন "চলুন।'
এবার অটোআলা খুব দ্রুত ছোটালো এবং দেখা গেল যে ঠিক ট্রেন ঢোকার 5 মিনিট আগে স্টেশনে পৌঁছে গেল।
রেখা আর ভদ্রলোক ভাড়া মিটিয়ে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল ।ঠিক তখনই অটোওয়ালা বলল "ট্রেনটা তাহলে ধরালাম তো দাদা ,দিদি?'
রেখা আর ভদ্রলোক পিছন ফিরে তাকালো না।
রেখা ভদ্রলোককে বলল 'দেখলেন এদের মেজাজ কত?'
ভদ্রলোক বললেন' যা বলেছেন। এদের মেজাজ লাটসাহেবকেও হার মানায়  ।দুজন হো ,হো ,হো ,করে হাসতে লাগলেন।'
ভদ্রলোক বললেন' ওই দেখুন দু'নম্বরে খবর হয়েছে। দ্রুত পা চালান।'
রেখা বললো' ও বাবা'।
ভদ্রলোক বললেন আপনি কি লেডিসে  উঠবেন?'
রেখা বলে "আমি তো লেডিসেই …
রেখার কথা সম্পূর্ণ না হতেই ভদ্রলোক বলেন "প্রতিদিন লেডিসে  ওঠেন ঠিক আছে,আজকে না হয় জেনারেল কম্পার্টমেন্টে উঠলেন গল্প করতে করতে যাব।
রেখা মনে মনে ভাবল তা অবশ্য ঠিক কারণ ডেলি প্যাসেঞ্জার যারা আছে প্রত্যেকে তো সাড়ে 4 টার ট্রেনে চলে গেছে একাই যেতে হবে।
রেখা একটু নিজের ওয়েট বাড়ালো তারপর বলল "আসলে আমি বরাবর লেডিসের উঠে অভ্যস্ত তো তাই কেমন একটু অস্বস্তি হয়। অন্য কম্পার্টমেন্টে  উঠতে।'
ভদ্রলোক আবার জিজ্ঞেস করলেন' চলুন না'।
রেখা আর কথা না বাড়িয়ে বগির কাছে আসতেই ভদ্রলোক বললেন ', আসুন, আসুন বলতে গেলে হাত ধরে টেনে তুললেন।'
কেমন একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো
 রেখা ।তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে পড়ল না উঠে উপায়ও ছিল না ।এমন জোরে হাত টেনে তুললেন ।এদিকে ট্রেন ছেড়ে দেবার হুইসেল বাজিয়ে দিলো।
ভদ্রলোক জায়গা পেয়ে রেখাকে জায়গা দিলেন এবং নিজেও জায়গাটা নিলেন।
"আপনি জানলার ধারে টা পছন্দ করেন 
তো "ভদ্রলোক বললেন।
রেখা অবাক হয়ে বলল" আপনি কি করে জানলেন?"
ভদ্র লোক হেসে বললেন' এগুলো তো জানা কথাই মেয়েরা স্বাভাবিকভাবে জানলার কাছে বসতে চায় ।পুরুষরা যে জানালার কাছে বসে না সেটা কিন্তু বলছি না। আসলে এখানে জানলার ধারে সিট পাওয়া গেছে ,অফার করা হচ্ছে ন্যাচারেলি আপনি জানলার ধার বেছে 
নেবেন ।কি রাইট ?আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বললেন।"
রেখা বেশ ভদ্র লোকের কথায় মুগ্ধ হল।
"একদম ঠিক বলেছেন আমি জানালার ধার টাই নেবো।'
ভদ্রলোক বললেন "বসুন ,বসুন ,বসুন।"
এরমধ্যে ট্রেন ছেড়ে দিল ভদ্রলোক মুখিয়ে রয়েছে রেখার সঙ্গে কথা বলার জন্য ।ঠিক সেইসময় রেখার ফোন বেজে উঠল ।রেখা ফোনটা রিসিভ করে বললেন "হ্যালো"
"কে বলছেন,?"
"আমাকে চিনতে পারছেন না ম্যাডাম?"
"ও আপনি ?আসলে এখানে একটু কথা হচ্ছে তো আমি ভালো বুঝতে পারছিনা।"
"বলুন ।"
"শুভ সন্ধ্যা ম্যাডাম।'
"হ্যাঁ শুভ সন্ধ্যা।"
"আপনার লেখা রেডি তো?"
"হ্যাঁ পুরোটা হয়নি।'
"কেন ম্যাডাম এনার্জি পাচ্ছেন না।"
ঠিক তা নয়। আসলে গতকাল একটা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম, ফলে ফিরতে দেরি হয়েছে। আর আজকে আবার একটা ওয়ার্কশপ থেকে ফিরছি। সেই জন্য ।ঠিক আছে ,আমি বাড়ি গিয়ে দেখছি।"
"ঠিক আছে, তাহলে আর কথা বাড়াবো 
না ।আপনি সাবধানে আসুন।"
পাশের ভদ্রলোক রেখার দিকে' মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন "আপনি লেখালেখি করেন?
আমি একজন লেখিকার সঙ্গে যাচ্ছি।'
রেখাএকটু মুচকি হাসল।
ভদ্রলোক বিশ্বাসের সঙ্গে বললেন"আপনার কন্টাক্ট নাম্বারটা দেয়া যাবে?"

Vghh

LOVE

কবি আইরিন মনীষা  এর কবিতা "বেদনার বালুচরে"





বেদনার বালুচরে
আইরিন মনীষা 

বেদনার বালুচরে আছি একাকী 
বেঁচে থাকা দায়
ভালো থাকার আয়োজনে নেই
আর  কোনো সায়।

ভাঙা মনে নেই আজ
আর কোনো শান্তি
ফেলে আসা দিন যেনো
শুধুই এক ভ্রান্তি।

সুখ পাখি রয়ে গেলো
এখনো সেই অধরা
ক্লান্ত শ্রান্ত মনে  তাই
নেই শান্তির  পসরা

দিন যায় রাত আসে
চোখে নেই ঘুম
ফেলে আসা দিনে যেনো 
স্মৃতি কথার ধুম।

আশা নেই তবু দেখি
স্বপ্নের এক ভোর
খুলে যদি কভু আবার
খুশি মাখা দোর।