০৭ নভেম্বর ২০২১

কবি বিকাশ সরকার আলোউৎসবে এবং আমরা দুইজন

ভালোবাসা থেকে প্রেম 

দেবব্রত সরকার 

(আজ দ্বিতীয় কিস্তি) 

                                               আলোউৎসবে সকলে যখন বাজি ফাটাচ্ছে তখন কবির কাছে আমরা দুইজন মানে সঙ্গে কবি বন্ধু তথা সাংবাদিক সানি সরকারকে নিয়ে কবিতা গল্প সাহিত্যে আলোর ঝলক দিয়ে গেলেন কবি।  কবি বিকাশ সরকার একজন প্রাণের মানুষ পাঠকের কাছে।  সবুজ মন নিয়ে হৃদয়ে নাড়া দেয়। তাঁর নিজস্ব অনুভূতিকে লেখার মধ্যে এমন ভাবে প্রয়োগ করেন যে , যে কোন পাঠকই ভেবে নিতে পারেন তার জীবনের কথা উল্লেখ করছেন।  কবিতার বই পড়তে পড়তে কালী পুজোর পরদিন সানি আমার ঘরে হাও হাও করে কেঁদে উঠল।  আমি তাকে কোন ভাবেই থামাতে পারিনা।  সানি বলল তোতন বলতো কি করে লেখেন বিকাশ দা ? আমি নির্বাক হয়ে চেয়ে থাকলাম।  সানি চোখের জল মুছতে মুছতে বাইরে ঘরে গিয়ে বসল আমার সঙ্গে তারপর বিকাশদাকে নিয়ে চলল আলোচনা কেটে গেল সারারাত।  কবির গল্প উপন্যাস ও কবিতা নিয়ে কি ভাবে যে রাত কেটে গেল জানতে পারিনি। সকালের পাখি ডাকতেই ব্যাগ কাঁধে কবির বই হাতে ট্যাক্সিতে গিয়ে বসলাম দুইজনে।  রওনা দিলাম শিয়ালদহ রেলস্টেশন এর দিকে। 

                                     
                            কবি বিকাশ সরকার কাব্যমায়ায় বুনে ঘর, কেউ নেই তার পরপর 
  

এটাই সত্য যে তিনি এই সময়ের অন্যতম এই বাংলা সাহিত্যের স্বনামধন্য কবি। কবি বিকাশ সরকারের কবিতায় মাটির ঘ্রাণ লক্ষ্য করা যায়।  কবি বিকাশ সরকারকে নিয়ে কবি কুমার অজিত দত্ত একটি নামি  সোশ্যাল মিডিয়ায় উল্লেখ করেছেন  যে, "ঈশ্বররেরা বিকাশ সরকারের কবিতা শোনে আর মুগ্ধ হয় পড়তে পড়তে , আমরাও সজনে -সবুজ হয়ে যায় , ধানক্ষেতে শুয়ে থাকি , আমরা আজ প্রকৃতি দারিদ্র হলাম ..." গৌহাটির কবি মুন চক্রবতী সেখানেই লিখেছিলেন-"লেখনীতে অনুভূতি জাগ্রত "কবি কৃষ্ণ প্রিয় ভট্টাচার্য ওখানেই উল্লেখ করেছেন -"বিকাশের কবিতা ক্রমশ বিকাশের মতোই বিকশিত "। কবি অনুপ আচার্য উল্লেখ করেছেন যে, মন ভরিয়ে দেওয়া মাটির গন্ধমাখা কবিতা।  
  

                                চায়ের দোকানে সেল্ফি 
                               চুপচাপ কবিকে দেখেছি 


 কবিকে নিয়ে কবি তুষার ভট্টাচার্য বলেছেন -"কবি বিকাশ সরকারের কবিতায় রয়েছে মাটির ঘ্রাণ।  জীবনানন্দর উত্তরসূরী প্রতিভাবান এই খানিকটা অনালোচিতই রয়ে গেলেন এটা ভীষণ আক্ষেপের। " 

                                               
                                           কবি বিকাশ সরকারের সঙ্গে আমি

 

                                     কবি বিকাশ সরকারের সঙ্গে কবি সানি সরকার 



জীবন কুড়ানো কথার যাদুতে ভরা কবিতার কবি , জীবন সংগ্রামের এক ফুটন্ত ভাতশিকারের কবি, কবি  বিকাশ সরকার তাঁকে শ্রদ্ধা ও প্রণাম। 
তাঁর ছন্দ হৃদয়ে দোলা দেয় আমার আমার করে কান । তাঁর দর্শন প্রতিটি শব্দে রহস্য মাখানো বোধ। 
উঠে আসে প্রতিটি নিয়তি মায়া । কবিতায় চুঁইয়ে পড়ে গ্রাম্য ভ্রাম্য প্রকৃতি । তাঁর  লেখার পিরামিড প্রেমে আমি হয়ে উঠি "বিষাদ বালক"। কবি আপনাকে অসংখ্যবার জানাই হার্দিক শ্রদ্ধা। আরো লিখুন আরো কবিতা চাই আমার এই বাংলা ভাষা। দু হাত খুলে আমাদের উজাড় করুন আপনার অনন্ত প্রেম। অপেক্ষায় আমরা আরো নতুন শব্দ বোধের আশায় ... 


                                                                                                                                    

মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন" ৩৮

একান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক।  তার নিত্যদিনের  আসা  যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন "।






'টানাপোড়েন' (৩৮)

          ফিকে স্মৃতি



                                                         রেখা ভেবেছিল আজকের সন্ধ্যাটা বেশ ভালোই কাটবে । মনোজ বেশ  ভাল ই ছিল ,মাঝখান থেকে ফোনটা এসে যাওয়াতে কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেল। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে রেখা টেবিলে বসলো একগাল হাসি নিয়ে, হাসিটা রেখা জোর করেই হাসছে মনোজের মুডটাকে ঠিক করার জন্য।
 রেখা বলল  ' কফিটা খুব টেস্ট হয়েছে। না ।তুমি ন্যাচারালি কফি ভালো বানাও। কি গো খাও? এত কি ভাবছো বল তো?'
মনোজের হঠাৎ যেন রেখার কথায় চমক ভাঙলো তারপর বলল  'হ্যাঁ, কি বলছো,?'
রেখা কফির দিকে তাকিয়ে ইশারায় কফিটা খেতে বলল।
মনোজ বলল 'তুমি স্টেশনে গেছিলে কেন?'
রেখা বলল  'আর ব'লো না। কালকে খাতা জমা দিতে হবে এ,ই জন্যই তো।'
মনোজ  বলল  'একদিনের মধ্যে খাতা জমা?'জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকিয়ে রইল রেখার দিকে'।
রেখা বলল  'আরে পর্ষদ নির্দেশিত ডেট দেওয়া হয়েছে। তো ,বড়দিরও কিছু করার নেই। ভাগ্যিস রিম্পাদি খাতাগুলো নিয়ে এসেছে। না হলে কি করতাম বল আমি?'
মনোজ বলল  'ঠিক কথা রিম্পাদির মতো একজন কলিগ তুমি পেয়েছো। তুমি ভাগ্যবতী।'
রেখা বলল  'আমি তো ১00 বার স্বীকার করি সে কথা রিম্পাদিও তো চলে যাবে ।এই তো কবে দেখো হুট করে ...।'
মনোজ বলল ' রিম্পাদি চলে গেলে ওরকম হিতাকাঙ্খী তুমি পাবে না তোমার স্কুলে।'
রেখা বলল 'আমি ও  ট্রানস্ফার নেব জানো তো?আশেপাশের স্কুলগুলো দেখি ভ্যাকান্সি আছে কিনা? কি বল তুমি?'
মনোজ বলল ' হ্যাঁ, সে তো দেখতেই হবে।'
মনোজ কফি খেতে খেতে মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে। ফোনটা আপন মনে ঘেটে যাচ্ছে।
রেখা বলল ' কি গো কি ভাবছো এত? এত ভেবো না ।দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।'
মনোজ বলল  'বলছো?'
রেখা বলল  'হ্যাঁ, গো ।যদি মনের দিক থেকে সৎ থাকো ,তোমার কেউ কিছু করতে পারবে না। ঝামেলা হয় তো তোমাকে একটু  পোয়াতে হবে।'
এরমধ্যেই মনোজের ফোনটা বেজে উঠল  'ক্রিং ক্রিং ক্রিং'
মনোজ বিরক্তিভরে বলল ' আবার সেই ফোন।'
একটু রেগে আর বিরক্তিভরে বলল ' হ্যালো'।
অপরপক্ষ বললো ' কি ব্যাপার ।আজকে অনেকক্ষণ ফোনটা সুইচড অফ করে রেখেছিলে কেন?'
মনোজ বলল  'তা আমি প্রয়োজন মনে করলে আমার ফোনের সুইচড অফ করতেই পারি ।তাতে কারো পারমিশন নিতে হবে নাকি?'
অপরপক্ষ বলল  'তা নিতে হবে বৈকি? তুমি যখন তখন তোমার ফোনের সুইচড অফ করে রাখবে । আর আমি যোগাযোগ করতে পারব না ।তা তো হবে না।'
মনোজ বলল  'কে তুমি ?আমার জীবনে এতটা দখলদারি করতে এসেছ?'
অপরপক্ষ বলল  'সেটা তুমি ভালো করেই জানো।'
মনোজ বলল  'জানি বলেই তো বলছি।'
রেখা বলল ' কে ফোন করেছে গো তোমায়।'
অপরপক্ষ বললো  'ও পাশে বউ বুঝি? এইজন্য তোমার এতটা গলাবাজি তাই না?'
মনোজ বলল  'সে তো ঠিকই। সে তো আমার বউ ।আমার জীবনের সমস্ত কিছুতে তার অধিকার। এটা আবার বলার অপেক্ষা রাখে না কি?'
অপরপক্ষ বলল  'এই দ্যাখো, আমি অত কিছু জানতে চাই না ।কি ভাবলে সেটা তুমি আগে আমাকে জানাও।
মনোজ বললো ' দ্যাখো তিথি ,তুমি আমাকে ব্ল্যাকমেইল করতে পারো না।'
তিথি বলল  'একশোবার পারি। তুমি আমার সাথে যে অন্যায়টা করেছ তার জন্য পারি।'
মনোজ বলল  'অন্যায়! আমি তোমার সাথে কি অন্যায় করেছি?'
তিথি বললো  'তুমি জানো না? তুমি কি অন্যায় করেছো?'
মনোজ বলল 'একথা অনেকবার হয়ে গেছে। আমি তোমার সাথে কোন অন্যায় করি নি ।বরং তুমি আমার সাথে অন্যায় করেছো ।আর এত বছর পর ফিরে এসে তুমি আমার জীবন টাকে বিপর্যস্ত করতে চাইছ?'
তিথি বলল  'সে তো ঠিকই ।আমি নিজে বিপর্যস্ত হবো আর তুমি সুখে সংসার করবে ।সেটা তো হবে না।'
রেখা কথাগুলো শুনছে।
তারপর রেখা বলল  'কে ভদ্রমহিলা এত গলাবাজি করছে তোমার সাথে? আমার কখনো এরকম গলাবাজি করার সাহস হয় নি।'
মনোজ বলল ' রেখা তুমি ভেতরে যাও। তোমার খাতা চেক করার ব্যাপার আছে। আমি ব্যাপারটা বুঝে নিচ্ছি। তোমাকে এই নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা করতে হবে না।'
রেখা বলল 'কিন্তু তুমি এত উত্তেজিত হয়ে যেও না।  শান্তভাবে কথা বলে মেটাও।'বলেই ভেতরে চলে গেল রেখা।
মনোজ বলল 'কেন তুমি আমার জীবনে এসে আমার সমস্ত কিছু ওলট-পালট করতে চাইছে তিথি?'
তুমি তো বিয়ে করে চলে গেলে। আজ কেন হঠাৎ তুমি আবার ফিরে আসলে ?'
তিথি বলল 'কি ব্যাপার এত মোলায়েমভাবে এখন কথা বলছ ।তোমার বউ বুঝি নেই পাশে।'
মনোজ বলল 'না নেই। ও স্কুল টিচার। ওর খাতা চেক করার আছে ।ওকে আমি ভেতরে যেতে বললাম।'
তিথি বলল 'ও তোমার বউ স্কুল টিচার? সেই জন্যই বুঝি তুমি আমাকে এত নেগলেট করছো?'
মনোজ বলল 'আমি তোমাকে নেগলেক্ট করছি না তোমার জন্য আমার সহানুভূতি হয়। কিন্তু তোমার জীবনে কি কোন ক্রাইসিসএসেছে যার জন্য তুমি..?
রেখা বলল-আমার ক্রাইসিস তুমি। তুমি আসলেই আমার সব সমস্যার সমাধান।
মনোজ  বলল  'তোমার স্বামীর কি খবর?'
তিথি বলল  'কোন স্বামী ?কিসের স্বামী?'
মনোজ বলল  'তুমি তো বিদেশে চলে গেছিলে বিয়ে করে।'
তিথি বলল' ' আমি কোন বিয়ে টিয়ে করি নি। আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই।'
মনোজ কথাটা শুনে মনে মনে একটু ভাবলো ।তারপর ভাবলো যদি ওকে কাছে পেয়ে বোঝানো যায়। তাহলে হয়তো সমস্যার সমাধান হতে পারে ।দেখা করলে কি আর ক্ষতি?
তিথি বলল  'দেখা করবে তুমি আমার সাথে?'
মনোজ বলল ' ঠিক আছে ।কোথায় বলো ?'
 তিথি বললো  'ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস?বা ন্যাশনাল লাইব্রেরী?'
মনোজ বলল  'ন্যাশনাল লাইব্রেরী?'
তিথি বললো  'ওকে ।তাহলে আগামীকাল সাড়ে ১০ টায়।'
মনোজ ফোনটা রেখে ভাবছে কথা তো দিলাম।চলে যাওয়াটা কি ঠিক? যেতে তো হবেই ।না হলে যেভাবে ফোনে আমাকে জ্বালাচ্ছে । দেখা করে এর থেকে  আর...?   ভাবতে ভাবতেই রেখার ঘরে ঢুকে ঢুকল।
মনোজ দেখছে রেখা খাতা দেখতে দেখতে পেতে শুয়ে পড়েছে। আলতো করে পেনটা হাত থেকে নিয়ে রেখে দিল টেবিলে। তারপর রেখার মাথায় হাত বুলাতে লাগল।
রেখা হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে মনোজকে দেখে হকচকিয়ে যায়। উঠে বসতে যায় তখন মনোজ বলে'তুমি খুব ক্লান্ত না? আর একটু ঘুমাবে?'
রেখা বলল  'না, ঘুমালে চলবে না। খাতাগুলো শেষ করতে হবে। আর বলল  মিলিদের খাবারের দেরী হয়ে গেলো ।খেয়েছো গো?'
মনোজ বলল  'তাই তো? আমারো তো খেয়াল হয় নি ।চিৎকার করে নি তো?'
রেখা বলল'না না না আমি যাই দেখি কি হলো?' বলেই তাড়াতাড়ি ছুটলো মিলির দিকে।
মনোজ বলল  'আমিও তোমার সঙ্গে যাচ্ছি। চলো।'
দুজনেই ছুটলো। রেখা মিলি মিলি করে ডাকলো কিন্তু মিলির কোন সাড়া নেই। কাছে গিয়ে দেখে মিলে শুয়ে আছে ।রেখা গায়ে হাত দিয়ে দেখে প্রচন্ড জ্বর। সঙ্গে সঙ্গে মনোজকে বললো  'দেখো দেখো মিলির গা কত গরম? '
মনোজ ও  মিলির গায়ে হাত দিয়ে দেখল ঠিকই। প্রচন্ড গরম। বাচ্চারা পাশে শুয়ে দুধ খাচ্ছে।
মনোজ পশু ডাক্তারকে ফোন করল' হ্যালো'।
অপরপক্ষ বলল ' হ্যাঁ ,বলুন।'
মনোজ বলল  'আপনি তো জানেন আমাদের  স্ট্রীট ডগ আছে ,ওর নাম হচ্ছে মিলি । ওর প্রচন্ড জ্বর কি ওষুধ দেয়া যায় বলুন তো? ও কিন্তু  মা হয়েছে।'
ডাক্তারবাবু   বললেন 'ওকে প্যারাসিটামল খাইয়ে দিন আর তার সাথে ডাইজিন খাইয়ে দিন।'
মনোজ বলল  'ওকে।'
ডাক্তারবাবু বললেন  'কালকে কেমন থাকে আমাকে একটু জানাবেন কেমন?'
মনোজ বলল ' নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই। অনেক ধন্যবাদ।'
রেখা বলল  ,.'আমার মিলি ঠিক হয়ে যাবে গো?  বলেই কাঁদতে শুরু করল।
মনোজ বলল ' হ্যাঁ, ঠিক হয়ে যাবে। দেখো না আমি এক্ষুনি পিন্টুদের দোকান থেকে ওষুধ নিয়ে আসছি।
তুমি খাবারের সঙ্গে গুঁড়ো করে ওটা খাইয়ে দেবে।'
রেখা বলল ' ঠিক আছে। তুমি যাও আমি ওয়েট করছি।'
মনোজ বলল ' আমি এক্ষুনি আসছি।'
রেখা বাচ্চাগুলোকে আদর করতে লাগল সঙ্গে মিলিকেউ। ও যেন কেমন অসহায় ভাবে রেখার দিকে তাকিয়ে আছে, আর মাঝে মাঝে মাঝে কাঁদছে।
এরমধ্যে মনোজ ওষুধ নিয়ে আসলো। রেখা খাবারের সঙ্গে গুঁড়ো করে খেতে দিল কিন্তু খাবার খেল না ।তখন রেখা বলল ' যাও মিষ্টি নিয়ে আসো ।ও মিষ্টি খেতে খুব ভালোবাসে ।মিষ্টির সঙ্গে ওষুধ খাওয়াতে হবে। '
মনোজ সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেল মিষ্টির দোকানে । মিষ্টি কিনে এনে রেখার হাতে দিল। রেখা মিষ্টির সঙ্গে গুড়িয়ে খাওয়ালো ।
তারপর রেখা নিজের রুমে চলে এসে চটপট  যে কটা খাতা বাকি ছিল, দেখতে শুরু করলো।
মনেজ ও  চলে গেল পাশের ড্রইংরুমে আর ভাবতে লাগলো সেই কলেজ লাইফের কথা। সবাই মিলে এক্সকারশনে গেছিল। কাশ্মীরের আপেল গার্ডেন , ডাললেক(শিকারা) ,আরুভ্যালি,চন্দনওয়ারী.... অসাধারণ আর  অসাধারণ পাহাড়, বরফ ,প্রকৃতি যেটা ভূস্বর্গ বলে খ্যাত সেখানে তিথির সঙ্গে একাত্ম হয়েছিল। 
কাব্য করে মনোজ কথা বলেছিল ' কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে বিদেশিনী ,চলে যাব তোমা সাথে ,বাঁধবো ঘর খানি। '
এলোমেলো ভাবনা চলেছিল তখন ।যদিও মনোজ সেই ভাবনাটাকে স্থিতিশীল করতে চেয়েছিল কিন্তু তিথি...?
আজ তিথি ফিরে আসলেও....।
আজ তার বিস্তর ফারাক। সেই স্মৃতি তাকে মনে করালেও স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়  বাস্তব বড় কঠিন।

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক গল্প "অলিখিত শর্ত"১০



শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত 
                                              (পর্ব ১০)
   শামীমা আহমেদ 



                                          ছুটির দিনের সকাল। রাস্তা বেশ ফাঁকাই ছিল।শিহাব এক ঘন্টায় ঝিগাতলায় তাদের নিজেদের বাড়িতে পৌছে গেলো।মাঝে পেট্রোল পাম্প থেকে বাইকে তেল নেয়া। পথে আর কোথাও থামল না। মা অপেক্ষায় আছে তাই আর দেরি করতে মন চাইছে না।সারা সপ্তাহ ফোনে কথা হয়, ভিডিও কলে কথা হয়, দেখা হয়।তবুও মাকে ছুঁয়ে না দেখলে সত্যিকারভাবে মায়ের কাছে যাওয়া হয় না। যতই ভিডিও কলে দেখা হউক।অবশ্য শিহাবের বাবা এ ব্যাপারটায় এখনো অভ্যস্ত হয়ে উঠেনি। শুধু পাশে বসে সবকিছু শোনে।শিহাবের বাবামায়ের কাছে অর্থাৎ দাদাদাদীর কাছে বড় হচ্ছে শিহাবের একমাত্র সন্তান  তিন বছর বয়সী  ছেলে আরাফ। সেও তার বাবার জন্য নাস্তা নিয়ে অপেক্ষায় থাকে। শিহাবের বাইকের আওয়াজ শুনলেই দৌড়ে বারান্দায় চলে আসে।
শিহাবদের ঝিগাতলার এই চারতলা বাড়িটি  ওদের নিজেদের । তিন আর  চারতলায় এক ইউনিট করে হলেও বাকীগুলি দুই ইউনিটে করা।আর সবই ভাড়া দিয়ে রাখা।তা প্রায় পনের বছর হয়ে এলো বাড়িটার। শিহাবের বাবা আমেরিকায় থাকতেই বাড়ির কাজে  হাত দেয়া। শিহাবের বড় ভাই শাহেদ তখন কলেজে পড়ছে আর শিহাব ক্লাস নাইনে।  একটা ছোট্ট দুইরুমের টিনের ঘর তোলা ছিল। নিজের এই জায়গাটায় ফ্যামিলি রেখে আমেরিকায় গিয়েছিলেন আজহার সাহেব,মানে শিহাবের বাবা। তারপর একেবারে বাড়ির কাজ শেষ হওয়া অব্দি বাইরে থেকে টাকা পাঠিয়েছেন। শিহাবের বড় মামা দেখভাল করে বাড়িটি করে দিয়েছেন।বাঙালি সমাজে বড়ভাইদের বোধ হয়  বোনদের জন্য এমন দায়িত্ব পালন করা অবশ্য কর্তব্য হয়ে যায়।  যদি ভায়েরা বিষয়টি সেভাবে দেখে।শিহাবের বাবা এরপরেও বহু বছর  বিদেশে কাটিয়ে বাড়ির লোন চুকিয়ে দেশে ফিরেন।এখন অবসর জীবন যাপন করছেন। খুবই গোছানো মানুষ তিনি। চোখে মুখে দেহে প্রকৃত বয়সের ছাপ পড়েনি মোটেও।নিজের দিকে ভীষণ খেয়াল।বিদেশ জীবন একা কাটিয়েছেন তাই নিজেকে স্বাবলম্বী করে তুলেছেন। স্ত্রীকে বেশি যন্ত্রণা করেন না। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকা পুরুষরা স্ত্রীদের বেশ সম্মানের চোখেই দেখে।তারা বুঝতে পারে, কত কঠিন ছিল তার একার জীবনে দুই সন্তানকে মানুষ করা।
এখন শিহাবের ছেলে আরাফকে নিয়ে তাদের সময় কাটে। বড় ছেলে শাহেদের পরিবার, তাদের এক ছেলে আর এক মেয়ে নিয়ে তিনতলায় থাকছে। 
ওরা নিয়মিত যোগাযোগে আছে। শিহাবের ভাবী সুমাইয়া বেশ চমৎকার একটি মেয়ে।
উচ্চশিক্ষা নিয়েও ঘরকন্যা আর সন্তান লালনপালনে  সাংসারিক জীবনটাকে এনজয় করছে। এ ব্যাপারে কোন অভিযোগ নেই।শ্বশুর শাশুড়ী আরাফের  যত্নআত্তিতেও সবসময় হাসিমুখ। শিহাবের বড় ভাই শাহেদ যেমন গম্ভীর, তেমনি মৃদুভাষী। যিনি একটানা বিভিন্ন প্রাইভেট ব্যাংকে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে এখন একটি বিদেশি ব্যাংকের এমডির পদে আছেন।
শিহাব বাইক বাড়িতে ঢুকিয়ে রুহুল আমিন চাচার সাথে কুশলাদি বিনিময় করলেন। রুহুল আমিন আজ প্রায় পনের বছর যাবৎ এই বাড়ির কেয়ারটেকার সাথে দারোয়ানের দায়িত্বও পালন করছে। বাড়ির গ্যারেজের পিছনে তাকে সপরিবারে থাকতে দেয়া হয়েছে। শিহাব চারতলায় উঠে গেলো।দরজা খোলাই ছিল।অবশ্য এই ফ্ল্যাটের দরজা খোলাই থাকে। সারাদিন শাহেদের দুই ছেলেমেয়ে সুনায়রা ও আরুশের দাদার বাড়িতে যাতায়াত। এই তিন নাতিনাত্নি নিয়ে শিহাবের বাবামায়ের বেশ সুন্দর সময় কাটে।তবে  শিহাব আর আরাফের চিন্তা তাদের মাঝে মাঝে অস্থির করে তোলে। শিহাব সেটা বেশ ভালো করেই জানে। তাইতো ছুটির দিনে আর দেরি করেনা একেবারে। আরাফ দৌড়ে এসে বাবার কোলে উঠল! বাবার গলা জড়িয়ে ধরলো। শিহাব  আরাফকে শক্ত করে বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। আদরে আদরে দুটো গাল ভরিয়ে ফেললো। বাবা ছেলের এমন মধুর মিলনে, মায়ের উপস্থিতি হলো না কোনদিন, কী দূর্ভাগ্য নিয়ে জন্মেছে!
শিহাবের মায়ের  একদিকে যেমন ছেলেকে কাছে পাওয়ার আনন্দ, অন্যদিকে মায়ের আদর বঞ্চিত ছোট্ট ছেলে আরাফের জন্য বুকটা হু হু করে উঠে। চোখ জলে ভরে যায়। শিহাবের বাবা আজহার সাহেব এইসব আবেগী ব্যাপারস্যাপার বেশ শক্তভাবেই সামাল দিতে পারে।ঠিক তার বড় ছেলেটিও এমনি আবেগহীন, মৃদুভাষী  আর গুছানো, প্ল্যানড লাইফে দিন কাটান।শিহাব আরাফকে নিয়ে মায়ের পাশে বসলো।মা ছেলের কান্নার দৃশ্যে আরাফ অবাক হয়ে দেখছিল। মিনিট দশেক পরিবেশটা বেশ ভারী হয়ে উঠল।আরাফের জন্য আনা খেলনাগুলো শিহাব মায়ের হাতে দিলেন। তিনতলা থেকে ভাবী চলে এলেন। শিহাবকে বললেন, নাসতা খাবে এসো।মা বাবা আরাফকে নিয়ে টেবিলে বসো। ভাবি তিনতলায় থাকলেও এই ঘরের সব প্রয়োজনই বুঝে। বড় ছেলে শাহেদকে নিয়ে মা বাবার কখনোই কিছু ভাবতে হয়নি।
বউওটাও আল্লাহ তেমনি মিলিয়ে দিয়েছেন।পরিবেশের সাথে নিজেকে খুব সহজেই মিলিয়ে নিতে পারে। কিন্তু শাহেদ ভীষন প্র‍্যাক্টিক্যাল মানুষ। ঠিক বাবা আজহারুল ইসলামের মতনই।
শিহাব তার ভাবীর কাছে জানতে চাইল সুনায়রা, আরুশ ওরা কোথায়? ওদের পাঠিয়ে দাও একসাথে নাস্তা করি। তুমিও বসো।অনেকদিন গল্প করি না। সুমাইয়া তার  হাতের মোবাইলে শাহেদকে কল দিতেই শাহেদ বাচ্চাদের পাঠিয়ে দিল। চাচ্চুকে পেয়ে তারা দারুণ খুশি!তারপর তারা আরাফের এই গল্প সেই গল্পে সারাদিন মেতে রইল। ওদের কাছে আরাফ একটা জ্যান্ত পুতুল! সেই জন্মের একমাস পর থেকেই ওরা বড়ভাইবোনের মত অভিভাবক। আরাফের মা কেন নেই সে প্রশ্ন ওরা করে না। এইটুকু জীবনে ওদের চাচার সবকিছুই ওরা প্রায় বুঝেছে। যদিও একজন ক্লাস এইটে আরেকজন ক্লাস ফাইভে পড়ছে। কিন্তু ওরা বুঝে আরাফের মা কাছে নেই আর কোনদিন আসবেও না।  
সুমাইয়া এখানেই সব খাবার পাঠিয়ে দিলো।সুমাইয়া খুব করেই জানে সুনায়রা আর আরুশ আজ আর তারা বাসায় যাচ্ছে না।নাস্তা শেষে ওরা আরাফের খেলনা নিয়ে খেলার  আনন্দে মেতে উঠল!
আজ এই চারতলার ফ্ল্যাটে রিশতিনাকে নিয়ে শিহাবের দিনগুলি অন্যরকম হতে পারতো!আর সেসব ভাবলেই শিহাব  বেশ নস্টালজিক হয়ে পড়ে,,,



                                                                                                           চলবে....

সাফিয়া খন্দকার রেখা এর গল্প

নিলয়ের বয়স তখন বিয়াল্লিশ আর প্রথমা মাত্র অনার্স প্রথম বর্ষে একুশ কিংবা বাইশ বছরের এক সুন্দরী যাকে দেখলেই যে কোন যুবকের মাথা ঘুরে যায়।  প্রথমার বাবার অফিসের কম্পিউটার অপারেটর নিলয়ের যাতায়াত ছিলো মোবিন সাহাবের বাড়িতে কারণ তার পি এর কাজও নিলয়কেই করতে হোত।


সে এক আশ্চর্য  লাশের চরিত্র  


হেমন্তের এই সময়টা নতুন চালের গন্ধে যেমন বাতাস ভারি হয় ঠিক তেমন ভারি হয়ে ওঠে প্রথমার মনের শরীর।   কতগুলো বছর অথচ কিছুই মুছে যায়না ভেতর ভেতরে কি ভয়ঙ্কর চিৎকার!  শরীর গুলিয়ে বমি আসতে চায়, বিছানা ছেড়ে অন্ধকার ঘরেই আস্তে আস্তে বেশিনের কলের কাছে এসে মুখে জলের ঝাপটা দেয়।  নিলয় গভীর ঘুমে থাকলেও পাশের ঘর থেকে শাশুড়ী মা ঠিক টের পেয়ে উঠে আসেন 
তুমি একজন ভালো ডাক্তার দেখাওতো বৌমা
আজকাল প্রায়শই দেখি তোমার বমি হয় ঠিকঠাক ঘুম হয়না, নিশ্চয়ই আমার ছেলেটা ঘুমিয়ে থাকে কিছুই জানেনা 
কথাগুলো বলছেন আর প্রথমার পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন রওশন বেগম।  
মা আপনি রাতে ঘুমান না একদম? 
ঘুমিয়ে ছিলাম তোমার বমি করার শব্দ পেলাম, 
সরি মা
আরে সরি বলার কি আছে
তুমি কিন্ত অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যাবে কাল, আর আজকাল তো ঘরেই টেস্ট করার কি সব বের হয়েছে নিজেওতো করতে পারো।
প্রথমা জানে শাশুড়ী মা ধরেই নিয়েছেন অন্য কিছু,
কিন্ত ও তো জানে নভেম্বর এলেই ও কেন সিক হয়ে যায়,
দশটা বছর অথচ ক্ষতের উপরে এতোটুকুও প্রলেপ পড়েনি।
প্রথমার শরীরে কেমন শীত লাগছে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওর শরীরে পৌষের ঠান্ডার মতো কাঁপন শুরু হতে লাগলো, পায়ের কাছ থেকে কাথাটা টেনে নিজের শরীরে দিলেও শীত কমছে না, নিলয়কে ডাকছে কিন্ত কোন শব্দ বের হচ্ছেনা প্রথমার মনে হোল ওর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে,  নিলয়কে ডাকছে কতক্ষণ তারপর আর কিছু মনে নেই ওর..... 

প্রথমার স্বামী নিলয় নিতান্তই ভদ্র এবং গো - বেচারা টাইপের মানুষ দশ বছর আগে যখন প্রথমাকে বিয়ে করে তখন সেই ঘটনা ছিলো একটি সিনেমার গল্পের মতো নিলয়ের বয়স তখন বিয়াল্লিশ আর প্রথমা মাত্র অনার্স প্রথম বর্ষে একুশ কিংবা বাইশ বছরের এক সুন্দরী যাকে দেখলেই যে কোন যুবকের মাথা ঘুরে যায়।  প্রথমার বাবার অফিসের কম্পিউটার অপারেটর নিলয়ের যাতায়াত ছিলো মোবিন সাহাবের বাড়িতে কারণ তার পি এর কাজও নিলয়কেই করতে হোত। মা ছোট বোন আর নিলয়কে নিয়ে তিন জনার সংসারে কোন বৌ নিয়ে আসতে পারেনি নিলয়ের মা শত চেষ্টা করেও কি এক অজ্ঞাত কারণে নিলয় বিয়ের নাম শুনতেই চাইতো না সেই মানুষ বিয়াল্লিশ বছর বয়সে যখন বসের মেয়েকে ঘরে এনে বললো মা দেখো আমি কিচ্ছু জানিনা কিভাবে কি হলো। 
নিলয়ের মনে হয়েছে বাবার প্রতি প্রতিশোধ নিতে এই কাজ করেছে প্রথমা রাগ কমে গেলেই ও চলে যাবে কিন্ত নিলয়ের ধারণা ভুল প্রমাণ করে দশ বছর এখনও একসাথে আছে ওরা।  

নিলয়ের মনে আছে মোমিন সাহেব যেদিন মেরিনা আপুকে বিয়ে করে ঘরে নিয়ে গেলেন তার চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই প্রথমার মা স্ট্রোক করে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই মরে গেলেন  প্রথমা একটুও কাঁদেনি সেদিন।  মেরিনা মোমিন স্যারের এসিস্ট্যান্ট হিসেবে জয়েন করেছে মাত্র আট মাস।  খুব স্বাভাবিক ছিলো  একুশ বছরের মেরিনাকে নিয়ে যখন ঘরে ঢুকে পরিচয় করিয়ে দিলেন মোমিন সাহেব 
" এই যে তোমাদের ছোট মা,
তোমার মা অসুস্থ থাকেন বেশির ভাগ সময় এজন্যই তাকে নিয়ে এলাম আমার সেবা করবে, তোমাদের যত্ন নেবে"
তুলি বুলি জমজ দুই বোনের বয়স তখন তেরো ওরা দুজন দৌড়ে মায়ের ঘরে ঢুকে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছে কতক্ষণ সে দরজা বন্ধ ছিলো মনে নেই।  প্রথমা মেরিনার কাছে এসে আস্তে করে প্রশ্ন করেছিলো 
তোমার বয়স কতো ছোট মা?
সদ্য বিবাহিত লাল বেনারসি মোড়ানো মেয়েটি জবাব দিয়েছিলো একুশ... আমার বয়স কত জানেন ছোট মা?
মেরিনা মাথা নেড়ে না বলেছিলো,
আমি আপনার সিনিয়র আমার বাইশ
তারপর সব দ্রুত ঘটে গেলো 
প্রথমার মায়ের মৃত্যুর তিন দিনের শেষে নিলয়েকে অফিসের ডেস্ক থেকে কাজী অফিসে নিয়ে গেলো প্রথমা।
তুলি বাসা থেকে বেড়িয়ে সেই যে কোথায় গেছে আজও কেউ জানেনা বুলি মেঝ মামার সংসারে থাকে সেই থেকে মামীর কোন সন্তান নেই ওকে বেশ আদোর করেই রেখেছেন তারা।
নিলয় জানে নভেম্বরের তিন তারিখ থেকে পুরোটা মাস প্রথমাকে এইসব ঘটনা বেশি করে জাপটে থাকে।  পাঁচ বছর পড়ে এক সন্ধ্যায় নিলয় যখন জানালো মোমিন সাহেব অফিসে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন হাসপাতালে অক্সিজেন দেয়া ডাক্তার বলেছেন অবস্থা ভালো না, 
নিলয়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে প্রথমা বলেছিলো..
পাঁচ বছর আগের লাশের নতুন করে আবার কিসের মৃত্যু!! 

মেরিনার ঘরে সাত বছরের এক ছেলে আছে মোমিন সাহেবের। বারবার ফোন করে সেই ছেলে প্রথমাকে কি আদুরে গলায় ডাকে... বড় বুবু
আমাকে দেখে যাও মা তোমাকে কিছু বলতে চায়।  প্রথমা শুনতে পায় পাশে কেউ শিখিয়ে দিচ্ছে কথাগুলো, 
প্রথমার কি যেনো হয় দশ বছর পর সে সেই বাড়িটার দিকে ছুটছে যেখানে তার বাইশটি বছর কেটেছে  যেখানে তুলি হারিয়ে গেছে যে বাড়িতে মা মরে গেছে দশ বছর আগে প্রতিদিন অফিস ফেরত বাবার জন্য ওরা অপেক্ষা করতো তিন বোন বাবা গরম গরম নাস্তা নিয়ে ঘরে ফিরতো দূর থেকে প্রথমা বলে চিৎকার করতো...
বাড়ির অদূরে এসে প্রথমার পা চলতে চায়না , কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলো মনে নেই হঠাৎ প্রথমার মনে হোল দু পাশ থেকে দুটো হাত তাকে ধরে আছে, ছোট্ট একটা হাত টানছে চেনা ঘরটার দিকে.. আর বলছে তুমি বড় বুবু আমি তোমাকে চিনেছি , 
প্রথমা তাকিয়ে দেখলো হুবহু বাবার ছেলেবেলার চেহারার একটা ছোট্ট হাত টেনে নিয়ে যাচ্ছে তাকে 
মেরিনাকে বেস বয়স্ক লাগছে
স্বামী মরে গেলে বুঝি মেয়েরা বয়সের আগেই বুড়িয়ে যায়!
মেরিনা একটি বড় খাম এনে প্রথমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো 
আমার যাওয়ার কোন জায়গা নেই মামার ঘরে মানুষ হয়েছি মামা আপনার বাবার বন্ধু ছিলেন তিনিই চাকরি দিলেন বিয়ে দিলেন।  আপনার বাবা আপনার কথা খুব বলতেন এই বাড়ি অফিসের টাকা পয়সা সব আপনার নামে করে দেয়া...
ছোট্ট হাতটা তখন প্রথমার চোখ মুছিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করছে 
বড় বুবু তুমি কি আমাদের তাড়িয়ে দেবে এ বাড়ি থেকে! 
প্রথমা ফাইল না খুলেই মেরিনার হাতে দিয়ে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে ছোট্ট হাতটা আবার টানছে.. 
প্রথমা মেরিনার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে আগামী সপ্তাহে উকিল নিয়ে আসবো সব ভাইয়ের নামে করে দেবো,  মেরিনার কান্নার মুখটা একদম মায়ের মতো লাগছে আজ প্রথমার কাছে....

লেখক শান্তা কামালী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "বনফুল" ১৯

চোখ রাখুন স্বপ্নসিঁড়ি সাহিত্য পত্রিকার পাতায় লেখক শান্তা কামালী'র  নতুন ধারাবাহিক  উপন্যাস "বনফুল" 





বনফুল
                   ( ১৯ তম পর্ব ) 



                                            জুঁই উপরে উঠে হাত পা ছেড়ে শুয়ে পড়ল,ঘড়িতে তখন তিনটে বাজে। ফোনটা হাতে নিয়ে পলাশকে ফোন দিল, ওপাশ থেকে পলাশের কণ্ঠে বললো কেমন আছো জুঁই ? স্যরি জুঁই আমি আর তোমাকে ফোন দিতে পারিনি! এপাশ থেকে জুঁই বললো its Okay আমি তো দিচ্ছি, মোট কথা একজন দিলেই হলো।
আমিও ব্যস্ত ছিলাম তাইতো তোমাকে ফোন দিতে পারিনি, এখন বল তোমার বন্ধু কেমন আছেন?  
হুমমম ভালো আছে, এতক্ষণ পর্যন্ত তোমার গল্পই হচ্ছিল..... 
জুঁই হাহাহা হাহাহা হাহাহা  হেসে উঠলো! আমায় নিয়ে আবার গল্প করার কি আছে, আমি সাদামাটা একটা মেয়ে মাত্র,আমি তো ক্লিওপেট্রা নই। আচ্ছা তোমাদের বন্ধুত্বের গল্পে ভাগ বসাতে চাই না, কালকে ঠিক সময়ে চলে এসো। ফোন রাখছি বাই বাই বলে জুঁই ফোন কেটে দিলো। কিছুক্ষণ চুপ করে শুতেই ঘুমিয়ে পড়েছে জুঁই। পাঁচটায় জুঁয়ের ঘুম ভাঙ্গলো, হাতমুখ ধুয়ে নিচে নেমে আসতেই ময়না জিজ্ঞেস করলো আপামনি আপনাকে চা দেবো না কফি?  
জুঁই বললো কফি দাও সাথে হালকা কিছু স্ন্যাকস দিও।
আজ জুঁয়ের মা ভীষণ ব্যস্ত কালকে বাসায় মেহমান আসবে, তাই আজ থেকে সব কিছু গুছিয়ে রাখছে, যেন সকালে নাস্তার পরই একে একে সব রান্না করে নিতে পারেন।
আজ জুঁই বাবা-মায়ের সঙ্গে চুটিয়ে গল্প করলো রাত দশটা পর্যন্ত, তারপর ময়না টেবিলে খাবার পরিবেশন করেছে। বাবা-মা মেয়েতে ডিনার শেষ করে। গুডনাইট বলে জুঁই  উপড়ে উঠে এলো। 
দাঁত ব্রাস করে ফ্রেস হয়ে জুঁই শুতে যাওয়ার আগে নিজেকে একবার আয়নায় দেখে নিলো।তারপর ভাবলো কালকে কি ড্রেস পরবে।কোন বডি স্প্রে টা পলাশ কে বেশী আকর্ষণ করবে,এইসব ভাবতে ভাবতে একটা চুড়িদার ওড়না, ইনার গার্মেন্টস সবকিছু গুছিয়ে রাখলো।পড়ার টেবিলে একটা ফটো ফ্রেমে নিজের একটা হাল্কা পোশাক পরা ছবি লাগিয়ে বসিয়ে দিলো।আবারও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বিনুনি দুটো পেছন থেকে সামনে এনে বুকের দুপাশে দুলিয়ে দিয়ে নিজেকে দেখে নিজেই হেসে ফেললো। প্রতিবিম্ব কে যেন নিজেই প্রশ্ন করলো",উঁ এইটুকু মেয়ে আবার প্রেম করে"।ঠোঁটের ওপর হাল্কা করে ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে মুখটা এঁকিয়ে বেঁকিয়ে নিজেকে মুগ্ধ হয়ে দেখছিলো,এমন সময় 
 পলাশ একটা গুড নাইট মেসেজ পাঠালো।ফোনটা হাতে নিয়ে পলাশ কে ফোন দিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,তোমার বন্ধু কি ঘুমিয়েছে, না-কি এখনো আমাকে নিয়েই.....। পলাশ বললো, এতোক্ষণে ঘুমিয়েছে বলেই তো শুভ রাত্রি জানাতে দেরি হয়ে গেলো।
একটা মিষ্টি হাসির মৃদু শব্দ শুনিয়ে পলাশ কে শুভ রাত্রি জানিয়ে জুঁই ঘুমাতে গেল।


                                                                                                চলবে....

রুকসানা রহমান এর ধারাবাহিক উপন্যাস "উদাসী মেঘের ডানায়"২৩

চলছে নতুন  ধারাবাহিক  উপন্যাস "উদাসী মেঘের ডানায়" 
লেখাটি পড়ুন এবং অন্যদের  পড়তে সহযোগিতা করুন  লেখককের মনের অন্দরমহলে জমে থাকা শব্দগুচ্ছ একত্রিত হয়েই জন্ম  লেখার। 
আপনাদের মূল্যবান কমেন্টে লেখককে  লিখতে সহযোগিতা করবে। 




উদাসী মেঘের ডানায় 
                                                  (পর্ব ২৩)


                                                 সমিয়া,সোজা যেয়ে উঠলো তৃষ্ণার বাসায়,তৃষ্ণার মা অবাক কন্ঠে বললো- কি হয়েছে তোমার সুটকেস ব্যাগ নিয়ে কোথাও যাবে মা?
সামিয়া - না, খালা কয়টা দিন আমাকে থাকতে দিন।
তারপর চলে যাবো বাসা ঠিক করে, দিবেন থাকতে?
- ওমা সেকি কথা থাকতে দিবোনা মানে এসো পাগলি
মেয়ে কোথাকার,এতো ক্লান্ত দেখাচ্ছে কেন কিছু খাওনি, তৃষ্ণা কোথায়?
সামিয়া- খালা আমি অফিস থেকে অনেক আগে চলে
এসেছি একটা জরুরী কাজ ছিলো সেটা শেষ করে
এসেছি তৃষ্ণা চলে আসবে হয়তো কাছাকাছি চলে
এসছে।
- যাও হাতমুখ ধুয়ে ঐরুমে যাও আমি খাবার রেডি করি।
সামিয়া- তৃষ্ণা আসুক, আমি বরং একটু বিশ্রাম নেই।
এইবলে গেষ্টরুমে চলে গেলো।
তৃষ্ণা বাসায় এসেই মার কাছে সব শুনে সামিয়ার রুমে এসে দেখে সামিয়া শুয়ে আছে।
ওর মাথায় হাত রাখতেই সামিয়া চোখ খুলে উঠে বসে
তৃষ্ণা কে জড়িয়ে ধরে কাদঁতে কাদঁতে বললো -
পারলাম নারে সংসারটা টিকিয়ে রাখতে আমি হেরে গেলাম ভালোবাসার কাছে।
তৃষ্ণা- কেন কি হয়েছে খুলে বলো।
সামিয়া- আমি বাধ্য হলাম আর অপমান,অপবাদ নিতে পারলামনা তাই ডিভোর্স দিয়ে তোর কাছই ছুটে
এলাম,কয়টা দিন থাকি তারপর চলে যাবো।
তৃষ্ণা- অনেক সহ্য করেছো আর কতো, খালা তোমার
ভাাই বোনেরা জানে।
সামিয়া- না বলিনি,আর ভাইয়ের বাসায় গেলে আবার
জোর করে পাঠিয়ে দিবে, মাকে আমার জন্য কথা শুনতে হবে।বোনের কষ্টে ওদের কষ্ট হয়না, ওদের মান-সন্মান অনেক বেশি, তাইতো তোর কাছেই এলাম।
তৃষ্ণা- এসেছ যখন তখন এখানেই থাকবে বাড়ি ভাড়া
নিতে হবেনা আমাাদের কতরুম খালি পড়ে আছে
তাছাড়া আমাকে তো তুমি ছোট বোনের মতন আদর করো, কাজেই আমার কথাই শুনতে হবে।
সামিয়ার মা দরজায় দাঁড়িয়ে সব শুনে সামিয়ার কাছে
এসে বুকে জড়িয়ে ধরে বললো- আজ থেকে আমার
দুটো মেয়ে,তৃষ্ণা অফিসের কাপড় চেন্জ করে হাতমুখ
ধুয়ে আায় দুজন ডাইনিং এ কিছু খেয়ে নাও তারপর
গল্প করো।এই বলে উনি বেরিয়ে গেলো।


                                                                                      চলবে...

০৫ নভেম্বর ২০২১

কবি বিকাশ সরকার আলোউৎসবে এবং আমরা দুইজন

ভালোবাসা থেকে প্রেম 

দেবব্রত সরকার 

                             কবিতা নয় কবি।  হ্যাঁ তিনি কবি।  কবি বিকাশ সরকার।  নরম। উজ্জ্বল। মিষ্টি।  সুন্দর। নিরলস।  নির্মম।  সহানুভুতিশীল।  নিরহঙ্কারী একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ।  তিনি কবিতা যোগে নিজেকে মাখিয়ে রাখেন।  উপন্যাস তার প্রতিবাদের কথা বলে।  প্রেম মেখে ওঠে কবিতা।  বোধের মাঝে ডুবিয়ে রাখেন মন।  ভালোবাসার মাঝে খোঁজেন প্রাণ।  উদারতা এক বিস্ময়কর প্রকাশ।  উজ্জ্বল কচি হাসি আর যোগনিদ্রায়িত চোখ।  নিবিড় সান্যিদ্ধে কুড়িয়ে নেয় বুক।  অদ্ভুত মানুষ কবি বিকাশ সরকার। 

         কবি বিকাশ সরকার  এক বিশেষ মুহূর্তে                                 (ছবি দেবব্রত ও সানি সরকার )


 তাঁর লেখা কবিতার গোপন দৃশ্যে প্রেম প্রকৃতি হয়ে ওঠে অনন্ত।  ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে লেপটে থাকা সম্পর্ক যখনও তাঁর  হিংসা করে।  ভাবুক কবি নিয়তি মায়ায় নিজেকে খুলে খুলে দেয়। আদর ছুঁড়ে দেয় স্নেহভাজনদের দিকে। তাঁর চুপচাপ আর্তনাদ কেও দেখে , কেও দেখেও নির্বাক। অথচ কবি চুপচাপ। নেশা নেই শ্রেষ্ঠত্বের।  কাজ করে জান।  ভালোবাসা ছুঁয়ে ছুঁয়ে ঝরে পড়ে নদী। যেমন প্রকৃতি ভালোবাসে প্রাণ।  তেমনই ভালোবাসে কবি।  


      কবি বিকাশ সরকার                                 (ছবি তুলেছেন দেবব্রত সরকার) 

"কবিতার মাঝে এঁকে চলে প্রেম আর জীবনের কথা।  তিনি আর কেও নন কবি তিনি ব্যথা।"  এই কথায় কবিজীবনের সব উত্তর।  কবি বিকাশ সরকার  আজও একই ভাবে গতিময় জ্ঞান।  কবি বিকাশ সরকারের কবিতায় কি এক যাদুময় অনুভূতি। 

            কবি সানি সরকার                                                                          ছবি নিজস্বী 

আজ আলোউৎসবের দিনে হঠাৎ তাঁর বাড়িতে গিয়ে হাজির। আমি আর সানি মানে কবি সানি সরকার। সানি খুব ভালো কবিতা ও গল্প লেখে। পেশা বলতে  সাংবাদিকতা। তরুণ কবির মুখে একমুখ প্রাণচ্ছল মনখোলা আদুরে ভালোবাসার হাসি।  যে কেউ ভিজে যায় তার নরম হাসি আর সুরালো ভাষায়। 
.  

কবিতায় নিয়ে আসে প্রেম আর মায়া। কখনও বা হেসে খেলে জড়িয়ে দেয় মন। আবার কখনও ভালোবেসে ভিজিয়ে ফেলে চোখ।  কবিদেরই মনে হয় এমন হয়। ভালোবাসা তাঁদের বড়ই নিবিড়।  আর প্রেম অনন্ত।    খুব মজা করলো কবি বিকাশ সরকারের সঙ্গে।  দীর্ঘ ৬ বছর পর বিকাশঝোরা কে পেয়ে আপ্লোত কবি সানি সরকার। জড়িয়ে ধরলেন মায়াবী।  কবি তাঁর আদর দিয়ে ভাসিয়ে নিলেন আলো উৎসবের দিন। 


                                                                                                                
  

চলবে ....

রুকসানা রহমান এর ধারাবাহিক উপন্যাস "উদাসী মেঘের ডানায়"২২

চলছে নতুন  ধারাবাহিক  উপন্যাস "উদাসী মেঘের ডানায়" 
লেখাটি পড়ুন এবং অন্যদের  পড়তে সহযোগিতা করুন  লেখককের মনের অন্দরমহলে জমে থাকা শব্দগুচ্ছ একত্রিত হয়েই জন্ম  লেখার। 
আপনাদের মূল্যবান কমেন্টে লেখককে  লিখতে সহযোগিতা করবে। 




উদাসী মেঘের ডানায়   
                                                     ( ২২তম পর্ব ) 




                                                            সামিয়া জন্ডিস থেকে ভালো হবার পর বাববার ওর কানে ভেসে আসছে সৈকতের কথা ক্লিনিক ছাড়ো
বাসায় চিকিৎসা হবে , নয়তো ডিভোর্স দিবো আজ ও অফিসে এসে আগের মতো আর হাসিখুশি নেই
কেমন যেনো নিরব হয়ে গিয়েছে, তৃষ্ণা কিছু জিগ্যেস
করলে ও কিছু বলেনা। কল করলে ও বলে পরে শুনিস এখন ভালো লাগছেনা। আজ অফিস থেকে
স্যারএর রুম থেকে বেরিয়ে তৃষ্ণা কে বললো আমি
একটু কাজে যাচ্ছি এই বলে বেরিয়ে গেলো।
সামনে এসে দাঁড়ালো একটি খালি রিকসা তাকিয়ে
দেখে মহিলা চালক অবাক হয়ে বললো
-তুমি রিকশা চালাও?
-হ ম্যাডাম, ওডেন কই যাইবেন।

সামিয়া উঠে পড়লো- মেইন রোডে ধরবেনা, লাইসেন্স আছে?
মহিলা - আমিই আমার লাাইসেন্স।
খানিকটা যেয়ে সামিয়া বললো - তোমার নাম?
-নুরজাহান, হাজারিবাগ থানার সামনে থাকে পুলিশ
আমারে কিছু কয়না বেক্কে চিনে নুরজাহান কইলে
কই যাইবেন আপা কইলেন না।
পুরান ঢাকা সুপ্রিম কোটে।
চিনো রাস্তায় ধরবেনাতো তেমায়?
-না চিন্তা কইরেন না।
সামিয়া-তুমি ইন্জিন চালিত রিকশা চালাও কেনো?
নুরজাহান - কি করমু এক্সিডেন্ট আমার স্বামি বাচ্চা মইরা,গেছে আমার একটা হাত-পা ভাঙা,পেটের দায়ে
চালাই।
সমিয়া,অবাক হয়ে ওর জীবন কাহিনী শুনে ভাবলো
ও যদি একা বাচঁতে পারে আমি কেন বাচঁতে পারবোনা আমাকে পারতেই হবে যা,কষ্ট হউক একাই
বাচঁবো আর নয়।
কাজি অফিসে ঢুকে কথা বলে বেরিয়ে এলো
কাজি বললো দুদিনের ভিতর নোটিশ চলে যাবে
সামিয়া,বাসায় ফিরে সুটকেস গুছিয়ে বের হয়ে এলো।


                                                                            চলবে...

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক গল্প "অলিখিত শর্ত"৯




শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত 
                                              (পর্ব ৯)
   শামীমা আহমেদ 



                                                প্রায় দুই আলমারী বোঝাই শিহাবের পোষাক,একটি তো স্যুট দিয়ে, তারপরেও তার মায়ের আলমারী দখলের চেষ্টা।আবার কিনতে গেলেই সাত আট সেট পোষাক একসাথে নিয়ে আসে,আরো চার পাঁচ সেট বানাতে দিয়ে আসেন টেইলারিং শপে। একসেট পোশাক একদিন পরলে আবার সেটা পরার জন্য ঘুরে আসতে কখনো দুই মাসও লেগে যায়। কেউ বলবে না এক পোষাকে তাকে দুই দিন দেখেছে।অবশ্য গ্রামে গেলে অনেক কাপড় বিলিয়ে দিয়ে  কিছু  কমিয়ে আসে।আবার যা তাই,নতুন নতুন  কিনে আলমারী ভরিয়ে ফেলা।
আর মা এতে বেশ বিরক্ত।দরকারের সময় প্রয়োজনীয়  জিনিসপত্র খুঁজে পায়না।সেই কলেজ লাইফ থেকে শিহাবের এই পোষাক বিলাসিতা।মাতো প্রায়ই বলেন, তোর কাপড়চোপড়ের যন্ত্রণায় আমার বাড়ি ছাড়তে হবে। এগুলো দিয়ে একটা শোরুম খুলে ফেল।বিক্রি হলে কিছু আয় হবে,ঘরে কিছুটা হলেও কাপড় কমবে।  মায়ের এই রাগ সবই বৃথা যায়।মা খুব ভালো করেই জানে কাপড়ের সাথে শিহাবের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। সে টিপটপ চলতে পছন্দ করে।সেই যে সেই কলেজ জীবনে ফার্স্ট ইয়ারে কলেজে যাবার জন্য দুই সেট শার্ট প্যান্ট আজো রয়েছে স্মৃতি হয়ে।ঘড়ি আর সানগ্লাস এগুলোতো ব্র‍্যান্ডেড হতেই হবে।জুতা! সেও এক ইতিহাস। যেমন জুতার সংগ্রহ তেমন তাদের যত্নআত্তি।দেশের বাইরে গেলে বাড়তি  সুটকেস কিনতে হয় জুতা ক্যারি করতে। আর যখন বাইরে  বেরুবে সুগন্ধিতে তো সারাবাড়ি মৌ মৌ করবে!
দু তিনটে পারফিউম মিশিয়ে স্প্রে করা শিহাবের হ্যাবিট।একসময় খুবই সৌখিন ছিল এইসব নিয়ে।এখন কিছুটা কমেছে।তবে পরিস্কার পরিচ্ছন পরিপাটি পোষাকে নিজেকে খুব যে জাহির করে সেটা নয়,  শিহাব বরাবরই খুবই মার্জিত  আর সংযত তার চালচলনে।একসময় উঠতি তরুণ বয়েসে নিত্য নতুন পোষাকে  সেকি রোমিও রোমিও ভাব নিয়ে চলা! মেয়েরা জানালা, দরজার আড়াল থেকে, বারান্দায় কাজের অজুহাতে কিংবা মোড়ের দোকানে কিছু কেনাকাটার ছলে  শিহাবের আড্ডার পাশ দিয়ে ঘুরে আসতো।সে সব দিনের কথা ভাবলে শিহাবের বেশ হাসি পায়।কিন্তু শিহাবতো শুধু একটা বারান্দারই অপেক্ষায় থাকতো।
তা হউক কড়া রোদ, ঝড়, বৃষ্টি কিংবা প্রচন্ড শীত আর এরজন্য বন্ধুদের নিয়ে কত হাজার  টাকা যে চায়ের বিল দিতে হয়েছে!

শিহাব চা খেয়ে গোসল সেরে নিলো।ঘড়ির কাটা আটটা ছুঁই ছুঁই। মা নাস্তা নিয়ে অপেক্ষায় থাকবে।গতরাতে মা আর আরাফের জন্য যা যা কেনাকাটা করেছিলো সেগুলো একেএকে গুছিয়ে নিলো। নিজে গুলশান মার্কেট থেকে কেনা প্রিন্টেড শার্ট, মিলিয়ে প্যান্ট আর গায়ে সুগন্ধি ঢেলে  নীচে নেমে এলো।আকর্ষণীয়, সুন্দর সুপুরুষ বলতে যা বুঝায়!এদেরকে ফিল্মেই মানায়। সিনেমার পর্দায় দারুণ দেখায় আর দর্শকরা তাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে।হিরো হওয়ার প্রস্তাবও দু'একবার এসেছিল। দূরসম্পর্কের এক সিনেমা মামা আছেন।সিনেমার পরিচালক।ছোটবেলা থেকে এই নামেই চিনে তাকে।সিনেমা বানায় বলে নামের সাথে সিনেমা শব্দটা জুড়ে গেছে। সেই সিনেমা মামা ছোট বোন শিহাবের মাকে বলেছিল, ছেলেকে নায়ক বানাবি নাকি? তাহলে পাঠিয়ে দিস,,
কোথায় কি! নায়ক! সন্ধ্যা হলে মা পিটিয়ে পড়াতে বসাতেন।পড়ালেখা ছাড়া কোন কথা নেই।বাবা বিদেশ থেকে হাঁড়ভাঙা খাঁটুনি করে টাকা পাঠায়। কড়া নির্দেশ, দুই ছেলে যেনো মানুষ হয়। শিহাবের বড় ভাই শাহেদ ছিল খুবই মেধাবী।তার সাথে তুলনায় শিহাব বরাবরই পিছিয়ে যদিও দুষ্টুমিতে এগিয়ে।
শিহাবের সিনেমার নায়ক হওয়া হয়নি তবে তার ভেতরে শিল্প সাহিত্য গান সিনেমা এইসব  নান্দনিকতার প্রভাব প্রবল।সে যেমন আবেগী তেমনি রোমান্টিক। 
শিহাব তিনতলা থেকে নেমে এলো। নিজে  হাতে বাইকটা মুছে নিয়ে চোখে সানগ্লাসটা বসিয়ে বাইকে স্টার্ট দিল আর সাথে সাথেই প্রতিদিন নিয়ম করে যে ব্যাপারটা ঘটে যাচ্ছে, নীচতলার ভাবী দরজা খুলে তাকে উৎসুক চোখে একনজর দেখে নিচ্ছে। শিহাব ব্যাপারটা বেশ এনজয় করে।আর সামনের বিল্ডিংয়ের ডাইনিং এর পর্দাটা একটু সরবেই।কিন্তু কে আছে পর্দার পিছনে তা আর দেখা হয় না।শিহাব এসব ব্যাপার ফেস করে অভ্যস্ত।এ এলাকায় শিহাব নতুন।তাকে দেখবার উৎসুক চোখ তো থাকবেই!
শিহাব মনে মনে দিনের প্ল্যানটা করে নিলো। উত্তরা থেকে জিগাতলা যাওয়ার পথে পরীবাগের পেট্রোল পাম্প থেকে বাইকের জন্য তেল নিতে হবে।আর কিছু না ভেবেই  শিহাব বাইক স্টার্ট দিয়ে ঝিগাতলার দিকে ছুটলো।
চলবে....

মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন"৩৭

একান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক।  তার নিত্যদিনের  আসা  যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন "।




 'টানাপোড়েন' (৩৭)

 এক রাস্তা হ্যায় জিন্দেগি



                                   রেখা হঠাৎ করেই দেখছে পরপর কতগুলো মেসেজ ঢুকছে। রেখা হোয়াটসঅ্যাপটা চেক করে দেখে স্কুল গ্রুপে মেসেজ ঢুকেছে। রেখা চশমাটা পরে ভাল করে দেখল"আরে এ তো এমসিকিউ 'এর মূল্যায়ণের জন্য খাতা ইমিডিয়েট সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে। আগামী পরশু দিন খাতা জমা দিতে হবে।'
রেখা দেখল  'আজকে তো  স্কুলে যায় নি। হাতে সময় মাত্র একটা দিন ।কালকে স্কুলে গিয়ে খাতা এনে চেক করে দেয়া অনেকটা টাফ ব্যাপার ।কি হবে এখন ?এদিকে মনোজ ও  ফেরে নি ।ওদিকে কী হলো কে জানে? রিম্পাদিকে বললে হ'তো, খাতাটা যদি নিয়ে আসতো, স্টেশন থেকে সংগ্রহ করা যেত। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ,সে সময় পেরিয়ে গেছে। এখন তো বলেও লাভ নেই। রিম্পাদি তো ট্রেনে চেপে পড়েছে ,কি হবে? শরীরটাও ভাল নেই। কী যে হচ্ছে ,কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না ।সবকিছু কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।'
 অন্যদিকে মিলি  চেঁচাচ্ছে। বাবা, ওর আবার খিদে পেয়ে গেল। এত ঘনঘন খিদে পাচ্ছে। ওকেই বা দোষ দিয়ে লাভ কি ?বাচ্চারা বড় হচ্ছে, দুধ খাচ্ছে ,ওর ক্ষিদের পরিমাণ বাড়ছে, তাছাড়াও ঠিক করে না খেলে বাচ্চাদের দুধ ই বা পাবে কোথা থেকে?এই ভেবে গেল মিলিকে কিছু খাবার দিতে। মিলির কাছে যেতেই মিলি রেখাকে ওর ভাষায় রাগ দেখাতে লাগলো ।মানে ওর ভাষায় কিছু বলতে চাইছে যে এত দেরি করে দিচ্ছ ?খিদে পাচ্ছে ।তোমার কি টাইম জ্ঞান নেই?
রেখা হেসে বলল '  মা গো, আমার তো কাজ থাকে নাকি, রাগ কোরো না। খেয়ে নাও। '
মিলিও সেই কথা শুনে রেখার দিকে একটু তাকালো, তারপর লেজ নেড়ে খেতে শুরু করল।
এরমধ্যেই শুনতে পেল ঘরেতে ফোনে আওয়াজ হচ্ছে। রেখা মিলিকে খেতে দিয়ে ছুটল ফোনের দিকে।যেতে যেতে ফোনটা কেটে গেল। ভাবলো হাতটা ধুয়ে নিয়ে ফোনটা রিসিভ করবে ।
এরমধ্যে আবার ফোন বেজে উঠলো। রেখা হাত ধুতে গিয়ে আবার ফিরে আসলো ।বাহাতে ফোনটা রিসিভ করল ,ডান হাত টা তখনও এঁটো।
 রেখা বলল  '"হ্যালো।
অপরপক্ষ বলল 'এই রেখা আমার ট্রেন পালপাড়া ছাড়ছে ।তুই রেডি হয়ে স্টেশনে চলে আয় ।আমি তোর খাতাগুলো নিয়ে এসেছি ।কারণ খাতাগুলো চেক করে তাড়াতাড়ি জমা দিতে হবে।'
রেখা খুব খুশি হয়ে বলল  'তুমি কি করে আমার মনের কথা বোঝো রিম্পা দি ।সত্যিই তুমি ছাড়া কে বুঝবে আমাকে বল তো?'
রিম্পাদি বলল  ,'কি হয়েছে বল তো? হঠাৎ এরকম বলছিস কেন?'
রেখা বলল  ' মনে মনে এটাই ভাবছিলাম যে রিম্পাদি   কে বললে তো, খাতাগুলো দিয়ে যেত। মেসেজটা একটু আগে দেখতে পেলাম। আরেকটু আগে যদি বড়দি মেসেজ দিত। তাহলে হ'ত।'
রিম্পাদি বলল  'আমি জানি তো। সেই জন্যই তো আমি তোর খাতাগুলো নিয়ে আসলাম।'
রেখা বলল  'তোমাকে আমি থ্যাঙ্কস জানাবো না ।কারণ থ্যাংকস জানিয়ে আমি তোমাকে ছোট করতে চাই না ।তোমাকে আমি সব সময় আমার হৃদয়ের ভালোবাসায় তোমাকে সংযুক্ত করতে চাই। করতে চাই বললে ভুল, তুমি তো সংযুক্তি হয়েই গেছে ।না হলে বুঝলে কি করে আমার মনের কথা বল?
রিম্পা দি বলল ' হু, মন ভেজানো হচ্ছে না?'
রেখা বলল  ,'না গো রিম্পাদি ,মন ভেজানো নয় ।সত্যি কথা বলছি।'
রিম্পা দি বলল 'ঠিক আছে তাড়াতাড়ি চলে আয় ।খাতা গুলো নিয়ে যা।'
রেখা বলল 'হ্যাঁ, তুমি রাখো ফোন ।আমি স্টেশনে যাচ্ছি।'
রেখা রেডি হয়ে হন্তদন্ত হয়ে কোনরকমে একটা অটোকে পাকড়াও করল। অটো তো অলরেডি বুকিং ।এবার খুব চেপে চেপে বসতে হবে।
 অটোওয়ালা দাঁড়াতেই চাইছিল না। জোরজবস্তি
করে রেখা বলে ' এ‌ই অটো দাঁড়াও, রোজ যাই।'
অটোওয়ালা বলল ‌'না দিদি ,আপনি যেতে পারবেন না ঠাসাঠাসি করে বসতে হবে।
রেখা বললো  'আমাকে যেতেই হবে । আমি জানি এই ট্রেনটা মিস করলে আমার অসুবিধা আছে।'
অটোওয়ালা বলল  'কি বলব দিদি, বলুন তো ?আপনারা ডেলি প্যাসেঞ্জার করেন, কিছু বলার নেই ।ঠিক আছে উঠুন ।কষ্ট করে বসতে হবে আপনাকে।'
রেখা কোন কথা না বলে অটোতে উঠলো আর মনে মনে ভাবল অটোওয়ালা তো ঠিকই বলেছে। কিন্তু আমার তো কিছু করার নেই আর তাছাড়া অটোতে বসে আর যা কান্ড হবে, সেসব হজম করতে হবে ।তার চেয়ে মনে মনে ভালো কথাগুলো ভাবতে থাকি ।রিম্পাদির সঙ্গে দেখা হবে ,খাতা পাবো -এই খুশিতে যেটুকু পথ অতিক্রম করা যায়।
এই করতে করতে কল্যাণী স্টেশন এর কাছে নামিয়ে দিলো আর ঠিক তখনই ট্রেনটা ঢুকলো রেখা ছুটতে ছুটতে প্লাটফর্মে এসে  উপস্থিত হল। রিম্পাদি ও একগাল হাসি নিয়ে গেটের কাছে দাঁড়িয়ে । বলল 'এই নে ,তোর আমানত। আমি খুব টেনশনে ছিলাম। কি জানি তুই আসতে পারবি কিনা?'
রেখা বলল  'আর বোলো না, আসতে পারতাম না ।অটোওয়ালা কিছুতেই তো আমাকে অটোতে তুলে ছিল না ।নেহাৎ ডেলি প্যাসেঞ্জার বলে এই ফ্যাসিলিটি পেলাম জানো তো?
যাই হোক আজকে নেমে যাও না ?কালকে একসাথে যাবো স্কুলে।
রিম্পা বলল  ' হ্যাঁ , তাই  আর কি ?আমার বাড়িতে মেয়েটা রয়েছে ,আমার বর রয়েছে ।আমি না বলে কয়ে, হঠাৎ করে তোর বাড়িতে থেকে যা ই তাই না ?ঠিক আছে অন্য দিন আসব ।
এর মধ্যে  ট্রেন ছেড়ে দিল ।
ভালো থাকিস ।'হাত নাড়তে লাগল দুজনেই।
রেখা যতদূর ট্রেনটাতে রিম্পাদিকে দেখা গেল ,তাকিয়ে রইলো ।তারপর আবার অটোতে এসে বসলো। খেয়াল করে নি সেই অটোতেই বসেছে।
অটোওয়ালা তাকিয়ে বলল ' ও দিদি আপনি ট্রেনে গেলেন না ,এত হুটোপাটি করে যে আসলেন?'
রেখা একগাল হেসে বলল ' একটু দরকার ছিল দাদা।এই ট্রেন মিস করলে আমার খুব অসুবিধা হতো এইজন্য'।
অটোওয়ালা বলল ' তখন যা কষ্ট করে আসলেন ।এখন একটু জায়গা নিয়ে ঠিক ভালোভাবে যেতে পারবেন। বলেই হাঁকতে লাগল বুদ্ধ পার্ক, বি ব্লক ,বাগের মোর ।
এরমধ্যে মনোজ ফোন করলো ।
রেখা ফোন রিসিভ করে বলল' হ্যালো'।
মনোজ একটু অবাক হয়ে বলল ' আরে তুমি কোথায় ?আজকে স্কুলে যাও নি তো?'
রেখা বলল  'একটু স্টেশন এসেছিলাম। দরকার ছিল।'
মনোজ বলল  'এদিকে বাড়িতে এসে দেখি। ‌ মিলি কি চেঁচানো চেঁচাচ্ছে। আমাকে দেখে একটু শান্ত হলো।'
রেখা বলল 'আর বোলো না, ওর খাবার টাইম হয়ে গেছে।'
মনোজ বলল ।'আমি ওর খাবার দিয়ে দিয়েছি।'
রেখা বলল ' ও তাই? ভালো করেছো। ওদিকের কি খবর গো?'
মনোজ বলল  'আবার ডেট পড়েছে। জজ যা বলল তোমার বোনের তো লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যাবার মতো।'
রেখা বলল ' ঠিক আছে ।আমি বাড়িতে গিয়ে শুনবো'।
এর মধ্যে অটোওয়ালা গান চালিয়েছে 'এক রাস্তা হ্যায় জিন্দেগি,যো থাম গ্যেয়ে তো কুছ  নেহি....।'
রেখা মনে মনে ভাবতে লাগল সত্যিই তো তাই আমাদের জীবনটাও ঠিক তাই।  
অটোওয়ালা বলল  'দিদি ,এসে গেছেন নামুন।'
রেখা বলল ' আচ্ছা, আচ্ছা ।এই নিন ভাড়া।'
 ভাড়া মিটিয়ে রেখা বাড়িতে ঢুকলো।
বাড়িতে এসে দেখে মনোজ কফি করে বসে আছে।
মনোজ বলল এই মাত্র কপি করলাম ফ্রেশ হও তাড়াতাড়ি।একটু গল্প করি দুজনে।'
রেখা কেমন অবাক হয়ে গেল ।কালকে অবধি তার জীবনটা কি অবস্থায় ছিল ?
এক টলমলে তরী ।যার মাঝির বেহাল অবস্থা ।আদৌ তরী তীরে নিয়ে গিয়ে থামাতে পারবে কিনা ?জীবন বিপর্যস্ত হয়ে যাবে কিনা? একটা টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে কাটিয়েছে ।আজকে মনোজকে অন্য মুডে দেখে রেখার চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগলো ।
মনোজ  বলল ' তুমি কাঁদছো কেন ?যাও ফ্রেশ হও।' রেখা তারপরও যখন নড়লো না।
 তখন মনোজ এসে রেখাকে হাত দুটো ধরে বলল  'সরি ,আমি যদি কোন খারাপ ব্যবহার করে থাকি, তার জন্য।আমার যে কি হয়েছিল..? আদপে আমি একটা সমস্যায় আছি ।তোমাকে না পারছি বলতে কি ভাববে ,না ভাববে ?আগে সমাধানটা করি ।তারপর তোমাকে সব বলবো ।আমার কোন কথা তো তোমার অজানা নয় ।শুধু হঠাৎ করে একটা উটকো ঝামেলায় মধ্যে কিভাবে জড়িয়ে গেলাম বুঝতে পারছি না। শুধু এটুকুই বলবো যে আমি ,আছি থাকবো তোমারি। তবে আমার কিছু খারাপ আচরণের জন্য সত্যিই আমি লজ্জিত।'
রেখা বলল 'এই যে তুমি মন খুলে আমাকে কথাটা বললে এতেই আমি খুশি। তোমাকে ঐরকম অবস্থায় দেখলে আমি একদম ভালো থাকি না।'
মনোজ বলল  'আসলে কেন যে আমি তোমার সাথে এরকম ব্যবহার করলাম আমি নিজেও জানি না।'
রেখা বললো ' ছাড়ো, যা হবার হয়ে গেছে। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। দুজনে মিলে অনেকদিন পর বসে বসে আবার কফি খাবো  , গল্প করবো। আমাদের ব্যস্ততম জীবনে এই টুকুই অক্সিজেন।'
রেখা ফ্রেস হতে চলে গেল।
বাথরুম থেকেই রেখা ফোনের আওয়াজ শুনতে পেল। মনোজ ফোনে কথা বলছে  'হ্যালো'।
অপর পক্ষ বলল  'আমি সুরো বলছি।'
মনোজ বলল ' হ্যাঁ বল।'
সুরঞ্জন বলল 'তিথিটা এত নির্লজ্জ হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে তোকে এবার ডিএনএ টেস্ট করতে হবে? না হলে তুই এই সমস্যার সমাধান করতে পারবি না।
মনোজ বলল 'ডিএনএ?'
রেখা কলের জোরটা একটু কমিয়ে দিল বাথরুম থেকে ডিএনএ টেস্টের কথা শুনতে পেল। ভাবলো 'কেন, ডিএনএ টেস্ট কেন হবে?'
সুরঞ্জন বলল 'আরে তুই তো ফ্রেশ আছিস, তোর এত চিন্তার কি আছে? তাছাড়া  এই যাত্রায় তুই রক্ষা পাবি না।'
মনোজ বলল 'ও তো চিরকাল টাকার জন্যই সবকিছু করেছে। ও টাকার  পেছনে ছুটেছে বলে আমার ভালবাসাটাকে অস্বীকার করেছিল ।আজকে আবার আমার কাছেই ছুটে এসেছে । এখন আমি তো ওকে মনেপ্রাণে চাই না।''
রেখা বাথরুম থেকে কথাগুলো শুনতে পাচ্ছে আর ভেতরে ভেতরে একটা  কষ্ট পাচ্ছে। 
রেখা ভাবছে যখনই ক্ষণিক ভালোবাসার সুখে হাসি ফুটে ওঠে ,তখনই কিছু না কিছু খারাপ সময় রেখার জীবনে এসে হাজির হয়।
 আবার কোন কালবৈশাখী ঝড় আসতে চলেছে জীবনে কে জানে ?আদপেও এই ঝড়-ঝঞ্ঝার হাত থেকে মনোজকে, নিজেকে রক্ষা করতে পারবে কিনা?
কথাগুলো মনোজ  আস্তে আস্তে বলছে না জোরেই বলছে। এটুকুর ভরসায় বুকে বল পাচ্ছে।

গুলশান আরা রুবী




অন্তরে যার স্থান


তুমি কষ্ট দেয়া বন্ধ করো না-
তাতে কি হবে 
ভুলতে চাই না সহজে তা আমি 
তুমি কি তা বুঝবে।

যতদিন বেঁচে রইবো এ ধরণীতে- 
কামনা থেকে রেহাই নেই নিশ্চয়ই!
তবে একবার ভেবে দেখ তো 
যা আছে সব রেখে যাবে কিছুই আপন নয় তো ।

ঐ কষ্টগুলো ভীষণ মধুরতম-   
তোমার কষ্ট থেকে চাই না পরিত্রাণ !
তা নিয়েই যেন পাই পরপারে স্থান।।

জীবনে যা ভাবেনি তাই পাই 
আসলে এমন বুঝি পৃথিবীর জীবনটাই !
সময়ে সাথে বদলে যায় মানুষের রুপ 
বদলে যায় আচার ব্যবহার 
বদলে যায় রীতিনীতি এটাই জীবন।

রাবেয়া রুবি




ফেরারী মন 


সেই কবে হারালো ভালোবাসার নক্ষত্রগুলো
লুকায়িত হয়ে প্রাপ্তি খুঁজে পেলনা, 
অনুরাগের সবুজ গালিচায় ভালোবাসা আর
ঈর্ষা পাশাপাশি  শুয়ে থাকেনা। 
রাত নেমে এলেই গোধূলির লালিমা, ধূসর রঙের  সমাপ্তি, 
তবুও ডুবন্ত সূর্যের ঝলকানির মাঝেও আকাশ খুঁজে প্রাপ্তি।
পরম ভালোবাসা গুলো ঝুলে থাকে শূন্য আকাশে নিস্তব্ধতায়, 
আঁকা হয়না  রঙিন আল্পনাগুলো  নির্জন রাতের জ্যোস্নায়। 
জীবনের দোলাচলে মিশে আছো
জীবনেরই  প্রতিচ্ছায়া  হয়ে, 
সব ভাবনাগুলোও  জুড়ে আছো
আদুরে মায়া নিয়ে। 
প্রকৃতির নিয়মের বেড়াজালে সব ঠিক আছে
স্বপ্নগুলো ঘুরেফিরে দমকা হাওয়ার মাঝে।
কতদিন হলো একসাথে নতুন সূর্যোদয়  দেখা হয়না,
এখন আর শিশিরেও পা ভিজানো হয়না, 
মন যমুনায় ঢেউ উঠলে ভোরের শুকতারা হয়ে এসো, 
তখন শুনবো পাখ- পাখালির  কলতান,
পরিযায়ী পাখিরা দলবেঁধে এসে ফিরে যাবে,
হয়তো রেখে যাবে মহা মিলনের  গান।
কতটা সময় পাড়ি দিয়েছি কত বাঁধা-বিপত্তির  পথ, 
প্রহরগুলো অমলিন সোনালী  ছিল,থমকে যায় সবকিছু হঠাৎ। 
সাজানো পৃথিবী  থেমে যায়,সবকিছু  নিস্তব্ধ তায়,
থেমে নেই শুধু  সময়ের গতিবেগ, আর নতুন চলার গতি যত,
প্রকৃতিও তালে তালে মিলে যায়  সব - ই  আগের মত।

লেখক শান্তা কামালী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "বনফুল"১৮

চোখ রাখুন স্বপ্নসিঁড়ি সাহিত্য পত্রিকার পাতায় লেখক শান্তা কামালী'র  নতুন ধারাবাহিক  উপন্যাস "বনফুল" 





বনফুল
                     ( ১৮ তম পর্ব) 
 

জুঁই উপরে উঠে হাত পা ছেড়ে শুয়ে পড়ল,ঘড়িতে তখন তিনটে বাজে। ফোনটা হাতে নিয়ে পলাশকে ফোন দিল, ওপাশ থেকে পলাশের কণ্ঠে বললো কেমন আছো জুঁই ? স্যরি জুঁই আমি আর তোমাকে ফোন দিতে পারিনি! এপাশ থেকে জুঁই বললো its Okay আমি তো দিচ্ছি, মোট কথা একজন দিলেই হলো।
আমিও ব্যস্ত ছিলাম তাইতো তোমাকে ফোন দিতে পারিনি, এখন বল তোমার বন্ধু কেমন আছেন?  
হুমমম ভালো আছে, এতক্ষণ পর্যন্ত তোমার গল্পই হচ্ছিল..... 
জুঁই হাহাহা হাহাহা হাহাহা  হেসে উঠলো! আমায় নিয়ে আবার গল্প করার কি আছে, আমি সাদামাটা একটা মেয়ে মাত্র,আমি তো ক্লিওপেট্রা নই। আচ্ছা তোমাদের বন্ধুত্বের গল্পে ভাগ বসাতে চাই না, কালকে ঠিক সময়ে চলে এসো। ফোন রাখছি বাই বাই বলে জুঁই ফোন কেটে দিলো। কিছুক্ষণ চুপ করে শুতেই ঘুমিয়ে পড়েছে জুঁই। পাঁচটায় জুঁয়ের ঘুম ভাঙ্গলো, হাতমুখ ধুয়ে নিচে নেমে আসতেই ময়না জিজ্ঞেস করলো আপামনি আপনাকে চা দেবো না কফি?  
জুঁই বললো কফি দাও সাথে হালকা কিছু স্ন্যাকস দিও।
আজ জুঁয়ের মা ভীষণ ব্যস্ত কালকে বাসায় মেহমান আসবে, তাই আজ থেকে সব কিছু গুছিয়ে রাখছে, যেন সকালে নাস্তার পরই একে একে সব রান্না করে নিতে পারেন।
আজ জুঁই বাবা-মায়ের সঙ্গে চুটিয়ে গল্প করলো রাত দশটা পর্যন্ত, তারপর ময়না টেবিলে খাবার পরিবেশন করেছে। বাবা-মা মেয়েতে ডিনার শেষ করে। গুডনাইট বলে জুঁই  উপড়ে উঠে এলো। 
দাঁত ব্রাস করে ফ্রেস হয়ে জুঁই শুতে যাওয়ার আগে নিজেকে একবার আয়নায় দেখে নিলো।তারপর ভাবলো কালকে কি ড্রেস পরবে।কোন বডি স্প্রে টা পলাশ কে বেশী আকর্ষণ করবে,এইসব ভাবতে ভাবতে একটা চুড়িদার ওড়না, ইনার গার্মেন্টস সবকিছু গুছিয়ে রাখলো।পড়ার টেবিলে একটা ফটো ফ্রেমে নিজের একটা হাল্কা পোশাক পরা ছবি লাগিয়ে বসিয়ে দিলো।আবারও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বিনুনি দুটো পেছন থেকে সামনে এনে বুকের দুপাশে দুলিয়ে দিয়ে নিজেকে দেখে নিজেই হেসে ফেললো। প্রতিবিম্ব কে যেন নিজেই প্রশ্ন করলো",উঁ এইটুকু মেয়ে আবার প্রেম করে"।ঠোঁটের ওপর হাল্কা করে ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে মুখটা এঁকিয়ে বেঁকিয়ে নিজেকে মুগ্ধ হয়ে দেখছিলো,এমন সময় 
 পলাশ একটা গুড নাইট মেসেজ পাঠালো।ফোনটা হাতে নিয়ে পলাশ কে ফোন দিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,তোমার বন্ধু কি ঘুমিয়েছে, না-কি এখনো আমাকে নিয়েই.....। পলাশ বললো, এতোক্ষণে ঘুমিয়েছে বলেই তো শুভ রাত্রি জানাতে দেরি হয়ে গেলো।
একটা মিষ্টি হাসির মৃদু শব্দ শুনিয়ে পলাশ কে শুভ রাত্রি জানিয়ে জুঁই ঘুমাতে গেল।


                                                                                                                                      চলবে। ....