১২ মার্চ ২০২২

কবি সুপর্ণা চ‍্যাটার্জ্জীর কবিতা




জীবনের রঙ
সুপর্ণা চ‍্যাটার্জ্জী

আকাশের রঙ নীল,
তবে ঘাসের রঙ সবুজ,
মনের সাথে কোথায় মনের মিল
অভিমানে তা যে বড় অবুঝ। 

ভোরের আকাশে রোজ সূর্য উঠা দেখি,
তাই ইচ্ছে করে প্রিয়জনকে জানাতে সুপ্রভাত। 
কারো কাছে বিরক্তিকর হলেও
আবার কারো কাছে  ঔষধির সমান।  

মানুষ চেনাই বড় দায়,
সরল বন্ধুত্ত্বের অর্থ বোঝা না যায়।
তাদের মনের রঙে নিজেকে রাঙাতে যাওয়া বৃথা।

হয়তো কোনা গোপন রঙে 
সে রাঙিয়েছে তার মাথা।
তাই আকাশের রঙ নীল 
জীবনের রঙ অন্ধ ভালোবাসা।

১১ মার্চ ২০২২

কবি সানি সরকারের কবিতা




পোড়া পাখি
সানি সরকার



আমার জ্বর হয়েছে। পুড়ে যাচ্ছি 

অতঃপর, দেখলাম 
আমাকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হল 
গলিয়ে ফেলা হল ধাতুর মতন... 

আমার কান্না পেল না 
আমার শুধু দেখতে ইচ্ছে হল 

তোমাকে 

পাখিটি ডাকছে? 
পাখিটি ঘুমিয়ে পড়েছিল? 

ঘুম ভাঙার পরে পাখিটি ডাকছে আবার?

মমতা রায় চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৩০




উপন্যাস 


টানাপোড়েন ১৩০
পরান বীণা সুরে সুরে ভরে যাক
মমতা রায় চৌধুরী

যাক বাবা শেষ পর্যন্ত রাজি করানো গেল।এবার শুভস্য শীঘ্রম। শেষ পর্যন্ত পরিণতি পাক এটাই প্রার্থনা। আজকে পার্থ কত খুশি ছিল ।সত্যিই তো তাই। মনের মানুষকে যদি কাছে পায়,আরো আপন করে পায় । তার চেয়ে সুখী আর কে আছে। রেখা মনে মনে বারবার বলতে থাকলো 
'ভগবান ওদেরকে সুখী করুন। ওদের দাম্পত্য জীবন মধুর হোক,সুখের হোক ,আনন্দের হোক,বিশ্বাসের হোক ,বন্ধুত্বের হোক। এভাবে ওদের পরান বীণা সুরে সুরে ভরে যাক।
এসব ভাবতে ভাবতে বাড়িতে ঢুকছে। বাড়ির দরজা হাট করে খোলা।কে এসেছে রে বাবা।
রেখা আস্তে আস্তে ঘরে ঢুকলো। ঘরে ঢোকার মুখেই শুনতে পেল মনোজের মগজ ধোলাই হচ্ছে।
'এত আস্কারা দিস না বউকে।একে তো চাকরি করে, তারপর সব ব্যাপারে যদি সাপোর্ট করিস বুঝতে পারছিস??'
মনোজ বললো 'ওএমন কিছু করে না তো যার জন্য ওকে সাপোর্ট করবো না?'
', মা ভাইকে বুঝিয়ে কোন লাভ নেই। ওর ভালো ও বোঝে না। ওরে আমরা কি তোর  শত্রু।'
'কি বলব বলো তো?'
'এই যে পাড়া-প্রতিবেশী যে যখন ডাকছে অমনি তাকে চলে যেতে দিস ।পাড়া-প্রতিবেশীরা ওর মাথা খেতে পারে না ?'

'কি যে বলো না মা ,এতদিনকার সম্পর্ক পার্থদের সঙ্গে।  ওর মা রেখাকে ভালবাসে ।যেতে দেবো না?'
''তোকে কে বোঝাবে বল বাবা। তোকে যে বুঝিয়ে রেখেছে এর বাইরে তো তুই যাবি না । যোগ,বিয়োগ গুন ,ভাগ সবই করে রেখেছে আর কি করবি?'
মনোজ ঘর থেকে বেরিয়ে আসে । ভূত দেখার মত দেখে রেখা কে।
একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলে' তুমি কখন আসলে?'
'এইতো এক্ষুনি ঢুকলাম।'
'ও আচ্ছা।'
'মিলিরা কিছু খেয়েছো গো?'
'না কিছু বিস্কিট দিয়েছি ওদের।'
রেখা যেসব কথা শুনতে পেয়েছে মনোজকে হাবে ভাবে বুঝতে দিলে হবে না।
 বিষ যেমন করে কন্ঠে ধারণ করেছিল নীলকন্ঠ, ঠিক তেমনি করেই রেখা ও মনের ভেতরে সব রেখে দিল।
মনোজ মনে মনে ভাবল 'যাক শুনতে পায়
 নি ।না হলে কি ভাবতো? থ্যাংকস গড।'
জোড়হাত করে প্রণাম করে ভগবানের উদ্দেশ্যে।
রেখা বলল' কি হল?'
মনোজ বলল হেসে' কিছুই না।'
'কি খাবে তোমরা আজকে?'
'কি আবার রুটি।'
'কী সবজি বানিয়েছ গো সকালে?'
"ব্রকলি উইথ আলুভাজা।'
"বাহ, বেশ বেশ ।'
"মায়েরা কি খাবে?'
'দাঁড়াও জিজ্ঞেস করি।'
বলেই মনোজ  ঘরের ভেতরে গিয়ে বলল
' মা ,দিদি তোমরা কি খাবে রাত্রে?'
'আমরা তো ভাত খাই।
ভাত করবে আর  দুপুরে তরকারি করাই ছিল।'
মনোজ বলল 'ঠিক আছে'
।মনোজ রেখাকে এসে বলল ' ভাত খাবে?
রেখা বলল' ঠিক আছে। রান্না ঘরের দিকে পা বাড়ালো। আবার ফিরে এসে বলল শোনো একটা কথা আছে।'
উৎসুকভরে মনোজ বলল' কি কথা গো?'
'কালকে কিন্তু আমি স্কুলে যাব কামাই করব না।'
'হ্যাঁ অবশ্যই যাবে।'
"রান্নাবাড়া?'
'যেটুকু পারবে তুমি করে রেখে যাবে। বাকি মা 
দিদিরা করবে ।'
'ঠিক আছে এটাই বলার ছিল।'
রেখা রান্না ঘরের দিকে চলে গেলো এমনিতেই লেট হয়ে গেছে। ভাত চাপিয়ে দিয়ে মিলিদের
তরকারি গরম করলো। তারপর মিলিদের খাবারটা দিতে গেল।
"পাইলট তুলি উঠে পড়ো সোনা খাবার খেয়ে নাও।
সবাই লেজ নাড়তে নাড়তে এসে আগে রেখাকে একটু আদর করল তারপর খাবার খেতে শুরু করল।
ইতিমধ্যে রেখা পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে মনোজ এসে দাঁড়িয়ে।' একি তুমি?'
'হ্যাঁ l দেখতে আসলাম।'
'তাহলে তুমি দেখো। আমি যাই।'
রেখা চলে যাচ্ছে, তখন মনোজ বললো
"  অ্যাই রেখা ,শোনো, শোনো।'
রেখা পিছন ফিরে তাকিয়ে বলে' কি হলো?"
মনোজ কাছে এসে ফিসফিস করে বলল 'এই পার্থদের ওই ব্যাপারটা মেনে নিয়েছে মাসিমা?'
রেখা হেসে  বললো 'অনেক কষ্টে রাজি করে নিয়েছি ।দেখা যাক।'
এদিকে মনোজ আর রেখা খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থেকে কথা বলছে ,সেটা মনোজের দিদি আর মা দেখে  মনোজকে একসাথে দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো।
কিন্তু মুখে প্রকাশ করতে পারছিলো না । কিন্তু মনে মনে গজগজ করতে করতে ঘরে ঢুকে গেল। মনোজ বলল 'তাহলে এতদিনের স্বপ্ন ওদের পূরণ হবে বলো?'
রেখা বলল'সে রকমই তো হবার কথা। আজকে পার্থকে দেখে যেটা আমার মনে হয়েছে, এতোদিন একটা চিন্তায় ছিল ওদের ভালোবাসা পরিপূর্ণতা পাবে কিনা সংশয় ছিল মনে। তবে আজ ওকে দেখে আমার যেটা মনে হল ওর সমস্ত হৃদয় আকাশ সোনালীর ভালোবাসা। মনোজের  স্বপ্নচূড়া জুড়ে রয়েছে।'
'যাক একটা ভালো খবর শোনালে।'
অন্যদিকে মনোজের মা বাজখাই গলায় বলল'হ্যাঁরে মনু তোদের গল্প হল ।এদিকে ভাতের অবস্থাটা কি হচ্ছে দেখতে বল বৌমাকে।'
এতক্ষণে গায়ের জ্বালাটা যেন পারলো
 জুড়াতে ।
রেখা দ্রুত রান্না ঘরে এসে দেখলো ভাতের জল অনেকটা কমে গেছে।
তাড়াতাড়ি ভাতে জল দিল।
এমন  সময় রেখার ফোন বেজে উঠলো। ফোনের আর্তনাদে রেখার শাশুড়ি মা  বিরক্ত হয়ে বলল
"হ্যাঁরে মনু কার ফোন বাজছে?'
"মনু অ্যাই মনু ,মনু…"
মনোজ বাথরুম থেকেই সাড়া দিলো 'আমি বাথরুমে আছি মা'।
রেখা ঘরে গিয়ে ফোনটা ধরল।
'হ্যালো'
'হ্যাঁ বৌদি, পার্থ বলছি।"
"হ্যাঁ বল ভাই।'
'অনেক ধন্যবাদ।'
'ও বুঝেছি আগে পুরো কাজটা করতে দাও।'
'মনে তো হচ্ছে পুরো কাজটাই হবে।'
'ঠিক আছে তার জন্য ধন্যবাদ জানাতে হবে না।
তোমাদের ভালোবাসা পরিণতি পেলে আমারও খুব ভালো লাগবে।'
'এই জন্যই তো এতটা দিন অপেক্ষা করছি বৌদি।
ওকে ছাড়া আমি অন্য কাউকে গ্রহণ করতে পারতাম না।"
'তবে একটা কথা বলি ভাই সোনালীকে বলে দিও এ বাড়িতে এসে মাসিমার সঙ্গে সঠিক ব্যবহার করতে।মাসিমাকে আপন করে নিতে চেষ্টা করে যেন।'
"সে কথা আমি ওকে বলেছি বৌদি ।'

'কিছু মনে করো না ভাই  । কেননা মাসিমার মনে তো একটু দ্বিধা আছে ,হয়তো মাসিমা তাড়াতাড়ি সেটা কাটিয়ে উঠতে পারবে না ।সোনালীকে চেষ্টা করতে হবে সেটা।'
'একদম ঠিক কথা বলেছো বৌদি।'
'ঠিক আছে ভালো থেকো সবাই।'
মনোজ টাওয়ালে   হাত মুছতে মুছতে বলল 
"কে ফোন করেছিল গো।'
ফোনটা কেটে রেখা বলল 'ও  পার্থ করেছিল।'
"খুব খুশি না পার্থ ।'
রেখা একগাল হাসল।
'শোনো শিখার বিয়েতে কিন্তু যেতে হবে।'
'কবে বিয়ে আছে গো?'
'এই তো এ মাসেই বিয়ে।'
'দেখি কি হয়?'
'দেখলে হবে না সুরো কিন্তু ভীষন রাগ করবে আর মাধুও ।'
"শিখা তো তোমার একজন পরম ভক্ত। না গেলে হয়।'
রেখা ঘাড় নাড়লো তারপর বললো' ঠিক আছে যাই ,ওদিকে ভাত হয়ে গেলো  তোমাদের খাবার ব্যবস্থা করি।'

রেখা রান্নাঘরে গিয়ে ভাতের ফ্যান ঝরিয়ে ঝটপট রুটি করে ফেলল।
আবার ফোন বেজে উঠলো মনোজের ফোনে।
মনোজ ফোনটা ধরে বলল ''হ্যালো'।
"হ্যাঁ রে সুরো বলছি।'
'হ্যাঁ বল সবাই ভালো আছিস?'
'ভালো আছি। আজকে  রেখাকে পাবো তো নাকি রে।"
'পাবি রান্নাঘরে আছে ।দেখছি দাঁড়া।'
মনোজ চেঁচিয়ে বলল ', রেখা, রেখা, অ্যাই রেখা তোমার ফোন আছে।'
'যাই ।আবার কে ফোন করল?'
বেসিনের কল টা ছেড়ে আটার হাতটা তাড়াতাড়ি  ধুয়ে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ছুটে আসলো
' কে ফোন করেছে?'
'ফোনটা ধরো তাহলেই বুঝতে পারবে।'
' হ্যালো'।
"রেখা আমি সুরঞ্জনদা বলছি।'
:'হ্যাঁ দাদা বলুন  ভালো আছেন সবাই।'
'সবাই ভালো আছি  আরো ভালো থাকবো, যদি তোমরা সবাই আমার বাড়িতে আসো শিখার
 বিয়েতে। শিখার বিয়ে ঠিক হয়েছে জানো তো?'
"হ্যাঁ, দাদা শুনলাম।'
"শুনলে তো হবেনা এবার এসে তো সবকিছু অ্যারেঞ্জ করতে হবে ।মাধু একা পড়ে যাবে
 তো । তোমরাএসো তাহলে খুব ভালো লাগবে আর না কথাটা কিন্তু শুনবো না ।ঠিক আছে।'
"তা অবশ্যই চেষ্টা করব।'
'চেষ্টা করব কথাটা বলো না রেখা। বলো যাব আর শিখা কিন্তু তোমার একজন পাঠক হিসেবে ভীষণ ভক্ত। সুতরাং তুমি না আসলে ও খুব কষ্ট পাবে।'
'হ্যাঁ দাদা যাব। শিখাকে আমার অনেক ভালোবাসা আর শুভেচ্ছা জানাবেন।'
'সে আমি জানিয়ে দেবো কিন্তু তোমাকে কাছে এসে জানাতে হবে।'
রেখা হো হো হো করে হাসতে শুরু করলো তারপর বললো '
"মাধু বৌদি কেমন আছে দাদা?'
' শিখার বিয়ে বলে কথা ।ওকে তো ননদ হিসেবে কখনো দেখেনি ।মেয়ে হিসেবে দেখেছে। আনন্দ যেমন হচ্ছে তেমনি ভেতরে একটা কষ্ট রয়েছে চলে যাবে শ্বশুর বাড়ি  সব মিলিয়ে রয়েছে।'
'ঠিক আছে রাখছি তাহলে। তোমাদের কিন্তু অবশ্যই এক সপ্তাহ আগে আসার কথা। তোমারা সেই ভাবে প্রিপারেশন নিয়ে আসবে।'
রেখা আশ্চর্য হয়ে বলল' কি ?এক সপ্তাহ!'
সুরঞ্জন বলল' আমি বলেছি যখন…..আমি কোন কথা শুনব না ।রাখলাম ।সবাই ভালো থেকো আর তাড়াতাড়ি চলে এসো।'
মনোজ বলল 'দেখলে না গেলে হবে?'
রেখা সংশয় আর চিন্তাগ্রস্থভাবে বলল 'সে তো বুঝলাম কিন্তু আমার এই বাচ্চাগুলোর খাবার দাবারের ব্যাবস্থা।'
মনোজ বলল' সে ভাবনা তোমাকে ভাবতে হবে
 না ।আমি সেটা ভেবে রেখেছি ।সেটা করেও দেবে দরকার হলে কিছু টাকা পে করে দেব?'
রেখা বলল' কে গো?'
"কেন আমাদের গৌরী সেন দা",।
রেখা হাসতে হাসতে বলে' তুমি পারোও বটে। এসো এসো খাবে এসো। সে পরে ভাবা যাবে।'
কতদিন পরে যেন রেখার মনে হল প্রাণখুলে মনোজ হাসল। রেখার মনের থেকে চাপ অনেকটা কমলেও মনোজকে এভাবে হাসতে দেখে খুব খুশি হলো রেখা। মনজ কি কোন কিছুতে জড়িয়ে আছে ,যার জন্য মাঝে মাঝে এরকম ব্যবহার করে পরিষ্কার করে তো কিছু বলেও না।'
যাক টানাপোড়েনে মনের কালিমা দূরীভূত হোক।
সকলের হৃদয় বীণা সুরে সুরে ভরে উঠুক 

মমতা রায়চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১২৯




উপন্যাস 


টানাপোড়েন  ১২৯
মনের হদিশ কে বা জানে
মমতা রায়চৌধুরী

রেখার গোধূলি বেলা আজ শুধু অন্য ভাবনায়
কেটেছে। সন্ধ্যেবেলাটায়  রয়ে গেল তার রেশ। একরাশ টাটকা বাতাস এসেছিল বহুরূপী নৃত্য প্রদর্শনে। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকার সময়  হঠাতই বেখেয়ালি মনে আসে ঢাকঢোল পেটানোর আওয়াজ ,ভাবনা চলে যায় অন্য
 জগতে ।তাড়াতাড়ি উঁকি দিয়ে  দেখতে থাকে কি হচ্ছে। মিলি, চুনু,কটা ওরা এত জোরে চেঁচাচ্ছে
 বাধ্য হয়েই তাকাতে হল ,ব্যাপারটা কি ,দেখার জন্য।
'ও বাবা কতদিন পর বহুরূপী।'
এই সব শিল্পীদের কদর কোথায়? হারিয়ে যেতে বসেছে।
বহুরূপ  ধারণ করে কিছু টাকা উপার্জন করে তারা যেভাবে  মানুষের মনোরঞ্জন করছে, উপরী পাওনা হিসেবে মানুষের মনের খিদেটা উপশম হয় বটে
কিন্তু যারা বহুরূপী সেজে মনোরঞ্জন করল তাদের ভাড়ারে কি থাকলো? এটা আমরা কেউ চিন্তা করিনা।
দু এক টাকা দিতেই হাত কেঁপে ওঠে।
রেখার ইচ্ছে হয়েছিল কিছু টাকা ওদের দেয় কিন্তু টাকা বের করে নিচে নামতে নামতে ই বেরিয়ে যায়।
'একজন '' আরেকজন' পার্বতী 'বেশ দারুন লাগছিল?
হঠাৎই শাশুড়িমা আর মনোজের চিৎকারে রেখার ধান ভাঙ্গে।
রেখা ব্যালকনি থেকে কান খাড়া করে শোনে
'বুঝলি মনু চা কিন্তু আর সঠিক সময় পেলাম না?'
মনোজ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে তাইতো কি করছে রেখাটা মা এসেছে কোথায় একটু তাড়াতাড়ি করে দেবে তা নয়।
মনোজ আবার ডাকে' রেখা ,রেখা ,রেখা।'
রেখা বেলকনি থেকে উত্তর দিল 'কি বলছ?'
মনোজ বেশ নিচু গলায় বলল 'চা টা দাও?'
'হ্যাঁ দিচ্ছি।'
রেখার শাশুড়ি মা আবার পিএনপিসি শুরু করে দিল। "হ্যাঁ রে মনু ,তোকে কি এই ভাবেই চেয়েছে চা খেতে হয়?
'কেন বলতো?
'না তাই বলছি।'
'না তো?'
"তাহলে কি আমাদের দেখে চা করতে লেট করছে?'
'কোন কিছু করছিল হয়তো?
'ওরকম নয় মা তুমি ওরকম ভেবো না।'
মনামী ওর মাকে ধাক্কা দিয়ে ইশারা করে দেখালো 'দেখলে রেখার নামে কিছু শুনতে চায় না।'
রেখা চা করতে গেল একদিকে চায়ের জল বসিয়েছে অন্যদিকে কুকিজ বিস্কুট নিয়ে গিয়ে মিলি তার বাচ্চাদের খাওয়ালো।
তারপর যথারীতি চা বানিয়ে প্লেটে করে সাজিয়ে নিয়ে গিয়ে দিল।
শাশুড়ি মা প্লেটের দিকে তাকিয়ে কিছু স্নাক্স দেখতে  না পেয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল আজ বোধহয় চায়ের সাথে বিস্কুট খেতে হবে বুঝলি?
তাই তো দেখছি।
কথা শুনে তারপর বাইরে এসে রেখাকে বলে চায়ের সাথে কিছু বানিয়ে দিলে না কেন?
রেখা কোন কথা বলে না তারপরেই ফিশ ফ্রাই  শাশুড়ি, ননদ, মনোজকে দেয়।
মনোজ বলল 'দেখলে মা তোমাকে বলতে হবে না ও কিন্তু ঠিকঠাক সাজিয়ে দেয়,.'
রেখা তখন রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিল সব কথা কানে আসে।
ফিশ ফ্রাই টা কেমন হয়েছে রে দিদি!
হয়েছে একরকম।  
মনোজ বাইরে বেরিয়ে এসে রেখাকে জিজ্ঞেস করল 'হ্যাঁগো ফিশ ফ্রাই কাকে দিয়ে আনালে?'
'পার্থ কে বলেছিলাম।'
'আমি একটু পার্থদের বাড়ি যাচ্ছি।'
মনো জ বললl' কেন?
আরে সেদিন বলল না যে আর কথা তারপর তো আর যাওয়া হয়নি। ফোনেও আবার বলল।
যাও গিয়ে দেখো কিছু করতে পারো কিনা?
আমার যদি একটু ফিরতে দেরী হয় তাহলে মিলিদের একটু খাবার টা দিয়ে দিও।
ঠিক আছে।
পার্থদের বাড়ি যাওয়ার কথা শুনে মা মেয়ে দুজনেই কানাকানি শুরু করে দিল।
একটা কেমন অশালীন ইঙ্গিতও করলো।
রেখা দেখেও না দেখার ভান করল।
রেখা বেরিয়ে গেল পার্থদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রাস্তায় যাওয়ার সময় চৈতির মার সঙ্গে দেখা।
ও দিদি কোথায় চললেন গো?
এইতো পার্থদের বাড়ি যাচ্ছি।
কেন কিছু হয়েছে?
চৈতির মার সব সময় একটা কেমন যেন কৌতুহলী মনোভাব সবকথা জানতেই হবে এই জন্য মাঝেমাঝে রেখা চৈতির মার ওপর একটু বিরক্ত হয়।
"না না ওর মা ডেকে পাঠিয়েছে?'
'ও তাই বলুন।'
'তোমরা কবে ফিরলে?'
এইতো গতকাল।'
চৈতি রা কেমন আছে?
ভালোই আছে।
ঠিক আছে ,দিদি আসছি।
রেখাও ঘাড় নাড়লো। তারপর পার্থদের বাড়ি ঢুকলো।
কলিংবেলের আওয়াজ শুনে পার্থ এসে দরজা খুলল।
পার্থ একগাল হেসে বলল এসো বৌদি, এসো।
দরজা লাগাতে লাগাতে বললো ও মা মা, দেখ কে এসেছে?
পার্থর মা শুয়ে শুয়ে টিভি দেখছিল টিভির আওয়াজ টা কমিয়ে দিয়ে খাট থেকে নেমে বলল কে এসেছে?
বলতে বলতেই রেখা গিয়ে হাজির হল 
পার্থর মা বললো' ওমা ,ওমা তুমি?'
যেন একেবারে ভূত দেখার মত দেখল।
আজকাল তো আসই না। ভুলে গেলে বৌ মা?
রেখো এক গাল হেসে বলল কি যে বলেন না মাসিমা?
তাহলে আসলাম কি করে বলুন?
এসো মা এসো, আমার পাশটায় বলেই হাত ধরে টেনে বসান।
তোমার শাশুড়ি মা এসেছে শুনলাম।
হ্যাঁ মাসিমা।
উনারা এখন থাকবেন এখানে?
হ্যাঁ শাশুড়ি মা থাকবেন।
থাক ।ছেলে, ছেলে বউ থাকতে অন্য জায়গায় থাকতে ইচ্ছে করে ?ভুল করেছিলেন।
গলাটা বাড়িয়ে পার্থর মা পার্থকে উদ্দেশ্য করে বলল 'হ্যাঁ রে যা না বাবা।'
'হ্যাঁ মা যাচ্ছি।'
পার্থ কোথায় যাচ্ছে মাসিমা?
কোথাও না তুমি বস তো।
না মাসিমা কিছু আনাবেন না যেন।
আরে না না সন্ধ্যেবেলায় আমরা তো কিছু খাবো নাকি?
হ্যাঁ সে আপনার খান।
বেরোনোর সময় পার্থকে রেখা বলল ও পার্থ তুমি কিন্তু আমার জন্য কিছু এনো না ।তুমি তো জানো বাড়িতে তুমি এত কিছু পাঠিয়েছো!
আরে না বৌদি তোমার অনারে যদি কিছু হয় আমাদের।
বলেই হাসতে শুরু করলো।
"কতদিন আসনা মা?'কদিন ধরেই ভাবছিলাম মাসিমা আসব আসব আসার হয়ে উঠল না এদিকে শাশুড়ি মা ,ওরা এসেছেন। তাই আজ সন্ধ্যাবেলায় বেরিয়ে আসলাম হুড়মুড়িয়ে। তোমরা কিছু উল্টোপাল্টা ভাবতে বসে আছে কিনা কে জানে?
কি আর ভাববে তুমি তো আমাদের বাড়িতে এসেছো না?
আসলে স্কুল থাকে তো মাসিমা?
 হ্যাঁ সেইতো রোজ এত সকাল সকাল বেরিয়ে যাও স্কুলে আবার স্কুল থেকে ফিরে এসে কাজকর্ম থাকে তারপর হুটোপুটি করে ছুটে আসা বড় পরিশ্রমের ব্যাপার।
না পরিশ্রম আর কি এইটুকু আসবো সেটা নয় সময় করে উঠতে পারছিলাম না মাসিমা।
এবার পার্থ রোজি বলে মা ডেকে পাঠিয়েছে মা ডেকে পাঠিয়েছে?
আজকে দেখলাম না  আজকে স্কুল ছুটি ছিল।
ওদিকে আবার কাকিমা ফোন করেছিল যেতে বলেছে?
কেন গো উনারা সবাই ভাল আছেন তো?
মুখে তো বলছেন মাসিমা ভালো আছেন কাকার শরীরটা তো এমনিতে ভালো নেই এইবার যেতে হবে। আসলে মানুষের হুট করে যাব সেটাও ভাবছি..
পার্থনা রেখাকে কাছে টেনে বললেন এত চিন্তা ক'রো না বৌমা ।যাওয়া তো আর হয় না । উনারা এসেছেন বুঝবেন নিশ্চয়ই তোমার অধিক তাও তো দেখতে হবে বল?
হ্যাঁ সেই আর কি?.
তারপর মাসিমা বলুন কি জন্য ডেকে পাঠিয়েছেন?
পার্থর বিয়েটা নিয়ে বড্ড ভাবাচ্ছে গো বৌমা?
এদিকে ও তো ঐ মেয়ে ছাড়া আর বিয়েও করবে না বলছে,?
কিন্তু তুমি তো জানো ওদের বাড়ির কথা।
হে মাসিমা বাড়ি যাই হোক না কেন মেয়েটা কিন্তু ভালো।
আমি চেয়েছিলাম বৌমা আমার ছেলের বউ সুন্দরী হবে ,শিক্ষিতা হবে, ঘরোয়া হবে ভালো ঘরের মেয়ে।
মেয়েটা সুন্দরই না হোক দেখতে খারাপ নয় কিন্তু?
হ্যাঁ ওইতো ফোলা ফোলা ঠোঁট চাপা গায়ের রং গালদুটো টোপা টোপা..
হ্যাঁ মাসিমা তবে মেয়েটার চোখ দুটো দেখেছেন বেশ সুন্দর ,টানাটানা ।অনেকটা চিতল হরিণ এর মত।
আর বাড়ির অবস্থা একটু খারাপ তাতে কি হয়েছে মেয়েটা গ্রাজুয়েট তো। শিক্ষিতা।
পার্থ মা চুপ করে থাকে।
এই আর আপত্তি করবেন না।
তাছাড়া ছেলের যখন পছন্দ। সংসার করবে ওরা। ওদের দিকে তাকিয়ে মেনে নিন।
তবু তবুও পার্থর চুপ করে থাকে।
মাসিমা কিছু বলছেন না?
আমার তো আর একটা ছেলে নেই যে তাকে দিয়ে মনের আশাটা পূর্ণ করব?
সব বুঝতে পারছি মাসিমা কিন্তু কি আর করবেন তবে এটুকু বলতে পারি মনে হয় খারাপ হবে না মেয়েটার সাথে এমনি কথা বলে দেখেছি আমি ।
মাসিমার হাত দুটো ধরে রেখা বলল  'মেনে নিন।
এরমধ্যেই পার্থ এসে হাজির।
ওমা গরম গরম সিংয়ের কচুরি, আলুর দম আর রসগোল্লা।
হ্যাঁ প্লেট নিয়ে আয় তো বাবা।
পার্থ রান্নাঘর থেকে আওয়াজ দিলেইতো নিয়ে যাচ্ছি।
পার্থ প্লেট এনে হাজির করল।
রেখাকে প্লেটে সাজিয়ে দিলো বললো খাও বৌমা।
এটা ঠিক হলো না মাসিমা আমি বললাম যে আমি খাব না।
পার্থ বলল' বৌদি, তোমার অনারের বলেছি না এজন্য আমরা ওই দুটো খাচ্ছি।'
সে ঠিক আছে তুমি এত কিছু এনেছো কেন?
আরও মা শোনো ভোলা ময়রার দোকান থেকে পান্তুয়া ও এনেছি।ওই দেখো ওই প্যাকেটে আছে।
আমি আর খেতে পারব না মাসিমা।
পার্থ বলল তা বললে তো হবে না বৌদি ভোলা ময়রার নাম জানো না আমাদের এখানে ওর দোকানের পানতোয়া শেষ হয়ে যায় আমি অর্ডার দিয়ে রেখেছিলাম। একটা তো খেতেই হবে।
পার্থর মা বলল' খেতে হবে বললে হবে ,দে ওকে।'
পার্থ প্লেটে দুটো পা দিতে যাচ্ছিল তখন বললো ঠিক আছে আমাকে একটা দিয়ে দাও।
পার্থর মা বলল' তোর প্লেট টা নিয়ে যা বাবা।'
রেখা বলল ' আপনারটা মাসিমা?'
মায়ের জন্য ছানা এনেছি বৌদি।

তাহলে বৌমা ,তোমাকে তাহলে একদিন যেতে হবে আমাদের সাথে।
সময় করে আমাকে ব'লো। আমি সেইভাবে তাহলে কথা বলব।'
ঠিক আছে মাসিমা আমি জানিয়ে দেবো।
তাছাড়া বিয়ে দিলে তো তোমার সামনের বৈশাখ ছাড়া হবে ও না। ফাল্গুন মাস ওর জন্ম মাস।
ঠিক আছে।
খেতে খেতেই রেখার ফোন বেজে উঠলো'আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা...।'
পার্থ বলল বৌদি তোমার ফোনের রিংটোন দারুণ করেছ?
ভালো লাগছে পার্থ?
অসাধারণ।
দেখো কে আবার ফোন করলো।একবার ফোন হয়ে কেটে গেল।
মাসিমা বল্লো হুটোপাটি করে খেও না তো পরে ফোন ধরবে। 
না মাসিমা বাড়ি থেকে ফোন করছে কিনা কে জানে?'
করুক না?
রেখা এসে দেখল' হ্যাঁ ,স্কুল থেকে একটা ফোনএসেছিল?'
স্কুল থেকে ফোন করেছে।আমি ফোনটা করে নিই।
রেখা ফোন ধরাল। রিং হওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে ফোন রিসিভ করলেন।
হ্যাঁ বড় দি ফোন করেছিলেন?
হ্যাঁ কালকে স্কুলে আসবে তো?
ইচ্ছে তো আছে বড়দি।
ইচ্ছেটাই যেন থাকে অনিচ্ছা যেন না হয় হাসতে হাসতে বলেন বড়দি।
কালকে তোমাকে স্কুলে আসতেই হবে যে করেই হোক ভাষা দিবস আছে প্রোগ্রাম সেট করবে?
ঠিক আছে বড়দি।
রাখি।
 হ্যাঁ দিদি, রাখুন।
পার্থর মা বললেন' মেয়েটার এত চাপ কেনো তুমি না গেলে কোন কিছুই হবে না?'
আসলে  প্রোগ্রামগুলো আমি অ্যারেঞ্জ করেছি তো জয়েন করার পর থেকেই আমার ওপর বাড়তি একটা চাপ রয়েছে।
পার্থ বলল 'ও মা, বৌদির আর একটা গুণ আছে জানো?'
পার্থ-মা উৎসুক ভরে ছেলের দিকে তাকিয়ে তারপর বললেন 'কি?
'বৌদি তোমাদের লেখিকা।'
পার্থ মা অবাক হয়ে বললেন লেখিকা বাহ খুব ভালো তো।'
'আমাকে লেখা পাঠিও তো বৌমা?'
'পাঠাবো।'
ইবাবা সাড়ে আটটা বাজে এখন উঠতে হবে 'মাসিমা। 
' উঠবে?'
'ঠিক আছে এসো তাহলে ওই কথাই থাকলো।'
'হ্যাঁ মাসিমা ,আপনি মনের থেকে ওইগুলো তাড়িয়ে দিন ওর ভেতরের ভালো গুণগুলো খোঁজার চেষ্টা করুন ।দেখবেন, একেবারে মনের মত হয়ে যাবে।'
আসলে আমি মনের মতো চেয়েছিলাম বৌমা?
'মনের হদিস কে বা জানে.. কি আছে তার মনের ঘরে, কেউ জানেনা কেউ জানেনা।'
'সে ঠিক আছে ওই আপনার মনের মত হয়ে যাবে দেখবেন।'
'তাই যেন হয় ঈশ্বরের কাছে তোমরাএই প্রার্থনা ই করো।
'তাহলে আসি?'




তুই নামুক অসুখ-
মিতা নূর



যদি আমি সব ব্যথা ভুলে যাই.....   
যদি ভুলে যাই তোর দেওয়া আঘাত.... 
তবে প্রতি রাতে তোকে ভেবে, শিশির চোখে কাঁদবে কে? 

যদি ভুলে যাই তোর দেওয়া, তোর প্রিয় নাম
যদি পুড়িয়ে ফেলি জমিয়ে রাখা,স্মৃতিদের খাম
তবে দিন শেষে একাকীত্বের ভার সইবে কে? 

যদি ঢেকে দেই হৃদয়ের আয়নায় রাখা, তোর প্রিয় মুখ...
যদি বেছে নেই ফের, নতুন কোনো সুখ...
তবে আমার মতো করে, তোকে ভালোবাস কে, শত বকুনি খেয়েও হাসবে কে..? 
তার চেয়ে ভালো, আমার ভেতরই থাকুক...
খুব করে , তুই নামুক অসুখ !! 

১০ মার্চ ২০২২

কবি রেহানা বীথি'র কবিতা




বিরহের বেহাগ 
রেহানা বীথি 


দাঁড়িয়ে থেকো না 
মৃত শীতের অশ্লীল শব্দোচ্চারণে
ভেঙে যাচ্ছে, ভেসে যাচ্ছে 
কলসির গল্প 
পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ছে 
রোদ আর কুয়াশা 


একটু বোসো 
না-হয় আধশোয়া হয়ে 
চিবুকে তর্জনি রেখে একটু ভাবো 
দুপুর, ভোর, সন্ধেবেলার গণিত 

অতঃপর শবাসন 
শিথিল... 


পীড়িত মানুষের কাছে 
জ্যোৎস্না চেয়ে বিরক্ত কোরো না 
শবাসন থেকে উঠে বসে
বিরহ চাও তার কাছে 

দু'হাত খুলে দেবে 
 

মমতা রায় চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১২৮




উপন্যাস 


টানাপোড়েন  ১২৮

মনের মানুষ থাকুক মনের মন্দিরে

মমতা রায় চৌধুরী



রেখা  হঠাৎ ই অন্যমনস্ক হয়ে গেল। পার্থ যে টানাপোড়েনের মধ্যে আছে। রেখা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পেরেছে। কতটা কষ্ট হয় প্রিয় মানুষের সঙ্গে মিল না হলে। শৈশবকালে রেখা নীলকে হারিয়েছে। সেই ক্ষত এখনো টাটকা আছে। জ্বালা, যন্ত্রণা কিছুটা উপশম কাজের মধ্যে ভোলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু অতীত স্মৃতি ইতিহাসের পাতার মতো জ্বলজ্বল করে।
পাতা উল্টাতে উল্টাতে ভিড় করে আসে মনের আরশিতে।
এর মধ্যেই জীবনে ঘটে গেছে কত কিছু। স্বপ্নীল এসেছে জীবনে সেও অতীত। এটা হবারই কথা ছিল। বিবাহিত জীবনে পরকীয়া এটা কেউ মেনে নেবে না। কিন্তু মন তো অনেক কিছু চায়। মনের ক্রাইসিস কে দূর করবে? প্রকৃত বন্ধুর দরকার। প্রকৃত বন্ধুকে সবকিছু বলা যায় নিজের স্বামীকে বলা যায়না। তাহলে সে প্রকৃত বন্ধুটা কে? প্রকৃত বন্ধু সেই যে কখনো বন্ধুকে ছেড়ে কোথাও যায় না হ্যা হয়তো সবসময় তাকে কাছে পাওয়া যায় না কিন্তু তার মানে এই নয় তার দুঃখে তার অবসাদে তার কষ্টে সে শামিল হবে না ।দুঃখ বিমোচনে পরামর্শদাতা হবে না?
সবাই ছেড়ে গেলে ও বন্ধু ছেড়ে যাবে না।
সেরকমই বন্ধু পেয়েছিল স্বপ্নীলকে। স্বপ্নীল বন্ধু হয়ে উঠেছিল হয়তো বন্ধুর থেকে আরো একধাপ উঁচুতে। তবে স্বপ্নিলের  সব দাবিতে সাড়া দিতে পারে নি রেখা।
একদিন তো বলেই ফেলল স্বপ্নীল
চলো দূরে কোথাও পালিয়ে যাই।
কোথায় যাব?
যেখানে তোমাকে আমাকে কেউ চিনতে পারবে না?
শ্রাবণী পূর্ণিমায় তোমাকে নিয়ে পালাবো রসিকতা করে বলেছিল।
রেখা একটু রেগে গেছিল এসব কথা তুমি কি বলছো আমি বিবাহিতা আমি সমাজ-সংসার সকলকে ভয় পাই?
আর আমাকে?
আমি তো তোমাকে ভালোবাসি?
রেখা কিন্তু  বলেছিল' আমি কি তোমাকে বলেছি ভালবাসি?'
অবাক হয়ে স্বপ্নীল বলেছিল "তুমি আমাকে ভালোবাসো না?
তুমি আমার দিকে তাকিয়ে বলো?'
রেখা বলেছিল 'না।'
ছোট্ট একটা শব্দ '। অথচ এর ভেতর দিয়ে প্রকাশ পায় যা তাতে কারো মন ভেঙে খান খান হয়ে যায় ।অবসাদ চলে আসতে পারে ,দুঃখ-যন্ত্রণা ভরিয়ে দিতে পারে। 
রেখা জানত কিন্তু রেখার কোনো উপায় ছিল না ।এটা রেখাকে বলতেই হত ।নইলে স্বপ্নীল সারাটা জীবন ধরে রেখার পেছনে পড়ে থাকত জীবনটাকে বাজি রেখে । 


রেখা চেয়েছিল ভালো থাকুক। ওর ও একটা ছোট্ট সংসার হোক। মনের ভিতর রেখার প্রতি ভুলটাকে নিয়েই স্বপ্নীল থাকুক।
স্বপ্নীল অনেকক্ষণ মাথা নীচু করে ছিল।
তারপর বলেছিল ভালোবাসাটা একতরফাই থেকে গেল। তাই থাকুক। কিন্তু আমি তোমাকে ভালবেসে যাব নিরন্তর। ভালোবাসার মৃত্যু নেই। ভালোবাসা চিরজীবী।
স্বপ্নীলের দুচোখ কখনো জলে ভরা আবেগমথিত কন্ঠে বলেছিল
' ঠিক আছে আমি আসছি ।আমি আমার কষ্টটাকে ভাগ করার জন্য চলে যাচ্ছি কদিনের জন্য।
রেখা অবাক হয়ে বলেছিল কোথায় যাচ্ছ?
তোমাকে বলতেই হবে?'
সেটা তোমার ইচ্ছে।'
আমার ইচ্ছেগুলো কি সেটা তুমি সব জানো ।সেই ইচ্ছেগুলো ডানা মেলে উঠতে পারল না। তবে তোমাকে বলে যাচ্ছি আমি সমুদ্রে যাচ্ছি ঢেউ গুনতে।
ঢেউ এর সাথে সাথে কতবার শুধু ভালোবাসার নামটাই উচ্চারিত হয় ।সেটা দেখতে যাব।
স্বপ্নীল এই কথা বলেই দ্রুত বাইকটা স্টার্ট করে চলে 
যায় ।
তার পরে বেশ কয়েকদিন স্বপ্নীলের কোন ফোন নেই ,দেখা নেই।
রেখা জানতো এই নির্দয়তার পরিচয় না দিলে স্বপ্নীল রেখাকে ভুলতে পারবে না। তারপর রেখা
হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিল সত্যিই সে স্বপ্নীলকে কতটা ভালোবেসেছে ,এতটা কষ্ট এতটা যন্ত্রণা ,কেন পাচ্ছে ?মনে হচ্ছে স্বপ্নীলের সঙ্গে কথা না বললে রেখার যেন পাগল পাগল লাগছে। একটা শুন্যতা ,রিক্ততা সারাটা মন জুড়ে থেকে 
গেছে ।কতবার ফোন টার দিকে তাকিয়েছিল ।একটা ফোন আসেনি ।রেখা ও যখন ফোন করতে গেছে ফোনটা নট রিচেবল থেকেছে। ওই কদিনে রেখার ভেতরে যে কষ্টের পাহাড় গড়ে উঠেছিল তিল তিল করে সেই হিসেব শুধুমাত্র রেখেছে।
রেখা মনে মনে বলেছে স্বপ্নীল 'তুমি জানো না তোমাকে যদি আমি এই কথাগুলো না বলতাম তুমি সারাটা জীবন আমার জন্যই নিজের জীবনটাকে অতিবাহিত করতে কিন্তু আমি তো সেটা চাই না ।আমি চেয়েছি তুমি সুখী হও  তোমার একটা ঘর সংসার হোক। সারাটা দিন ক্লান্তি শেষে তুমি নিরাপদ আশ্রয়ে এসে দুটো একটা মনের কথা খুলে বলো ।ক্লান্তি, অবসাদে তোমার কাছে বসে যে তোমার কপালটা একটু টিপে দেবে ,কখনো বা আদরে আদরে ভরিয়ে দেবে তোমাকে । এমনি করেই একদিন তুমি আমাকে ভুলে যাবে , এটাই নিয়ম।
কতটা যে যন্ত্রণা কতটা যে কষ্ট রেখা মনের ভেতরে চেপে রেখেছিল সেই কটা দিনে। মনে হয়েছিল যেন স্বপ্নীল কোথায় চিরদিনের জন্য রেখাকে ছেড়ে চলে গেল। মিনিটে মিনিটে ঘন্টায় ঘন্টায় সারাক্ষণ শুধু স্বপ্নীলের কথা ভেবেছে।
মনে হচ্ছিল যেন ক্রমশ তাদের এই গল্পে যে পাতা জুড়ে গিয়েছিল।দু মুঠো বিকেল ক্রমশই হৃদয় ছুঁয়ে ছুঁয়ে অনুভবের চাদরে মুড়ে গেছিল। আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে শুধুই তোমাকে উপলব্ধি । আর ছেলেমানুষি গুলোকে মনের ক্যানভাসে রং তুলির আঁচড় দিয়ে কোন এক শিল্পীর আঁকায় অবয়ব দেবার চেষ্টায় মন ব্যাকুল হয়েছিল। অথচ চলে যাবার পর সবকিছুই যেন ফাঁকা মাঠের মতো হুহু করা এক রিক্ততা।
তারপর যখন ও ফিরে এসেছে সে কি এক অনাবিল আনন্দে ভরে উঠেছিল রেখার মন ও প্রাণ।
হারানো জিনিস ফেরত পেলে যে অভূতপূর্ব, অনির্বচনীয় আনন্দ এর সৃষ্টি হয়।  রেখার ও  ঠিক সেরকমই হয়েছিল।
আজ সেই স্মৃতিচারণ করতে বসে রেখার দু'চোখ জলে ভরে ওঠে।  সত্যি সত্যি রেখা  চেয়েছিল, স্বপ্নীল নিজের মতো করে বাঁচুক।
আর যখন স্বপ্নীল নিজের মতো করেই বাঁচার জন্য রেখার থেকে দূরে চলে গেল তখন রেখা মানার চেষ্টা করলেও ভেতরে কষ্টে যন্ত্রণায় দুমড়ে-মুচড়ে হৃদয়টা যেন ভেঙে খান খান করে দিয়ে গেল। এখন স্বপ্নীল কে দুটো কথাও বলতে পারে না কোথায় আছে কে জানে ?কোথায় হারিয়ে গেল ওর জীবন থেকে ।গল্পের পাতা গুলো এভাবেই ছিঁড়ে গেল।
সত্যিই তাই সবকিছু সুন্দর হয়  যদি কাছে থাকে এমন কেউ।
মনে মনে চাইছে স্বপ্নীল আবার ফিরে আসুক জীবনে । ফিকে হয়ে যাওয়া ধূসর জীবনে হাতছানি দিক কৃষ্ণচূড়ার পলাশের রং। ফিরে আসুক আবার বসন্ত কোকিলের কুহুতান আবার ডেকে উঠুক তাদের সুমিষ্ট ধ্বনি।
এমন সময় এক ঝাঁক পায়রা উড়ে চলেছে নীল আকাশে হয়তো বা ওরা গোধুলিবেলায় নিজের নিজের ঠিকানায়। রেখা মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল ওদের। কি মুক্ত স্বাধীন যখন খুশি যেখানে খুশি চলে যেতে পারে ,নেই কোনো বাঁধন। এরকম মুক্ত পাখির মতো যদি ডানা মেলে উড়ে যেতে পারত দূর-দূরান্তে। হয়তো বা ঠিকানা খুঁজে বের করতে পারত স্বপ্নিলের।
এমন সময় শাশুড়ির চিৎকারে রেখার ধান ভাঙ্গে।
'হ্যাঁ রে মনু, বলি তোর বউটা কি বেআক্কেলে রে।
এতটা সময় হয়ে গেল চা পেলাম না। শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবে, না কিরে?'
মনোজ বললো 'সে কি ?
এখনো চা পাওনি?'
তাহলে কি তোকে আমি  মিথ্যা কথা বলছি? জিজ্ঞেস কর তোর বউকে।'
মনোজ তারস্বরে চেঁচাতে লাগলো' রেখা রেখা রেখা আ. আ. আ।'
রেখার চমক ভাঙ্গে অবাক হয়ে কাছে এসে বলে কি হয়েছে এভাবে চিৎকার করছো কেন?
এখনো চা দাওনি মায়েদের?
গ্যাস নেই তো।
সেকি?? আগে বলনি তো?
মনে করে দেখো ৫-৬ দিন আগেই বলেছি গ্যাস শেষের মুখে গ্যাস দিতে বলো।
এই যা আমিতো ইসলামকে বলতে ভুলে গেছি। এখন উপায়?
মনে সংশয় নিয়ে রেখার মুখের দিকে তাকায়।
রেখা বলল পার্থদের বাড়ি খোঁজ নাও ওদের থেকে এনে দাও।
একদম ঠিক বলেছ।
রেখা কোন কথা না বলে চুপ করে থাকে।
রেখা মনে মনে ভাবে শাশুড়ি মা যখন কথাগুলো বলেন মাঝে মাঝে মনে হয় তার জবাব দিই কিন্তু ইচ্ছে হয়না। বোঝানো যাবেনা শুধু শুধু মুখ নষ্ট করে লাভ নেই। অনেকে বলে এডুকেটেড মেয়ে চুপ চাপ থাকিস কেন প্রতিবাদ তো করতে পারিস। তখনই প্রতিবাদ হয় যখন তার থেকে রিটার্ন কিছু পাওয়া যায় । উজবুক দের বুঝিয়ে কোন লাভ নেই। সেজন্য বোবা হওয়াই সব থেকে বেশি বেটার।
আজকাল এই পলিসি নিয়ে চলছে রেখা। চালাতেই  হবে। না  রোজগারের অশান্তি।
কিন্তু কতদিনই বা এ ভাবে মেনে নেবে জানে না।
ঈশ্বর ধৈর্যশক্তি দিন। ছুটির দিন কোথায় গল্প লিখবে সে ফুসরত নেই। এরমধ্যে কলিংবেলের আওয়াজ" জয় গনেশ, জয় গনেশ ,জয় গনেশ দেবা।"
রেখা গিয়ে দরজাটা খুলে দেখে পার্থ একগাল হাসি নিয়ে বললো 'বৌদি ,এই নাও তোমার রান্নার গ্যাস। এতক্ষণ তোমরা চা না করে বসে
 আছো ।আমাকে একটা ফোন করলেই তো হতো।
"হ্যাঁ ,তা হতো আসলে  আমিও একটু  অন্যমনস্ক হয়ে গেছিলাম।
ও বৌদি কবে যাবে মায়ের কাছে?
রেখা বলে ঠিক আছে দেখছি আজকে যদি পারিস সন্ধ্যের পরে যাব।
একটু ভালো করে বুঝাও না বৌদি মাকে।
হাত তুলে আশ্বস্ত করে বলল নিশ্চয় চেষ্টা করব ভাই আমি তোমার মনের কষ্টটা বুঝতে পারছি।
এই জন্যই তো তোমাকে আমি বললাম মা ও তো তোমার কথা শোনে।
ঠিক আছে বৌদি আসছি।
রেখা বলল ঠিক আছে এসো।
পার্থ চলে যাবার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে চলে যাবার সময় পার্থর মুখটা কি অনাবিল আনন্দ আর প্রশান্তিতে ভরে উঠেছে । পার্থ গান করতে করতে যাচ্ছে 'ভালোবেসে সখী নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখো তোমার মনেরও মন্দিরে। 'রেখা পার্থর চলে যাবার পথের দিকে তাকিয়ে, মনে মনে ভাবতে থাকে 'সত্যিই তো একটা ভালোবাসা যদি পরিপূর্ণতা পায় একটু চেষ্টা করে দেখতে দোষ 
কি ।ভালো থাকুক সবাই।'মনের মানুষটি থাকুক ভালোবেসে মনেরও মন্দিরে।

মমতা রায়চৌধুরী এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১২৭




উপন্যাস 

টানাপোড়েন ১২৭
ঢেঁকি  গেলেও ধান ভানে
মমতা রায়চৌধুরী


দুটো দিন টানা কিছু খেতে পারেনি রেখা যাও বা খেয়েছে সবই বেরিয়ে গেছে ।প্রচন্ড উইক লাগছে কিন্তু বাচ্চাগুলোর কাছে তো যেতেই হবে। না দেখলে যেন প্রাণ আনচান করতে থাকে। ওদের আদর-ভালোবাসা সবথেকে বেশি মূল্যবান বলে মনে হয় ।মিলি যেন রেখার মাতৃত্বটাকে তার বাচ্চা দিয়ে ভরিয়ে দিলো। ঈশ্বরের অশেষ
 আশীর্বাদ ।থ্যাংকস গড বারবার জানায় রেখা।
হঠাৎ  মনোজ এসে বলল'জানো রেখা।'
রেখা মনেজের দিকে উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে তাকায়।
"তোমার পাইলট কি করছে দেখেছো?'
রেখা বললো কি?
মনোজ হাত দুটোকে গেট ধরার মতো করে দেখিয়ে বলল
'গেটটাকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে আর ডাকছে?'
আমি কাছে গেলাম ।লেজ নাড়ল।
তারপরও ডেকে যাচ্ছে।'
কেন?
'তুমি যাওনি আজকে ওদের কাছে।''
'অনেক আগে কিন্তু আদর করিনি।'
"ও বাবা ওই জন্যই বোধহয় ... যাও যাও একবার দেখা করে আসো, আদর করে আসো।
রেখা বলল 'ঠিক আছে, যাই।"
'সত্যিই তো ওরাও তো প্রত্যাশা নিয়ে থাকে, হয়তো "মনটা খারাপ হচ্ছে।'
"হ্যাঁ যাও ,ওদের কাছে যাও।'
রেখার ননদ রেখার শাশুড়ির কাছে গিয়ে বলল 'দেখ ,এদিকে বলছে শরীর খারাপ, ও দিকে  কুকুরের বাচ্চা গুলোর কাছে গিয়ে কেমন আদর করছে তোমার বৌমা?
সব নাটক বুঝলে মা।'
রেখার শাশুড়ি বললো'আরে বাজা মেয়ে মানুষ, কুকুরের বাচ্চাকে আদর করে একটু না হয় দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাল।'
রেখার কানে কথাগুলো আসলো ,যেন মনে হলো কোন হ্যাঁচকা টানে বুকের ভিতর একটা ভাষাহীন বোবা  যন্ত্রনা দুমড়ে-মুচড়ে হৃদয়টাকে শূন্য করে দিতে চাইল।
তবুও রেখা তার শরীরটাকে টেনে টেনে নিয়ে গেল বাচ্চাদের কাছে।
রেখা কাছে যেতেই  চেঁচিয়ে উঠল। তারপর  রেখা গেটটা খুলে ভেতরে যেতেই সবাই  যেন হামলে পড়েছে । মনে হচ্ছিলকোনো একটা প্রিয় জিনিস হারিয়ে গেলে হঠাৎ খুঁজে পেলেযেমন মনে খুশির বন্যা বয়ে যায়,আনন্দ হয় ,যে রকম  ঠিক সে রকম।
শাশুড়ি আর ননদের কথাগুলো মনে হতে থাকলো রেখার দুচোখ বেয়ে জল পড়তে থাকল কিন্তু বাচ্চাগুলোর আদর-ভালোবাসা তাদের ভেতরে যে অনুভূতি সেগুলো যখন রেখার কাছে ধরা পড়ে ,রেখাকে আদরে আদরে ভরিয়ে দেয়। রেখা ভুলে যায় সেই যন্ত্রণা।
হঠাৎই মনোজ চিৎকার করে ডাকতে থাকে রেখা ,রেখা,রেখা।
'তোমার ফোন বাজছে?'
রেখা বেশ জোরে বলে কে করেছে?
মনোজ  ঘরে টিভি চালিয়েছে। টিভির শব্দে রেখার আওয়াজ প্রথমে শুনতে পায় নি।
তারপর মনোজের মনে হল যেন মনোজকে কেউ কিছু বলছে টিভির সাউন্ড টা কমিয়ে দিয়ে কানটা খাড়া করল শুনতে পেল। রেখাই যেন কিছু বলছে।
মনোজ বলল-কি বলছ. ছ,,. ছ. ছ
বলছি কে ফোন করেছিল?
আমি দেখিনি।
ও আচ্ছা।
তুমি এসে দেখে নাও জরুরী ফোন এলে ফোন করে নাও।
হ্যাঁ, এই যাচ্ছি গো। বাচ্চাগুলোকে মায়ের কাছে রেখে গেটটা তালা দিয়াআসি
রেখা ভেতরে গিয়ে কল লিস্ট চেক করে দেখলো
এই যা t বড়দি ফোন করেছিল তো।
ঠিক আছে তুমি আর একবার ফোন করে
নাও।
হ্যাঁ ঠিকই বলেছ আবার কি করলে দেখো?
এ বাবা দরকার থাকলে তুমি ছুটি নেবে না? এই নকইয়ে আবার গসিপ ?'
রেখা বড়দিদি নম্বরে রিং করল।
রিং হয়ে গেল কেউ ধরলেন না।
আবার ফোন করল । এবার রিং হতে হতেই ফোনটা রিসিভ করে গুরু গম্ভীর স্বরে বলল হ্যালো '।
রেখা বলল ,“আমি রেখা ।আমি বলছি।.'
হ্যাঁ বলো।
না আপনি ফোন করেছিলেন তাই।
আমি ঠিকই আন্দাজ করতে পেরেছিলাম।
কালকে স্কুলে ভ্যাকসিন আছে সেকেন্ড ডোজ।
তুমি কিন্তু কাল কামাই করো না অবশ্যই স্কুলে এস।
কিন্তু দিদি এতটা পথ যাব , কি হবে কে জানে?
কিন্তু তুমি না আসলে খুব অসুবিধা হবে রেখা। চেষ্টা করো আর দেখো তুমি নিশ্চয়ই সুস্থ হয়ে যাবে।
ঠিক আছে দিদি আমি চেষ্টা করব।
এরমধ্যে কলিং বেলের আওয়াজ জয় গনেশ, জয় গনেশ, জয় গনেশ দেবা।
রেখা বললো এই সময় আবার কি আসলো কে জানে?
আবার কলিংবেল বাজল 
'গনেশ জয় ,গনেশ জয় 'গনেশ দেবা।
মনোজ উঠে সবেমাত্র দরজার কাছে গেছে গেল।
এবং বলল: কে ,কে জানে?'
দরজা খুলতেই একগাল হাসি নিয়ে পার্থ দাঁড়িয়ে।
মনোজ রেখা কে বলল দেখো কে এসেছে?
রেখা খুশিতে ডগোমগো হয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসলো।
কি ব্যাপার পার্থ ভাই?
এইতো দিদি।?
ভাবলাম অনেকদিন আপনাদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হয়নি কাজে ব্যস্ত থাকি।
তা বেশ বেশ ভাল করেছো।
মাসিমা কেমন আছেন।
বসার কুশান টা একটু কুঁচকে গেছে ওটাকে টানটান করে রাখল।
রেখা আবার গেল সবজি কাটতে। পার্থ বলল বৌদি একটু বসুন না।
কিছু বলবে?
বলছি মায়ের সাথে দেখা করেছিলে।
দেখা করতে পারিনি ফোনে কথা বলেছি।
মা কিছু বলেছে?
হ্যাঁ বলেছে?
পার্থ খুব শখ ভরে রেখার দিকে তাকিয়ে কিছু জানতে চাইল আশাব্যঞ্জক কথা।
রেখা বললো মাসীমা যেটা বললেন মাসিমার দিক থেকে ঠিকই বলেছে ন।
কি বলেছে মা?
কাস্ট নিয়ে।
পার্থ একটু চিন্তিত মুখে বলল মাকে কিছুতেই বোঝাতে পারছি না কাস্ট নিয়ে ধুয়ে কি জল খাব?
পার্থ চিন্তা করো না মাসিমা কে আমি বোঝাবো।
পার্থ বলল আজ এত বছরের সম্পর্ক বৌদি আমি কি করে…?
আমি বুঝতে পারছি।
তাছাড়া এখন তো ওর বাড়ি তো চাপ দিচ্ছে আমি কি করব বুঝে উঠতে পারছি না।
আমি এর মধ্যেই যেতাম আমার শরীরটা বাবার বিগড়ে গেল তো।
আশ্চর্য হয়ে পার্থ বলল কি হয়েছে বৌদি?
মনোজ বাইরে থেকে কথাটা শুনতে পেয়ে এসে বলল রেখার তো শরীর খারাপ বমি পায়খানা হলো।
তারপর মায়েরা এসেছে।
পার্থ এদিক ওদিক তাকিয়ে কে মায়েরা বলতে কাকিমা আর মনিদি।
মনোজ বলল হ্যাঁ।
তা আমাদের বাড়িতে গেল না তো।
যাবে এইতো রেখা অসুস্থ ওরা রান্না বান্না করছে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
ও আচ্ছা আচ্ছা।
তারপরই আবার পার্থ রেখা কে বলল বৌদি একটু দেখো ব্যাপারটা বুঝতে পারছো আমার মনের অবস্থা।
রেখা না বুঝে আর পারে উল্টো ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায় পার্থর অবস্থাটা বুঝতে পারছে।
রেখা পার্থকে আশ্বাস দিয়ে বলল 'কোন চিন্তা ক'রো না ।আমি দেখছি ব্যাপারটা।
পার্থ বলল তাহলে আমি আসছি বউদি তবে কিন্তু যেও না কিন্তু তোমার কথা শোনে।
রেখা ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো।
পার্থ উঠে দাঁড়ালো।
রেখা বলল পার্থ ভাই উঠে দাঁড়ালে চা খাবে তো একটু একটু ওয়েট করো আমি চা করে দিচ্ছি।
না বৌদি আজকে আর চা খাব না। তোমারও শরীরটা ভালো নেই।
অন্যদিন তোলা থাকলো।
মনোজ বললো ভাইয়া তুমি খেলে আমি একটু পেতাম।
পার্থ হেসে বাইরে বেরিয়ে আসলো।
বাইরে বেরিয়ে আসতেই দেখতে পেল মনোজের মা আর দিদি দাঁড়িয়ে।
পার্থ সঙ্গে সঙ্গে মনোজের মাকে গিয়ে প্রণাম করলো।
মনোজের মা বললো' থাক বাবা, বেঁচে থাকো।'
আমাদের বাড়িতে যে ও কাকিমা।
আর বাতের ব্যথা বাবা দেখি এখন তো এখানেই থাকব দেখা হবে মাঝে মাঝে।
পার্থ অবাক হয়ে বললো এখানে থাকবে 
কাকিমা। বাহ বেশ ভালো কথা।
মনোজের মা একটু বাঁকা সুরে বলল আর ভালো কথা তোমার কাছে বাবা সবার কি আর ভাল লাগবে?
মনোজ কি বলবে বুঝে না পেয়ে বলল মা ঘরে এসে বসো।
মানুষের মা বলল ঘরে ঢুকতে ঢুকতে আজকে বৌমাকে রান্না করতে বলিস বাবা মনির শরীরটাও ভাল নেই আর আমি তো দাঁড়াতে পারি না হাটুর ব্যাথা তে।
লেখা বুঝতে পারলেই ইচ্ছে করে পার্থ সামনে কথাগুলো বলছে যেন মনে হয় রেখা কিছুই করতে পারেনা উনারাই করছেন কিন্তু কিছু বললো না রেখা।
আসলে যার যার ধর্ম ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে।
মনোজ  রেখার দিকে তাকিয়ে রইল।মনোজ পড়েছে যাঁতাকলে। না পারছে রেখাকে এই অবস্থায় কিছু বলতে আর না পারছে মায়ের কথা ফেলতে।
রেখাই যেন এই অসহায় অবস্থা থেকে মনোজকে মুক্তি দিলো ।রেখা মনোজের দিকে তাকিয়ে বলল 'না ,না আমি আজকে রান্না করবো।'
পার্থ শুধু বলল 'বৌদি তুমি পারবে ?তুমি তো উইক আছো?
মনোজের মা বিড় বিড় করে বললো বাবা এত দরদ মরে যাই ,মরে যাই।
পার্থ বলল বৌদি আসছি, কাকিমা আসছি।
মনোজের মা বিরক্তিভরে বলল-'এসো বাবা।'

কবি শিবনাথ মণ্ডল এর ছড়া






মাকে পেলেই শিশু খুশি
শিবনাথ মণ্ডল



জন্মেই পেয়ে গেলাম
মায়ের শীতল কোল
আদর স্নেহ দিয় মা
সর্বদা দেয় দোল।
মা,যে আমার দেবীর সোমান
বড়ো করে তোলে
বুকের সুধা দিয়ে বাঁচায়
সব ব‍্যাথা ভুলে।
সব কষ্ট ভুলে যায় মা
দেখলে শিশুর হাসি
মাকে পেলেই ভুলেযায় শিশু
আদরের মাসি।
শিশুর কাছে মায়ের মত
নেইকো কিছু আর
হতোভাগি হয় শিশু
নেই মা যার।
বড়ো হয়ে মাকে যেন
কেউ যেওনা ভুলে
মায়ের স্নেহ মাথায় করে
রেখো সবাই  তুলে।।

০৯ মার্চ ২০২২

কবি প্রিয়াঙ্কা দাস এর কবিতা




আমরা নারী 
প্রিয়াঙ্কা দাস

যুগ-যুগান্ত ধরে বিদ্রোহ   
ব্যথা-যন্ত্রণা কষ্ট সহ্য করে
অধিকারটি পেয়েছি ফিরে।
পেয়েছি? 

এখন সমস্ত দেশের মেয়ে 
একাধিক বিদ্রোহ করে 
বছরের একটি দিন 
নারী দিবস পালন করে। 

সারা বিশ্বের মেয়েরা যখন 
নেমেছিল প্রতিবাদের আন্দোলন
ক্ষত বিক্ষত হয়েছে সব 
তবুও তো আসেনি ফিরে… 

বহু নারীর কোল শূন্য করে,
তাদের সাহসিকতার জবাব দিয়ে
মেয়েদেরকে পৌঁছেছিল সর্বাঙ্গের চূড়ায়… 

নারী বলে থামবো না
ঘরে ঘরে শুধু বদ্ধ হব না,
এগিয়ে আসব বারবার 
ভারত ও বিশ্বকে জয় করতে
নারী না পুরুষ না 
মানুষের ভিড়ে।

কুড়ি ও কুড়ি, আর ভয় তো নেই তার,
নারী ও নারী সবকিছুতে যে বিশ্ব তোমার।

কবি নীলাচল চট্টরাজ 




বসন্ত
নীলাচল চট্টরাজ 

বসন্ত কাল মিলন মধুর কাল। 
প্রকৃতির সৌন্দর্য উজ্জীবিত করে 
মানুষের প্রেম.. অনুভূতির সৌন্দর্য 
                                        জাগিয়ে তোলে প্রকৃতির প্রেম। 
ধরা দেয় বসন্ত উৎসবে।।





কবি শিবনাথ মণ্ডল এর ছড়া




কলকাতায় পাহার
শিবনাথ মণ্ডল



কোলকাতায় বাড়ির পাহার
রাস্তা ভত্তি গাড়ি
না না রকমের মানুষ গুলো
চলছে সারি সারি।
রাস্তা গুলো অলিগলি
চারিদিকে মোড়
লাল সবুজ আলোদেখে
গাড়ি দেয় দৌড়।
এত বড় শহর খানার
নেইযেন তার শেষ
সুন্দরী কোলকাতাটা আজ
সেজেছে যেন বেশ।
মহাকাশের গ্রহ তারা
আছে কোলকাতায়
তারা মণ্ডলে ঢুকলে পরে
সেথায় দেখা যায়।
ইস্ট ইণ্ডিয়ার কর্মধ‍াক্ষ‍্য
জব চার্ণক‍্য নাম
তিন গ্রাম এক করে
বাড়ালো কোলকাতার দাম।
সুতানুটি গোবিন্দপুর 
নিয়ে কোলকাতা
আঠারো টি জেলার মাথা
শহর কোলকাতা।।

গ্রামীণ ঐতিহ্যে বাসন্তী ব্লকে সদ্য হয়ে গেল "সুন্দরবন কবিতা উৎসব"




সুন্দরবন কবিতা উৎসব


বিশেষ সংবাদদাতা : সুন্দরবন :  সুন্দরবন কবিতা উৎসব অনুষ্ঠিত হল বাসন্তী ব্লকের শিবগঞ্জ ধনঞ্জয়- চম্পাবতী মহিলা সোসাইটি সভাগ্ৰহে।উৎসবের উদ্বোধন করেন সুদূর ইতালি প্রবাসী বাঙালি কবি ও সমাজসেবী বিপুলবিহারী হালদার।অনুষ্ঠানে পৌরহিত্য করেন বহুমাত্রিক লেখক ও শিক্ষক প্রভুদান হালদার।
সাকিল আহমেদ সম্পাদিত  'শীত থই থই ছড়া' গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন করেন বাসন্তী থানার আই সি ড, আব্দুর রব খান।
ডায়মন্ড হারবার প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে এবং কুসুমের ফেরা সাহিত্য পত্রিকার আয়োজনে সভাগ্ৰহে তিল ধারণের জায়গা ছিল না।



সুন্দরবন কবিতা উৎসবে সুন্দরবনের মা মাটি মানুষ বিশেষ করে বাঘে র আক্রমণের মৃত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে যিনি সহায়তা করে আসছেন সেই বিশিষ্ট শিক্ষারত্ন প্রাপ্ত শিক্ষক অমল নায়েকের হাতে মাদার টেরেজা স্মৃতি পুরস্কার তুলে দেন সাংবাদিক সাকিল আহমেদ ও মেদিনীপুর জেলা পরিষদ সদস্য কবি দুরন্ত বিজলী।
জল জঙ্গলে বাঘের গর্জন আর জীবিকার সন্ধানে গিয়ে বাঘের আক্রমণ থেকে বেঁচে ফিরে আসা মৎস্যজীবী এবং ফিরে না আসা পরিবারের বিধবা বাসন্তীর অলকা মন্ডলের হাতে তুলে দেওয়া হল সুন্দরবন সৃজন সম্মানের পাশাপাশি আর্থিক সাহায্য।



একমাস আগে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে পড়েন গৌরহরি মাইতি ।অসম লড়াই করে বেঁচে ফিরে এসে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন।বললেন সারাক্ষণ মাথা ঘুরছে।চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছেন না গৌরহরি ।সংসার চলে না।জীবনকে বাজি রেখে তাঁদের এই 'হাম সফর' ভোলার নয়।
কবিতা উৎসবে সুন্দরবন সৃজন সম্মান পেলেন কবি  সুনীল করণ, দুরন্ত বিজলী, নীপা চক্রবর্তী, তন্দ্রা ভট্টাচার্য, শংকর দত্ত,পুষ্পিতা চট্টোপাধ্যায়, পুনে থেকে কবি মিনতি সরকার, শ্যামল জানা, মালদা থেকে ভাস্কর পাল মুর্শিদাবাদ থেকে প্রধান শিক্ষিকা সুদেষ্ণা সিনহা, বাচিক শিল্পী অনিন্দিতা মোদক,হুগলি থেকে মানিক পন্ডিত ,দিলীপ কুমার প্রামাণিকপ্রমুখ।




উদ্বোধক বিপুল বিহারী হালদার বলেন, দুই মৎস্যজীবী পরিবারের হাতে ইতালি ফিরে গিয়ে আর্থিক সাহায্য পাঠাব যাতে তাঁরা জীবন নির্বাহ করতে পারেন স্বাচ্ছন্দ্য পরিবেশে।
মাদার টেরেজা পুরস্কারে সম্মানিত অমল নায়েক বলেন, আমার এই পুরস্কার সুন্দরবনের মানুষের উদ্দেশে উৎসর্গ করলাম।