০১ সেপ্টেম্বর ২০২১

ওয়াহিদা খাতুন


তাহাজ্জুদে বসেছি আজ প্রভুর দরবারে  


তাহাজ্জুদে বলেছি আজ প্রভুর দরবারে,

শান্তি তুমি কবে দেবে বলো আমারে?

দুখে ভরা আমার জীবন সইতে পারিনা,

বিনাদোষে অপরাধী মানতে পারছি না;

চোখের জলে নালিশ দিলাম আজকে তোমারে!

তাহাজ্জুদে বলেছি আজ প্রভুর দরবারে।।


মেনে চলি তোমার ভয়ে তোমারি বিধান,

সময় কাটাই তোমার ধ্যানে পড়ি পাক কোরান ;

শয়তানেরি পাঁকে পড়ে জ্বলছি আমি হায়,

প্রভু তুমি বলে দাও আজ বাঁচার কী উপায়?

কেনো বলো দিলে আমায় পাপের সংসারে?

তাহাজ্জুদে বলেছি আজ প্রভুর দরবারে!

শান্তি তুমি কবে দেবে বলো আমারে?


রচনাকাল:-৩১/০৯/২০২১ ভোর ৫ টা। 

আবদুস সালাম




 স্মারক স্তম্ভ


 দিশাহীন প্রান্তে নতমস্তকে দাঁড়িয়ে গুনছে প্রহর

আর্তনাদ এখন উলঙ্গ শিশুর নিত্য কথা

আলোর নিচে তাবু গেড়েছে অন্ধকার


প্রতিবেশীর লাশে  ভরাট হয় কবর ধ্বংসের উল্লাসে রসদ জোগায় উলঙ্গ ভারতবর্ষ 

 ঊর্ধ্ব বাহু নিয়ে ভিজতে থাকে বিরামহীন জীবন 

ফিবছর স্বাধীনতা এলে জনগণ নতমস্তকে স্মরণ করে বীরগাথা 

বীরেরা আলোর নিচে  শোনায় আর্তনাদের কাহিনী 

 বিকৃত ইতিহাস ডানা মেলে ওড়ে

  সংবিধানের জলসায় তারস্বরে ধর্মসংগীত বাজে 

আমরা  নেচে  উঠি

স্মারক স্তম্ভের মাথায় শকুনেরা সভা করে

মেরী খাতুন


রোজনামচা

    

সাদা উর্দি পরা সুসজ্জিত গার্ড 

মালদার স্টেশনের একবগ্গা রেলঘাটির উঁচু জানলা থেকে 

মুখ বাড়িয়ে আছেন।

স্টেশনে ট্রেন ঢোকার মুহূর্তে সুনিশ্চয়তায় সবুজ নিশানায় 

ট্রেনকে জানান উষ্ণ অভ্যর্থনা।

সারাদিন কত শত ট্রেন আসে এই নিরপরাধ স্টেশনে,

আর তত বারই তিনি কর্তব্য সামলে তাকিয়ে দেখে 

জীবনের কতরকম সাজ পোশাক।

শিশুর দুরন্ত হাত ধরে সামলাচ্ছেন মা

মোবাইলে সশব্দে কথা বলছে এক বাঙালি,

জানলার পাশে বসে দাঁতে ঠোঁট কাটাচ্ছেন অন্যমনস্ক তরুণী। 

একটা চৌদ্দ কি পনেরো বছর বয়সের লিকলিকে ছেলে

হাঁকিয়ে বেড়াচ্ছে জানালায় জানালায়,

আর তার নিশ্বাসে ভেসে চলা রক্ত এক ডালি বাদামের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে ঠোঙায় ঠোঙায় হচ্ছে 

কারো কারো আঙুলের ডগায় ভালোবাসার শব্দ।

একটা বৃদ্ধ আর জবুথবু লোক এঁই ডিম,এঁই ডিম বলে 

হেঁকে বেড়াচ্ছে।

তখন ডিম কেনার আর সময় নেই কারোরই 

ট্রেন চলে ধীর থেকে দ্রুত গতিতে----

স্টেশনের পাশেই তাঁর দু'কামরায় কোয়ার্টারে,

কাজ সেরে বাড়ি ফেরেন তিনি,

উঠোনে টাঙানো ছেঁড়া-ফাটা জামা-কাপড়;

রান্নাঘরে এক মুঠো চাল নিয়ে রান্নায় ব্যস্ত তাঁর রোগা গৃহিনী। 

রাতের খাবার খেয়ে ছেঁড়া কাপড়ের পুরনো কাঁথা বিছানো বিছানায় দুজনে শুয়ে কাটিয়ে দেন সারাটা রাত

সূর্য এসে ডেকে তোলে ভোরে,

এসে যায় অন্য এক রোজের সকাল।।

মুফতী কামরুল ইসলাম


 হায়রে মানুষ 

 


একটু ছিল বয়েস যখন ছোট্ট ছিলাম আমি

আমার কাছে খেলাই ছিল কাজের চেয়ে দামি।

উঠোন জুড়ে ফুল ফুটেছে আকাশ ভরা তারা

তারার দেশে উড়তো আমার পরাণ আত্মহারা।

জোছনা রাতে বুড়িগঙ্গা তুলতো যখন ঢেউ

আমার পিঠে পরীর ডানা পরিয়ে দিতো কেউ।

দেহ থাকতো এই শহরে উড়াল দিতো মন

মেঘের ছিটার ঝিলিক পেয়ে হাসতো দু’নয়ন।


তারায় তারায় হাঁটতো আমার ব্যাকুল দু’টি পা

নীল চাঁদোয়ার দেশে হঠাৎ রাত ফুরাতো না।

খেলার সাথী ছিল তখন প্রজাপতির ঝাঁক

বনভাদালির গন্ধে কত কুটকুটোতো নাক;

কেওড়া ফুলের ঝোল খেয়ে যে কোল ছেড়েছে মা’র

তার কি থাকে ঘরবাড়ি না তার থাকে সংসার ?

তারপরে যে কী হলো, এক দৈত্য এসে কবে

পাখনা দুটো ভেঙে বলে মানুষ হতে হবে।

মানুষ হওয়ার জন্য কত পার হয়েছি সিঁড়ি

গাধার মত বই গিলেছি স্বাদ যে কি বিচ্ছিরি।

 

জ্ঞানের গেলাস পান করে আজ চুল হয়েছে শণ

কেশের বাহার বিরল হয়ে উজাড় হলো বন।

মানুষ মানুষ করে যারা মানুষ তারা কে ?

অফিস বাড়ির মধ্যে রোবোট কলম ধরেছে।

নরম গদি কোশন আসন চশমা পরা চোখ

লোক ঠকানো হিসেব লেখে, কম্প্যুটারে শ্লোক।

বাংলাদেশের কপাল পোড়ে ঘূর্ণিঝড়ে চর

মানুষ গড়ার শাসন দেখে বুক কাঁপে থরথর।

‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’- গান শোননি ভাই ?

মানুষ হবার ইচ্ছে আমার এক্কেবারে নাই।

৩০ আগস্ট ২০২১

সানি সরকার


 

কবির বারান্দা 


মুক ও বধির হয়ে থাকি... 

যেমন ওই গাছ, ওই শীতল  প্রাচীর, 

ঠাণ্ডা জলের মতন অতল ছুঁয়ে আছি 

আর কী নেবে 


খুব শান্ত ও ধীর আমাদের চাষাবাদ

খাদানের ভেতর নেমে আসি 

ওই আমাদের শস্যবীজ

ওই আমাদের অনন্ত কাঁচা মাটির গন্ধ

ওই আমার শস্যদেবী পাথর হয়ে গিয়েছে 


এখন মাঠের মধ্যিখানে খেলা করছে সার্কাস বালক

রিং নিয়ে, ঘোড়া নিয়ে, প্রাচীণ দড়ির ওপর

আর কুচকুচে কালো বুক ফুলে আছে

হাসি লেগে আছে ঠোঁটের সমস্তটায়

এতটাই চঞ্চল সে, পৃথিবীটিকে হাতের ওপর নিয়ে

ঘুমন্ত মানুষের মতো ক'য়েকবার ঘুরিয়ে দিল 


এইসব তোমার গোচরে আসে না

তবলার স্থির তালের ভেতর

আস্তে-আস্তে চাঁদের দু'পিঠ পরিক্রমণ করলে এক্ষুণি

এতটা-ই আস্তে, যেন মাথা থেকে পা-বেয়ে 

একটি-একটি করে সরীসৃপ যাতায়াত করল

এবং তুমি কিছুই টের পেলে না মুহূর্তের জন্যেও 


মুক ও বধির এই বিদ্যানিকেতনে

কেন যে কোনও ব্ল্যাকবোর্ড নেই, নৌকো নেই…

শুধু একটি ব্ল্যাকহোল, যে-যেমন আসে

আর তেমনি চলে যায় 


কবিতার মুক্তির পথের দিকে

কবির তর্জনী নির্দেশ করা... 

এইভাবে কবির কলঙ্ক জমা হয়

আত্মা ও পরমাত্মার মাঝের বারান্দায় 

কবির সার্কাস বালক ঘুমকে সিলিংয়ে টাঙিয়ে

ট্রেনের হুইশেল আর দেয়াল ঘড়ির শব্দ গুনছে 

                                          রাত্রি পৌঁনে চারটেয়...

আয়শা সিদ্দিকা




তুই নেই বলে 


তুই নেই বলে

অসময়ে বৃষ্টি এলে আজ ভিজতে যায় চলে 

তুই নেই বলে

পুরোনো কিছু স্মৃতি আর তোর মুখখানা আজও আমায় সমানভাবে  করে বিচলিত

তুই নেই বলে 

এখন কেউ মায়া দেখাতে এলে আমি অনেকটাই থাকি অাড়ালে 

তুই নেই বলে

বসন্ত এসেও বসন্ত মুখ ফিরিয়ে গেলো 

তুই নেই বলে 

কবিতার ছন্দগুলোও আজ বেশ এলোমেলো 

তুই নেই বলে

কেউ আর শাসন করে না, বকে না আমায় হাসি ঠাট্টার ছলে 

তুই নেই বলে

জানিস আজকাল কথা বলতে খুব জড়তা হয় 

তুই নেই বলে 

বালিশটা এখন রোজই ভিজে 

চোখের কিছু জলে

তুই নেই বলে 

সুখ পাখি এসে দূরে গেল চলে

তুই নেই বলে 

শ্রাবণ ধারার মেঘে,আবেগেরা আছে মুখ ঢেকে

তুই নেই বলে 

এ শহর আজ চলে মিথ‍্যে কাব‍্যের ছলে। 

প্রমি জান্নাত


 


যদি এমন হয়


ধরুন কোনো এক ভোরে ঘুম ভাঙতেই জানলেন আমি নেই!

তারপর?  আমি হীনা সকাল গুলো কেমন কাটবে আপনার?


কোনো এক মধ্যদুপুরে হঠাৎ আমার কথা মনে পড়ল ভীষণ 

কিন্তু তপ্ত দহনে পুড়াবার জন্য আমাকে আর খুঁজে পেলেন না ; আমি নেই আর, কেমন লাগবে তখন?


কোনো এক বরষায় হঠাৎ যদি আমার সাথে গল্প মাখতে ইচ্ছে হয়। আমি তখন ইহলোকের গল্পের উর্ধ্বে হারিয়ে গিয়েছি ; কি করবেন তখন?


কোনো এক গোধূলি বেলায় আমাকে নিয়ে হারিয়ে যাওয়ার কথা দেয়া ছিল হয়তো তবে নির্দিষ্ট সেই গোধূলি আলো আসবার আগেই আমি সন্ধ্যার ঠিকানায় নাম লিখালাম। 


আমার সাথে হারিয়ে যাওয়া হলো না আর।


আমার অপেক্ষায় সময় কাটাবেন তখন? নাকি অন্য কোনো স্পর্শ আপনাকে আমার স্মৃতি টুকু থেকে ও নিয়ে যাবে দূরত্বে!


আসবেন বলে বলে কাছে আসার তারিখ টা কেবল পিছিয়ে দিলেন অথচ ভুলে গেলেন মৃত্যু অপেক্ষার ধার ধারে না। আপনার অবহেলা, অপেক্ষা টুকু উপেক্ষায় ফেলে যদি মৃত্যু নামক অতিথি আমাকে ডেকে নিয়ে যায়!! 


জানেন তো আপনাকে মনে পড়লেই আমি আজকাল আকাশ দেখি। আপনাকে বলতে না পারা কথা গুলো, আক্ষেপ, অভিযোগের কাব্য গুলো কেবল মেঘেদের ঠিকানায় উড়িয়ে দেই।


মন খারাপ হলেই শূণ্যতা দেখি। আমার আর তখন নিজেকে শূন্য মনে হয় না। বিশালতার আকাশের মাঝে ক্ষুদ্র আমি টা পরিপূর্ণ।



The sky cannot be seen from the Grave..

The Sky cannot be seen From the grave..


সেমন্ত, আপনি আমার আকাশ হবেন? যে আকাশ টা বুকে পুষে অতল অন্ধকারে হারিয়ে গেলেও আকাশ দেখতে না পারার দুঃখবোধ আমায় আর পোড়াবে না।

হা‌বিবুর রহমান হা‌বিব




দগ্ধ দীর্ঘশ্বাসঃ


দীর্ঘশ্বা‌সের অ‌তি দীর্ঘ দগ্ধ গু‌লো,

যতই কা‌ছে যাই,ততই দূ‌রে পাই,

দি‌কে দি‌কে শুধু ভরা হাহাকার ,

নাই শুধু নাই ।

চৈ‌ত্রের দ্বা‌হে পোড়া শুস্ক কান‌ণে,

বিরস ক‌ন্ঠে শুধু পা‌খির ডা‌কের আর্তনাদ ।

তৃ‌ষিত বুক ফাটা পিপাসায় চে‌য়ে থাকা,

অ‌গ্নি আকা‌শের পা‌নে আর পা‌নে ।।।

শিবনাথ মণ্ডল


অসুস্থ‍্য  পৃথিবী


মাটির নীচেজল কমছে

ডাঙায় জলোচ্ছৃস

আর কটাদিন পরে মানুষ

চাঁদে করবে বাস।

              বারে বারে নিম্মচাপ

                      প্রকৃতির কি খেলা

                   হরকা বানে ঘরবাড়ি  ভাসে

                         গাঙে যেন ভেলা।

মেঘ ভাঙা বৃষ্টি কোথাও

    যেখানে সেখানে ধস্

কোথাও আবার দাবানল

      মাটিতে নেই রস।

                      হিমালয় পড়ছে গলে

                              সূর্যের বেড়েছে তাপ

                         সমূদ্র থেকে উঠেআসে

                                  গভীর নিম্মচাপ।

গাছ গাছালী হচ্ছে কাটা

        বাড়ছে গাড়ী বাড়ি

পৃথিবীর ভারসাম্য এবার

দেবে আকাশ পাড়ি।। 

২৯ আগস্ট ২০২১

নাজনীন নাহার



 প্রিয়_স্বাধীনতা 


প্রিয় স্বাধীনতা, 

তোমাকে নিয়ে লেখার সাহস আমার বরাবরই কম।

সকলে কত শত ভালোবাসায় আদৃত করে,

তোমাকে নিয়ে লিখে যায়।

আমার কেবল মনে হয়,

তোমায় নিয়ে লেখার সুযোগ্য আমি নই। 


তবুও সকলের ভালোবাসায় লেখার দুঃসাহস করি আমি।

আজ আমাদের মহান স্বাধীনতা দিবস।

আজ ২৬ শে মার্চ।

কত আয়োজন কত উদযাপন,

কত কত গল্প, গান,  কবিতা তোমাকে নিয়ে।

তুমি আমাদের  পরিতৃপ্তির এক মহা প্রণয়,

তুমি আমার ও আমাদের ভালোবাসা।

আমাদের সম্মান আর গৌরবের আনন্দ তুমি। 


হে প্রিয় স্বাধীনতা ,

তুমি আমাদেরকে একখানা বাংলাদেশ দিয়েছ।

দিয়েছ লাল সবুজের পতাকার উজ্জীবন।

দিয়েছ বিশ্বের মানচিত্রে নাম, মান আর সম্মান। 


আমি জানি,

ত্রিশ লক্ষ শহীদদের রক্তের বিনিময়ে,

অগুনতি মা বোনদের ইজ্জত ও আব্রুর বিনিময়ে ; আমরা তোমাকে পেয়েছি।

আমরা তা ভুলিনি।

আমরা তা ভুলব না কোনদিন প্রিয় স্বাধীনতা। 


তবুও তোমাকে নিয়ে দেখা স্বপ্নগুলো যখন তারিখ হীন দুঃসময় হয়ে সময় কাটায়, 

সময় কাটায় বেকার যুবকের হতাশার আতঙ্ক নেশায়।

ধর্ষিতার আজন্মের গ্লানিময় বিভীষিকায়,

আর দুর্নীতির ক্যাসিনো নিশীথের কাব্যে।

তখন তোমার অভিতাপের আগুনে পুড়ে,

নিঃশেষ হতে হতে পরাধীনতায় মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে জাতীয়তা আমাদের। 


জানো স্বাধীনতা!

তোমার মুখটা মাঝে মাঝে অবুঝ শিশুর নরম গালের মতো লাগে,

তখন তোমার চোখ ভর্তি আকাশে আমারা স্বপ্নের রংধনু  উড়তে দেখি। 

আমরা আবারও আমাদের ধমনীতে তোমাকে ধারণ করি,

পাঁচ ঘোড়া সাত ঘোড়ার অশ্বশক্তিতে আমরা দৌড়াতে থাকি।

দৌড়াতে থাকি ক্ষুধা দারিদ্র্য মারি আর সব রকম প্রহসনের বিপরীতে। 

আমরা আবারও স্বগৌরবে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করি,

আমরা আবারও শূন্যতার ব্যভিচারে হাত ফসকে তোমাকে হারিয়ে ফেলি।

তোমাকে হারিয়ে ফেলি হে প্রিয় স্বাধীনতা! 


আচ্ছা কেন এমন হয়! 

কেন এমন হয় প্রিয় স্বাধীনতা আমার!

আমাদের স্বপ্নের আকাশ মুছতে মুছতে দেখি,

শীতল দীর্ঘশ্বাসে গড়াগড়ি খাচ্ছে;

গৃহবন্দী আমাদের উত্তর আধুনিক জেলখানায় আটক বেহিসাবি সময়।

যদিও কেউ কেউ বেহিসাবি পরাধীন সময়ের গহ্বর থেকে কুড়িয়ে নেয়,

বেঁচে থাকার মৌন সম্মোহন। 


হে আমার স্বাধীনতা! 

তোমাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাস্তবতা আমাদেরে ছোবল মেরে বিষ ঢেলে দেয়,

আমাদের জীবন বিশ্বাসের রক্ত নালীতে ছড়িয়ে পড়ে বীভৎস দহন।

আমাদের জীবন থেকে উড়ে যায় সবগুলো স্বাধীন ভোর।

আমি ও আমরা আর এগুতে পারি না, 

সার্কাসের বিশালদেহী হাতীটির মতো,

আমরা এক শলতে দঁড়ির গিঁটে আবদ্ধ থাকি নির্দিষ্ট স্বাধীন পরাধীনতায়।

এভাবেই আমাদের অধিকাংশের স্বাধীনতারা, 

উৎসবের রঙিন গ্লাসে পরাধীনতার বিশ্বাস গুলে খায়। 


আমাদের মন ও মগজের অলিতে গলিতে মৌন মিছিলের স্লোগানে উচ্চারিত হয়,

হে স্বাধীনতা! 

তোমার মাঝবয়সী চোখ কী করে ভার্জিন হয়!

যেখানে টুইনটাওয়ার থেকে ফিলিস্তিন, 

ফিলিস্তিন থেকে ইরাক যুদ্ধ সমাপ্ত করে;

আই এস এর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে তোমার চোখের সন্মুখে! 

যেখানে তর্ক বিতর্কে জর্জরিত অণুজীবের তাণ্ডবে টালমাটাল পুরো পৃথিবী! 

তারপরও কি মৃত্যুর কাছে পরাজিত হতে হতে তুমি বলবে!

আমরা স্বাধীন বাঁচি!

আমরা স্বাধীন আছি! 


তবুও হে প্রিয় স্বাধীনতা আমার,

চোখ ভর্তি আকাশ নিয়ে গৃহবন্দী থাকার পরেও,

তুমি যেভাবে নীল চিনো।

আমরাও তেমনি তোমার জানলায় রোদের পাল্কিতে 

নেমে আসতে দেখি গোটা আকাশ।

যার শরীর থেকে কুড়িয়ে নেই নতুন স্বপ্ন সমৃদ্ধ ভোর।

এই তো তুমি, 

এই তোমাতেই বিভোর আমরা;

হে প্রিয় স্বাধীনতা।

মিতা নুর


আমার কিছু স্বপ্ন আছে


কেবল জানি 

          তোমায় নিয়ে, 

আমার কিছু 

              স্বপ্ন আছে;

প্রাপ্য আছে

           বিনিদ্র রাত, 

কাটিয়ে দেবার 

              গল্প আছে, 

  হাজারো হাজার 

তোমার জন্যে 

         ব্যাকুল  হৃদয়;

একটুখানি 

        পুরোপুরি,

শর্তবিহীন

         তোমায় 

 কাছে পাবার !! 

আসাদুল্লাহ গালিব




অভিসাপ



আমাকে ভুল ভেবে কতকাল আর অভিসাপ দিবে,রোদের উত্তাপ আর মরুভূমির তৃণলতাহীন

খসখসে মরণফাঁদ অম্লান তোমার অভিসাপে৷

আর কতকাল?

কলমের ডগায় খুচাখুচি,

নিমগ্ন রাতের গভীরে নির্ঘুমদের সারিতে উদ্দাম দেহে হজম করি সব৷

আমাকে ভুল ভেবে আর কত বাক্য সৃষ্টি করবে

মেঘেরা সূর্যকে লুকানোর অবয়ব দেখে

সন্ধা ভেবে নেওয়া অবিচার৷

আর কত অস্পৃশ্যা থেকে নিজেকে মিটাতে চাও না পাওয়ার মাঝে৷

উদোম গায়ে আমাকে খুটিয়ে দেখো নির্মল গঠন

কৌতুহলী হৃদয় ছাড়া কিছুই পাবে না আর

তবে আর কত অভিসাপের বাণী উচ্ছারিত

তোমার যবানিকা থেকে৷

অপেক্ষায় আগামি প্রভাতের নতুন অভিসাপের

প্রীতির ডোরে আগলিয়ে আছে শতাব্দির সেরা চরিত৷ 

মমতা রায় চৌধুরী 'র গল্প - অপত্য স্নেহ


 অপত্য স্নেহ



বুলু কাকিমা পুলিশ অফিসারের মেয়ে, নার্সিংহোম মালিকের স্ত্রী ,ঝকঝকে গাড়ি  করে যাতায়াত। আমি জয়িতা যখন প্রথম বউ হয়ে মল্লিকবাড়িতে ঢুকি। আমাকে দেখতে এসে একগাল হেসে বলেছিলেন -'বাঙাল ঘরের মাইয়া আনছো, একটু মানাইয়া, গোছাইয়া লইও কল্যাণী'।কথাটার মানে সেদিন বুঝতে পারি নি। আজ হারে হারে টের পাচ্ছি। আসলে আমি শাশুড়ি মার যতই আপন হবার চেষ্টা করেছি ১৪বছরে একটুও সক্ষম হই নি। ভেবেছিলাম এ বাড়িতে নতুন করে মাকে পাব। মেয়ের মত তিনি আমাকে কাছে টেনে নেবেন। ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছি মায়ের স্নেহ তো কপালে জুটল না। অনেক প্রত্যাশা ছিল মনের ভেতর। বড়লোক বাড়ি বিয়ে হয়েছিল। ঝি চাকরাই সব কাজ করে। তবে আমার ভাগ্য অতটা সুপ্রসন্ন ছিল না। সব কাজ আমাকে করতে হতো। তাতে অবশ্য আমার কখনো কষ্ট হয়নি। কষ্ট হতো যখন বাবা-মা বা আমার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আমাকে যখন তখন অপমান করা হতো ,অসম্মান করা হত। আসলে 'এই জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভুরি ভুরি'-এই কথাটা আমার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়েছে আমার শশুর -শাশুড়ি মার ক্ষেত্রে। ছেলেটি হুট করে বিয়ে করে ফেলবে ,তা তাদের স্বপ্নের ও কল্পনার অতীত ছিল। ভেবেছিলেন যে ছেলেকে তারা এত ভালবাসেন মা বাবার কথা মত পছন্দসই পাত্রী র সঙ্গেই তার বিবাহ হবে। কিন্তু তা হয়নি। তাই  উচ্চশিক্ষিতা বৌমার‌ প্রশংসায় প্রতিবেশীরা পঞ্চমুখ হলেও তাঁরা খুশি হতে পারেন নি।কত সম্ভ্রান্ত বাড়ির ইতিহাসে লুকিয়ে আছে ,এরকম অত্যাচারের কাহিনি। কোনদিন হয়ত সেগুলো চার দেয়ালের বাইরে বের হতেই পারে না। অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে যায় সন্তান না হওয়াতে। অলক্ষী ,বাজা এ তো উঠতে-বসতে কপালে জুটতো। এমনকি ছেলেকে অন্যত্র বিয়ের জন্য তোড়জোড় চলতে থাকে। আমি শুধু চোখের জল ফেলি নীরবেএবং স্বামীকে একদিন বলে ফেলি ,সত্যিই তো আমি তোমাকে কিছুই দিতে পারলাম না ।এতে তোমার ফ্যামিলির কোন দোষ নেই।তুমি বরং অন্যত্র বিবাহ করে বংশের মুখ রক্ষা করো। স্বামী অবশ্য মুখ কাচুমাচু করে বলে এসব কথা তুমি ব'লো না ।মুখে হয় তো বলে কিন্তু ভেতরে হয়তো আছে তার অন্যরকম খিদে। সেটা ক্রমশ প্রকাশ হতে থাকে। কিন্তু আমার তো কোথাও যাবার জায়গা ছিল না ।তাই মুখ বুজে আমাকেও সব মেনে নিতে হয়। অনেকে ভাবে উচ্চশিক্ষিতা সে এসব কেন সহ্য করে, সে তো চলে যেতে পারে বা প্রতিবাদ করতে পারে?স্কুল জীবনে যখন আমি এই অত্যাচারের কথা শুনতাম তখন ভাবতাম কেন প্রতিবাদ করে না। এখন বুঝি প্রতিবাদ আমরা অনেকেই করতে চাই কিন্তু পরিবেশ প্রতিকূলতায় সব সময় তা হয়ে ওঠে না ।বিশেষত যদি সেই মেয়েটি আত্মনির্ভরশীল না হয়ে থাকে।

ভেতরে ভেতরে এবার আমি আত্মনির্ভরশীল হওয়ার কথাই ভাবছিলাম। কেননা স্বামীর প্রতি যার গভীর আস্থা ,শেষ পর্যন্ত সেও যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়। তার থেকে দুঃখের একটি মেয়ের জীবনে আর কি হতে পারে? আমার জীবনে চলতে থাকে মা না হতে পারার তীব্র যন্ত্রণা। সন্তান জন্ম দিয়ে নাকি সংসারের ভর্তি হওয়া যায় মল্লিকবাড়ির ধারণা অনুযায়ী। এভাবেই কাটতে থাকে বছর আমিও এ বাড়িতে স্বামী শ্বশুর শাশুড়ি মার সেবা -যত্ন, আর তীব্র অসম্মান নিয়ে সময় কাটাতে থাকি। আবার সন্তান থাকলেও সে মায়ের কত যন্ত্রনা ,আমি আমার জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছি চারপাশের ঘটনা দেখে ,বিশেষত বুলু কাকিমাকে দেখে। কাকা মারা যাবার পর বুলু কাকিমার যা-কিছু ব্যাংক ব্যালেন্স ছিল সমস্ত কিছুই মেয়েরা কাকিমাকে বুঝিয়ে নিজের নামে করে নেয়। আস্তে আস্তে সেই ঔদ্ধত্যপূর্ণ বুলু কাকিমাকে আমি দেখতে পাই অন্য মাত্রায়। বুলু কাকিমা শ্বশুরমশাইয়ের বন্ধুর স্ত্রী হওয়ার জন্য সেই সুবাদে প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসতেন আর আমার সঙ্গে গল্প করে যেতেন। এতে শাশুড়ি মা অসন্তুষ্ট হতেন। বুলু কাকিমা বাঙাল হওয়ার জন্য হয়তো আমার প্রতি কিছুটা সহানুভূতিশীল ছিলেন।এরপর বুলু কাকিমার কপালেও জুটল মেয়েদের থেকে লাথি-ঝাঁটা। এমন কি খাবার খেতে না দেওয়া ।শেষমেষ একদিন তো আমার কাছে এসে কেঁদেই পড়লেন এবং বললেন তুমি আমার মেয়ের মতো ,তাই তোমাকেই বলছি। আমাকে একটু খেতে দেবে? আমি বললাম -'সে কি কথা ,কাকিমা ?অবশ্যই অতিথি নারায়ন। আমি আরো সাহস করে বলতে পারি কারণ আমার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি মা তার মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে গেছেন প্রায় দুমাস হল। তখন সংসারের সমস্ত কিছুই আমার হাতে বিশেষত হেঁশেলের। তাই যখন কাকিমা দুপুরবেলায় একদিন হন্তদন্ত হয়ে আসলেন ,চুলগুলো উসকো খুসকো ,চোখের কোণে কালি এবং কেঁদে ফেললেন। আমি বললাম কাকিমা কি করবেন আপনাকে বাঁচতে হলে তো আপনাকে আইনের দ্বারস্থ হতেই হবে ।কি করে বৌমা ? তাহলে তো আমার পরিবারের কেচ্ছা-কেলেঙ্কারি সব বেরিয়ে পড়বে ।তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন -'তুমি পারবে তোমার পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে কথা বলতে? আমি তোমার সব কিছুই জানি ।একদিন আমিও  হয়তো তোমাকে বলেছি যে একটা সন্তান জন্ম দিতে পারলে না । সন্তানসুখে গর্বিত মা হিসেবে বলেছিলাম তখন। তবে আজ বুঝি তোমার সন্তান হয় নি ,তুমি ভালো আছো ।আমার সন্তান হয়েও তো আমি ভালো নেই । অপত্য স্নেহ এমন যে, তারা ভুল করলেও তাদের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু বলতে পারি না। ওপরে থুতু ফেল লে তো মাটিতেই পড়ে ।এরা আমার সন্তান ।সুখে দুঃখে ভালো-মন্দে আমি জড়িয়ে আছি ।তাদের বিরুদ্ধে গিয়ে কথা বলব?আমি অবাক হয়ে গেলাম আর ভাবলাম মা এমনই হয়। উদাসী হাওয়া গায়ে এসে লাগল ।দোলা দিয়ে গেলো মনে প্রানে। তার দুদিনের মধ্যে শশুর শাশুড়ি মা বাড়িতে আসলেন। শাশুড়ি মা ,দেখি আদর করে আমাকে ডাকছেন ।আমি একটু অবাক হলাম বটে। তবে ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় করে। তবুও খুব খুশি হয়েছি যে এভাবে এত স্নেহের সুরে আমাকে ডাকছেন । এক নিমিষে যেন জীবনের সমস্ত দুঃখ কষ্ট ঘুচে গেল। মরা নদীতে বান ডেকে গেল।আমি গদগদ ভাবে যখন তার কাছে দাঁড়াই। উনি বললেন -'দেখো বৌমা তোমাকে আমি অনেক কটু কথা বলেছি কিছু মনে করো না। তবে তোমার কাছে অনুরোধ তুমি আমার ছেলেকে ডিভোর্স দিয়ে চলে যাও।  নইলে আমার বংশ রক্ষা হয় না। তুমি তো উচ্চশিক্ষিতা নিশ্চয়ই আত্মনির্ভরশীল হতে পারবে। তার জন্য যা করতে হয় আমি তার ব্যবস্থা করে দেবো। শুধু তুমি আমার ছেলেটিকে মুক্তি দাও। কথাটা শুনে আমার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল, আমি যেন আমার চোখের সামনে তখন সর্ষেফুল দেখছি। তারপর নিজেকে শক্ত করলাম আর ভাবলাম তাই তো আমার স্বামী একটি সন্তান‌‌ প্রত্যাশা  করে। কিন্তু আমি সেটা দিতে পারি নি।আমাদের মধ্যে সম্পর্কটায় যেন আস্তে আস্তে অনেকটাই দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। ভেবে দেখলাম আমাকেও প্রমাণ করার দরকার আছে। আমি কিছু করতে পারি আমার আইডেন্টিটি তৈরি করতে পারি। সারাটা রাত ভাবলাম খোলা জানালায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলাম ,যখন চাঁদের স্নিগ্ধ মধুর আলো আমার শরীরে এসে পড়ল। ভাবলাম শাশুড়ি মার কথাটাই মেনে নেওয়া উচিত। পরেরদিন সকালবেলায় শাশুড়ি মাকে বললাম আমি রাজি । শাশুড়ি মা বললেন-বাহ ভাল ভাবনা। আমিও তোমার জন্য ভেবে রেখেছি। তুমি তো খুব ভালো গান করো। এ বাড়িতে তো তুমি সেভাবে গান করার সুযোগ পাওনি। তোমার জন্য একটা গানের স্কুল খুলে দেবো। জয়িতা খুব খুশি হলো। যে  গান একসময় তার প্রাণ ছিল। কলেজে গান গেয়ে কতজনার হৃদস্পন্দনে পরিণত হয়েছিল সে। শুধুমাত্র সজলকে ভালোবেসে এতটা সেক্রিফাইস করেছিল। তাই আজ শুধু সে নিজের জন্যই ভাববে। শাশুড়ি মা বৌমার মধ্যে একটা যেন চুক্তি হয়ে গেল। তবে মনে রয়ে গেল পুরুষ জাতির প্রতি একটা তীব্র ঘৃণা। এ কেমন ভালোবাসা ,সন্তান জন্ম দিলেই কি শুধু ভালোবাসার অস্তিত্ব রক্ষা করা যায়? সন্তান ই কি শুধুমাত্র দুজনকে বেশি নিবিড় করে বাঁধে?  আজ সন্তান হয়নি বলে সে সুখী হতে পারলো না সজলের সাথে। আর বুলু কাকিমা তার সন্তান থাকা সত্ত্বেও সেও সুখী হতে পারলো না। সন্তান না থাকার জন্য একটা সংসার ভেঙে যাচ্ছে ।আবার সন্তান থাকার জন্য অসহায় মা চোখের জল ফেলছে। এ কেমন অপত্য স্নেহ যার জন্য ভালোবাসার মানুষটিও হাতছাড়া হয়ে যায়। আজ জয়িতার বারবার মনে পড়ছে গানটি-"আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ' সজলের সঙ্গে বাঁধা ছিল তার গান। আজ তাল কেটে গেলো ,সুর বেসুরো হলো। তবে আজ নতুন করে নিজেকে বেঁধে ফেলতে চাইলো গানের অপত্য স্নেহে। জয়ীতার চলার পথে থাকল শুধু গান আর গান।