২৫ জুলাই ২০২২

মমতা রায়চৌধুরী এর ধারাবাহিক উপন্যাস উপন্যাস টানাপোড়েন ১৯৪




উপন্যাস 

টানাপোড়েন ১৯৪

মনোজের মৌউল নেশা

মমতা রায়চৌধুরী


মনোজ আজ অফিস থেকে বাড়ি ফিরল প্রায় রাত্রি নটার পরে।  ক্লান্ত শ্রান্ত মন নিয়ে যখন সে তার কলাপসিপল গেট খুলে ঘরে ঢুকলো তখন মনে হল সে বেশি বড্ড ক্লান্ত হয়ে 
পড়েছে ।তাড়াতাড়ি কোনরকমে আলোটা জ্বাললো । জোরালো আলো আরও বেশি ক্লান্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে , তাই মৃদু আলো জ্বাললো।ওদিকে পুবের জানালার শার্সি দেয়া ছিল তার ভেতরে প্রচুর চাঁদের আলো এসে পড়েছে ঘরের 
মধ্যে ,ঘরের প্রায় সবকিছুই আবছা দেখা 
যাচ্ছে কোন অসুবিধাই হচ্ছে না দেখতে lনিজের প্যান্ট, শার্টটা খুলে আলনায় টাঙিয়ে রাখল তারপর এক এক করে ঘরের জানলাগুলো
 খুলে মনে মনে ভাবছে  "কি ব্যাপার আজকের জানলা গুলো বন্ধ? রেখা কি এখনো বাড়ি ফেরেনি ?কি হতে পারে? কোথায় গেল ভাবতে ভাবতেই সোফায় গিয়ে নিজের শরীরটাকে এলিয়ে দিলো।
"এইসময় রেখা থাকলে, এক কাপ কফি হলে মনটা ফুরফুরে হয়ে যেত ।আজকে এত ক্লান্ত লাগছে কেন ?মনে মনে ভাবছে  তারপর চোখটা বুজে আসলো। এরমধ্যে দেখা গেল তুতু এসে মনোজের পাশটাতে বসে" কিউ কিউ" আওয়াজ করছে ।মনোজ চোখ বন্ধ করেই বললো " কি ব্যাপার ,তোর আবার কি হলো ?তোর মালকিন কোথায় গেল ,কিছু বলে গেছে ?'
তারপরও দেখা গেল কিউ ,কিউ আওয়াজ করে যাচ্ছে  তখন মনোজ আবার উঠলো ,উঠে দেখল সামনেই ফ্লাক্স রাখা রয়েছে  মনোজ এতক্ষণে খেয়াল করে। ফ্লাক্স এর ঢাকা খুলে
খুলে দেখল' সত্যিই কফি রাখা আছে ।'
"উফ এইজন্যেই রেখা কে এত ভালো লাগে কিন্তু সত্যিই কি এত ভালো লাগে ?"
ভাবতে ভাবতে তু তুর  কাছে গেল  ।
দেখা গেল ও আবার দরজার কাছে যাচ্ছে, বুঝল তুতু বাইরে বেরোবে ।
মনোজ আবার গেটটা খুলে দিল । গেটটা
  বন্ধ না করে সোফায় এসে বসলো আর মনে মনে ভাবল একটু পরেই তো আবার তুতু
 ঢুকবে  কাজেই গেট বন্ধ করে লাভ নেই । সামনেই কাপ রাখা ছিল তাতে কফি ঢেলে খেল। কফি খেতে ই মাথাটা যেন ছেড়ে গেল ,ক্লান্তি দূর হয়ে গেল ।এবার রিমোট নিয়ে নাড়াচাড়া করল টিভিতে সেই একই নিউজ শুনতে আর ভালো লাগছে না ।সেই ভোটের তরজা।'
তার চেয়ে মনোজ সিগারেট হাতে নিয়ে জানলার কাছে গেল তারপর লাইটার দিয়ে সিগারেট ধরালো ,ধরিয়ে চাঁদের আলোর সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে লাগলো। মনটা যেন আজ কেমন কেমন সিগারেট পাশে এক সুন্দরী নারী।
মনোজের মন ক্যানভাসে নাড়া দিয়ে গেল আরো কিছু তুলির আচড়  মনে পড়ে গেল মনোজ যখন গ্রামের বাড়িতে ছিল সেই সময় প্রতিবেশী এক দিদি তাকে খুবই স্নেহ করত কিন্তু দিদিকে দিদি হিসেবে ভাবতেই পারতো না ।মনে মনে তাকে নিয়ে কত কিছুই কল্পনা করেছিল কিশোর মনে। সেই অলিখিত মনে দোলা দিয়ে গিয়েছিল প্রথম  দিদি নারী ।তার জীবন তখন ভোরের সদ্যফোটা আলোর মত ছড়িয়ে পড়তে চাইছিল চারিদিক। শীতের ভোরের কুয়াশা যখন দূর্বা ঘাসের উপর পড়ে তার ওপর যদি রোদের ছটা পরে তা যেমন চিকচিক করতে থাকে ,এক অপরূপ মুক্তার মত আলোয় ভরে যায় চারিদিক । ঠিক জুঁই দিদিকে দেখে মনোজের মনপ্রাণ হিন্দলিত হত ।এভাবেই মনাকাশে চলতো মেঘের আনাগোনা ।কিন্তু কোথাও দ্বিধা কোথাও যেন একটা লজ্জা, বোধের জগতে কাজ করছিল। ভালোবাসার প্রকাশ করতে পারেনি একটা অনাবিল সর্বদা তার ভেতরে কাজ করেছে কাউকে শেয়ার করতে পারেনি কারন সেটা সমাজের কাছে সেখা নিজে অসম বয়স এ ভালোবাসা কখনো মর্যাদা পাবে
 না  মনোজের থেকে বয়সে তিন বছরের বড় তার সমবয়সী পিন্টুর দিদি । পিন্টুর সঙ্গে একসঙ্গে খেলাধুলা করত ,পিন্টুদের বাড়ি প্রায়শই যেত, পরে বুঝতে পেরেছিল তার কিসের এত টান ওই বাড়ির প্রতি। আসলে দিদির ওই সৌন্দর্য সেই বয়সেই তার মনে দাগ কেটে গেছিল অপরূপ কাঁচা রুপের সাজ , মনোজের মনের ভিতরে জুই দিদির  মাধুর্যএর ছটা সর্বদা ঘুরপাক খেত। তাই কারণে-অকারণে পিন্টু দের বাড়িতে হাজির হতো মনোজ। জুই দিদির অপরূপ সৌন্দর্য। সুন্দর ফর্সা দেহ খানি কোকড়ানো চুল, পটলচেরা চোখ সেই চোখের দৃষ্টি যেন অনেক গভীরে পৌঁছে যেত মনোজ। সাঁতার কাটতো ।নিটল বক্ষের ভেতরে ছিল গোলাপের সুগন্ধ।  
প্রেম যেন অপ্রত্যাশিতভাবেই আসে ।তার  কোনো দিনক্ষণ থাকে না। বয়স থাকে না ।মনোজের জীবনে এরকম ঘটনা ঘটেছিল  প্রথম যৌবনের সুরভী লেগেছিল, তার মনের কোণে কোন এক বনমালী বাঁশ রী বেজেছিল ।সে মনে মনে প্রত্যাশা করত অভিসার যেতে। তার মানস প্রত্যাশিত সেই প্রেমিকা ছিলো জুইদিদি।
আজকে এসব কথা ভাবতেও খারাপ লাগে কিন্তু কিছু করার ছিল না তার প্রথম প্রেম , তাকে অস্বীকার করবে কি করে? মৌউল ফুলের নেশার মত টান তো।
প্রেমের বোধহয় একটা অবাধ্য ভাব আছে। কারোর জন্য কোন কিছু নিয়ে প্রতীক্ষা করলে বা অনেক আয়োজন নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করলে সে আসে না। তার দর্শন পাওয়া দায়। প্রেম কখনো দিনক্ষণ দেখে আসেনা ,তা শুধু অপ্রত্যাশিতভাবেই আসে আর যখন আসে তার সেই আবেগ ত্রিভুবনে জুড়ে বসে।
জুই দিদিকে নিয়ে বেশি ভাবলেই তার ভেতরে একটা শিহরণ লাগতো ,সে রাত্রে তার চোখে ঘুম আসত না। জুঁই দিদিকে নীল শাড়িতে খুব সুন্দর মানাত ,যেন একটা নীল পরী নেমে এসেছে কিন্তু একটা দুঃখের বিষয় এত সুন্দর রূপ তার প্রকাশ নেই। মনোজ সেই দিদিকে নিয়েই কত বর্ষার সন্ধ্যা কত জ্যোৎস্নাময় রাত্রি ভেবে গেছে কিন্তু সব সময়  অধরাই থেকে গেছে।
মনোজের শুধু মনে হতো একটি সুকোমল নারীর হৃদয়ে এত সম্ভার রক্ষিত আছে অথচ তার প্রিয়তমের আসন খানা জনশূন্য অন্ধকারে হাহাকার করত। যদি  কাঁচা রূপের সাজের আবরণে আস্তে আস্তে আরো অভিজ্ঞ সুরুচির পরিচয় পাওয়া যায়, তার কথা বলার ভঙ্গি ,তার সাজসজ্জা, এমনকি বেনিবন্ধেও  অভিজ্ঞ সুরুচির পরিচয় পাওয়া যায় তাহলে হৃদয়ের সমস্ত অপ্রার্থিত প্রেম রাশি একজনের স্মরণেই নিবেদিত হতো, তাহলে কি ভালোই না হত। কত নির্জন রাত্রে মনোজের মনে এভাবে জুঁই দিদি নাড়া দিয়ে যেত। আর মনোজকে উতলা করে দিত।
মনোজ মনে মনে ভাবে এই সৌন্দর্যের একটা  মোহিনীশক্তি আছে । যার বসে মনোজ পড়েছে সেই সুন্দর্যকে উপলব্ধি করতে না পেরে বারবার তাই মনোজ হতাশ হয়ে যেত তার হৃদয় মরুভূমি নয় সবসময় যেন নতুন রসের উদ্ভব হত।
একসময় এই মোহিনী রূপেই জুঁই দিদি মনোজের মনেও এক  ম্লানগোধূলির আলো তে পরিণত হয়েছিল, যেদিন মনোজ তার কল্পনার প্রথম প্রেমিকা  অন্য কারোর হতে যাচ্ছে ,সেই মুহূর্তে তার কাছে পৃথিবীর রং বদলে গিয়েছিল।

পিন্টু যখন এসে বিয়ের কার্ড খানা মনোজদের বাড়িতে এসে ধরিয়ে দিয়েছিল। সেদিন মনোজের পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গিয়েছিল, তার মনের ভেতরের সদ্য পাপড়ি মেলা প্রস্ফুটিত ফুল যেন ঝরে পড়তে শুরু করেছিলো। মনে মনে তাকে নিয়ে সাজানো নতুন বাড়ির গোলাপি পর্দা গুলো ক্রমশ অনেকদিনের রং চটা ধুলোর আস্তরণে  পরিণত হয়েছিল।
তার হৃদয় বিকল হয়ে গেছিল সে দ্রুতপদে নিজের ঘরে চলে এসেছিল যেন মনে হয়েছিল তার চোখের সামনে তার সেই কল্পিত জুই দিদি তার মানসপ্রতিমা যেন নীল জর্জেটের আঁচল খানা মেলে দিয়ে একটা অন্তরাল সৃষ্টি করেছিল দুই দেশেই মোহনীয় উদ্ধত রূপ আর মনোজ দেখতে পেল না।
মনোজ সাহসে বুক বেঁধে আর ভেতরে ত্যাগের মহিমায় উন্নীত হয়ে পরেরদিনই হোস্টেলে চলে গেছিল।
যে মনোজকে হস্টেলে পাঠানোর জন্য বাবা-মা হিমশিম খাচ্ছিল সেই মনোজ নিজের থেকেই হোস্টেলে যাবার জন্য তোড়জোড় শুরু করেছে দেখে বাবা-মা একটু অবাক হয়ে গেছিল মাত জিজ্ঞেস করেই ফেলল কি ব্যাপার আজকে তোকে হোস্টেলে যেতে হবে জুয়েল বিয়ে আছে দুদিন থেকে যান তারপরে যাবি।
মনোজ নিরুত্তর থেকে ছিল ছেলের চাউনিতে একটা ভাবলেশহীন প্রতিমূর্তি ধরা পড়েছিল মনোজের মা তখন শিউরে উঠেছিল মনোজকে আর ঘাটাতে সাহস পায়নি মনের ইচ্ছেটা পূর্ণ হয়েছিল
মনোজ তার প্রেমের সকল বাতায়নগুলি রুদ্ধ করে ফেলেছিল সেখানে আর প্রেমের সৌন্দর্য লোক প্রবেশ করতে পারবে না তারপর বহু দিন এই যন্ত্রণা বুকে নিয়ে বেরিয়ে ছিল কিন্তু কাউকে প্রকাশ করতে পারিনি হয়তো মনের মত এরকম সকলেরই কিছু না কিছু ঘটনা থাকে যা সব সময় সকলের কাছে শেয়ার করা যায় না।
এসব ভাবছে এমন সময় রেখা এসে বলল" কি ব্যাপার জানালায় দাঁড়িয়ে এত কি ভাবছো?""
"কই কিছু নাতো। তুমি কোথায় গিয়েছিলে?"
"আরে পার্থর মা ,মানে মাসিমা ।'সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে পা মচকে গেছে তাই দেখতে গেছিলাম।
"এ বাবা কখন?"
"সন্ধ্যেবেলায়।"
আর দরজাটাকে হাট করে খুলে রেখেছো যে দেখো তোমার পেছনে কারা কারা বসে আছে।
ও বাবা তুতু, মিলি ,পাইলট সবাই। টু বুঝতে পারেনি দেখো।
তুমি কি এই জগতে ছিলে , অন্য কোন জগতে ছিলে ,কে জানে।'

মমতা রায়চৌধুরী এর ধারাবাহিক উপন্যাস উপন্যাস টানাপোড়েন ১৯৩




উপন্যাস 

টানাপোড়েন ১৯৩

উন্মত্ত খেলা

মমতা রায়চৌধুরী



আজ ছুটির দিন এইমাত্র সূর্য অস্ত গেল । পশ্চিম দিক জানলার সামনে দাঁড়িয়ে মনোজ সিগারেটের পর সিগারেট খেয়ে যাচ্ছে আর সন্ধ্যারানীর লজ্জা বনত রক্তিম মায়াটুকু দেখার জন্য উৎসুক  । কিছুক্ষণ আগেও রেখা মনোজের পাশে ছিল রেখা আর আকাশের এই অস্থিয়মান সূর্য। দু'জনকেই   যেন অস্পষ্ট মনে হচ্ছে ।সমস্ত রং যেন আকাশের চোখ  থেকে মুছে যাচ্ছে। কেমন যেন একটা বিবর্ণ চেহারা এত আকাশের। তবুও অস্পষ্ট বেড়াজাল অতিক্রম করে মনোজের মনে স্মৃতির অ্যালবাম থেকে বেরিয়ে আসে কিছু অজানা তথ্য ।সেদিনও এভাবেই তারা দুজন পাশাপাশি বসেছিল । শুধু পাত্রী পাল্টে গেছে জায়গা পাল্টে গেছে, পরিস্থিতি পাল্টে গেছে।সেদিন কারো  মুখে কোন কথা ছিল না। শুধু পরস্পরের সান্নিধ্য আর অন্ধকার রাত্রিতে তারার চাকচিক্য যেন মনে হচ্ছে রঙের খেলা চলছে আকাশের বুকে ।যখন এই রঙের খেলা চলে তখন তো অপূর্ব লাগে। তখন মনোজের হৃদয় আকাশে শুধু তিথি সবই ভালো লাগে।
মনোজের চোখ যখন তিথির চোখের দিকে তাকিয়ে নিমিলেষ নেত্রে। তখনও মনোজ চোখের ভাষা বোঝেনি । তাছাড়া কখনো বুঝে উঠতে পারেও নি ।তিথি যেন ক্ষণে ক্ষণে বদলায়। কখনো মনে হতো সন্ধ্যারাতে ধূসর ছায়ার মতো, কখনো বা পূর্ণিমার চাঁদের আলোর মত উজ্জ্বল ,কখনো ভোরের শিশির এর উপর সূর্যের কিরণ পরলে ,যেরকম সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয় ,সেরকম।  কখনো মনে হতো নদীর কালো জলের মতো ।আসলে তিথির গহন মনের হদিশ কোনদিনও পায় নি ।একতরফাই তিথিকে ভালোবেসেছিল জানে না । কিন্তু শেষ সময় তিথির আবেগ দেখে মনোজের কখনো মনে হয়নি একতরফাই ভালোবেসেছে মনোজ। তারপরে আর কখনো মনে হয়নি যদি তাই হতো তাহলে ইতিহাস হয়ে যেত না আজ তিথি ইতিহাস।তবে হয়তো  সেটা ছিল তার বয়সের দোষ ।এ কাঁচা বয়স তখন তার ভেতরের তারুণ্যের রক্ত টগবগ করে
 ফুটছে ।হয়তো সে জন্যেই তার উষ্ণতার পারদ চলেছে ।সেই কারণে হয়তো মনোজের সান্নিধ্য তার ভাল লেগেছে ।আজ দীর্ঘদিন পরে এসে  যখন আবার  সে ভালবাসার দাবি নিয়ে এসে হাজির হয় । মনোজ অস্বীকার করে ,এটাই তো স্বাভাবিক কারণ যখন তাকে চেয়েছিলো সে ,তখন তার ভালবাসাকে উপেক্ষা করে পাড়ি দিয়েছিল বিদেশে । মনোজ মনে মনে একটা ছোট্ট সুখের ভালোবাসার নীড় মনের কোনে অজান্তেই রচনা করেছিল। অথচ সেটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে চুরমার করে দিয়ে চলে গেছে।।তবে কেনই বা আজকে হঠাৎ করে এই সময় আজ আবার তিথির কথা মনে পড়ছে । আজ তিথি তার কাছে অতীত  আর রেখা তার কাছে বর্তমান ।অতীত আর বর্তমানের মাঝে  দাঁড়িয়ে মনোজ ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে  ।ভবিষ্যত  অবশ্যই হওয়া উচিত রেখাকে নিয়ে। রেখাই তার জীবন সঙ্গিনী। রেখার মতো মেয়ে হয় না। উজ্জ্বল ঝকঝকে একটি মেয়ে। কত গুণ ওর। তারপরও মাঝে মাঝে রেখার প্রতি এমন আচরণ করে ফেলে যার জন্য রেখাও ভেতরে ভেতরে অনেক কষ্ট পেয়েছে। এসব কথা ভাবছে হঠাৎ করেই দোলা দিয়ে যায় তার কাঁচা বয়সের কিছু ভুল। কাঁচা বয়স কলেজে পড়া অবস্থায় সেই সময় মনের ভেতরে যেন একটা তীব্র তৃষ্ণা কাজ করত ।সবসময় মনেপ্রাণে চাই তো তিথিকে স্পর্শ করতে , তিথির সান্নিধ্য পেতে । নাকি তখন বিপরীত লিঙ্গের প্রতি একটা স্বাভাবিক আকর্ষণ জন্মায়, হয় তো সে তার জীবনে এসেছিল বলে শুধু তিথির প্রতিই তার মোহ জন্মেছিল। যাইহোক কি আর হবে সেই নিয়ে কাটাছেঁড়া করে। তবুও মনে পড়েএকদিন  অযাচিতভাবে এসে গেছিল সেই মুহূর্ত। সে দিনটা ছিল এরকমই সন্ধ্যের সময় সূর্য অস্ত যায় যায় একটা দারুন বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য তিথি
দের বাড়িতে। সেদিন আরও বন্ধুবান্ধবের আসার কথা ছিল। ওরা আস তে  অনেকটা দেরি করেছিল। হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া এসে জানলাগুলোকে দড়াম দড়াম করে বাজনা বাজাচ্ছিল। তিথি  তখন গেছিল চা করতে আর আমি দাঁড়িয়েছিলাম জানলার কাছে জানালাটা বন্ধ করতে ভাল লাগল না। কেমন যেন একটা উন্মত্ততা কাজ করছিল নিজের ভেতরে, ওটাই যেন ভাল লাগছিল  বাইরের প্রকৃতির খেলা আর নিজের ভেতরের খেলাসেদিন যেন সব একাকার হয়ে যাবে মনে হয়েছিল ।ঠিক সেই সময় তিথি এসে চায়ের কাপটা নামিয়ে যখন বলল 
"কি করছো ?জানলাটাকে বন্ধ করো .।তবুও জানলার কাছে দাঁড়িয়ে থেকেই তিথিকে দেখছিলাম দুচোখ ভরে কি শান্ত ,স্নিগ্ধ, রূপ যেন তিথির মধ্যে কত স্নেহ-মমতা দিয়েই না সৃষ্টি করেছেন বিশ্ব শিল্পী ।তিথি ছাড়া যেন তখন আর কাউকে অর্থাৎকোন নারী তার কাছে এত সুন্দর বলে মনে হয়নি ।দরজা বন্ধ। তিথি জানালা বন্ধ করতে গেছে ।তখন আমি বলেছিলাম "কি দরকার জানালাটা খোলা থাক না ।দেখছো ,না বাইরে কি সুন্দর ঝড় উঠেছে।"
  তিথি কিছুটা মনোজের চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল "ঝড় উঠেছে বলেই তো বন্ধ
 করছি । জানলা বন্ধ করতে যাবে ঠিক সেই সময়  তিথির হাত দুটো টেনে এনে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করেছিল । তিথিরও যেন কিছুটা মনে হচ্ছিল নিজেকে পিষে চূর্ণ-বিচূর্ণ  করে ফেলতে চায় মনোজের বুকে। তার সারা দেহ কেঁপে কেঁপে উঠছিল আর আমার ভেতরের  শিরাগুলো যেন বিদীর্ণ করে দিয়ে রক্তের স্রোত ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছিল। বিপুল একটা মুহূর্ত যেন তখন কাজ করছিল। তিথির গায়ের গন্ধ তখন সর্বাঙ্গ ঝিমঝিম করে উঠেছিল । তিথির এত সুন্দর সৌন্দর্য প্রজাপতির ডানার মতো যেন
 যেন দুটি গাল ,গোলাপের পাপড়ির মত সুন্দর দুটো উষ্ণ ঠোঁট, চারুকন্ঠ ছিল অনেক নমনীয় যেন মনে হচ্ছিল রক্তকরবী। আর ছিল স্নিগ্ধতা এ ভরা দুটি বক্ষ। ভেতরে যে তখন কি উত্তেজনা কি সর্বনাশা সেই সুখ পরস্পর পরস্পরের কাছে আসা। হয়তো সেদিন বিপ্লব ঘটে যেত যদি না বাইরে কলিং বেলের আওয়াজ টা আসতো 
 আজ নিজেকে অপরাধী মনে হয়। সে কথাগুলো রেখার কাছে অকপটে স্বীকার করতেও পারে না একদিন তাকে স্বীকার করতেই হবে নাহলে গ্লানি তাকে কুরে কুরে খাবে কিন্তু কি করে বলবে তার ভাষা কোথায় ?আজকে সেইসব ভাবছে বসে বসে। হঠাৎ তার ভাবনায় ছেদ ঘটায় এসে রেখা ।
"এই নাও তোমার কফি নাও ।
কি এত ভাবছো বল তো ?জানলার কাছে দাঁড়িয়ে আর কতগুলো সিগারেট খাবে বলো তো ।"
মনোজ বলল" না না বেশি সিগারেট খাই নি ।"
রেখা বলল "কী বলবো ,।বলার তো কিছু নেই। যা ভালো বোঝো করো '।
ওমা দুজনের মধ্যে এই রকম একটু কথা চালাচালি হচ্ছে ।তার মধ্যে তুতু ঢুকে কিউ কিউ আওয়াজ করছে ।
কে জানে? কী হলোতোর ?আবার কি হয়েছে ?"

রেখা তুতুকে আদর করে বললো "শুয়ে পড়ো শুয়ে পড়ো।"
তুতু কি সুন্দর শুয়ে পড়ল।

মনোজের তখনও ঘোর কাটেনি আবার চলে গেছে স্মৃতির অ্যালবামে।
তিথি যখন মনোজকে বলছে "কেউ এসে গেছে সিঁড়িতে তখন হাসির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।
মনোজ বলল " আজ বড্ড অশান্ত আমি। তুমিও কি অশান্ত নও।,"
তিথি বলেছিল "আমি শীর্ণ নদীর জল ,শুধুমাত্র একটুখানি ভুলের মাটি ছুঁয়ে গেলাম।"
মনোজ জিজ্ঞেস করেছিল "তুমি কি তৃপ্ত? '
তিথি বলেছিল" তুমি তৃপ্ত নও?'
মনোজ বলেছিল, আজ তৃপ্ত-অতৃপ্ত বিরোধাভাস,'
তিথি বলেছিল তবুও?, এ যেন আশাতীতভাবে পেয়ে যাওয়া । "
যা চেয়ে নেয়া হয়নি, যা অর্জন করা হয়নি।
এত কৌতুহল উত্তেজনা আরও বেশি করে কাজ করে যতক্ষণ না পরিপূর্ণভাবে পাওয়া যায়।

এ যে  অফুরন্ত সুখের আধার। হৃদয়ের অন্তস্থল উথলে ওঠে। তবুও আর একবার মনে হয়েছিল দুহাত বাড়িয়ে ওর লতায়মান দেহটিকে আমার সর্বাঙ্গ দিয়ে অনুভব করতে।

এ ভাবে খেলা যদি চলতে থাকতো আরো কিছুক্ষণ তাহলে সেদিন কি হতো সেটা ভগবান ই
জানতো। তিথি বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত তাড়াতাড়ি বাহুবন্ধনে ছাড়িয়ে একবার চারিদিক তাকিয়ে দেখে নিল। সব ঠিকঠাক আছে কিনা। তারপর গেল দরজা খুলতে। আর আমার ভেতরে যে উন্মত্ত লীলা চলেছিল সেটা থমকে গেল কিছুক্ষনের জন্য । তবে বাড়িতে ফিরে এসে রাত্রে শোবার ঘরে গিয়ে শরীরটা হঠাৎ করেই আবার যেন ঝিমঝিম করে উঠলো কেন এরকম হলো কিছুই জানি না  ।তখন সমস্ত রাত শুধু তিথিকে ঘিরে স্বপ্ন এঁকে গেছি। আর ভেবেছি আবার কি তার বুকে এরকম ঝড় উঠবে ?তারা কি আবার কখনো উন্মত্ত খেলায় মেতে উঠবে। এসব ভাবতে ভাবতে সারারাত শুধু তিথির শরীরের আতর মেখে এপাশ-ওপাশ করেছি।'
সেই আতরের গন্ধ আজও যেন নস্টালজিক হয়ে বারবার ফিরে আসে ,যেন সে এক অভূতপূর্ব অনির্বচনীয় সুখ।

২৩ জুলাই ২০২২

মমতা রায়চৌধুরী এর ধারাবাহিক উপন্যাস উপন্যাস টানাপোড়েন ১৯২




উপন্যাস 

টানাপোড়েন ১৯২

ভাবনারে কি হাওয়ায় মাতালো

মমতা রায় চৌধুরী


আজ প্রায় সারাটা দিন চলে গেল এই মেয়েদের প্রোগ্রামের লিস্ট করতে, মেয়েদের ফোন কল ওদিকে রাজ্যের কাজ পড়ে রয়েছে। মাসি আসলো না। রেখা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে বুকে চিনচিন করে উঠলো।
মাসি এলো  না । মাসি তো না বোলে কামাই করে না।  আগে সমিতা যা মিথ্যে কথা বলতো । সব সময় যেন মা সরস্বতীরকে মিথ্যে কথার ঝুলি তে বন্দি করে রেখেছিল। এই মাসি সে রকম তো নয়। বয়স হয়েছে।মাসির ভিতর  ফাঁকিবাজি কাজ করে না।তবুও ছেলেটা অসুস্থ আছে,নাতি নাতনী দের কথা মাথায় রেখে কাজে নেমেছে। আহা রে এদের আবার  অন্ধের কিবা রাতি কিবা দিন অবস্থার মত।
"না।আর ভাবলে হবে না। যাই জামা কাপড়গুলো শুকোয় নি ।এই বৃষ্টি আবার এই রোদ, ছাদে দিয়ে আসি। এখন তো এক চিলতে রোদ্দুর দেখা মিলেছে ।"
এই ভেবেই রেখা ছাদে গিয়ে উঠল জামা কাপড় নিয়ে ।ছাদের থেকে চোখ পড়ে গেল আবার সেই চৈতিদের বাড়ির দিকে ।
"আহা রে ছাদখানা কেমন খাঁ খাঁ 
করছে ।বাড়িটাও ঠিক তাই ।লোকজন না থাকলে যা হয় ।"
"ছাদ থেকেনেমে গিয়ে একবার চৈতির মাকে ফোন করতে হবে। কি করছে কে জানে?'
রেখা এসব ভাবতে ভাবতে জামা কাপড়গুলো ছাদে মিলিয়ে দিল ,ক্লিপ লাগিয়ে দিলো। এবার ছাদে কিছু ফুলগাছ করেছে ।দেখে নিল  ফুল গাছ গুলো ঠিকঠাক আছে কিনা ।এখন যে হারে বৃষ্টি হচ্ছে, জল দেবার কোন প্রশ্নই ওঠে না। গতবার নীলকন্ঠ ফুল যা হয়েছিল বাবা, দেখলে যেন চোখ জুড়িয়ে যায় ।কতজন যে কত নজর দিয়েছে তার ঠিক নেই।
রেখা ভাবছে "না ,আর একটা কাজ বাকি আছে কদিন ধরে লিখে উঠতে পারছে না, রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী জন্য। একটা গল্প বা কবিতা দিতে হবে দুটো পত্রিকা থেকে আর্জি জানিয়েছেন সম্পাদক। এইজন্য তাড়াতাড়ি জামা কাপড়গুলো মিলিয়ে দিয়ে   সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে রেখা নেমে আসলো।l
ঘরের কিছু টুকরো-টাকরা কাজ করার পর দেখল মেঘ করেছে রেখা আবার ছাদে কেন জামা কাপড় গুলো নামিয়ে আনলো। শুকিয়েছে সেগুলো কে আলাদা জায়গায় রেখে বাকিগুলো কে একটু মিলিয়ে দিল। তারপর রেখা ড্রইং রুমের জানলা খুলে দিয়েছে হালকা করে একটু বৃষ্টির ছাঁট ঠান্ডা ঝোড়ো হাওয়া তার চোখে মুখে এসে লাগল । মনের ভিতর কেমন একটা উদাসী হাওয়া  বুকের ভেতর হু হু করে বয়ে যেতে লাগলো। একটি সুন্দর প্রাকৃতিক মুহূর্তেই কত রকমের প্রশ্ন ভিড় করছে তার মনের ভেতর।
রেখা ঠিক করে নিয়েছে এখনি একটা রবি ঠাকুরের কবিতা লিখে ফেলবে যেমনি ভাবা অমনি কাজ । সত্যি সত্যি তার কল্পনা প্রবণ মন বাস্তবের মাটিতে
স্পর্শ করে। লিখে ফেলল একটি কবিতা। কবিতা লিখতে লিখতে দু-এক ফোঁটা করে বৃষ্টির ছাঁট রেখার চোখে মুখে এসে লাগলো।
এ যেন মনে পড়ে সেই গান 'আজ ঝর ঝর মুখর বাদল ও দিনে….।"
রবি ঠাকুরের বর্ষাকে নিয়ে যে কত কবিতা গান আছে,তার  ঠিক নেই ।আজ বর্ষাকাল না হলেওবৃষ্টিকে নিয়েই ইচ্ছে করছে কবিতা লিখতে। কবিতা লিখে তার নামকরণ করল "অপেক্ষার বৃষ্টি হয়ে এসো রবীন্দ্রনাথ"।
কবিতাটি লিখে নিজেই পাঠ করতে শুরু করল ।এদিকে বৃষ্টির জোর আরো বেড়ে গেল। রেখা জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে জলকে স্পর্শ করল। রেখার দোপাট্টা হয়ে গেল আলুথালু, চুলগুলো কিছুটা ভিজছে শরীর-মন বৃষ্টির পরশে মেতে উঠেছে। তখন মনে হচ্ছে সেই গুরুদেবের কবিতার লাইন না' আজি এ প্রভাতে রবির কর কেমনে পশিল প্রাণের পর ।…..
না জানি কেন রে এতদিন পর জাগিয়া উঠেছে প্রাণ ,ওরে উথলি উঠেছে ,.. প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি.।"
রেখা বেশ কিছু টা  ভিজে গেল এদিকে জানলা দিয়ে জলের ঝাপটায় সেই ঘরেও কিছুটা জল প্রবেশ করল ।সেদিকে কোন খেয়ালই নেই । হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ময়ূরের মতো নাচে রে..।আজকে মনে হচ্ছে রেখা পেখম তুলে ময়ূরের মতো নাচতে ।' 
কিছুটা ঝোড়ো হাওয়ায় গাছগুলো সব ওলট-পালট শুরু হয়েছে ।চৈতিদের বাড়ির নারকেল গাছ ,সুপারি গাছগুলো দুলছে আবার ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। এই পরিবেশে স্বাভাবিকভাবেই মন প্রাণ আর বসে থাকতে চায়না। রেখার মনে হলো যে সে 40 পেরোচ্ছে কিন্তু তার মনের বয়স যেন পেরোয়নি সে যেন 18 বছরের তরুণী।
এমন সময় ফোন বেজে উঠলো।  রিং হচ্ছে।কেটে গিয়ে আবার আবার ফোন বাজছে, সেদিকে রেখার কোনো হুঁশ ই নেই।
হঠাৎই আবার চিনচিন করে ব্যথা হচ্ছে থমকে যায় তার উড়াল পাখি। কি একটা প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করেছিল রেখা নিজের ভেতরে, হঠাৎ একটা যন্ত্রনা কুরে কুরে খাচ্ছে।মাঝে মাঝে হচ্ছে এই যন্ত্রণাটা। জানলাটার থেকে সরে এসে এবার বসল রেখা ।তখন আবার ফোনটা বেজে উঠলো। রেখা কোনক্রমে ফোনটা ধরল বলল 'হ্যালো।'
"হ্যাঁ আমি সুরঞ্জন বলছি মনোজ আছে?"
"কে সুরো দা ,বলছেন ?'
'হ্যাঁ ,রেখা আমি সুরোদা বলছি।
তোমার গলাটা এরকম শোনাচ্ছে কেন?'
রেখা পুরো অস্বীকার করল" কই না তো এমনিই মনে হচ্ছে? ও তো অফিসে গেছে দাদা।"
"দেখো আমার মাথাটা গেছে আমি একদমই ভুলে গেছি। ঠিক আছে ও আসলে বলবে আমি ফোন করেছিলাম।"
"ঠিক আছে দাদা বলব।
বাড়ির সবাই ভালো আছে তো দাদা?''
ততক্ষণে সুরো ফোন কেটে দিয়েছে।
রেখা মনে মনে ভাবল আজকে সুরোদাকেএকটু অন্য রকম লাগলো ,বেশ চিন্তিত মনে হল।কিছু কি হয়েছে?
এদিকে আমার যন্ত্রণা টাও কেমন যেন আরও বাড়ছে । কিসের থেকে
 হচ্ছে ? না একটা গ্যাসের ওষুধ খেয়ে নিই।'রেখা ভাবল "রিপোর্টগুলো নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে ।ডাক্তারবাবু তো আসবেন নাম ক 'সপ্তাহ বলেছেন।"
যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে দেখে তুতু এসে পায়ের কাছে বসল ,মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো ।তারপর কেমন একটা অস্থিরতা ওর ভেতরে লক্ষ্য করা গেল ।রেখা নিজের যন্ত্রণার কথা ভুলে যাচ্ছে তুতুকে দেখে ।একটা অবলা জীব তার কত অনুভূতি ।আমার কষ্ট দেখে ওর ভেতরেও কেমন কষ্ট হচ্ছে সত্যিই যারা এদেরকে ভালোবাসে তারাই একমাত্র বুঝতে পারবে ওদের অনুভূতিগুলো ,ওদেরও ভাষা 
আছে ,ওদেরও সমানুভূতি আছে ।শুধু একটু বোঝার অপেক্ষা ।ওদেরকে একটু বুঝে ভালোবেসে কাছে ডাকলে সমস্ত কিছু অনুভব করা যায় ।মানুষের থেকে অনেক বোঝে এরা ,শুধু মানুষের ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না।এবার কিউ  কিউ আওয়াজ করছে। একবার ছুটে  ছুটে দরজার কাছে যাচ্ছে ,একবার রেখার কাছে আসছে । রেখা ভাবলো না যন্ত্রণাতে এইভাবে কাতরানো যাবে 
না ।নিজের কষ্ট হলেও ওকে বুঝতে দিলে হবে না । রেখা এবার হাসিমুখে তুতুকে ডাকছে।' কি হয়েছে মা তোমার ?তুমি এমন করছ কেন ?তুটু এসে রেখার গাল চাটতে শুরু করলো এবং দুই হাত দিয়ে রেখার কোলে মাথা রাখলো ।কি অসাধারন অনুভুতি ।ট্রেনিং দেয়া হয়নি 
 অথচ এমন সব কাণ্ড করে যেন মনে হবে ট্রেনিংপ্রাপ্ত  এরপর কেমন একটু শান্ত হলো এবার ওকে দেখে রেখার ও যন্ত্রণা যেন মনে হল একটু উপশম হল ।রেখা একটু ওই অবস্থাতেই সোফাতে শুয়ে পড়ল । তুতু ওর বুকের ওপর।
বেশ কিছুক্ষণ  চোখটা লেগে এসেছিল যখন ঘুম ভাঙলো  দেখলো বেশ বেলা হয়ে গেছে ।খাবার খাওয়া হয়নি বাচ্চাগুলোকে।খেতে দিতে 
হবে ।তুতুকে এবার।আস্তে আস্তে সরিয়ে দিয়ে রেখা ভালো করে হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ধুয়ে গেল রান্নাঘরে ওদেরকে খাবার খাওয়াবে বলে খাবার রেডি 
করতে ।বাইরে পাইলট বসে 
আছে ।আজকে কোন সাড়াশব্দ 
নেই ।শুধু বসে আছে ।দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই কেমন একটা কৌতুহল ওদের ভেতরে । রেখা খাবার দিল আর গায়ে হাত বুলাতে লাগল। খাওয়ার শেষে দরজা বন্ধ করতে যাবে ঠিক তখনই পার্থ এসে বলল 
"বৌদি ।"
রেখা পেছনে ফিরে তাকিয়ে বলল "একি তুমি এই সময়?,"
'দাদা তো অফিসে গেছে না?'
'', হ্যাঁ"
"দাদা ফিরলে অবশ্যই আমার সঙ্গে দেখা করতে বলবে বা ফোন করতে ব"লো।"
"কেন কী হয়েছে গো? এত জরুরি তলব।"
"আরে চৈতির বাবার অবস্থাটা ভালো নয় বৌদি ফোন করেছিল।"
"আমরা কি করব বল তো পার্থ? সত্যি কষ্ট হচ্ছে কিন্তু কি করার আছে। ওদের কেই ডিসিশন তো ওদের নিতে হবে ।কী করবে, না করবে ?মেয়ে জামাই আছে।"
"চিন্তার ব্যাপার। বৌদি একটা টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। বৌদিকে দেখবে চেহারাটা এই কদিনের মধ্যে কি হয়েছে?"
এ তো স্বাভাবিক। সমস্ত চিন্তাভাবনা এখন বৌদির কাঁধে।এত বড় একটা  সংসার রয়েছে। সংসার টা চলবে কি করে? সে একটা বড় চিন্তা । মেয়েটার  বাচ্চা হবে মেয়ের শ্বশুর বাড়িতেও তো সেরকম  শুনেছি ভালো নয়। মাঝে তো খুব অশান্তি হয়েছিল। হাজারো চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।"
"হ্যাঁ এবার আমরা কি করব সেটাও ভাবছি।"
"দাদার গসারি দোকানটাই এখন বৌদিকে কোনরকম চালাতে হবে আর কি করা যাবে ।।সেরকম হলে আমরা পাড়া-প্রতিবেশীরা একটু সাহায্য
 করবো। এই ছাড়া তো আর কিছু করার উপায় নেই।"
"বউদি বলছিল পুঁজিগুলো সব ভেঙ্গে দাদার চিকিৎসা হচ্ছে।
এদিকে আরো বলছিল যে কিছু ধার করে ফেলেছে।"
আমাকে চাবিটা দিয়েছে জানো তো বৌদি বলেছে ঘরদোরগুলো একটু দেখতে গিয়ে।"
"যাবে একটু দেখে আসবে।
সবাই মিলে সহযোগিতা না করলে তো হবে না পার্থ।'
ফোন করবো ভেবেছি তার মধ্যে আমার পেটে এত ব্যথা শুরু হলো না ,দিয়ে আমি মানে ওই গ্যাসের ওষুধ খেলাম তারপর একটু শুয়েছিলাম শুয়ে ওদের খেতে দিতেও দেখছো না দেরি হয়ে গেছে  এবার নীচে গিয়ে একটু ফোন করবো বৌদিকে।'
'হ্যাঁ ,তুমি একবার ফোন ক'রো মনে একটু জোর পাবে।"
"পার্থ বিপদের মধ্যে ,দুঃখের মধ্যে আমরা যদি একটু সাহায্য করতে পারি, তার পাশে থাকতে পারি থেকে আর বড় কিছু নেই ।বিপদেই তো মানুষকে চেনা যায়।"
'"একদমই ঠিক বৌদি।"
আশেপাশে তো আরও লোকজন আছে কেউ খোঁজ খবর নিচ্ছে!"
"ওদিকে তাকিয়ে লাভ নেই পার্থ পৃথিবীতে সব মানুষ সমান হয় না ।কাজ করছ তোমার কর্ম তুমি করে যাও ফল তুমি নিশ্চয়ই পাবে।  আমরা করি না কেউ হলো না তো কি হয়েছে সবার দলে আমাদের ফেললে হবে না বুঝেছ?"
"বুঝলাম ঠিক আছে বৌদি ।আসছি ,মা ওদিকে চিন্তা করবে।"
"ঘরের কাজ আছে, মাসি আসছে না। এইভেদরজা বন্ধ করবে তখনই তুতু আগে আগে ঘরে ঢুকলো।
রেখা বাসন টা রেখে ভাল করে হাত ধুয়ে নিজের খাবারটা নিয়ে বসলো।
ফোন বাজছে রেখা ফোনটা এসে  দেখলো যে বেশ কয়েকবার ফোন বেজেছে । নম্বর টা চেক করে দেখলো না এটা বড়দি ফোন করেছেন।
রেখা রিং ব্যাক করল।
ওদিক থেকে ফোনটা রিসিভ করার সঙ্গে সঙ্গে রেখা বলল " বড়দি বলুন।"
রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীর সমস্ত অ্যারেঞ্জ করে ফেলেছ রেখা ,না পারো নি ।আমার তো খুব চিন্তা হচ্ছে।"
" হ্যাঁ দিদি ,কোন টেনশান নেবেন না আমার অ্যারেঞ্জ করা হয়ে গেছে। শুধু পঞ্চমীদিকে বলে রাখা একটু আগের দিন আমি সেটা করবো রাত্রে বেলায় ফোন করবো টেবিল ক্লথ ঠাকুরের ছবি মালা ধুপ এগুলো যেন সব রেডি করে রাখে।
ঠিক আছে টেনশন মুক্ত করলে ,।আমি কেন যে টেনশন করি ?জানি না। জানি তোমার ওপর দায়িত্ব দিলে হবে ।তা হলেও এখন ফোনে পেলে কিনা সে জন্যেই ।ঠিক আছে আমি পঞ্চমীকে বলে দেবো তোমাকে ফোন করতে হবে
 না ।আর কি প্রোগ্রাম টা কখন করছো?স্কুল আওয়ার্স তো?"
" হ্যাঁ দিদি"।
"'বেস্ট অফ লাক।'
ভালো থেকো তুমি।'-বলেই বড়দি
ফোনটা কেটে দিলেন।
রেখা গান ধরল "মোর ভাবনারে কি হাওয়ায় মাতালো..।'

মমতা রায়চৌধুরী এর ধারাবাহিক উপন্যাস উপন্যাস টানাপোড়েন ১৯১





উপন্যাস 


টানাপোড়েন ১৯১

হঠাৎই খারাপ খবর

মমতা রায়চৌধুরী


১২.৫.২২ আর ফ্রেশ করে লেখা হল১৩.৫.২২ রাত্রি ৮.১০
গতকাল অনেক রাত হয়ে গেছিল তাই মেয়েদের কে ফোন করে উঠতে পারেনি আজকের দিনটাই সময় পাওয়া যাবে এর মধ্যে ফোন না করলে অ্যারেঞ্জ করা মুশকিল হয়ে যাবে তাই শেভ করার নম্বর থেকে ফোন করলে প্রথমে সোহিনীর নম্বর ডায়াল করলো, রিং হচ্ছে ফোন ধরছে না তখন রেখা মনে মনে ভাবছে সোহিনীকে যদিও বলা ছিল রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীতে যেন নাচ রেডি করে রাখে ।তাই ওকে নিয়ে অতটা চাপ নেই কিন্তু বলে তো দিতে হবে যে প্রোগ্রামটা হচ্ছে ।ভাবতে ভাবতে হঠাৎ অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে আসলো হ্যালো'
হ্যাঁ আমি ম্যাম বলছি।
 হ্যাঁ বলুন দিদি ।
"সোহিনী কে রবীন্দ্র জন্ম জয়ন্তী প্রোগ্রাম করতে হবে ।জানি ও মোটামুটি রেডি থাকে ।"
"হ্যাঁ রেডি আছে  ।"
 "কোনটা করবে সেটা কি আপনাকে পাঠাবো হোয়াটসঅ্যাপে ।"
"টেক্সট করে রাখুন, আমি পরে দেখে নেব ।ঠিক আছে তাহলে পরশুদিন প্রোগ্রাম অবশ্যই , ও যেন অবশ্যই আসে।'
"এইতো আপনার ছাত্রী কাছেই আছে কথা বলুন।"
সোহিনী তোমার মাকে যা বলার বলে দিয়েছি সেইভাবে রেডি হয়েও আর তোমার কাছে কি রাজশ্রী ফোন নম্বর আছে?থাকলে একটু ফোন করতে বলো। ঠিক আছে রাখছি। "
Ok ম্যাম।
এরপর দেবাংশীর নম্বর ডায়াল করলো।ওকে নিয়েও চাপ নেই। ও নাচে ভালো।
এরপর সোমিয়া কে ফোন করল ।আবৃত্তিও
নাচ দুটোই ভালো করে।
সোমিয়াকে ফোনে পাওয়া গেল না।
এর মধ্যেই তুতু এসে কিউ কিউ আওয়াজ শুরু করেছে। "হল কি তুতু? আমি একটা ইমপর্ট্যান্ট কাজ করছি না?"
মুখের দিকে তাকিয়ে রইল হেসে ফেলে বলল" কি হয়েছে বল ?খাবার খেয়েছো তো ।এখন কি চাই?
বাইরে যাবে চলো দরজা খুলে দিচ্ছি।"
ফোনটা রেখে দরজাটা খুলে দিল ,ছুট্টে বাইরে চলে গেল ।তখনই বুঝতে পারল ওর জোরে পটি পেয়েছে বা হিসু পেয়েছে। এবার রেখা দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে এসে আবার ফোন করতে বসলো এবার ফোন করলো রাজশ্রী কে ।রাজশ্রী কে ফোন করার সঙ্গে সঙ্গে ফোন রিসিভ করল কিন্তু না গলা শুনে মনে হচ্ছে রাজশ্রী নয় ওর মা মনে হচ্ছে। 
"হ্যালো।"
"স্কুলথেকে বলছি।"
"ও ম্যাম বলুন।'
"কেমন আছে আপনার বাচ্চারা।"
"আর বলবেন না। আজকে তো একজন সকাল থেকে পাতলা পটি করছে।,"
"ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।"
"না ফোনে পাইনি। তবে জানি তো কি ওষুধ খাওয়াতে হবে । খাইয়ে দিয়েছি।"
"আপনার বাচ্চারা কেমন আছে?"
"এখনো তো ভালোই আছে।"
"ওরা তো বলতে পারেনা তাই কিছু হলে খুব খারাপ লাগে।"
"একদমই তাই।"
আচ্ছা দেখি যে জন্য ফোন করেছি রাজশ্রী কে আগামীকাল আসতে হবে রবীন্দ্রজয়ন্তী 
আছে ।আমি জানি ও সব সময় তৈরী ই থাকে।"
"তা ঠিক ।ও মোটামুটি রেডি থাকে।"
"দিদি একটু রাজশ্রীকে ফোনটা দিন তো অনেকদিন ওর গলা শুনি নি।"
রাজশ্রীর মা তখনই গলা হাঁকিয়ে  ডাকলো রাজু ,রাজু তোমার ম্যাম তোমার সাথে কথা 
বলবেন । ম্যাম, দাও, দাও ,দাও আমাকে ফোনটা দাও।"
"হ্যাঁ ম্যাম বলুন। ভালো আছেন আপনি?"
"হ্যাঁ ভালো আছি । শোন তোকে আগামীকাল কবিতা আবৃত্তি করতে হবে।'
"হ্যাঁ ঠিক আছে ।অসুবিধা হবে না ।ম্যাম আমি যদি দুটো কবিতা আবৃত্তি করি ।"
রেখা হেসে বলল "দুটোই করবে । কোন অসুবিধা নেই।"
"ঠিক আছে, তাহলে ওই কথাই থাকলো 
কেমন ?ভালো থেকো।'
এবার মিত্রা আর স্নিগ্ধাকে ফোন 
করলো ।স্নিগ্ধাকে ফোন করার পর একবার রিং হয়ে গেল ধরল না। তারপর আবার ফোনটা 
ধরল ।রেখা খুব খুশি হল বলল স্নিগ্ধা রবীন্দ্র সংগীত তোমার কন্ঠে না শুনলে আমাদের একদমই ভালো লাগে না ।রবীন্দ্র জন্ম জয়ন্তীতে কিন্তু তুমি রেডি হয়ে আসবে।
প্রত্যেকে 11 টার মধ্যে চলে আসবে স্কুলে।।
তুমি মিত্রাকে ফোন করে বলে দিও "ও কিসে নাম দেবে, গানে ,না আবৃত্তিতে। আমার সাথে যোগাযোগ করতে বলবে।"
Ok ম্যাম।
"প্রত্যেকে এগারোটার মধ্যে স্কুলে ঢুকে যাবে। এখন স্কুল ছুটি তাতে কী হয়েছে স্কুলে আসবে।"
"Ok ম্যাম "
ফোনটা রেখে রেখা বললো" ওহ একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ সারা হল।"
রেখা ভাবছে বৃষ্টিটা একটু ধরেছে। যাক ভালোই হলো কিন্তু কই আবার বৃষ্টি শুরু হল । রেখা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল" সাড়ে নটা বাজে ।মনোজ কি আজ অফিসে যাবে না? ওর তাড়া দেখছি না তো।"
এরমধ্যে কলিং বেল বেজে উঠলো' হরেকৃষ্ণ হরেকৃষ্ণ ,কৃষ্ণ কৃষ্ণ ,হরে হরে ।হরে রাম ,হরে রাম হরে রাম ।রাম রাম হরে হরে ।"
রেখা দরজাটা খুলতেই  দেখল মনোজ কোথা থেকে  যেন হন্তদন্ত হয়ে ফিরেছে।
তারপর বললো" খাবার রেডি করেছো ?'
বলেই বাথরুমে ঢুকল।
রেখা বলল"কখন থেকে রেডি করা আছে।তুমি দেরী করছিলে  বলে ভাবছিলাম ,কি হলো?"
 তাড়াতাড়ি বাথরুম থেকে বেরিয়ে টাওয়াল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলল "একটা আর্জেন্ট কাজে গেছিলাম পরে বলব। কি বানিয়েছো এখন দাও তো তাড়াতাড়ি ।ট্রেনটা বোধহয় মিস করে যাব।" ""হ্যাঁ, তুমি বসো এক্ষুনি দিচ্ছি।"
"আজ কি বানিয়েছো ?"
"একটু চিকেন ছিল তাই দিয়ে চিকেন রেজালা করেছি আর রুটি।"
"বাহ দারুন ব্যাপার তো। কোথায় কব্জি ডুবিয়ে খাব তা না ,এখনি আমাকে ছুটতে হবে ',।
"আর দুপুরের কি মেনু করেছো?"
*কেন তুমি নিয়ে যাবে নাকি?*
"না ,না জানতে ইচ্ছে করছে।"
"তেল কই, লাউ চিংড়ি,  উচ্ছে ভাজা, আর আমের চাটনি।"
"দুপুরেরটাও তো বেশি লোভনীয় গো?'
রেখা বলল *একটু ওয়েট করো আমি তোমাকে প্যাক করে দিচ্ছি । ওখানে খেয়ে নেবে।"
"না, না। হবে না ,লেট হয়ে যাবে।"
"আরে বাবা তুমি প্যান্ট-শার্ট পরবে তো নাকি,
ততক্ষন তো আমি দিয়ে দিতে পারব ।তুমি থামো ,দেখ ,আমি  পারি কিনা?"
মনোজ উঠে গিয়ে বেসিনে হাত ধুতে ধুতে " বলল "তুমি আজকে স্কুলে যাবে না তো?"
"না, না। আবার কালকে যাব।"
টাই বাঁধতে বাঁধতে মনোজ বলল কালকে কেন?'*
"কেন আবার কি ?কালকে রবীন্দ্রজয়ন্তী না?"
মনোজ একটু জি ভ কেটে  বললো "ও বাবা, যেতে তো হবেই।"
"আমার ঘড়িটা কোথায় রেখেছো।'
"দেখো ড্রয়ারে আছে।"রেখাএঁটো বাসন তুলতে তুলতে বলল 
"কোথায় যে রাখো না?"মনোজ একটু বিরক্তির স্বরে বলল।
"দাঁড়াও যাছি।টিফিন ক্যারিব্যাগটা হাতে করে নিয়ে গেল তারপর খুঁজতে শুরু করলো। একবার দেখেই ধরতে পেরে গেল বদমাইশি বুদ্ধি।
 " এই তো ঘড়ি আর তুমি যে বলছিলে ,পাচ্ছি না।"
মনোজ রেখাকে হাতটা ধরে বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলল "পাচ্ছিলাম না তো আমি।এইতো এখন পেলাম।'
রেখা ভাবল মনোজকে সেই আবার পুরনো ফর্মে দেখতে পাচ্ছে তারপর বলল"মহাশয় এখন তোমার সময় নষ্ট হচ্ছে না ?ট্রেন মিস করবে না?"
মনোজ রেখার কপালে একটা মিষ্টি উষ্ণ চুম্বন এঁকে দিল আর বলল" এবার সারাটা দিন আমার ভালো যাবে দেখো ,বেরোছি। ভালো থেকো।"
"মনোজের এসব কথায় রেখার রক্তের ভেতর কেমন নাচন ধরে । 40 পেরোব পেরোব করছে
  সামনের মাসেই ।40 পেরোনো নারীর নাকি  সবকিছুই ধুয়ে মুছে যেতে শুরু করে জীবনটা নাকি ফিকে হয়ে যায় কিন্তু কেন এখনো এরকম কথা নেশার মত লাগে ।রেখাকে মনোজ টা টা করে চলে গেল ।রেখা তাকিয়ে রইল সত্যিই তো জীবনে কে কটা দিন বাঁচবে ?কেনই বা এত ঝগড়া ?কেনই বা এত অভিমান? থাক না ওসব দূরে সরিয়ে,নিজেদেরকে যদি নতুন করে আত্ম  অনুসন্ধান চালায় তাহলে তো একটু ভালো থাকা যায় ।রেখা আপন মনে হেসে উঠল। তুতুটা ফ্যাল ফ্যাল করে  রেখার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। রেখা বলল" ওরে দুষ্টু তুমি এতক্ষণ এইসব দেখছিলে বলেই তুতুকে কাছে টেনে নেয় একেবারে বুকের কাছে যেন দ্রুত রেখার একটা ছোট্ট বাচ্চা সত্যিই তাই ও হয়তো মানুষের বাচ্চা নয় কিন্তু রেখা এক্ষেত্রে সেভাবে দেখেনা তুতু না থাকলে জীবনটা তার কাছে তেতো হয়ে যাবে ,ভাবতেই পারে না। নুন ছাড়া ভাত যেমন লাগে ঠিক এরা না থাকলেও রেখার জীবনটা  বিস্বাদ মনে হবে।
রেখা দেখল  মাসি আজও আসলো ।না কি হলো মাসির কে জানে,,? আজকে মনোজ ফিরলে বাড়িতে একটা খবর লাগাতে হবে,। চৈতির মা বাড়ি থাকলে এ ব্যাপারে অবশ্যই হেল্প করত নিজে গিয়ে আসত ঠিকানাটা আমার কথা ভেবে ভেবে।l রেখা ভাবলো বয়স হয়েছে তো ,নাকি ছেলেটার শরীর খারাপ হলো ।যেন খারাপ কিছু নয় ভালো থাকে ।এ কথা ভেবে রেখা ভাবলো পরে আছে বাসনগুলো ।বাসনগুলো এবার মেজে  ধুয়ে পরিস্কার করবে ঠিক সেইসময় রেখার ফোন বেজে উঠলো দিবসও রজনী আমি যেন কার আশায় আশায়…। রেখা বললো আর কারোর আশা করতে হবে না ।আমি যাচ্ছি ফোনটা রিসিভ করে বলল '"
" হ্যাঁ হ্যালো কে ?"
আমি শুভ্রা বলছি রেখা দি ।'
"হ্যাঁ বল বলছি।
" অনিন্দিতার কিছু খবর শুনেছো ?"
অনিন্দিতার !না আমি কি করে জানব কেউ তো কিছু বলেনি 
" বলছি ও তো ব্যাঙ্গালোরে আছে ।কেন কি হয়েছে ?
ওর নাকি বায়োপ্সি রিপোর্টএকটা খারাপ বেরিয়েছে।
 "সে কি কথা! ভগবান সবকিছু ঠিক করে দেবেন। তারপর ব্স্কটব্রাইটে সাবান লাগিয়ে বাসন মাজতে থাকে।

মমতা রায়চৌধুরী এর ধারাবাহিক উপন্যাস উপন্যাস টানাপোড়েন ১

LOVE

মমতা রায়চৌধুরী এর ধারাবাহিক উপন্যাস উপন্যাস টানাপোড়েন ১৯০

LOVE

মমতা রায়চৌধুরী এর ধারাবাহিক উপন্যাস উপন্যাস টানাপোড়েন ১৯০

LOVE

২২ জুলাই ২০২২

কবি মাসুদ করিম এর কবিতা "প্রতিক্ষায়"





প্রতিক্ষায়

মাসুদ করিম


পথ পানে চেয়ে রই তোমারি 
প্রতিক্ষায় ঠাই দাঁড়িয়ে আসবে 
কখন তুমি মোর দারে,
হৃদয় উতাল চঞ্চল আঁখি মেলে 
দেখবো বলে তোমার ধুলায় 
মাখা দুটি চরন।
দিন যায় মাস যায় হয়নি শেষ 
প্রতিক্ষার প্রহর আজো তোমারি 
পথ পানে চেয়ে,
হৃদয় ভরে উঠে চাপা কান্নায় 
অশ্রু ঝরে দু নয়নে অবিরত 
তোমার স্বরনে।
আসো প্রিয় তুমি মোর দারে 
দেখিবো তোমায় নয়ন ভরে 
জুড়াবো হৃদয় খানি,
কত রাত গেলো নিদ্রাহীন ভাবনার 
ভেলায় ভাসিয়ে অন্তর সে তো 
শুধু আমি জানি।
এসো মোর প্রিয় দেখিতে তোমায় 
এক পলক হয়েছি আজ তোমারি 
দর্শন পিয়াসী,
কি যাতনা অন্তরে তোমারে 
দেখিবার তরে ওগো মোর 
হৃদয়ে আসীন প্রিয়তম।

কবি জাবেদ আহমেদ এর কবিতা মন খারাপ 




মন খারাপ 

জাবেদ আহমেদ 


আসে যদি
ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি। 

উদাসদিন
মেঘে মেঘে
কালো আকাশ।
বাঁচার নাই উচ্ছ্বাস 
জীবনজুড়ে দুষিত বাতাস।

পথে পথে রাজপথে
পাড়ায় মহল্লাতে
এক ভয়ংকর দুঃচিন্তা

মন ভালো নেই
মন খারাপ।

২১ জুলাই ২০২২

মমতা রায়চৌধুরী এর ধারাবাহিক উপন্যাস উপন্যাস টানাপোড়েন ১৯০





উপন্যাস 

টানাপোড়েন ১৯০

দুর্যোগ

মমতা রায়চৌধুরী



আবহাওয়া দপ্তর জানিয়ে দিয়েছিল যে কদিন টানা ঝড় বৃষ্টি হবে। এটা মাথায় ছিলো না রেখার। বাড়িতে ফিরতে পেরেছে এটাই যথেষ্ট। ভিজে একসার হয়ে গেছিল রেখা। ফিরে এসে মনোজের হাতে চা-টা খেয়ে অনেক ফ্রেশ লাগছে। সত্যি জাদু আছে মনোজের হতে। আগে তো প্রায়শই মনোজ সুন্দর চা টা বানাত। আজকাল সেটা হয় না। তবে আজকে সন্ধ্যের চা নয়, রাত হয়েছে। তো ফিরে এসে যেন মনটা বলে" চা চাই এখন আর কিছু না চাই ।"
চা খেতে খেতে  মনোজ বলল "কেমন হলো আজকে তোমাদের জাজমেন্টের কর্মশালা।"
"জাজমেন্টের কর্মশালা কি বলছো তুমি?"
"ওই হলো ।গেছিলে তো বিচারকের ভূমিকা নিয়ে তাই বললাম আর কি।"
রেখা হেসে বললো "আর বোলো না ,হলো একরকম।"
"তোমার অফিস কেমন চললো,?'
"একেবারে ঝাক্কাস।"
"সে তোমার মুড দেখেই বোঝা যাচ্ছে।"
"বাবা ,তুমি আবার কবে থেকে অ্যাস্ট্রোলাইজার হলে বলো তো?"
এটা ভেরি সিম্পল এর জন্য অ্যাস্ট্রোলাইজার  হওয়ার দরকার নেই।'
মনোজ হাসতে হাসতে বলল " ও তাই'।
", হ্যাঁ তাই। সেজন্য একটা ফোন করে জানাতে পারো নি "
"কাজের চাপ ছিল প্রচুর সেজন্য পারিনি বললাম তো তোমাকে।"
"সে যাক ছাড়ো ওসব।
হ্যাঁগো চৈতির বাবার কোন খবর পেলে?"
"কাল অবধি  পার্থ যা  জানিয়েছিল।"
"তুমি একবার খবর নিতে পারতে?"
"সে  হয় তো পারতাম ,সময় পেলাম কই বলো আজকে তো সারাদিন অফিসেই কেটে গেল।"
তুমি একদিন ও ফোন করেছিলে?"
"না।"
সে কি ভেরি ব্যাড। তোমার একদিন ফোন করা উচিত ছিল। দুর্যোগ দুর্দিনে মানুষের পাশে থাকা উচিত।
"তাহলে এখনি ট্রাই করি।কি বলো?"
মনোজ ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো।
রেখা ফোন করল রিং হচ্ছে। কিন্তু ধরছে না।
ধরছে না গো ফোনটা। কে জানে কি 
করছে ?খাবার-দাবার খেতে গেছে কিনা আবার ফোন করো।'
রেখা আবার ফোন করল। এবার ফোন ধরল বলল 'হ্যালো।'
"হ্যাঁ আমি রেখা বলছি দিদি।'
"হ্যাঁ দিদি বলুন।'
'দাদা এখন কেমন আছেন?'
"ওই আছেন ফিজিওথেরাপিস্ট এসে দেখে গেছেন ।একটা সাইট তো পড়ে গেছে।'
"না মানে ,কিছু ইমপ্রুভ বুঝতে পারছ না?"
"সেটা বলবো না  তা তো একটু কিছু উন্নতি
 হয়েছেই।কতদিনে ঠিকঠাক করতে পারব দিদি জানি না। সংসারের পুরো চাপটা এখন আমার উপর ।কি করে, কি করবো,? বুঝতে পারছিনা।"
"অত ঘাবরাবে না সব ঠিক হয়ে যাবে।"
চৈতির মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল" হ্যাঁ ঠিক হবে ।আগের মত তো আর হবে না। 
 আর কাজ করতে পারবে?'
"আগে মানুষ টা একটু স্টেবল হোক তারপরও এসব নিয়ে ভাবা যাবে দিদি।"
'আজকে বাড়িতে গেছিলাম ।আপনাকে দেখতে পেলাম না।'
"আজকে বাড়িতে এসেছিলে ।আজকেই ভাবছিলাম তোমার ওই ছাদটার দিকে তাকিয়ে।"
"হ্যাঁ ঝড়ে আমার গাছগুলোকে ভেঙে দিয়েছে।
বাড়ি গিয়ে একটু ,গুছিয়ে  নিলাম। যা ঘরবাড়ির অবস্থা হয়ে আছে।"
"হ্যাঁ ,আমি বাড়ি ছিলাম না  আমাকে স্কুলের কাজে যেতে হয়েছিল এই তো ফিরেছি বেশ খানিকটা রাত হয়েছে।ভাবলাম ফোন করা হয় না একটু ফোন করে নিই।"
"ভালো লাগলো দিদি কাছের মানুষ জন খোঁজখবর নিলে ভালো লাগে।"
"না সে তো দিদি ঠিকই ,।আমার অনেক আগেই কথা বলা উচিত ছিল কিন্তু আমি ও না নানা কাজে পেরে উঠি নি আর সবথেকে বড় ব্যাপার যেহেতু খবরা খবর গুলো পার্থ আর আপনাদের দাদার কাছ থেকে পেয়েছি। সেই জন্য অতটা গুরুত্ব দিইনি।"
"ঠিক আছে সবারই তো সংসারের কাজকর্ম থাকে তবে দাদা আর পার্থ যেভাবে আমাকে সাহায্য করেছে জীবনেও ভুলব না।"
"না, না ওরকম কেন বলছ। পাশাপাশি থাকি মানুষ হিসেবে তো মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত এটাই আমরা জানি।"
আসলে সবার ভেতরে তো সি মানবিক বোধ থাকে না তাই বলা। দেখছি তো নিজের আত্মীয়-স্বজন অতোটা খোঁজ খবর নিচ্ছে বিপদে পড়লে লোক চেনা যায় দিদি আমি হাড়েহাড়ে বুঝতে পারছি।"
" ঠিক আছে দিদি মন খারাপ করো না সব মানুষ তো একরকম হয় না।"
"তবুও আমরা প্রত্যাশায় থাকি,।"
"ঠিক আছে দিদি রাখছি ।পরে আবার জেনে নেবো ফোন করে।"
"ঠিক আছে দিদি রাখুন।"
ফোনটা রাখার পর চৈতির মার মনে হলো এই
আজকের মেঘাচ্ছন্ন বৃষ্টি হয়ে বৃষ্টিহত থেমে যাবেন আবার আলো চারিদিক আলোকিত হবে অন্ধকার কেটে যাবে কিন্তু চৈতির মার জীবনাকাশে যে মেঘ ঘনিয়ে এসেছে ,আঁধার নেমে এসেছে এ যেন দুর্যোগের ঘনঘটা। এ কবে কাটবে কে জানে? ""একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চৈতির বাবার কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলাতে লাগল ।
এদিকে রেখা জিজ্ঞেস করলো "রাত্রে কি খাবে গো?"
"কি খাব বলো তো ?অফিসে আজকের লাঞ্চ হেভি হয়েছে। রাত্রে বেশি ভারী জিনিস খাবো না ওটস দিও।"
"বেশ ভালোই হলো ।রান্নার ঝামেলাটাও থাকলো না।"
"এর মধ্যে তুতু এসে কিউ কিউ করছে।"
মনোজ বললো "দেখো তু তু রানি আবার কি বলছে তোমায়?"
"কি আর বলবে খিদে পেয়েছে খাবে কটা বাজে গো? 'ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল।
১০টার বেশি বাজে।"
"ও বাবা ওইজন্যেই খিদে পেয়েছে গো। "রেখা ওকে একটু আদর করে নিয়ে বলল" দাঁড়াও আমি খাবার নিয়ে আসছি সোনা।'
রেখা রান্নাঘরের দিকে গেল তরকারিটাএকটু গরম করে নিল। তারপর ভাতগুলো ভালো করে মেখে নিল
এবার ডিস গুলো নিয়ে ওদের কাছে গেল ।
"কি গো দরজাটা খোলো তো আমার দুটো হাতই জোড়া।''
"হ্যাঁ এই দিচ্ছি একটু দাঁড়াও।
"আমি দাঁড়িয়ে আছি তুমি ওঠো।'
তুতু তো হাত দিয়ে দরজাটাকে খেলার চেষ্টা করছে। রেখা হেসে বলল ও রে খেপি দরজা খুলবে, তবে তো খুলতে  পারবি।"
মনোজ দরজাটা খুলে দিতেই তুতু তাড়াতাড়ি চলে গেল বাইরে ।এমন খোশমেজাজে গেল যেন মনে হচ্ছে মহারানী বেরোচ্ছে ।বাকি যারা ছিল ওদের সঙ্গে সেরকমই বিহেফ করছিল।
"নে আর অন্যের সঙ্গে এখন ধস্তাধস্তি করতে হবে না ,খেয়ে নাও এসো।"
প্রত্যেককে ডিস দেয়া হল সামনে। ওরা যে যার জায়গায় বসে রইল। প্রত্যেককে মাখা  ভাত 
দিল।
রেখা মনোজকে বলল 'ওরা খাক আমি ভেতরে যাচ্ছি। কালকের তরকারির সবজিগুলো কেটে নিই।
"মাসি তো আসে নি ,না হলে মাসিই কেটে রেখে দিত।"
তারপর আবার মেয়েদের কে ফোন করার বাকি আছে?'
"কাদের ফোন করবে?"
"আর বলো কেন স্কুলে রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীর জন্য মেয়ে লাগবে, গান ,নাচ ,কবিতা আবৃত্তির।তাদের সাথে যোগাযোগ করতে হবে তো?"
"এত রাত্রে আবার ওদের এখন ফোন খোলা থাকবে?"
"দেখবো চেষ্টা করে সময়ও বেশি 
নেই ।পরশুদিন।"
"ঠিক আছে আমি ভেতরে যাচ্ছি ।খাওয়া হলে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে এসো।"
মনোজ বললো "হুম।"
রেখা চটপট ওদের থালাটা মেজে ধুয়ে নিল।
তারপর ফ্রিজটা খুলে দেখলো কি কি সবজি আছে।
"হ্যাঁ রুই মাছ আছে, চিংড়ি মাছ আছে।
রুই মাছটা সজনে ডাটা ,আলু ,বেগুন বড়ি দিয়ে ঝোল করে দেবে আর লাউ আছে ,লাউ চিংড়ি করে দেবে। অবশ্য পটল ও আছে  তাহলে কি পটল চিংড়ি করবে ?না এ ব্যাপারে মনোজ কে জিজ্ঞেস করতে হবে  কোনটা খাবে? নোটে শাক আছে নোটে শাক ভাজা করে দেবে পেঁয়াজ দিয়ে। আর সকালের জলখাবার এর জন্য কি করা যায় কি করা যায়? এইতোভেন্ডি আছে। তাহলে কালকে সকালে জল খাবার পরোটা আর  ভেন্ডি ভাজা করে দেবে।
সবজি গুলো নিয়ে রেখা চলে আসলো বারান্দাতে।
এরমধ্যে মনোজ কলাপসিবল গেট লাগাচ্ছে তখন রেখা বলল" হ্যাঁ গো লাউ চিংড়ি খাবে,না পটল চিংড়ি খাবে?"
"যা হোক একটা করো না আমার দুটোই প্রিয়।'
Ok"
হ্যাঁ গো তুতু কোথায়?"
"কেন ভেতরে আসেনি?"
"খেয়াল করি নি ।দেখ তো ঘরে ঢুকেছে কিনা?'
"না তো  ঘরে নেই ।'
"এ বাবা তাহলে পটি করতে গেছে। তুমি তার মধ্যেই গেট লাগিয়ে দিলে।"
'খেয়াল করিনি গো ।ঠিক আছে দাঁড়াও । খুলে দিচ্ছি।"
"বাবা ও কি বৃষ্টি পড়ার আওয়াজ হচ্ছে নাকি গো?'
"তাইতো মনে হচ্ছে দেখি তো?"
"জোরে বৃষ্টি নামবে মনে হচ্ছে।'
"ধরে গেছিল দেখো কী কান্ড।"
"আজকে শাটারটা খুলে রেখো নইলে ওরা থাকবে কোথায় বলো? ভিজে যাবে।"
"ঠিক আছে খুলে রাখবো।"
এমন সময় ফোন মনোজের ফোন বেজে উঠলো।
রেখা লাউ এর চোকলা ছাড়াতে ছাড়াতে বলল"হ্যাঁগো তোমার ফোন বাজছে?"
মনোজ বাইরে থেকে আওয়াজ দিল বাজুক গে
রেখা আর  কিছু না বলে আপন-মনে লাউ কাটতে লাগল তারপর ভাবতে  লাগলোলাউ এর চোকলাগুলো ভাজা করে নিলেও হয়।
আবার ফোন বাজছে।
রেখা বললো 'দেখো তোমার কিন্তু আবারও ফোন বাজছে ,.কোন আর্জেন্ট কল কিনা,?'
মনোজ কলাপসিবল গেট দিয়ে ঢুকে পরল তুতু তো খানিকটা রেখার কাছে এসে লেজ নাড়াতে লাগল 
রেখা বলল "কী চলে এসেছ? যাও যাও যাও ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ো।'
তারপর  তুতু নিজের ঘরে চলে গেল।'
মনোজ বললো "কে  ফোন করছে দেখি তো"।
*ও বাবা ,চৈতির মা ফোন করেছে গো। আবার কী হলো কে জানে?""
মনোজ ঘুরিয়ে ফোন করলো রিং হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধরল হ্যালো.

হ্যাঁ বৌদি বলুন আসলে সঠিক সময়ে ধরতে পারিনি ফোনটা আমার বাচ্চাগুলো কে খেতে দিচ্ছিলাম।
চৈতির মা বলল ,l,আসলে পার্থর ফোনটা পাচ্ছি না তো তাই ?
" হ্যাঁ কি হয়েছে বলুন?"
আসলে পার্থর কাছে একটা চাবি আছে আমাদের বাড়ির কালকে গিয়ে একটু শুধু দেখা যে আমি জানলাগুলো লাগিয়ে দিয়েছি কিনা? নয়তো জল এসে ঘর  ভেসে যাবে।"
"ও আচ্ছা ,আচ্ছা ।এখন তো অনেক রাত হয়ে গেছে।"
"ঠিক আছে তাই বলব ।"
ফোনটা কেটে দিল।
রেখা সবজিগুলো কেটে আবার ফ্রিজে ঢুকিয়ে দিল।তারপর দুধ গরম করে ওটসে  মিশিয়ে উপর থেকে কিছু ফ্রুটস মিলিয়ে দিল।।।
তারপর রেখা মনোজকে জিজ্ঞেস করল 'তোমাকে কি খাবার দেবো?"
"হ্যাঁ দিও একটু পরে।'
"আবার এর ও পরে সাড়ে 10 টা তো বাজলো।'
হ্যাঁ হ্যাঁ দাও।"
রোজ খাওয়া নিয়ে বিরক্ত লেগে যায় রেখার একটু বিরক্তির স্বরে বলল সারাদিন তো আমিও বসে থাকি না বলো?'

সিগমা আউয়াল এর গল্প " মেঘের কোলে পাহাড়" পর্ব ১





মেঘের কোলে পাহাড়  পর্ব (১


সিগমা আউয়াল 


        পাহাড়ের মুখে মেঘ জমে থাকে ।বেশ খানিকটা উপরে দিকে । যত উপরের দিকে ওঠা যায় ততো তুলোতুলো মেঘগুলো জমাট বেঁধে  ভাসতে থাকে ।অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকে মীলা ।মনে হচ্ছে মেঘের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে । আঁকাবাঁকা পাহাড়ী রাস্তা ধরে উপরে দিকে গাড়ি উঠছে । নীচের দিকে তাকালে সবুজের সমারোহ  । মেঘ গুলো মাঝে মধ্যে ভাসতে ভাসতে আটকে যাচ্ছে  গাছের সাথে । 
   এক পশলা বৃষ্টি হয় সেখানে, অথচ নীচে  কোন বৃষ্টি নেই । মেঘ - বৃষ্টির এই অদ্ভূত খেলা দেখে মীলা রোমাঞ্জিত হয়। পাশে  পাহাড়ের গায় বেয়ে কোথাও কোথাও ঝর্ণা নামছে । খাঁশিয়া বউ - মেয়েরা পানি নিচ্ছে দৈনন্দিন কাজে ।  পাথর ভাঙা সিড়ির মতো  জায়গায় কাপড় ধুচ্ছে । শোঁশো  শব্দ বেশ কিছুক্ষণ আগে থেকেই  পাচ্ছিলো মীলারা । কাছে আসতে দেখে বেশ বড় ঝর্ণা । ভালোলাগার অনুভূতিটা  দ্বিগুন হলো ।  দু/ তিন মাইল পার হবার পর সামনে একটা বাজার পড়ে ।  ডাঁওকি  বাজার । 

     পুরুষ বিক্রেতা থেকে মহিলা  বিক্রেতা সংখ্যা  বেশির ।  নানা রকম পাথরের  গহনা ,মশলা , চাল ডাল সবই পাওয়া যাচ্ছে ,অনেকটা হাটের মতো । পাহাড়ি মোরগ  - মুরগী । সব চেয়ে যেটা মজার সেটা হচ্ছে কোন সমান্তরাল জায়গায় না । পাহাড়ের খাঁজে বা পাথরের  স্তরেস্তরে  হাট  । মীলা  বাচ্চাদের হাত ধরে ওঠে । বাজারে ওরা সবাই একটা  চায়ের দোকানে বসে । শিলংএর  খাস চায়ের পাতার চা খায় ।ভারি সুন্দর তার সুবাস । অল্প স্বল্প কিছু  সৌখিন জিনিস পত্র কিনে নিয়ে আবার ওরা গাড়িতে ওঠে । সন্ধ্যার নামার  আগেই  পৌঁছতে হবে । এরকম চড়াই- উতড়াই পথে রাত হওয়া ঠিক না । সেপ্টেম্বরের শেষ এখনো কি বর্ষাকাল ?  
      নানা ধরনে জীব জন্তুর গল্প শুরু করে দিলেন কবীর সাহেব (মীলার স্বামী )। বেশ খানিকটা মন:ক্ষুন হয়ে বললেন -- যাতায়াতের  আরো বেটার সুযোগ সুবিধা থাকতে তোমার হঠাৎ বাই রোড়ের আসার ইচ্ছে হলে কেন বুঝলাম না ।এরকম বিপদজনক রাস্তায় কেউ শখ করে আসে ? তাও বর্ষা এখনো শেষ হয়নি । 
--- বারে বর্ষা কিছুটা আছে বলেই না এখন এলাম । পাহাড়ি  ঝর্ণা , প্রকৃতির আসল সৌন্দর্য তো এই সময় দেখতে হয় ।কি সুন্দর সবুজ চারিদিকে দেখো মন দিয়ে দেখো, তোমারও ভালো লাগবে । বাচ্চারা হৈচৈ করে যাচ্ছে । কবীর জার্নালে মুখ গুঁজে আছে ।মাঝে মধ্যে ড্রাইভারের  সঙ্গে  কথা বলছে । চোখ দিয়ে রাস্তা নিরিখ করছে । গম্ভীর থমেথমে মুখ । প্লেনে আসলে ভালো হতো বার বার একই কথা বলে এখন ক্লান্ত ।

কবি রাজ রিডার এর কবিতা "এত লাশ কোথায় গেল?"





এত লাশ কোথায় গেল?

রাজ রিডার


এত লাশ কোথায় গেল?
আমাদের ত্রিশ লক্ষের বেশি লাশ কোথায় গেল?
মায়ের পেটেই যে শিশুটি থেকে গেল সে কোথায়?
যাদের পরিচয়পত্র ছিল না তাদের লাশ কোথায়?

পানিতে ভাসছিল যে লাশ...মিশে গেল পানিতে পানিতে
মাটিতে পুঁতে দিল যে লাশ...মিশে গেল মাটিতে মাটিতে
আগুনে পুড়ে গেল যে লাশ...ছাই হয়ে উড়ে গেল বাতাসে বাতাসে 
যে লাশের কিছুই হলো না...পড়ে রইলো
চলে গেল শুকুনের পেটে পেটে
এমন লাশের হিসাব কে দিতে পারে?

আমার কাছে লাশেদের হিসাব নাই...আছে মানুষের খোঁজ
আমার কাছে মাথার খুলির হিসাব নাই...আছে মায়া-মমতার
আর এসব গণনা করবে কোন মায়ের লাল?




কান পেতে দেখো
সময়ের দেয়ালে
বোমার ঝলকানিতে
তরবারির রক্তে
ভেসে যাওয়া নদীতে
মিশে যাওয়া মাটিতে
জোয়ার আর ভাটিতে
শুনতে পাবে লাশেদের কথা
কান পেতে দেখো বাতাসে
পেয়ে যাবে খোঁজ মানুষের
পেয়ে যাবে খোঁজ লাশেদের।

লাশেরা কথা বলে না।
তুমি যে দেখেও দেখো না—তাই তুমি লাশ
তুমি যে লাশেদের কথা বলো না—তাই তুমি লাশ
লাশেদের রুহু যে তোমার শরীরে প্রবেশ করে না—তাই তুমি লাশ
আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তুমিই জিন্দা লাশ।

কবি তাহেরা আফরোজ এর কবিতা প্রেমের গান"




প্রেমের গান

তাহেরা আফরোজ


তুমি বলেছিলে, গান শোনাবে 
এমন একটি গান, যা কেবলই আমার হবে 
আমার জন্য তোমার কন্ঠ নিঃসৃত সুর 
তোমার কন্ঠে উচ্চারিত গানের প্রতিটি বাণী 
আমার জন্য 
আমার জন্য তোমার সবটুকু গাওয়া। 
তুমি শিল্পী নও
কিন্তু তোমার প্রেমের তানপুরায় যে সুর ওঠে 
তা যেন শ্রেষ্ঠ সুর হয়ে বাজে আমার ধ্যাণে 
আমার শরীরের প্রতিটি শিরা উপশিরায়
তোমার আবেশ জড়ানো কন্ঠ 
আমাকে মোহাবিষ্ট করে রাখে সমস্ত দিন 
আমি অপেক্ষায় থাকি 
তুমি বলেছিলে, গান শোনাবে 
কেবলই আমার জন্য তোমার সেই গান।