২৭ এপ্রিল ২০২২

কবি শাহীন সুলতানা এর কবিতা "কখনো সমুদ্র কখনো পাহাড়"





কখনো সমুদ্র কখনো পাহাড়
শাহীন সুলতানা 




কখনো কখনো তোমাকে জলের মতো পড়ে ফেলি... 
যেন...শান্ত, স্থির, কমনীয় শিশিরের মতো স্নিগ্ধ তুমি। 
আবার কখনো বিশাল অচলান্ত পর্বতের মতোন 
আবিষ্কার করি। জানি, পর্বত ও সমুদ্র ধারণ করে; 
তবুও সে কাঠিন্য ভেদ করে জলের সন্ধান করা
দুঃসাধ্য বটে !

হয়তো আমারই ক্ষুদ্রতা !  মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে.. 
কোনো এক জ্যোৎস্নার রাতে তোমাকে ভেঙেচুরে 
চুরমার করে একেবারে ঢুকে পড়ি বুকের গহীনে... যেখানটিতে তুমি নীল পদ্মের গাছ লাগিয়েছিলে... ওখানটাতে একটা গোলাপের চারা লাগিয়ে দিই।

কবি এম, এইচ রহমান এর কবিতা "শাব্দিক ফুল"





শাব্দিক ফুল
এম, এইচ রহমান



হঠাৎ পথের দ্বারে কুড়িয়ে পেয়েছিলাম- সেদিন,সাদা কাগজের মাঝে সাদামাটা-
হাতের লেখা কয়েক টুকরো শাব্দিক ফুল।

সযত্নে একত্রিত করে শব্দের মালা গেঁথে-
খুঁজে পাই নির্ভুল একটি বাক্যের মূল।

মৃত্যুপথযাত্রী কেউ লিখেছিলো-
এই নশ্বর ধরাধামের বুকে খুঁজে না পেয়ে- তোমায়,বেলা শেষে অনশ্বর ধরাধামেই পাড়ি জমালাম-

স্বর্গীয় উদ্যানে দাঁড়িয়ে থেকো তুমি-
হাতে নিয়ে কোন স্বর্গীয় ফুলের মুকুল"

Hffvn

LOVE

২৬ এপ্রিল ২০২২

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক পর্ব একশত তম সম্পন্ন হয়ে শেষ হল।





(কবি ও লেখক শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক পর্ব একশত তম সম্পন্ন হয়ে শেষ হল।  লেখিকাকে সম্মান জানাই স্বপ্নসিঁড়ি সাহিত্য পত্রিকার পক্ষ থেকে । আপনার আগামীদিন কুশল কামনা করি । অজস্ৰ পাঠক আপনার লেখার অনুগ্রাহী হয়ে উঠুক । 
আবারও স্বপ্নসিঁড়ি পত্রিকা আপনার লেখার আশায় রইলো । 
ভালোবাসাসহ সম্পাদক দেবব্রত সরকার ।)




শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত 
( শেষ পর্ব ) 

শামীমা আহমেদ 




শায়লাকে তার বাইকে নিয়ে শিহাব  ঝিগাতলার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেও কিছুদূর গিয়ে সে তার সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনলো। সে একটু নিজের বাসায় যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করলো। বাইকের পেছনে বসা শায়লার কাছে শিহাব আজ এক নতুন পৃথিবী হয়ে ধরা দিলো। শায়লা তার মনের ভাবনায় রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়ে রইল। সে বারবার শিহাবের পিঠের উপর আলতো করে নিজেকে ছুঁয়ে দিচ্ছিল আর ডান হাত দিয়ে বেশ শক্ত করে শিহাবকে জড়িয়ে ধরে তার সাথে বেঁধে রাখলো। শায়লার মনে হলো, যেন সে আকাশে সাদা মেঘের মত হালকা হয়ে উড়ছে। শিহাব উত্তরা থেকে  বেরুনোর আগেই সিদ্ধান্ত পালটে নিয়ে বাইক ঘুরিয়ে তার বাসার দিকে এগুলো। শায়লা অবাক হলো! শিহাবের মাথায় হেলমেট থাকায় কথা বলাও সম্ভব হচ্ছিল না। শায়লা শিহাবের কথা বলার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।বাইক শিহাবের বাসার গেটে থামতেই শায়লা বুঝতে পারলো শিহাব হয়তো কোন বিশেষ  প্রয়োজনে বাসায় এসেছে। শিহাব উচ্চরবে হর্ণ দিতেই কেয়ারটেকার বিল্লাল মেইন গেট খুলে দিলো। বিল্লাল বেশ অবাক দৃষ্টিতেই তাকিয়ে রইল। এই ভর দুপুরে তার স্যার কোথা থেকে এলো, গত রাতে যেভাবে বেরিয়ে গিয়েছিল ! সেতো ভেবেছিল কোন খারাপ খবর কিন্তু এখন দেখছে পিছনে লাল শাড়িতে একজন মহিলা আবার স্যার চকচকা নতুন পাঞ্জাবি পরা। নিশ্চয়ই কোন ঘটনা ঘটেছে।সে শিহাবের কাছ থেকে কথা শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে রইল। শিহাব বাইকের স্টার্ট থামাতেই শায়লা নেমে তার পাশে দাঁড়ালো। শিহাব বিল্লালের চোখ দেখে বেশ বুঝতে পারছে তার মনের ভেতর অনেক জিজ্ঞাসা। সে তার কৌতুহল নিবৃত্ত করতে স্পষ্ট করে  জানালো,বিল্লাল, এ হচ্ছে তোমার ম্যাডাম, মানে আমার বিয়ে করা বউ। গতকাল আমাদের বিয়ে হয়েছে। বিল্লাল হয়তো রিশতিনার সাথে মিলাতে চাইছে কিন্তু তার খটকা লাগছে। তার কাছে এবার বিষয়টি পরিষ্কার হলো। তাহলে এই ম্যাডামের  জন্যই বিদেশী ম্যাডামকে স্যার ফিরায়া দিছে। বিল্লাল দুয়ে দুয়ে চার মিলে যাওয়াতে এবার শান্ত হলো। সে শায়লাকে সালাম দিয়ে তার হাতে শিহাবের ফ্ল্যাটের চাবি দিয়ে বললো,তাইলে এখন থাইকা এই চাবি আপনার কাছেই থাকবো নয়া ম্যাডাম।শায়লাকে সে লিফটের দিকে এগিয়ে নিলো। শিহাবও এগিয়ে গেলো। বিল্লাল আশ্চর্যান্বিত হয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ওরা দুজনে লিফটে উঠে, শিহাব বাটন চার'এ প্রেস করলো।দুজনে খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো। শিহাব শায়লাকে হাতের বাঁধনে জড়িয়ে নিলো।লিফটের ভেতরের আয়নায় দুজন দুজনকে দেখছিল। শায়লা শিহাবের কাঁধে মাথা রাখলো।  শিহাবের মুখে হাসির ঝিলিক ভেসে উঠলো!  সে শায়লাকে মৃদু টানে আরো শক্ত করে বেঁধে নিলো। এবার দুজনে হাতের বাঁধনে দুজনকে স্পর্শ করে নিলো। কিছুটা ক্ষণের এই স্পর্শ  যেন আরো গভীরের বন্ধনে বেঁধে নিলো। কত পাওয়া না পাওয়ার দ্বিধা দ্বন্দ্বের  আজ অবসান হলো।দুজনে দুজনকে নিবিড় ভাবে জড়িয়ে নিলো। চার তলায় লিফট থামতেই দুজন বেরিয়ে  এলো। শিহাব শায়লাকে ইশারায়  তার  নিজের হাতে ঘরের চাবি দিয়ে শিহাবের ফ্ল্যাটের দরজার তালা খোলার জন্য বুঝালো। শায়লা ভেতরে এক  অভাবনীয়  আনন্দে শিহাবের বুকে মুখ লুকালো। শিহাব শায়লার  মুখ তুলে চোখের ভাষায়  এই ঘরের অধিকার বুঝিয়ে দিলো। শায়লা চাবি  দিয়ে লক খুলতে লাগলো। শিহাব বিষয়টি খুব আনন্দ নিয়ে দেখছিল।শায়লা আজ তার নিজের হাতে ফ্ল্যাটের তালা খুলছে! শিহাবের কাছে তা যেন এক অনন্য প্রাপ্তি। কোনদিন এই ব্যাপারটি  আসলেই সত্য হবে শিহাব তা কল্পনাও  করতে পারেনি, তা শুধু স্বপ্নই দেখেছে। শায়লা দরজা খুলে শিহাবকে ভেতরে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানাতেই শিহাব  মুখে হাসি ছড়িয়ে নিজের ঘরে প্রবেশ করলো। অনেক দিনের চেনা ঘরে আজ তার অন্যরূপে প্রবেশ ! আজ আর  ঘরে সে  একাকী  নয়।আজ সাথে শায়লা আছে। আর সে  আজীবনের জন্য থাকবে। শিহাব ঘরে ঢুকতেই শায়লা দরজা লাগিয়ে ফিরলো। শিহাব ড্রইংরুম পেরিয়ে বেড রুমে ঢুকে শায়লাকে ভেতরে ডাকলো। শায়লা শিহাবের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো, শিহাব শায়লার দিকে তাকিয়ে বললো, শায়লা তুমি জানোনা গতকাল সন্ধ্যা থেকে রাত অব্দি কি এক অনিশ্চয়তার মধ্যে কেটেছে। সব শেষে  তোমাকে পাওয়া আমার জীবনের সব দুঃখকে ভুলিয়ে দিয়েছে। আমি তোমাকে পেয়ে ভীষণ সুখী হতে চাই,ভীষণ। আমাদের বাকি জীবনে থাকবে শুধু হাসি আনন্দের ছড়াছড়ি। আমাদের মাঝে থাকবে না কোন দুঃখবোধ আর ভুল বুঝাবুঝি। শায়লা শিহাবকে আশ্বস্ত করলো,তুমি নিশ্চিন্ত থাকো শিহাব, আমি তোমার বাকী জীবন সুখ আর ভালোবাসার রঙে রাঙিয়ে দিবো। শিহাব শায়লাকে কাছে টেনে নিতেই শায়লা বলে উঠলো, তবে আরেকটা খুবই জরুরি কথা ভুলে গেলে চলবে না শিহাব। শিহাবের চোখে জিজ্ঞাস্য ভেসে উঠলো! জরুরি  কি কথা ? আমার কোন ভুল হলো ? শায়লা এবার শিহাবের দিকে রাগত চোখে তাকালো।
কেন ? আরাফের কথা। আরাফকে আমাদের কাছে নিয়ে আসতে হবে। সে কথা ভুলে গেলে ? 
শিহাব একেবারে থমকে গেলো। আরাফের প্রতি বরাবরই শায়লার এমন মায়াভরা ভালোবাসা শিহাবকে অনেকটাই নিশ্চিন্ত করে। শায়লা আবার বলে উঠলো, জানো শিহাব, আরাফকে আমার ভীষণ কাছে পেতে ইচ্ছে করে।কেমন মায়াকাড়া মুখটা ! আরাফের কথায় শিহাবের ভেতরে চঞ্চলতা খেলে গেলো। সে শায়লাকে বললো, আরে নাহ,তা ভুলবো কেন ? তাহলে চলো,আজই আরাফকে নিয়ে আসি। শায়লা মাথা ঝুঁকিয়ে তাতে সায় দিলো। কিন্তু আরাফের জন্য কিছু কেনাকাটা করতে হবে। আরাফের জন্য আমি নিজে হাতে ঘর সাজাবো। শায়লার কথায় শিহাবের ভেতরে শায়লার প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ অনুভুত হলো।
তবে এখন একটা আব্দার আছে !  
শায়লা চমকে উঠলো !  এখন আবার কি আবদার ? শিহাবের চোখের দৃষ্টিতে দুষ্টুমির আভাস। এবার শায়লা নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইছে। শিহাব তাকে বেশ শক্ত করে ধরে বললো,আরে, অন্য কি ভাবছো তুমি! এখন ওসব কিছু চাই না, সেটা আজ রাতের জন্য তোলা থাকবে। আমার নিজের ঘরে তোমার আমার প্রথম বাসর, সেটা কি এমন বর্ণহীন হবে। সেটার জন্য অন্যরকম প্রস্তুতি নিতে হবে। এখন আপাতত আমি তোমার হাতের ছোঁয়ায় এক কাপ চায়ের স্বাদ নিতে চাইছি। আর বাকীটা তোলা থাকবে রাতের জন্য।
উহ ! এই কথা ! শায়লা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। তক্ষুনি তার মনের অর্ধেক অংশ রান্নাঘরের দিকে ছুটে গেলো। মেয়েরা বোধহয় এমনি হয়।স্বামীর কোন চাওয়া পুরণ করতে এক নিমেষে জাদু করে তা হাজির করতে চায়।
শায়লা রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলো। দরজায় কলিংবেল বেজে উঠলো।  শিহাব উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো।
দরজায় কেয়ারটেকার দারোয়ান দাঁড়িয়ে হাতে একটা পোস্টাল প্যাকেট। শিহাবকে দেখিয়ে বললো, স্যার এইমাত্র এইটা আসলো।আপনি বাসায় আছেন তাই নিয়া আসলাম। শিহাব প্যাকেটটি গ্রহন করলেও  বিল্লালের কাচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে থাকায় শিহাব  তার হাতে একটা একশত টাকার নোট  দিলো। কিছু কিনে খেয়ো, বলতেই বিল্লালের মুখে বিশাল এক হাসি খেলে গেলো ! তবে শিহাব বেশ চিন্তিত মুখে প্যাকেটটি হাতে নিয়ে উলটে পালটে দেখতে লাগলো। দ্রুতই তা খুলে ফেললো। ভেতরের  কাগজ খুলতেই শিহাব ভীষণ চমকে উঠলো !  
রিশতিনা শিহাবকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়েছে।এবং লিখেছে খুবই আরজেন্ট ! তবে কি গতরাতে রোমেলের কলের কথাগুলো সত্য ছিলো।রিশতিনা ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে তারপর সুইসাইড  করেছে ? যদিও শিহাবও এমনটিই ভাবছিলো। কাল পরশুর মধ্যেই রিশতিনাকে ডিভোর্স দেয়ার প্রসেস শুরু করবে। ভালোই  হলো রিশতিনাই  তা করে দিলো। হঠাৎই  প্যাকেট টি থেকে একটা পোস্টাল কার্ড বেরিয়ে এলো। শিহাব দেখলো সেখানে টেমস নদীও নদী তীরের সুন্দর প্রকৃতির দৃশ্য।  শিহাব  অপরদিকে তা উল্টাতেই রিশতিনার বাংলা হাতের লেখায় কিছু লেখা দেখতে পেলো। শিহাব ড্রইং রুমের সোফায়  বসলো। কার্ডটি হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলো, কার্ডটিতে আজ থেকে পাঁচদিন আগের তারিখ দেয়া। তবে কি শায়লা এখনো দেশে ? এখানে থেকে ডিভোর্স প্রক্রিয়া চালাচ্ছে ! সম্ভবত রোমেল তাকে সব্রকম সহায়তা করছে। শিহাব কার্ডটি পড়তে লাগলো, শিহাব,তোমাদের নতুন জীবনের জন্য অভিনন্দন জানাই।তুমি তোমার মনের মত কাউকে খুঁজে পেয়ে তাকে জীবন সঙ্গী করতে যাচ্ছো এতে আমি যত কষ্টই পাইনা কেনো তবুও আমি আনন্দিত। তোমাকে আমি সুখী করতে পারিনি কিন্তু অন্য কারো মাঝে তুমি সুখ খুঁজে পেয়েছো, এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া। শুধু অনুরোধ আমার সন্তান, আমার রিয়াজকে তোমরা বাবামায়ের পূর্ণ স্নেহ দিয়ে বড় করবে। আমি দূর থেকে এতেই পূর্ণ হবো।
ডিভোর্স পেপারে দ্রুতই সাইন করে দিও। এরপর আমার ভিন্ন জীবনের শুরু,আর তা হতে পারে নতুন অন্য কারো সাথে অথবা অনন্ত জীবনে মহাকালের দিকে। তোমরা ভালো থেকো।রিশতিনা।
শিহাব বেশ কয়েকবার লেখাগুলো পড়লো।রিশতিনার জন্য মনটা কেঁদে উঠলো। তবে সে নিরুপায়।আর পিছনে গিরতে চায় না সে।তবে হ্যাঁ,রিশতিনার রিয়াজ,শিহাবের আরাফ আজ শায়লার সবচেয়ে আগ্রহের একজন। সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারি। শিহাব কার্ডটি প্যাকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে বেড রুমে চলে এলো। সে ওয়ারড্রোবের উপরে তা রেখে বারান্দায় গিয়ে বসলো। শিহাব গভীর ভাবনায় রিশতিনার অতীত স্মৃতিতে হারিয়ে গেলো। 
শিহাবের রান্নাঘরের বিশাল জানালাটি শায়লার ভীষণ পছন্দের। সেদিকে তাকিয়ে আকাশে মেঘের ওড়াওড়ি দেখতে দেখতে শায়লা উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।শায়লার তার মায়ের কথা খুব মনে পড়তে লাগলো। শায়লার চোখ অজান্তেই জলে ভরে উঠলো। 
সে ভাবলো, কল করে মায়ের সাথে  কথা বলবে।নিশ্চয়ই তার জন্য খুব  কান্নাকাটি করছে। শায়লা নিজেকে সামলে নিলো।সে   চা বানানোর জন্য  চুলার দিকে এগিয়ে গেলো।কেটলিতে চায়ের পানি বসিয়ে ট্রেতে দুটো চায়ের কাপ সাজয়ে নিলো। ফুটন্ত পানিতে সামান্য  চিনি দিয়ে শায়লা টিব্যাগ পাশেই দেখতে পেলো। দুই কাপে দুটো টি ব্যাগ রেখে শায়লা গুড়া দুধের খোঁজে কিচেন ক্যাবিনেট খুলতেই তা সামনেই পেয়ে গেলো। শায়লা  তা নামিয়ে নিয়ে একটা চায়ের চামচ হাতে নিলো।  ফুতন্ত পানি টিব্যাগের কাপে ঢেলে নিয়ে শায়লা গুড়া দুধের কৌটা খুলতেই বেশ চমকে গেলো !  একটা গোলাপী রঙের কাগজ সেখানে ভাজ করে রাখা। শায়লা ভীষণ অবাক হলো ! সে কাগজটি দ্রুতই বের করে ভাঁজ খুলে নিলো। ভেতরে বেশ সুন্দর হাতের লেখায় একটা চিরকুট!  এবং তা শায়লাকে সম্বোধন করেই লেখা ! শায়লার চোখ বিস্ময়ে বিস্ফারিত হলো। সে গোগ্রাসে লেখাটি
পড়তে লাগলো। শায়লা, আমি রিশতিনা। লেখাটি পেয়ে হয়তো অবাক হচ্ছেন।এখানে এইভাবে পেয়ে। আপনাকে পেতে আমি আর কোন পথ খুঁজে পেলাম না।তাই এভাবে। আর শিহাবে চা খুব পছন্দের, আমি জানি, আপনাকে যখন চা বানাতে বলবে তখন এটা দেখতে পাবেন। সেদিন  জিগাতলার বাসায় আপনার উপস্থিতি আমি বুঝতে পেরেছি আর রোমেল ভাইয়ার কাছ থেকে আপনার নামটি জেনেছি। আপনাকে পেয়ে শিহাবের মন থেকে আমার নামটা মুছে গেছে,সে আমাকে ভুলে গেছে, আর এতেই আমি বুঝে নিয়েছি আপনার ভালোবাসার শক্তি আমার চেয়েও বেশী।তাই তো আমি নিশ্চিন্ত হলাম।তবে আপনাদের কাছে আমার রিয়াজ, মানে আপনাদের আরাফকে রেখে গেলাম।শুধু অনুরোধ রইল, রিয়াজকে মায়ের আদর স্নেহ ভালোবাসায় বড় করবেন। আমি যেখানেই থাকি আমি এতেই সুখ খুঁজে পাবো।আপনাদের নতুন জীবনের জন্য অভিনন্দন রইল।
শায়লা চিঠিটা পড়ে কিচ্ছুক্ষণ  একেবারে নীরব,নিথর  নির্বাক হয়ে রইল। নিজেকে অপরাধী ভাবতে লাগলো।আরাফকে তার মায়ের সংস্পর্শ থেকে বঞ্চিত করলো। পরক্ষণেই সে ভাবলো, কিন্তু সেওতো আরাফকে ভালোবাসে।আরাফের কথা মনে পড়তেই তার শিহাবের কথা মনে পড়লো !  তার চায়ের কথা খেয়াল হলো। শায়লা চিঠিটি ক্যাবিনেটের ড্রয়ারের ভিতর রেখে চায়ের ট্রে নিয়ে  ঘরে গিয়ে শিহাবকে খুঁজতে লাগলো। শিহাবকে ঘরে না পেয়ে সে বারান্দায় এগিয়ে যেতেই দেখলো,শিহাব বেশ বিষন্ন মুখে বারান্দায় বসে আছে। শায়লা চায়ের ট্রে টেবিলে রেখে, শিহাবের কাছে জানতে চাইলো,তার কিছু হয়েছে কিনা ? 
শিহাব গভীর ভাবনা থেকে এ জগতে ফিরে এলো। শায়লা তার হাতে চায়ের কাপ তুলে দিতেই  শিহাব শায়লার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল।যেন বোবা কান্নায় ভেতরে কিছু একটা বয়ে যাচ্ছে। শায়লা বুঝতে পারছে না, তার ভেতরেও কেন এমন একই অনুভুতি বয়ে যাচ্ছে। সে শিহাবের মাথায় হাত বুলিয়ে অস্ফুট স্বরে জানতে চাইলো, তোমার কি হয়েছে ?  আমাকে কি বলা যায় ? তুমি কিছু একটা নিয়ে কষ্ট পাচ্ছো। এবার শিহাব শায়লার কাছে তার মনের আবেগের কথাকতা যেন উগড়ে দিলো। শায়লা,  রিশতিনা অনুরোধ করেছে আমরা দুজন যেন আরাফকে বাবা মায়ের আদরে বড় করে তুলি। তাতেই সে সুখী হবে।
শায়লা বেশ অবাক হলো ! এ কথা শিহাব কিভাবে জানলো ? তবে কি শিহাব তার চিঠির কথা জানে ? তবুও শায়লা শিহাবের কাছে জানতে চাইলো, এ কথা কখন বলেছে ? সে কি এখন কল করেছিলো ? 
না, সে আমাকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়েছে আর তোমার আমার নতুন জীবনের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছে। 
শায়লা শিহাবের খুব  ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ালো।শিহাবের মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করলো। তুমি ভেবোনা, আরাফ আমার কাছে  সন্তান হয়েই থাকবে। চা খেয়ে চলো, স্মরা আরাফকে আজই আমাদের কাছে নিয়ে আসি। আজ আমরা রাতে একসাথে বাইরে খাবো।আরাফকে নিয়ে সারাদিন ঘিরে বেড়াবো। আরাফকে অনেক খেলনা কিনে দিবো। নতুন পোশাক কিনে দিবো। শায়লার কথাগুলোতে শিহাব যেন প্রাণ ফিরে পেলো।তার চোখ সুখ স্বপ্নে চকচক কতে উঠলো!  সে শায়লার বুকের মাঝে নিজেকে  আড়াল করে নিলো।আরাফের মত সেও একজন শিশু হয়ে শায়লার মাঝে আশ্রয় খুঁজছে।
শায়লা চায়ের ট্রে রান্নাঘরে রেখে ক্যাবিনেটের ড্র‍্যার খুলে চিরকুটটিকে বলে এলো, রিশতিনা তোমার রিয়াজ, আজ থেকে আমারও রিয়াজ হয়ে, এক মূল্যবান  মানিক রতনের আদরে থাকবে। 
শিহাব নবশক্তি নিয়ে বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকতেই ওয়ারড্রোবের উপরে রাখা প্যাকেটটির দিকে তাকিয়ে, মনে গভীরে ভেবে নিলো, রিশতিনা আরাফকে নিয়ে তুমি একেবারেই ভেবোনা। শায়লা ওর জন্য চিরকাল মা হয়েই থাকবে। 
রান্নাঘর থেকে শায়লা বেরিয়ে এসে শিহাবকে ওয়ারড্রোবের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শিহাবকে স্বাভাবিক কর‍্যে বলে উঠলো, তুমি কিন্তু এখন সেই মেরুন রঙের শার্টটি পড়বে।
শিহাবও নিজেকে ভাবনা থেকে সরিয়ে এনে বললো, আমরা এখন আর বাইক নিয়ে বেরুচ্ছি না। আমরা উবারে যাবো। আসার সময় আরাফ থাকবে আমাদের সাথে।তার কত জিনিসপত্র আনতে হবে।
শায়লা শিহাবের দিকে এগিয়ে গিয়ে হাত ধরতেই শিহাব এক টানে শায়লাকে তার বুকের মাঝে মিশিয়ে নিলো।





                                            (সমাপ্ত)
                                            ধন্যবাদ

মমতা রায় চৌধুরী ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৬৩




LOVE

কবি আমির হাসান মিলন এর কবিতা "নীল ইচ্ছে"




নীল ইচ্ছে

আমির হাসান মিলন 


কোন আলো কি এসেছিলো এখানে 
বিষণ্ণতার কুৎসিত অন্ধকার মাড়িয়ে ? 

জানি উত্তর পাবো না , 
হয়তো ইচ্ছে করেই বলবে না! 

চোখে আমার লাল রক্তের উদ্ভাস, 
আজ বুকের ভিতর অহরহ ভাঙ্গনের আওয়াজ   
যা কিছু বাঁচার প্রেরণা যোগাতো আমায় , 
সব কিছু বিলুপ্ত হবার পথে 
গলে গলে যাচ্ছে  নর্দমার দিকে। 

আজ নয়তো কাল মৃত্যু ধীরে ধীরে পাথরের মতো 
পর্বতের উঁচু শৃঙ্গ হতে গড়িয়ে পড়বে নিচে  
নৈশব্দের যাঁতাকলে মিশে যাবে জীবনের সব কোলাহল। 

তুমি জানলে না নীলাঞ্জনা , 
ওরাই কেঁদে-সেধে এই পরিণতি চেয়েছিলো।

কবি নাহিদা আক্তার রুনা এর কবিতা  "আমাকে পেয়েছিলো কেউ"





আমাকে পেয়েছিলো কেউ
নাহিদা আক্তার রুনা 



আমাকে পেয়েছিলো কেউ 
খুব করে পেয়েছিল বহুদিন, 
তোমার মতোই বলেছিল কেউ
রাতের পেঁচার ডাকে 
জ্বলে উঠা তারার সাক্ষীতে,
হাত দুটো ধরেছিলো কেউ।
ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠা ক্ষণ
সাক্ষী ছিলো ঝরাপাতার বন,
সাক্ষী ছিলো পৌষালী চাঁদের মায়া 
ঝাউগাছের পা ছোঁয়া ছায়া,
খুব করে উড়েছিলো আলো
ঝিঁঝি পোকারা গান গেয়ে গেলে
বুকের সেতার বাজে এলোমেলো,
সবুজ ঘাসের বিছানো গালিচায়
আমাকে পেয়েছিলো কেউ।
খুব করে পেয়েছিলো বহুরাত
তোমার মতোই ভাঙা সুরে, 
ঢেউয়ের মতোন পা চুমে দিয়ে
সমুদ্রের বুকে ডেকেছিলো কেউ।
অতঃপর দিগন্তের ওপার থেকে
কে নিলো তারে ডেকে,
পড়ে রইলো পৌষালি চাঁদ 
আর ভাঙা কিছু রাত,
পড়ে রইলো ঝরা পাতা ঝিঁঝিঁর ডাক
ট্রেনের সেই হুইসেল,বুকের সেতার।
তোমারই মতো বলেছিল কেউ 
আমৃত্যু আকাশের বুকে নীলের মতো
ধরে রাখার প্রতিজ্ঞা যতো,
প্রতিজ্ঞারা উড়ে গেছে পাখি হয়ে 
সুরভিত ক্ষণ পেরিয়ে।
সে কথা তুমি বলোনা আর 
এখনো চোখে সমুদ্রের ঢেউ,
আমাকে পেয়েছিলো কেউ
বহুদিন বহুরাত।

কবি রাজেশ কবিরাজ এর কবিতা "দুঃখও "




দুঃখও
রাজেশ কবিরাজ

আমি সব সময় দুঃখকে আপন ভেবেই 
ঠাঁই দিয়ে রেখেছি মনের আসনে,
এখন দেখি দুঃখ ও আমাকে পর ভেবে 
ফাঁকি দিয়ে চলে যাচ্ছে অনেক দূরে !
আমি সেই একা আগের মতই -
নিজের সাথে কথা বলি আপন মনে ।
আসলেই আমার তো আপন বলে
কোন প্রিয় মানুষ ছিল না কোনদিন,
যে তারা দুঃখ দেবে আমাকে অতি যত্নে !
আমার বিপদে ছুটে আসবে তারা,
আমাকে বলবে কি হয়েছে তোমার ?
ভালোবেসে আমাকে নেবে বুকে টেনে !
আমার একটা পরিপূর্ণ দিন কাটে বোবার মত,
নিঃশব্দে  রাত পার হয়, হৃদয়ে 
জমে থাকা হাজার কষ্ট বরফের মতো বুকের ক্ষত ;
প্রকাশ করতে পারিনা সবার সামনে ।
সেই সহজ অধিকার আমার নেই ,  তাই 
তাকে অতি যত্নে লুকিয়ে রেখেছি খুব গোপনে ।

২৫ এপ্রিল ২০২২

কবি বিশ্বজিৎ রায় এর কবিতা "রহস্য"




রহস্য 

বিশ্বজিৎ রায় 



বৃষ্টিকে আড়াল করে একটা প্রদীপ জ্বালিয়ে 
সারা সন্ধ্যা খুব গল্প করল সে, গান করল,
খুনশুটি করল, 
সবুজ পাতায় রঙিন খাবার সাজিয়ে
আপ্যায়ন করল আমাকে.... 



অন্য সুখের গল্প বলতে বলতে কখন যে আমাকে
ঘুম পাড়িয়ে দিল বুঝতেই পারিনি ---
ভোরবেলা ঘুম ভাঙতে দেখলাম,
 চারপাশে থইথই জল, তার মাঝখানে 
 একটা ডোঙায় শুয়ে ভেসে আছি আমি....

কবি গাজী আনিস এর কবিতা "ভালবাসা পল্লবিত বৃক্ষের মতন..."




ভালবাসা পল্লবিত বৃক্ষের মতন...

গাজী আনিস



যখন মৃত্তিকা- 
ঘাস কিংবা ঘাসফুলের সাথে কথা বলি, 
হঠাৎ মনের অজান্তে তোমার নামই উচ্চারণ করি।

জানালার বাইরে- 
তাকিয়ে যখন বলতে চাই,হে পৃথিবী, 
তখন তোমার নাম বেজে ওঠে আমার কন্ঠস্বরে।

যখন টেবিলে
ঝুঁকে লিখি,বই পড়ি কিংবা শুয়ে থাকি, 
তখন তন্ময় হয়ে বারবার তোমাকেই আবৃত্তি করি।

যখন নিঃসঙ্গ
পথ হাঁটি কিংবা চা'খানায় দেই আড্ডা,
হঠাৎ হাওয়ায় সুতীব্র জেগে ওঠে তোমার মুখচ্ছবি। 

মনে হয় গোপনে
কিছু বলবে আমাকেই,তাইতো হই উৎকর্ণ,
অকস্মাৎ চকিতে চাতক হয় আমার প্রতিটি রোমকুপ।

কখনো গাছের
পাশে গাছ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি নিভৃতে একাকী, 
অমাবস্যায়-পুর্ণিমার ঝকঝকে আবির মাখি দু'চোখে।

কবিতার কিছু
পঙক্তি নীরবে আউড়িয়ে শান্তি পেতে চাইলে,
কেবল প্রীতি নামই উচ্চারিত হয় হৃৎপিণ্ডের গভীরে। 

কি অসীম
তৃষ্ণায় হৃদয় ফেটে যায় তুমি বুঝবে না,
বুকের তলায় অহর্নিশ জ্বলছে প্রেম-নিয়ন বাতির মতো। 

নিঁভাজ চোখে
নির্ঘুম রাত্তিরে কিছু প্রশ্ন ঘোরাঘুরি করে, 
তখন স্বপ্ন-ঘোরে জিজ্ঞেস করি-প্রীতি কেমন আছো ?

মমতা রায়চৌধুরীর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৬২




উপন্যাস 


টানাপোড়েন  ১৬২

আবার ভ্যাকসিন

মমতা রায়চৌধুরী




"অ্যাই শুভ্রা'
বড়দিকে হঠাৎ  স্টাফ রুমে চলে 
এসেছেন ।অনেকে বলাবলি করছে ।
নীলা বললো
', বড়দি কিছু বলবেন?'
'রেখাকে খুঁজছিলাম ।রেখা কোথায় জানো?'
'রেখা তো ক্লাসে গেল?'
'ও আচ্ছা।'
বড়দি যেতে গিয়ে আবার ফিরে এসে বললেন 'ক্লাস থেকে আসলে আমার সঙ্গে দেখা করতে ব"ল তো?'
'ঠিক আছে বড়দি।'
এর মধ্যে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগল বড়দি চলে যাওয়ার সঙ্গে 
সঙ্গে । শুরু হয়ে গেল পিএনপিসি।বাববা "রেখাকে যেন চোখে হারান বড়দি।"
কথা বলতে বলতেই রেখা ক্লাস করে  ঢুকল স্টাফরুমে। তারপর হ্যান্ড ওয়াশ দিয়ে হাত ধুয়ে নিজে টেবিলের কাছে এসে দাঁড়িয়ে বললো 'বাপরে কি গরম পড়েছে ।তার মধ্যে আজকে উপরের রুমে কোন ফ্যান ঘুরছে না ।মেয়েরা অস্থির হয়ে পড়ছে।'
এরমধ্যে নীলাদি বলল ', হ্যাঁ, একদম ঠিক বলেছ  আমার দিকটাও  বোধহয় গন্ডগোল হয়েছে। ফ্যান চলছিল না।'
এরমধ্যে শুভ্রা বললো 'রেখা তোমাকে বড়দি ডেকেছেন।'
"যাই একটু পরে  ।কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগছে গরমে।'
রেখা নিজের চেয়ারটায় বসলো ,বোতল থেকে ঢকঢক করে জল খেলো।
এরমধ্যে পঞ্চমী দি  এসে খবর দিল'রেখা দি বড়দি আপনাকে ডেকেছেন।'
"হ্যাঁ তুমি বল ,যাচ্ছি একটু পরে।"
"আচ্ছা।"
প্রজেক্ট খাতাগুলো দেখতে হবে ।এডুকেশন এর প্রজেক্ট খাতা পড়ে রয়েছে।
এরমধ্যে সন্ধ্যা দি আবার আসলো 'রেখাদি বড়দি আপনাকে ডেকেছেন।'
"বাপরে বাপ ,বললাম একটু পরে যাচ্ছি। তো আর সহ্য হচ্ছে না ।ঠিক আছে , চলো ,যাচ্ছি।'
"আচ্ছা বলেই সন্ধ্যাদি চলে গেল ।সন্ধ্যাদি চলে যাওয়ার সময় বেশ লম্বা চুলের বেণী দুলিয়ে দুলকি চালে চলে গেল।
রেখা উঠে বড়দির ঘরের কাছে গেল।
তারপর বলল" আসবো বড়দি দিদি?"
"এই রেখা তোমাকে আমার খুব দরকার।"
রেখা একগাল হেসে বলল "আমাকে দরকার?"
বড়দি হেসে বললেন "তোমাকে কখন থেকে খুঁজছি জানো! তোমাকে ভীষণ দরকার।"
"হ্যাঁ বলুন।"
রেখাকে খুব করে অনুরোধ করলেন।
জানি তুমি পরপর ভ্যাকসিন এর কাজগুলো করেছো ,তবুও তোমাকেই বলছি অনিন্দিতার কাজটা একটু করে দেবে?'
রেখা বড়দি কিছু বললে , না করতে পারে না। তাই বলল কেউ যদি করার না থাকে তাহলে তো করতেই হবে।'
বড়দি একগাল হেসে বললেন' আমি জানি তুমি না করবে না  কিন্তু দেখো আমি এবার তোমাকে বলতাম ই  না ।উপায় নেই,  তাই বললাম।'
"ঠিক আছে ,বড়দি চিন্তা করবেন না।"
বড়দি হেসে আবার বললেন' না ,না ,তুমি যেখানে বলেছে চিন্তা করবেন না ,সেখানে আমার চিন্তা কেন থাকবে ?আমি তো তোমার উপর অনেক ভরসা করি।"
'আপনি ভরসা করেন , বিশ্বাস করেন আমি যেন সেই ভরসার মর্যাদা রাখতে পারি দিদি।'
"তুমি এভাবে কথা ব'লো না ,তুমি নিশ্চয়ই পারবে।'
রেখা  বললো '' ঠিক আছে দিদি ,করে দেবো।'
'আচ্ছা রেখা তোমাকে একটা কথা বলি, তোমাকে সব কাজ করতে হবে না  যা কুপন রেডি করা ,নাম রেজিস্টার করা আজকেই শুভ্রা আর নীলা করে রাখবে ।কালকে শুধু তুমি এসে মেয়েদের নাম গুলো এন্ট্রি করে নেবে কোন মেয়েরা ভ্যাকসিন নিলোনা সেইগুলোকে নোট করবে, আর তাদের কে ফোন করে জানবে কেমন?'
'Ok দিদি। কিন্তু…?'
'আবার কিন্তু কেন রেখা, কিছু বলবে?'
বড়দি উৎসুকভরে  তাকিয়ে রইলেন রেখার দিকে' কিছু শুনবেন বলে। 
'মানে নীলাদি আর শুভ্রাকে এ কথাটা কে বলবে?'
', না, না তোমাকে কিছু বলতে হবে না ।আমি এক্ষুনি ডেকে বলে দিচ্ছি।'
বড়দি সঙ্গে সঙ্গে কলিং বেল বাজিয়ে সন্ধ্যাদিকে ডাকলেন।
সন্ধ্যাদি তার সেই দুলকি চালে বেণী দুলিয়ে এসে হাজির বড়দির কাছে।
'শোনো সন্ধ্যা, তুমি এক্ষুনি নীলা আর শুভ্রা কে ডেকে দাও।'
'আচ্ছা দিদি।'
'রেখা যাও তুমি গিয়ে বস স্টাফ রুমে।'
সন্ধ্যা দি স্টাফ রুমে এসে নীলাকে বলল 'দিদি আপনাদের দুজনকে বড়দি ডাকছেন। এক্ষুনি আসবেন।'
নীলা, শুভ্রা দুজনে একসঙ্গে বলল 'ঠিক আছে যাচ্ছি, তুমি যাও।'
নীলা ,শুভ্রা দুজনের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল ।এর মধ্যে রেখা এসে নিজের জায়গায় বসল।
যারা সমস্ত কিছুর জন্য দায়ী রেখা তাই
 যাবার সময় রেখাকে টিপ্পনীকেটে দিয়ে বেরিয়ে গেল।' চল যাই, আবার আমাদের কি জন্য ডেকে পাঠিয়েছেন দেখি। সবার তো রাজ ভাগ্য হয় না।'
কথাগুলো ব্যঙ্গ করে বলে দিয়ে দুজনে হাত ধরাধরি করে বড়দির ঘরের দিকে এগুলো।
'আসবো দিদি?'
বড়দি শুভ্রা ,নীলার দিকে তাকিয়ে বললেন' 'এসো।'
"আমাদেরকে ডেকেছেন?"
বড়দি ফাইলে মুখ গুঁজে রেখে বললেন' হ্যাঁ ডেকেছি। আগামীকাল ভ্যাকসিন আছে, তোমরা জানো। আর অনিন্দিতা এবসেন্ট থাকবে তাই অনিন্দিতার কাজগুলো তোমাদের দুজনকে করে দিতে হবে ।আজকের মধ্যেই কমপ্লিট করতে হবে।'
শুভ্রা আর নীলা দুজনেই একসঙ্গে বললো' কি কাজ দিদি।"
"তেমন কিছু নয় শুভ্রা যে ক্লাসের ক্লাস টিচার, সেই মেয়েদের নামগুলো সব তুলে নেবে আলাদা একটা খাতায় ।তারপর আর একজন কুপন কাটবে ।যাও যাও কুইক কাজ করো।'
নীলা আর শুভ্রা বড়দির ঘর থেকে বেরিয়ে এসে স্টাফ রুমে এসে কি গজ গজ করতে 
লাগল ।রেখাকে শুনিয়ে বলতে লাগলো' বললাম না ,আমাদের এত রাজ ভাগ্য নয়।'
'একদম ঠিক বলেছ নীলা দি।'
অনিন্দিতা মুখে যে কথাগুলো বলে ,খারাপ বলে না।
আসলে ওর মুখের সামনে বলে দেয় তো, তাই সহ্য হয় না।'
'তার মানে কাউকে  কাজটা করার জন্য বলেছিলেন বড়দি ,সে অজুহাত দেখিয়ে কেটে পড়েছে ।আমরা তো সেটা পারি না।'
শুভ্র বলল 'একদম ঠিক বলেছ।'
রেখা সব শুনে হজম করতে লাগল ।আসলে রেখার কিছু জবাব দিতে ইচ্ছে করলো 
না ।জবাবদিহি করলে নানা কথা উঠে আসবে সারাটা দিন মেজাজ বিগড়ে থাকবে। তারচেয়ে ওরা যা পারে বলে যাক। কিছু কিছু সময় চুপ করে থাকাই যুদ্ধে রণনীতি জেতার একটা কৌশল।
নীলা বললো 'শুভ্রা চল  অ্যাটেনডেন্স খাতাটা খুঁজি।"
"আমরা কেন খুঁজবো?'
নীলাদিঅবাক হয়ে বলল,' তাহলে?'
'সপ্তমীদিকে ডেকে খাতাটা খোঁজার কথা বলি।'

নীলা দি  বলল 'একদম ঠিক বলেছিস শুভ্রা।'
শুভ্রা উঠে গিয়ে সন্ধ্যা দিকে খোঁজ করতে গেল। দেখলো মিড ডে মিলের ঘরে। শুভ্রা সেখানে গিয়ে বলল' সন্ধ্যা দি ,ক্লাস এইট এর অ্যাটেনডেন্স খাতাটা খুঁজে আমাদেরকে দাও এক্ষুনি। আমরা লিখব।'
সন্ধ্যা দি বলে' ঠিক আছে আপনারা যান। আমি খুঁজে নিয়ে  আপনাদের কাছে দিয়ে আসছি।"
শুভ্রা আরবললো সোনার সঙ্গে চটি খাতা দেবে আর কিছু লুজ শিট ও দেবে।'

"আচ্ছা আচ্ছা দিয়ে আসব।"
শুভ্রা এসে নিজের জায়গায় বসল।
নীলাদি বলল কিরে পেলি খাতা,?"
"বলেছি।'
কথা শেষ না হতেই সন্ধ্যা দি এসে বলল খাতাগুলো দিয়ে এইযে দিদি খাতা রইল আর এই যে কয়েকটা লুজ শিট "
নীলা বলল 'তুই কি করবি কুপন কাটাবি, না নাম লিখবি?'
শুভ্রা বললো "যেটা বল।"
নীলা বললো'তাহলে তুই নাম লেখ।'
শুভ্রা বললো 'ওকে।'
নীলা বলল" কার কাজ কে করে?'
শুভ্রা বললো আমরা হচ্ছি শ্রমজীবী মানুষ খাটতে তো হবেই।'
"যারা অভিজাত্ত তাদেরকে তারা এসব কাজ করতে হবে না।"
রেখার মাথাটা ধরেছে তাই মাথা নিচু করে টেবিলে মাথা রেখে বসে আছে আর সব শুনছে ।
এরমধ্যে রেখার ফোন বেজে উঠলো।
রেখা ফোনটা রিসিভ করে বলল' হ্যালো।'
'হ্যাঁ ম্যাডাম,' আশা 'পত্রিকা থেকে বলছিলাম।'
"হ্যাঁ ,হ্যাঁ বলুন।'
আমরা আপনার একটা সাক্ষাৎকার নিতে চাই কালকে কি একবার সময় হবে?
রেখা বলল' না না কালকে একদমই সময় হবে না।'
ঠিক আছে তাহলে আপনি একটা আমাদের সময় দিন।
 "আপনারা রবিবার আসুন '।
ওকে।
ফোনটা কেটে দিয়ে রেখা ভাবতে লাগলো আশা পত্রিকার থেকে আসবে, রবিবারে কি কি অ্যারেঞ্জ করবে?"
"ঠিক আছে বাড়ি যাই। এ ব্যাপারে মনোজের সাথে কথা বলতে হবে।'
এসব ভাবতে ভাবতেই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল এখনো সময় আছে কিছুক্ষণ লেখা যাবে।
বরং রেখা  লেখাটা লিখতে থাকুক….।
"বন্ধুত্ব বেঁচে থাক গভীর শ্রদ্ধায় পরস্পর পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ততায় আর  ভালোবাসায়।*"

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৯৯





ধারাবাহিক উপন্যাস 

শায়লা শিহাব কথন 

অলিখিত শর্ত (পর্ব ৯৯)

শামীমা আহমেদ 




এক ম্যারাথন সময় পেরিয়ে শায়লা ও শিহাবের মধুময় রাত কাটলো। সূর্যের আলোর টানে শায়লার আগে ঘুম ভাঙলো। ঘুম থেকে জেগেই সে চারপাশে তাকিয়ে এখন বেলা ঠিক কয়টা বাজছে তা  বুঝতে চেষ্টা করলো। মনে হচ্ছে অজানা কোন দ্বীপে রাত্রিযাপন শেষে তার ঘুম ভাঙলো। শায়লার চোখ পড়লো,দেখলো, এখনো বেডসাইড টেবিলে ল্যাম্পটি জ্বলছে। শায়লা তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে নামতে চাইলো।কিন্তু কিছু একটায় সে আটকে গেলো। শায়লা দেখলো ঘুমন্ত শিহাব তার দু'বাহুতে শায়লাকে বেঁধে রেখেছে। সেদিকে তাকাতেই তার শিহাবের কথা মনে হলো! 
তাইতো ! শিহাবতো গতকাল রাতে এই বাসাতেই ছিল।শায়লার একে একে গতরাতের সবকিছু মনে পড়তে লাগলো। শিহাব তখনো অতল ঘুমে একেবারে কাদা হয়ে আছে । শায়লা খুব আলতো করে একে একে  শিহাবের দুবাহুর বন্ধন ছাড়িয়ে  বিছানা থেকে নেমে এলো।নিজের পরনের পোশাক গুছিয়ে নিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে দিনের সময়টা বুঝতে চেষ্টা করলো।বাইরে বেশ উজ্জ্বল সূর্যালোকে সবদিক একেবারে ঝকঝকে স্বচ্ছতায় ফুটে আছে। মানুষের স্বাভাবিক চলাচলে শায়লা বুঝে নিলো বেশ অনেক আগেই সকাল হয়েছে। সে ল্যাম্পটি নিভিয়ে ঘরের বাতি জ্বালিয়ে দেয়াল ঘড়িতে দৃষ্টি দিতেই একেবারে চমকে উঠলো!  দুপুর বারোটার ঘন্টার কাঁটা একটার দিকে চলমান। শায়লা দ্রুত ওয়াশরুমের প্রস্তুতি নিলো।ফিরে এসেই সে শিহাবকে জাগাবে। বেচারা আরেকটু ঘুমিয়ে নিক।শিহাবের কথা মনে হতেই শায়লা বিছানার দিকে এগিয়ে গেলো। ঘি রঙা পাঞ্জাবিতে ঘুমন্ত শিহাবের মায়াভরা মুখটার দিকে শায়লা অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। মনে হলো অনেক প্রচন্ড এক যুদ্ধের ধকল কাটিয়ে রাজ্যবীর জয়ের আনন্দে গভীর ঘুমে ডুবে আছে। শায়লার মনে পড়ে গেলো শিহাবের সাথে পরিচয়ের   প্রথমদিনের ক্ষণটি।নেভি ব্লু জিন্স শার্টে একখন্ড সাদা মেঘের মত চাঁদ মুখের উঁকি! বাইক থেকে নেমে আসতে প্রতি পদধাপে সেদিন শায়লা ভীষণ ভালোলাগায়
আছন্ন হয়ে গিয়েছিলো।দিনে দিনে বাড়তে বাড়তে শায়লাকে তা পূর্ণ গ্রাস করে নেয়। তার অমায়িক ব্যবহার আর শায়লার প্রতি অমন সুন্দর ভদ্রতা বজায় রেখে চলা শায়লাকে তার প্রতি এক দুর্নিবার আকর্ষণে টেনে নিয়েছিল। একটু একটু করে তাতে  ভালোবাসার জন্ম নেয়। আজ সেই শিহাব তার এতটা কাছে এতটা আপন হয়ে  ধর দিয়েছে।শায়লা নিজেকে একজন সুখী মানুষ ভেবে নিলো। আস্তে আস্তে খুব সন্তর্পণে  সে শিহাবের মুখের দিকে এগিয়ে গিয়ে কপালে আলতো করে তার ঠোঁট ছুয়ে দিল। এক অপার্থিব ভালো লাগা তার অন্তরের গভীরে গিয়ে জায়গা করে নিলো। শায়লা শিহাবকে না জাগিয়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যেতে হঠাৎ করে শিহাব চোখ মেলে তাকালো। শায়লা ভীষণ লজ্জা পেয়ে  গেলো। শিহাবের দুষ্ট চোখ শায়লাকে আরো কাছে চাইলে তাতে শায়লার সম্মতি না মেলায় শিহাব চট করে এক গাঢ় চুম্বনে শায়লাকে দখল করে নেয়।শায়লা শিকারীরজালে আটকে যাওয়া নিরীহ এক শশ শাবকের ন্যায় আত্মসমর্পণ করে নিলো। সময়ের বয়ে চলায় শিহাব স্বেচ্ছায় তার বাঁধন ছুটিয়ে শায়লাকে মুক্ত করলে তবেই শায়লা নিজের অবস্থানে ফিরে এলো। শায়লা  আর পিছনে না তাকিয়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেলো। সে বেশ অনেকটা সময় নিয়ে শাওয়ারের জলধারার নিচে দাঁড়িয়ে রইল।পানির ঝর্ণাধারায় তার সারা দেহে  শিহাবের স্পর্শের শিহরন বয়ে গেলো।  অনেকটাক্ষণ সে চোখ  বন্ধ করে তা অবগাহনের সুখ শুষে নিলো।এক অনন্য সুখানুভূতিতে ডুবে বুঝে নিলো ভালোবাসা পাওয়ার ক্ষণগুলো জীবনের সময়ের তুলনায় খুবই ক্ষনিকের। কেন তা সারাটা জীবনের প্রতিটি ক্ষন জুড়ে থাকে না ? কেন জীবনের সব অপ্রাপ্তিকে সরিয়ে বারবার একই আনন্দে বিভোর হওয়া যায় না। শায়লার দীর্ঘ সময় ওয়াশরুমে থাকায় শিহাবের খুব একা একা বোধ হতে লাগলো। সে বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমের দরজায় নক করতেই শায়লার খেয়াল হলো অনেক সময় ধরেই সে নানান ভাবনায় ডুবে আছে।শিহাবকে একা রেখে এসে।সে সব গুছিয়ে দ্রুতই বেরিয়ে এলো।বাইরে শিহাব তার মোবাইল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।রিং হচ্ছে। শায়লা তাকিয়ে দেখলো,বুবলীর কল। সে কল রিসিভ করতেই শিহাব ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো। বুবলীর  আক্রমণাত্মক  কথায় শায়লা একেবারে কুপোকাত হয়ে গেলো।শায়লা বুঝতে পারে না কখন বুবলী এতটা দক্ষ একজন বক্তা হয়ে উঠলো। সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ছাত্রী এরা। যেমন স্পষ্টভাষী তেমনি প্রতিবাদী।
তোমাদের আজ কি ঘুম ভাঙবে ? নাকি একসাথে দুইদিন ঘুমাবে ? 
বুবলীর এমন প্রশ্নে শায়লা কি উত্তর দিবে কিছুই খুঁজে পেলো না।আসলে শায়লার তো খুব অল্প বয়সেই  জীবন সংগ্রাম শুরু হয়ে যায়। মন খুলে কথা বলা বা নিজের অধিকার আদায়ের কথা বলার মত সুযোগ তার হয়ে উঠেনি।তাইতো বুবলীকে পরাস্ত করা হয়ে উঠে না। এইতো,এখুনি বেরুচ্ছি,শায়লা শুধু এটুকুই বলতে পারলো।
শিহাব ভাইয়া কোথায় ? তার জন্য কি নাস্তা হবে জানিও। তোমরা দ্রুত এসে নাস্তা করো।একটু পরতো লাঞ্চের সময় হয়ে যাবে। আপু, তোমার জন্য ঐ কেনাকাটার মাঝে নতুন শাড়ি আছে সেটা পরে নিও। আপাতত শিহাব ভাইয়ার জন্য কিছু নতুন পোশাক আনা হয়েছে। রাহাত ভাইয়া কেনাকাটা করে এনেছে। দরজা খোল আমি নিয়ে আসছি। 
কথাগুলো বলেই  বুবলী কল রেখে দিলো।শায়লা তার শাড়িটি খুজতে লাগলো।শিহাব ওয়াশরুম থেকে টাওয়েল চাইতেই শায়লা অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। সে এখন কি করবে ? শিহাব মুখ বাড়িয়ে বললো,শায়লা তোমার চুলে বাধা টাওয়েলই আমার চলবে ওতে যে তোমার চুলের ঘ্রাণ আছে সেটাই মেখে নিবো। শায়লা ভেবে পায়না শিহাব কবে এত রোমান্টিক কথা শিখল ? কই আগেতো এমনটি শুনিনি। শায়লা এগিয়ে গিয়ে টাওয়েল দিতেই সে ফিসফিস করে বললো, শায়লা তোমাকে পেয়ে আমার নিজেকে খুব সুখী মানুষ মনে হচ্ছে।তুমি কখনোই আমাকে ছেড়ে যেওনা। শায়লার চোখ জলে ভরে উঠলো। শায়লার প্রতি বারবার শিহাবের এই একই আকুতি। আমায় ছেড়ে যেওনা। আমায় ছেড়ে যেওনা।তার জীবন থেকে আচমকা  রিশতিনার চলে যাওয়া শিহাবের মনে হারানোর ভয় ঢুকে গেছে। বুবলী দরজায় নক করে  ভিতরে না ঢুকেই সে শিহাবের পোশাক, টাওয়েল দিয়ে গেলো। শায়লার  ভেজা চুল থেকে তখনো পানি ঝরছে। আর তাতে  বুবলীর মুচকি হাসি যেন শায়লার ভেতরে ভীষণ  এক টিপ্পনী কেটে গেলো! উফ! মেয়েটাকে নিয়ে আর পারা যাচ্ছে না।শীঘ্রই এটাকে জামাই বাড়ি পাঠাতে হবে। শিহাব বেরিয়ে এসে তার নতুন পোশাক  দেখে অবাক হলো! শায়লা জানালো,রাহাত সকালে কিনে এনেছে । গাঢ় সবুজ রংয়ের সিল্কের পাঞ্জাবী আর আদ্দি কাপড়ের চোস্ত পায়জামা আর নতুন চটি স্যান্ডেলে নতুন জামাই সাজে শিহাবকে দারুণ লাগছে। শায়লা মুগ্ধ হয়ে তা দেখছিলো। শিহাব আয়নায় নিজেকে দেখে নিলো।বাহ! রাহাততো ঠিক মাপেই সব কিনেছে। শিহাব মনে মনে ভেবে নিলো, এখন তার উপরেও কিছু দ্বায়িত্ব বর্তে গেলো। শায়লা ইট রঙা কমলা শাড়ি খুব পরিপাটি করে পরে নিলো। সাথে হালকা জুয়েলারী। দরজায় বুবলীর ক্রমাগত কড়া নাড়ার শব্দে শায়লা  শিহাব বুঝে নিলো তাদের দ্রুত বেরুতে হবে। নিশ্চয়ই  সবাই অপেক্ষায়।  
দুজন বেরিয়ে আসতেই বুবলী এগিয়ে এলো। রাহাত ও বুবলী দুজনকে ড্রইং রুমে নিয়ে বাসালো। সেখানে কাজী সাহেবকে বিয়ে পড়ানোর জন্য আগে থেকেই বসিয়ে রাখা হয়েছে। সেখানে শায়লার মা, নিচ তলার রুহি খালার স্বামী আর বাড়ির অন্যান্য মুরুব্বিদের উপস্থিতিতে শায়লা ও শিহাবের বিয়ে পড়ানো হলো।  সবাই মিষ্টি মুখ করে নব দম্পতির জন্য দোয়া করতেই শায়লার মা লায়লা খানম কান্নায় ভেঙে পড়লেন। শিহাব শায়লার মায়ের কাছে এসে দাঁড়িয়ে তাকে বিনীতভাবে জানালো, মা আপনি কাঁদবেন না। শায়লা  আর আমার জীবনে সবকিছু একটু অন্যভাবে ঘটলো। কারো কারো জীবনের চলা এভাবেই লেখা থাকে। সবকিছু প্রথাগত নিয়মে হয় না। আপনি দুঃখ করবেন না। আমাদের জন্য দোয়া করবেন। শায়লাকে আপনারা আমার হাতে তুলে দিয়েছেন,আমার জীবনের সঙ্গী করেছেন, আপনাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।কেননা শায়লার মত একজন মেয়েকে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।আর শায়লার কাছে থেকে আমার ছোট্ট আরাফ তার মায়ের  আদর পাবে এর চেয়ে স্বর্গীয় সুখ আর কিছু নেই।  শিহাব শায়লার মাকে সালাম করলো,মা শিহাবের মাথায় হাত দিয়ে তাকে আশীর্বাদ জানালো।
শিহাবের ছেলে আরাফের কথা শুনে আত্মীয় স্বজনের  মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়লো ! ও তাহলে এই ছেলে আগে থেকে বিবাহিত ছিল আবার ছেলেও আছে ! সবার কোথায় যেন আনন্দ আবেগের ছন্দ পতন হলো। রাহাত আর বুবলী বিষয়টি টের পেয়ে শায়লা আর শিহাবকে সেখান থেকে সরিয়ে ডাইনিং এ নিয়ে এলো। ওরা চারজন একসাথে বসে নাস্তা করে নিলো।  নাস্তা শেষে  শিহাব শায়লার মায়ের কাছে শায়লাকে তাদের ঝিগাতলার বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুমতি চাইলো। আর আজই সে আরাফকে সেখান থেকে নিয়ে আসবে আর ওরা তিনজন  আজ থেকেই শিহাবের বাসায় থাকবে।তাদের নতুন জীবনের জন্য শিহাব সবার কাছে দোয়া চাইল। শিহাব সবার কাছে কিছুই লুকাবে না। সে কখনোই আরাফকে বাদ দিয়ে তার জীবন ভাববে না। শিহাব চাইছে শায়লার  স্বজনেরা আজই আরাফের কথা জানবে এবং আরাফ এই বাড়িতে যাতায়াতের জন্য সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ থাকবে। আর সবকিছুই যে শায়লার সম্মতিতে হয়েছে শায়লাও সেটা স্বজনদের কাছে পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিলো। 
বাড়ির মুরুব্বিরা আরাফের ব্যাপারে  শায়লা আর শিহাবের এমন দৃঢ় মনোভাবে আর কিছু বলবার সাহস পেলো না।  সবার জীবন সহজ সরল গতিতে চলে না,কারো কারো জীবনের গতিপথ নানান চড়াই উৎরাই পেরিয়ে তবেই মোহনার ঠিকানা খুঁজে পায়,এমনি কথা বলে শিহাব সবাইকে এটাই বুঝিয়ে তাদের মনে জমা হওয়া প্রশ্নের সমাধান করে দিলো। শিহাবের অমায়িক ব্যবহার আর সশ্রদ্ধ আচরণে আত্মীয় স্বজনেরা বিমুগ্ধ হয়ে তাদের আশীর্বাদ জানাতে লাগলো। সবকিছু দেখে রুহি খালা লজ্জায় যেন নিজেকে লুকাতে চাইছে। বিষয়টি শায়লার দৃষ্টি এড়ায়নি। শায়লা নিজে থেকে এগিয়ে গিয়ে রুহি খালাকে সালাম করে তার দোয়া চাইতেই রুহি খালা তার ভুলের জন্য কান্না করে দিলেন।কিন্তু শায়লা ভেবে নিলো শত হলেও তিনি  তাদের পরিবারের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী।

কবি আছিয়া হক এর কবিতা "তীব্র শীতের একটা রাত কিনতে চাই "






তীব্র শীতের একটা রাত কিনতে চাই 

আছিয়া হক  
(তিথি)


আমি কুয়াশায় মুড়ানো তীব্র শীতের একটা রাত
চড়া দামে কিনতে চাই পৌষ মাঘের কাছ হতে,
নবান্নের সুখ ঢোলে পড়ে হৃদয়ে স্বপ্ন উদিত হয়
বিষাদের স্বপ্ন ঢেউ তোলে বুকে তোমাকে পেতে।

কামনার দৃষ্টি ভরা দহন গুলো কান পেতে শুনি
তোমার কণ্ঠের সুর ভোরের পাখিদের গানে গানে,
সুরের তালে মাতাল করে দেয় জুড়ায় মন প্রাণ
নুড়ে পড়ি স্বপ্নের প্রান্তরে পাওয়া আত্মভিমানে।

বাসনা গুলো হারিয়ে গেছে সীমানার দুর দিগন্তে
অদৃশ্য মায়াজাল প্রেম জাগায় আঁখি মিলনে,
আলোর জ্যোতি খোঁজে জোসনা ছড়ানো চাঁদ
মেঘের রঙের পাগলামি দেখে কাঁদে নির্জনে।

প্রেমের আবেদন জানায় সন্ধাকাশের উজ্জ্বল তারা 
অকাল মৃত্যু হয়েছে যে প্রেমের ঝরা ফুলো তলে,
প্রথম প্রেম আলোড়ন সৃষ্টি করে নবযৌবনা সুখে
ঘন কুয়াশার শিশির কণা ঝরে দু- চোখের জলে।

অনন্ত প্রেম অন্তহীন অবিরাম কেন মনে জাগে
তীব্র শীতের স্নিগ্ধতায় কাঁথা মুড়ি দিয়ে কাঁদে দুখে,
কুয়াশাচ্ছন্ন আঁধারে ছেয়ে আছে মোর আঙিনা
অবেলায় অবহেলায় গল্পকথা হয়ে মনের সুখে।

সৃজন করি সুপ্ত বাসনা পূর্ণতায় নিজেকে বিলাই
অবসরে বেদনারা কড়া নাড়ে মনের জানালায়,
ভোরের কলাফুলের শিশির মেখে উঠবো ফুটে
স্বপ্নচারিনী হয়ে তোমার মনের বনের মোহনায়।

জীবনের সঞ্চিত সমস্ত জমানো সুখ দুঃখ গুলো
হিসেব করিনি, কি পেলাম কি হারালাম এই আমি,
প্রতিদানে দিতে পারিনি তোমার পবিত্র প্রেমের মূল্য
পারবে কি ক্ষমা করে দিতে আমাকে ওগো তুমি।