মোবাইলে টাইম পাশ, সম্বৃদ্ধ উল্লাস সাহিত্য হাসি ঠাট্টা খুনসুটি বিন্দাস পড়তে হবে নইলে মিস করতেই হবে। মোবাইল +91 9531601335 (হোয়াটসঅ্যাপ) email : d.sarkar.wt@gmail.com
২০ মার্চ ২০২২
মমতা রায়চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস ১৩৮ পর্ব
উপন্যাস
টানাপোড়েন ১৩৮
ভয়েস বিভ্রাট (৩)
মমতা রায়চৌধুরী
সরজু সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখছে সারা উঠোনময় নানা ধরনের পাতায় পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। মনটা একটু নাড়া দিয়ে উঠলো। আপন খেয়ালে কিছু পাতা তুলে নিয়ে তার গন্ধ নিতে চাইলো আর পাতার ভেতরে যেন কেমন একটা পুরনোকে ধরে থাকার আকুতি ,একটা বেদনা কাজ করতে লাগলো। গ্রামের বাড়ি প্রচুর গাছপালা আছে ।তাই উঠোনটা পাতায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়। পুরনো পাতা ঝরে যায় মনের ভেতর একটা বিষন্নতা কাজ করতে থাকে কিন্তু পরক্ষণেই মনটা উৎফুল্ল হয়ে ওঠে ,ঝরে যাওয়ার মধ্যে দিয়েই নতুনের আগমন ।বসন্ত এসে গেছে আবার নতুন করে নিজেকে সাজিয়ে
তুলবে ।প্রকৃতি দিয়ে যায় সেই বার্তা। এ সব ভাবছে বসে বসে ,কতটা সময় পেরিয়ে গেছে হুশ নেই ।এমন সময় ফোন বেজে ওঠে। প্রথম ফোন রিং হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। পরক্ষণে আবার ফোন বেজে ওঠে। ফোনের কলতানে মনটাকে নিয়ে আসে বাস্তবে ।তাড়াতাড়ি উঠে ফোনটা ধরতে
যায় । বাপ রে সাত সকালে কে ফোন করলো?
ফোনটা তুলে বলে' হ্যালো'।
' বৌদি ,মাধু বলছি।'
'হ্যাঁ বলো কেমন আছো সবাই?'
'এমনি ঠিকঠাকই আছি। তোমরা কেমন আছো?'
'আমরা সবাই ভালই আছি ।এখন তো শুধু একটাই টেনশন বিয়ে নিয়ে।'
মাধু মনে মনে ভাবল' তাহলে কি কল্যাণের ব্যাপারটা সব জানে বৌদি?'
'কেন টেনশন করছো কেন?'
কত দায়িত্ব বলো ভাইয়ের বিয়ে বলে কথা।
একটা মাত্র দিদি। কত দায়িত্ব বলো তো?'
তা অবশ্য ঠিকই বলেছ। আমারও ননদের বিয়ে বলে কথা। একটাই ননদ কত দায়িত্ব বলো তো?'
'ঠিকঠাক পার করতে না পারলে কতজনা কত কথা বলবে ।আর রায়বাঘিনী ননদিনী আমার সে কি আর ছেড়ে কথা বলবে? দুইজনাই হো করে হেসে উঠলো।
"তা যা বলেছ মাধু।"
'তবেএকটা সমস্যা হয়ে গেল বৌদি?'
'কোন সমস্যা আমি শুনতে চাই না। ননদের বিয়ে ঠিকঠাক করে দাও। আমারই তো ভাই এর বউ হয়ে আসছে নইলে কিন্তু কথা শুনতে
হবে তোমাকে ।আবার হো করে হেসে উঠলো।'
না গো বৌদি সিরিয়াসলি বলছি একটা সমস্যা হয়েছে।
'যা আমার ননদের কোন সমস্যা হতে
পারে ?আমার ননদ হচ্ছে মুশকিল আসান সবকিছুই সহজ-সরলভাবে করে দেয় সমাধান।'
'তুমি কিছু শোনোনি?'
'এবার যেন সরজু একটু করে রহস্যের গন্ধ পাচ্ছে।'
'এতক্ষণ যা বলছে তাহলে এটা মশকরা নয় সত্যি সত্যিই কিছু হয়েছে।'
আরেকটু উদগ্রীব আর আশ্চর্য হয়ে বলল 'কি হয়েছে ঠাকুরঝি ব'লোনা?'
'মাধু দেখল বৌদির ব্যাপারে কিছু জানে না 'তারমানে কল্যান কিছুই জানায়নি।
তোমার সাথে কল্যাণের কথা হয়নি।'
'হয়েছে !তাও ৩ দিন আগে।
কাল করলাম ফোনটা রিসিভ করল না।
ওর ই কিছু কেনাকাটার ব্যাপারে কথা বলতাম।'
ও বৌদি গলার ব্যাপারে কিছু শোনো নি?
গলাটা থেকে ভালো কথা বেরোচ্ছিল না। কেমন ঘর ঘর আওয়াজ হচ্ছিল ।
তা আমি বললাম ভাই ডাক্তারটা দেখিয়ে
নিস 'তুমি চিন্তা করো না আমি ঠিক ডাক্তার দেখিয়ে নেব?'
'কেন কি বলছ গো?'
গলাটাতেইতো সমস্যা হয়েছে। এবার তো গলার অপারেশন করতে হবে।'
সেকি?'
"আরে একথা আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে কর নি।"
'না বৌদি ওকে ভুল বুঝ না ।আমাদের কেউ জানায় নি শিখার সাথে কথা প্রসঙ্গে উঠে
এসেছে ।তাই আমি ভাবলাম তোমাকে একবার জানাই।'
' তা বেশ করেছো ।অপারেশন করতে হবে ।এ চিন্তার ' হলো বলো? তোমাদের সামনে বিয়ে।'
"ওই জন্য তো আমার টেনশন হচ্ছে।'
'অপারেশনের ডেট ঠিক হয়ে গেছে? জানো এ ব্যাপারে কিছু?'
'না শিখা বলছিল, যে ডাক্তার বলেছে ইমিডিয়েট অপারেশন করাতে। সামনের মাসেই প্রথমদিকে করিয়ে নিতে বলেছে।'
'তাহলে তো গলার অবস্থা যাচ্ছেতাই। নাকি গো মাধু ।কী চিন্তা হচ্ছে গো ?আমার ভাইটা একা একা থাকে ওখানে।'
'বলেই কাঁদতে শুরু করল।'
' এখন কি কাঁদার সময় বলো ,ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করো যেন অপারেশন সাকসেসফুল হয় আর তাড়াতাড়ি হয়ে যায়।"'
'তোমরাও ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করো।
'সে করছি । কিন্তু বিয়েটা কি হবে বলো?
মানে?
সেটাইতো কথা বিয়ের ডেট তৈরি, মাসের লাস্ট উইকে অপারেশনের যদি শুরু হয় তাহলে বিয়েটা কিভাবে কি হবে?
লোকজন এসব নেমন্তন্ন হয়ে গেছে এখন এই মুহূর্তে ডেট চেঞ্জ করলে হয় এবার অপারেশনের ডেটটা কবে দেয় দেখা যাক বিয়ের করেই না হয় অপারেশন হবে আর কি করবে?'
মাধু একটু নিশ্চিন্ত হল।
'দাঁড়াও না ওকে আমি কেমন বকা দিই
দেখো ।আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি।'
'না বৌদি ,ওকে ভুল বুঝনা কার কাছে শোনাও সেমিনার ছিল তারপর গলাটা খুব ভোগাচ্ছে হয়তো টেনশনে আছে।'
'হ্যাঁ সে তো ঠিকই বলেছ।'
তুমি বলো মাধু আমি কি জানতে পারি না?
To know অধিকার রয়েছে কিন্তু এখনতো মান অভিমান করার সময় নয়।'
'আর একটা সমস্যা হয়েছে জানো বৌদি?'
'আরো সমস্যা?'
'শিখার কাছে শুনছিলাম টাকা পয়সা নিয়ে।
কেন? অপারেশনের জন্য প্রচুর টাকা লাগবে শুনছিলাম ।এই মুহূর্তে নাকি ওর টাকা-পয়সার সব ইনভেস্টে আছে ওই কলকাতায় ফ্ল্যাটে সেজন্য একটু চিন্তায় আছে।'
'তা আমরা রয়েছি কি করতে বলো মাধু?'
জিজ্ঞাসু কন্ঠে বলল সরজু।
'সে তো ঠিকই।'
'ঠিক আছে । ,আমরা সবাই মিলেই সাহায্য করবো।'
'ঠিক আছে।'
'ফোন রাখছি। তাহলে বৌদি পরে কথা হবে।'
'আচ্ছা রাখো।'
ভালো থেকো সবাই।'
ফোনটা কাটার পর সরজু ভাবলো একবার ভাইকে ফোনটা করি ।কেন এত টেনশন করছে আমরা তো রয়েছি।'
সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা করল।'
ফোন বেজে গেল।
'কিরে বাবা ফোন তুলছে না কেন ?এখনো কি ঘুমোচ্ছে পড়ে পড়ে। ভাবল একটু পরেই
করি ।যদি ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুয়ে থাকে।'
এদিকে কল্যাণের মাথার উপর যেন করতাল বাজছে ।চোখে পর্দা নেমে এসেছে। অনেকগুলো ফোন করার বাকি আছে। দিদিকে একটা ফোন করতেই হবে। তবে এখনই করবে না আরেকটু বেলা বাড়ুক। দিদি এখন সাংসারিক নানা কাজে ব্যস্ত আছে।
বিছানার দিকে ক্লান্ত পা টেনে নিয়ে এলো কল্যাণ একটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে নিলে ভালো হতো এখন ঘুমের ওষুধ খাওয়া ঠিক হবে না। বরং ঘুমিয়ে পড়লে অনেক কিছু গন্ডগোল হয়ে যাবে।
বিছানা থেকে উঠে কল্যান সরাসরি বাথরুমে গেল। সম্পুর্ন নিরাভরন হয়ে ঝর্নাটার নিচে দাঁড়িয়ে আবার নিজেকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করলো।
সাবান কেস থেকে সাবানটা নিয়ে গায়ে লাগলো একবার হাত থেকে সাবান টা পড়ে গেল।
সে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা পড়েছে যদি ভালো করে প্রবাহিত জলে স্নান করা যায় তাহলে অনেক ক্লান্তির অবসান হয়।
তাই আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা অনুযায়ী শরীরটাকে অবগাহন করাতে চায়।
কিন্তু এত অবগাহন না এত শাওয়ারের নিচে স্নান ধারাপাত বলা যেতে পারে।
সাওয়ারের জলে যখন চলছে ধারাপাত তখন মনে হচ্ছে যেন তপ্ত তাপিত দেহে রয়ে গেল স্বস্তির বার্তা।
একসময় এই জলের শব্দ ভেদ করে যেন কোথাও একটা ফোনের রিং হওয়ার আওয়াজ শুনতে পেল।
প্রথমে কল্যাণ ভাবলো 'না ,না পাশের ফ্লাটের কারোর বাজতে পারে?'
এক সকালে ফোন করবে কে?"
আবার ফোন বাজলো।
সাওয়ারের জলের আওয়াজ কমিয়ে দিয়ে কান পেতে শুনলো।
"হ্যাঁ ,ফোনের আওয়াজই বটে।'
এবার কল্যান ভিজা টাওয়াল কোমরে জড়িয়ে বেরিয়ে আসলো। এসে ফোনটা রিসিভ করল।
বলল 'হ্যালো।
'আমি দিদি বলছি।'
হ্যাঁ, দিদি .। প্রণাম নিও।
'তোর এত কিছু হয়েছে গলা নিয়ে একবার জানানোর প্রয়োজন মনে করলি না ভাই? '
'আরে দিদি আমি ভেবেছিলাম তোমাকে ফোন করবো কিন্তু পরক্ষনেই ভেবে দেখলাম যে এটা ঠিক হবে না। সকালবেলায় তোমাকে ডিস্টার্ব করব সাহসে কুলালো না।'গলা দিয়ে ঘর, ঘর, ঘর আওয়াজ।
'এবার বল ভাই তোর কিসের টেনশন?'
'আমার টেনশন !এ কথা কে বলেছে?'
'হ্যাঁ, ভাই শোন, তোর গলাটা যে এতটা খারাপ অবস্থায় আছে একবারও জানাস নি?'
'না দিদি ,রাগ ক'রো না ।আমি তোমাকে জানাবো ভেবেছি কিন্তু রাত্রে আর পেরে উঠলাম না। রাত হয়ে গেছিল শরীর মন দুটোই ক্লান্ত ছিল ।'
'ঠিক আছে এখন একটা কথা বলত ভাই আমি কি তোর পর?'
'এভাবে কেন বলছো দিদি।'
তাহলে তোর কিছু সমস্যা হচ্ছে সেটা আমাকে জানাতি স।'
'মিথ্যা কথা বলব না দিদি, একটা সমস্যা হচ্ছে ওই জন্যই তোমাকে আমি আজকে ফোন
করতাম ।তুমি যখন করেই ফেললে…।'
"বল সমস্যা কি?'
ডাক্তারবাবু ইমিডিয়েট গলার অপারেশন করতে বলেছে একটা কড গেছে অলরেডি।
'সমস্যা কী ডাক্তার বাবু বলেছেন যখন অপারেশন করাতে করিয়ে নে।'
কল্যান চুপ আছে।
'টাকা-পয়সার সমস্যা হচ্ছে?
তো চিন্তা করছিস কেন? আমরা তো আছি, নাকি?'
'সমস্যা হতো না দিদি ।নেয়া হলো এবার তাহলে হয় ফ্ল্যাটে বিক্রি করতে হবে এদিকে বারাসাতের ফ্ল্যাটটাও ছাড়তে পারছি না যতক্ষণ না ওখানে শিফট করছি। এবার কি করব বুঝে উঠতে পারছি না।'
কোনো ফ্ল্যাট এখন বিক্রি করতে হবে না।
সে টাকার ব্যবস্থা আমি করে দেব ।ডাক্তার কত বলছে সেটা আমাকে জানা।
আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অপারেশন করিয়ে নে।'
'কিন্তু দিদি তুমি এতগুলো টাকা?'
'এটা ঠিক হবে না আমি তোমার কাছ থেকে এভাবে টাকা নিতে পারব না।'
'আরে বাবা ঠিক আছে যদি আমার কাছ থেকে না নিতে পারিস না তো কিছু গয়না মা রেখে গেছে ন তোর বউকে দেবার জন্য এই গয়নাগুলো রেখেও তো দেয়া যেতে পারে?
কিন্তু আমি চাইছি না এই গয়নাগুলো বাধা দিতে।'
'কিন্তু দিদি আরও একটা সমস্যা?'
'আবার সমস্যা কি বিয়ের ডেট নিয়ে?'
কল্যাণ ভাবছে এতসব নিশ্চয়ই শিখা ফোন করেছে।'
চুপ করে আছে কল্যাণ।
'বিয়ে কিন্তু ওই ডেটেই হবে বিয়ে পেছানো যাবে না' ডাক্তারের সঙ্গে সেই ভাবে কথা বল।'
"ঠিক আছে দিদি ,তুমি যখন বলছো তাই হবে।
বল তো সবারই তো লোকজন নেমন্তন্ন হয়ে গেছে আর বিয়েটা ফেলে রাখাটা ঠিক হবে না ভাই ।সে তুই বিয়ে করে যা না । অপারেশন করিয়ে আয় তাতে তো কোন অসুবিধা হবার কথা নয়।'
কল্যান চিন্তামুক্ত হলো এখন শুধু ডাক্তার সরকার মুখার্জির সঙ্গে কথা বলে চেন্নাইতে ডেট টা ঠিক করতে হবে।
'ঠিক আছে, এখন রাখছি। নিজের যত্ন নিবি ।'
'তুমিও ভালো থেকো দিদি।'
ফোনটা কেটে জানালায় কাছে দাঁড়িয়ে কল্যান ভাবতে চেষ্টা করছে কেমন অবাক চাঁদের আলোয় যেন তার ঘরটা ভরে উঠবে , ভরে উঠবে ছোট্ট পৃথিবী।
কবি গোলাম কবিরের কবিতা
পড়ে থাকা একখণ্ড মাংসপিণ্ড
গোলাম কবির
মানুষকে তো ইচ্ছে করলেই
ছুৃঁয়ে দেয়া যায় , ইচ্ছে হলে প্রিয়ার খোঁপায়
গুঁজে দেয়া যায় একটি লাল গোলাপ
কিংবা নিদেনপক্ষে একটি রক্তিম জবা।
ইচ্ছে করলে কখনো কখনো
পাহাড়ের বুকে শুভ্র মেঘকে ও
ছুঁয়ে দেয়া যায় কিন্তু
হৃদয় কি ছুঁইয়ে দেয়া যায় হৃদয় না দিলে?
অথচ কতো লোকই দেখি
হৃদয় না দিয়েই হৃদয় ছুৃঁয়ে দেয়
ভুল ভালবাসার খেলা খেলে!
ওরা মানুষের হৃদয় নিয়ে সাপলুডু
খেলা করে, কখনো আবার হৃদয়
ঝলসে দেয় অথচ ভালবাসলে
মানুষের হৃদয় হয়ে যায়
নিঃসীম আকাশের মতো উদার!
ভালবাসা পাবার জন্য মানুষ
অবিরাম বয়ে চলা নদীর মতো
ভালবাসা নামের মরিচীকার পিছনে
ঘুরতে থাকে অবিরত!
অথচ মানুষের কাছে এখন
হৃদয় নামের বস্তুটাই হারিয়ে গেছে,
ওটা এখন শুধুই পড়ে থাকা
একখণ্ড মাংসপিণ্ড যেনো!
কবি শিবনাথ মণ্ডল এর কবিতা
মুখোস পরা মানুষ
শিবনাথ মণ্ডল
স্বার্থ ছাড়া এই দুনিয়ায়
কেউতো চলেনা
স্বার্থ ছাড়া কোনো মানুষ
ভালো বাসেনা।
মিথ্যা কথা বলতে যাদের
মুখে বাধা আসেনা
নিজে ভাবে আমি ছাড়া
কেউতো বোঝেনা।
বন্ধু সেজে যে জন তোমায়
ভাবাই আপনজন
সুযোগ বুঝে কেড়ে নেয়
আসল মূলধন।
কাছে এসে ভালো বেসে
বলে মিষ্টিকথা
স্বার্থ খানা ফুড়িয়ে গেলে
নেয় কেটে মাথা।
মুখোস পরাএই দুনিয়ায়
যায়না কাউকে চেনা
আসল নকল যাবে বোঝা
পুড়ালে খাঁটি শোনা।।
১৯ মার্চ ২০২২
মমতা রায়চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস ১৩৬
উপন্যাস
টানাপোড়েন ১৩৬
ভয়েস বিভ্রাট
মমতা রায়চৌধুরী
কল্যান সেমিনার শেষ করে কৃষ্ণনগর স্টেশনে যখন আসলো তখন মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে চারিদিকে কিচ্ছু দেখা যাচ্ছেনা। এমন অবস্থায় অটো থেকে নামতে নামতে কিছুটা ভিজেও গেল। ভাবছে তাই তো গলার এই অবস্থা ।এর মধ্যে যদি আবার ঠান্ডাতে কিছু একটা হয় তাহলে তো দারুণ মুশকিল হয়ে যাবে।
যথারীতি ট্রেন ঢুকে গেল। কল্যান ট্রেনে গিয়ে বসলো।
নির্দিষ্ট টাইম এ ট্রেন ছেড়ে দিল।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল আজকে গিয়ে ডাক্তার দেখাতে পারবে না মনে হচ্ছে কৃষ্ঞনগরেই ৬. ৪০
অথচ ডাক্তার না দেখালেও নয়। দেখা যাক 'ডাক্তারবাবু তো ৯টা পর্যন্ত থাকবেন বলেছেন?'
মাথাটা ভেজেনি এই রক্ষে। প্যান্টের নিচের অংশ ভিজেছে ।হাতের অংশটুকুও ভিজেছে। ট্রেনে
বসে কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। ট্রেনে বসে হাজারো কথা মনে পড়তে লাগলো। মনে পড়ল অনিন্দ্যর কথা। কল্যাণদের চারজনের একটা ভালো বন্ধুত্ব ছিল। তাদের মধ্যে শুধুমাত্র অনিন্দ্য তখন প্রেম করতো। অনিন্দ্য হচ্ছে ওদের প্রেমের দীক্ষাগুরু। অনিন্দ্য আর মনীষা যখন চুটিয়ে প্রেম করছে ।তখন কল্যাণরা দূতের কাজ করতো। সম্ভবত ওদের লায়লা মজনুর প্রেম দেখেই কল্যাণের ভেতরেও একটা প্রেম প্রেম ভাব এসেছিলো। তারই ফলশ্রুতি বোধহয় প্রভা।
আজ আবার কেন ঘুরে ফিরে আসছে প্রভার কথা। এ যেন বৃষ্টি হলেই কল্যাণের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কাজ করে এন্টেনার মত। কোথায় অনিন্দ্য মনীষার গল্প করছিল সেখানে এসে পাতা জুড়ে নিল কল্যান প্রভার গল্প।
' হ্যাঁ, একদিন এসে হঠাৎ অনিন্দ্য বলল
'যাই বলিস ভাই ফাইনাল পরীক্ষার হয়ে গেলেই আমরা দুজন পালাচ্ছি।'
কল্যান তো অবাক হয়ে গেল 'বলে কি?
পালাচ্ছি মানে?
তুই তো এখনো নিজের পায়ে দাঁড়ালি না মনীষাকে কি খাওয়াবি?
পরে কিন্তু প্রেম জানলা দিয়ে পালাবে।'
ভুরু কুঁচকে অনিন্দ্য বলেছিল শত্তুর না হলে তো কেউ এরকম কথা বলে ।না তুই আমার নাকি আসল বন্ধু। প্রিয় বন্ধু ।কোথায় আমাকে উৎসাহ দিবি ।সেসব নয়।'
'দেখ ভাই আমি কিন্তু বাস্তবটাই বললাম। আমি প্রকৃত বন্ধু বলে তোর বাস্তব অবস্থাটাকে বুঝিয়ে দেবার চেষ্টা করেছি ।এবার তুই যেটা ভালো বুঝিস?'
তারপর অনিন্দ্য কি একটা ভাবল কিছুক্ষন তারপর বললো' না কথাটা তুই ঠিকই বলেছিস কিন্তু আমার তো একটা সমস্যা হয়ে যাচ্ছে?'
'কিসের সমস্যা?'
'আরে মনীষাকে নিয়ে। ও তো এখনই বলছে বিয়ে করতে হবে,।'
'মানেটা কি? খেপেছে নাকি?'
তখন কল্যাণ বলল ' বুঝতে পারছি ।প্রেমের বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস…
বলেই হাসতে শুরু করলো।
'তুই হাসছিস আমি মরমে মরমে মরছি।'
আচ্ছা, ঠিক আছে তাহলে বল কি বলবো তোকে?'
'শোন,আমার আর পড়াশোনা হবে না।'
'ঠিক আছে তাহলে কি করতে চাইছিস?'
'আমি আমেদাবাদ চলে যাব।'
'কার ভরসায়?'
'আরে হারুদের একটা গদি আছে। ও বলেছিল ওখানে ব্যবস্থা করে দেবে একটা চাকরি।'
বেশ বোদ্বার মত মাথা নেড়ে কল্যান বলল' তাহলে তো সমস্যা মিটেই গেল।'
কিন্তু কি ট্রাজিক চরিত্র হয়ে গেল অনিন্দ্য।
এসব ভাবনা চিন্তার মাঝেই মনীষার বাবা ট্রানস্ফার নিয়ে চলে গেল দূরে সপরিবারে।
মনের দুঃখে অনিন্দ্য কিছুদিন দাড়ি রাখল, সাই গোলের রেকর্ড শুনল। তারপর এ ম, পরীক্ষা এসে গেল ।পড়ার চাপে সবই ঠিকঠাক হয়ে
গেল। মজা করে বলেছিল কল্যান হারুকে
অনিন্দ্য আর মনীষার প্রেমের কাহিনী লাস্ট চ্যাপ্টার অনিন্দ্যের দাড়ি রাখা ।আমার মনে হয় আমাদের এই বাকি তিনজনেরো দাড়ি রাখা উচিত ছিল কারণ ওর প্রেমটা তাদের বাকি তিন জনেরও প্রেম।'
হারু তখন মজা করে বলেছিল 'তুইতো বাবা প্রভার সঙ্গে জড়িয়ে গেছিস ।তোর তো জীবনে বসন্ত এসেগেছে কিন্তু আমরা দেখ কি অভাগা আমাদের না জুটলো কোন সুন্দরী গোলাপ।
না নিতে পারলাম তার কোন ঘ্রাণ।'
ট্রেনে যেতে যেতে এইসব কথাই মনে পড়ছিল কিন্তু অনিন্দর মত কল্যাণের প্রেমের পরিসমাপ্তি ঘটল একটা প্রহেলিকার মধ্যে দিয়ে। প্রভার থেকে আর কোনো উত্তর কক্ষনো আশা করেনি ।প্রভা কিভাবে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল অথচ কল্যাণ তো প্রভাকে মনেপ্রাণে ভালবেসেছিল ।দুরন্ত উচ্ছল নদী যেন ছিল ।কখনো মনে হয়েছে
ঝরনা ।ঝরনার সঙ্গে হারিয়ে যেতে কল্যাণের কোন আপত্তি ছিল না।
অথচ…. শুধুই অন্তহীন জিজ্ঞাসা রয়ে গেল।'
এরই মধ্যে ট্রেন নির্দিষ্ট স্টেশনে এসে পড়ল।
ফোনটা বার করতে দেখলএরমধ্যেতে কটা মিসকল হয়ে পড়ে রয়েছে। এতটাই ভাবনায় মশগুল ছিল যে সেটা খেয়াল করে উঠতে পারেনি।
ফোনটা খুলে দেখল শিখার বেশ কয়েকটা মিসকল হয়ে যাচ্ছে।
কল্যাণের উচিত ছিল শিখাকে ফোনটা করে দেয়া যে সে ট্রেনে উঠে পড়েছে।
কি করে ইরেস্পন্সাইবেল হলো?
নিজেকে নিজের প্রতি খুব বিরক্ত লাগলো।
তারপর একটা ফোন করলো।
ফোনের রিং হতেই শিখা ফোনটা রিসিভ করে বলল'কি ব্যাপার বলতো?'
কল্যান মনে মনে ভাবল এই শুরু হল অধিকারবোধ এটা তো হতেই হবে তারপর নিজেকে ঠিক রেখে বলল 'সরি এক্সট্রিমলি সরি ডিয়ার।'
'না না সরি কেন বলছো?'
'একবার ও মনে হয়নি চিন্তা হতে পারে?'
'আরে হ্যাঁ ,ভেবেছিলাম তোমাকে ফোন করবো শোনো না এত বৃষ্টি তারপর??'
'তারপর ,তারপর কি হয়েছে?'
'আরে সেরকম কিছু নয়।'
'ভিজে গেছ?'
"একটু ভিজেছি।'
গলাটা যেই দেখলে একটু আওয়াজ বেরোচ্ছে অমনি বৃষ্টিতে ভিজলে?'
'কিছু করার ছিল না গো অটো থেকে নামতে নামতে যেটুকু ভিজেছি।'
সকালে যখন বেরিয়েছি তখন ওয়েদারটা তো ভালই ছিল ।বোঝা গেছে কি বৃষ্টি হবে বল?'
'ঠিক আছে আর তোমাকে কোন কিছু বলতে হবে না।'
'এখন বল কতদুর আছো?'
'আর একটা স্টেশন।তার পরেই নেমে যাব।'
'ঠিক আছে ডাক্তারের এপারমেন্ট নিয়েছো তো?'
'নিয়েছি কিন্তু ডাক্তার থাকবেন কিনা কে জানে?'
'যদিও নটাএখনো বাজে নি।'
'ঠিক আছে ।দেখো কি হয়।
সাবধানে এসো।'
'ওকে'
বাড়িতে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে তোমাকে ফোন করবো।'
শিখা প্রসন্নতায় একগাল হেসে উঠলো।
কথা বলতে বলতেই স্টেশন এসে গেল। তাড়াতাড়ি নেমে পড়ল কল্যান। কাঁকিনাড়া থেকে খুব বেশি সময় লাগে না ডাক্তার বাবুর চেম্বারে যেতে। এখনো দশ মিনিট বাকি আছে 9:00 বাজতে। হন্তদন্ত হয়ে ছুটল। হাঁপাতে হাঁপাতে ডাক্তার বাবুর চেম্বারে এসে দেখল ডাক্তার মুখার্জির চেম্বারে ভীষণ ভিড়। যদিও কল্যান সাক্ষাৎ লগ্ন আগেই স্থির করে এসেছে ।তবুও প্রায় ১৫মিনিট হলো স্লিপ জমা দিয়ে বসে আছে কল্যাণএর এখনো ডাকআসেনি। এদিকে সেই বৃষ্টিতে ভেজা চ্যাট চ্যাটে ভাব ভালো লাগছে না বসে থাকতে ডাক্তার বাবুর চেম্বারে অনেকগুলো উইলি ম্যাগাজিন রয়েছে ।সেগুলো উল্টেপাল্টে দেখতে লাগলো। হঠাৎ ম্যাগাজিনে যখন নিজেকে ডুবিয়ে ফেলেছে ঠিক তখনই 'কল্যাণ চৌধুরী কে আছেন ?এখানে ডক্টর কল্যাণ চৌধুরী?'
কল্যান বলল' আমি ।আমি ডক্টর কল্যাণ চৌধুরী।"
'আপনার ডাক এসেছে আপনি চেম্বার এ যান।'
পত্রিকাটি নামিয়ে রেখে নিজের ব্রিফকেস টি সঙ্গে নিয়ে উঠে দাঁড়াল কল্যাণ চৌধুরী।
বাবা প্রায় ঘড়ি দেখে আধ ঘন্টার মতো দেরী করিয়ে দিয়েছেন ডাক্তার বাবু।
চেম্বারে ঢুকে হেসে নমস্কার করল চৌধুরী।
ডাক্তারবাবু নিজের ডান হাতটা কপালে ছুইয়ে বললেন 'বসুন 'চেয়ারটা দেখিয়ে।
"আচ্ছা বলুন আপনার কি সমস্যা?
কি কি অসুবিধা বোধ করছেন? কোথায় কষ্ট হচ্ছে আপনার,?. একটু জোর করে হাসি এনে ডাক্তারবাবু আরো বললেন 'নট টু ওয়ারি'! ডোন্ট বি সো ডিপ্রেসড।'
কল্যাণ আমতা আমতা করে বলল আমার কি ডিফিকাল্ট কিছু হয়েছে?
'ফেটাল তো কিছু হয়নি আপনার?'
তবে আপনার প্রফেশনটা একটু অসুবিধে হতে পারে?
তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই এখন তো অনেক ভালো ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। মানে অপারেশনের ব্যবস্থা আছে। বিদেশ থেকে যদি করাতে চান করাতে পারেন আপনাদের তো দেশ বিদেশের যাতায়াত আছে বিভিন্ন সেমিনার উপলক্ষে।
এবার একটু ভয় পেয়ে কল্যান বলল' ডাক্তারবাবু আপনি কি বলছেন আমি কি চিরকালের মতো তাহলে আমার কন্ঠস্বর হারাবো?'
আজকাল ভয়েস বক্সটা রিপ্লেস করা কিছুই না। এতে আপনার অনেক কাজ চলে যাবে। সব কথাই বলতে পারবেন ।এটা হচ্ছে উইথ এ সিম্পল এন্ড সাইন্টিফিক ফলস ভয়েস।'
আপনি স্মকিং করেন?'
কল্যান বলল' হ্যাঁ করি।'
মনে রাখবেন' স্মোকিং ইজ ডেডলি ফর ইউ'।
একটা কড আপনার একেবারেই গেছে এবং অন্যটাও প্রায় অলমোস্ট গন।'
ধোয়ায় ধোয়ায় গলাটার বারোটা বাজিয়ে দিবেন না আর।'
'ডাক্তারবাবু আমি কতদিন পর্যন্ত কথা বলতে পারব না?'
কেবল সপ্তাহে সপ্তাহে সাত দিন গান্ধীজী সপ্তাহে একদিন মৌনব্রত পালন করতেন জানেন তো আপনি ওরকমই করুন তিন সপ্তাহ ঘরে থাকুন চুপচাপ । কমপ্লিটলি গলাটার রেস্ট দিন।'
'তাহলে কি বলছেন আমি কি আর কথা বলতেই পারবোনা। ওটা একেবারেই চলে গেল । আ পার্মানেন্ট লস?'
'কি মুশকিল আমি কি তাই বললাম নাকি ।তিন সপ্তাহ আপনাকে কথা বলতে বারণ করা হলো এরপর অপারেশন টা করিয়ে নেবেন ।কেন অত অরিড হচ্ছেন।'
এই মুহূর্তে কিছু ওষুধ দেবেন না?
হ্যাঁ মাক্রাবিন আর ভিটামিন ইনজেকশন দুটো তিন সপ্তাহ এবং স্টেরয়েড অ্যান্টিবায়োটিক টা 10 দিন ঠিক যে ভাবে লিখে দেয়া হয়েছে সেই ভাবে চালিয়ে যান আর ওই যে বললাম ভয়েসকে কমপ্লিটলি রেস্ট দিন।
তিন সপ্তাহ পর আবার আপনার সঙ্গে আমার দেখা হবে।'
কল্যান বলল' থ্যাংক ইউ ডাক্তার'।
এরপর ডাক্তারবাবু আচ্ছা বলে টেবিলের উপরে রাখা ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়ে বলেন
' ওয়েলকাম ।নেক্সট।'
ডাক্তারবাবুর ওখান থেকে বেরিয়ে এবার কল্যাণ ভাবল সামনে রেস্টুরেন্ট থেকে কিছু খাবার নিয়ে চলে যেতে হবে বাড়িতে। স্টুডেন্টের দিকে যেতে যেতে ডাক্তারবাবু কতটা অর্থ পিচাশ সেটাই মনে মনে ভাবার চেষ্টা করছিল ভিজিট দেবার সঙ্গে সঙ্গে ঘন্টি বাজিয়ে দিলন আর একটা কথাও শুনতে রাজি হলেন না ডাক্তার বাবু।
বাপরে কি প্রফেশনাল।
তারপর নিজের ভয়েসটা নিয়ে ভাবনা চিন্তা করতে লাগল এর মধ্যে যদি ঠিক না হয় পরের মাসেই আছে আবার আর একটা সেমিনার। এছাড়া কলেজে ক্লাস রয়েছে।কি হবে কে জানে জীবনে টানাপোড়েন তো রয়েছেই এখন চলে ভয়েজের টানাপোড়েন দেখা যাক ঈশ্বর কি করেন। কতদিন ভয়েস বিভ্রাটে থাকতে হয় কি যেন?
শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস
শায়লা শিহাব কথন
অলিখিত শর্ত (পর্ব ৭২)
শামীমা আহমেদ
সারাদিন ফ্যাক্টরির কাজ তদারকির দ্বায়িত্ব শেষ করে,দিনশেষে গাজীপুর থেকে রওনা দিয়ে, শিহাবের উত্তরায় ফিরতে রাত প্রায় দশটা হয়ে গেলো। পথিমধ্যে,চন্দ্রা, জিরাবো,আশুলিয়া, আবদুল্লাপুরের ভয়ানক যানজটে প্রায় একঘন্টা বসে থাকা। যদিও চাইলে আশপাশ দিয়ে বাইক চালিয়ে বেরিয়ে আসা যেতো।কিন্তু শিহাবেরতো ঘরে ফেরার অত তাড়া নেই।কেউতো আর ঘরে তার জন্য অপেক্ষায় নেই।বরং বাইকে বসে উদাস হয়ে আকাশের চাঁদ দেখে কয়েক স্টিক টেনে নেয়া যায়। আর এর সাথে কয়েককাপ চা, কফি চালান দেয়া হয় ভিতরে ভ্রাম্যমাণ চা, কফি বিক্রেতাদের কাছ থেকে।
যানজট ছাড়তেই শিহাব বাইকের স্পীড বাড়িয়ে সময়টা পুষিয়ে নিলো।
শিহাব বাসার গেটে এসে হর্ণ দিতেই কেয়ারটেকার বিল্লাল গেট খুলে৷ দিলো। বিল্লালের ভয়ার্ত দৃষ্টি! শিহাবের অনুমতি ছাড়া তার বাসায় অতিথি ঢুকেছে। কিভাবে তা ছারকে জানাবে। শিহাব বাইক পার্ক করে হেলমেট খুলতেই বিল্লাল তার কাছে এসে বললো, ছার মাফ কইরা দিয়েন। আপনার অনুমতি ছাড়া একটা কাজ কইরা ফেলছি ছার।
কি করেছো বিল্লাল? শিহাব বেশ নরম সুরেই জানতে চাইলো।
তাই কি এত কল দিচ্ছিলে সকালে?
জ্বী ছার।
তা কি করেছো?
ছার আপনি ঘরে গেলেই দেখতে পারবেন।
ক্লান্ত শিহাব আর কথা বাড়ালো না। বাইকের চাবি হাতে নিয়ে ঘিরের চাবি চাইতেই বিল্লাল বললো, ঘরে অতিথি আছে, তার কাছেই চাবি দিয়া গেছে বুয়া।
এবার শিহাবের মাঝে একটু ভাবনা এলো,,কে হতে পারে যে আমার অনুমতি ছাড়াই আমার ফ্ল্যাটে ঢুকে যায়। শায়লা নয় তো? তবে কি সেদিন এখানে আসাতে বাসায় কোন ঝামেলা হয়েছে? সেকি তবে বাসা থেজে রাগ করে চলে এলো হাবের কৌতুহল বেড়ে গেলো।সে দ্রুত লিফটের দিকে পা বাড়ালো। শস্যলা কোন বিপদ হলো! লিফট উপরে উঠতেই শিহাব এক ঝটকায় বেরিয়ে দরজার কলিং বেলে আঙুল দিয়ে বেশ কয়েকবার বিরতি ছাড়াই পুশ করলো।
রিশতিনাতো এতটাক্ষণ ধরে, সেই সকাল দুপুর রাত কাটিয়ে শিহাবের ফেরার অপেক্ষাতেই উন্মুখ হয়ে ছিল। অলস ভঙ্গিতে টিভির সাউন্ড অফ করে চালিয়ে রেখে সময় পার করছিল।কলিং বেল শুনেই চমকে উঠে ঘর থেকে রক দৌড়ে দরজার কাছে এলো।
দরজা খিলতেই দেখলো শিহাব দাঁড়িয়ে!
অপরপ্রান্তে শিহাবের জন্য রিশতিনা বড় একটা বিস্ময় হয়ে এলো। দুজনেই থমকে দাঁড়িয়ে! দরজার এপাশ আর ওপাশে।শিহাবের পা যেন আর ঘরের দিকে চলছিলই না। শিহাবকে কাছে পেয়ে রিশতিনার চোখ জলে ভরে উঠলো। মন চাইছে এখুনি শিহাবের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে।যেন খুব ইচ্ছা করছে শিহাব এখুনি যেন হাত বাড়িয়ে তাকে বুকে টেনে নিক।কত জনমের চাওয়া।কত যুগের তৃষ্ণা।
শিহাব যেন এর কিছুই অনুভব করছে না।তার দুচোখ শুধু শায়লাকে খুঁজছে। সামনের মানুষটা অদৃশ্য হয়ে রইল। রিশতিনা বুঝতে পারছে শিহাবের কাছে সে একেবারেই অপ্রত্যাশিত হয়েছে।তাইতো সে এমন বরফ
কঠিন হয়ে আছে। এই বরফকে গলাতে হবে। শিহাবের ভেতরে তার জন্য ভালবাসার জলধারা বহাতে হবে আর এর জন্য শিহাবের শত অপমান সে সহ্য করবে। শিহাবের মন জয় করে আবার আগের সেই আবেগ অনুভূতি অনুভব ফিরিয়ে আনতে হবে।
রিশতিনা হাত বাড়িয়ে শিহাবের হাত ধরলো।শিহাবের ভেতর তখনো কোন চেতনা ফিরে আসেনি। তার চোখ রিশতিনার দিকে তাকিয়ে পাথর হয়ে আছে। রিশতিনা এক টানে শিহাবকে ঘরে নিয়ে এলো। দরজা লাগিয়ে শিহাবকে বেড রুমে নিয়ে গেলো।বিছানায় বসিয়ে দুই হাত ধরে জানতে চাইলো,কেমন আছো চাঁদ? ভালোবাসার দিনগুলিতে রিশতিনা শিহাবকে চাঁদ নাম ডাকতো। শিহাব কি সব হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না। সে শুধু শায়লার মুখটিই ভাবছে।
শিহাবের নীরবতায় রিশতিনা বললো,শিহাব তুমি কি ভুলে গেছো, তুমি আমায় কি নামে ডাকতে? আবার সেই নামে ডাকো চাঁদ।আবার সেই নামটিতে ডাকো।বলেই রিশতিনা ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো। শিহাবের বুকে মাথা রাখলো।এবার যেন একটু স্বাভাবিকে এলো। একটা মেয়ে তার সামনে তার জন্য কাঁদছে, তার বুকে আছড়ে পড়ছে আর সে এমন স্থির হয়ে বসে আছে? শিহাব কথা বলে উঠলো, রিশতিনা তুমি কেঁদোনা। বলেই রিশতিনার মুখটা দুই হাতে তুলে ধরলো।
রিশতিনা তখনো চোখ বন্ধ করে অঝোরে কেঁদেই যাচ্ছে।আর বিড়বিড় করে বলছে
শিহাব তুমি আমাকে ক্ষমা করো। সব ভুলে আমায় গ্রহণ করো। আমি একেবারে তোমার কাছে চলে এসেছি।আমার পরিবারের
সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে এসেছি।
শিহাব বুঝতে পারছে না এখন সে কি করবে বা তার কি করা উচিত? শায়লাকে সে কি বলবে? শায়লা যে কোন ভাবেই তার কাছে আসবে।রিশতিনা স্থির হলো।কান্না থামালো।
রিশতিনা বললো, তুমি হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আসো আমি খাবার দিচ্ছি। আজ জিগাতলা থেকে মা ভাবী অনেক খাবের পাঠিয়েছে। আমি আভেনে গরম করছি।শিহাবের তখন যেন আজ সকালের সব মনে পড়লো।কেন বিল্লাল এত ফোন দিচ্ছিল তাকে।সে বুঝতে পারছে আজ আর রিশতিনাকে ফেরানোর কোন পথ কি সে পাবে?সে তার স্ত্রীর অধিকার নিয়ে তার কাছে এসেছে।কোন আইন বা ধর্মের দোহাই আজ আর কাজ করবে না। কিন্তু শায়লা যে তার মন প্রাণের অনেকখানি জুড়ে আছে।
রিশতিনা শিহাবের হাত ধরে ওয়াশরুমের দরজার কাছে নিয়ে গেলো।এওতটা পথ বাইক চালিয়ে সারাদিনের শত ঝামেলায় ক্লান শ্রান্ত শিহাব টাওয়েল নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো।
রিশতিনা কিচেনের দিকে এগিয়ে গেলো।ফ্রিজ খুলে খাবার বক্স খুলে দেখে নিচ্ছিল কি কি আছে। দুটো প্লেট হাতে নিয়ে ডাইনিং এ এলো। রিশতিনা বুঝিতে এভাবেই শিহাব ক্লান্ত ঘরে ফেরে আর একাই সব কিছু করে।শিহাবের জন্য তার মনটা হু হু করে উঠলো।
হঠাৎই শিহাবের মোবাইল বেজে উঠলো। রিশতিনা ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলো,রাত এগারোটা। এত রাতে কে কল করলো।রিশতিনা এগিয়ে এলো।মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলো,মায়া নাম ভেসে উঠেছে আর স্ক্রীনে ভেসে উঠেছে, টানা টানা চোখে মায়াবতী মুখের একটি মেয়ের ছবি যার কপালে ছোট্ট একটা কালো টিপ।রিশতিনার কেন যেন ঐ টিপটাকে একেবারেই সহ্য হলো না।
চলবে.....
কবি আশ্রাফ বাবু
যেখানে দিন রাত চলে
আশ্রাফ বাবু
যে পৃথিবীতে আমাদের বাস তুমি ছিলে চুপচাপ,
শেষ হয়ে যাইনি আমি আগন্তুক
যেখানে দিনরাত চলে বেচাকেনা।
চেয়ে চেয়ে রত হই প্রার্থনায় - প্রেরণা আর ভালোবাসা, জ্বলছে ভেতর থেকে - রত হই প্রার্থনায়
এই জীবনের আগে মৃত্যু হয়েছে।
আরেকটা জীবনে আগুনের তাপে তরুণ হৃদয়
শুধু আন্দোলিত তপ্ত শোণিত ফুটছে আমার ধমনিতে
আমার অনুভূতিগুলো ভেতরে ভেতরে বেঁধে ফেলেছে,
জন্তুতে পরিণত হয়েছি বিশ্বস্ত প্রাণীর মতো,
যেখানে দিন রাত চলি আর ভুলি
ভেতরে ভেতরে আমি গজরাই।
আমার ভয় ও টান প্রশমিত হবার নয়-আমি প্রাণবন্ত,
শেষ হয়ে যাইনি এইভাবে আর ভাবতে পারি নি
আর আমি চাই তুমি, ঠাণ্ডা বাতাস খেয়ে বলি।
সুখের চোখে জলে ভেজা দেখেছি স্বপ্নে
কোথায় এলাম সত্যিই এই মোকাম আমার
এই অনন্তদৃষ্টি রেখে,এই জায়গার উপর।
কবি মিতা নূর এর কবিতা
আমায় তুমি খুঁজবে
মিতা নূর
তুমি, তোমাকে পেয়েছিলাম শূন্যতার মতো,
একমুঠো মিথ্যের ঘর আর বিষন্নতার উঠোনে !
তোমাকে পেয়েছিলাম ঘুটঘুটে আঁধারে,
মুখ মুখথুবড়ে পড়ে থাকা জোনাকির আলোয় !
তোমাকে পেয়েছিলাম নির্জন নির্ঘুম রাতের,
অদেখা ভালোবাসার মাঝ পথে,
তুমি,তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে একজোড়া বিশ্বস্থ হাত বাড়িয়ে !
তোমাকে পেয়েছিলাম আমার কাব্যের মতো,
তোমাকে পেয়ে ভেবেছিলাম..!
আমার জীবনের অস্তিত্বের কোণ জুড়ে,
যেন এক স্বেচ্ছায় মন খারাপী উড়িয়ে দেওয়া নীল আকাশ তুমি!
তুমি, তোমার মায়াবী মুখখানা দেখে নিঃশ্বাস ছেড়ে ভেবেছিলাম,
একজীবনের সমস্ত সুখ বুঝি তোমার ঐ বুকে রাখা,
নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দিতে পারি আরো কিছু সময়!
তুমি,তোমাকে পেয়েছি আজ ঠিকই, কিন্তু- কাছথেকে দেখে মনে হচ্ছে,
ভয়াবহ কালবৈশাখী ঝড়ের মতো,
এ-ই বুঝি আবার সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে!
তুমি এসেছো ঠিক, কিন্তু অবেলায়, অবহেলা হাতে নিয়ে,
তোমার চোখে ভালোবাসা কই? আমি তো খুঁজে পাচ্ছি না!
হঠাৎ আমার বুকের ভেতরটা যেন ঝরে
যাওয়া পাতার মতো,
দুমড়েমুচড়ে ভেঙে যাওয়ার শব্দ পাচ্ছি..?
আমি কী ভুল করে আবারও চোরাবালিতে পা দিয়েছি?
দৌড়ে আয়নার কাছে গিয়ে নিজেকে আত্মাসমর্পণ করলাম।
আয়নায় চোখ পড়তে দেখি, আমার আনন্দ গুলো,
বিষন্নতা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে একেকটা করে নালিশ জানাচ্ছে।
কপালের কালো টিপ আত্মচিৎকার দিয়ে বলছে,
আর কতকাল এমন করে দুঃখ লুকাবে...?
চোখে দু'টোও সুযোগ পেয়ে, স্যাঁস্যাঁতে হয়ে বলে উঠলো,
আর কতকাল এমন করে কাজল টেনে অশ্রু লুকাবে...?
ঠোঁট গুলোও সুযোগ ছাড়েনি একটুও, বলে উঠলো,
ঠোঁটের নীলচে ব্যথা গুলো আর কতকাল, রঙবেরঙে, রঙ মেখে ঢেকে রাখবে..?
তখন আমি লজ্জায় চৈত্র কাতুরী হয়ে বর্ষা মেঘ খুঁজি,
বুক ফেটে ভেতর থেকে তুমুল বেগে বর্ষণ শুরু হয়।
তুমি, তুমি চোখ মেলে দেখতে পাবে..!
তোমারও মনে পড়বে আমায়,
কোনো এক পিচঢালা কংক্রিটে,
যখন প্রচন্ড হোঁচট খেয়ে পড়বে...!
বর্ষাস্নাত কোনো বিকেলে আমাকেই তুমি খুঁজবে,
নিঃসঙ্গতার চাদর, তোমাকে তখন জড়িয়ে ধরবে।
তখন আমাকেই তোমার ভয়াবহ প্রয়োজন হবে,
হয়তো সেদিন দেখবে আমি নেই, মনে হবে আমিই তোমার,সকল রোগ শোকের সমাধান..!
দুজনের মনে এতো ভালোবাসা ছিল, তবু আজ।
তবুও জীবনের কোনো মোড়েই আমরা নেই,
সেইদিন তুমি হয়তো থাকবে, কোনো টোং দোকানে বসে,
হাতে নিকোটিন, ঠোঁটে চায়ের কাপ...!
তবুও চুম্বনের আবেশ অনুভব করছো আমায় মনে করে।
তোমার চোখ দু'টো জলাশয়, কিন্তু খুব কৌশলে চশমার আড়াল ডাকবে।
তখন আমাকেই তুমি খুঁজবে..!
আর আমাকে হয়তো শহরের কোনো গোরস্তানে,
মাটি তার বুকে লুকিয়ে রাখবে সবুজ ঘাসের সুগন্ধিতে।
তখন মনে অজান্তেই, মনে পড়বে, তোমার কবিতায় কী, আমি ছিলাম?
তুমি,সেদিন শেষ বারে হয়তো, আরো একটা কবিতা খুঁজবে।
আমার নামে লিখা হবে, তুমি, সযত্নে লিখবে !!
কবি শিবনাথ মণ্ডল এর কবিতা
রঙিন বসন্ত
শিবনাথ মণ্ডল
ভূস্বর্গে বসন্ত এলো
এলো ঋতু রাজ
গন্ধমাখা ফাগুন হাওয়ায়
মনে লাগেনা কাজ।
শিমূল ফোটে পলাশ ফোটে
ফোটে কৃষ্ণচূড়া
আবির রঙে আকাশ লাল
রঙিন হলো ধরা।
ফাগুন এলো হোলি এলো
এলো কোকিলের সুর
বসন্ত আজ বিরাজিত
মন হলো ভরপুর।।
১৮ মার্চ ২০২২
কবি মমতা রায়চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৩৫
উপন্যাস
টানাপোড়েন ১৩৫
মিষ্টি একটা গন্ধ
মমতা রায়চৌধুরী
কল্যাণ এলার্ম দিয়ে রেখেছিল যথাসময়ে ঘুম ভাঙলো কিন্তু শরীর মন এতটাই ক্লান্ত ,উঠতে ইচ্ছে করছিল না । তবুও উঠতে তো হবেই। সকালে বিছানায় উঠে বসে দেখছে গলার অবস্থা আরো খারাপ। আজকে কি করে লেকচার টা দেবে ,গভীর সমস্যায় পড়ল।
এরমধ্যে কলিং বেলের আওয়াজ শুরু হলো। এবার পুরোপুরি না উঠে আর পারল না কল্যাণ। নিশ্চয় মাসি এসেছে। আবার কলিংবেল বাজছে।
আড়মোড়া কেটে কল্যান আস্তে আস্তে দরজার দিকে এগোল, তারপর দরজা খুললো।
সত্যি ,সত্যি মাসি এসেছে।
মাসি বলল 'অনেক রাত্রে ঘুমিয়েছো নাকি?'
কল্যান একটা মস্ত বড় করে হাই তুলল। মাসির সাথে ইশারায় কথা বলল। কল্যাণ ইশারায় বুঝিয়ে দিল গারগিল করার জল দেবার জন্য।
মাসি যথারীতি গিয়ে আগে গারগিল করার জল দিল ।তারপর চা বানালো। তারপর আনুষঙ্গিক অন্যান্য কাজে হাত দিল।
মাসি জিজ্ঞেস করল 'কি খেয়ে যাবে
আজকে ?কখন বেরোবে?'
কল্যাণ যা মুখে বলল বুঝানো অসুবিধে হল, তার থেকে আবার কিছু ইশারায় বুঝিয়ে দিল।
মাসি শুধু বললো 'ভাত খাবে তো?'
কল্যাণ মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি প্রকাশ করল।
মাসি বললো 'তাহলে কি খাবে?'
'তরকা বানাবো? রুটি খাবে তো?'
কল্যাণ মাথা নাড়লো।
এরমধ্যে কল্যাণের আবার ফোন বাজছে।
ফোনের আর্তনাদে ফোনটা রিসিভ করল বলল¡' হ্যালো'। গরগর আওয়াজ হলো।
'আমি শিখা বলছি।'
'হ্যাঁ বলো। 'আবার গরগর আওয়াজ।
'তোমার গলার অবস্থা তো বুঝতেই পারছি ...।'
'যাচ্ছেতাই।'.
'কিন্তু কি করে তুমি লেকচার দেবে?'
'সেটাই তো ভাবছি।
উপায়ও নেই।'
'ডাক্তার দেখাবে না?'
'ফিরে এসে দেখাবো।'
'ঠিক আছে টেক কেয়ার।'
'তুমিও নিজের যত্ন নিও।'
'কখন বেরোবে?'
'এই তো দশটায়।'
''ok'
'ফিরে আমাকে ফোন ক'রো।'
''ok'
ফোনটা কেটে দিলো। সারারাতের অবসন্ন ক্লান্ত মনে একটা বিষণ্ণতার ছাপ ফেলেছিল প্রভা। হঠাৎ করে শিখার ফোনটা আসাতে , সঙ্গে যেন একটা মিষ্টি গন্ধ হৃদয় বীণার চারিদিকে ভরে গেল। মন বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠল।
মাসি আর একবার গারগিল করার জল দিয়ে গেল। কল্যাণ ইশারায় মাসির কাছে আর এক কাপ চায়ের বায়না ধরল।
মাসি একগাল হেসে বলল 'দিচ্ছি।'
কল্যাণ একটা বাংলা ম্যাগাজিনে চোখ বুলাচ্ছিল। হঠাৎই চোখ ফ্রেমবন্দি হয়ে যায় সম্পাদকীয় কলমটাতে। অন্যমনে পাতা উল্টাতে উল্টাতে এই সম্পাদকীয় কলমটা পড়ে বলল
'বাহ ,বেশ ভালো লিখেছেন
তো ?সেন্সেবল লেখা। যথেষ্ট সংযত আর ঝরঝরে ।সারও আছে ,তাতে আবার ধারও আছে।
মাসি এসে চায়ের কাপটা আবার ধরিয়ে দিল। চা খেতে খেতে লেখালেখির পাতার কবিতাংশে কবি দেবব্রত সরকার, কবি স্বপ্নীল ভট্টাচার্য, কবি রেখা চৌধুরী র কলমে চোখ নিবদ্ধ হয়ে গেল।
বসন্ত সংখ্যায় কবি দেবব্রত সরকার এ কবিতাটা বেশ সুন্দর
'বসন্ত হাঁত রাই'
"তোমার চোখে রাঙানো ফুল আদরে আদখান,
আমার চোখে লাগলো ছোঁয়া রুপেরই আখ্যান।
তোমার চোখে কামনার ডাকে চুপ সাগরে ডুব,
আমার বুকে কৌতূহলের প্রশ্ন ওঠে খুব।
তোমার চুলে উঠল ভেসে আমার হিয়া চোখ,
তাকিয়ে আছি দেখছে দেখ ইচ্ছে ছবি লোক।
তোমার গালে চুপ্টি করে ঠোঁট চলে যায় একা,
পায়ের থেকে কপাল জুড়ে চুমুতে আধ ক্ষ্যাপা।
নরম সুরে শরীর ভিজে হারিয়ে গেছে হৃদি,
শরীর এত নরম হলো জানেন নিরবিধি।
কৃষ্ণচূড়ায় রাধার খোঁপা ঢেকেছেএকলাই,
আবির ফুলে মেখেছে মন বসন্ত হাঁতরাই।"
মন ছুঁয়ে গেল কবিতাখানি। আর দেখার সময় নেই এবার ওয়াশ রুমে গিয়ে ফ্রেশ হতে হবে ।তারপর বেরোনো আছে খেয়ে দেয়ে।
ডাইনিং টেবিলে বসে কল্যাণ প্লেটে চামচের আওয়াজ করতে লাগল। মাসি হাসতে হাসতে এসে বলল' একদম বাচ্চা ছেলের মতো হয়ে গেছ।'
ডিস বাজাতে হবে না । এই নাও তোমার খাবার।
ইশারায় বললো 'এতগুলো রুটি?'
মাসি বলল 'এতগুলো! দুটো রুটি খাবে না?
না, না খেয়ে নাও।'
ইশারায় মাসিকে বোঝাতে চাইল কিছু একটা।
মাসি বললো'একটু দাঁড়াও রান্নাঘর থেকে ছুটে নিয়ে আসছি,কাঁচা লঙ্কা ,পেঁয়াজ।'
যতদূর সম্ভব কম কথা বলছে গলার উপর খুব প্রেসার পরছে। তরকা টা দারুন বানিয়েছে মাসি।
হাতের ইশারায় বাহবা দিল মাসিকে।
মাসিও খুব খুশি হলো। আর বলল
'তোমার ভালো লাগলে আমারও ভালো লাগে। রান্না করেও সুখ।'
কল্যান বলল 'আমি সিরিয়াসলি বলছি মাসি তুমি ছোটখাটো একটা দোকান খুলতে পারো, মানে রেস্টুরেন্ট।'
মাসি তো একেবারে প্রসন্নতায় একগাল হেসে বলল 'আমাদের অত টাকা পয়সা কোথায় বাবা।'
কল্যান বলল'-হ্যাঁ আরো কিছু তোমাকে অবশ্য আধুনিক অনেক রান্না শিখতে হবে।
তবে এটা অবশ্য করতে পারো যদি শুধু ট্রাডিশনাল রান্নায় থাক আবদ্ধ সেটাও করতে পারো।'
ওটা আমার স্বপ্ন হয়েই থাকবে বাবা। মাসি এঁটো বাসন গোছাতে গোছাতে বলল '
'আমাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়। আমরা কি আর সেই স্বপ্ন দেখতে পারি?'
কল্যান চেয়ারটা টেবিলের একটু ভেতরের দিকে ঢুকিয়ে দিলো।
তারপর বলল বেশিনে হাত ধুতে ' না মাসি কার কখন স্টার ঘুরে যাবে কেউ কি কিছু বলতে
পারে ?তবে স্বপ্নটাকে মরতে দিলে তো হবে
না ।স্বপ্ন তোমাকে দেখতেই হবে।'
মাসি শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
কল্যান নিজের রুমে গিয়ে ড্রেস পড়ে নিল বেরোতে হবে।
'মাসি তোমাকে আর সন্ধ্যেতে আসতে হবে না আমি কখন ফিরবো না ফিরব।'
'তা বেশ।
তাহলে তুমি কি খাবে?'
'আরে এক বেলা তো ,দরকার হলে কিছু কিনে নিয়ে এসে খেয়ে নেবো ।তোমাকে অত ভাবতে হবে না।
কালকে আবার সকাল সকাল চলে এসো কেমন?'
'ঠিক আছে। কি খাবে না খাবে একটা চিন্তা থেকে যাবে।'
"আরে না মাসি, কোন চিন্তা নেই ।আমার মা এখানে নেই তুমি এখন আমার মায়ের মত তাই এত চিন্তা করছ?'
মাসি বেরিয়ে গেল কল্যাণ বেরিয়ে পরলো।
কল্যাণ ট্রেন ধরল কৃষ্ণনগর লোকাল।
কৃষ্ণনগর স্টেশনে নেমে আবার কিছুতে উঠতে হবে। নবদ্বীপ কলেজে পড়েছে। একটা সেমিনার আছে।
ট্রেনে উঠে প্রথমদিকে জায়গা পায়নি ।তারপর ঠিক মদনপুর ছাড়িয়ে জায়গাটা পেল।
ট্রেনে যেতে যেতে ভাবল মনে মনে কালকে লেখাটা নিয়ে ভাবতে থাকবে কিভাবে উপস্থাপন করবে ?পরিবেশনটা কতটা সুন্দর ভাবে করা যায় এসব আর কি।
তারপর কখন কৃষ্ণনগর স্টেশনে এসে থেমেছে বুঝতেই পারেনি চোখটা লেগে গেছিল।
সবাই যখন হন্তদন্ত হয়ে নামতে শুরু
করেছে ।তখন নির্মেদ স্মার্ট কল্যাণ নামলো। তারপর হাঁটতে শুরু করল ।যথারীতি অটোওপেয়ে গেল। বাপরে অটোতে যা ভিড়। কিন্তু চাপতেই হলো ।এদিকে টাইমও হয়ে যাচ্ছে।
যথারীতি নবদ্দীপ কলেজে পৌঁছালো ওখানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষ উষ্ণ অভ্যর্থনায় ভরিয়ে তুলল। প্রথমেই ব্রিফকেস খুলে নিজের ল্যাবটপ বের করে চোখ বুলিয়ে নিতে থাকলো। এরইমধ্যে এসে গেল কফি।
কফিটা গলায় বেশ আরাম দিল। কি সুন্দর সুখানুভূতি। একটা বাতানুকূল ঘরে বসতে দেয়া হয়েছিল। হলঘরটার শীতলতা যেমন নিজের শরীরটাকে প্রশান্তি দিয়েছে তেমনি ভেতরের প্রশান্তি দিয়েছে উষ্ণতায় ভরে কফি।
বিভিন্ন কলেজ থেকে বিভিন্ন লেকচারাররা এসেছেন। গলার জন্য কল্যাণ একটু কেমন যেন ভেতরে ভেতরে একটু দুর্বল হয়ে পড়ছিল।
ঠিকঠাক তথ্য পরিবেশন করতে পারবে কিনা ইন একটা সংশয় ছিল।
গুরুর নাম করে নেমে পড়তেই হলো।
গলার স্বর এর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে নিলো তারপর তার বক্তব্য শুরু করলো।
বক্তব্য শুনে সকলে অভিভূত, আপ্লুত।
প্রত্যেকের ভেতরে যে একটা উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করেছে তাতে কল্যাণও ভেতরে ভেতরে ভীষণভাবে অভিভূত হয়ে গেছিল।
তারপর মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিল আজকে ডাক্তার দেখাতেই হবে। ব্রেক এর সময় ডাক্তারের সাথে কনসাল্ট করে নিয়েছে।
কিন্তু আজকে কি ডাক্তার দেখাতে পারবে কটায় ছাড়া পাবে সেটাই তো বুঝে উঠতে পারছে না দেখা যাক।
এরমধ্যে লাঞ্চ এসে গেছে। লাঞ্চে বিরিয়ানি ,মটন কষা দেয়া হয়েছে। লঞ্চের প্যাকেট খুলে কল্যান
মনে মনে খুব খুশি হয়েছে।
মাঝে টুক করে মনে হল শিখাকে ফোনটা করলে কেমন হয়।
আমার গলাটা জন্য ও চিন্তিত । ভাবতেই রিসিভ করলো তারপর বললো বলো।
'যেন মনে হল ফোনের অপেক্ষাতেই বসে ছিল 'অনেকটা অধীর আগ্রহে।'
"তোমার প্রোগ্রাম শেষ হয়েছে?"
'না গো ,এখন লাঞ্চ করছি। এখন ব্রেক।'
'ও আচ্ছা তোমার গলার অবস্থা কি?'
'কি মনে হচ্ছে?'
সকালে যে খারাপ অবস্থা ছিল তার থেকে একটু বেটার মনে হচ্ছে ওষুধ খেয়েছো নাকি?
এটা বোধহয় জানো ,ঈশ্বরের অসীম লীলা ।খুব টেন্সড ছিলাম আ'মি।'
'"তুমি কি করছ?
'তোমার কথাই চিন্তা করছিলাম। ঠিকঠাক গলা কাজ করছে কিনা?'
'তোমার লেকচার হয়ে গেছে?'
"হ্যাঁ ,হয়ে গেছে।'
"তাহলে কখন ফিরবে?'
'সেমিনার শেষ হোক তবে তো?'
'ঠিক আছে টেক কেয়ার।'
'সেম টু ইউ।'
'/অ্যাই শিখা একটা গান শুনিয়ে দাও না খুব ইচ্ছে করছে তোমার কন্ঠে গান শুনতে। প্লিজ।"
"এখন! মাথাটাও গেছে।"
"প্লিজ একটু শুনিয়ে দাও না'
"মান্নাদের একটা গান গাইছি বেশি কিন্তু করবো না?"
"Ok"
"মিষ্টি একটা গন্ধ রয়েছে ঘরটা জুড়ে,... এলোমেলো করে ছড়ানো ছিল যা, কার দুটি হাত সাজিয়ে দিলো তা। চিনি নাকি চিনি না। কাছে না দূরে..।'
ওদিকে কর্তৃপক্ষ কল্যাণকে ডাকলেন
' স্যার আসুন সেমিনার শুরু হয়ে গেছে।'
'হ্যাঁ যাচ্ছি,।'
"এখন ছাড়ছি কিন্তু মিষ্টি একটা গন্ধ প্রাণের ভেতরে ছড়িয়ে দিলে তুমি।"
শিখা প্রসন্নতায় হো হো করে হেসে উঠলো।
কবি শারমিন সুলতানার কবিতা
জীবন নামক সহজ খাতায়
শারমিন সুলতানা
চারপাশে এমন অনেক আছে
চরম অভাগা মানুষ,
মৃত্যু ভয় নেইকো তাদের
উড়ায় শুধু ফানুস।
না হয়,"বাবার"চোখের মণি
হয় যে অভিশপ্ত,
বোনের দুঃখেও কাঁদেনা মন
হয় বিরক্তের পাত্র।
ভাইয়ের কষ্টের রাখে না খবর
জ্ঞান দিতে সদা ব্যস্ত,
সত্যনিষ্ঠ তারাই কেবল
সবাই তাদের অধীনস্থ।
টাকার পেছনে ছুটতে গিয়ে
হয়নাতো আচরণ সদয়,
ইবাদতেও ঢের ফাঁকিবাজি
কঠিন হয় যে হৃদয়।
"মা" থেকেও মধুর ডাকটি
ডাকতে জানে না যেই জন,
সব থেকেও ভীষণ গরিব
বোঝেনা তাদের অবুজ মন।
এমন সুখী নাই-বা হোক
এই জগতের কেউ,
জীবন নামের সহজ খাতায়
থাকে সন্তান বউ।
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)









