২৯ ডিসেম্বর ২০২১

রুকসানা রহমান





গেঁথেছো সকল মগ্নতা


ভেঁজা রোদের ছায়া ধরে ফিরে যাওয়া ক্লান্ত দুপুরের
রাত্তি কি জানে, মমতা স্পর্শ পাগল খেলার ছায়ার
হৃদয়ে তুমি-আমি মেপে -মেপে পথ চলার ছন্দে
চোখস্মৃতি ভালোবাসার আনাগোনা।

তবে কি আজও সময়ের হাতে হয়তো রাখা হয়নি হাত
শরীরের ভাঁজে আটকে থাকা নীল খাম
জীবন মেপে দেয় অপেক্ষা...

অন্ধকারে শুনি ওষ্ঠের নিপুণ কথার উপচে পড়া ঢেউ
স্নানের বাথটবে বিষাদ নগ্নতায় বকুল ভাসে মোহরাত  জীবনের বুকে অনুভব রাতজাগা স্বপ্নের ঘর।

এভাবেই মাখামাখি হোক হাওয়ার স্পর্শে
নির্ভুল সংলাপে সত্যি - মিথ্যের মিলনের রথে
ফসলের মাঠ ইচ্ছার ব্রতের সাঁকো পেরিয়ে
উল্লাসে মাখামাখি লাঙ্গলের ফলায়
গেঁথেছো সকল মগ্নতা...

রাবেয়া পারভীন/৩য় পর্ব




দুরের বাঁশি 
রাবেয়া পারভীন
(৩য় পর্ব)


সৌন্দর্য  এবং ব্যাক্তিত্ব এই দুয়ের সংমিশ্রণ শুভকে  ভিষন আকর্ষনীয়  করে তুলেছিল  লাবন্যর কাছে । প্রতিটিক্ষন  মনের চোখ দিয়ে খুঁটিয়ে খু্টিয়ে  দেখত  আর মুগ্ধ  হতো। শুভ কথাবার্তায় বেশ সাবলীল। যা বলে খুবি সহজ ভঙ্গিতে। তাই খুব সহজেই  সে বলল কথাটা।  
- লাবন্য  আপনাকে  মিস করছি 
একটু পরেই আবার বলল
- আচ্ছা  আমরা একে অপরকে  তুমি করে বলতে পারিনা ?  
ভেতরে ভেতরে ভিষন  চমকালো  লাবন্য । শুভ কি  তাহলে লাবন্যর  দূর্বলতাটা  টের পেয়ে গেছে ?   নাকি নিজের ভালোলাগার কথা বলছে ?
তবুও   নিজেকে সামলে নিয়ে  লাবন্য  বলে
- কেন  আপনি তে কি সমস্যা ?
- সমস্যা  আছে তো  কেমন জানি দুর দুর মনে হয়। 
এটাই চাইছিল সে  কিন্তু বলতে পারছিলনা । হেসে বলল -ঠিক আছে  তাহলে তুমি হলে   তুমি । লাবন্যর বলার ভঙ্গিতে এবার শুভও হেসে ফেলে। বলে
- একদম। এই কথাটাই বলতে চাইছিলাম ।
তারপর  দুজনেই হাসে।  হঠাৎ  কোথা থেকে যেন একটা সুখের দমকা বাতাস এসে  মাতাল করে দেয় লাবন্যকে। আপন মনে বার বার বলে  
- আমার স্বপ্নের রাজকুমার। আমি তোমাকে পেয়েছি । তোমাকে ভেবে কতরাত  নির্ঘুম কেটেছে আমার। সেই তুমি আজ এলে। লাবন্যর। একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরে চুমু খায় শুভ। লাবন্যকে  বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলে
- এখন থেকে আর কোন রাত তোমাকে একা থাকতে দেবনা আমি। সারাক্ষন ছায়ার মত  তোমার পাশেই থাকবো আর তোমাকে ভালোবাসায় ভরিয়ে দেব।


চলবে...

খাদিজা





প্রেম আমার
 

মহাসাগরের গভীরতার মতো তোমার প্রেমে আমি ডুবতে থাকি-
নিজেকে হারিয়ে ফেলি, 
বসরাই গোলাপের সুগন্ধি আমায় টানে না, 
না গালিবের গজল-
আমি ডুবতে থাকি। 

তোমাকে হারাবার বেদনা যখন অসহনীয় বিষাদের গর্ত, 
যুদ্ধক্ষেত্রে কেটে যাওয়া হাতের মতো।
আকাশের নীলে আমি ভেসে যাই-
ভাসতে থাকি কোন অজানার পানে ;
পরিযায়ী পাখিদের মতো -
নিজেকে হারাই। 

উজল রবির প্রভায় আমি দগ্ধ হই না-
ফসল তোলার পরে খড়কুটো পুড়িয়ে দেবার মতো, 
হৃদয়ের গহীনে থাকা সূর্যটা আমায় পোড়ায় অনুক্ষণ-
আমি মরতে থাকি। 

অতঃপর এক মধুর লগনে তুমি আমার হলে-
সাগরের গভীর হতে তুলে নিলে,
আকাশের নিলীমা হতে খুঁজে নিলে, 
ঠাঁই দিলে প্রেমের দেউলে,
বুকে চেপে ধরে বেলোয়ারি রাগে ভাসালে, 
ওষ্ঠাধর ছুঁয়ে দিলে ভীরু কপোতীর গালে-
বাঁচালে আমায় !

শান্তা কামালী/৫২ পর্ব




বনফুল
(৫২ পর্ব ) 
শান্তা কামালী

মনিরুজ্জামান কিছু দাবিদাওয়া করেননি বলে অলিউর রহমান কিছু দিবেন না তা আবার হয় নাকি!  ওনার একমাত্র ছেলে বলে কথা.... 
অহনাদের বাসায় আসার সময় গাড়িতে আধমন মিষ্টি নিয়ে এসেছেন। অহনাদের বাসায় সামান্য চা নাস্তা খেয়ে বেরিয়ে ড্রাইভারকে বললেন  নিউমার্কেটে যাওয়ার জন্য। মনিরুজ্জামান যতই বলুক কোনো দাবিদাওয়া নেই। সৈকত যে ওনার একমাত্র ছেলে....। অলিউর রহমান বেশ ক'টা দোকান ঘুরে একটা স্বর্ণের সেট পছন্দ করলেন বার বড়ি সামথিং  কার্ড দিলেন... । 
পেমেন্ট বুঝে নিয়ে স্বর্ণ প্যাকেট করে দিলেন দোকানদার। 
অলিউর রহমান সোজা বাসায় চলে আসলেন। সরাসরি স্ত্রী রাহেলা খাতুনের ঘরে ঢুকে প্যাকেট খুলে জিনিস দেখাতেই রাহেলা খাতুন স্বামীর প্রতি খুব খুশি হলেন।কিন্তু দুজনের কেউই এই বিষয় টা কাউকে বললেন না। 
 সৈকত রাতে মাকে খাবার এবং ঔষধ খাইয়ে,বাবাকে নিয়ে  বসে রাতের খাওয়া শেষ করলো।
তারপর  নিজের রুমে এসে মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলো অহনা ওকে  তেরো বার ফোন করেছে। সৈকত ফোন ব্যাক করে বললো অহনা তুমি ফোন দিয়েছিলে, কিন্তু আমি..... 
অহনা বললো হুমম আমি বুঝতে পেরেছি, তুমি রুমে ছিলেনা....। 
সৈকত তুমি কি জান আঙ্কেল আজ আমাদের বাসায় এসে আগামী  বৃহস্পতিবার আমাদের বিয়ে ঠিক করে গেছেন?
অহনার মুখে সব শুনে সৈকত আশ্চর্য যায়।বাবা তাকে কিচ্ছু বললেন নি!
সৈকত বললো অহনা এখন ফোন রেখে ঘুমাবো  সকালে উঠে আম্মুকে খাওয়ার আগে পরের ঔষধ গুলো দিতে হয়। তাড়াতাড়ি না ঘুমালে সকালে উঠতে পারি না....
 অহনা আর কোনো কথা না বাড়িয়ে শুধু গুডনাইট বলে ফোন কেটে দিলো।



চলবে...

শামীমা আহমেদ /পর্ব৪৩




শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব৪৩)
শামীমা আহমেদ 



সকালে খুব নীরবেই ভাইবোনের নাস্তা পর্ব শেষ  হলো।তবে রাহাত বেশ বুঝতে পারছে শায়লা তাকে যেন কিছু  বলতে উসখুস করছে। টেবিলে মা আছে তাই শায়লার কথাটা বলা হচ্ছে না। বুঝতে পেরে রাহাত চায়ের মগ হাতে ড্রয়িং রুমে চলে এসে বেশ লাউডে টিভি অন করলো।আর শায়লাকে মোবাইলটা টেবিল থেকে দিয়ে যেতে অনুরোধ করলো।শায়লা নিজের চায়ের মগ ও রাহাতের মোবাইল নিয়ে ড্রয়িং রুমে চলে এলো। সোফায় পাশাপাশি ভাইবোন বসলো।
রাহাতই নীরবতা ভাঙল।
আপু কি কিছু বলতে চাচ্ছো?বলো,কী বলতে চাও?
না মানে 
কী? শিহাব ভাইয়ার কথা কিছু বলবে?
হ্যাঁ,শিহাব বলেছে তোমার আর মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে রাখতে কিন্তু মাকে কিভাবে বলি?
কোন ব্যাপারে আপু।আমাকে আগে বলো শুনি।
না মানে, শিহাব বলছিল ও ওর পারিবারিক ব্যাপারে আমার সাথে কিছু কথা বলতে চায়, তাই আজ বিকেলে আমাকে একটু  বাইরে কোথায় বেড়াতে নিয়ে যেতে চাচ্ছে।তা,আমি কি যাবো?
হ্যাঁ আপু, অবশ্যই যাবে।তোমাদের এখন বেশি বেশি কথা বলা দেখা করা উচিত।সব ব্যাপারে খোলামেলা কথা বলো।কোন কিছু আড়ালে না রেখে সামনের দিনগুলো কিভাবে সুন্দর হয় সেভাবে আলোচনা করো।
কিন্তু মাকে কিভাবে বলবো?
কোন অসুবিধা নেই আপু।আমারতো জানা থাকলো।আর তাছাড়া আজ বিকেলেতো মা থাকছে না।আমি আর মাতো নায়লার বাসায় যাচ্ছি। মা জানতে পারবে না। তুমি তাড়াতাড়ি ফিরে এসো।
আপু,শোন,
কি বলবে?
আজ আমার দেয়া নতুন শাড়িটা পরে যেও।
খুবই বাধ্য মেয়েটি হয়ে শায়লা মাথা ঝুকিয়ে বললো,ঠিক আছে।
রাহাত খুব সহজেই শায়লাকে শিহাবের সাথে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দিলো।শায়লা অবাক হলেও রাহাত নির্বিকার রইল। রাহাত ইতিমধ্যে শিহাব সম্পর্কে  সব ধরনের খোঁজ খবর নিয়েছে।আর তা জানতে চারিদিকে লোক পাঠিয়ে ছিল।শিহাবের বর্তমানের উত্তরার বাসা,উত্তরার অফিস, গাজীপুরের ফ্যাক্টরি, 
জিগাতলার বাসা,বাসায় কে কে থাকে, শিহাব এলাকার কোন বাড়ির মেয়েকে বিয়ে করেছিল, বিয়ে ও তার পরবর্তী জটিলতা,এখন কে কোথায় থাকে,শিহাবদের গ্রামের বাড়ি, শিহাবের চালচলন, বন্ধুবান্ধব কারা,কাদের সাথে চলাফেরা, যাবতীয় সবকিছুর খোঁজ রাহাত নিয়েছে। এটা বোধহয় ভাইদের বিরাট একটা দ্বায়িত্ব থাকে বোন বিয়ে দিতে গেলে।
নায়লার বাসায় নেবার সবকিছু শায়লা গুছিয়ে দিলো। মাকেও তৈরি করে দিলো। দুপুরের পরপরই রাহাত আর মা  সব প্রস্তুতি শেষ করলে রাহাত একটা উবার কল দিলো এবং খুব দ্রুতই তা চলে এলো।
মাকে নিয়ে রাহাত নায়লার বাসার উদ্দেশ্য রওনা দিলো।
শায়লা শিহাবের ফোনের অপেক্ষায় রইল।মোবাইল  হাতে নিয়ে খালি বাসায় এ ঘর ওঘর পায়চারী চলছিল। দুপুর তিনটায়  শিহাবের কল এলো। তক্ষুনি শায়লার মনের ভেতর কী এক ফল্গুধারা বয়ে গেলো! এক নিবিড় অনুভবে মোবাইলটিকে আলতো করে গালে ছুঁয়ে নিলো যেন শিহাবের কন্ঠস্বরের সাথে তার স্পর্শও অনুভব করলো!
শায়লা কি করছো?
এইতো মা আর রাহাত একটু আগে নায়লার বাসায় গেলো। আমি একা। 
উহু, তুমি একা নও। এইতো আমি আছি!
---কই দেখতে পাচ্ছি নাতো!
একটু চোখ বন্ধ করে আমাকে ভেবে নাও।
শায়লা চোখ বন্ধ করতেই সেই যে দুজনে শপিংএ যাওয়ায় শিহাব কালো শার্ট পরা চোখে সানগ্লাস সাঁটা ছিল সেদিনের সেই মুখটি ভেসে উঠলো! মূহুর্তেই শায়লা  অন্য এক ভুবনে হারিয়ে গেলো!
ওপ্রান্তে শিহাব বলেই চলেছে,
জানো শায়লা, আজ নিজেকে অনেক ফ্রেশ করে নিলাম।বাইক চালাতে চালাতে বহুদিন  নিজের দিকে আর খেয়াল দেয়া হয়নি ।একটা নতুন শার্ট কিনলাম।আমার আবার কেনাকাটার বাতিক আছে, বুঝেছো।পরে আবার বিরক্ত হইয়ো না যেনো।
শায়লা হেসে ফেললো!
আজ তোমার সাথে দেখা হবে তাই নিজেকে তোমার মত করে তৈরি করে নিলাম।
---আমি কি কখনো বলেছি তুমি আমার মত হয়ে এসো, তুমিতো সবসময়ই সুন্দর, তোমার পাশেই বরং আমি বেমানান। 
এবার শিহাব বেশ রাগতঃ,কন্ঠে বলে উঠলো, আর কোনদিন এ ধরনের কথা বলবে না।শায়লা তোমার সাথে পরিচয় না হলে জীবনটা আমার আর স্বপ্ন দেখতো না।তোমার সরলতা আমাকে নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছে।আমার অতীতের কষ্ট মুছে দিয়েছে। জীবনকে উপভোগ করার চেয়ে উপলব্ধিটাই যে বেশি আনন্দের তুমিই সেটা বুঝিয়েছো।
শায়লা নীরবতায় শিহাবকে অনুভব করছে।
শায়লা কিছু বলো!
সারাজীবন  অপ্রাপ্তির শায়লার জীবনে যে এতটা সুখ পাওনা হয়ে ছিল তা শায়লার  নিজেরও জানত না।কোন স্বপ্নের ওপার থেকে শিহাব উড়ে এসে এমন করে তার মনের খাঁচায় বন্দী হবে তা জানা ছিল না।
শায়লা শুধু বললো, শিহাব আমি হয়তো তোমাকেই এতদিন খুঁজেছি। তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম।
শিহাব ছোট্ট করে শুধু বললো,হু,আমি আছি, থাকবো তোমার হয়ে।ঠিক আছে আজ দেখা হচ্ছে।অনেক কথা হবে। তোমার আমার যত না বলা কথা আজ দুজন দুজনেরটা শুনবো।
এখন আমি শাওয়ার নিবো। সামান্য লাঞ্চ করবো। ঠিক সাড়ে চারটায় আমি উত্তরা পার্কের কাছে থাকবো।আর হ্যাঁ,আমি সেখানে পৌঁছে তোমাকে কল দিলে তুমি বাসা থেকে বেরুবে।আমি চাইনা ওখানে তুমি একা একা দাঁড়িয়ে থাকো।
শায়লা আচ্ছা বলতেই শিহাব বলে উঠলো,সবসময় তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করেছো আজ আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করবো।অপেক্ষা করার মাঝে প্রাপ্তির আনন্দটা লুকিয়ে থাকে।আমি আজ অনেকদিন পর সেই আনন্দটা পেতে চাই শায়লা।
শায়লা ওপ্রান্তে সাড়াহীন। শুধু চোখভেজা কান্নার একটা চাপা শব্দে মোবাইল যন্ত্রটি ভারী হয়ে উঠলো।


চলবে...



উপন্যাস 

টানাপোড়েন ৮০

হৃদয়াকাশ

মমতা রায় চৌধুরী


রেখার চোখে শুধু জল আর জল। এ কোন নজর লাগল তার সন্তানদের প্রতি। অবজ্ঞা, অবহেলা উপেক্ষা ছাড়া আর কিছুই জোটে না ওদের ।তাই রেখা ও মনোজ 'ওদেরকে একটা আলাদা জীবন দিতে তার পরিবারের সাথে লড়াই করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। একটা উটকো ঝামেলা হয়ে গেল কোথা থেকে একটা কুকুর এসে  কামড়ে দিয়ে গেল।
একটু আগে মন্টু ডাক্তার এসেছিল ভ্যাকসিন দিয়ে গেলো ।তবে হ্যাঁ ডাক্তারবাবু খুব ভালো। কি জানি কেন উনি ভ্যাকসিনের কোন টাকাই নিলেন না।
মনোজ যখন বলল 'ডাক্তার বাবু আপনাকে কত দিতে হবে?'
মন্টু ডাক্তার বললেন ' কিছু না।'
মনোজ অবাক হয়ে বলল 'সে কি ডাক্তারবাবু আপনার ভিজিট , ভ্যাকসিনের দাম নেবেন না?'
ডাক্তারবাবু বললেন 'না, না ।আপনারা যে রাস্তার কুকুরগুলোকে এত ভালবাসেন ,রোজ ওদেরকে খেতে দেন ।ওরা তো অনাদরে-অবহেলায় বড় হয়। কে এত ভালবাসে বলুন তো?
মনোজ বলল'ডাক্তারবাবু এদেরকে নিয়ে রোজ আমার পরিবারের ভেতরে অশান্তি, বাইরে রাস্তায় খেতে দিলে অশান্তি ।তবুও আমার স্ত্রী কিন্তু এগুলোকে একদমই গায়ে মাখে না।'
ডাক্তারবাবু বললেন 'ওদেরকে ভালবাসুন ।ওরা আপনাদের জন্য জীবন দিয়ে দেবে। মানুষ বেইমান। এরা নয়।'
মনোজ বলল'তবে আপনি যে কাজটা করলেন ডাক্তারবাবু এটা তো আপনার মহানুভবতার প্রকাশ।'
ডাক্তারবাবু বললেন 'দেখুন ,আমাদের পেশাটাই হচ্ছে সেবার কাজ। কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী আমাদের কেউ মূল্য নিতে হয়। কিন্তু আপনারা আমার চোখ খুলে দিয়েছেন।'
মনোজ বলল 'কিভাবে ডাক্তার বাবু?'
ডাক্তারবাবু বললেন 'এই যে আপনারা যদি ওদের জন্য এত কিছু করতে পারেন? তাহলে আমি সামান্য একটু ওদের জন্য সেবা করতে পারি না?'
মনোজ বলল' সবাই যদি এরকম হত পৃথিবীটা কত সুন্দর হতো।'
ডাক্তারবাবু বললেন' পৃথিবীতে তো সবাই একরকম হবে না ,এরকম দু-চারজন মানুষই তো থাকবেন তাই না?'
মনোজ বলল' হ্যাঁ ,তা অবশ্য ঠিকই বলেছেন আপনি।'
ডাক্তারবাবু বললেন 'আসুন না আমরা যে কজন ই পারি আমরা ওদের জন্য কিছু করি।'
মনোজ বলল 'একদম ডাক্তারবাবু।'
রেখা অবাক হয়ে বলল' ডাক্তারবাবু এরকম বললেন।'
অথচ এই ডাক্তারবাবুর নামে কতজন কত বাজে কথা বলেছেন। ডাক্তারবাবু হচ্ছেন চামার ,চশমখোর । ছিঃ ছিঃ। ভাবতেই কেমন কষ্ট হচ্ছে।
মনোজ বলল 'মানুষকে না সবসময় বাইরে থেকে দেখে বিচার করা যায় না। দেখ না যাকে চশমখোর ,চামার ইত্যাদি বলে অভিহিত করেছেন লোকে ।আজ তার ভেতরটা দেখো  এক মহানুভবতা ।
রেখা বললো' ঠিকই বলেছ।'
মনোজ বললো 'মিলি  এখন কি করছে? ঘুমাচ্ছে?
রেখা বলল 'হ্যাঁ দেখলাম যে ঠাণ্ডায় কাঁপছে। আমি আবার কিছু ওর গায়ে চাপা দিয়ে আসলাম।'
মনোজ  বললো 'দেখো জ্বর-টর যদি আসে তাহলে ওকে আবার একটু ওষুধ খাওয়াতে হবে।'
রেখা বলল "আমাদের মিলিটা দেখো কত বোঝে আমিও ওর কাছে গিয়ে বললাম 'মা তোমার শীত করছে? চোখটা মেলে তাকালো , যেই বললাম শুয়ে পড়ো ,মাথাটা একদম কাত করে দিয়ে শুয়ে পড়ল।'
মনোজ বলল 'জানো আজকে কি কান্ড করেছে?
রেখা বললো ' কি?'
মনোজ বলল  'বাচ্চারা মিলিটাকে যেই দেখতে পেয়েছে ,ওদের তো আটকে রাখা হয়েছে। লিলিটা একবার দেখি এমন চিৎকার শুরু করলো সঙ্গে পাইলট, তুলি ,ওরাও।'
রেখা বলল' লিলি যখন চেঁচায় না, একবার দেখবে  গ্রীলটা ধরে  চিৎকার করবে আবার একবার ভেতরে গিয়ে চিৎকার করবে।'
মনোজ বলল' এবার তুমি চিন্তা মুক্ত হয়েছ রেখা?'
রেখা বলল' হ্যাঁ । ভ্যাকসিন না হলে আমি চিন্তা মুক্ত করতে পারছিলাম না। থ্যাংকস গড।'
মনোজ বলল 'এবার কি এক কাপ ব্ল্যাক কফি পাব ম্যাডাম?
রেখা হেসে বলল 'একশোবার পাবে।'
রেখা রান্নাঘরের দিকে গেল কফি বানাতে এমন সময় ফোন আসলো। রিং হল'আমি তো সুখেই আছি..।'
রেখা রান্নাঘর থেকে কফিটা কাপে ঢালতে ঢালতে বললো 'কি ব্যাপার আজকাল তুমিও রিংটোন চেঞ্জ করছো?'
মনোজ বলল 'বাহ, তুমি করতে পারো ,আমি করতে পারি না?'
রেখা বলল 'অফকোর্স পারো।'
রেখে  হাসতে হাসতে বলল' তো ফোনটা ধরো?'
এর মধ্যে ফোন কেটে গেল।
রেখা রান্নাঘর থেকে দুকাপ কফি নিয়ে এসে ডাইনিং এ টেবিলের ওপরে রাখল মনোজ পাশে সোফাতে বসেছিল। বলল 'এসো এখানে খাবে ?না তোমার কাছে গিয়ে দেবো?'
মনোজ বলল' এখানে এসো।'
রেখা বলল' ইস সসস'।
মনোজ বলল 'একি সোনার আলোয় জীবন ভরিয়ে দিলে বন্ধু। কাছে থেকো, কাছে থেকো।'
রেখা বলল' কি ব্যাপার এত রোমান্টিক?'
সত্যিই মনোজের হৃদয়াকাশ আজ প্রেমেতে ভরপুর।
মনোজ বলল 'সেই কবে থেকে আমি হেঁটে চলেছি পৃথিবীতে। অপেক্ষায় অধীর দু'চোখ কেউ রবে এ পথে ।ভাবি নি কখনো আমি ।তুমি আমার সেই তুমি। 'তোমায় দেখে চোখের পাতায় বড় সুখে সে চোখে জল ভেসে যায়। জলে ভালোবাসি আমি তোমাকে।'
রেখা বলল' ভালো গান গাইছো?
মনোজ বলল 'কেন গানটা ভালো না?'
রেখা বলল 'অফকোর্স ভালো।'
রোমান্টিকতায় যেন রসভঙ্গ হলো।
এরমধ্যে আবার ফোন বেজে উঠলো আমি তো সুখেই আছি।'
রেখা বললে 'এবার ফোনটা ধরো।'
মনোজ ফোনটা রিসিভ করে বলল ' হ্যালো।'
কিরে কি করছিস?
মনোজ বলল 'এই তো ভাই চলে যাচ্ছে।'
সুরঞ্জন বলল ' শরীর ঠিক আছে?'
মনোজ  বলল' হ্যাঁ ,আগের থেকে অনেক বেটার।'
সুরঞ্জন বলল'হ্যাঁ রে, রেখা লিখছে তো নিয়মিত? অসাধারণ লেখে।'
মনোজ বললো' ও  যা চাপের ভেতরে আছে, কি করছে, কে জানে?'
সুরঞ্জন বলল'-শিখা তো ওর  বহুৎ বড় ফ্যান।'
মনোজ বলল' রেখাকে জানিয়ে দেবো।'
ওদিক থেকে মাধু বলল বৃষ্টিকে নিয়ে আসতে হবে ওর ছুটি হয়ে গেছে।
সুরঞ্জন মনোজ এর সাথে ফোন করে কথা বলতে বলতেই বলল হ্যাঁ এই তো যাচ্ছি। আচ্ছা, রাখি রে মনোজ। ভালো থাকিস।'
মনোজ বলল' তুইও ভালো থাকিস আর ফোন করিস মাঝে মাঝে।
 সুরঞ্জন বলল ' ঠিক আছে। তুই ও মাঝে মাঝে ফোন করিস।'
এরমধ্যে রেখার ফোন বেজে উঠলো। মনোজ নিজের ফোন কলটা কেটে ,দেখছে রেখার ফোন বেজে যাচ্ছে ।রেখা ধারেপাশে কোথাও নেই। রিংটোনে গান বাজছে
'তুমি কি এমনি করে থাকবে দূরে ,আমার এ মন মানে না..।'
মনোজ বলল' রেখা ,রেখা ,তোমার ফোন বেজে যাচ্ছে।'
রেখা ছাদের থেকে শুনতে পেয়ে বলল ফোনটা ধরো আমি কম্বলটা রোদে দিতে এসেছি ।ঘরে তো একটু ও রোদ ঢোকে না।'
মনোজ ফোনটা ধরতে গিয়ে ফোনটা কেটে গেল।
আমাদের এখান থেকে নেমে এসে বলল কে ফোন করেছিল?
মনোজ বলল' খেয়াল করি নি।'
রেখা বলল' মিস কল টা দেখো না?'
মনোজ বলল' হ্যাঁ ,দেখছি।'
রেখা বলল 'পেলে ?কে করেছে?'
মনোজ বলল' তোমার কাকিমার ফোন?'
রেখা চিন্তিত ভাবে বলল' কাকিমার?'
মনোজ বললো 'ফোনটা ধরাব?'
রেখা বলল-'হ্যাঁ, ধরাও তো?'
মনোজ নম্বরটা ডায়াল করল।'রিং হয়ে গেল ' কি দিয়ে পূজিব ভগবান তোমায়...।'
মনোজ বলল 'এই নাও ফোন ধরো, রিং হচ্ছে।'
রেখা রিসিভ করে বলল 'হ্যালো'।
কাকিমা বললেন' ভালো আছিস সবাই।'
রেখা বলল'এই আছি।'
রেখার কাকিমা বললেন'ননী, একটা খারাপ খবর আছে রে?'
রেখা বলল'কি খবর?'
কাকিমা বললেন'বিপাসার জামাইবাবু মারা গেলেন।'
রেখা অবাক হয়ে ব্যাঘ্রভাবে বলল 'কিভাবে ?কবে?'
কাকিমা বললেন ' গতকাল। স্ট্রোক।'
রেখা বললো 'কি অবস্থা ভাবো ?এদিকে বিপাশার বর জেলে আছে। ভাবা যাচ্ছে না।'
কাকিমা বললেন' সত্যিই ওদের দুই বোনের কপালটা এতটাই খারাপ যে ,কি হবে? কে জানে?'
রেখা বলল' তোমরা সবাই ভালো আছে তো?'
কাকিমা বললেন 'ওই আছি ।'
রেখা বললো'মানি অর্ডার টা পেয়েছ?'
কাকিমা বললেন 'হ্যাঁ পেয়েছি।'
রেখা বলল'কাকুর ট্রিটমেন্ট করে করাও।'
কাকিমা বললেন 'তুই আমার পেটের মেয়ে নয় তবুও যা..।'
রেখা বলল' ও, তাহলে তুমি আমাকে মেয়ে বলে ভাবো না তাই তো।
কাকিমা বললেন ' না মা এসব বলতে নেই আর ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন।'
ওদিকে মনোজ বলতে লাগলো মিলি একটু খেতে দাও।
রেখা বলল ' হ্যাঁ দিচ্ছি ।'
কাকিমা বললেন   আমি ফোনটা রাখছি পরে কথা হবে ননী। ভালো থাকিস।'
ফোনটা কাটার পর কাকিমা ভাবতে লাগলেন হৃদয়ের টান। রেখা তার নিজের মেয়ে নয় তবুও আজ তার হৃদয়ের অনেকটা জায়গা জুড়ে। তার নিজের মেয়েকে নিয়ে সবসময় টানাপোড়েন।
এদিকে রেখা ভাবতে লাগলো মিলি র যদি কিছু হয়ে যেত, তাহলে রেখার হৃদয়াকাশ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যেত।

২৮ ডিসেম্বর ২০২১

কবি নিপুন দাস এর কবিতা





মোহনায় এসে

মোহনায় এসে ক্লান্ত সে নদী 
ফেলে আসা পথে চায়,
সব পথ আজ শেষ হোলো বুঝি 
সাগরের ঠিকানায়।
কত পথ সে পার হয়ে এল
কত দেশ প্রান্তর,
উদ্দাম স্রোতে ভেঙেছে গড়েছে
 কতই না বালুচর।

আজ নেই তার কূলভাঙা ঢেউ নেই সেই স্রোতধারা,
সময়ের স্রোতে ভেসে গেছে সব
ফিকে সব স্বপ্নরা।
পরিচয় তার ছিল যতটুকু 
মুছে যাবে ক্ষনিকেই 
অপার সাগর, অ থৈ জলেতে
হারাবে সে অচিরেই।
সাগরের বুকে জমা হবে তার
বয়ে আনা জলরাশি,
যা ছিল নিজের, রইবে না আর
সব যাবে ঢেউয়ে ভাসি।
এ কী আনন্দ, না কী বিষাদ
ভাবে সেই স্রোতস্বিনী,
নিজেরে হারায়ে সুখ কিছু আছে। 
দুঃখ বা কতখানি ?
চঞ্চল স্রোতে যারা ছিল সাথী
কে কোথায় আজ তারা! 
মোহনায় এসে শান্ত তটিনী
বোবা কান্নায় সব হারা।
জমেছে বুকেতে নুড়ি আর বালি 
ধীরে তাই পথ চলা,যা গেছে হারায়ে, যা গেছে ফুরায়ে
সকলি থাক শুধু না বলা।

মমতা রায় চৌধুরী/৭৯





উপন্যাস 

টানাপোড়েন ৭৯
মিলির মাতৃত্ব
মমতা রায় চৌধুরী



স্কুল  থেকে বেরিয়ে টোটোতে উঠতে যাবে, পেছন থেকে রিম্পাদি বলল 'কিরে হনহন করে একাই টোটোতে এসে উঠে পড়লি, আমাকে ডাকলি না?'
রেখা বলল' ও ডাকি নি বুঝি?'
আমার পাশে এসে বসো জায়গা আছে'। বলেই কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেল। আসলে রেখার মনটা খুবই খারাপ। কিছু ভালো লাগছে না। এটা যেন ওর জীবনের একটা ট্রাজেডি। যাকে বেশি ভালোবেসেছে আপন করার চেষ্টা করেছে, তখনই যেন হঠাৎ করে সবাই দূরে সরে গেছে।
রিম্পা দি পাশে এসে বসলো তারপর বলল 'অনিন্দিতার বিয়েতে যাচ্ছিস তো?'
রেখার অন্যমনস্কতার জন্য কথাটা শুনতে পেল না। রিম্পাদি আবার একটু ঝাঁকুনি দিল। রেখা রিম্পদির দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে  বলল _কিছু বলছো?'
রিম্পাদি বলল 'তোর কী হয়েছে বল তো ?আমি তো কে একটা কথা বলছি ,তুই শুনতে পাচ্ছিস না?'
রেখা বলল '  হ্যাঁ ,বলো কি বলছো?'
রিম্পাদি বলল' অনিন্দিতার বিয়েতে যাবি তো?'
রেখা বললো' ইচ্ছা আছে, দেখি কি হয় ।সব ইচ্ছে আমার  পূর্ণ হয় না।'
টোটোতে ফোন বেজে উঠল রেখার। রিং টোন 'সবাই তো সুখী হতে চায় ...'।ব্যাগ থেকে ফোন হাতরে হাতরে বের করতে গিয়েই ফোনটা কেটে গেল।
আবার রিং হতে শুরু করল 'সবাই তো সুখী হতে চায়..'। 
রিম্পাদি বলল 'কে ফোন করেছে রে ?'
রেখা বলল' কে জানে? দেখি ফোনটাকে বের করে।'
রেখা ফোন বের করে দেখলো মনোজের ফোন ।ইশারায় রিম্পাদিকে বোঝাল। 
রিম্পাদি একগাল হেসে মজা করে বলল' চোখের পলক হারায়।'
রেখা ফোনটা রিসিভ করে বললো' হ্যাঁ বলো।'
মনোজ  বলল 'তুমি কোথায় এখন?'
রেখা বলল 'কেন ?এখন আমি টোটোতে আছি ।স্টেশনের দিকে যাচ্ছি ট্রেন ধরবো।'
মনোজ বলল 'না তাই জিজ্ঞেস করছি।'
রেখা বলল 'সাধারণত তুমি এই সময় ফোন করো না তো,কিছু হয়েছে?'
মনোজকে নিরুত্তর দেখে রেখা আবার জিজ্ঞেস করল 'বলো না কিছু হয়েছে?'
রিম্পাদি রেখার কপালে চিন্তার ভাঁজ দিকে ইশারায় জিজ্ঞেস করল' কি হয়েছে?'
রেখা ইশারায় বোঝালো পরে বলবে।
 রেখা আবার জিজ্ঞেস করল 'মিলি আর ওর বাচ্চারা সবাই ঠিক আছে তো?'
মনোজ বলল 'আজ মিলিকে একটা কুকুরে কামড়েছে।'
রেখা বলল' সে কি?কী করে?'
মনোজ বলল 'আমিও জানি না। একবার চিৎকারের আওয়াজ পেয়েছিলাম ,বাইরে বেরিয়ে শুনি দোকানদারা বলছে' মিলিকে কামড়েছে।'
রেখা বলল 'ক্ষ্যাপা কুকুর নাকি?'
মনোজ বলল-'এটাই তো সংশয় আছে। কেউ বলছে পাগলা কুকুর, আবার কেউ বলছে সেরকম কিছু নয়।'
রেখা বলল 'ওর খুব লেগেছে?'
মনোজ বলল হ্যাঁ চোয়ালের দিকে, অনেকটা কেটে গেছে।'
রেখা বলল 'এ বাবা, কি হবে?'
এর মধ্যে টোটো এসে স্টেশনে থামলো। ব্যাগ থেকে কুড়ি টাকার নোট বের করে দিল।
রিম্পাদি বলল' এই তুই দিলি কেন ?আজকে তো আমার দেবার কথা।'
রেখা বলল ' আরে বাবা একজন দিলেই হল।'
রিম্পাদি বলল ' এটা কিন্তু ঠিক করলি না।'
রেখা বলল 'আমার জীবনটাই তো বেঠিক।
গাড়ির এখনো খবর হয় নি না?''
রিম্পাদি  বলল 'তাই তো মনে হচ্ছে ।সবাই প্লাটফর্মে ঘোরাঘুরি করছে।'
মনোজ তখনও ফোনটা কাটে নি। রেখা বলল 'হ্যালো'
মনোজ বলল' হ্যাঁ বল শুনতে পাচ্ছি।'
রেখা বলল' মন্টু ডাক্তারকে খবর দিয়েছ?
মনোজ বললে 'হ্যাঁ কথা হয়েছে। উনি আউট অফ স্টেশন।'
রেখা বলল 'তাহলে কি হবে?'
মনোজ বলল 'ফোনে 'কথা হয়েছে?'
রেখা বলল'' কি বললেন উনি চিন্তার কিছু কারণ আছে?'
রেখার চোখ  ছল ছল করছে।ব
রিম্পাদি বলছে' কাঁদিস না সব ঠিক হয়ে যাবে।'
মনোজ বলল উনি বললেন যে ভ্যাকসিন দিয়ে রাখলে খুব ভালো হয় ।কারণ বাচ্চারা যেহেতু এখনও মায়ের দুধ খাচ্ছে। তাহলে চিন্তার কোনো কারণ থাকে না।'
রেখা বলল 'আমার মিলিটা কত ভালো মেয়ে ওর দুই দুবার অ্যাক্সিডেন্ট হল আবার এখনও এই রকম। শুধু  ওর উপরে কেন এরকম হচ্ছে বলো তো?'
কাঁদতে শুরু করলো এবার রেখা প্ল্যাটফর্মের লোকজন দেখতে লাগলো।
রিম্পাদি বলল' চুপ কর, চুপ কর।
এর মধ্যে ট্রেন ঢুকে গেল। 
রিম্পাদি বলল 'চল চল চল ট্রেনে উঠবি।'
রেখা বলল' আমি ট্রেনে উঠে তোমাকে ফোন করছি।'
বাপরে বাপ কৃষ্ণনগর লোকালে যা ভিড় হয়। 
রিম্পা দি বললো' এদিক আয় ,এদিক আয়, জায়গা রেখেছি।'
রেখা রিম্পাদির  কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। রিম্পাদি নিজে বসে রেখার ব্যাগগুলো নিয়ে বলল ' বস।'
এর মধ্যেই সামনের সিট নিয়ে দুই ভদ্রমহিলা সঙ্গে তুমুল ঝগড়া শুরু হলো। এক ভদ্রমহিলা বলছেন আপনারা ডেইলি প্যাসেঞ্জার   করেন বলে সব জায়গা রেখে দেবেন আর আমরা বসতে পারবো না, তা তো হবে না ।আপনাকে  এতগুলো জায়গা রাখতে দেবো না।'
রিম্পাদি বলল' দেখলি সোমাদির কান্ডটা প্রতিদিন এরকম করে।'
রেখার মাথায় কিছু ঢুকছে ওর মাথায় শুধু মিলি আর ওর বাচ্চাদের কথাই ঘুরছে।
মহিলা আবার বলছেন আপনি দেখতে পাচ্ছেন না আমার বেবি আছে। আমি   শিয়ালদা অব্দি যাব। দাঁড়িয়ে যাবো?'
রিম্পাদি থাকতে না পেরে বলল' সোমাদি একটা জায়গা ছেড়ে দাও না।'
সোমাদি বলল-'এই রিম্পা তুমি এরকম বলবে না তো ?আমি আগে জায়গা রেখেছি, আমি ছাড়বো কেন?'
রিম্পাদি বলল'  বাচ্চা নিয়ে আছে না ,ছেড়ে দাও না একটা জায়গা তোমার তো আরো কয়েকটা জায়গা রয়েছে।'
তোড়া ,সহেলি ...ওরা বসবে না?'
রিম্পাদি আর কথা বাড়ালো না ,সোমাদির সঙ্গে পেরে উঠবে না ।
রিম্পাদি শুধু বললো' যা ভালো ,বোঝো করো।'
সোমাদি বলল 'সেটাই তো করছি আগ বাড়িয়ে বার বার তুমি কেন কথা বলতে আসছো?
অন্যযাত্রীরা বলল ' উনি কি খারাপ কথাটা বলেছেন ?দেখছেন তো উনার কোলে বাচ্চা আছে। না কিছুতেই হবে না ।সব একজোট হয়ে বলল 'একটা জায়গা আপনাকে ছাড়তেই হবে।'
কি আর করে বাধ্য হয়ে তখন একটা জায়গা ছাড়তেই হলো।
 অন্য যাত্রীরা বলল' আপনি বসুন তো দিদি ওখানে। ভদ্রমহিলা খুব টেটিয়া আছেন। প্রতিদিনই এরকম জায়গা রাখবেন উনি।'
সোমাদি গজ গজ করতে লাগল।
রিম্পাদি  রেখাকে ধাক্কা দিয়ে বোঝাতে লাগলো আর মুচকি মুচকি হাসতে লাগল।
রেখা র তখনো চোখে জল।
রেখা আবার ফোন লাগালো মনোজকে।
মনোজের ফোনে রিং হতে লাগলো'আমি তো সুখেই আছি, যখন তুমি জানবে...।'
দুবার রিং হয়ে গেল। ফোন ধরছে না বলে রেখা উদগ্রীব হয়ে উঠল। 
রিম্পাদি বলল ' আরে বাবা, দেখ, হয় তো একটু কাজে ব্যস্ত আছে। ঠিক ফোন ধরবে।'
রেখা আবার ফোন করলো'রিং হল 'আমি তো সুখেই আছি..।'
মনোজ হাঁপাতে হাঁপাতে ফোন ধরে বললো 'হ্যাঁ বল ।'
রেখা বলল 'মন্টু দা কী বলেছেন?'
মনোজ বলল'  কালকে মন্টুদা আসবেন ভ্যাকসিন দেবেন।'
রেখা বলল 'আর ব্যাথাটা, রক্ত ঝরল সেটার কি হবে?
মনোজ বলল ' আমাদের এখানে  ওই স্ট্রিট ডগ কেয়ার  করে যারা, আরে আমাদের পাশে  থাকে ওর নাম' সন্দেশ 'ওকে বলেছি। ওরা ওদের টিম নিয়ে সন্ধ্যেবেলায় আসবে।'
রেখা বলল 'ও আসবে?'
মনোজ বলল'' হ্যাঁ আসবে ।এসে ওরাও কিছু ট্রিটমেন্ট করে দিয়ে যাবে।''
রেখা বললো 'আমার মিলির জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে গো?'
মনোজ বলল 'সে তো হবেই?'আজকে গেটটা খোলা ছিল ওই কুকুরটা নাকি বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেছিল আর মিলি ছিল বাইরে বাচ্চাদের দিকে আসতে দেখে ঘেউ ঘেউ করতে থাকে। তখনই.....।'
রেখা বলল-'কে গেটটা খুলে রাখে কে জানে? যৌথ বাড়ি হলে যা হয়।'
মনোজ বলল 'তা যা বলেছো।'
রেখা বললো 'বাচ্চা গুলো কি করছে?'
মনোজ বলল'বাচ্চাগুলোকে এই তো সাড়ে চারটেতে দুধ রুটি খাওয়ালাম।
মিলির কাছে যাবে বলে ওরা চিৎকার করছে।'
রেখা বলল 'ওদেরকে সামলানো মুশকিল। সারাদিনে মার কাছে যায় নি ছটফট তো করবেই।'
মনোজ বলল 'হ্যাঁ ,কিন্তু এখন ওদেরকে ছাড়া যাবে না মায়ের কাছে।"
রেখা বললো 'ঠিক আছে। আমার মিলিটা কি করছে?'
মনোজ বলল 'এখন ঘুমোচ্ছে'।
ইতিমধ্যেই ট্রেন এসে মদনপুরে থামল।'
রিম্পাদি বলল 'নে আর কথা বলতে হবে না। বাড়ি  গিয়ে দেখতে পাবি ।এর পরেই তো কল্যাণী স্টেশন।'
রেখা বললো 'হ্যাঁ গো ,রিম্পাদি কি বলবো তোমায় ,বলো?'
রিম্পাদি বলল' আমাকে কিছু বলতে হবে না। আমি সব বুঝতে পারছি, তোর মনের অবস্থা।'
এরমধ্যেই ট্রেন স্টেশনে থামলো ।রেখা তার আগেই সিট  থেকে উঠে গেটের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। ট্রেন থামলে রেখা নামল  ট্রেন থেকে। জানলা দিয়ে রিম্পা দিকে হাত নাড়লো ।'
রিম্পাদি বলল 'সাবধানে যাস।'
রেখা বিধানের অটো দেখতে পেয়ে বলল' এই বিধান দাঁড়াও ,দাঁড়াও ,যাব।'
বিধান ব'লল 'ও দিদি তাড়াতাড়ি আসুন বুক হয়ে যাবে।'
হন্তদন্ত হয়ে অটোতে উঠে বসলো। বসার সঙ্গে সঙ্গেই অটো ছেড়ে দিল।
রেখা শুধু ভাবছে' কত তাড়াতাড়ি বাড়িতে পৌঁছাবে বাচ্চাদের দেখবে? মিলিকে দেখবে।'
বিধান বলল' দিদি ,আজকে আপনি খুব চিন্তায় আছেন?হাসি মশকরা করছেন না।সব ঠিক আছে তো?'
রেখা বলল 'এমনি মনটা একটু খারাপ আছে বলে ভালো লাগছে না কথা বলতে ।টায়ার্ড ও আছি তো?'
বিধান বলল 'হ্যাঁ, সে তো ঠিকই ।সারাদিনের ধকল।'
বিধান গেটের কাছে নামিয়ে দিল।
রেখা ভাড়া মিটিয়ে গেটটা খুলল। তারপর কলিং বেলটা বাজাল" জয় গনেশ, জয় গনেশ ,জয় গনেশ দেবা।"
মনোজ দরজা খুললো রেখা তাড়াতাড়ি ঢুকে গিয়ে আগে বাচ্চাদের দেখলো আর বলল আবার মিলি কোথায় আছে?'
মনোজ বলল' মিলিকে এ জায়গায় না রেখে অন্য জায়গায় ওকে শোবার ব্যবস্থা করে দিয়েছি।'
রেখা মিলির কাছে গিয়ে মিলিকে ডাকতেই মিলি ওর যেখানে লেগেছে, সেই জায়গাটা দেখাতে লাগলো ।সত্যিই যে কতটা কাছের ,ভালোবাসার হলে তবে এই উপলব্ধি করা যায় । রেখা অবাক হয়ে গেল । একটা পশু কি করে তার যন্ত্রণার কথা ,সে কিভাবে প্রকাশ করছে।
রেখা মিলির গায়ে হাত বুলাতে লাগল আর বলল' না মা ,তোমার কিচ্ছু হবে না ।তোমার সব কষ্ট চলে যাবে দেখো। মিলির ঐরকম করুণা অবস্থা আর ওর  দেখানোর ভঙ্গি দেখে রেখার চোখে জল এসে গেল। রেখা শুধু ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে লাগল ঈশ্বর যেন কিছু না হয় ওর।ওকে তাড়াতাড়ি সুস্থ করে দিও ।আর যেটা ভয় পাচ্ছি সেটা যেন একদমই না হয়।'
মনোজ রেখার জীবনের পরিপূর্ণতা মিলি আর ওর বাচ্চারা ।তাই মিলিদের কিছু হলে মনোজ রেখা কিছুতেই স্থির থাকতে পারে না ‌আর রেখা তো নয় ই ।রেখার হৃদয়ের শূন্যতা  কানায় কানায় পূর্ণ করে দিয়েছে মিলি আর ওর বাচ্চারা। কিছু হলে রেখা র ভেতরটা কুরে কুরে খায়। মিলিতারি সন্তানদের বাঁচাতে আজকে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছে। একেই বলে মাতৃত্ব।

শামীমা আহমেদ/পর্ব ৪২




শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৪২)
শামীমা আহমেদ 



বেশ কয়েকদিন হলো শায়লা আবার  সেই আগের মতই কর্মচঞ্চলতায় ফিরে গেছে।সেই অনিশ্চয়তার দিনগুলির অবসান হয়েছে।এখন সে  নিয়মিত ফুল গাছগুলোতে পানি দিচ্ছে। খাঁচায় পোষা পাখিগুলোকে গান শোনাচ্ছে।রাতে ঘুমুতে যাওয়া আগে নিজের বেশ যত্ন নিচ্ছে। ভোরে ঘুম থেকে উঠে মায়ের জন্য অপেক্ষা করছে। নাস্তার আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে উঠছে।মায়ের সাথে টুকটাক কথায় কথায় তার অসুস্থতার সময়ে সংসারের যে বেহাল দশা হয়েছিল তা জানছে।শায়লা নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না শিহাবের জন্য কেন সে এতটা উতলা হয়ে উঠেছিল! সে কথা ভাবলে কেমন একটা লজ্জাবোধও  কাজ করে। শিহাবতো তাকে আগেই সতর্ক করেছিল যেন দুজনার মাঝে কোন চাওয়া পাওয়ার ইচ্ছেরা উঁকি না দেয়। শায়লা নিজেকে নিজেই চিনতে পারছে না।নাহ! এভাবে কারো ইচ্ছার বাইরে তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা তার ঠিক হয়নি।কিন্তু আজকাল শিহাবের ফোনালাপ, মেসেজ কেমন যেন অন্যকিছুর আভাস দিচ্ছে।কেমন যেন একটা বন্ধনের আলাপন। তবে কি শিহাব নিজের  প্রতিজ্ঞা ভেঙে তার প্রতি দয়া দেখাচ্ছে।যদি সেদিন মরেই যেতাম তবে তো সে-ই দায়ী থাকতো শায়লার এই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার জন্য।তাই কি তার এতটা উদ্বেগ উৎকন্ঠা! কিন্তু শিহাবকে সে যতখানি জেনেছে সে কখনো শায়লাকে কোন ব্যাপারে দয়া দেখানো বা মিথ্যে কোন আশ্বাস দিয়ে কিছু প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষার সম্ভাবনা দেখায়নি। শিহাবের কথার কখনো ভিন্ন অর্থ হয়নি।সে যা বলেছে সবই খুবই পরিষ্কার  এবং সরাসরি বলেছে। তার প্রকাশভঙ্গীর কখনো দুটো মানে হয়নি। কখনো অলীক স্বপ্ন দেখিয়ে মিথ্যে জাল বুনেনি। চারিদিকে প্রেমিক প্রেমিকাদের অস্থিরতা আর প্রতারনায় যেখানে প্রেম ভালবাসাটা আজ একটা নিত্য দিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু শিহাবের মাঝে তেমন কোন ছলনা বা কপট কিছু তো শায়লা দেখেনি।নিজের জীবন, ভালবাসা, স্ত্রী, সন্তান সব কথাইতো সে অকপটে জানিয়েছে।তার প্রতি আস্থা রেখেছে।সব কথা শায়লাকে জানিয়ে মনকে ভারমুক্ত করেছে।সেও তো তবে তাকে একটা ভরসাস্থল ভেবেছে।
এই ভেজালের ভীড়ে শিহাবের মত শুদ্ধতা, তাই তো শায়লার মনকে এতটাই দখল করে নিয়েছে।শায়লার সরল মনে এমন একজন মানুষের সাথে পরিচয়।আর এ জন্যই শায়লা শিহাবের প্রতি এতটা নির্ভরতায় ডুবেছে।
শায়লা এখন আর পিছে ফিরে তাকাতে চায়না।সে তার মনের গহীনের ডাক শুনেছে। আর তাতে শিহাবেও সাড়া মিলেছে।শায়লা সব পিছুটান  উপেক্ষা করে সে, শিহাব,হ্যাঁ,শিহাবকেই সে তার জীবন সঙ্গী করে পেতে চায়।
রাত প্রায় সাড়ে নয়টার দিকে রাহাত অফিস থেকে বাসায় ফিরলো।হাতে  দুটো আড়ংএর ব্যাগে  দুটো শাড়ি নিয়ে।রাহাত নিজের ঘরে না গিয়ে শায়লার রুমে নক করে মায়ের ঘরে গেলো। মা দোয়ার বই পড়ছিলেন।রাহাতকে দেখে থামলেন। রাহাত ব্যাগ দুটো বিছানায় রাখল।শায়লা ততক্ষনে মায়ের রুমে চলে এসেছে। মা আর শায়লার হাতে শাড়ি দুটো তুলে দিলো। দুজনেই ভীষণ অবাক হলো! যদিও দুজনেই বলে উঠলো কেন এখন শাড়ি? কী দরকার ছিল? যদিও শাড়ি উপহার পেলে কোন বাঙালি  মেয়ে ভেতরে আনন্দিত হবে না তা কিছুতেই হতে পারে না। রাহাত জানতে চাইল, শাড়ি পছন্দ হয়েছে? দুজনেই মাথা ঝুকালো। কেবল শায়লাই বলে উঠলো, আমার খুব পছন্দ হয়েছে ভাইয়া।আর মায়েদের তো সেই একটাই কথা কেন এত টাকা নষ্ট করছো?তবে এসব কথায় রাহাত একেবারেই  কান দেয় না। অন্য রসংণংে গিয়ে রাহাত 
শুধু বললো, আপু আজ কী রান্না করেছ? খুব খিদে পেয়েছে, শিগগীর খেতে দাও।এ কথা বলেই রাহাত নিজের রুমে ফ্রেশ হতে চলে গেলো। শায়লা মায়ের শাড়িটা আলমারীতে তুলে রাখল আর তার শাড়িটি নিয়ে ঘরে চলে এলো। ঘরে এসে শাড়িটি খুলে নিজের পরনে একটু জড়িয়ে নিয়ে  আয়নায় নিজেকে দেখে নিলো। খুব উজ্জ্বল একটা নীল রঙ! শিহাবের পছন্দের রঙ। শায়লা কল্পনায় শাড়িটি পরে একঝলক শিহাবকে ভেবে নিলো।পরক্ষণেই রাহাতের কথা মনে পড়তেই দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।রান্নাঘরে গিয়ে ডাইনিং এ খাবারের আয়োজনে ব্যস্ত হলো।মাকেও ডেকে নিলো। চলে আসো মা আজ আমরা একসাথে খাবার খেয়ে নেই।মেয়েকে স্বাভাবিকতায় ফিরতে দেখে মা আল্লাহর দরবারে হাজারবার শুকরিয়া জানাচ্ছে। 
রাহাত ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং এ এসে চেয়ারে বসে পড়লো।খুব গোপনে আপুর গতিবিধি  দেখতে লাগলো।যাক! আপু আবার আগের মত হাস্যমুখে ফিরে এসেছে।
তিনজনই একসাথে খেতে বসলো।খাওয়ার এক পর্যায়ে রাহাত মাকে বললো,কাল আমার অফিস ছুটি।সপ্তাহের মাঝে ছুটি? মা অবাক হলো! রাহাত জানালো কাল  সারাদেশেই একটা সরকারী ছুটির জন্য ছুটি থাকছে। তাই চলো কাল দুপুরের পর তুমি আর আমি নায়লাকে দেখে আসি।  মূর্শেদকেও পাওয়া যাবে।শায়লা আপন মনে খাবার খাচ্ছে।আপু,তুমিও চলো কাল আমাদের সাথে,শায়লার মনযোগ আকর্ষণ করতে রাহাত বললো।

কোথায়?
বুঝা গেলো,রাহাতের কোন কথাই শায়লা শোনেনি।আর কেন যে এত উন্মনা সেতো আর রাহাতের চেয়ে ভালো কেউ জানে না।
রাহাত জানালো,নায়লার বাসায়।
নায়লার বাসায় যেতে  শায়লা বরাবরই একটু
নিম রাজী থাকে। 
না তোমরা ঘুরে আসো। আমি পরে একদিন যাবো।
রাহাত এব্যাপারে আর বেশী পিড়াপীড়ি করলো না।আপুর এখন একটু একা বা নিরিবিলি সময় প্রয়োজন। নিজের সাথে বা শিহাব ভাইয়ার সাথে বোঝাপড়াটা করে নিতে।
ঠিকাছে আপু,তুমি মাকে তৈরি করে দিও।আর নায়লার জিনিসপত্রগুলো গুছিয়ে দিও।
শায়লা মাথা ঝুকিয়ে সম্মতি দিলো।খাবার শেষ করে যে যার রুমে চলে গেলো।
শায়লার মনে আজ অন্যরকম এক উন্মাদনা।রাহাতের এনে দেয়া নতুন শাড়িটি যেন আরো তাতে বেশি আনন্দ যোগ করলো!বারবার আয়নায় নিজেকে আর শাড়িটিকে দেখছে।
আচ্ছা শিহাবের কি শাড়িটা পছন্দ হবে?সেই যে সেদিন শিহাব বলছিল,একদিন দূরে কোথায় বেড়াতে নিয়ে যাবে তবে সেই দিনই এই শাড়িটা পরবে।এমনটি ভাবতে ভাবতেই  শিহাবের কল এলো।
আজ কেমন আছো শায়লা?
আচ্ছা আমি কি  এখনো অসুস্থ নাকি? 
না,তবুও যে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে।
বেশ করেছি।আমাকেও তো তুমি কম আতংক দাওনি।
শায়লা আমার সেদিনের কথাগুলোকে তুমি ভুল ভাবে নিয়েছ।
আমি এ ধরনের কথার জন্য সেদিন প্রস্তুত ছিলাম না।
আমি তোমার ভালো চেয়েছি,তাই বলেছি।
তাহলে আমাকে বুঝতে তুমি ভুল করেছো শিহাব।
শিহাব আর সেই দিনে,পিছনের দিকে যেতে চাইল না।
শিহাব কথার পরিবেশ পালটে নিলো।
আচ্ছা শায়লা তুমি কি কাল ফ্রি আছো?আজ বাসায় তোমার মা আর রাহাতের অনুমতি নিয়ে রেখো।কাল বিকেলে আমি তোমাকে নিয়ে একটু ঘুরতে বেরুবো।কাল আমার অফিস বন্ধ।একটু সময় পাওয়া গেলো।
তুমি অসুস্থতা থেকে উঠেছো,তোমাকে একটু  খোলা জায়গায় নিয়ে যাবো।
শায়লা বললো কিন্তু ছুটির দিনে তোমার বাবা মা আরাফতো অপেক্ষায় থাকে।
হ্যাঁ,তা থাকে।তবে ওদের শুক্রবারে দেখতে যাবো।এখন আরাফ বাসায় নেই।ভাবীর সাথে ভাবীর বাবার বাড়ি বেড়াতে গিয়েছে।আরাফ ওটাকেই ওর নানাবাড়ি মনে করে।
যদিও  আমাদের বাসার একই রোডে ওর দাদা আর নানাবাড়ি কিন্তু আমরা আজো তা জানাই নি। শায়লা, এ প্রসঙ্গে কাল কিছু কথা তোমায় বলবো।তুমি  মানসিক প্রস্তুতি রেখো।আর হ্যাঁ,সকালে একটু নিজেকে ফ্রেশ করায় ব্যস্ত থাকবো।কল করে না পেলে আবার টেনশন করোনা।আমি লাঞ্চের পরে তোমার সাথে যোগাযোগ করবো। এখন ঘুমিয়ে পড়ো।রাত জেগোনা।আমিও এই একটা মুভি দেখে এখুনি ঘুমিয়ে পড়বো।বাই।
শায়লা নিঃশব্দের গভীরতায় শিহাবকে অনুভব করে নিলো।কী এক মায়ার টানে শিহাবকে খুব কাছের একজন মানুষ মনে হতে লাগল।

চলবে….

শান্তা কামালী/৫১ পর্ব





বনফুল
শান্তা কামালী
(৫১ পর্ব ) 


এভাবেই সময় এগিয়ে যেতে লাগলো... সৈকত ঢাকা আসার কিছু দিন পরের কথা, অলিউর রহমান বদলি হয়ে ঢাকায় নিজের বাসায়  ওঠেন। মাস দু'য়েক পরে ঘুমের মধ্যে স্ট্রোক করে এক সাইড প্যারালাইস্ট হয়ে যায় সৈকতের মায়ের। অলিউর রহমান সাহেব ভেঙে পড়লেন!  একদিকে অফিস অন্য দিকে স্ত্রী। রাহেলা খাতুনের সেবা যত্ন করেন বাপ ছেলে দু'জনেই। 
মাঝে মধ্যে অহনাও এসে সেবা যত্ন করে।  রান্না ঘরে খালাম্মাকে লোকমা তুলে খাইয়ে,ঔষধ খাইয়ে তবেই অহনা বাসায় যায়। 
মধ্যে মধ্যে রাহেলা খাতুন অহনার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন পরম মমতায়.... 
একদিন অলিউর রহমান অফিস থেকে এসে স্ত্রীর কাছে বসতেই, রাহেলা খাতুন স্বামীকে বললেন অহনা সৈকতের বিয়েটা খুব তাড়াতাড়ি দিয়ে দেন,পুরুষ মানুষ বলে কথা।
এতো কিছু মাথায় আসে না কাজের মধ্যে, তাই অলিউর রহমান সপ্তাহ খানেকের ছুটি নিলেন।পরদিন বিকালে অহনাদের বাসায় গেলেন। অলিউর রহমান যাবেন আগেই  বলে রেখেছিলেন।  সেই কারণে মনিরুজ্জামান সাহেব, মানে  অহনার বাবা বাসাতে ই ছিলেন। অলিউর রহমান পরিচয় পর্ব শেষ করে, কোনো রকম ভনিতা না করে বললেন .... আপনি যদি রাজি থাকেন  তাহলে অহনা সৈকতের বিয়েটা অপেক্ষা করে আর ঝুলিয়ে রাখতে চাই না। 
অহনার বাবা বললেন ছেলে মেয়ে যেহেতু একে অপরকে ভালোবাসে সেইখানে না করে কি করব বলেন। 
সৈকতের বাবা বললেন, আপনাদের কোনো দাবিদাওয়া আছে? 
 অহনার বাবা মনিরুজ্জামান সাহেব  বললেন, জ্বি... না ভাই সাহেব আমাদের কোনো রকম দাবিদাওয়া নেই। সৈকতের বাবা বললেন আলহামদুলিল্লাহ......তাহলে কথা পাক্কা।

শহিদ মিয়া বাহার





পরখ কর এ আমাকে 


এখানে একটুখানি বস, চোখের শার্শিতে
রাতের পল্লবী হৃদয় ছুঁয়েছে আমার শরীর 
ওখানে  হাত রাখ, ছুঁয়ে দেখ 
তোমাকে পাবে
কত যতনে  তোমাকে রেখেছি 
শো-কেসে যেমন রাখে প্রিয় প্রসাধনগুলো
একটুখানি বসলেই পেয়ে যাবে বাসন্তিক চোখের শালুক, 
তোমার চুলের তরঙ্গ নহর
আমার অতনু শরীর,  
থরে থরে সাজানো 
সুগন্ধি ভালবাসার পূর্ণ-পেয়ালা শিশির
শিশিরের ভাঁজে ভাঁজে 
 মুক্তা  দানাদের আলোকিত জলমহল ।

একটুখানি হাত ধরো 
অথবা যতটুকু তুমি চাও 
ছুঁয়ে দেখ এ আমাকে 
দেখ তুমি আছো এ হাতে, 
হাতের তালু, তর্জনিতে...
হৃদয়ে-হৃদয়ে
ছুঁয়ে দেখ
পরখ কর এ আমাকে
যতখানি তুমি চাও আমি তাই আছি কিনা। 

এখানে একটুখানি বস 
বৈষ্ণবী হাতে ছুঁয়ে দেখ বুকের চৌকাঠ 
তোমার প্রতীক্ষায়
মন্জিলে মন্থিত চন্দ্রিমা নিলয় আমার।

রাবেয়া পারভীন/২য়পর্ব




দুরের বাঁশি 
রাবেয়া পারভীন
( ২য়পর্ব)



প্রথম  দেখাতেই  শুভকে ভালো লেগে গিয়েছিলো লাবন্যর।  শুভর সাথে যখন প্রথম কুশল বিনিময়  হচ্ছিলো  কি যেন এক অজানা ভালোলাগায় বুক কাঁপছিলো  লাবন্যর। তারপর  কখন সেটা ভালোবাসা হয়ে গেছে  লাবন্য বুঝতেই পারেনি। অথচ  শুভর খুব নিঃস্পৃহ  ভাব। যখনি শুভর দেখা পেত কথা হতো  লাবন্যর চোখের পাতায় কাঁপন  ঠোঁটে কাঁপন  যা বলতে চাইত তা না বলতে পারার কষ্ট  লাবন্যকে উদাসীন  করে তুলতে লাগলো। মনে মনে বলত
-আচ্ছা শুভ  তুমি কি আমার কিছুই বোঝ না ?  নাকি অন্য  কোথাও  ডুবে আছো তুমি ?   
ইচ্ছে করেই কিছুদিন  খবর নেয়না  শুভর । নিজেকে ভুলিয়ে রাখতে চেষ্টা করে । সে আর খবর নিবেনা। দেখবে ওর মনে পড়ে কিনা লাবন্যকে। একসপ্তাহ কেটে গেল  শুভর দেখা নেই।  অভিমানী চোখে জল গড়ায়। নিজেকে বোঝায় লাবন্য 
- দুর কোথাকার কে ?  না নিল খোঁজ তো বয়েই গেল। সে আমার কে ? মন বলে কিছু নেই লোকটার।
মনটা  যখন ভেংগে পড়ছিলো তখন হঠাৎ শুভর  সাথে দেখা। সেই  সদা  হাস্যময়  মুখ। 
- কেমন  আছেন  লাবন্য ? 
মুহূর্তেই  সব অভিমান  উধাও হয়ে গেল।
- ভালো আছি  আপনি ভালো আছেন তো ? 
স্মিত  হেসে উত্তর দেয় শুভ
- ভালো আছি । তবে অনেকদিন  আপনার দেখা নেই খুব মিস করেছি আপনাকে।  
 -সত্যি ???
- হ্যাঁ সত্যি,  কেন নয়।?   
বিস্ময়ের  ঘোর কাটেনা  লাবন্যর।



চলবে...

২৭ ডিসেম্বর ২০২১

মমতা রায় চৌধুরী/৭৮




উপন্যাস 


টানাপোড়েন ৭৮
যন্ত্রণার আঁচড়
মমতা রায় চৌধুরী


স্কুলে ঢুকতে ই এক অভিভাবক এসে জিজ্ঞেস করলেন'আপনি কি রেখা ম্যাম?'
রেখা বলল' হ্যাঁ ।কেন বলুন তো?'
অভিভাবক বললেন 'নমস্কার,আপনি ফোন করেছিলেন?'
রেখা বলল ' আমি?
অভিভাবক বললেন ' প্রজেক্ট এর ব্যাপারে।'
রেখা বলল'হ্যাঁ ,ফোন করেছিলাম আপনার মেয়ের নাম কি?'
অভিভাবক বললেন' রিয়া মল্লিক।'
রেখা হাত বাড়িয়ে বললেন ', হ্যাঁ হ্যাঁ, দিন।'
বড়দি লক্ষ্য করে একবার মুচকি হেসে ঘরে ঢুকে পড়লেন।
গার্জেনের কাছ থেকে খাতাটা নিয়ে বড়দিকে গিয়ে রেখা বলল'দেখলেন দিদি তাও একজন গার্জেন এসে দিলেন ।বাকিদের মধ্যে কেউ তো সুইচড অফ করে দিচ্ছেন, আবার কেউ ফোন ই  তুলছেন না।'
বড়দি বললেন 'খুবই সমস্যার কথা।'
রেখা বলল' তাহলে কি করবো এখন?'
বড়দি বললেন'আর দুটো দিন দেখো, যদি না দেয়, তখন নয় বিষ্ণুকে পাঠাবো'।
রেখা বলল ' ঠিক আছে বড়দি, যেমন বলছেন তেমনই হবে। আসছি তাহলে  বড়দি।'
বড়দি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।
রেখা চলে আসছে ঠিক তখনই পেছন থেকে বড়দি ডাকলেন। 'রেখা শোন।'
রেখা গিয়ে বলল'কিছু বলবেন বড়দি?'
বড়দি বললেন'সামনের সপ্তাহে রিম্পার ফেয়ারওয়েল দেয়া হবে। তোমাকে আগে থেকেই জানিয়ে রাখছি, কারণ তুমি তো মাঝে মাঝেই ছুটি নিচ্ছো এজন্য।'
বড়দির কথাটা শুনে রেখার বুকের ভেতরে যেন একটা কেমন যন্ত্রনার আঁচড় কেটে গেল। রেখার চোখে মুখের অভিব্যক্তিতে তা স্পষ্ট ধরা পরলে ,বড়দি বললেন 'দেখ রেখা ,পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সদ প্রচেষ্টায় বহু শিক্ষক-শিক্ষিকার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত  বাড়ির কাছে যাবার স্বপ্ন 'উৎশ্রী'সোনায় সোহাগা করে দিয়েছে। সেজন্য মন খারাপ না করে এটাকে মেনে নাও।'
রেখা বলল' হ্যাঁ দিদি, সে তো মানতেই হবে।'
এরইমধ্যে রিম্পাদির গলা শোনা গেল 'রেখা কোথায় গেল বলতে বলতেই বড়দির ঘরের দিকে উঁকি দিয়ে দেখে ঢুকে বলল 'তুই এখানে ।আমি কত জায়গায় তোকে খুঁজে বেড়াচ্ছি ।একবার ক্লাসের দিকে গেলাম ভাবলাম বোধহয় টুয়েলভের ক্লাসে আছিস ,গিয়ে দেখলাম নেই।'
রিম্পাদি রেখার কাছে এসে হাত দুটো ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল' কিরে কথা বলছিস না?'
রেখার চোখের জল দেখে রিম্পা  একটু অবাক হয়ে গেল। রিম্পা বলল 'কি হয়েছে?'
বড়দি হেসে বললেন 'রিম্পা তোমার সামনের সপ্তাহে ফেয়ারওয়েল টা আছে ওকে জানালাম তার থেকে মুখটা কেমন ভার হয়ে আছে দেখো।'
রিম্পা  বলল' আমি জেনেও ওকে সাহস করে বলতে পারছিলাম না ।বড়দি ,যাইহোক আপনি বলে দিয়েছেন, ভালোই হলো। না হলে হঠাৎ করে আগের দিন জানতে পারলে আরো বেশি কষ্ট পেত।'
রেখা বলল 'না ,না কষ্ট পাবার কি আছে ?ধরে তো আর কাউকে রাখা যাবে না।'
রিম্পা বললেন 'দেখলেন বড়দি?'
বড়দি বললেন 'অভিমানবশত কথাগুলো বলছে। ওর ভেতরটা তো যন্ত্রণায় দগ্ধ হচ্ছে।'
রিম্পা পরিস্থিতি হালকা করার জন্য রেখার গাল দুটো ধরে  বলল' 'বড়দি, দেখুন  ফর্সা গাল দুটো কেমন অভিমান এ লাল হয়ে গেছে।'
বড়দি  বললেন'হ্যাঁ তাই তো?'
রেখা বলল ' বড়দি আসছি।''
রিম্পা  বলল 'বড়দি  আসছি।'
বড়দি বললেন "হ্যাঁ এসো।'
আরো বললেন আচ্ছা আজকে টিচার্স নন টিচিং স্টাফ সকলের সঙ্গে দুটো থেকে একটা মিটিং আছে ।ওটা পঞ্চমী নোটিশ টা সার্ভ করল কিনা দেখ তো?'
রিম্পা বলল 'ঠিক আছে বড়দি।'
রিম্পা আর রেখা যখন স্টাফ রুমে ঢুকলো অনিন্দিতার বিয়ে নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল।
কে কি শাড়ি পরবে? কে কি অর্নামেন্টস পড়বে বেশ জমিয়ে আলোচনা চলছে। টিফিন আওয়ার্স ক্লাসের চাপ নেই।
অনুরাধা বলল 'হ্যাঁ রে রেখা। তুই কি শাড়ি পরবি?'
রেখা কোন উত্তর দিল না।
অনুরাধা সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে একটা বিশেষ ভঙ্গি করলো।
শিবানী বলল'রিম্পাদি যাচ্ছ তো?'
রিম্পা বলল'( যাবার ইচ্ছে তো আছ?'
অনুরাধা বলল 'রে'খার কিছু হয়েছে রিম্পা? '
 রিম্পা বলল'⁹ না তো?'<
শিবানী বলল "ওর মুখটা ভারী, তাই বলছিলাম।
রিম্পা শিবানীর কথায় কান না দিয়ে বলল' সবাই শোনো একটু মিটিং আছে । বড়দি আমাকে বলতে বললেন ,তাই বললাম।'
এরইমধ্যে ঘন্টা পড়ল।
এরমধ্যে বড়দি ঝড়ের গতিতে স্টাফ রুমে ঢুকে বললেন 'আজকে মিটিং ডাকা হয়েছে মূলত পরীক্ষা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য।
আগামী সপ্তাহে স্কুলের টেস্ট পরীক্ষা শুরু হচ্ছে।
আপনারা সবাই চেষ্টা করবেন এই সময় গুলোতে ছুটি না নেবার ‌। পরীক্ষার দিনগুলোতে কোন সি এল গ্রান্ট হবে না।'
শিবানী বলল 'কিন্তু দিদি, কারুর তো কোনো আর্জেন্ট প্রয়োজন হতে পারে?'
অনুরাধা বলল' হ্যাঁ দিদি ঠিকই তো।'
বড়দি সে কথার কোন গুরুত্ব না দিয়ে বললেন' নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো কার্পণ্য করবেন না আর নম্বরগুলো এবং খাতাগুলো খুব যত্ন করে রেখে দেবেন সংসদ চেয়ে পাঠালে পাঠানো হতে পারে।'
অনুরাধা বলল 'দিদি পরীক্ষাসংক্রান্ত বাইরে একটা কথা বলতে চাই?'
বড়দি বললেন 'হ্যাঁ বলুন।'
অনুরাধা বলল 'অনিন্দিতা জানতে চাইছে কতজন মোটামুটি ওর বিয়েতে অ্যাটেন্ড করছে। '
বড়দি বললেন 'সেটা আলোচনা করে তোমরা ঠিক করো।'ঠিক আছে মিটিং এখানেই শেষ হলো।'
শিবানী বলল "রেখা কিছু বল বিয়েতে যাবার ব্যাপারে?"
অনুরাধা বলল'সব ব্যাপারে ওর  উৎসাহ বেশি থাকে। মনমরা হয়ে থাকলে ভালো লাগে না।স্কুল থেকে গাড়ি করা হচ্ছে ।কে কে যাবে আমাকে জানিও।'
শিবানী বলল' হ্যাঁ কজন যাচ্ছে সেই বুঝে সেরকম গাড়ি করতে হবে।'
রিম্পা বলল 'আমি আর রেখা যাচ্ছি।"
শিবানী বললো 'তাহলে আমরা মোট 10 জন হচ্ছি'। 'অনুরাধা বললো তাহলে দুটো গাড়ি করতে হবে।
ইতিমধ্যে টিফিন শেষ হওয়ার  ঘন্টা পড়ে গেছে পাঁচ মিনিট হয়ে গেল। 
বড়দি এসে বললেন" আপনাদের আলোচনা এখনো হচ্ছে? দেখুন দেখুন কার কি ক্লাস আছে?'
আলোচনায় যেন একটা ছন্দ পতন ঘটল। প্রত্যেকে তড়িঘড়ি করে ক্লাসে যাবার জন্য তৈরি হয়ে গেল।'
রেখার কানে আজকে এই সমস্ত কথা কোনো রেখাপাত করল না।ক্লাস ছিল না বলে স্টাফ রুমে ই ছিল রেখা।তখন ফোন বেজে উঠলো। রিংটোন বাজতে শুরু করলো-
'সবাই তো সুখী হতে চায়..?
রেখা ফোনটা রিসিভ করে বলল' হ্যালো'।
মনোজ বলল' কখন ফিরছো?'
রেখা বলল 'স্কুল ছুটি হলে?'
মনোজ বলল আজকে বড়দিকে বলে একটু তাড়াতাড়ি আসতে পারলে না পার্থদের বাড়ি কাজ ছিল।'
রেখা বলল' বলার স্কোপ পাই  নি।'
মনোজ  বললো' তোমার কি কিছু হয়েছে?'
রেখা বলে কই না তো?
মনোজ  বলল' মনে হচ্ছে যেন ভেতরে কত কষ্ট, কিছু লুকিয়ে যাচ্ছ?'
রেখা বলল' না সেরকম কিছু নয়।'
মনোজ  বলল' আজকে একবারও ফোনও করলে না?'
রেখা বললো' সময় পাই নি।'
মনোজ বলল 'ঠিক আছে ফোন রাখছি।'
ফোনটা কেটে দিয়ে শুধু ভাবতে লাগলো যাকে ভালোবাসা যায় তাকে চিরদিন আটকে রাখা যায় না ।ভালোবাসা তো ক্ষনিকের সুখ দিয়ে চিরস্থায়ী করে যায় ।শীতে শিশির স্নাত দূর্বা ঘাসে সূর্যের কিরণে উজ্জ্বল আলোর সৃষ্টি করে তাও তো ক্ষণস্থায়ী অথচ তা মনমুগ্ধকর ।সেই সুখস্মৃতি নিয়েই পরের দিনের অপেক্ষা। রিম্পাদি রেখার জীবনে সেই সুখস্মৃতি ।কল্পনার সমুদ্রে সুখটাকে নেড়েচেড়ে আগামী দিনগুলোতে পথ চলা।  গোধূলি বেলায় সেই ম্লান সূর্যের আলোর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে রেখা শুধু বলে ওঠে এই তো জীবন।এই তো জীবন।এই তো জীবন।