১৮ এপ্রিল ২০২২

কবি মহুয়া চক্রবর্তী এর কবিতা "পরিচয়"





পরিচয়
মহুয়া চক্রবর্তী 

আমি কে কিবা আমার পরিচয়
সারাজীবন ভেবেই মরলাম 
কি আছে আমার বিষয়-আশয়।
এই মানবজমি জ্ঞানের অভাবে 
অজ্ঞানেতেই রয়ে গেল
তিল তিল করে এবার 
যাবার সময় যে ঘনিয়ে এলো।

যতই আমি আমার আমিকে 
খুজেঁ মরি শত মানুষের ভিড়ে
ততোই আজ একাকিত্ত এসে
ভিড় করে আমার মনের ঘরে।
আমি যেন এক আঁধারের পথে 
হেটে চলেছি বহুকাল ধরে
আজ আর কেউ সঙ্গী নেই 
আমার হাতদুটো ধরবার। 

নিজের অহং ত্যাগ করো একটি বার ভাবো
টাকা-পয়সার রূপের ছটা কিছুইতো স্থায়ী নয়
একদিন এই মানব দেহ মাটিতেই বিলীন হয়। 

মানুষ হয়ে এই পৃথিবীতে জন্মেছিলেম আমি
আজ মান আর হুশ ভুলে
আমার আমি'তে মত্ত হয়েছি আমি। 

জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালো এবার
নিজের মনের মাঝে,
প্রভুর নাম স্মরণ করো
ও মন তুমি সকাল সাঁঝে।
তবেই তুমি হবে পার এই ভবসিন্ধু হতে
এক টুকরো সাদা কাপড় ছাড়া
কিছুই যে যাবেনা তোমার সাথে।

মমতা রায় চৌধুরী এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৫৬




উপন্যাস 


টানাপোড়েন ১৫৬
সমস্যা
মমতা রায় চৌধুরী



বাড়িতে ফিরে রেখার তখনো ঘোর কাটেনি। উত্তেজনা টা যেন রয়েই গেছে। মনোজ বলল'উফ কি ভালো খেলাম রিম্পাদির বাড়ি।'
রেখা কোন কথার উত্তর দিচ্ছে না বলে মনোজ আবার বলল'কি ভালো খেলাম বলো রিম্পাদির বাড়ি?'
হ্যাঁ, রিম্পা দি এরকমই।
'বড়ো আন্তরিক তাই না?'
'একদমই তাই।'
'মানুষটাই অন্যরকম।'
রেখা হঠাৎ করে জানলার কাছে দাঁড়িয়ে গান গেয়ে উঠলো
"ঘরেতে ভ্রমর এলো গুনগুনিয়ে..।'
বাববা ,রাত্রিতে তুমি হঠাৎ  গান শুরু করলে যে?'
'মনেতে পুলক তাই মশাই।'
'ও তাই?'বলেই মনোজ রেখার দিকে এগোতে লাগলো।
রেখা বলল' ভালো হবেনা কিন্তু। ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকো।"
মনোজ বললো কেন কেন কি সুন্দর ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে, ঝরঝরে মেজাজ, খেয়ালী মন বলেই রেখাকে বাহু বন্ধনে জড়াল।
রেখা বলল-'হঠাত তোমারই  বা মনে এত প্রেম জেগে উঠল কেন?'
মনোজ হেসে রেখার গাল দুটোকে ধরে একটু আদর করে দিয়ে বলল'বসন্তের মধুমাস না তাই?'
'হ্যাঁ ,হ্যাঁ বুঝেছি।'
'বসন্ত চলে যেতে বসেছে বুঝেছ মশাই।'
'সে যাক। তবে আমাদের কাছে বসন্ত ।'ফুল ফুটুক না ফুটুক ,আজ বসন্ত'।
বসন্তের একটা গান গাও।
তাহলে তুমিও গলা মেলাও।
'   ...তোমার অশোকে কিংশুকে অলক্ষ্য রং লাগল আমার অকারণের সুখে…।'

হঠাৎ একটা কিসের' কিউ, কিউ 'আওয়াজে রেখা গান বন্ধ করে দিল। মনোজ ইশারায় বললো কি হলো বন্ধ করলে বেশ তো চলছিল।'
রেখা আঙ্গুল দিয়ে দরজার দিকে ইঙ্গিত করে বললো 'কেমন আওয়াজ পাচ্ছো না কিউ কিউ কিউ?'
'কই কোথায় আওয়াজ? তুমি একটু যেন সব কিছুতে বেশি শুনছো। কর্নন্দ্রিয়  খুব ভালো কাজ করছে।'
'তুমি মজা করছ ভালো করে কান খাড়া করে শোনো?'
মনোজ অনেকক্ষণ কান খাড়া করে শুনে বলে 'হ্যাঁ তাই তো ।চলো, চলো ,চলো গিয়ে দরজা খুলি।'
কলাপসিবল গেট খুলল, তারপর দরজা 
খুলল ।দেখছে হ্যাঁ বাচ্চাগুলো ও রকম আওয়াজ করছে।'
রেখা বলল 'ওরে দুষ্টুরা ,বাচ্চাদের আজকে ভালো করে আদর করা হয়নি বুঝেছো ?আদর খাবার জন্য এরকম করছে?'
মনোজ বলল' খিদে পেয়েছে।'
'ঠিক আছে তুমি বিস্কিট দাও দেখি 
তারপর 'আওয়াজ করে কিনা।
'হয় তো খিদেও পেয়েছে।'
মনোজ ঘর থেকে বিস্কিট এনে দিল। ওরা খেলো তারপর রেখা মনোজ যখন দরজা লাগিয়ে  দিচ্ছে তখন আবার ' কিউ , কিউ, কিউ 'আওয়াজ করছে।'
'দেখলে আবার আওয়াজ করছে।'
'ওমা তাই তো !কি অবাক কান্ড।'
'এবার দেখ তো ওদের আদর করে।'
শান্ত ভাবে দাঁড়িয়ে লেজ নাড়াতে লাগলো।
এগিয়ে গিয়ে বাচ্চাদের খুব ভালো করে আদর করলো।
তারপর দরজা বন্ধ করে ভেতরে ঢুকলো।
মনোজ বললো 'ঠিকই তো দেখো এখন আর কোন আওয়াজ নেই গো?'
রেখা বলল' এদের ছেড়ে আমরা কোথায় ও যেতে পারবো?'
'একদমই তাই।'
তারপর মনোজ বড় একটা হাই তুলে বলল
' না গো খুব ঘুম পাচ্ছে?'
'সেকি রাতে কিছু খাবে না?'
মনোজ পেটটাকে দেখিয়ে বলল
' যা খাইয়ে দিয়েছে? এরপর আর কোনো ইচ্ছে নেই?'
'তুমি তো ঘুমিয়ে পড়লেই  হল ।আমার তো আর ঘুমোলে হবে না ।কালকে স্কুলে যাব। কালকের রান্নার সবজিগুলো  কেটে রেডি করে রাখতে হবে।'
'তুমি ভুল করেছো মাসিকে বললেই পারতে ,মাসি কেটে রেখে দিত।'
'সেটাই ভুল হয়ে গেছে।'
'মাঝে মাঝে পরামর্শগুলো নেবে আমার কাছ থেকে বুঝলে?'
'হুঁ'
' না যাই রান্নাঘরে।'
রেখা রান্নাঘরে গেল ফ্রিজটা খুলল।
তখন মনোজ বলল' শোনো কালকে হালকা কিছু রান্না করবে । রিচ খাবার করবে না।'
'তাহলে কি খাবে ?'ফ্রিজ থেকে সবজি বের করতে করতে বলল রেখা।
'ওই তো ডাল করো তাহলেই হবে।'
রেখা হাসতে হাসতে বলল' বাহ শুধু ডাল দিয়ে ভাত খেয়ে নেবে, দারুন ব্যাপার তো?'
রেখা বুঝে নিল এবার আপন-মনে রেখা সবজি কাটতে বসল।
"হ্যাঁ ,মুগডাল করবে মাছের মাথা তো আছেই ফ্রিজে। তার সঙ্গে বেগুন ভাজা আর পাট শাকের ঝোল।'
এমন সময় রেখার ফোন বেজে উঠল"প্রাণ চায় চক্ষু না চায়, মরি একি তোর দুস্তর লজ্জা….।'
মনোজ ঘর থেকে চেঁচাতে লাগল' রেখা রেখা রেখা রেখা.আ .আ .আ….।'
রেখা সাড়া দিল 'কি হয়েছে?'
'তোমার ফোনের কান্না।'
'কে করেছে?'
"ধেত্ততেরি 'আমি জানি না ।তুমি এসে দেখো।'
রেখা বেগুন কাটছিল বেগুন টা নামিয়ে রেখে আস্ তে আস তে  আবার সেই ফোনের রিংটোন বেজে উঠলো 'প্রাণ চায় চক্ষু না….।'
রেখা এসে ফোনটা ধরল বলল 'হ্যালো'।
'কিরে পৌছে গেছিস?'
'ও রিম্পা দি সরি গো ।তোমাকে বলতে ভুলে গেছি অনেকক্ষণ পৌছে গেছি।'
'ঠিক আছে ,ঠিক আছে ।ওইটাই খবর নেবার জন্য । ভালো থাকিস ।শুভরাত্রি।'
'হ্যাঁ গো ,তুমিও ভালো থেকো আর তোমার বাড়ির খাবার খেয়ে তো কতবার মনোজ নাম করছে তার ঠিক-ঠিকানা নেই ।'
রিম্পা দি হো হো হো করে হেসে উঠল আর বলল 'ওকে আবার একদিন আসতে বলবি।'
'হুঁ''
শুভরাত্রি।
ফোনটা কেটে দিয়ে রেখা রান্না ঘরের দিকে যাবে বলে পা টা  বাড়িয়েছে ,ঠিক তখন আবার ফোন বেজে উঠল।
রেখা ফোনটা রিসিভ করে বলল ''হ্যালো'
'আমি বড়দি বলছি।'
'হ্যাঁ বলুন দিদি। আসলে আপনার  যে নম্বরটা সেভ করা আছে সেটা থেকে করেননি তো…।'
'হ্যাঁ ,আমি অন্য একটা নম্বর থেকে ফোন করছি 
তোমার শরীর ঠিক আছে তো?'
'হ্যাঁ দিদি তবে একটু টায়ার্ড আছি।'
'কেন বলুন তো দিদি।'
'না পরপর দুদিন স্কুলে আসলে না। জানালে না।'
'আসলে দিদি ,হঠাৎ করেই ঠিক হয়েছিল তাই দেশের বাড়িতে গেছিলাম।'
'ও ওখানে তো তোমার কাকু কাকিমা থাকেন তাই না?  সবাই ভাল আছেন তো?'
'হ্যাঁ ,ওই মোটামুটি আছেন দিদি।'
'আর আজকে স্কুলে আসলে না কেনো?'
'আসলে দিদি আজকে আমার একটা সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ছিল ।ওখান থেকে আমাকে একটা সম্মাননা দেয়া হয়েছে, আমার লেখার জন্য।'
বড়দি বললেন 'কনগ্রাচুলেশন্স।'
'থ্যাংক ইউ দিদি।'
'তুমি এভাবে আগামী দিনগুলোতে এগিয়ে যাও আরো সম্মাননা তোমার ভান্ডারে আসুক। ঈশ্বরের কাছে এই প্রার্থনা করি।'
'থ্যাংক ইউ দিদি।'
'রেখা একটা বিশেষ কাজের জন্য তোমাকে আমি ফোনটা করেছি কালকে যদি না আসো তাহলে ভীষণ অসুবিধায় পড়তে হবে।'
"কি দিদি?'
'আসলে একটা ওয়ার্কশপ আছে সেটা অনিন্দিতা ই জেদ করেছিল যাবে  তাই ওর নামটা পাঠানো হয়েছিল কিন্তু ও কালকে স্কুলে আসেনি ।আজকে সন্ধ্যের দিকে ফোন করে আমাকে জানালো ওর বাচ্চাকে নিয়ে একটু প্রবলেম আছে। তাই ও অ্যাটেন্ড করতে পারবে না।'
'কি হয়েছে ওর বাচ্চার দিদি।'
'আর বোলো না ।ও তো কিছুদিন যাবত এসেই বলছিলো যে ওর বাচ্চা কথা বলছে না।'
'কেন তুমি ব্যাপারটা জানতে না?'
'আপনি তো জানেন দিদি, ও কি কারনে আমার প্রতি এতটা রাগ ,আমি জানিনা ।আমার সামনেও কখনো ওর ফ্যামিলির কথা আর বলে না ।আর আমিও কোন ইন্টারেস্ট দেখাই না।'
'হ্যাঁ ওর বাচ্চার দু'বছর কমপ্লিট হয়ে গেছে আড়াই বছর হয়ে গেছে এখন অব্দি কোন কথা বলে না।
কিন্তু ও সব বোঝে নাকি?'
'এইরকম একটা ভাষা ভাষা কথা শুনছিলাম তবে স্পষ্ট করে আমি কিছু জানি না দিদি।'
"ওইটা নিয়েই এখন নাকি ওর কি মনে হয়েছে ওর হাজবেন্ড আর ও মিলে ডিসিশন নিয়ে একটা স্কুলে ভর্তি করেছে।'
"বাহ ,ভাল করেছে তো দিদি।'
'হ্যাঁ সে তো ভালো করেছে কিন্তু ওখানে আর একটা কান্ড হয়েছে। ক'দিন হয়েছে তিন চারদিন স্কুলে গেছে এর মধ্যে ও নাকি অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে মারামারি করেছে।
গত পরশু দিন নাকি একটা বাচ্চাকে ঠেলে ফেলে দিয়েছে।'
'ও বাবা কি সাংঘাতিক?'
'স্বাভাবিক ভাবেই প্রিন্সিপাল কল করেছেন।'
'ও বাবা তাই নাকি?'
'আর বোলো না'
'প্রিন্সিপাল কল করার পর কি বলছেন দিদি?'
'ওনারা বলছেন বাচ্চা কে অন্য জায়গায় ভর্তি করিয়ে দিতে ।এই স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেয়া হবে।'
'তাড়িয়ে 'দেয়া হবে এই শব্দ টা কখনো ব্যবহার করতে পারেন?'
'হ্যাঁ ও দুঃখ করে কাঁদছিল আমার কাছে। তখন 'আমি বললাম এটা তো ওনারা বলতে পারেন না।'
এই সমস্যা থেকে ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে।'
'তা আমি বললাম  ভেঙে পড়ার কোনো কারণ নেই ।তোর বাচ্চাতো এমনি সুস্থ-স্বাভাবিক সবই আছে অত চিন্তা করিস না বরং বলে আসতে পারতিস  সকল শিশুর শিক্ষার অধিকার 
রয়েছে ।কখনো বলতে পারেন না যে স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেবো ,সে যদি লেখাপড়া শিখতে চায়।'
"তা তো ঠিকই দিদি।'
'এইরকম একটা সমস্যা চলছে।'
ওকে বেশি জোরজবস্তি করলাম না ,. ও একটা মেন্টাল প্রেসারে আছে বাচ্চাকে নিয়ে।'
'তাহলে শেষ পর্যন্ত কি হলো দিদি?'
'ওকে স্পিচ থেরাপির ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বললাম।'
'বাহ দারুন সিদ্ধান্ত।'
'এখন দেখা যাক ও কি করে?'
'হ্যাঁ ওর একবার স্পিচ থেরাপির সঙ্গে কথা বলা উচিত আর একবার এমনি ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত।'
'যাই হোক তা কালকে তুমি আসছো তো সিওর?'
'এখন অব্দি তো ঠিকই আছে।'
'ব্যস এটুকু হলেই যথেষ্ট  আমি তো তোমাকে
 চিনি '।বড়দি হাসতে হাসতে বললেন।
'তাছাড়া তুমি আসলে কোন সমস্যা হবে না ।আর আমি জানি  তুমি সমস্যায় ফেলবে ও না।'
রেখা বললেন 'আমি চেষ্টা করি দিদি।'
'ব্যস ,এই চেষ্টাটাই রেখো সব সময়।'

কবি সেলিম সেখ এর কবিতা "মায়ের কোল"




মায়ের কোল
সেলিম সেখ

ওই দেখো খোকন সোনা
মায়ের কোলে বসে,
বলছে সে অনেক কিছু
আপন-মনে খুশে।

মিষ্টি মধুর চেহারা তার
জুড়াতো মায়ের কোল,
মা হীনা আঁখিতে তার
আসতো দুখের জল।

মায়ের কোলে মাথা রেখে
পেত সে চিরসুখ,
মা যে নেই এখন
রয়ে গেছে তাই দুখ।

দুঃখ ভরা জীবন নিয়ে 
চলে সমুখ পানে, 
মা হীনা জীবন যে তার 
দুর্বিষহ তা জানে।

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৯৩





ধারাবাহিক উপন্যাস 


শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৯৩)
শামীমা আহমেদ 

খুবই অনিচ্ছা সত্বেও শিহাব দোতালার
হাসান সাহেবকে তার ঘরে প্রবেশের জন্য স্বাগত জানালো। যদিও এই মূহুর্তে শিহাবের মনের সবকিছু ভীষণ এলোমেলো  হয়ে আছে তবুও সামাজিকতা মেনে হাসান সাহেবের সাথে কিছু কথা চালিয়ে যেতে হবে। বিল্লাল খাবারের ট্রে  ডাইনিং টেবিলে রাখলো।  হাসান সাহেব বিল্লালকে তার  খাবার নেয়ার জন্য বাসায় যেতে বললে বিল্লাল বিদায় হলো। এবার শিহাব, হাসান সাহেবকে উদেশ্য করে বললেন, এসবের কী দরকার ছিলো ?  আর আমি একা মানুষের জন্য এত খাবার !
এবার যেন হাসান সাহেব তার মনোবাসনা প্রকাশের একটা মওকা পেলো। খুবই বিগলিতভাবে বললেন, না,  না,এ আর এমন কি।আজকের সামান্য আয়োজন। প্রতিদিন তো আর এমনটা হয়না।
সামান্য আয়োজন ! শিহাব অবাক হলো, এই যদি হয় সামান্য আয়োজন তবে অসামান্য বলতে কী বুঝবো ? শিহাব শুনেছে,
হাসান সাহেব একটা ওষুধ কোম্পানীতে চাকরী করেন।স্বল্প বেতনভোগী হলেও নানান হাসপাতাল আর ডাক্তারদের সাথে তার দারুন সখ্যতা।সবার সাথেই কমিশন পাইয়ে দেয়ার আর নিজের পকেটে ভরার লাইনঘাট তার ভালই জানা। ছেলেকে একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াচ্ছে যা ভীষণ ব্যয়বহুল।
শিহাব আরাফের কথাও একঝলক ভেবে নিলো।আরাফকেও স্কুলে দিতে হবে।আরাফের তিন শেষ হয়ে চা'রে পড়েছে।
হাসান সাহেব কিছু একটা বলার জন্য যেন উসখুস করছেন। কিন্তু অনেকরাত হয়ে গেছে।শিহাব এখনো খায়নি তাই কথা শুরুও করতে পারছে না। কিন্তু শিহাব বুঝতে পারছে এমনি এমনি তিনি তার বাসায় আসেননি।নিশ্চয়ই কিছু একটা বলার অভিপ্রায়ে এত কিছুর অবতারণা। 
শিহাব তাকে সহজ করতে বলে উঠলো, হাসান সাহেব, কিছু বলবেন ?
না না তেমন কিছু না। আপনি খেয়ে নিন। আমি ড্রইং রুমে বসছি। বলেই তিনি উঠতে চাইলেন। শিহাব বললো,না,এখন খেতে ইচ্ছে করছে না। সন্ধ্যায় ভাবী অনেক নাস্তা করিয়েছে। সেগুলোতে এখনও পেট ভরে আছে। 
তক্ষুনি যেন হাসান সাহেবের শিহাবের সেই কথা মনে পড়ে গেলো, আচ্ছা তখন আপনি বলছিলেন আপনার পরিবারের কে যেন অসুস্থ ? আপনার মা ? 
না, না,  আমার মা ভালো আছেন। শিহাব যতই কথা সংক্ষিপ্ত করতে চাইছেন কিন্তু হাসান সাহেব বারবার আঠার মত লেগে থাকতে চাইছেন।শিহাব বুঝতে পারছে নিশ্চয়ই কোন উদ্দেশ্য নিয়ে তার এখানে আসা।
তাহলে কে অসুস্থ ? আপনার বাবা ?
তার আবার প্রশ্ন। 
এবার শিহাব তাকে শান্ত করতে জানালো, আমার ছেলে আরাফ। সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে কপালে কেটে গেছে। হাসপাতালে আছে।
শুনে হাসান সাহেব ভীষণ ব্যথিত হলেন। আহা ৷ এত ছোট বাচ্চাটা। তা শিহাব সাহেব বাচ্চার মাকে কি খবর দিয়েছেন ?  শুনেছি উনি দেশের বাইরে থাকেন। শিহাব বুঝতে পারলো, সব খবরই সে রাখে তাহলে।
শিহাব বেশ স্পষ্ট করেই বললো, না জানাইনি।
এবার যেন তার আফসোসের পাল্লা বোঝাই হলো।আহা,মা ছাড়া বাচ্চাটা এমন ব্যথা পেলো। তা আমি শুনেছি, উনি এখানে এসেছিলেন। দুদিন থেকে চলেও গেছেন। আপনি নাকি তাকে চলে যেতে বলেছেন।
শিহাব এবার ভীষণ অবেক হলো!ঘরের কথা বাইরে জানলো কিভাবে ?
শিহাবের মনে কৌতুহল হতেই সে সন্দিগ্ধ মনে জানতে চাইলো, আপনি কিভাবে জানলেন এইকথা ? 
হাসান সাহেব এবার যেন ধরা পড়ে গেছেন এমন অভিব্যক্তি দিয়ে নিজেকে বাঁচাতে তার স্ত্রীর উপর তা চাপিয়ে দিলেন,, ইয়ে মানে,আপনার ভাবী বলেছে । যাওয়ার সময় আপনার মিসেস, বিল্লালকে বলে গেছে,উনি একেবারেই চলে যাচ্ছেন।বিল্লাল যেন তার স্যারকে দেখে রাখেন।  এবার শিহাব বুঝতে পারলো,তাহলে বিল্লালই হচ্ছে সবকিছুর মেসেঞ্জার। শিহাব বুঝতে পারছে না, অন্যের ব্যাপারে মানুষের কেন এত কৌতুহল ! 
এবার হাসান সাহেব তার মনের কথাটা বলার জন্য যেন উপযুক্ত যুক্তিটা খুঁজে পেলেন। তিনি অকপটে বলেই ফেললেন, দেখুন আপনার স্ত্রী এত ছোট একটা বাচ্চা রেখে চলে গেছেন,আপনিও একা একা কষ্ট করছেন। এভাবে আর কতদিন থাকা যায় বলুন। ঘর সংসার তো করতে হয়। বাচ্চাটাকেও তাহলে কাছে এনে রাখতে পারতেন। শিহাব হাসান সাহেবের  কথায় বেশ অবাক হচ্ছেন ! মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়ে কথা বলতে এ দেশের  মানুষ অনুমতি নেবারও প্রয়োজন মনে করে না।
হাসান সাহেব বলেই যাচ্ছেন, তা আপনার ভালোর জন্যই একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলাম।যদি সহজভাবে নেন তো বলতে পারি।
শিহাবের প্রান্ত থেকে উত্তরের অপেক্ষা না করেই তিনি বলে চললেন,আমার শ্যালিকা চৈতীকে তো একটু আগেই দেখেছেন।
শিহাব কিছুক্ষন আগে হাসান সাহেবের দরজায় কথা বলার সময় একটি মেয়েকে দেখেছিল। তাহলে তার নাম চৈতী ! 
শিহাবের আর বুঝতে কিছু বাকী রইল না। হাসান সাহেবের আগমনের হেতু আর ইনিয়ে বিনিয়ে এত কিছু বলার পেছনের কারণ।
শিহাব ভাবলো, ঐটুকু মেয়ে মাত্র মাস্টার্স পড়ছে কেমন করে এরা আমার সাথে এমন সম্পর্ক ভাবে ? শিহাবের ভাবনা শিহাবের মনের ভেতরেই রইল।
হাসান সাহেব বললেন,নাহ,এখুনি কিছু জানাতে হবে না।আপনি সময় নেন। হাসান সাহেব হাত কচলাতে কচলাতে  বললেন, বলছিলাম কি,ওরা দুইবোন, এক বিল্ডিংয়ে থাকলে ভালোই হতো।বাপ মা মরা ওরা এই দুটি বোন। আর আপনাকেও আমি ভায়রা  করে নিতে পারলে আমি খুবই খুশী হতাম! আপনাকে আমার খুবই পছন্দ শিহাব সাহেব।এতদিন হয় আপনি এখানে আছেন কোনদিন কোন খারাপ  কিছু  শুনিনি। এতসব কথা বলে এবার হাসান সাহেব শিহাবের ফ্ল্যাট থেকে বেরুনোর জন্য আগালো।পরক্ষণেই তিনি তার শ্যালিকার  দুইটি  থ্রী আর সাইজের রঙিন ছবি শিহাবের বিছানায় বালিশের পাশে রেখে গেলেন। শিহাব বাধা দিয়ে কিছু বলতে চাইতেই হাসান সাহেব শিহাবের বাসা থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। শিহাব ভাবলো,এতো দেখছি আরেক মহা যন্ত্রণা ! শিহাব এগিয়ে গিয়ে ছবি দুটো হাতে নিলো। একটি ছবিতে  ডাগর চোখের  মেয়েটি রঙিন ঝলমলে শাড়িতে  তার কলেজের বাগানের সামনে দাঁড়িয়ে, আরেকটি ছবিতে ঘরে সোফায় বড় বড় চুল ছেড়ে গালে হাত দেয়া ভঙ্গিমায় মায়া ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।শিহাব মনে মনে ভাবলো, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হলেও আজো মেয়েদের বিয়ের পাত্র খোঁজে সেই সনাতন প্রথা রয়ে গেছে। শিহাব ছবি দুটো উল্টো করে তার সাইড টেবিলে রেখে দিলো। তবে একবার ভাবলো, এখুনি বিল্লালকে ডেকে ছবি দুটো ফেরত পাঠাতে।কিন্তু  এতে তারা অপমানিত বোধ করতে পারেন। কাল সকালেই তবে ফিরিয়ে দেয়া হবে।  শিহাব ছবি দুটো খাটের  সাইড টেবিলে রাখতেই তার মোবাইলের দিকে চোখ পড়লো। হাতে নিতেই দেখতে পেলো,মোবাইল একেবারে ডার্ক এন্ড ডেড হয়ে আছে। তার মনে পড়লো হাসপাতালে থাকতেই ফোনের চার্জ ফুরিয়ে গিয়েছিল। এসে আর হাসান সাহেবের জন্য চার্জে দেয়ার একটু  সময় মিলেনি। আরাফেরও খবর নেয়া হয়নি।শিহাব দ্রুতই মোবাইল চার্জে লাগিয়ে দিলো। টেবিলের খাবার সব ফ্রিজে তুলে রেখে সময় দেখলো,রাত বারোটা। শিহাব একটা সিগারেট  ধরিয়ে বারান্দায় এসে বসলো।শায়লার কথা খুব  মনে পড়তে লাগলো। শায়লা নিশ্চয়ই তার স্বামীর সাথে এখন গল্প করছে। কিন্তু কেমন করে শায়লা তাকে এভাবে ভুলে আছে? এ কথা ভেবে শিহাব ভেতরে অস্থিরতায় খুব ঘন ঘন সিগারেটে টান দিতে লাগলো।
রাহাত অনেকবার ফোন করেও  শিহাবের মোবাইলে কল পৌছাতে পারেনি।বারবার তা বন্ধ পাচ্ছিল। রাহাত একথা শায়লাকে জানাতে শায়লা ভীষণ চিন্তিত হলো।সে নিজেও কয়েকবার ট্রাই করে শিহাবের মোবাইল বন্ধ পেলো। শিহাব বাইক চালিয়ে চলাচল করে। পথে কিছু হলোনাতো আবার ?
শায়লা অজানা আশংকায় কোন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যেন না ঘটে মনে মনে এমনটি ভাবছিল। বুবলী অনেক অনুরোধ করে শায়লার মুখে একটু খাবার দিয়েছে। শায়লা তার নিজের ঘরে সাজানো খাটের এক কিনারায় শুয়ে রইল। দেয়াল ঘড়িতে চোখ যেতেই দেখলো রাত্রি বারোটা। শায়লা ভীষণ অবাক হলো, আজ দুপুরের পর থেকে শিহাব তার সাথে একেবারেই যোগাযোগে নেই ।  তবে কী আরাফ বেশী অসুস্থ হলো ? 
শায়লা কিছুই বুঝতে পারছে না কি করবে ? সারাটাদিন নানান ঘটন অঘটনের মধ্যে দিয়ে কেটেছে।কিন্তু এমনি ভাবে শিহাব কোনদিনই নীরব থাকেনি। শায়লা শিহাবের অফিস থেকে পাঠানো শিহাবের কালো শার্ট পরা সেই সেল্ফিটির দিকে একমনে তাকিয়ে রইল।


চলবে...

১৭ এপ্রিল ২০২২

কবি শেখ রাসেল এর কবিতা "নারীই তুমি"




নারীই তুমি 
শেখ রাসেল 

নারীই তুমি গড়তে পারো
ভাঙ্গতে পারো জানি,
উদার হলে পাহাড় সমান
রুষ্ঠে নাগিন মানি।

নারীই তুমি কল্যাণে সব
স্বভাব গুণে ভালো,
পুরুষ কাঁদে জন্য তোমার 
রাত্রি হলেই কালো।

নারীই তুমি রূপ সরসী
হাজার কত গুণ,
নিন্দা ঘুণে ধরলে দিবে
তিক্ত কথার নুন।

নারীই তুমি চাইলে পারো 
করতে সবি আলো,
মিথ্যা মোহের দেমাগ নিয়ে
হওনা কেন ভালো ?

নারীই তুমি বিষাদ ভরা
কয় পুরুষে কতো,
বদলে ফেলো মানুষ কেন
পোশাক পরার মতো ?

নারীই তুমি বৃক্ষ মায়ার
বাঁধলে সুখের ঘর,
কোন ছলনায় সত্ত্বা ভুলেই
করলে আপন পর ?

নারীই তুমি মা ভগিনী 
সম্মানে হই নত,
রূপ ধুয়ে নাও তুলশী জলে
ময়লা আছে যত ?

শামীমা আহমেদ  এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৯২





ধারাবাহিক উপন্যাস 


শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৯২)
শামীমা আহমেদ 


এক অনিশ্চয়তার বাতাবরনে মোড়ানো শিহাব, শায়লাকে পাওয়া না পাওয়ার দোলাচলে বাইক নিয়ে এগিয়ে চলছে।
কেবলমাত্র রাস্তার দুপাশের নিয়ন বাতিকে লক্ষ্য করে বাইক ছুটে চলছে। তার কাছে চারপাশের আর সব কিছু অদৃশ্যমান হয়ে আছে। ট্রাফিক সিগন্যালের বাতিগুলো মাঝে মাঝে চলার গতিতে ছেদ ঘটাচ্ছে। রাত বাড়ছে।পথে যানজট তীব্র হচ্ছে।সবারই গন্তব্যে ফেরার তাড়া। কারো জন্য ঘর,ঘরের মানুষজন উন্মুক্ত হয়ে অপেক্ষায় কেউবা নিদির্ষট সময়ের মধ্যে মালামাল পৌঁছে দেয়ার প্রতিজ্ঞাবদ্ধে যানবাহনে গতি বাড়িয়ে দেয়া। শিহাব জানেনা কার উদ্দেশ্যে তার ছুটে চলা,সে জানেনা তার ভবিতব্য। এই রাতের শহরে কেবল শায়লার জন্য হৃদয়ে ভালবাসা সম্বল করে একটা স্বপ্নের বাস্তবায়নে উর্ধ্বশ্বাসে এগিয়ে যাওয়া। শিহাব বুঝতে পারছে শায়লাকে তার পরিবারের সন্মান রাখতে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সব করতে হচ্ছে। তবুও শিহাবের কোথায় যেন শায়লার প্রতি একটা ভরসা। তার বিশ্বাস, শায়লা তাকে ছাড়া আর কাউকে গ্রহন করবে না। কিন্তু কিভাবে শায়লা নিজেকে এর থেকে বের করে আনবে। আজ সকালে শায়লার চোখের ভাষায় বিনা প্রশ্নে সে   শিহাবের কাছে চলে আসার জন্য তৈরি ছিল। কিন্তু কি করে যে কি হয়ে গেলো ! সবই বিধাতার বেঁধে দেয়া বিধিলিপিতে এগিয়ে চলছে।শিহাব মনকে শান্ত করে বাইকের চলায় মনযোগী হলো। সে  আজমপুর দিয়ে উত্তরায়  ঢুকলো। শায়লাদের বাসা সেক্টর সাতের রোড ক্রস করতে গিয়ে তার মনটা ভেতরে ভেঙে চুড়ে যাচ্ছিল।নিজেকে সামাল নিয়ে সে সোজা একটানে নিজের বাসার দিকে এগিয়ে গেলো।
এদিকে রাহাত বিয়ে বাড়ির সব আয়োজন চালিয়ে যাচ্ছে। শায়লার ঘর কাঁচা ফুল দিয়ে সাজানো  হয়েছে। বিয়ের বাসরঘর যেমন করে সাজানো হয়। বাড়ির ভেতরের মানুষ যেমনি বিয়ে বাড়ির আমেজ ধরে রেখেছে তেমনি বাইরে থেকে দেখে লোকজন বুঝবে এই বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলমান। তবে বুবলীর মাধ্যমে কোন সমাধান করতে না পেরে রাহাত  নিজেই  এবার শায়লার সাথে কথা বলার জন্য এগিয়ে গেলো।রাহাত ভেবে নিলো, আপু যতই অনীহা দেখাক না কেনো রাহাত তা উপেক্ষা করে  আপুর কাছে নিজের ভুল স্বীকার করে নিবে। শিহাব ভাইয়াকে কল করে আপু যেন  তাকে বাসায় থাকতে বলে।রাহাত নিজে গিয়ে শিহাব ভাইয়ার কাছে ক্ষমা চেয়ে তাকে নিয়ে আসবে।রাহাত  শায়লার ঘরের বদ্ধ দরজায় নক করতে বুবলী দরজা খুলে দিলো। রাহাত শায়লার ঘরটিকে খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে। কিন্তু সেখানে আপুর এমন মলিন মুখ দেখে রাহাতের মনটা ব্যথায় ভরে উঠলো।  সে সরাসরি শায়লার হাত ধরে তার ভুলের জন্য, আপু যেন ক্ষমা করে দেয়,তার অনুরোধ করে গেলো। ছোট ভাইয়ের এমন অনুনয়ে শায়লা প্রথমে কঠোর থাকলেও কিছু সময় পর বোনের মন গলে একেবারে কাদা হয়ে গেলো।কতইনা আদরের এই ভাইটা! তার জন্য শায়লা আর আবেগ ধরে রাখতে পারলো না। শায়লার চোখ  দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগলো। বারংবার শিহাবের কাছে ক্ষমা চাওয়ার উত্তরে এবার শায়লা ছোট  ভাইকে জড়িয়ে ধরলো। বুবলী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। যাক ! ভাইবোনের মান অভিমান ঘুচলো। কিন্তু শায়লার একটাই কথা আমি শিহাবকে আসতে বলতে পারবো না সেটা তোমাদের দ্বায়িত্ব। আজ কানাডার অতিথি আসেনি বলে তোমরা তার খোঁজ করছো। তোমাদের ভুলের মাশুল তোমাদেরই দিতে হবে। শায়লার সম্মতিতে শিহাব এক লাফে রাজী হয়ে গেলো। রাহাত তক্ষু্ণি শিহাবকে ফোন করতে উদ্যত হলো। রাহাত তার মোবাইল আনতে নিজের ঘরের দিকে ছুটলো।  
রাত সাড়ে দশটার দিকে শিহাব নিজের বাসার গেটে এসে গেট খোলার জন্য প্রতিদিনের অভ্যাসমত  জোরে হর্ণ বাজাতেই দেখলো,পুরো দরজাটাই খোলা। বাসায় গাড়ির যাতায়াত। অচেনা মানুষজনের আসা যাওয়া।চকচকে উজ্জল পোষাকের অতিথি,  নারী পুরুষ শিশু বাসায় প্রবেশ করছে। শিহাব সাবধানতায় বেশ জোরে হর্ণ বাজিয়ে বাসায় তার বাইক ঢোকালো। স্টার্ট বন্ধ করে হেলমেট খুলতেই কেয়ারটেকার বিল্লাল শিহাবের দিকে এগিয়ে এলো। শিহাবের ফ্ল্যাটের চাবি হাতে নিয়ে কাছে এলো। শিহাবের  মনেও একটা জিজ্ঞাসা, আজ বাড়িতে এত লোকজন ! কোন উৎসব আয়োজন নাকি ? 
বিল্লাল শিহাবকে জানালো, স্যার, আজ দোতালার অপুর আম্মু ম্যাডাম আর হাসান স্যারের বিয়া বার্ষিকী। অনেক মেহমান আসতাছে। বাসায় অনেক আয়োজন হইছে।
অনেক খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা হইছে। আমারেও দাওয়াত দিছে। ডিউটি শেষ কইরা যামু। 
শিহাব মনে মনে ভাবলো, মানুষ তার প্রিয় মানুষকে বিয়ে করে আবার কত ধুমধামে বিয়ে বার্ষিকীও করে। আর তার জীবনে সবটাই ধোয়াশা হয়ে থাকে। ধরা দিয়েও নিষ্ঠুরের মত তাকে একা করে যায়। শিহাবের মনে শায়লার মুখটা ভেসে উঠলো। সে অভিমানে অনুযোগে নিজের কাছে নিজেই জানতে চাইলো, কই  সন্ধ্যা থেকে শায়লা তো তাকে একটা কলও করলো না ? সারাদিন আরাফের একটা খোঁজও নিলো না।বিদেশি অতিথিকে পেয়ে তাকে ভুলেই গেছে। কিন্তু পরক্ষণেই সে ভাবলো, এ আমি কি ভাবছি? শায়লা কখনোই তাকে ছাড়া কাউকে গ্রহন করবে না। শিহাবের নীরবতায় বিল্লাল বললো, স্যার কিছু ভাবতাছেন ? উনারা আপনারেও দাওয়াত করতে চাইছে। কিন্তু যতবারই আপনার বাসায় গেছে ততবারই তালা দেওয়া পাইছে। তাইতো আমারে বইলা রাখছে, আপনি আইলেই য্যান তাদের খবর দেই। স্যার আমি তাদের জানাইয়া আসি।বিল্লাল এগিয়ে যেতে উদ্যত হতেই শিহাব তাকে থামিয়ে দিলো। শিহাব বললো,না বিল্লাল, তাদের এখন আর জানিও না। আমি খুবই ক্লান্ত।আমি বাসায় গিয়ে বিশ্রাম নিবো। ওদের জানিও না। বিল্লাল দেখলো, সত্যিই স্যাররে খুব ক্লান্ত লাগতাছে। কিন্তু সেতো শুধু বাইরেটা দেখছে। শিহাবের ভেতরটা যে  ভেঙে চুড়ে যাচ্ছে সেতো সেটার টের পাচ্ছে না। শিহাব হাতে হেলমেট,বাইক আর ফ্ল্যাটের চাবি নিয়ে এগিয়ে গেলো। লিফটে অতিথিদের   যাতায়াত চলছে। শিহাব তাই লিফট এড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে লাগলো।
দোতালায় অপুদের ফ্ল্যাটের দরজা খোলাই ছিল। শিহাব দোতালার সিঁড়িতে উঠতেই দেখলো,দরজায় অপুর বাবা হাসান সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। বেশ সুটেড বুটেড পোশাকে উৎসব আমেজে যেন শিহাবের জন্যই অপেক্ষা। ভেতর থেকে অতিথিদের আলাপচারিতার শব্দ, সাথে খাবারের সুঘ্রাণ ভেসে আসছে। শিহাব ভদ্রতাবশতঃ হাসান সাহেবের প্রতি  সালাম জানাতেই হাসান সাহেব  সালামের উত্তর দিয়ে হ্যান্ডশেক করার উদ্দেশ্যে  হাত বাড়িয়ে দিলেন। শিহাব হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করে নিলো। হাসান সাহেব শিহাবকে বাসায় ঢুকতে অনুরোধ করলো। শিহাব বিনীতভাবে বললো, আজ নয়,অন্য দিন, আরেকদিন, বলেই সে ছুটে যেতে চাইলো। কিন্তু হাসান সাহেবের অনুরোধ, আজ আমাদের একটি বিশেষ দিন, এমনতো সবদিন হবে না। আপনার ভাবী আপনাকে  দাওয়াত করতে  বেশ কয়েকবার গিয়ে দরজায় তালা পেয়ে ফিরে এসেছে।চাইলে ফোনে বলতে পারতাম সেটা ঠিক সুন্দর দেখাতো না৷ তাইতো আপনার বাসায় ফেরার বাইকের শব্দ পেয়েই দরজায় এসে দাঁড়িয়েছি।প্লিজ,কিছু মনে করবেন না, আজ আমাদের সাথেই ডিনার করুন। হাসান সাহেব শিহাবকে অনুরোধ করেই যাচ্ছেন। শিহাব দেখলো,হাসান সাহেব কথা বলতে থাকলে তার  ঠিক পাশে হলেও হাসান সাহেবের পিছনে নিজেকে একটু আড়াল করে গাঢ় বেগুনি রঙের ঝলমলে শাড়িতে একটি মেয়ে এসে দাঁড়ালো। তার বড় বড় চোখ দিয়ে আড়াল থেকে শিহাবের দিকে দৃষ্টি রাখলো। হাসান সাহেব তখনো শিহাবের হাত ধরেই রেখেছেন। মেয়েটি আসার টের পেয়েই হাসান সাহেব বললেন, ও আমার শ্যালিকা, নাম চৈতী। রংপুরের কারমাইকেল কলেজে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স পড়ছে।প্রায় শেষের দিকে । বোনের বাসায় বেড়াতে এসেছে । ওরা দুই বোন।শিহাব বুঝতে পারছে না,হাসান সাহেব মেয়েটি সম্পর্কে  কেন এতকিছু বলছেন। শিহাব সৌজন্যতা দেখিয়ে, ও আচ্ছা,ও আচ্ছা, বলে ছুটতে চাইলো। এবার শিহাব সারাদিন তার উপর দিয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনার কিছুটা বলে হাসান সাহেবের কাছ থেকে ছুটতে চাইলো। 
দেখুন, আমি সারাদিন হাসপাতালে ছিলাম। আমার পরিবারের খুব কাছের একজন অসুস্থ। আমি সেই সকালে বেরিয়েছি। আমি খুবই ক্লান্ত এবং মানসিকভাবে আপসেট আছি।আমার বাসায় ফিরে রেস্ট নিতে হবে।
এবার হাসান সাহেব শিহাবের মনের অবস্থা বুঝলেন। যদিও শিহাব শায়লার প্রসংগে কিছুই বলেনি। 
ঠিক আছে, আপনি বাসায় গিয়ে রেস্ট করুন। আমি অতিথি বিদায় করে আপনার সাথে দেখা করে আসবো।শিহাব আচ্ছা,ধন্যবাদ, জানিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেলো। সিঁড়ির বাঁক ঘুরে উপরের সিঁড়িতে উঠতেই শিহাব দেখলো, বেগুনি রঙের শাড়ি পরা মেয়েটি  দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। এবং স্থির দৃষ্টিতে শিহাবের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। শিহাব তার দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে  নিজের ফ্ল্যাটের দিকে এগিয়ে গেলো।

রাহাত বেশ আগ্রহ নিয়ে নিজের ঘরের দিকে মোবাইল আনতে গেলেও বারবার কল করেও শিহাবের কোন সাড়া পাচ্ছে না। বারবার একই উত্তর আসছে।মোবাইলটি বন্ধ আছে । রাহাতের ভেতরে অস্থিরতা বাড়তে লাগলো। তবে কি অভিমান করে শিহাব ভাইয়া মোবাইল বন্ধ করে রেখেছে ? আপুর কাছে নিশ্চয়ই কানাডা থেকে নোমান ভাইয়া আসবার খবর জেনেছে । রাহাত বুঝতে পারছে না এখন সে কি করবে ? কিভাবে শিহাব ভাইয়ার ভুল ভাঙাবে। শিহাব ভাইয়ার বাসাওতো সে চেনে না। রাহাত নিজের ভুলে আজ নিজেই এমন বিপদে পড়েছে। নিজের উপর তার রাগ হচ্ছে।নিজের মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে। বুবলী উৎকন্ঠিত হয়ে রাহাতের কাছে শিহাবের রেস্পন্স জানতে চাইছে। কোন সাড়া না মেলাতে সে হতাশ হয়ে যাচ্ছে। বারবার এ ঘর ও ঘর করছে । বাড়ির অতিথিরা বহাল তবিয়তে চলাচল করছে। তারা বুঝতেও পারছে না ভেতরে কি ঘটে যাচ্ছে।
শিহাব চাবি দিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা খুলতেই ঘরের ভেতরের অন্ধকার  এক বিশালতা তাকে গ্রাস করলো।একটি ব্যথিত ভাঙা মন নিয়ে শিহাব ঘরে প্রবেশ করলো।শায়লার কথা মনে পড়তেই শিহাবের ভেতরটা হু হু করে উঠলো।  অজান্তেই তার চোখ দুটো জলে ভরে গেলো।ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে সারারাত একাকীত্বের দুঃসহ অনুভবে কাটাতে হবে, এমনি ভাবনায় মনটা ভারী হয়ে উঠলো। ড্রইং রুমের বাতি জ্বালিয়ে সে বেড রুমে ঢুকলো। খাটের সাইড টেবিলে হাত থেকে বাইকের চাবি হেলমেট আর মোবাইল নামিয়ে রাখলো। তার ঘরটি শুন্য। আজ শিহাবের ঘরে শায়লাকে নিয়ে আসবে এমনটি আশা নিয়েই সকালে বেরিয়েছিল। নিয়তি সেটা হতে দেয়নি। যদি শায়লার স্বামী তার জোর দাবী খাটিয়ে শায়লাকে তার করে নেয় তবেতো তার আর কোন আশাই থাকবে না  সবরকম দুরাশায় তার
মনটা অস্থির হয়ে উঠলো। 
শিহাবের কাপড় বদলাতেও ইচ্ছে করছে না।কিন্তু সারাটাদিন এক কাপড়ে।নিজের দিকে তাকিয়ে শিহাব ভাবলো তার চেঞ্জ দরকার।সে অনিচ্ছাতে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেলো। দীর্ঘ সময় নিয়ে নিজেকে ফ্রেশ করে শিহাব বেডরুমে দাঁড়াতেই দরজায় কলিং বেল বেজে উঠলো। শিহাব দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো, রাত সাড়ে এগারোটা। সে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলতেই  দেখলো বিশাল এক ট্রে নিয়ে বিল্লাল দাঁড়িয়ে। নানান খাবারে ভরপুর করে ট্রে সাজিয়ে হাসান সাহেব মুখে একরাশ হাসির সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ভেতরে আসতে পারি ? বলেই হাসান সাহেব তার এক পা শিহাবের ঘরের দিকে বাড়িয়ে দিলো। শিহাব বুঝতে পারলো, আজ মনে হয় আর এর হাত থেকে তার নিস্তার নেই।
চলবে....

কবি লুৎফুর রহমান চৌধুরী কবিতা "পহেলা বৈশাখ"




পহেলা বৈশাখ 
লুৎফুর রহমান চৌধুরী
( ইংল্যান্ড ) 

পথের বাঁকে বসেছে মেলা
চলো সবাই যাই
আগের মতো মেলায় এখন
আনন্দ যে নাই।

হেঁটে হেঁটে দেখছি মেলা
খুঁজছি তোমায় আমি
তোমার সাথে দেখা হলে
কিনবো চুড়ি দামী।

লাল শাড়ির কথা তুমি
যেওনা ওগো ভুলে
মেলায় কিনে  দিয়েছিলাম
তোমার হাতে তুলে।

বৈশাখ এলেই মনে পড়ে
অতীতের স্মৃতি গুলো
দিনে দিনে সবকিছু
হয়ে যাচ্ছে এলোমেলো।

শাখা বরাক নদীর কথা
ভীষণ মনে পড়ে,
বৈশাখ এলে ইলিশ খেতে
ছুটে আসতে ঘরে।

খাতা পাতায় লিখতে তারিখ 
ভুলে যেতাম আমি
সবসময় পহেলা বৈশাখ মনে,
করিয়ে দিতে তুমি।

১৬ এপ্রিল ২০২২

মমতা রায় চৌধুরী এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৫৫





উপন্যাস 

টানাপোড়েন১৫৫
প্রাপ্তি
মমতা রায় চৌধুরী



মনের ভেতরে তখন রেখার চলছে তোলপাড় "কিভাবে দেখবে, কি বেশে দেখবে ,কেমন আছে
 ও ?ভালো আছে তো তার স্বপ্নের স্বপ্নীল?" বসে থাকতে থাকতেই প্রচণ্ড ঘাম দিচ্ছে শরীরে। 
মনোজ এসে বলল 'এই দেখো ছবি তুলেছি।'
তখন আর কোন কিছু রেখার  ভাল লাগছে না ।
"দেখ না ছবিগুলো দেখো?'
রেখা এমনভাবে মনোজের দিকে তাকালো। মনোজ ঘাবড়ে গিয়ে বলল
'তোমার এত ঘাম হচ্ছে কেন? শরীর খারাপ লাগছে? ঠিক আছো তুমি?'
রুমালটা ব্যাগ থেকে  রেখা হাতরে হাতরে বের করল।
"প্রেসার বাড়ে নি তো?'
"কে জানে?'
ইতিমধ্যে আয়োজকরা অনুষ্ঠান সূচি ঘোষণা করছেন।
মনোজ কাছেপিঠের আয়োজকদের দু একজনকে ডেকে বলল 'ঠান্ডা জল দিন না।'
একজন এগিয়ে এসে বললেন 'কি হয়েছে ম্যাডাম? ঠিক আছেন?'
অন্য একজন কথা বলছিলেন' আশা' পত্রিকার সম্পাদক কে এসে বললেন সাহিত্যিক স্বপ্নীল স্যার হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাই উনি আজ আসতে পারবেন না বলে দুঃখ প্রকাশ করেছেন উনার সেক্রেটারি।'
'রেখার কানে কথাটা যেতেই রেখা যেন আরো অস্থির হয়ে উঠলো।'
মাথাটা বন বন করে ঘুরতে লাগলো। পায়ের তলার মাটি সরে যেতে লাগলো।
'কি হলো স্বপ্নীলের?
খুব বেশি বাড়াবাড়ি হয়নি তো? কি করে জানতে পারবে সব ঘটনা?'
একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছিল 
রেখার ।আগে থেকেই ভেবেছিল আজকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবে বলে। কিভাবে দেখবে? কিভাবে কথা শুরু করবে ?আদৌ কোনো কথা হবে কিনা আবার এর মধ্যে  অন্য ঘটনা। আর পারছি না?"
'কি পারছো না ?কি কষ্ট হচ্ছে বলো?'
'আশা' পত্রিকার সম্পাদক বলেন আজকের দিনটা আদপেও মনে হচ্ছে ভালো নয়।'
উদ্যোক্তাদের আরেকজন সম্পাদক মহাশয় কে সান্তনা দিলেন, বললেন
',না, না দাদা এরকম ভাবছেন কেন ? এরকম হতেই পারে এক্সিডেন্টলি।
দেখুন না আবার লেখিকা রেখা, তিনিও তো অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
'হ্যাঁ ওনাকে একটু ভেতরে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসুন তো?'
হ্যাঁ যাচ্ছি দাদা। একদম ঘাবড়াবেন না অন্য সাহিত্যিকরা এসে গেছেন।
দর্শকদের কাছে সাহিত্যিক স্বপনীলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে নিন আর উনার সুস্থতা কামনা করুন।'
"একদম ঠিক বলেছেন।
অনুষ্ঠান তো শুরু করতেই হবে না দাদা?'
"একদমই তাই।'
'ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি। ওদিকে ম্যাডামের খবর নিচ্ছি আর আপনি এদিকে এনাউন্স করুন।'
সম্পাদক মহাশয় এনাউন্স শুরু করে দিলেন উনাদের বার্ষিক সম্মেলন । এইদিনেইপত্রিকার যাত্রা শুরু হয়েছিল  গুটিগুটি পায়ে। আজকে এই পত্রিকা এগিয়ে চলেছে সমস্ত সাহিত্য পিপাসু পাঠকদের মনের চাহিদা মিটিয়ে।
কিন্তু যে সমস্ত সাহিত্যিকদের নিয়ে আজকের এই চাঁদের হাট বসার কথা ছিল এই অনুষ্ঠানকে আরো উজ্জ্বল করে তোলার মূলে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে সাহিত্যিক স্বপ্নীল আসতে পারেন নি উনি হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ।সেজন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করছি এবং উনার সুস্থতা কামনা করছি।
প্রথমে আজকের অনুষ্ঠানে অতিথিবরণের মধ্যে দিয়ে সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান শুরু হবে।
যাদের পেয়েছি তারা হলেন সাহিত্যিক রেখা চৌধুরী ,সাহিত্যিক অয়ন চক্রবর্তী,সাহিত্যিক, দেবার্ঘ্য পাল।'
এই বলে অনুষ্ঠান সূচনা শুরু করলেন সম্পাদক মহাশয়।
সাহিত্যিকদের  বরণ হয়ে গেলে লেখিকা রেখা চৌধুরীকে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করলেন।
রেখার নাম ঘোষণা হতেই যেন ভেতরে ভেতরে আরো পাল পিটিশন বেড়ে গেল।
সাহিত্যিক রেখা চৌধুরী বেশ কয়েকটি উপন্যাস কাব্য ,গল্প ,আজকের সাহিত্য জগতে সাড়া ফেলে দিয়েছেন। উনি আটপৌরে মধ্যবিত্ত সমাজ জীবনের জীবনধারা নিয়ে লিখছেন । উনার জনপ্রিয় কবিতাটি যার জন্য ''আশা' পত্রিকা আরো একধাপ এগিয়ে গেছে, তার নাম হচ্ছে 'আশায়  বুক বাঁধি '।দৈনন্দিন মানুষের জীবনের ঘটনা সেগুলো ছাপ ফেলে যাচ্ছে।
কবিতাটি উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে।  লেখিকাকে একরাশ শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
রেখা হল ভর্তি অগণের দর্শনের  মাঝখানে
স্মারক সম্মান, ও ফুলেল শুভেচ্ছা এতটাই আপ্লুত অভিভূত যে আজকে লেখিকার মুখে ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। তবুও যে যা জিজ্ঞাসা করেছে,তার যথাযোগ্য উত্তর দেবার চেষ্টা করেছে।
আগামীতে আরো ভালো কিছু দর্শকদের জন্য পাঠকদের জন্য উপহার দিতে পারবে সেই প্রতিশ্রুতি ও দিয়েছে।
সংবাদমাধ্যম ক্যামেরার সামনে আজকে রেখা কে একটু সত্যি নার্ভাস মনে হয়েছিল।
একরাশ ভালোবাসা আর শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন হৃদয় ভর্তির টাটকা অক্সিজেন নিয়ে বাড়ি ফিরছেরেখা।
মাঝে রিম্পাদির অনুরোধকে উপেক্ষা করতে পারল না। স্টেজ থেকে নেমে রিম্পাদিকে জড়িয়ে ধরে আরো বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেছিল রিম্পা দি রেখা কে বলেছিল' আমি জানতাম তোর এরকম দিন আসবে  তুই যদি আরো অনেক আগে থেকেই চেষ্টা করলে সাহিত্যাকাশে বোধহয় আরো আগেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারতিস।'
রেখা রিম্পাদির বুকে মাথা রেখে সম্মতি জানায়।
রিম্পা দি যেন রেখার এক নিরাপদ ভালোলাগার আশ্রয়, যেখানে নির্দ্বিধায় সবকিছু ভরসা করা যায়।
মনোজ বললো 'হয়েছে তোমাদের? দিদি বোনের সোহাগ ভালবাসা।'
রিম্পা দির চোখে জল, রেখার চোখে আনন্দ অশ্রু।
রিম্পা দি বললো ' আর দেরি করা না, তোদের আবার ফিরতে হবে ।চল খেয়ে নিবি।'
রেখা বলল' এখানে অনেক কিছু খাইয়েছে।'
'আমি জানি কি খাইয়েছে। ভাত তো খাস নি।'
মনোজ রিম্পা দির  বাড়ি এই প্রথম আসলো রেখা যদিও  আগে এসেছে।
"বাববা রিম্পা দি যা খাবার আয়োজন করেছে এলাহি ব্যাপার।"
মনোজ বলেছেন' কি করেছেন দিদি আপনি?'
কি করেছি ভাই?'
'পোলাও, সাদা ভাত, কাতলা মাছের কালিয়া, মটন, চাটনি, পাপড়, মিষ্টি, দই, আর কি চাই এ তো বিয়ে বাড়ির খাওয়া দাওয়া?'
রেখা বললো 'মেয়ের বিয়েতে কি আমরা কিছু খাব না নাকি গো?'
রিম্পা দি হেসে বলল 'সে কবে খাবে, সে ততদিনে হজম হয়ে যাবে। তাছাড়া আজকালকার মেয়ে কি করবে বাবা মায়ের ইচ্ছেতে বিয়ে । না নিজে পছন্দ করে বিয়ে করবে? জানাবে কি ,জানাবে
 না ।সেটাও তো অনেকটা নির্ভর করছে না?'
মনোজ  বলল' আমাদের মেয়ে ওরকম নয়।'
রিম্পা দি বলল' তুমি ওকে চেনো?'
রেখা বললো "ভাগ্যিস ও নেই কাছে।'
"হ্যাঁ তাইতো ওকে তো দেখতে পাচ্ছি না 
দিদি ?'মনোজ বললো।
'আজকে ওর একটা এক্সাম আছে কোচিং সেন্টারে ।সেখানে গেছে।'
মনোজ বলল 'ওর গিফটা দিয়েছো।'
জিভ কেটে বলে 'ভাগ্যিস মনে করালে, ভুলেই গেছি?'
রিম্পা দি বলল' কি রে?'
'ও চকলেট খেতে ভালোবাসে তো ওর জন্য ক্যাডবেরি সেলিব্রেশন আছে। ওকে দিয়ে দিও। সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগ থেকে বের করে রিম্পা দির হাতে দিল  রেখা।'
রিম্পাদি বলে' ও কি এখন ছোট আছে?  এসব কেন করিস?'
মনোজ ,রেখা দুজনই বলল' ও আমাদের কাছে ছোটই আছে ।তাছাড়া  আমরা কি দেব, না দেব তুমি এ ব্যাপারে একটা কথাও বলবে না।'
রিম্পা দি বললো, সেই তো যা জেদি হয়ে যাচ্ছে না ,যদি থাকতিস কাছে বুঝতে পারতিস?'
'এসময়টা একটু হবে জানো রিম্পা দি' রেখা বলল।
মনোজ বলল হ্যাঁ, এডোলেসন পিরিয়ড চলছে তো।'
রেখা বলে 'এই সময় ওর কিছু জিনিসকে যেমন সাপোর্ট করতে হবে। আবার কিছু জিনিস কে ওকে ভালো করে বুঝিয়ে বলতে হবে ।সব সময় বকাঝকা করো না। ওর সাইকোলজিটা বুঝে চলবে।'
"সেই চিন্তাতেই তো সব সময় থাকি রে।'
মনোজ বললো 'আমি উঠতে পারছি না এত খাইয়ে দিলেন রিম্পা দি ।এবার কি করে যাব বলুন তো?"
রিম্পা দি বলল' যাবার কি দরকার একটা দুটো দিন তো থাকতে পারো দিদির বাড়িতে?'
মনোজ বললো 'সেতো পারি কিন্তু আমার বাড়িতে যে আবার কিছু সৈন্য আছে, তাদের দেখভাল তাদের খাওয়া দাওয়া এসবের জন্য তো কোথাও যেতে পারি না ।গেলেও থাকা যায় না।'
সেদিন ওর কাকার বাড়িতে এত করে থাকতে বলল তাও থাকতে পারলাম না ,শুধু ওদের জন্য।
রিম্পা দি বললো' তোরা কিন্তু মায়ার বাঁধনে পড়ে আছিস।'

মনোজ   বলল 'একবারও মাসিকে ফোন করেছো'?
রেখা জিভ কেটে বলল 'একদম ভুলে গেছি গো সরি ,সরি।'
এক্ষুনি করছি, রেখা তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে মাসিকে ফোন লাগালো।
রিং হয়ে যাচ্ছে। মাসি এসে ফোনটা রিসিভ করে বলল" হ্যালো'।
মাসি," কি করছো?'
"এইতো কাজগুলো একটু গোছাচ্ছি গো বৌমা.।'
"বাচ্চাগুলো সব খেয়েছে?'
"হ্যাঁ খেয়েছে '।
'কি করছে ওরা?"
'ওরা এখন ঘুমোচ্ছে?'
তুমি খেয়েছ?
হ্যাঁ খেয়েছি।
'তোমরা কখন বেরোবে?'
'এইতো এক্ষুনি বেরোবো।'
"ঠিক আছে রাখছি।'
 ফোনটা রেখে রিম্পা দিকে বলল' এখন বেরিয়ে পড়তে হবে আর দেরি করলে হবে না।'
রিম্পা দি বললো' হ্যাঁ আর কি বলবো বল ?একটা দিন এসে থাকলে তাও হয়। তোরা হুটোপাটি করে আসিস আবার হুটোপাটি করে যাস।।'
"হ্যাঁ, অন্যদিন আসবো গো তোমরা যেও।
"আবার কবে দেখা হবে কে জানে ?'রিম্পা দি বললো।
"রেখা বললো ' খুব শিগগিরই দেখা হবে আমাদের কেন বলছে এরকম কথা?'
রেখা মনোজ রিম্পাদিকে হাত মেরে বিদায় জানালো। গাড়ি স্টার্ট করলো ।গাড়ি ছুটে চলেছে নিজের নিশানায়।
রেখার বুক জুড়ে তখন শুধুই প্রাপ্তির সম্মাননার আনন্দের উচ্ছ্বাস।

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৯১




ধারাবাহিক উপন্যাস 


শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৯১)
শামীমা আহমেদ 

বুবলীর কথা শুনে রাহাত বুঝে নিলো হয়তো  সবকিছু একটা সমাধানের দিকে যাচ্ছে। তবে   সে এখন খুব বুঝতে পারছে শিহাব ভাইয়ার সাথে তার এমনটা করা উচিত হইনি।শায়লা আপু আর শিহাব ভাইয়া তো তাকে সবই জানিয়েছিল। তখনই নোমান সাহেবকে রাহাতের ম্যানেজ করা উচিত ছিল। ছোট ভাই হয়ে আপুর জন্য এই কাজটি সে করেনি। আজ ঘটনাচক্রে এমন পরিস্থিতিতে পড়ে রাহাত ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেছে।  তার ভেতরে অপরাধবোধ কাজ করছে। কেমন করে সে শিহাব ভাইয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। রাহাত ভাবলো,তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। আর শায়লা আপুকে তা জানাতে হবে। শিহাব ভাইয়াকে সসন্মানে এই বাসায় আনতে হবে। শায়লা আপু শিহাব ভাইয়াকে বলে যেন  এই বিষয়টি সহজ করে দেয়। এখন রাহাতের সব ক্ষোভ গিয়ে পড়ছে রুহি খালার উপর। তার কথা শুনেই সবকিছু এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। সেতো সবসময়ই আপুর প্রতি কৃতজ্ঞ ছিল। আপুর সুখী হওয়াটাই যেখানে মূখ্য সেখানে অন্য কারো দ্বারা প্রভাবিত হওয়া ঠিক হয়নি। তাছাড়া আপুর পুরো বিয়ের বিষয়টিই এক বিরাট ভুল ছিল। অনভিজ্ঞ রাহাত তা একেবারেই বুঝে উঠতে পারেনি। সবাই যা বুঝিয়েছে তাই মেনে নিয়েছে।রাহাত ভাবলো,অন্তত বিয়ে সংক্রান্ত ব্যাপারে এরপর থেকে সে খুব বুঝে শুনে চলবে। 
বুবলী  সারাটাক্ষন শায়লাকে প্রবোধ দিচ্ছে।
কিভাবে বিষয়টিকে একটা সুষ্ঠু সমাধানে আনা যায় তার একটা উপায় খুঁজছে।
আর শায়লা আপুর জন্য যেন শায়লার মা মানে তার ফুফু যেন দুশ্চিন্তা না করে তা বারবার বুঝাতে চেষ্টা  করছে। তবে এত বড় একটা আঘাত শায়লাকে নিশ্চুপ করে দিয়েছে। শিহাবের প্রতি তার আকুলতা থাকলেও এখন কিভাবে তা শিহাবকে সব জানাবে ? যেখানে শিহাব বারবার রাহাতকে বুঝিয়েছে। রাহাত কেবলি উল্টো স্রোতে বয়ে চলছিল।
শায়লা ঘড়িতে সময় দেখে নিলো।সন্ধ্যা ছয়টা। নিশ্চয়ই  আরাফ এতক্ষণে একটু সুস্থ হয়েছে।পরিবারের সবাই নিশ্চয়ই ওকে ঘিরে আছে। তাহলে কেমন করে সে আরাফের অবস্থা  জানবে ? তবুও শায়লা ভাবলো, আরাফের অবস্থা জানতে একটা মেসেজ দিয়ে রাখি।
শায়লা মোবাইল হাতে নিতেই  রাহাত মায়ের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালো। সে কিছু একটা বলতে চাইছে। কিন্তু শায়লার চোখে চোখ ফেলতে চাইছে না। বুবলী দরজার কাছে এগিয়ে গেলো, কিছু বলবে রাহাত ভাইয়া ? 
হ্যাঁ,মানে আমি আপুর সাথে একটু কথা বলতে চাইছিলাম।
শায়লা বুঝে নিলো সে কি বলতে চাইছে। এ ব্যাপারে সে নিজেকে বেশ শক্ত করে রাখলো। বুবলী পরিস্থিতিটা বুঝতে পারলো। সে বুঝতে পারলো, ভাইবোনের এই শীতল সম্পর্কের বরফ গলতে না দিলে সবদিকে আরো ঝামেলা হয়ে যাবে। বুবলী তাই সমাধানের জন্য এগিয়ে গেলো। সে শায়লাকে বুঝাতে লাগলো, আপু,মানুষ মাত্রই ভুল করে। তুমি রাহাত ভাইয়ার ভুলের জন্য ক্ষমা করে দাও। 
ভুল ? শায়লার মধ্যে যেন বারুদ স্ফুলিঙ্গের মত বিস্ফোরণ ঘটলো ! যদিও সে নিজের ভেতরেই তার সবটুকু রেখে দিল আর মনে মনে ভাবলো,যারা নিজেদের স্বার্থে
অন্যের কথায় প্রভাবিত হয় তারা ভুল করে না। আর যারা কথা দিয়ে কথা রাখেনা তারা যে অন্যের সুখ চায় না সেটা স্পষ্ট। 
শায়লার এমন অভিব্যক্তিতে  রাহাত যেন চুপসে গেলো। সে তার নিজের ঘরে গিয়ে ভাবনায় ডুবে রইল।

বিকেল সন্ধ্যা নাগাদ সুমাইয়া তার দুই সন্তান সুনায়রা আর আরুশকে নিয়ে হাসপাতালে এলো। সাথে  আরাফের খেলনাপাতি আর অনেক নাস্তার ব্যাগপত্র। রুবিনা আর  শিহাবের কথা ভেবে সুমাইয়া সব গুছিয়ে এনেছে। আসলে  সুমাইয়া চাইছে যতভাবে শিহাবকে আটকে রাখা যায় আর রুবিনার সাথে একটা বোঝাপড়া করিয়ে নেয়া যায়।
যদিও ওরা দুজনেই দুজনের মনোভাব বুঝে নিয়েছে। কিন্তু সুমাইয়া সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যেন এবার শিহাব যেন একটা সিদ্ধান্তে  আসে।তার পক্ষে নিজের সংসার, শ্বশুর শাশুড়ী, নিজের সন্তানদের দেখাশুনা  করা আরাফের খেয়াল রাখা খুবই হেকটিক হয়ে যাচ্ছিল। নিজের মামাতো বোন এক বাড়িতে এলে আরাফকে নিয়ে আর ভাবতে হতো না। 
আরাফের কেবিনে ঢুকতেই সুনায়রা আর আরুশকে দেখে আরাফ একেবারে সুস্থ হয়ে  বিছানায় উঠে বসলো। তারা খেলনা দিয়ে খেলার আনন্দে মেতে উঠলো ! 

বুবলী শায়লাকে একটু স্বাভাবিক করতে মায়ের ঘর থেকে  শায়লাকে তার নিজের রুমে নিয়ে এলো। প্রায় দুইদিন পর শায়লা নিজের ঘরে ঢুকল। ঘরে ঢুকে শায়লা চারিদিকে তাকিয়ে দেখলো ঘরটি পরিপাটি করে গোছানো হয়েছে। খাটের পাশে সুন্দর একটি সাইড টেবিলে একটি ল্যাম্প শেড,সুন্দর কারুকাজের একটি ফুলদানীতে এক গোছা রজনীগন্ধা সুবাস ছড়াচ্ছে। জানালায় নতুন পর্দা,বিছানায় মখমলি চাদর। ড্রেসিং টেবিলে নানান প্রসাধনীতে সাজানো। শায়লা বেশ অবাক হলো,কবে এসব তৈরি করা হলো ? রাহাত তাহলে এই বিয়ের জন্য ভালোই প্রস্তুতি নিয়েছে। শায়লা বুঝলো, রাহাত এখন কেনাকাটায় বেশ এক্সপার্ট হয়েছে ? কিন্তু একটা সময় সব কিছুর জন্য তার কাছেই আবদার থাকতো।  শায়লা দেখলো,নতুন বরের জন্য বিয়ের যাবতীয় কেনাকাটা এই ঘরেই রাখা হয়েছে ।  শায়লার হলুদ সাজের সবকিছু শুধু সময়ের জন্য অপেক্ষায় ছিল।নোমান সাহেব  এলে হয়তো এতক্ষনে তাকে হলুদ সাজে সাজতে  হতো। শায়লার শিহাবের কথা খুব মনে পড়ছে।  জানালা দিয়ে বাড়ির লাইটিং দেখা যাচ্ছে।লাল নীল হলুদ নানা রঙের  ছোট ছোট বাতি জ্বলছে আর নিভছে। ছাদে হলুদের স্টেজ বানানো হচ্ছে। একটু পর এই ঘর সাজানো হবে। রাহাতের এমনি পরিকল্পনার কথা সে শুনেছে। সব দেখে শায়লা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। ভাগ্য তাকে নিয়ে বেশ খেলছে ! তবে এতে রাহাতের প্রতি তার সব অভিযোগ জমা হলো।  বুবলী ঘরের দরজা লাগিয়ে দিলো।বাড়িতে এখনো বিয়ে বাড়ির লোকজন বর্তমান। তারা কিছুই বুঝতে পারছে না কি ঘটতে যাচ্ছে। 
শায়লা যেন শিহাবকে সব ঘটনা খুলে বলে বুবলী ইনিয়ে বিনিয়ে একথাটাই বুঝাতে চাইছে। কিন্তু শায়লা এ ব্যাপারে  একদম অনড় হয়ে আছে। তবে হ্যাঁ, শিহাব যদি স্বেচ্ছায় তার খবর জানতে চায় তবে সে আর কিছুই লুকাবে  না।শায়লা শিহাবকে খুব ভালো করেই জানে। কিন্তু বেশ অনেকক্ষন  হলো, শিহাব তার সাথে কোন  যোগাযোগে নাই। হয়তো সে আমাকে নিয়ে এদিকের অন্যরকম আয়োজনের কথা ভাবছে। শায়লার নিজের কাছে নিজেকে খুব বোঝা মনে হলো।
সুনায়রা, আরুশ আর আরাফ রাত নয়টা পর্যন্ত খেলায় ডুবে রইল।সুমাইয়া, শিহাব আর রুবিনা নানান গল্পে মেতে রইল। গল্পের  বেশীর  ভাগই ছিল আরাফ আর আরাফের সারাদিনের নানান কর্মকাণ্ড, সুন্দর সুন্দর কথা,দুষ্টুমি এইসব নিয়ে। রাত হয়ে যাওয়াতে সুমাইয়া বাচ্চাদের নিয়ে বাসায় ফিরতে চাইলো। আর রুবিনাকে বড় বোনের নির্দেশ রেখে গেলো, সে যেন আজ রাতটা আরাফের সাথেই থাকে। শিহাব যা বুঝার তা বুঝে নিলো। কিন্তু ভাবীর এত পরিকল্পনা  যে তার কাছে ধোপে টিকবে না সেটা আর ভাবীকে বুঝতে দেয়া হলো না। 
বাসার দারোয়ান চাচাকে দিয়ে তোমাদের আর আরাফের  খাবার পাঠিয়ে দিবো। তোমরা আরাফকে যত্ন করে খাইয়ে দিও। আর তোমরাও খেয়ে নিও। সারারাত দুজন গল্প করে কাটিয়ে দিও। হাসপাতাল ছাড়ার আগে সুমাইয়া শিহাবকে এমনি আদেশ রেখে গেলো। রুবিনা এতে সম্মতি দিলেও শিহাব নিরুত্তর রইল। 
শিহাবের নিরুত্তরে তার এতে সম্মতি আছে রুবিনা যেন এমনটি না ভাবে তাই শিহাব রুবিনকে স্পষ্ট করেই জানালো, রুবিনা,
আপনি আমার সন্তানের জন্য অনেকখানি ভেবেছেন, অনেক সময় দিচ্ছেন। আমি আপনার এই ঋণ যদি কখনো শোধরাবার সুযোগ হয় তা করবো। না হয় আজীবন  ঋণী থাকবো। যদি আপনার ক্ষমা মেলে তা আমার সৌভাগ্য ভেবে নিবো। কিন্তু আপনি আর ভাবী যা ভাবছেন তা কোনদিন হবার নয়।আপনি মিছে কোন স্বপ্ন দেখুন তা আমি চাইনা। শুধু অনুরোধ আজ রাতটা আপনি আরাফের সাথে থাকুন। কারণ আমি একজনের অপেক্ষায় আছি। সেও আমার পথপানে চেয়ে আছে। আমাকে তার কাছে ফিরতে  হবে। আমি আজ খুব সকালে বাসা থেকে বের হয়েছি। আমাকে বাসায় ফিরতে  হবে। সারাদিন এক পোষাকে আছি। তাছাড়া মোবাইলেও একেবারেই চার্জ নেই। আমি সকালেই আবার চলে আসব। আমার মাকে কল দিয়ে আসতে বলছি।আপনার সাথে থাকবে। আশা করি আপনি আমাকে  ভুল বুঝবেন না। রুবিনা একেবারে নিষ্প্রাণ হয়ে বসে রইল। শিহাব মাকে কল করে, আরাফকে আদর দিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো। আরাফ রুবি আন্টিকে পেয়ে  বাবাকে হাসিমুখে বিদায় জানালো। 
বেরুনোর আগে শিহাব মনে মনে ভেবে নিলো শায়লাকে পেতে যে করেই হউক শেষ চেষ্টাটি সে করবে। হাসপাতালের ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে নয়টা বাজছে। শিহাব উত্তরার উদ্দেশ্য বাইকে স্টার্ট দিলো।


চলবে...

কবি নওশাদ আলম এর কবিতা "জ্ঞান-ভিখারি"




জ্ঞান-ভিখারি 
নওশাদ আলম

ভিখারির থালা হাতে নিয়ে ঘুরবো জ্ঞানীর তরে,
জ্ঞান-ভিক্ষা চাইবো ভুবনে, জ্ঞানীজনদের ঘরে।
লাজ-লজ্জা বিসর্জন দিবো মনের অন্তিম তটে,
সহানুভূতির ভিক্ষাগুলো ভরে নিবো নিজ ঘটে।

জ্ঞানের আবাদ করে চাষী, সাবলম্বী হবে জাতি,
আঁধারের হৃৎপিণ্ড চিবা'ত জ্ঞানের জ্বলন্ত বাতি।
রাষ্ট্রের সম্মান পুনরুদ্ধারে, অতন্দ্র প্রহরী হবো,
হৃৎপাত্রে সমীরণ জমিয়ে জ্ঞানীর সন্ধানে যাবো।

জ্ঞানের ক্ষুধায় উন্মাদ যে, চলে এসো এই দলে,
একমুঠো জ্ঞান চাইবো ভিক্ষা কতই'না কৌশলে।
আত্মতৃপ্তির আকাঙ্ক্ষাতে উঠিনি'ত মেতে আমি,
জ্ঞানশূন্যের হাতে স্বাধিকা হয়েছে বড় আসামি।

সঞ্চিত সব জ্ঞানের স্তুপ, বিলাবো দেশের মাঝে,
অজ্ঞের ঘটে জ্ঞান ঢুকাবো লাগাব উত্তম কাজে।
অপছন্দ পরিচ্ছদ অংশ ,হোক না সবার কাছে,
জ্ঞান উপার্জন চালু রাখি, ঘুরে জ্ঞানীদের পাছে।
 
জন্মভূমির আপদকালে, ভাসাবো সাহায্য তরী,
জ্ঞান-ভিখারি হয়ে জগতে যাযাবরে নেই জুড়ি।
জ্ঞান তৃষ্ণানায় কাতর হয়ে, পথে পথে যায় ঘুরে,
জ্ঞানের থালাটা হস্তে নিয়ে যাবো যে অচীনপুরে।

১৫ এপ্রিল ২০২২

মমতা রায় চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৫৪




উপন্যাস 

টানাপোড়েন ১৫৪
আবার হবে দেখা
মমতা রায় চৌধুরী




অবশেষে একটা স্বপ্ন সত্যি পূরণ হতে চলেছে। মনের ভিতরে একটা সুপ্ত ইচ্ছে ছিল লেখিকা হওয়ার। কিন্তু কখনো সাহস করে ভাবতে পারে নি যে তার লেখা কখনো ছেপে বেরোবে, ভাবতে পারে নি মানে, কিভাবে সেটা সম্ভব, সেটা বুঝে উঠতে পারে নি। এ বিষয়ে যথেষ্ট সাহায্য করেছে রিম্পা দি। অবশ্য এখন সম্পাদক মহাশয় যথেষ্ট উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছেন। ওনাদের কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। এটা তো ঠিক একটা লেখা কে আরো ভালো উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যেতে সম্পাদকের যথেষ্ট ভূমিকা থাকে। রেখা এসব ভাবছে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ।কালকেই একটা সম্মাননা প্রাপ্তি ।আর কি চাই?'
আজকে ঘুম আসছে না ।ভেতরে ভেতরে একটা উত্তেজনা কাজ করছে ।রক্তের ভেতরে যেন পারদের মত  উষ্ণতা বেড়ে চলেছে।
হঠাৎ মনোজ পাশ করে শুতে গিয়ে রেখাকে দেখছে আপন মনে বিড়বিড় করছে ওপরের দিকে তাকিয়ে। মনোজ প্রথমে কিছুটা ঘাবড়ে গেছিল অবাক হয়ে উঠে বসে রেখাকে ধাক্কা দিয়ে বলে 'অ্যাই তুমি এখনো ঘুমাও নি আর বিড়বিড় করে কি বলছো?"
রেখা বলল 'ঘুম আসছে না তো?'
'ও ঘুম না আসলে বুঝি বিড়বিড় করলে ঘুম আসবে  এটা আবার নতুন তোমার মেডিসিন
 নাকি? তোমার আবিষ্কার?'মনোজ হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে।
রেখা অবাক হয়ে বললো,' আমার ঘুম আসছে না 'তুমি হাসছো?'
মনোজ  হাসি থামিয়ে বললো 'ওয়েট ওয়েট, ওয়েট ,তাহলে কি বলবো বলো?'
রেখা খানিকক্ষণ নিরুত্তর থাকলো গাল ফুলিয়ে।
মনোজ বলল'কেন আজকে তো অনেকটা জার্নি করে এসেছ ,টায়ার্ড আছ।তবুও ঘুম আসছে না কেন?'
'জানিনা কালকের ওই ব্যাপারটা নিয়ে একটু টেন্সড, উত্তেজিত আছি। হয়তো সে কারণে।'
মনোজ ঘাড় নেড়ে বলে'হতে পারে।'
'তোমার একটু রিফ্রেশমেন্ট এর দরকার ।না ঘুমালে কালকে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তো ঝিমুবে।'
নাও নাও আজেবাজে চিন্তা না করে ঘুমানোর চেষ্টা করো।'
'আচ্ছা তুমি শোও আমার বুকে মাথা রেখে ।আমি তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি ।দেখো ,ঘুম পেয়ে যাবে।'
বলেই মনোজ রেখাকে বুকের কাছে নিয়ে আসে।
রেখা, কোন আপত্তি করে না। মনোজের বুকে মাথা রেখে ভাবতে থাকে মনোজকে বুঝে উঠতে পারে না কখনো এত দূর করে দেয় আবার কখনো এত কাছে টেনে নেয় ।কেন ?কেন ?কেন ?কেন এরকম করে? আমি ওকে নিয়ে সুখেই থাকতে চাই ।ভাবতে চাই ওকে নিয়েই। ওকে নিয়েই একটা জগৎ তৈরি করতে চাই কিন্তু সেটা তো হতে দেয় না ।ও আমার স্বপ্নের রঙিন প্রজাপতির ডানা ছেটে দেয়।'
এসব ভাবতে ভাবতেই রেখা কখন ঘুমিয়ে পড়ে? মনোজ আলতো করে ওর বুক থেকে রেখার মাথাটা বালিশে রাখে তারপর মনোজ সিগারেট ধরিয়ে জানলার কাছে দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকে।
'সে জীবনে কি চেয়েছে? সত্যিই কি সে সবকিছু পেয়েছে জীবনে? অতৃপ্তি কি বাসা বাঁধে নি।
রেখার মধ্যে সবকিছু থাকা সত্ত্বেও কেন রেখাকে পুরোপুরি ভালবাসতে পারে না ।চেষ্টা করে করে রেখাকে ভালোবাসার পরক্ষণেই রেখার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে।  মনোজ নিজেকে নিয়ে আত্মসমালোচনা করছে। কেন হয় তার ভেতরে ? কিছু কষ্ট আছে ?কি কষ্ট?'
আজকাল মনটাকে মানাতে হবে বলেই শুধু মানিয়ে নিতে হচ্ছে ।আজও কেন বিরহে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে থাকে ।কার জন্য ?কিন্তু যার জন্য তাকেও তো সে এখন মন থেকে ভালবাসতে পারে না ।সে তো চলে গেছে অনেক দূরে। তবুও প্রথম স্মৃতি কেন ভুলতে পারে না?'
তবুও তার কথার সুর আজও বাজে তার জীবনে।
এসব ভাবতে ভাবতেই কখন যেন রেখার ঘুম ভেঙ্গে গিয়ে তাকে বলে 'তুমি জানলার কাছে দাঁড়িয়ে কি করছ?'
মনোজের ভাবনায় ছেদ পড়ে। সবকিছুই মনে হয় এ ঘরের গভীরে কেমন যেন একটা নোনা ধরা শরীর ।একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে 'না এমনিই জানলার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম।'
'তুমি শোবে না?'
'হ্যাঁ ,তুমি শুয়ে পড়ো।'
রেখা আর কোন কথা না বলে  শুয়ে পড়ে।
আবার সেই কলিংবেলের আওয়াজে ঘুম ভাঙ্গে।
"জয় গনেশ, জয় গনেশ, জয় গনেশ দেবা।'
রেখা ধরফড় করে, উঠে পড়ে বিছানা থেকে।
হঠাৎ করে গভীর ঘুমটা ভাঙ্গায় বুকটা কেমন ধরফর করে ওঠে, গা হাত পা কাঁপতে থাকে।
নিজেকে সামলে নিয়ে রেখা দরজা খোলে।
"ও বৌমা, ঘুমাচ্ছিলে নাকি?'
'হ্যাঁ অনেক রাত্রে শুয়েছি তো?'
'সেইতো।'
"কখন বেরোবে তোমরা?'
'ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট করব ।বেরিয়ে যাবো।'
তার মাঝে একবার আমি তাহলে বাড়ি থেকে ঘুরে আসবো ।কাজগুলো তাড়াতাড়ি করে দিয়ে।
ও ,আবার বাড়ি যাবে?'
"আসলে নাতিটা রাত থেকে জ্বর তো বৌমা ডাক্তারের কাছে যাবে।'
"না ,সে তো ঠিকই তুমি তাড়াতাড়ি কাজ করে যাও  বেরিয়ে যাও ।আমরা বেরোনোর আগে চলে এসো মাসি।'
'সেটাই তো করবো , জানি না কি হবে।'
রেখা চটপট চা বানিয়ে মাসিকে দিল।
তারপর রুটি বানিয়ে নিল মিলিদের খাবারটাও বসিয়ে দিল। কারণ মাসি আজকে কখন আসতে পারবে, কি পারবে না?'
অন্তত খাবারটা  করা থাকলে কেউ না কেউ দিয়ে দিতে পারবে।'
'মাসি তুমি রুটি খেয়ে যাবে এখন?'
'না গো তুমি রেখে দাও  আমি পরে এসে খাবো।
আমার এখন তাড়া আছে।'
রেখা তাড়াতাড়ি বেডরুমের দিকে গেল 
মনোজকে ধাক্কা দিয়ে বলল 'কিগো তুমি কখন উঠবে? আজকে তাড়া আছে না ?তুমি পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছ?'
মনোজ ঘুমের চোখে বলে "কটা বাজে গো?'
'অনেক বাজে তুমি উঠে পড়ো, এই যে চা রইল।'
নিজেদের খাবারটাও ততক্ষণে হয়ে গেছে, গ্যাস থেকে নামিয়ে রেখে দিল। রেখা স্নান করতে ঢুকলো।
স্নান সেরে এসে গোপালের ভোগ চাপিয়ে মনোজকে ডাকতে গেল। দেখলে মনোজ উঠে পড়েছে। রেখাকে দেখে মনোজ বলল' তোমার স্নান হয়ে গেছে?'
'আজ্ঞে হ্যাঁ মশাই। আপনি উঠুন।'
'হ্যাঁ হ্যাঁ যাচ্ছি। টাওয়ালটা বাথরুমে আছে?'
রেখা ততক্ষণ নিজের ব্রেকফাস্ট টা নিয়ে খেয়ে নিল।'
আজ মনোজ বেরিয়ে রেখাকে খেতে দেখে অবাক হয়ে গেল।
"তুমি খেয়ে নিলে?'
'হ্যাঁ আজ। খেয়ে নিলাম।';;
'আজকে মাসির অনিশ্চয়তা রয়েছে।'
মনোজ অবাক হয়ে বলল 'সে কি?'
ঠিক আছে, তুমি আমার ব্রেকফাস্টে দিয়ে দাও খেয়ে নিচ্ছি তাড়াতাড়ি। ঘর থেকে  চেঁচিয়ে বলল 'আমার শর্ট প্যান্টটা কোথায় আছে?'
"আলনাতে আছে।'রেখা এঁটো প্লেট গোছাতে গোছাতে বলল।
সিঙ্কির তলায় বাসন গুলো রাখলো। মনোজের ব্রেকফাস্ট টেবিল এনে দিল।
"চিকেন রেজালা টা কেমন বানিয়েছে গো?"
'খুবই ভালো করেছে।'
'রায়দার হোটেলের নাম আছে জানো তো।"
রেখা বলল 'আমি তাহলে রেডি হয়ে নিই। তুমি খেয়ে নাও।'
 রেখা শাড়ি পরে রেডি হয়ে নিল।
রেখাকে  মুগ্ধ দৃষ্টিতে  মনোজ দেখতে লাগলো।
রেখা, চোখের সামনে হাত গুলো নাড়িয়ে বলল কি দেখছ?
'কি সুন্দর! লাগছে তোমায়। তাই দেখছি।'
'হ্যাঁ গো পার্থকে গাড়ির কথা বলেছ ?আমি তো বলতে ভুলে গেছি তোমাকে।'
"হ্যাঁ বলা আছে।'
"হ্যাঁগো মাসি আসবে তো?"
"হ্যাঁ ,হ্যাঁ মাসি আসবে চিন্তা ক'রো না।'
বলতে বলতেই কলিং বেলের আওয়াজ।
রেখা গিয়ে  দরজা খোলে ।
"সত্যি সত্যি মাসি এসেছে। মাসিকে দেখে রেখা ধরে প্রাণ ফিরে পায়।'
মাসি জুতো খুলতে খুলতে বলল" কিগো বৌমা চিন্তা করছিলে? আসবো কি আসবো না?'
রেখা বলল' তা অবশ্য ঠিকই বলেছ ?'
'ডাক্তার দেখালে?'
'বৌমা গেছে নিয়ে।'
মাসি যদি বাড়ি যেতে হয় তুমি তাহলে তালা  লাগিয়ে দিয়ে চাবি নিয়ে চলে যেও ।তারপর আবার এসো কিন্তু?তবে মিলিদের খাবারটা ঠিক টাইমে দিও।'
আচ্ছা।
'তোমার রুটি রাখা আছে আর ওখানে দেখবে পনির রেজালা রাখা আছে ।ওটা নিয়ে খেয়ে নিও।আর দুপুরের ভাত তোমার জন্য করে নিও কেমন? ফ্রিজে মাছ রাখা আছে। তুমি তোমার মত রান্না করে নিও।'
মনোজ রেখাকে তাড়া দিল 'এই চলো ,চলো, পার্থ ফোন করেছিল ।গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে ।"সত্যি সত্যি গাড়ির হর্ন বাজানোর আওয়াজ পাওয়া গেল বাইরে।
"ওই দেখো বলতে না বলতেই গাড়ি এসে গেছে।"
"হ্যাঁ, হ্যাঁ চলো। না হলে দেরি হয়ে যাবে।'
রেখা বললো 'মাসি আসছি দরজাটা লাগিয়ে দাও।'
মাসি এঁটো হাত ধুতে ধুতে বলল' এই যাই।'
গাড়িতে উঠতে যাবে তখন মিলির বাচ্চারা এসে ভিড় করল। ওদের আদর করতে করতে মাসিকে বলল' মাসি কয়টা বিস্কিট নিয়ে এসো।'
বিস্কিট ভেঙে খেতে দিল। ওরা খেতে 
থাকল ।রেখা গাড়িতে উঠলো। হাত নাড়িয়ে বিদায় জানালো।
মাসিও যথারীতি 'দুগ্গা ,দুগ্গা, দুগ্গা 'বলে দু 'হাত জড়ো করল। এরমধ্যেই রিম্পা দি ফোন।
রেখা ফোনটা রিসিভ করে বলল' হ্যাঁ ,বলো রিম্পা দি।'
'হ্যাঁ রে তোরা বেরিয়েছিস?'
"হ্যাঁ বেরিয়েছি।'
'সাবধানে আয়।'
এর মধ্যে গাড়িতে গান বাজতে থাকলো' এই শহর থেকে আরো অনেক দূরে, চলো কোথাও চলে যাই…।'
গাড়ি যথারীতি নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছালো।
ওখানে পৌঁছাতেই আয়োজক  উদ্যোক্তারা সাদর সম্ভাষণ জানালো।
সঙ্গে সঙ্গে কিছু সব ড্রিংক অফার করলো।
গেস্ট রুমে বসিয়ে দিল।
'বাহ কি সুন্দর স্টেজ করেছে গো বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে বেশ কয়েকজন কবি নাম যাদের সম্বর্ধিত করা হবে।'
মনোজ বললো' যাই একটু ছবি তুলে নিয়ে আসি।'
এরমধ্যেই' আশা'র সম্পাদক কাকে যেন বলছেন "এই দেখ কবি সাহিত্যিক স্বপ্নীল এসেছেন
 কিনা ?না আসলে তো অনুষ্ঠান শুরু করতে পারছি না।'
স্বপ্নীল নামটা কানে আসাতেই রেখা কেমন উদগ্রীব হয়ে উঠলো।'
পাশের ব্যক্তি বলছেন' উনি টাইম এর ব্যাপারে ভীষণ পাংচুয়াল  ।এখনো তো টাইম আছে।'
রেখার কাছে মনে হল যেন আবার স্মৃতির পাতায় জুড়তে আসছে শুধু স্বপ্নীল। একি সেই স্বপ্নীল?আবার কি নতুন করে দেখা হবে? শুরু হবে কি আবার জীবনের নতুন অধ্যায়? রেখার বুকের ভেতরটা কেমন ঢিপ ঢিপ করতে লাগলো।

কবি নাছিমা মিশু এর কবিতা "আধুনিক হালচাল"





আধুনিক হালচাল
নাছিমা মিশু

ঠিকাদারীতে ঠিকানা লাগে না
লাগে তাবেদারী।
জগত চিনিতে ভাব লাগে না
লাগে টাকা কড়ি।
আপনার জোস আপনার খোশ
আপনার ঢাকি আপনি দোলে।
সাধুত্ব পান্ডিত্যে
শুদ্ধ সাধুত্বে বৈরাগী বেশ
আত্মশুদ্ধি তথস্থ সবই বেশ।
হয়না নয়ন খুলতে সবই দেয় ধরা অন্তর দৃষ্ট অন্তলোকে।
বুক ফুলিয়ে ডিগবাজি ,চাপাতে জোর,নয়নে মিনতি
তনুতে বল হেমিলন ডঙ বংশিবাদক।
উচুঁতে সুর গভীর নিখাদ চিত্ত ফুরফুর চলে পাছে পাছে
ভক্তি সরসে -
বিশ্বাসী রঙ্গে হারিয়ে সঙ্গতি বিসর্জিত হয়,
শুদ্ধ সাধুত্বে আত্মশুদ্ধি তথস্হে।
জয় জয় ডঙ্কা রব রব কম্পন 
পূণ্য জনম পূর্ণ ধরম।
আধুনিক ঢঙে আধুনিক জীবন পাথেয়, 
শুদ্ধ সাধুত্ব আত্মবিশ্বাস তথাস্তু।

১৪ এপ্রিল ২০২২

কবি দেবব্রত সরকার এর কবিতা "পয়লা"




পয়লা 
দেবব্রত সরকার


সেদিন তোমায় মনে পড়ে
যেদিন তুমি আসো ঘরে
বাঙালিরাই আপন করে
পয়লা কথা বুকে ধরে
বৈশাখের ওই গন্ধ ছুড়ে
ওঠো তুমি বছর ফুঁড়ে
ভালোবাসার আঁচল ছুঁয়ে
রঙবে রঙের জীবন ধুয়ে

প্রতিদিন পয়লা জীবন
এই খেলা রিপুর বাঁধন

শেষেতে একটু খানি কথা
ভুলে যাও অশ্রু তিক্ত ব্যথা
নতুন কাজের সঙ্গ ধরে
সব ভালো হোক দুঃখ ভুলে ।