১৫ মার্চ ২০২২

Poet Suparna Chatterjee 's poem




Festival of Colour

Mrs.Suparna Chatterjee


Significance of colour means
A beautiful loving heart.
Which is very rare
And the most precious.
Significance of colour means
Welcoming Spring 
At the end of Winter.
Significance of colour means
A couple of lovers’ 
Madness of love.
Significance of colour means
Falling of dry leaves,
And coming out with green leaves instead of it.
Significance of colour means
Constant pain of a broken heart.
Significance of colour means
Endless waiting for a distant love.
Significance of the “Festival of Colour” means,
To enjoy the day 
In a different way.
By forgetting every wounds 
 Learn to love all the people of the beloved Earth.
     

১৪ মার্চ ২০২২

মনি জামানের ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৬






ধারাবাহিক উপন্যাস


সেদিন গোধূলি সন্ধ্যা ছিল
( ১৬ তম পর্ব ) 
মনি জামান




রাত শেষে ভোরের আলো ফুটলো চারি দিকে,পাখির কিচিরমিচির ডাক শুনতে শুনতে যেন সকাল হলো,সকালের নাস্তার জন্য জান্নাত আসমাকে ডাকলো ভাবি আসেন নাস্তা রেডি।আসমা ঘরের ভিতর বুঝতেই পারলো না এখন সকাল আটটা বাজে,আসমা উঠলো দাঁত ব্রাস করে চোখ মুখ ধুয়ে খেতে এলো টেবিলে।
জান্নাত বলল,ভাবি খেয়ে নিনি আসমা নাস্তা নিয়ে নাস্তা খেলো,খাওয়ার পর বলল,বোন তুমি স্কুলে যাবে না আজ?জান্নাত বলল,হ্যাঁ ভাবি যাবো নয়টায় আমাদের ক্লাশ শুরু আগে ঘরের কাজ গুলো সব সেরে নেই।
বাড়ির সব কাজ সেরে জান্নাত স্কুল ড্রেস পরে আসমাকে বলল,ভাবি আমি স্কুলে যাচ্ছি তাড়াতাড়ি ফিরবো আপনি কোথাও যাবেন না।আসমা বলল,বোন তুমি স্কুলে যাও আমি একটু ঘুমাবো আমার খুব ঘুম পাচ্ছে বলেই আসমা ঘুমাতে গেলো তারপর শুয়ে পড়লো শরীরটা খুব ক্লান্ত লাগছে,কখন ঘুমের অতলে ডুব দিলো আসমা জানে না, যখন জেগে উঠলো আসমা তখন দুপুর হয়ে গেছে কখন টেরই পেলো না তখনো ও আসমা শুয়ে আছে।জান্নাত কখন ফিরেছে স্কুল থেকে আসমা কিছুই জানে না জান্নাত যখন আসমাকে ডেকে বলল,ভাবি উঠেন গোসল সেরে নেন বেলা অনেক হয়েছে,আসমা উঠে বসলো তারপর ওয়াশ রূমে গিয়ে দুপুরের গোসল সেরে নিলো আজ একটু ঝরঝরে ফ্রেশ লাগছে নিজেকে,জান্নাত বলল,ভাবি কিছু লাগলে আমাকে বলবেন আমি একটু থালা বাটি ধুতে যাচ্ছি,আসমা বলল,ঠিক আছে কিছু লাগলে বলবো তোমাকে বোন বলেই আসমা আবার ঘরে চলে এলো।
আসমার ললাটে কলঙ্কের তকমা লাগানোর পর থেকে লজ্জায় কোথাও বের হয়নি আজ দুইদিন,সারাদিন ঘরে কাটে আসমার একাকি সময়।আসমা ভাবছে ফিরোজকে তার কথা গুলো বলা উচিত,কিন্ত ফিরোজ তো ঢাকায় কাজে আছে,বাড়ি ফিরলে আসমা আর যেতে পারবেনা যে সিদ্ধান্ত সে নিয়েছে সেখানে যেতে,চেয়ারে বসে কিছুক্ষণ কি যেন ভাবলো তারপর কাগজ কলম নিয়ে লিখতে বসলো।
সাংবাদিক ফিরোজকে উদ্দশ্যে করে লিখলো-
প্রিয় ফিরোজ ভাই,
জানি তুমি ঢাকায় আছো কাজে,আমাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য আমি চির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি,তবে আমাকে ক্ষমা করো ভাই আমার কিছুই করার নেই,তাই সেদিন তোমার বিয়ের প্রস্তাবটা ফিরিয়ে দিয়েছিলাম,হয়তো তুমি দুঃখ বা অনেক কষ্ট পেয়েছো আমাকে অহঙ্কারিও ভেবেছো কিন্তু আমি কখনো অহঙ্কারি ছিলাম না। আমার রাজকুমার জিকু আমার হৃদয়ে এতোটা জায়গা জুড়ে আছে,সেখানে আমি আর কারো কথা ভাবতে বা কল্পনাও করতে পারিনা,কষ্ট পেলে ক্ষমা করে দিও ভাই।আর কখনো তোমার সাথে আমার দেখা হবে না কথা ও হবে না,এমন কি আমার বাবা মা ছোট দুটো বোনের সাথে ও না।তুমি ঢাকা থেকে ফিরে যদি আমার মৃত লাশ পাও তবে তোমার কাছে অনুরোধ আমার লাশটা আমার রাজ কুমারের কবরের পাশে আমাকে কবর দিও,যদি অপরাধ করে থাকি বোন হিসেবে এই অভাগী বোনের অনুরোধ টুকু রেখো ভাই এটাই আমার শেষ ইচ্ছে।
---
ইতি  আসমা।
আসমা চিরকুট লিখে টেবিলের উপর সুন্দর করে কাগজটা ভাঁজ করে রেখে দিলো,তারপর ঘরের জানালার সিক ধরে দাঁড়িয়ে দেখছে বাইরের আলো ঝলমলে দুপুরের উত্তপ্ত রোদ যেন ঝা ঝা নৃত্য করছে,তবুও আজ এত সুন্দর দুপুর মনে হয় কখনো দেখেনি সে।আসমার খুব মনে পড়ছে আজ তার ছেলে নয়নের কথা,স্বামী জিকুর কথা।প্রবল ইচ্ছে করছে তার স্বামীর কবরটা ও শেষ বার একটু দেখে আসার জন্য,আসমা জানে সে এই কলঙ্কিত মুখ নিয়ে বের হতে পারবেনা কোথাও,তবুও ইচ্ছে করছে যদি একবার তার প্রিয় রাজকুমারের কবরটা শেষবারের মত দেখতে পেত।আজ সব ইচ্ছের কবর দিয়েছে সে,মোমেনা বেগমের বাড়ি থেকে করব স্থান একটু দুরে ফিরোজদের বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে কবর স্থান দেখা যায় দিনের বেলায়।
আসমা জানালা দিয়ে দেখছে কিন্তু সেটা দেখার ব্যর্থ চেষ্টা কিছুই দেখতে পাচ্ছে না, শুধু বাঁশ বাগান আর ঝোপঝাড় ছাড়া কিছুই দেখা যায় না,পুরো কবর স্থান জুড়ে যেন ঘিরে রেখেছে বাগান গুলো।
আসমার আজ বার বার মনে হতে লাগলো পাষান পৃথিবীর এই জীর্ণ কুঠিরে সে একা, অথচ একদিন ভালবাসার বাসরে রাজকুমারের সাথে গল্পে গল্পে কেটেছে কত যে নির্ঘুম রাত কত আনন্দ কত প্রেম দিয়েছে তার রাজকুমার তাকে উজাড় করে।
এ জীবনে রাজকুমার ছাড়া তাকে আর কেউ এত ভালোবাসেনি অথচ আসমা আজ সমাজের চাপিয়ে দেওয়া কলঙ্কের বোঝা মাথায় নিয়ে এ পৃথিবীতে বেঁচে আছে, ভাবছে আসমা চোখ দুটো অশ্রুতে ছল ছল করছে যেন শ্রাবণ শুরু হয়ে গেছে।আসমার এই ক্ষণিক জীবনে ঘটে যাওয়া কষ্ট গুলো তাকে এতোটাই বিমূঢ় করে তুলেছে যা জীবনে কখনো ভাবেনি আসমা এমন হবে তার জীবন,আজ স্মৃতির বাক্স গুলো সব রেখে যাচ্ছে সে।জীবনের সব চাওয়া যেন দুহাত ভরে নিয়েছে কুড়িয়ে, অযত্নে লালিত কষ্ট নামের প্রিয় মুহুর্ত গুলো।আসমা কাঁদছে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো,আজকের বিকেলটা গোধূলি রঙ মাখাছে যেন আকাশকে, আবির ছড়াচ্ছে দিন আর সন্ধ্যার প্রণয়ের খেলা চলছে এখ ঠিক এই মুহুর্তে।একটু পরেই সন্ধ্যা নামবে আসমা জানালায় দাঁড়িয়ে অবলোকন করে দেখছে পৃথিবীর শেষ দৃশ্য গুলো,এই সুন্দর পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কত স্বপ্ন ছিলো তার,আজ সব স্বপ্ন মুছে গেছে তার জীবন থেকে ধনী দরিদ্রের ব্যবধান এক বাস্তব কঠিন সত্যের সামনে।
আসমা ভাবছে পৃথিবীর কোন সংবিধানে,কোন আইন প্রণেতা লেখেছিল কি ধনী গরীবের ভালোবাসা অপরাধ?যদি নাই লিখে থাকবে তাহলে সমাজ এত নিষ্ঠুর কেন,কেন গরীব ঘরের মেয়ে বলে?আসমা ভাবছে তার জীবনে ঘটে যাওয়া কষ্টের কথা গুলো আসমা ঘরে একা সন্ধ্যা নামতে আর বেশি দেরি নেই,আসমার ছেলে নয়নের কথা মনে পড়ছে খুব কষ্ট হচ্ছে ছেলেটার জন্য কিন্তু কিছুই করার নেই তার,বাড়ি ফিরে যাবার ও উপায় নেই শাশুড়ি কলঙ্কের তিলক এঁকে দিয়েছে তার ললাটে আজ সে কলঙ্কিত। এ মুখ নিয়ে সন্তানের সামনে কি করে দাঁড়াবে আসমা?মন স্থির করলো সন্তানের কাছে ফিরে যাবেনা সে হঠাৎ জান্নাত রাতের খাবারের জন্য ডাকলো ভাবি খেতে আসুন ভাত নিয়ে এসেছি।আসমা চমকে উঠলো উঠেই চোখ মুছে বসলো কারণ গভীর ভাবনায় এতক্ষণ মগ্ন ছিলো সে।
আজ কিছুই ভালো লাগছেনা আসমার, জান্নত আবার ডাক দিয়ে বলল,ভাবি আসেন খাবার টেবিলে আমি ভাত বেড়ে রেখেছি এসে খেয়ে নিন।আসমা এবার উঠে ওয়াশ রূমে গিয়ে চোখ মুখ ধুয়ে ফ্রেস হয়ে সোজা খাবার টেবিলে এসে বসলো।
জান্নাত আসমাকে খাবার দিয়ে বলল,জানেন ভাবি ফিরোজ ভাই ফোন করেছিল আমাকে,ফোনে আমাকে কি বলেছেন?আসমা শুধু বলল,কি বলেছে!জান্নাত বলল,ফিরোজ ভাই আমাকে বলেছেন আপনার আদর যত্নের কোন রকম যেন ত্রুটি আমি না করি,সবসময় আপনার সাথে যেন থাকি।কথাটা শুনে আসমা হাউমাউ করে কাঁদে উঠলেনপর যখন আপন হয় তখন এমন মনে হয় আপনত্ব হৃদয় স্পর্শ করে,জান্নাত বলল,ভাবি কাঁদবেন না সব দেখবেন ঠিক হয়ে যাবে কাল সকালে ফিরোজ ভাই বাড়ি আসবে এসে আপনাকে ঢাকায় নিয়ে যাবে ভালো একটা হাসপাতালে ভর্তি করাবে ভাইয়া বলেছে আমাকে।
আসমা কোন রকম একটু খেলো তারপর হাত মুখ ধুয়ে জান্নাতকে বলল,বোন কিছু ভালো লাগছে আজ আমার,আমি একটু ঘুমাবো।জান্নাত আসমাকে বলল,ঠিক আছে ভাবি আপনি রূমে গিয়ে শুয়ে পড়ুন,আমি পড়ার রূমে গিয়ে পড়তে বসি
কালকে আমাদের পরীক্ষা।আসমা বলল,যাও বোন পড়তে বসো,জান্নাত চলে গেলো আসমা খাওয়ার টেবিল থেকে উঠে সোজা রূমে চলে এলো,এসেই শুয়ে পড়লো দেওয়াল ঘড়ি দেখলো রাত আটটা বাজে।আসমার চোখে আজ আর ঘুম নেই একটা অস্থিরতা মনের ভিতর কাজ করছে, কখন রাত নির্জন হবে সেই অপেক্ষা।
এশার আযান হচ্ছে আযানের ধ্বনিতে মুখরিত চারপাশ,জানান দিল রাতের শেষ নামাজ ঘনিয়ে এলো নামাজীরা মসজিদে এসো।আসমা শুয়ে শুয়ে অপেক্ষা করছে কখন নিরব নিঝুম হবে রাত,কখন মানুষের কোলাহল কমবে ভাবতে ভাবতে কখন রাত দশটা বাজলো বুঝতে পারলো না।
ভাবছে আর একটু রাত ভারী হোক তারপর ঘর থেকে বের হবো,অপেক্ষা করছে আসমা সেই মহেন্দ্র ক্ষণের।আজ এই মুহুর্তে আসমা অস্থির হয়ে উঠলো বিতৃষ্ণা তাকে ঘিরে ধরেছে,আসমার মনে হলো সে এখনো বসে আছে কেন তাকে তো বের হতে হবে।কিন্তু এখনো যে রাত গভীর হতে বাকি সবাই ঘুমিয়ে পড়লে তারপর বের হতে হবে।আসমা অপেক্ষা করছে যদিও জানে সে এ অপেক্ষা অনেক কষ্টের তবুও এ অপেক্ষা তার সময়ের।


চলবে.....

মমতা রায় চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৩২




উপন্যাস 


টানাপোড়েন ১৩২

দু'মুঠো বিকেল ছুঁড়ে দাও

মমতা রায় চৌধুরী


বাপরে বাপ কি এক উষ্ণতা সারা শরীর 
জুড়ে ।যেন মনে হচ্ছে শরীরটাকে পুড়িয়ে 
দিচ্ছে ।বাড়িতে ফিরে এসে বারবার ওয়াশরুমে গিয়ে ঠান্ডা জলে ছিটে দিচ্ছে শিখা। তবে আজকের বিকেল মনে রাখার মত।
শিখাকে দেখে মাধু বৌদি বলল 'হ্যাঁ রে তোদের আজকে অনেক কেনাকাটা হলো না?
কোন সাড়া না পেয়ে বৌদি ওপরে উঠে আসল 'শিখা ,শিখা, শিখা।'
কেউ কোথাও নেই দরজাটা হাট করে খোলা গেল কোথায়? এদিকে বাথরুম থেকে জলের আওয়াজ আসছে বুঝতে পারল বাথরুমে আছে ।বাথরুমের দরজায় নক করলো 'ঠিক আছিস?'
শিখা চোখেমুখে জল ছিটিয়ে দেয়ার চেয়ে মনে হয়েছিল নিজেকে ঠান্ডা জলে একটু ভিজিয়ে নিলে ভালো হয়  তাই শাওয়ারটা খুলে দিয়েছিল শাওয়ারের কলটা বন্ধ করতে করতে বলল 
'হ্যাঁ বৌদি?'।
'ঠিক আছে ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে আসবি। খাবার দেব?'
'আজকে আমি কিছু খাব না বৌদি।
শিখা মনে মনে ভাবছে এখনো গা টা যেন আনচান করছে।'
'খাবি না মানে? কেন খেয়ে এসেছিস? বাবা, কল্যাণ এখনই তোকে বাইরে খাইয়ে দিচ্ছে। ভালোই তো এরকম ঘুরতে বেরোবি ,বাড়িতে এসে আর কোন রান্নাবান্নার ঝামেলা থাকবে না।',হাসতে হাসতে বলল মাধুরী।
'আমি চললাম রে। যাই ওদিকে তোর দাদা ,বৃষ্টি সব তোর জন্য ওয়েট করছিল।'
মাধুরী তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসলো ।
বৃষ্টি বলল 'মা পিমনি কি আসবে না খেতে? '
'না মা ,তোমার পিমনি খেয়ে এসেছে।'
সুরঞ্জন বলল 'খেয়ে এসেছে মানে,,,?
'বাইরে বেরিয়ে ছিল  না কল্যান আর শিখা।'
মাধুরী চিকেন রেজালা বাটিতে দিতে দিতে বলল কিন্তু ওর জন্যই তো আজকে চিকেন রেজালা করেছিলাম ।থাক কাল খাবে?'
"আমিও চিকেন রেজালা খেতে ভালোবাসি মা।'
যেই শিখার কথা বললাম ওমনি আমারও ভালো লাগে ।ভালো লাগে তো খাও।'বৃষ্টির  নরম গাল দুটো টিপে দিয়ে বলল' খুব হিংসুটে হয়ে যাচ্ছ না?'
সুরঞ্জন বলল 'এই মাধু তুমিও একবারে নিয়ে নাও। একসঙ্গে খাই।'
শিখা বাথরুম থেকে বেরিয়ে নিজেকে খাটের উপরে এলিয়ে দিল আর ভাবলো কল্যান গাড়ি কিনেছে নিজেই ড্রাইভ করছিল। শিখাকে ড্রাইভ শেখাতে গেছিল। নতুন ড্রাইভ শিখতে গিয়ে একটা কেলেঙ্কারি হয়ে যাচ্ছিল আরেকটু হলে। খুব বাঁচা বেঁচে গেছি।ড্রাইভিং শিখতে গিয়ে যতটুকু না ভালো লেগেছিল তার থেকে বেশি ভালো লেগেছিল কল্যাণের সান্নিধ্য। 
কেন এরকম হয়েছিল কে জানে? আর তো বেশিদিন তাদের আলাদা থাকতেও হবে না। তবুও বারবার অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ"একটা গেল গেল 'বলে একটা শব্দ উঠেছিল ।'ঘ্যাঁচ 'করে একটা বিশ্রী আওয়াজ করে ব্রেক কষে গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়েছিল। কল্যাণ হ্যান্ড ব্রেক টেনে দিয়েছিল।সঙ্গে সঙ্গে শিখার ডান পাটাও আপনানথেকে উঠে এসে এক্সেলেটর এর ওপর চেপেও বসেছিল। গাড়ির সামনে পড়েছিল একটা বাচ্চা ।ঈশ্বরের অসীম কৃপা যার জন্য বাচ্চাটি বেঁচে গেল।পথচারীরা সব, জড়ো হয়ে গেছিল। ভয়ে গাটা খুব কাঁপছিল সেটা এখনো রয়েছে।
যাক কি বিশ্রী কান্ড হত ভাবতেই পারছি না।
তবু এত কিছুর মধ্যে কল্যাণের সান্নিধ্যটা মন ছুঁয়ে গেছে। অথচ বিয়ের আর বেশি দিন বাকি নেই। হ তখন কল্যাণ কে সব সময়ের জন্য পাবে। তাহলে মনে এত অধৈর্য্য হচ্ছ কেন?
অন্যদিকে আজকে কল্যাণের গলাটা ভালো ছিল না মাঝে মাঝে গলাটা ধরে আসছিল গলায় কি  ইনফেকশন হয়েছে ?একবার ফোন করার দরকার।
ভাবতে ভাবতেই রিং করলো । ফোন বেজে গেল ধরল না। আবার ঘুরিয়ে ফোন করলো ফোনের রিংটোন বাজছে'ক্রমশ গল্পগুলো পাতা জুড়ে যাচ্ছে, দুমুঠো বিকেল যদি চাও ছুঁড়ে দিতে পারি...।'
এবার ফোন ধরল বলল' হ্যালো'।
'আমি বলছি।'
বুঝতে পারছি বলো।
তোমার গলার অবস্থা তো খুব খারাপ।
গারগিল করেছ?
না এখন করা হয়নি।
সেকি?
'এত নেগলেট কেন করো?'
'না ,শিখা এসে একটু কাজে বসে ছিলাম।
একটা ভাইটাল লেকচার দেওয়ার আছে সেটাই রেডি করছিলাম।'
'কিন্তু যা গলার অবস্থা দেখছি তুমি পারবে?
বিশ্রাম দাও না গলাটা কে।.. ছুটি নেয়া যায়না?'
'তা যায় তবে এখনই ছুটি নেব এরপর তো ছুটি কাজে লাগবে।'
'থাক শরীর খারাপ বরং তুমি ছুটি নাও আর গলার  ডাক্তারকে দেখিয়ে নাও।'
'আর কটা দিন দেখিনা?'
'গলাটা তোমার বড্ড খারাপ হয়েছে এরপর আরো কটা দিন দেখবে, বুঝতে পারছ সামনে একটা ভাইটাল তোমার প্রোগ্রাম রয়েছে?'
"সব বুঝতে পারছি।'
"না ,তুমি আগে ডাক্তারের কাছে যাবে, কথা দাও।"
'দেখি কালকে তো একটা জায়গায় যাবার আছে লেকচার দেবার আছে। তারপরে সে না হয়..।'
'তুমি ঠিক আছো?'
"আমি তো ঠিক আছি কিন্তু তোমাকে নিয়ে তো টেনশন হচ্ছে।'
', তোমার রিসেপশনের শাড়ি কেনার জন্য আরেকদিন বেরোতে হবে বুঝলে?'
'আমাকে যেতেই হবে তুমি কিনে নিও তাহলেই হবে।"
'তোমার একটা পছন্দের ব্যাপার আছে বিয়ে বলে কথা সারা জীবনের ব্যাপার তোমার পছন্দটা তাতে থাকবে না?'
শিখা কিছুক্ষন চুপ করে থাকে ।
এরকম দুমুঠো বিকেল পেতে তো ভালোই লাগে। তোমার ভালো লাগলো?'
শিখা বলল' কি করে বোঝাবো তোমায় আমি। আমার ভেতরে কি  যে হচ্ছে।'
কল্যান বললো ' বলো, বলো কি হচ্ছে ?'
"জানিনা।'
'তাহলে আমাদের গল্পের পাতা যেখানে জুড়ে যাচ্ছিল তুমি এখানেই শেষ করে দিতে চাইছ।'
'এসে আমাকে অসময়ে শাওয়ারে ঢুকতে হয়েছে।'
'সেকি?
'তুমি ঠিক আছো?'
'হ্যাঁ স্নান করতে হলো।'
'কেন?
'এই শোনো, তুমি সব বোঝো। তারপরও তুমি এভাবে আমাকে প্রশ্ন করছো?'
ইসসসস স।
'ঠিক আমি কল্পনা করছি তুমি ভিজে  জলে ভেজা গায়ে কোনরকমে বাথগাউনটা জড়িয়ে স্নান থেকে ছুটে এসেছ তাই না ?তারপর তোমার সদ্য স্নাত দেহ থেকে বের হচ্ছে সুবাস। ভিজে চুল লেপ্টে আছে তোমার গালে ,কপালে ,চোখের পাতায় অভ্রচুর্নের মত জলকণা জমে আছে ।কবে যে তোমাকে এই রূপে দেখতে পাবো। নিজেকে সামলাতে পারছি না  ।'
ঠিক এভাবে যখন তুমি আমার বাড়িতে আসবে সদ্য স্নান করে তুমি আমার কাছে এসে দাঁড়াবে চুল থেকে বিন্দু বিন্দু সুরভিত টুপটাপ করে পড়তে থাকবে প্রসাধনহীন মুখের চারপাশে ভিজে চুল লেপ্টে থেকে কি অসাধারণই   না 
লাগবে ।তোমার গাউনের নিচে থাকবে না কোনো বর্ম চর্ম ।শুধুই তুমি আবরনহীন সমস্ত সুবাস আমি আমার ইন্দ্রিয়দিয়ে নিজের কাছে টেনে নেব।'
'হয়েছে মশাই, আর কাব্য করতে হবে না।'
'আমি তোমার বাড়িতে যাইনি ,আমি নিজের বাড়িতেই আছি আর তুমি তোমার বাড়িতে আছো।
এবার বাস্তবে ফিরে এসো'
'শোনো তুমি অবশ্যই কথা দাও যে তুমি ডাক্তার দেখাবে।'
'জো হুকুম ম্যাডাম।'
শোন আমি ফোন রাখছি আমার কালকে একটা ভাইটাল lecture আছে ।ওর জন্যআমাকে রেডি হতে হবে বুঝেছ?
'বুঝলাম।
'রাগ করলে'
'রাগ করে ও তো উপায় নেই।'
'ঠিক আছে এখন রাগ করলেও পরে সুদে আসলে ফেরত দেবো।'
'টেক কেয়ার।'
'তুমিও নিজের প্রতি যত্ন নিও। বাই।'
ফোন কেটে দিল।
সামান্য কিছু খেয়ে নিয়ে ল্যাপটপের সামনে বসে পড়ল। খেতে গিয়ে কষ্ট হচ্ছিল।
ল্যাপটপের অক্ষরগুলো টপাটপ ফণা তুলে স্কিন ভরিয়ে দিতে লাগলো।
আজকে কি হয়েছে কল্যাণের পদে পদেই কি যেন একটা গোলমাল হয়ে যাচ্ছে ঠিকঠাক লেখা গুলো আসছে না। কিন্তু হাল ছাড়বার পাত্র নয়।

এরমধ্যে কলিং বেল বাজল। দরজা খুলতেই দেখা গেল কয়েকজন ভদ্রমহিলা।
ল্যাপটপ বন্ধ করে কল্যান ভদ্রমহিলা দফায় বসার জন্য অনুরোধ করলেন।
নমস্কার।
নমস্কার।
আমরা এসেছি অল বেঙ্গল উইমেনস লীগ থেকে।
আমাদের তিতলি ম্যাম পাঠিয়েছেন।
কিন্তু এতটাই কাজে ব্যস্ত কল্যাণ সে কথা মুখ ফুটে বলতে পারছে না তাহলে সর্বদা মুখে হাসি দেখেই স্বাগত জানাতে হয়।
এবার এদের হাত থেকে কিভাবে অব্যাহতি পাবেন। এদের হাজারো চাহিদা।
এতকিছু মন দিয়ে শোনার সময় ও কল্যাণের কাছে নেই। জানি কি করে এদের কাছ থেকে অব্যাহতি পেতে হয়।
কয়েকটি কৌশল আয়ত্ত করে রেখেছে।
প্রথমে যখন তাদের কথাগুলো আর শুনতে ইচ্ছে করবে না তখন কল্যান হয় একটু অমনোযোগী হয়ে যাবে না হলে কিছু শুনাও শুনতে না পাওয়ার ভান করবে নয়তো জবাব না দেবে তাতেও যদি শেষ রক্ষা না হয় তখন আচ্ছা বলে উঠে দাঁড়াবে।
কারণ আজকে তাকে এই লেখাটা রেডি করতেই হবে।, যা ভাবা সে রকমই কাজ।
শেষপর্যন্ত তাদেরকে বিদায় জানিয়ে দরজাটা বন্ধ করে আবার ল্যাপটপের সামনে বসে পড়ল।
এর মধ্যেই কাজের মাসি এসেছে।
রিতা মাসিএসে বলল 'কফি খাবে?'
,'হ্যাঁ দিলে খুব ভালো হয় মাসি।
ল্যাপটপে চোখ  শুধু হেসে কথাটা বলল।
' আমাকে একটু গারগিল করার জল দাও তো। গলাটা খুব ধরে আছে।'
'হ্যাঁ ,দাঁড়াও আমি এক্ষুনি দিচ্ছি।'
গারগিল এর জল দিয়ে গেল রিতা মাসি ।গারগিল করল তারপর  ব্ল্যাক কফি করে দিয়ে গেল।
মাসি বললো আজকে রাত্রে  কি করব চানার তরকারি আর রুটি খাবে?'
'আজকে আর কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না মাসি?'
'না ,না ,না খেলে কি করে হবে। ওভাবে বলো না তো ,কিছুতো খাও।'
'মাসি কফিটা খুব ভালো হয়েছে।'
'যাক তোমার ভালো লেগেছে আমি খুব খুশি।'
'কি করব বল?'
'কি বলি বলতো?  আমার তো খেতে ইচ্ছে করছে না?
ঠিক আছে শোনো ঘরে কলা আছে তো মাসি?'
'হ্যাঁ ,আছে।'
'ঠিক আছে তুমি ডিম টোস্ট করে যাও আর সেরকম হলে আমি  ওটস খেয়ে নিতে পারি।
ঠিক আছে।'
'আর শোন ও মাসি কালকে একটু সকাল সকাল আসবে কালকে কিন্তু আমার একটা জায়গায় ইম্পর্টেন্ট কাজ আছে।'
'তাই আসবো।'
'মাসি খাবার বানিয়ে রেখে বলে গেল শোনো তোমার গলাটা কিন্তু আমার মোটেই ভালো লাগছে না ।তুমি কাল গলার ডাক্তারকে দেখিয়ে ফেলো বাবা।'
'দেখি চেষ্টা করব নিশ্চয়ই। তুমি ভেবো না মাসি।'
'মাসি চলে গেল। আরো ঘন্টাখানেক লেখার সঙ্গে ধস্তাধস্তি করল। একটা লেখা দাঁড়ালো কিন্তু মনের মতো হল না। আর পারা ও যাচ্ছে না।
একটু রিলাক্স করার দরকার।
ল্যাপটপ টা বন্ধ করার আগেই আবার ফোন বেজে উঠল।
কল্যাণ বলল 'হ্যালো।
কল্যাণ মনে মনে এটাই চাইছিল শিখার ফোনটা আসুক।
মনে হচ্ছিল দুমুঠো বিকেল স্পর্শ করে যায় স্নিগ্ধতায়। বড্ড ক্লান্তি লাগছে। কিন্তু না ফোনটা প্রফেশর দত্তর কাছ থেকে।
'আপনার লেখা রেডি?'
'হ্যাঁ রেডি করেছি।'
আমাদের কলেজ থেকে আপনিই যাচ্ছেন।
আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।'
তাহলে নির্দিষ্ট সময়ে আপনি পৌঁছে যাচ্ছেন প্রিন্সিপালকে বলে দিচ্ছি।'
কারণ এই কাজটা আপনার দ্বারাই হত।
ঠিক আছে রাখছি তাহলে আপনি রেস্ট নেন তবে আপনার গলাটা কিন্তু ধরা ধরা লাগছে গলায় কিছু হয়েছে কি?'
'ঠান্ডা লেগে বোধ হয়।'
'ডাক্তার দেখিয়ে নেবেন। রাখি তাহলে।
বেস্ট অফ লাক।'
ফোনটা নামিয়ে রেখে কল্যান চলে গে'ল ছাদে।
একাকী নিজেকে জানতে ইচ্ছে করছিল। এতক্ষণ ধরে একটা টানাপোড়েন চলছিল। ছাদে গিয়ে দেখল মস্ত একখানা তামার পুষ্প পাত্রের মতো লালচে চাঁদ উঠেছে।
অপরূপ তার সৌন্দর্য। শন শন শব্দে হাওয়া বইছে। এই  তামার থালাটি ও একসময়  ঢাকা পড়ে যাবে অসুখী হয়ে উঠবে রাত্রির চিকন মুখ।
তবু এই মুহূর্তে এই চাঁদের সৌন্দর্য তার মনটাকে স্নিগ্ধতায় ভরিয়ে দিল। আর দুমুঠো বিকেল এর যোগাযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করছিল।

কবি ফারজানা আফরোজ এর কবিতা





পথের আত্মকথা 
ফারজানা আফরোজ

মনের আরশিতে দেখি-
সেই চেনা পথ,
যেখানে ছুঁয়ে দিয়েছি স্বপ্ন সীমানা।
পথ যেন নীরব হয়ে বলছে,
নিজের আত্মকথা।
অনন্তকাল হেঁটে যেতে পারি,
এই পথ দিয়ে।
সমান্তরাল পথের বাঁকে-
থাকতে পারে চোরাকাঁটা,
কিংবা লুকানো চোরাবালি।
ধূলো ঝড় কিংবা তুষার ঝড়ের,
হাজারো ক্ষণের সাক্ষী এ পথ।
ধূসর আর উজ্জ্বল হাজারো স্মৃতি-
এ পথকে ঘিরে।
চাঁদ,তারাদের মেলা বসেছিল,
পাখিরা ফিরেছিল নীড়ে এই পথ ধরে।
চিরচেনা সেই পথে,
বারে বারে ফিরে আসি।
শিশির ভেজা পথটারে,
বড় ভালোবাসি ।
পথের মাঝে আঁকি,
জীবনের জলছবি।
একদিন শেষ হবে এই পথ চলা,
সব কাহিনী হবে চুপকথা।

কবি বাহাউদ্দিন সেখ এর কবিতা




নিঃশব্দে আওয়াজ
বাহাউদ্দিন সেখ 



নিঃশব্দে আকাশে ভেসে উঠবে- 
                           উথলে পরা মেঘ গুলো,
মেঘের ঘর্ষণে ঘর্ষণে সৃষ্টি হবে 
                  বিদ্যুৎ এর অব্যক্ত আওয়াজ।

ধেয়ে আসবে মৃত্তিকার স্তরে প্রলয়,
দমকা হাওয়ায় নিয়ে যাবে প্রেমের বিষাণ।
সত্য নির্জনতা প্রেম মর্চে মর্চে
                 লৌহোর মত ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাবে।

প্রেম ভালোবাসা বয়ে নিয়ে যাবে না,
                             ধর্ম জাতপাত উচ নিচ
তবুও নিঃশব্দে আকাশে ভেসে উঠবে-
        অব্যক্ত মেঘের ঘর্ষণে ঘর্ষণে
                                 বিদ্যুতের আওয়াজ।

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৬৭



ধারাবাহিক উপন্যাস 





শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৬৭)
শামীমা আহমেদ 



শায়লাদের পুরো বাসায় এখন বেশ থমথমে একটা ভাব।সারাদিনে ভাইবোনের খুবই কম কথাবার্তা হচ্ছে। সেদিন রুহি খালার কথাগুলো পর রাহাতের মাঝে বেশ পরিবর্তন এসেছে। রাহাত ভাবছে,আসলে মুরুব্বীরা অভিজ্ঞ মানুষ। আমরা এখন যা দেখছি সেটা তারা বহু আগেই পেরিয়ে এসেছে। তাইতো সবকিছুর পরিনতি তারা আগেই বলে দিতে পারে। আর আগে থেকে এই সতর্কবার্তায় রাহাত মনে মনে  রুহিখালার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে।
রুহি খালার প্রতিটি যুক্তি পালটা যুক্তি শায়লার ভিতরেও প্রতিনিয়ত আঘাত হানছে। শায়লা খুব ভালো করেই জানে,এই সমাজে মেয়েরা অনাকাঙ্ক্ষিত হয়েই জন্মায়। তাদের জন্মটাকে কেউ আনন্দের সাথে গ্রহন করে না। তবে প্রয়োজনের সময় সেই মেয়েই নিজের সুখ বিলাসকে তুচ্ছ করে সংসারের হাল কাঁধে তুলে নিতে পারে।নিজেকে নিঃশেষ করতে পারে। তবে শায়লা কখনো সেভাবে ভাবেনি। পিতৃহারা সংসারে একটি ছেলে থাকলে যা করতো সে তাই করেছে।  বড় সন্তান হয়ে সে তার জায়গা থেকে দ্বায়িত্ব কর্তব্য পালন করেছে। নিজে নিরাপদে থেকেতো  পিছিয়ে আসেনি। কিন্তু তাকে নিয়ে হিসেবের বেলায় সবাই জোড়াতালি লাগাতে চায়।
তার ঘাটতিগুলোকেই সামনে এনে বড় করে দেখা হয়। রুহিখালা আর তার স্বামী এখন তাকে নজরবন্দী করেছে।তাদের কাছে থেকে এক সময়ের আর্থিক সুবিধা নেয়া শায়লাদের পরিবারের উপর এখন অন্যায় আবদার করে চাপিয়ে দিচ্ছে।তবে তাদের এইসব আচরনে শায়লা নিজের ব্যাপারে আরো সচেতন হয়েছে, এটাই প্রাপ্তি।
এখন প্রতিরাতেই নোমান সাহেব কল দিচ্ছেন।শায়লার কি লাগবে?  কানাডা থেকে কি আনতে হবে? কানাডায় এলে,এই দেশের  কোন কোন সুন্দর জায়গা তাকে ঘুরিয়ে দেখাবে। এমনি নানান কথায় শায়লাকে নিজের দিকে টানতে চাইছে।শায়লা প্রতিটি কথায় একেবারেই  নীরব থেকেছে।

শিহাব অফিসে আজকাল বেশ আনমনা হয়ে থাকছে।একটা সময় ছিল শায়লাকে সে তাকে নিয়ে অন্যকিছু ভাবতে বারন করা ছিল।কেমন করে কিভাবে যেন ধীরে ধীরে শায়লার প্রতি তার দূর্বলতা চলে এলো। একদিনতো সবকিছু গুছিয়ে বলে শায়লাকে ফিরিয়েও দেয়া হলো।কিন্তু শায়লার অসুস্থতায় শিহাব নিজেকে পালটে ফেললো।ভেবে নিলো,হয়তো বিধাতাই শায়লাকে পাঠিয়েছেন তার একাকী জীবনে সঙ্গী হতে।কিন্তু এখন তার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে,এতটা কাছেই যদি এলো তবে বিধাতার এ কোন খেলায় আবার তাদের দূরত্ব হতে চাইছে।শায়লা বিবাহিত,অন্যের স্ত্রী, শায়লা সবইতো জানিয়েছে। কিছুই গোপন করেনি। কিন্তু কেন তবে কোন গভীরের টানে সে শায়লার প্রতি এমন ভালোলাগা এলো।ছেলে আরাফের কথা ভেবে আরাফের মায়ের শূন্যতা পূরণে শায়লাকে তার খুবই আপন মনে হয়েছে আর শায়লাও আরাফকে আপন করেছে, আমাকে ভালোবেসে। নোমান সাহেব দেশে আসতে আর কয়েকদিন মাত্র বাকী।এর মাঝে রাহাতও বেশ নীরব হয়ে গেছে।সেই আগের মত সহযোগিতায় থস্কছে না।গতকাল শায়লার সাথে  কথায় সেটাই বুঝলো শিহাব। 
আইনী বিষয়গুলি রাহাত দেখবে বলেছিল। কিন্তু তার কোন অগ্রগতি দেখছিন্স।তবে কি রাহাত শায়লাকে কানাডায় পাঠাতে চাচ্ছে।আর চাইবেইনা বা কেনো? বিবাহিত বোনকে তার  স্বামীর কাছে পাঠিয়ে ভাইতো তার দায় সারতেই চাইবে। শিহাব বুঝতে পারছেনা কিভাবে শায়লাকে এই শৃঙ্খল থেকে সে মুক্ত করে আনবে।শায়লাকে নিয়ে সে অনেক স্বপ্ন দেখেছে। তার ঘরে শায়লার চলাচল অনুভব করেছে।কত কত রাত জেগে জেগে শায়লার সাথে কথা হয়েছে।সারাদিন সে ব্যস্ততায় নীরব থাকলে শায়লা উৎকন্ঠিত হয়ে উঠেছে, আমার ফিরিয়ে দেয়ার কষ্টে সে নিজের উপর
সেই আঘাত সইতে না পেরে অসুস্থ হয়ে গিয়েছে। শিহাব আর ভাবতে পারছে না।মনের দাবীর কাছে কি কাগজের আর আইনের বন্ধনের অধিকার বেশি হলো?
শিহাব এভাবে ভাবতে চায়নি কিন্তু শায়লার ঐ মায়াভরা মুখ তাকে এভাবেই বেঁধেছে।
তবে আজ দুদিন হলো শায়লা খুব কম কথা বলছে। তবে কি সে অন্যরকম কিছু ভাবছে? শিহাবের ঘর আজ শূন্য লাগে,কই কতদিন যাবৎইতো সে একাই ছিল,তখনতো কাউকে খুঁজেনি,আবার কোন দিন মনে কোন স্বপ্ন উঁকি দিবে তাতো সে কল্পনাও করেনি।কি করবে এখন। শায়লা যে তার জীবনে অনেকখানি যায়গা নিয়ে নিয়েছে। শিহাব আর কিছু ভাবতে পারছে না।দুশ্চিন্তায় রাতের ঘুম কমে গেছে।সিগারেট খাওয়া বেড়ে গেছে।নাহ, এভাবে অন্য, শায়লাকে পেতে হলে তাকে অন্যভাবে অন্যরকম কিছু ভাবতে হবে। 

রাহাতের অফিস থেকে শায়লার মোবাইলে কল এলো।  আপু,আম্মুর কিছু ওষুধ লাগবে।আমাকে কল দিয়েছিল।তুমিওতো জানোই কি কি লাগবে।তুমি একটু বের হয়ে গিয়ে কিনে রেখো।আমি অফিস থেকে বেরুতে পারছি না। ফিরতেও রাত হবে। তুমি রকটু ওষুধগুলো কিনে রেখো।আমি কাল মাকে আনতে যাবো। মা উত্তরায় চলে আসতে চাইছে।নায়লা এখন মোটামুটি ভালো আছে।
 শায়লা সবটা শুনে বললো আচ্ছা আমি বিকেলে বেরুবো।কিনে আনবো।
শায়লা সারাটাদিন একা একাই ঘরে সময় কাটায়। নায়লার বাসা থেকে মায়ের নিয়মিত ফোন আসছে।বড় জামাই কানাডা থেকে আসবে এজন্য তার অনেক চিন্তা ভাবনা। তাকে কি কি দিতে হবে কি কেমন আপ্যায়ন করা হবে।বিয়ের সময় যে কয়দিন ছিল তাতো হোটেলেই থেকেছে।এবার যেন জামাই আদর করতে পারে এ জন্য রাহাতের সাথে কথা বলা।বিদেশের জামাই যেন যত্ন আত্মি ঠিকঠাক মত হয়।মা দু'একদিনের মধ্যেই উত্তরা চলে আসবে।টেলিফোনে রুহি খালার সাথেও দফায় দফায় আয়োজন নিয়ে কথা হচ্ছে। রাহাতের শায়লাকে পাশ কাটিয়ে চলা শায়লার  মনে আঘাত দিলেও কিন্তু পরক্ষনেই  শিহাবের কথা  মনে হলেই সে আবার মনের শক্তিতে দৃঢ় হয়।
শিহাবের দেয়া ব্রেসলেটটি শায়লার প্রতিমূহুর্তের অনুসঙ্গ। ভেবে নেয় শিহাব তার সাথেই আছে।রাহাত যদিও শায়লার সাথে অচেনার মত আচরণ করছে তবে সে এটা ভালো করেই জানে শিহাবের মত একটা ছেলে তার বোনের জন্য কতটা মানানসই।
তবুও রাহাত নিজের সুন্দর আগামীর স্বপ্নে শায়লাকে নিয়ে আর দৌড়াতে আগ্রহী নয়।
  শায়লা দুপুরের খাবার শেষ করে বিছানার কাছে এলো।সকাল থেকে সাংসারিক বেশ একটা চাপ যায়।যদিও বুয়া আসে তবুও গোছগাছ করে রাহাতকে অফিসে পাঠানো 
রান্নাবান্না নিজেকেই গুছাতে হয়।আবার এইসবের জন্য কেনাকাটাও তারই করতে হয়।শায়লা জানে যদিও আজ বা বিগত দিনে তার সাহায্যে সহযোগিতা ছাড়া সংসার না চললেও দিনে দিনে তার প্রয়োজন ফুরিয়ে আসছে।এরপর রাহাতের ঘরে স্ত্রী আসবে আর সে তখন সবকিছুর দায়িত্ব নিবে।মেয়েরা বাবার বাড়িতে আর কয়দিন?তারাতো বাবার বাড়িতে মেহমান হয়ে জন্মায় আর অচেনা একটা পরিবারের সাথে জীবন কাটিয়ে দেয়। তবে অচেনা হলেও শিহাবদের পরিবারের সবাইকে শায়লার খুবই ভালো লেগেছে।খুব মন চাইছে আবার একদিন যেতে। আরাফের আর বাড়ির অন্য বাবুগুলোর কথা খুব মনে পড়ছে।এই বাসায় একটা ছোট্ট শিশু নেই বহুকাল।কবে যে নায়লার একটা বাবু হবে? তবে হলেই বা কি? ওর শ্বশুরবাড়ি যে ধনী মানুষ  তারা কি আর খুব একটা আসতে দিবে?এই নায়লা ছোট্ট বোনটা ছিল।ফ্রক পরিয়ে চুল বেঁধে দিতো স্কুলে যাওয়ার আগে।ছুটির দিনে আপুর হাতে ভাত খাওয়ার বায়না ছিল।দিন শেষে আপুর গলা জড়িয়ে ঘুমানো।আজ কোথায় গেল সেইসব দিন।আজ সে ধনীর ঘরের স্ত্রী।এই বোনের কথা আর খুব একটা মনে পড়ে না।শায়লার চোখটা ভিজে উঠলো!  পরক্ষনেই ভাবলো ছিঃএসব কি ভাবছি?নায়লা ভালো আছে  বড় বোন হিসেবে এটাই তার চাওয়া।
নানান ভাবনায় ডুবে শায়লা একেবারে চুপটি করে দুপুরের ভাত ঘুমে ঢলে পড়লো।
শিহাবের কলে ঘুম ভাঙল।শায়লা কি করছো? 
এইতো একটু ঘুমিয়েছিলাম।
তুমি ঘুমাতে পারছো? আমার যে ক'রাত যাবৎ একেবারেই ঘুম নেই।শায়লা স্মাকে ভুলে তুমি কিভাবে ঘুমাও? 
তোমাকে ভুলে ঘুমিয়েছি কে বললো?এই যে তোমার দেয়া ব্রেসলেটটি আমার হাতে সর্বক্ষন।
আহ! শায়লা তোমার কাছে আমি বারবার হেরে যাই।তবে এই হেরে যাওয়ায়ও আমি তৃপ্ত।তোমার কাছেই তো হেরে যাওয়া!
শিহাব,একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
হু,
তুমি কি সত্যই আমাকে তোমার কাছে নিতে চাইছো?
কোন সন্দেহ,,?
না, সেটা নয়, আমাকে আপন করতে হলে রিশতিনার মত আবার সেই নানান আইনী জটিলতায় যেতে হবে।
হউক তা, কষ্ট করে  পাওয়ায় আনন্দ আছে আর রিশতিনাকে পেতে কোন আইনী জটিলতা ছিল না বরং ওরা রিশতিনা ছাড়িয়ে নিতে আইনের প্রভাব খাটিয়েছে, থ্রেট দিয়েছে। শুধু আমার সেই দুধের শিশুটার মুখের দিকে তাকিয়ে আমি সব হজম করেছি।তবে আবার আজ,আরাফের জন্য মা এনে দিতে যদি আইনের কাছে যেতে হয় তো যাবো।তোমার মাঝে আমি আমার জন্য যেমন গভীর ভালোবাসা দেখেছি আরাফের জন্য তেমনি মায়া দেখেছি।
শিহাব,তোমার সাথে পরিচয়টা আরো আগে হওয়া উচিত ছিল।
হু,ঠিক বলেছো।
শিহাব প্রসঙ্গ পালটে বললো,শায়লা এসো বিকেলে একসাথে চা খাই। 
হু হতে পারে, আমার কিছু কেনাকাটা আছে বেরুবো।
তবে শায়লা আজ আমি নিজে হাতে চা বানিয়ে খাওয়াবো। 
কিভাবে? 
আজ তুমি আমার বাসার অতিথি।
তোমার বাসায়?
হ্যাঁ, আজ আর বাইরে না।আমার বাসার বারান্দায় বসে দুজনে চা খাবো।
শায়লা চিন্তিত হলেও, মনকে সামাল দিতে না পেরে বলে ফেললো,  আচ্ছা আমি আসবো।
কখন বেরুবে? আমাকে বেরোনর আগে কল দিও।
আচ্ছা,জানাবো।ভালো থেকো।
তুমিও,দেখা হচ্ছে,,
শায়লা ঘড়ির দিকে তাকালো। সাড়ে তিনটা বাজছে। সাড়ে চারটার দিকে সে বেরুবে মনে মনে ঠিক করে নিলো।


চলবে....

১২ মার্চ ২০২২

মমতা রায়চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৩১





উপন্যাস 

টানাপোড়েন ১৩১
হৃদয় জুড়ে

মমতা রায়চৌধুরী

রেখা আজ সকাল সকাল উঠে পড়েছে। না উঠে উপায়ও ছিল না আজ যদি শুধুমাত্র মনোজ,রেখার সংসার হতো তাহলে আরেকটু শুয়ে থাকলে কোন অসুবিধা হতো না কিন্তু সেটা তো হবার উপায় নেই ।বাড়িতে শাশুড়ি মা ,ননদ এসেছেন ।উনাদের যত্নআত্তি তো করতে হবে । অন্যদিকে স্কুলে যেতে হবে। কিছু রান্না তো করতেই হবে। সকালবেলা প্রাতঃক্রিয়া সেরে নিয়ে ঠাকুরঘরে গোপালকে তুলে ,ভোগ চাপিয়ে রান্নাঘরে যায় চা করতে। রেখার আওয়াজ পেয়ে মিলির বাচ্চাগুলো উঠে পড়েছে। ওদেরকে কতগুলো বিস্কিট খাইয়ে আসলো রেখা। তারপর প্রত্যেকের ঘরে চা দিয়ে আসলো। অন্যদিকে জল খাবার রেডি করার জন্য ফ্রিজ থেকে আটা,ময়দা  বের করে রুটি ও পরোটা ভাগে ভাগে  রেখে
 দিল ।এর মধ্যে জয় গনেশ, জয় গনেশ, জয় গনেশ দেবা। কলিং বেলের আওয়াজ।রেখা রান্নাঘরে বেশিনে হাত ধুয়ে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বলল 
'যাই ,যাই ,যাই।'
' আর ভাবলো নির্ঘাত মাসি এসেছে।'
দরজা খুলে দেখল সত্যি সত্যি মাসি এসেছে।
'ও বৌমা রান্নাঘরে প্রেসার কুকারের সিটির আওয়াজ হচ্ছে ।কত সকালে উঠেছ গো?'
রেখা একগাল হাসলো তারপর বললো 
'মাসি এসো কাজ শুরু করার আগে চা খেয়ে নাও।'
'প্রথমেই চা খেয়ে নেব?'
'খাও ।রোজ তো আগে কাজ করো ,তারপর চা খাও ।আজ না হয় তার উল্টোটা করলে।'
'ঠিক আছে তাহলে দাও।'
'ওগো শাশুড়িমা ঘুম থেকে ওঠেনি?'
'সময় হলে ঠিক উঠবে মাসি?'
'কিছু মনে করো না একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?'
'বলো না মাসি, কি বলতে চাইছো?'
'বলছি তোমার শাশুড়ি মা না হয় থাকবেন ঠিক আছে কিন্তু ননদ কদিন থাকবে?'
'থাকবে এতদিন পর বাবার বাড়িতে এসেছে।'
বাবার বাড়িটা তো প্রত্যেকের হৃদয়ে জড়িয়ে থাকে না ,কত স্মৃতি ।সেগুলো কি ভোলা যায় মাসি।'
'তোমার ননদের বাচ্চাকাচ্চা নেই?'
'শুনেছি তো একটা মেয়ে আছে।'
রেখা আর মাসি দুজনে কথা বলতে বলতে চা খাচ্ছে তো আর রেখার ননদ সেটা দেখে গিয়ে শাশুড়ি মাকে লাগিয়েছে ।
'ক্লাসে ক্লাসে মিল কত দেখেএসো মা।'
মনোজের মা মনামীকে ইশারায় বোঝাতে চাইলো মনোজ কথাটা শুনতে পাবে। এই চুপ করে থাকাই ভালো। মনামী মুখ বেঁকিয়ে চলে গেল।
মাসি আবার রেখাকে প্রশ্ন করছে
'তাহলে সেই মেয়েকে কি করে ছেড়ে আছে গো।'
'যা করছে করুক না মাসি।'
'ঠিক আছে আমি উঠলাম বৌমা। কাজে হাত লাগাই। '
 মাসি হাতের কাছে চা এর বাসনগুলো নিয়ে চলে গেল কলতলায় আর রাত্রের  যে বাসনগুলো জমানো ছিল সেগুলো নিও গেলো।
রেখা মনে মনে ভাবতে লাগল সামনেই 'ভাষা দিবস 'ভাষা দিবসের কথা শুনলেই মনের ভেতরে একটা আলাদা আবেগ, উত্তেজনা কাজ 
করে ।.পৃথিবীতে এই প্রথম বোধহয় বাংলা ভাষার দাবিতে শহীদ হতে হয়েছিল ।সেই শহীদের রক্তে ভেজা দিন একুশে ফেব্রুয়ারি ।সেটা এখন 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস,' হিসেবে পরিচিত। 
এই দিনটা তো হৃদয়ের অন্তস্থল চিরস্মরণীয়। এমনিতেও রেখা এই দিনটার প্রতি বিভিন্নভাবে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে আর এখন স্কুলে তো দায়িত্ব পড়েছে।ন্যাচারালি দায়িত্ব পড়েছে রেখার উপর। স্কুলে তো যেতেই হবে। মেয়েদের প্রোগ্রামের জন্য রেডি করতে হবে। ভাষা দিবসের শহীদ পরস্পর পরস্পরের পরিপূরক রেখার কাছে মনে হয়।ভাষা দিবস আসলেই আবার সেই ঘুরে ফিরে চলে আসে স্বপ্নীল ।ভোরের স্বপ্নের মত আসে। সে বার ভাষা দিবসে ট্রেন লেট ছিল। তাতে কি হয়েছে সেবার এমনিতেও ট্রেনে যায়নি স্বপ্নীলের বাইকে গেছিল। আর ঘটনাচক্রের ওইদিনই ট্রেন লেট ছিল ।এজন্য রেখা ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়েছিল প্রোগ্রামের আগেই স্কুলে পৌঁছাতে পেরেছিল। ভালো কবিতা আবৃত্তি করতে পারত স্বপ্নীল। সারা রাস্তা শুধু ভাষা দিবসের উপযোগী কবিতা আবৃত্তি করেছে।এত অসাধারন করেছিল ।আজও ভুলতে পারে না রেখা। কবিতা আবৃত্তি শুনে রেখা র সারা গা রোমাঞ্চিত হয়েছিল। আজ আবার সেই ভাষা দিবস স্বাভাবিকভাবেই এই দিনটা তো মনের স্মৃতিপটে উজ্জ্বল হয়ে থাকবেই। কত স্মৃতি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
মিলিদের খাবার খাইয়ে রেখা চটপট রেডি হয়ে নিল। তারপর প্রত্যেককে সকালের নাস্তা দিয়ে নিজের খাওয়ার মতো কোনো সময় ছিল না তাই টিফিন বক্সে নিজের খাবারটা পুরে 
রেখেছিল ।
বাড়ির গেট থেকেই সঙ্গে সঙ্গে অটো পেয়ে গেল অটো করে চলে গেল স্টেশনে ।স্টেশনে গিয়ে শোনে গাড়ি লেট আছে।
কি অদ্ভুত মিল আজকের দিনটা কেউ গাড়ি রেট শুধু মিল নেই আজ রেখাকে পৌঁছে দেবার মতো কেউ নেই ।আজ নেই রেখার পাশে স্বপ্নীল ও ।তবুও যেন ঘুরেফিরে-বুকের সেই যন্ত্রণা টাকে টেনে নিয়ে বেড়াচ্ছে।
অধীরভাবে রেখা প্লাটফর্মে পায়চারি করতে লাগলো। ট্রেন সঠিক সময় না আসলে স্কুলে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যাবে। তাহলে বড়দি কে একটা ফোন করে দেয়াই শ্রেয় মনে হয়।
রেখা বড়দিদি। আবোল-তাবোল কত কথা হারিয়ে গেছিল দুজনে র।
এ বাবা এবার ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আজকে কি হবে?
ভাগ্যিস বৃষ্টির আগে স্টেশনে এসে পৌঁছেছে।
এর মধ্যে দুজন যুগল ভিজে একশা হয়েছে।
দুজন পাশাপাশি বসে আছে যেন পৃথিবীর সব সুখ ওদের কাছে।
না ট্রেনের এখনো খবর হলো না। রেখা ঘড়িতে টাইম টা দেখল। এবার ভেতরে ভেতরে ভীষণ অশান্ত হয়ে উঠলো।
রেখা বড়দিকে ফোন লাগাল ।
বড়দি র ফোন রিং হয়ে গেল।
আবার ফোন করল রেখা এবার বড়দি ফোনটা রিসিভ করলেন। "
'হ্যালো'
'বড়দি আজকের ট্রেন লেট আছে কখন স্কুলে পৌঁছাব বুঝতে পারছিনা।'
'সেকি রেখা!'
'কিন্তু তোমাকে তো আসতেই হবে।।'
'কি করে পৌঁছাব বড়দি আমি তো স্টেশনেই আছি।'
'খুব চিন্তায় ফেল্লে রেখা।'
'ঠিক আছে' দেখো কি হয় এমন সময় ট্রেনের খবর হল
একা খুব উৎসাহিত হয়ে বড়দিকে ফোনে বললো 'দিদি ,ট্রেনের খবর হয়ে গেছে।'
'তা বেশ, বেশ একটু দেরী হোক সেটা ম্যানেজ করে নেব ।তুমি এসে পৌঁছাও। বেস্ট অফ লাক। সেফ জার্নি।'
'থ্যাংক ইউ দিদি।'
'ওকে ওকে'।
'রাখি দিদি।'
রেখা ট্রেনের খবর হতেই নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালো।
মনে হচ্ছে যেন বেলা শেষ হতে না হতেই ঘনিয়ে এসেছে অন্ধকার। স্টেশনে অল্প কয়েকজন যাত্রী মাত্র গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছে।  আজকে স্টেশনটাকে ঝিমানো মনে হচ্ছে । এর মধ্যে গাড়ি এসে স্টেশনে থামলো প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন মাত্র যারা গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিল তারাও কিছুটা শঙ্কিত স্তব্ধ ছিল। গাড়ি এসে দাঁড়ালো কিন্তু গাড়ি দাঁড়ায় মিনিট দেড়েক এই সময়টুকুর ব্যস্ততা যেন আজকে যেন মনে হলো ট্রেন ছেড়ে যেতেই ট্রেন থেকে যারা নেমেছে তারা কোনো দিকে না তাকিয়ে তাড়াতাড়ি গেটে টিকিট দিয়ে নিজে নিজের গন্তব্যস্থলের দিকে দ্রুত পা বাড়ায়। একনজর তাকালেই বোঝা যায় প্রত্যেকে নিজের নিজের তাগিদেই ছুটে চলেছে।
আরে রেখাও গাড়িতে উঠে বসে। আজ গাড়িটার কামরা ফাঁকাই আছে। রেখা জানলার গা ঘেসে বসলো। যদিও বৃষ্টির ছাট আসছে ।তবুও যেহেতু প্যাসেঞ্জারের চাপ নেই। তাই জানলা কিছুটা খুলেই বসল ।ট্রেন দুটো গতিতে ছুটে চলেছে
 বৃষ্টির ছাঁট গুলো চোখে মুখে এসে পড়ছে। রেখা তখনো কল্পনা করছে। এখনো কি সেই যুগলমূর্তি প্লাটফর্মে বসে আছে। ওরা কি এই বর্ষার সৌন্দর্যে নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলছে। হৃদয়ের কত কাছাকাছি ।হৃদয় জুড়ে বর্ষা ,বর্ষা জুড়ে হৃদয়।
আজকের হঠাৎ বর্ষা একটু অপ্রস্তুতে ফেলেছে সকলকে। স্কুল হয়তো ছুটি হয়ে যাবে ।আজকে কি প্রোগ্রাম সেরকম হবে?মেয়ে কি আসবে ?রেখা ভাবছে' যাই হোক না কেন  অনুষ্ঠানটা তো করতেই হবে।
মাতৃভাষা আজ বিপন্নতার পথে তাকে রক্ষা করার দায় আমাদের ।অন্তত ২১এর টাটকা ক্ষত জিইয়ে দিয়ে রাখতে হবে।একদিন নয়তো আমরা হারিয়ে যাব মাতৃভাষার সঙ্গে। আমাদের অস্তিত্ব বিলীন হবে ।এজন্য এই মাতৃভাষার দাবিকে জোরালো করে তুলতে হবে। হৃদয় জুড়ে যে মাতৃভাষা রয়েছে তাকে তার যথাযথ মর্যাদায় ভূষিত করার দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের।
এইসব কথা ভাবতে ভাবতে যাচ্ছে হঠাৎ করে স্মৃতিদি এসে বললেন 
?দিদিমণি দেখো আজকে কত ভালো শাড়ি এনেছি।'
 হঠাৎ' দিদিমণি 'ডাকে রেখার ধ্যান ভাঙ্গে ।
'স্মৃতিদি কতদিন পর তুমি এই কামড়ায় উঠলে তোমাকে তো দেখাই যায় না 'সেই রিম্পা দি থাকাকালীন।
'আমার শরীরটাও ভাল ছিল না বেশ কিছুদিন তো আসতেও পারি নি।'
কি হয়েছিল?
বলছিলে তো কোভিদ পজিটিভ
কোয়ারান্টিনে ছিলাম।
এখন নেগেটিভ এসেছে। আমাদের কি আর ঘরে বসে থাকলে চলবে কাজ করে না খেলে আমরা খাব কি বলো।
এই রেখা দি কিছু নাও না?
নেব বল তো তুমি আগে আসলে তাও ভাষা দিবসের জন্য একটা শাড়ি কিনতে পারতাম।
দেখো না আজকে ভাষা দিবসের উপযোগী কিছু শাড়ি এনেছি নেক্সট বার না হয় পরবে।
স্মৃতি স্মৃতি জোরাজুরিতে রেখা শাড়ি দেখতে শুরু করলো।
একটা শাড়ীতে চোখ আটকে যায়।সত্যিই lনজর আছে ভাষা দিবসের উপযোগী একখানা শাড়ি শাড়িটা সাদাকালো ঢাকাই।
স্মৃতি দিয়ে বললো দেখো এই শাড়িটা তোমাকে কত সুন্দর লাগবে।
কত দক্ষিণা?২৮০০
'৩000 করে বিক্রি করছিলাম তোমাদের জন্য কমিয়েছি।'
আর দেখতে হবে না চোখ বুঝে নাও ।শাড়ির কোয়ালিটি দেখো খুব ভালো ।তোমাকে পরে খুব সুন্দর লাগবে। যদি কেউ সুন্দর না বলে  তুমি আমাকে ফেরত দিয়ে দিও ।আমার কথা মত , তুমি নাও।
'ঠিক আছে দিয়ে দাও।'
তাড়াতাড়ি প্যাক করো ।স্টেশনে ট্রেন থামলে  আজকে আমি দাঁড়াবো না ।এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে।আজকে প্রোগ্রাম আছে।'
'কিসের প্রোগ্রাম?'
'ভাষা দিবসের।'
ও ও ও।
সত্যিই গো আজকের দিনটা প্রত্যেকের হৃদয়ে আছে উজ্জ্বল হয়ে। রেখাও মনে মনে গান গাইতে লাগল আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি? ভাষা দিবসের শহীদদের প্রতি থাকলও অকুণ্ঠ বিনম্র শ্রদ্ধা।
হৃদয় জুড়ে থাকুক ভাষা যোদ্ধারা।

কবি গোলাম কবিরের কবিতা




কতোটা আলোকবর্ষ পরে
গোলাম কবির 
  
  কি এক গহীন আঁধার নেমে এলো 
  পৃথিবীর বুকে, দেখি মানুষের মতোই মুখ
  অথচ হৃদয় যেনো তাদের ঘৃণিত বরাহ!
  প্রতিটা রাত অপেক্ষা করি নরম সূর্যোদয়
  দেখবো বলে অথচ দেখি প্রগাঢ় অন্ধকারে   
  ম্লান নিভু নিভু দিনান্তে সূর্য ঢেকে গেছে   
  মানুষের অসহায়তায়, গভীর লজ্জায় 
  চাঁদও যেনো উজ্জ্বলতা হারিয়ে গিয়ে 
  ঘন কালো মেঘে ঢেকে গেছে!  
  তারপর সারাটা দিন কেটে যায় 
  মূল্যবোধের গণকবরে সারিবদ্ধ মানুষের
  লাশ টেনে নিয়ে শেয়াল কুকুরের মচ্ছবে 
  খাবি খাচ্ছি মানবিকতার পচে যাওয়া 
  গলিত লাশের ওপর শকুনির ভয়াল নৃত্য
  দেখে দেখে। বিষাদের প্রগাঢ় অন্ধকারে 
  আবার মুষড়ে পড়ি ভীষণ! 
  এভাবে আর কতোদূর যাবে সভ্যতা! 
  দেশে দেশে অনর্থক যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা,  
   সম্পদের অসম বন্টন, লুটপাট এবং
  বোধের শূন্যতা ঘুঁচে গিয়ে 
  কতোটা আলোকবর্ষ পরে 
   আবার ফিরে আসবে মানবতা!

কবি সুপর্ণা চ‍্যাটার্জ্জীর কবিতা




জীবনের রঙ
সুপর্ণা চ‍্যাটার্জ্জী

আকাশের রঙ নীল,
তবে ঘাসের রঙ সবুজ,
মনের সাথে কোথায় মনের মিল
অভিমানে তা যে বড় অবুঝ। 

ভোরের আকাশে রোজ সূর্য উঠা দেখি,
তাই ইচ্ছে করে প্রিয়জনকে জানাতে সুপ্রভাত। 
কারো কাছে বিরক্তিকর হলেও
আবার কারো কাছে  ঔষধির সমান।  

মানুষ চেনাই বড় দায়,
সরল বন্ধুত্ত্বের অর্থ বোঝা না যায়।
তাদের মনের রঙে নিজেকে রাঙাতে যাওয়া বৃথা।

হয়তো কোনা গোপন রঙে 
সে রাঙিয়েছে তার মাথা।
তাই আকাশের রঙ নীল 
জীবনের রঙ অন্ধ ভালোবাসা।

১১ মার্চ ২০২২

কবি সানি সরকারের কবিতা




পোড়া পাখি
সানি সরকার



আমার জ্বর হয়েছে। পুড়ে যাচ্ছি 

অতঃপর, দেখলাম 
আমাকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হল 
গলিয়ে ফেলা হল ধাতুর মতন... 

আমার কান্না পেল না 
আমার শুধু দেখতে ইচ্ছে হল 

তোমাকে 

পাখিটি ডাকছে? 
পাখিটি ঘুমিয়ে পড়েছিল? 

ঘুম ভাঙার পরে পাখিটি ডাকছে আবার?

মমতা রায় চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৩০




উপন্যাস 


টানাপোড়েন ১৩০
পরান বীণা সুরে সুরে ভরে যাক
মমতা রায় চৌধুরী

যাক বাবা শেষ পর্যন্ত রাজি করানো গেল।এবার শুভস্য শীঘ্রম। শেষ পর্যন্ত পরিণতি পাক এটাই প্রার্থনা। আজকে পার্থ কত খুশি ছিল ।সত্যিই তো তাই। মনের মানুষকে যদি কাছে পায়,আরো আপন করে পায় । তার চেয়ে সুখী আর কে আছে। রেখা মনে মনে বারবার বলতে থাকলো 
'ভগবান ওদেরকে সুখী করুন। ওদের দাম্পত্য জীবন মধুর হোক,সুখের হোক ,আনন্দের হোক,বিশ্বাসের হোক ,বন্ধুত্বের হোক। এভাবে ওদের পরান বীণা সুরে সুরে ভরে যাক।
এসব ভাবতে ভাবতে বাড়িতে ঢুকছে। বাড়ির দরজা হাট করে খোলা।কে এসেছে রে বাবা।
রেখা আস্তে আস্তে ঘরে ঢুকলো। ঘরে ঢোকার মুখেই শুনতে পেল মনোজের মগজ ধোলাই হচ্ছে।
'এত আস্কারা দিস না বউকে।একে তো চাকরি করে, তারপর সব ব্যাপারে যদি সাপোর্ট করিস বুঝতে পারছিস??'
মনোজ বললো 'ওএমন কিছু করে না তো যার জন্য ওকে সাপোর্ট করবো না?'
', মা ভাইকে বুঝিয়ে কোন লাভ নেই। ওর ভালো ও বোঝে না। ওরে আমরা কি তোর  শত্রু।'
'কি বলব বলো তো?'
'এই যে পাড়া-প্রতিবেশী যে যখন ডাকছে অমনি তাকে চলে যেতে দিস ।পাড়া-প্রতিবেশীরা ওর মাথা খেতে পারে না ?'

'কি যে বলো না মা ,এতদিনকার সম্পর্ক পার্থদের সঙ্গে।  ওর মা রেখাকে ভালবাসে ।যেতে দেবো না?'
''তোকে কে বোঝাবে বল বাবা। তোকে যে বুঝিয়ে রেখেছে এর বাইরে তো তুই যাবি না । যোগ,বিয়োগ গুন ,ভাগ সবই করে রেখেছে আর কি করবি?'
মনোজ ঘর থেকে বেরিয়ে আসে । ভূত দেখার মত দেখে রেখা কে।
একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলে' তুমি কখন আসলে?'
'এইতো এক্ষুনি ঢুকলাম।'
'ও আচ্ছা।'
'মিলিরা কিছু খেয়েছো গো?'
'না কিছু বিস্কিট দিয়েছি ওদের।'
রেখা যেসব কথা শুনতে পেয়েছে মনোজকে হাবে ভাবে বুঝতে দিলে হবে না।
 বিষ যেমন করে কন্ঠে ধারণ করেছিল নীলকন্ঠ, ঠিক তেমনি করেই রেখা ও মনের ভেতরে সব রেখে দিল।
মনোজ মনে মনে ভাবল 'যাক শুনতে পায়
 নি ।না হলে কি ভাবতো? থ্যাংকস গড।'
জোড়হাত করে প্রণাম করে ভগবানের উদ্দেশ্যে।
রেখা বলল' কি হল?'
মনোজ বলল হেসে' কিছুই না।'
'কি খাবে তোমরা আজকে?'
'কি আবার রুটি।'
'কী সবজি বানিয়েছ গো সকালে?'
"ব্রকলি উইথ আলুভাজা।'
"বাহ, বেশ বেশ ।'
"মায়েরা কি খাবে?'
'দাঁড়াও জিজ্ঞেস করি।'
বলেই মনোজ  ঘরের ভেতরে গিয়ে বলল
' মা ,দিদি তোমরা কি খাবে রাত্রে?'
'আমরা তো ভাত খাই।
ভাত করবে আর  দুপুরে তরকারি করাই ছিল।'
মনোজ বলল 'ঠিক আছে'
।মনোজ রেখাকে এসে বলল ' ভাত খাবে?
রেখা বলল' ঠিক আছে। রান্না ঘরের দিকে পা বাড়ালো। আবার ফিরে এসে বলল শোনো একটা কথা আছে।'
উৎসুকভরে মনোজ বলল' কি কথা গো?'
'কালকে কিন্তু আমি স্কুলে যাব কামাই করব না।'
'হ্যাঁ অবশ্যই যাবে।'
"রান্নাবাড়া?'
'যেটুকু পারবে তুমি করে রেখে যাবে। বাকি মা 
দিদিরা করবে ।'
'ঠিক আছে এটাই বলার ছিল।'
রেখা রান্না ঘরের দিকে চলে গেলো এমনিতেই লেট হয়ে গেছে। ভাত চাপিয়ে দিয়ে মিলিদের
তরকারি গরম করলো। তারপর মিলিদের খাবারটা দিতে গেল।
"পাইলট তুলি উঠে পড়ো সোনা খাবার খেয়ে নাও।
সবাই লেজ নাড়তে নাড়তে এসে আগে রেখাকে একটু আদর করল তারপর খাবার খেতে শুরু করল।
ইতিমধ্যে রেখা পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে মনোজ এসে দাঁড়িয়ে।' একি তুমি?'
'হ্যাঁ l দেখতে আসলাম।'
'তাহলে তুমি দেখো। আমি যাই।'
রেখা চলে যাচ্ছে, তখন মনোজ বললো
"  অ্যাই রেখা ,শোনো, শোনো।'
রেখা পিছন ফিরে তাকিয়ে বলে' কি হলো?"
মনোজ কাছে এসে ফিসফিস করে বলল 'এই পার্থদের ওই ব্যাপারটা মেনে নিয়েছে মাসিমা?'
রেখা হেসে  বললো 'অনেক কষ্টে রাজি করে নিয়েছি ।দেখা যাক।'
এদিকে মনোজ আর রেখা খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থেকে কথা বলছে ,সেটা মনোজের দিদি আর মা দেখে  মনোজকে একসাথে দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো।
কিন্তু মুখে প্রকাশ করতে পারছিলো না । কিন্তু মনে মনে গজগজ করতে করতে ঘরে ঢুকে গেল। মনোজ বলল 'তাহলে এতদিনের স্বপ্ন ওদের পূরণ হবে বলো?'
রেখা বলল'সে রকমই তো হবার কথা। আজকে পার্থকে দেখে যেটা আমার মনে হয়েছে, এতোদিন একটা চিন্তায় ছিল ওদের ভালোবাসা পরিপূর্ণতা পাবে কিনা সংশয় ছিল মনে। তবে আজ ওকে দেখে আমার যেটা মনে হল ওর সমস্ত হৃদয় আকাশ সোনালীর ভালোবাসা। মনোজের  স্বপ্নচূড়া জুড়ে রয়েছে।'
'যাক একটা ভালো খবর শোনালে।'
অন্যদিকে মনোজের মা বাজখাই গলায় বলল'হ্যাঁরে মনু তোদের গল্প হল ।এদিকে ভাতের অবস্থাটা কি হচ্ছে দেখতে বল বৌমাকে।'
এতক্ষণে গায়ের জ্বালাটা যেন পারলো
 জুড়াতে ।
রেখা দ্রুত রান্না ঘরে এসে দেখলো ভাতের জল অনেকটা কমে গেছে।
তাড়াতাড়ি ভাতে জল দিল।
এমন  সময় রেখার ফোন বেজে উঠলো। ফোনের আর্তনাদে রেখার শাশুড়ি মা  বিরক্ত হয়ে বলল
"হ্যাঁরে মনু কার ফোন বাজছে?'
"মনু অ্যাই মনু ,মনু…"
মনোজ বাথরুম থেকেই সাড়া দিলো 'আমি বাথরুমে আছি মা'।
রেখা ঘরে গিয়ে ফোনটা ধরল।
'হ্যালো'
'হ্যাঁ বৌদি, পার্থ বলছি।"
"হ্যাঁ বল ভাই।'
'অনেক ধন্যবাদ।'
'ও বুঝেছি আগে পুরো কাজটা করতে দাও।'
'মনে তো হচ্ছে পুরো কাজটাই হবে।'
'ঠিক আছে তার জন্য ধন্যবাদ জানাতে হবে না।
তোমাদের ভালোবাসা পরিণতি পেলে আমারও খুব ভালো লাগবে।'
'এই জন্যই তো এতটা দিন অপেক্ষা করছি বৌদি।
ওকে ছাড়া আমি অন্য কাউকে গ্রহণ করতে পারতাম না।"
'তবে একটা কথা বলি ভাই সোনালীকে বলে দিও এ বাড়িতে এসে মাসিমার সঙ্গে সঠিক ব্যবহার করতে।মাসিমাকে আপন করে নিতে চেষ্টা করে যেন।'
"সে কথা আমি ওকে বলেছি বৌদি ।'

'কিছু মনে করো না ভাই  । কেননা মাসিমার মনে তো একটু দ্বিধা আছে ,হয়তো মাসিমা তাড়াতাড়ি সেটা কাটিয়ে উঠতে পারবে না ।সোনালীকে চেষ্টা করতে হবে সেটা।'
'একদম ঠিক কথা বলেছো বৌদি।'
'ঠিক আছে ভালো থেকো সবাই।'
মনোজ টাওয়ালে   হাত মুছতে মুছতে বলল 
"কে ফোন করেছিল গো।'
ফোনটা কেটে রেখা বলল 'ও  পার্থ করেছিল।'
"খুব খুশি না পার্থ ।'
রেখা একগাল হাসল।
'শোনো শিখার বিয়েতে কিন্তু যেতে হবে।'
'কবে বিয়ে আছে গো?'
'এই তো এ মাসেই বিয়ে।'
'দেখি কি হয়?'
'দেখলে হবে না সুরো কিন্তু ভীষন রাগ করবে আর মাধুও ।'
"শিখা তো তোমার একজন পরম ভক্ত। না গেলে হয়।'
রেখা ঘাড় নাড়লো তারপর বললো' ঠিক আছে যাই ,ওদিকে ভাত হয়ে গেলো  তোমাদের খাবার ব্যবস্থা করি।'

রেখা রান্নাঘরে গিয়ে ভাতের ফ্যান ঝরিয়ে ঝটপট রুটি করে ফেলল।
আবার ফোন বেজে উঠলো মনোজের ফোনে।
মনোজ ফোনটা ধরে বলল ''হ্যালো'।
"হ্যাঁ রে সুরো বলছি।'
'হ্যাঁ বল সবাই ভালো আছিস?'
'ভালো আছি। আজকে  রেখাকে পাবো তো নাকি রে।"
'পাবি রান্নাঘরে আছে ।দেখছি দাঁড়া।'
মনোজ চেঁচিয়ে বলল ', রেখা, রেখা, অ্যাই রেখা তোমার ফোন আছে।'
'যাই ।আবার কে ফোন করল?'
বেসিনের কল টা ছেড়ে আটার হাতটা তাড়াতাড়ি  ধুয়ে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ছুটে আসলো
' কে ফোন করেছে?'
'ফোনটা ধরো তাহলেই বুঝতে পারবে।'
' হ্যালো'।
"রেখা আমি সুরঞ্জনদা বলছি।'
:'হ্যাঁ দাদা বলুন  ভালো আছেন সবাই।'
'সবাই ভালো আছি  আরো ভালো থাকবো, যদি তোমরা সবাই আমার বাড়িতে আসো শিখার
 বিয়েতে। শিখার বিয়ে ঠিক হয়েছে জানো তো?'
"হ্যাঁ, দাদা শুনলাম।'
"শুনলে তো হবেনা এবার এসে তো সবকিছু অ্যারেঞ্জ করতে হবে ।মাধু একা পড়ে যাবে
 তো । তোমরাএসো তাহলে খুব ভালো লাগবে আর না কথাটা কিন্তু শুনবো না ।ঠিক আছে।'
"তা অবশ্যই চেষ্টা করব।'
'চেষ্টা করব কথাটা বলো না রেখা। বলো যাব আর শিখা কিন্তু তোমার একজন পাঠক হিসেবে ভীষণ ভক্ত। সুতরাং তুমি না আসলে ও খুব কষ্ট পাবে।'
'হ্যাঁ দাদা যাব। শিখাকে আমার অনেক ভালোবাসা আর শুভেচ্ছা জানাবেন।'
'সে আমি জানিয়ে দেবো কিন্তু তোমাকে কাছে এসে জানাতে হবে।'
রেখা হো হো হো করে হাসতে শুরু করলো তারপর বললো '
"মাধু বৌদি কেমন আছে দাদা?'
' শিখার বিয়ে বলে কথা ।ওকে তো ননদ হিসেবে কখনো দেখেনি ।মেয়ে হিসেবে দেখেছে। আনন্দ যেমন হচ্ছে তেমনি ভেতরে একটা কষ্ট রয়েছে চলে যাবে শ্বশুর বাড়ি  সব মিলিয়ে রয়েছে।'
'ঠিক আছে রাখছি তাহলে। তোমাদের কিন্তু অবশ্যই এক সপ্তাহ আগে আসার কথা। তোমারা সেই ভাবে প্রিপারেশন নিয়ে আসবে।'
রেখা আশ্চর্য হয়ে বলল' কি ?এক সপ্তাহ!'
সুরঞ্জন বলল' আমি বলেছি যখন…..আমি কোন কথা শুনব না ।রাখলাম ।সবাই ভালো থেকো আর তাড়াতাড়ি চলে এসো।'
মনোজ বলল 'দেখলে না গেলে হবে?'
রেখা সংশয় আর চিন্তাগ্রস্থভাবে বলল 'সে তো বুঝলাম কিন্তু আমার এই বাচ্চাগুলোর খাবার দাবারের ব্যাবস্থা।'
মনোজ বলল' সে ভাবনা তোমাকে ভাবতে হবে
 না ।আমি সেটা ভেবে রেখেছি ।সেটা করেও দেবে দরকার হলে কিছু টাকা পে করে দেব?'
রেখা বলল' কে গো?'
"কেন আমাদের গৌরী সেন দা",।
রেখা হাসতে হাসতে বলে' তুমি পারোও বটে। এসো এসো খাবে এসো। সে পরে ভাবা যাবে।'
কতদিন পরে যেন রেখার মনে হল প্রাণখুলে মনোজ হাসল। রেখার মনের থেকে চাপ অনেকটা কমলেও মনোজকে এভাবে হাসতে দেখে খুব খুশি হলো রেখা। মনজ কি কোন কিছুতে জড়িয়ে আছে ,যার জন্য মাঝে মাঝে এরকম ব্যবহার করে পরিষ্কার করে তো কিছু বলেও না।'
যাক টানাপোড়েনে মনের কালিমা দূরীভূত হোক।
সকলের হৃদয় বীণা সুরে সুরে ভরে উঠুক 

মমতা রায়চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১২৯




উপন্যাস 


টানাপোড়েন  ১২৯
মনের হদিশ কে বা জানে
মমতা রায়চৌধুরী

রেখার গোধূলি বেলা আজ শুধু অন্য ভাবনায়
কেটেছে। সন্ধ্যেবেলাটায়  রয়ে গেল তার রেশ। একরাশ টাটকা বাতাস এসেছিল বহুরূপী নৃত্য প্রদর্শনে। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকার সময়  হঠাতই বেখেয়ালি মনে আসে ঢাকঢোল পেটানোর আওয়াজ ,ভাবনা চলে যায় অন্য
 জগতে ।তাড়াতাড়ি উঁকি দিয়ে  দেখতে থাকে কি হচ্ছে। মিলি, চুনু,কটা ওরা এত জোরে চেঁচাচ্ছে
 বাধ্য হয়েই তাকাতে হল ,ব্যাপারটা কি ,দেখার জন্য।
'ও বাবা কতদিন পর বহুরূপী।'
এই সব শিল্পীদের কদর কোথায়? হারিয়ে যেতে বসেছে।
বহুরূপ  ধারণ করে কিছু টাকা উপার্জন করে তারা যেভাবে  মানুষের মনোরঞ্জন করছে, উপরী পাওনা হিসেবে মানুষের মনের খিদেটা উপশম হয় বটে
কিন্তু যারা বহুরূপী সেজে মনোরঞ্জন করল তাদের ভাড়ারে কি থাকলো? এটা আমরা কেউ চিন্তা করিনা।
দু এক টাকা দিতেই হাত কেঁপে ওঠে।
রেখার ইচ্ছে হয়েছিল কিছু টাকা ওদের দেয় কিন্তু টাকা বের করে নিচে নামতে নামতে ই বেরিয়ে যায়।
'একজন '' আরেকজন' পার্বতী 'বেশ দারুন লাগছিল?
হঠাৎই শাশুড়িমা আর মনোজের চিৎকারে রেখার ধান ভাঙ্গে।
রেখা ব্যালকনি থেকে কান খাড়া করে শোনে
'বুঝলি মনু চা কিন্তু আর সঠিক সময় পেলাম না?'
মনোজ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে তাইতো কি করছে রেখাটা মা এসেছে কোথায় একটু তাড়াতাড়ি করে দেবে তা নয়।
মনোজ আবার ডাকে' রেখা ,রেখা ,রেখা।'
রেখা বেলকনি থেকে উত্তর দিল 'কি বলছ?'
মনোজ বেশ নিচু গলায় বলল 'চা টা দাও?'
'হ্যাঁ দিচ্ছি।'
রেখার শাশুড়ি মা আবার পিএনপিসি শুরু করে দিল। "হ্যাঁ রে মনু ,তোকে কি এই ভাবেই চেয়েছে চা খেতে হয়?
'কেন বলতো?
'না তাই বলছি।'
'না তো?'
"তাহলে কি আমাদের দেখে চা করতে লেট করছে?'
'কোন কিছু করছিল হয়তো?
'ওরকম নয় মা তুমি ওরকম ভেবো না।'
মনামী ওর মাকে ধাক্কা দিয়ে ইশারা করে দেখালো 'দেখলে রেখার নামে কিছু শুনতে চায় না।'
রেখা চা করতে গেল একদিকে চায়ের জল বসিয়েছে অন্যদিকে কুকিজ বিস্কুট নিয়ে গিয়ে মিলি তার বাচ্চাদের খাওয়ালো।
তারপর যথারীতি চা বানিয়ে প্লেটে করে সাজিয়ে নিয়ে গিয়ে দিল।
শাশুড়ি মা প্লেটের দিকে তাকিয়ে কিছু স্নাক্স দেখতে  না পেয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল আজ বোধহয় চায়ের সাথে বিস্কুট খেতে হবে বুঝলি?
তাই তো দেখছি।
কথা শুনে তারপর বাইরে এসে রেখাকে বলে চায়ের সাথে কিছু বানিয়ে দিলে না কেন?
রেখা কোন কথা বলে না তারপরেই ফিশ ফ্রাই  শাশুড়ি, ননদ, মনোজকে দেয়।
মনোজ বলল 'দেখলে মা তোমাকে বলতে হবে না ও কিন্তু ঠিকঠাক সাজিয়ে দেয়,.'
রেখা তখন রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিল সব কথা কানে আসে।
ফিশ ফ্রাই টা কেমন হয়েছে রে দিদি!
হয়েছে একরকম।  
মনোজ বাইরে বেরিয়ে এসে রেখাকে জিজ্ঞেস করল 'হ্যাঁগো ফিশ ফ্রাই কাকে দিয়ে আনালে?'
'পার্থ কে বলেছিলাম।'
'আমি একটু পার্থদের বাড়ি যাচ্ছি।'
মনো জ বললl' কেন?
আরে সেদিন বলল না যে আর কথা তারপর তো আর যাওয়া হয়নি। ফোনেও আবার বলল।
যাও গিয়ে দেখো কিছু করতে পারো কিনা?
আমার যদি একটু ফিরতে দেরী হয় তাহলে মিলিদের একটু খাবার টা দিয়ে দিও।
ঠিক আছে।
পার্থদের বাড়ি যাওয়ার কথা শুনে মা মেয়ে দুজনেই কানাকানি শুরু করে দিল।
একটা কেমন অশালীন ইঙ্গিতও করলো।
রেখা দেখেও না দেখার ভান করল।
রেখা বেরিয়ে গেল পার্থদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রাস্তায় যাওয়ার সময় চৈতির মার সঙ্গে দেখা।
ও দিদি কোথায় চললেন গো?
এইতো পার্থদের বাড়ি যাচ্ছি।
কেন কিছু হয়েছে?
চৈতির মার সব সময় একটা কেমন যেন কৌতুহলী মনোভাব সবকথা জানতেই হবে এই জন্য মাঝেমাঝে রেখা চৈতির মার ওপর একটু বিরক্ত হয়।
"না না ওর মা ডেকে পাঠিয়েছে?'
'ও তাই বলুন।'
'তোমরা কবে ফিরলে?'
এইতো গতকাল।'
চৈতি রা কেমন আছে?
ভালোই আছে।
ঠিক আছে ,দিদি আসছি।
রেখাও ঘাড় নাড়লো। তারপর পার্থদের বাড়ি ঢুকলো।
কলিংবেলের আওয়াজ শুনে পার্থ এসে দরজা খুলল।
পার্থ একগাল হেসে বলল এসো বৌদি, এসো।
দরজা লাগাতে লাগাতে বললো ও মা মা, দেখ কে এসেছে?
পার্থর মা শুয়ে শুয়ে টিভি দেখছিল টিভির আওয়াজ টা কমিয়ে দিয়ে খাট থেকে নেমে বলল কে এসেছে?
বলতে বলতেই রেখা গিয়ে হাজির হল 
পার্থর মা বললো' ওমা ,ওমা তুমি?'
যেন একেবারে ভূত দেখার মত দেখল।
আজকাল তো আসই না। ভুলে গেলে বৌ মা?
রেখো এক গাল হেসে বলল কি যে বলেন না মাসিমা?
তাহলে আসলাম কি করে বলুন?
এসো মা এসো, আমার পাশটায় বলেই হাত ধরে টেনে বসান।
তোমার শাশুড়ি মা এসেছে শুনলাম।
হ্যাঁ মাসিমা।
উনারা এখন থাকবেন এখানে?
হ্যাঁ শাশুড়ি মা থাকবেন।
থাক ।ছেলে, ছেলে বউ থাকতে অন্য জায়গায় থাকতে ইচ্ছে করে ?ভুল করেছিলেন।
গলাটা বাড়িয়ে পার্থর মা পার্থকে উদ্দেশ্য করে বলল 'হ্যাঁ রে যা না বাবা।'
'হ্যাঁ মা যাচ্ছি।'
পার্থ কোথায় যাচ্ছে মাসিমা?
কোথাও না তুমি বস তো।
না মাসিমা কিছু আনাবেন না যেন।
আরে না না সন্ধ্যেবেলায় আমরা তো কিছু খাবো নাকি?
হ্যাঁ সে আপনার খান।
বেরোনোর সময় পার্থকে রেখা বলল ও পার্থ তুমি কিন্তু আমার জন্য কিছু এনো না ।তুমি তো জানো বাড়িতে তুমি এত কিছু পাঠিয়েছো!
আরে না বৌদি তোমার অনারে যদি কিছু হয় আমাদের।
বলেই হাসতে শুরু করলো।
"কতদিন আসনা মা?'কদিন ধরেই ভাবছিলাম মাসিমা আসব আসব আসার হয়ে উঠল না এদিকে শাশুড়ি মা ,ওরা এসেছেন। তাই আজ সন্ধ্যাবেলায় বেরিয়ে আসলাম হুড়মুড়িয়ে। তোমরা কিছু উল্টোপাল্টা ভাবতে বসে আছে কিনা কে জানে?
কি আর ভাববে তুমি তো আমাদের বাড়িতে এসেছো না?
আসলে স্কুল থাকে তো মাসিমা?
 হ্যাঁ সেইতো রোজ এত সকাল সকাল বেরিয়ে যাও স্কুলে আবার স্কুল থেকে ফিরে এসে কাজকর্ম থাকে তারপর হুটোপুটি করে ছুটে আসা বড় পরিশ্রমের ব্যাপার।
না পরিশ্রম আর কি এইটুকু আসবো সেটা নয় সময় করে উঠতে পারছিলাম না মাসিমা।
এবার পার্থ রোজি বলে মা ডেকে পাঠিয়েছে মা ডেকে পাঠিয়েছে?
আজকে দেখলাম না  আজকে স্কুল ছুটি ছিল।
ওদিকে আবার কাকিমা ফোন করেছিল যেতে বলেছে?
কেন গো উনারা সবাই ভাল আছেন তো?
মুখে তো বলছেন মাসিমা ভালো আছেন কাকার শরীরটা তো এমনিতে ভালো নেই এইবার যেতে হবে। আসলে মানুষের হুট করে যাব সেটাও ভাবছি..
পার্থনা রেখাকে কাছে টেনে বললেন এত চিন্তা ক'রো না বৌমা ।যাওয়া তো আর হয় না । উনারা এসেছেন বুঝবেন নিশ্চয়ই তোমার অধিক তাও তো দেখতে হবে বল?
হ্যাঁ সেই আর কি?.
তারপর মাসিমা বলুন কি জন্য ডেকে পাঠিয়েছেন?
পার্থর বিয়েটা নিয়ে বড্ড ভাবাচ্ছে গো বৌমা?
এদিকে ও তো ঐ মেয়ে ছাড়া আর বিয়েও করবে না বলছে,?
কিন্তু তুমি তো জানো ওদের বাড়ির কথা।
হে মাসিমা বাড়ি যাই হোক না কেন মেয়েটা কিন্তু ভালো।
আমি চেয়েছিলাম বৌমা আমার ছেলের বউ সুন্দরী হবে ,শিক্ষিতা হবে, ঘরোয়া হবে ভালো ঘরের মেয়ে।
মেয়েটা সুন্দরই না হোক দেখতে খারাপ নয় কিন্তু?
হ্যাঁ ওইতো ফোলা ফোলা ঠোঁট চাপা গায়ের রং গালদুটো টোপা টোপা..
হ্যাঁ মাসিমা তবে মেয়েটার চোখ দুটো দেখেছেন বেশ সুন্দর ,টানাটানা ।অনেকটা চিতল হরিণ এর মত।
আর বাড়ির অবস্থা একটু খারাপ তাতে কি হয়েছে মেয়েটা গ্রাজুয়েট তো। শিক্ষিতা।
পার্থ মা চুপ করে থাকে।
এই আর আপত্তি করবেন না।
তাছাড়া ছেলের যখন পছন্দ। সংসার করবে ওরা। ওদের দিকে তাকিয়ে মেনে নিন।
তবু তবুও পার্থর চুপ করে থাকে।
মাসিমা কিছু বলছেন না?
আমার তো আর একটা ছেলে নেই যে তাকে দিয়ে মনের আশাটা পূর্ণ করব?
সব বুঝতে পারছি মাসিমা কিন্তু কি আর করবেন তবে এটুকু বলতে পারি মনে হয় খারাপ হবে না মেয়েটার সাথে এমনি কথা বলে দেখেছি আমি ।
মাসিমার হাত দুটো ধরে রেখা বলল  'মেনে নিন।
এরমধ্যেই পার্থ এসে হাজির।
ওমা গরম গরম সিংয়ের কচুরি, আলুর দম আর রসগোল্লা।
হ্যাঁ প্লেট নিয়ে আয় তো বাবা।
পার্থ রান্নাঘর থেকে আওয়াজ দিলেইতো নিয়ে যাচ্ছি।
পার্থ প্লেট এনে হাজির করল।
রেখাকে প্লেটে সাজিয়ে দিলো বললো খাও বৌমা।
এটা ঠিক হলো না মাসিমা আমি বললাম যে আমি খাব না।
পার্থ বলল' বৌদি, তোমার অনারের বলেছি না এজন্য আমরা ওই দুটো খাচ্ছি।'
সে ঠিক আছে তুমি এত কিছু এনেছো কেন?
আরও মা শোনো ভোলা ময়রার দোকান থেকে পান্তুয়া ও এনেছি।ওই দেখো ওই প্যাকেটে আছে।
আমি আর খেতে পারব না মাসিমা।
পার্থ বলল তা বললে তো হবে না বৌদি ভোলা ময়রার নাম জানো না আমাদের এখানে ওর দোকানের পানতোয়া শেষ হয়ে যায় আমি অর্ডার দিয়ে রেখেছিলাম। একটা তো খেতেই হবে।
পার্থর মা বলল' খেতে হবে বললে হবে ,দে ওকে।'
পার্থ প্লেটে দুটো পা দিতে যাচ্ছিল তখন বললো ঠিক আছে আমাকে একটা দিয়ে দাও।
পার্থর মা বলল' তোর প্লেট টা নিয়ে যা বাবা।'
রেখা বলল ' আপনারটা মাসিমা?'
মায়ের জন্য ছানা এনেছি বৌদি।

তাহলে বৌমা ,তোমাকে তাহলে একদিন যেতে হবে আমাদের সাথে।
সময় করে আমাকে ব'লো। আমি সেইভাবে তাহলে কথা বলব।'
ঠিক আছে মাসিমা আমি জানিয়ে দেবো।
তাছাড়া বিয়ে দিলে তো তোমার সামনের বৈশাখ ছাড়া হবে ও না। ফাল্গুন মাস ওর জন্ম মাস।
ঠিক আছে।
খেতে খেতেই রেখার ফোন বেজে উঠলো'আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা...।'
পার্থ বলল বৌদি তোমার ফোনের রিংটোন দারুণ করেছ?
ভালো লাগছে পার্থ?
অসাধারণ।
দেখো কে আবার ফোন করলো।একবার ফোন হয়ে কেটে গেল।
মাসিমা বল্লো হুটোপাটি করে খেও না তো পরে ফোন ধরবে। 
না মাসিমা বাড়ি থেকে ফোন করছে কিনা কে জানে?'
করুক না?
রেখা এসে দেখল' হ্যাঁ ,স্কুল থেকে একটা ফোনএসেছিল?'
স্কুল থেকে ফোন করেছে।আমি ফোনটা করে নিই।
রেখা ফোন ধরাল। রিং হওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে ফোন রিসিভ করলেন।
হ্যাঁ বড় দি ফোন করেছিলেন?
হ্যাঁ কালকে স্কুলে আসবে তো?
ইচ্ছে তো আছে বড়দি।
ইচ্ছেটাই যেন থাকে অনিচ্ছা যেন না হয় হাসতে হাসতে বলেন বড়দি।
কালকে তোমাকে স্কুলে আসতেই হবে যে করেই হোক ভাষা দিবস আছে প্রোগ্রাম সেট করবে?
ঠিক আছে বড়দি।
রাখি।
 হ্যাঁ দিদি, রাখুন।
পার্থর মা বললেন' মেয়েটার এত চাপ কেনো তুমি না গেলে কোন কিছুই হবে না?'
আসলে  প্রোগ্রামগুলো আমি অ্যারেঞ্জ করেছি তো জয়েন করার পর থেকেই আমার ওপর বাড়তি একটা চাপ রয়েছে।
পার্থ বলল 'ও মা, বৌদির আর একটা গুণ আছে জানো?'
পার্থ-মা উৎসুক ভরে ছেলের দিকে তাকিয়ে তারপর বললেন 'কি?
'বৌদি তোমাদের লেখিকা।'
পার্থ মা অবাক হয়ে বললেন লেখিকা বাহ খুব ভালো তো।'
'আমাকে লেখা পাঠিও তো বৌমা?'
'পাঠাবো।'
ইবাবা সাড়ে আটটা বাজে এখন উঠতে হবে 'মাসিমা। 
' উঠবে?'
'ঠিক আছে এসো তাহলে ওই কথাই থাকলো।'
'হ্যাঁ মাসিমা ,আপনি মনের থেকে ওইগুলো তাড়িয়ে দিন ওর ভেতরের ভালো গুণগুলো খোঁজার চেষ্টা করুন ।দেখবেন, একেবারে মনের মত হয়ে যাবে।'
আসলে আমি মনের মতো চেয়েছিলাম বৌমা?
'মনের হদিস কে বা জানে.. কি আছে তার মনের ঘরে, কেউ জানেনা কেউ জানেনা।'
'সে ঠিক আছে ওই আপনার মনের মত হয়ে যাবে দেখবেন।'
'তাই যেন হয় ঈশ্বরের কাছে তোমরাএই প্রার্থনা ই করো।
'তাহলে আসি?'




তুই নামুক অসুখ-
মিতা নূর



যদি আমি সব ব্যথা ভুলে যাই.....   
যদি ভুলে যাই তোর দেওয়া আঘাত.... 
তবে প্রতি রাতে তোকে ভেবে, শিশির চোখে কাঁদবে কে? 

যদি ভুলে যাই তোর দেওয়া, তোর প্রিয় নাম
যদি পুড়িয়ে ফেলি জমিয়ে রাখা,স্মৃতিদের খাম
তবে দিন শেষে একাকীত্বের ভার সইবে কে? 

যদি ঢেকে দেই হৃদয়ের আয়নায় রাখা, তোর প্রিয় মুখ...
যদি বেছে নেই ফের, নতুন কোনো সুখ...
তবে আমার মতো করে, তোকে ভালোবাস কে, শত বকুনি খেয়েও হাসবে কে..? 
তার চেয়ে ভালো, আমার ভেতরই থাকুক...
খুব করে , তুই নামুক অসুখ !!