১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১

দেবব্রত সরকারের লেখা "আসলে ফেরার কোন ডেট ছিলোনা"



আসলে ফেরার কোন ডেট ছিলোনা


আমাদের সঙ্গে একটা মানুষ এসেছিল তুমি জানো বাবা ? 

বাবা উত্তর করে, কই না তো ! 

সেকি ! তুমি দেখোনি ? 

কই না তো ! 

তাহলে আর কিছু বলবার নেই।  আমি মা দিদা দাদা সকলেই তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে এসে  গিয়েছি বাড়ি । কখন যে এসে পড়েছি বুঝতেই পারিনি। কি আশ্চর্য বলো! 

হ্যাঁ তা ঠিক ! কিন্তু আমি দেখতে পেলাম না কেন ? আমি কি তোদের সঙ্গে ছিলাম না ?

না ছিলে না! তুমি তো সারাক্ষন ফোন নিয়ে ব্যস্তই ছিলে ! ভদ্রজন কতবার তোমায় বল এই যে শুনছেন স্যার ! শুনছেন স্যার! তুমি তো শুধু তাকে হাত দেখালে মাত্র। 

সে কি ! কখন?

ওই তো, যখন তিনি তোমাকে ডাকছিলেন। উনি না থাকলে আমরা যে কোথায় থাকতাম কে জানে ! 

মানে ? 

মানে আর কি তোমার মাথায় তো কিছুই ঢোকে না।  শুধু ফোন ফোন ফোন ! উফ পারিনা   বাপু  !

                            ৬  বছরের ছেলেটার  কথা শুনে বাবা হু হু করে  হাসতে হাসতে চলে গেলো ঘরের বেডরুমে।  কিন্তু মাথা থেকে কিছুতেই তার খেয়ালটি পালিয়ে গেলো না।  ঘরে ঢুকেই ল্যাপটপ খুলে দেখতে শুরু করল যে তাদের ফেরার ডেট কবে ছিল।  আসলে তার মাথা থেকে সব হারিয়ে গিয়ে ছিল।  বাচ্চা ছেলে হলে কি হবে !  সে এমন ভাবে বলে গেল কেন ? নিশ্চয় এর কোন কারণ আছেই আছে। ভাবতে  ভাবতে  অনলাইনে খুঁজতে থাকে তাদের টিকিটের ডেট।  কিছুতেই তার ল্যাপটপে খুঁজে পাইনা। টকিটটি  মেইল এ চেক করতে গিয়ে দেখছে সেখানেও কেমন যেন আবছা। বুঁদ হয়ে কি যেন ভাবতে থাকে সে....  

  

                                                                                   ২

                            ত্রিপা স্নান সেরে বাথরুম থেকে ঘরে ঢুকেই দেখে  দুৰ্লক চিন্তিত অবস্থায়ই বসে আছে। পাশে এক কাপ গরম চা কখন কে দিয়ে গেছ তাও জানে না।  চা ঠান্ডা হয়ে জল হয়ে গেছে। ত্রিপা মাথায় তোয়ালে দিয়ে চুল ঘষতে ঘষতে  জানতে চাইলো - আচ্ছা বলতো তোমার কি হয়েছে ?  কয়েকদিন ধরে তোমায় একটু অন্য্ রকম দেখছি। পূজার ছুটি শেষ এবার পরশু থেকে আবার অফিস টু বাড়ি বাড়ি টু অফিস। মানে অফিসের কাজ শুরু।  আর এখন তুমি কেমন যেন কবিদের মত্ উদাস হয়ে বসে। 

                            দুৰ্লক ত্রিপার কথায় বুঝতে  পারল সে আসলে সত্যিই উদাস হয়ে   গেছে।  অথচ সে কোনদিনও কবিতা কি একটি ছড়াও লেখেনি। তবুও তাকে কবিদের মতো লাগছে।  কি আশ্চর্য এই ভুবন !  

 



































ধারাবাহিক প্রথম কিস্তি "আসলে ফেরার কোন ডেট ছিলোনা" 

মমতা রায়চৌধুরী'র উপন্যাস "টানাপোড়েন" ১

আজ থেকে শুরু হলো অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করবার মতো আকর্ষণীয়  মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন" পড়ুন ও অপরকে পড়তে সহযোগিতা করুন  





টানাপোড়েন  ()




                            রেখার সারাদিন এলোমেলো ভাবনার মধ্যে দিয়ে কেটেছে ।বৃষ্টি টাও আজ  যেন জাঁকিয়ে বসেছে। অন্যদিকে সুমিতা কাজে আসেনি। মনোজ বেরিয়েছে নিজের কাজে। কি আর করবে শরীরটা ঠিক আজ ভালো নেই ,না মন ভালো নেই। নিজেই বুঝে উঠতে পারছে না। কদিন ধরেই দীপ্তিদির কথা মনে পড়ছে। কোনোদিন ভাবতে পারিনি দীপ্তিদির এরকম অবস্থা হবে। বর যে ভালো নয়, কানাঘুষো শোনা যাচ্ছিল। যদিও দীপ্তিদি সেভাবে কিছু স্পষ্ট করে বলে নি । দীপ্তি দির মারা যাবার পর এখন জানতে পারি। এত তরতাজা মেয়ের জীবনীশক্তি যে  এত দ্রুত ফুরিয়ে যাবে কে ভাবতে পারত? হঠাৎ করে পেটে ব্যথা পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে বোঝা গেল সে ক্যান্সারে আক্রান্ত ।তাকে টাটাতে  রেফার করা হয়। কিন্তু সেখান থেকে তাকে ফেরত পাঠানো হয় ।যে কটা দিন সে বাঁচবে বাড়ির পরিবেশেই রাখার কথা বলা হয়। কিন্তু জানতে পারি ওই সময়ে হোটেলে থাকাকালিন দীপ্তিদির সঙ্গে ওর হাজবেন্ড যে কাজটি করেছিল সেটি মোটেই মানবোচিত কাজ নয়। এবং ওখানেই তার স্ট্রোক হয়ে গেছিল। মানুষ যে এতটা পশুসুলভ আচরণ করতে পারে, এবং তার বর যখন বলে এরকমটা হবে ভাবতে পারি নি ।আমরা তো ওই সময় গোল্ডেন টাইম স্পেন্ড করছিলাম। ভাবা যায় দীপ্তিদির শারীরিক কন্ডিশন তখন কোন পর্যায়ে আর সেই সময় নাকি ওর হাজবেন্ড গোল্ডেন টাইম স্পেন্ড করছিল?  কি করে যে কুড়িটা বছর পার করলো দীপ্তি দি ওই পশুর সঙ্গে একমাত্র ঈশ্বর জানেন। আবার দুটি সন্তানের জন্ম দিল।ভাবতেই পারি না। দীপ্তিদি ভাল গান  করতে পারত, দেখতে ও সুন্দরী ছিল। শোনা যায় স্কুলে যখন দীপ্তিদি তরুণী অবস্থায় জয়েন করে, তখন আশেপাশের অনেক পুরুষেরই হার্টথ্রব ।অথচ কি করে যে ওরকম একটি ছেলের সঙ্গে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল। ভালোবাসা যে অন্ধ এটা বারবার প্রমাণিত। স্কুল শিক্ষিকা দীপ্তিদির হাত খরচের টাকাটা ও চেয়ে নিতে হতো স্বামীর কাছ থেকে। শোনা যায় মাইনের মেসেজটা মোবাইলে ঢুকলেই ওর হাজবেন্ড গিয়ে সব টাকা তুলে নিত। বর ছিল বাউন্ডুলে ,স্ত্রীর পয়সায় বসে বসে খেতে আর স্ত্রীর উপর পুরুষোচিত আচরণ ফলাত। শোনা যায় ওর স্বামীর ভেতরে নাকি সব সময় চিরযৌবন কাজ করে আর সেজন্য দীপ্তিদির শারীরিক কন্ডিশন খারাপ হওয়া সত্বেও, তাকে হানিমুনের পর্যায়ে  নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ঘেন্না লাগছে ভাবতে। তবুও দীপ্তি দিকে শেষবার দেখতে গেছিলাম।এতদিনকার কলিগ একবার অন্তত দেখতে যাওয়া উচিত ।কত সুখ দুঃখের কথা শেয়ার করেছি ।কখনো পছন্দের জিনিসটা নিজেদের মধ্যে রদবদল করেছি। এখন ভাবি একবার আমাকে একটা  চুরি গিফট করেছিল। এতটাই বড় ছিল যা আজ পর্যন্ত সেটা পড়ে উঠতে পারিনি। একটা চুড়ি দেবার জন্য মনে মনে একটু ক্ষুন্ন হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম  একটা দিল কেন? চুড়িটা খুব পছন্দ হয়েছিল কিন্তু পড়তে পারিনি এজন্য একটু অভিমান হয়েছিল ।এখন বুঝি অভিমানটা করাটা ঠিক হয়নি ।আসলে কিছু কিছু সময় বা পরিস্থিতি এমন হয় যে চাকরি করা সত্ত্বেও যে পরাধীনতা সেটা সব সময় থেকেই যায় ।হয়তো আমরা ভাবি যে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বোধহয় চাকরি করলে ফিরে আসে ।আসে কিছুটা হয়তো ,কিন্তু যদি তার মনের মানুষটি সে রকম হয়। এখন তো শুনি অকারনে মিথ্যে কথা বলত নিজের স্যাটিসফেকশন এর জন্য। ফ্যামিলিতে স্কুলের কলিগদের কাছে স্বামীকে অনেক উঁচুতে তুলে ধরার জন্য সে বলতো। সে আরো বলতো আমার বাড়িতে আমাকে কিছু করতে হয় না ।বাড়িতে কাজের মেয়ে না আসলে বাসন মাজবো, এটা ভাবতেই পারি না। মনে মনে অবাক হতাম কখনো বা বলেই ফেলতাম-' কি জানি আমার কাজের মেয়ে না আসলে তো ,বাসন আমাকেই মাজতে হয় ।এতে অপরাধ বা দোষের কি আছে? দীপ্তিদির হাবভাব দেখে পরে অবশ্য ভাবতাম প্রকাশ করাটা ও যেন অত্যন্ত লজ্জার ব্যাপার। ও যখন শয্যাশায়ী হয় ওর বাড়িতে যারা দেখতে গেছে এবং পরবর্তী ক্ষেত্রে যখন আমরাও দেখতে গেছি কোন আয়া বা কাজের লোক কিছুই ছিল না। অথচ দীপ্তিদি এতটাই সৌখিন আর নিজেকে গুছিয়ে রাখত হাজারো কাজের মাঝে ।বাড়িতে তাকে এতটা অবহেলা ,অযত্ন,দেখে আমাদের চোখ ফেটে জল আসে এবং সব থেকে অবাক লেগেছে যখন দেখতাম যে আমরা গেলেও ওর বর ওর পাশে নির্লজ্জের মত শুয়ে আছে।এমন ভাবে জড়িয়ে ধরে আছে যে জীবনের সমস্ত অংশটা যেন দীপ্তিদিকেই কেন্দ্র করেই।কিন্তু ভেতরে যে আদতে ওটা একটা ভন্ডামি কাজ করছে তা আমাদের বুঝতে অসুবিধে হয়নি। দীপ্তিদির হাতের নখ গুলো বড় হয়ে গেছে ,চুলগুলো জট পাকিয়ে গেছে এই দুমাসেই । দীপ্তিদির ওই অবস্থা দেখে চোখ ফেটে জল আসছে আমাদের প্রত্যেকের‌ ।ভাবতে পারছি না দীপ্তিদির অসহায় চাহনি ,একটা অমলিন হাসি ।যেটা সব সময় তার মুখে হাসি লেগে থাকত। আজ যেন বড় বেদনা দেয় ।আমরা সত্যিই কতোটা মেয়েরা স্বাধীন হতে পেরেছি ?আর সব থেকে কাছের অত্যন্ত প্রিয় সন্তানেরা  তারাই বা তার কতটা কেয়ার করছে? তাদের চোখে-মুখে ও যেন একটা বিরক্তি মাকে নিয়ে। অথচ দীপ্তিদি সারাটা জীবন এদের সঙ্গে কাটিয়ে দেবে বলে ভেবেছিল । তার ভালোবাসার মানুষটিও তাকে অবহেলায় রেখেছে , পৃথিবীতে   সে যে ক্ষণিকের অতিথি। তবুও এতটা অবহেলা, অসম্মান ।অথচ যার চাকরির টাকায় তার সংসার চলে। পরে শুনতে পারলাম ভেতরে ভেতরে ওর বরের নাকি আর একটি মহিলার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। সারাজীবন তাকে ভালোবেসে গেছে সব কিছু উজাড় করে দিয়েছে। এত কোয়ালিটি থাকা সত্ত্বেও দীপ্তিদি জীবনে কী পেল? এখন না আজকাল আমার ভেতরে ও কেমন একটা টানাপোড়েন চলতে থাকে। আদৌ কি সত্যিই আমরা প্রত্যেকে ভালোবাসি ,না এটা আমার মনের দ্বন্দ্ব -সংশয় ,বুঝতে পারছি না ।আজকাল মনোজকে দেখলেও আমার ভীষণ রাগ হয়। মনে হয় প্রতিটা পুরুষ জাতিই যেন এরকমই ।ভালো লাগছে না কিছু। এই ভাবতে ভাবতে কখন যে চারটে বেজে গেছে। মনোজের ফোনে সম্বিত ফেরে।
ফোনটা কয়েকবার বেজেই গেলো তুলতে ইচ্ছে করলো না। শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়েই ফোনটা রিসিভ করলাম। কি হয়েছে? কি আবার হবে? দরজাটা তো খোলো,। তুমি এসে গেছ? সেকি কার ভাবনায় তুমি এতটা নিমগ্ন ছিলে ।আমি এসে কতবার কড়া নাড়লাম ।ফোন করছি ,ফোন তুলছো না। এখন কটা বাজে দেখ তো ফিরে আসবো না?একবারও ফোন করলে না। তুমিও তো করো নি। ফোনটা ভালো করে দেখো। ফোন করেছি, কি করি নি। একটু বিরক্তি ভাব নিয়েই দরজাটা খুললাম। সন্ধ্যে হয়ে যাচ্ছে ঘর দুয়ার এলোমেলো ।শরীর ঠিক আছে তো? হ্যাঁ। শরীরের আবার কি হবে? না ,আসলে তুমি তো সন্ধ্যা পর্যন্ত কখনো এরকম শুয়ে থাক নি? -বলেই মনোজ আমার দিকে তাকালো ।চোখটা তখনও ভেজা ভেজা। কি হয়েছে রেখা? মন খারাপ? বলেই আমাকে কাছে টেনে নিল। আর যেন সবকিছুই কেমন অসহ্য লাগছে।সত্যি মনোজ ও কি দীপ্তিদির বরের মত ? অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে বললাম -'ছাড়ো ভাল লাগছে না। তারপর ভাবলাম মনোজের ভেতরে তো কখনো এরকম কিছু দেখি নি। তাহলে আজকে আমার ভেতরে কিসের  দ্বন্দ্ব ?কিসের টানাপোড়েন? একটা অবিশ্বাসের কালো ছায়া যেন গ্রাস করছে দীপ্তিদি মারা যাবার পর ।ধীরে ধীরে যেন আমার মনে হচ্ছে আমি সত্যি সত্যি মানসিক রোগী হয়ে যাচ্ছি। হয়তো আমরা প্রত্যেকেই সংসারটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এভাবেই নিজের স্যাটিসফেকশন এর জন্য অন্যের কাছে ভেতরের কষ্টগুলো কে ধামাচাপা দেবার চেষ্টা করি। তাই যদি না হবে তাহলে মনোজের যে স্পর্শ তাকে সবসময়ই একটা আলাদা গন্ধ এনে দিত ।নতুন করে বাঁচার, ভালোবাসার ,বিশ্বাসের তাগদ জোগাত। আর তা যেন মনের ভেতরে নদীর সহস্রধারা সৃষ্টি করে ভালবাসার ঢেউ তুলত। আজ যেন কালো মেঘের স্তরের ভেতরের সূর্য ডুবে গেছে ।চারিদিক অন্ধকার কোন আলোর দিশা রেখা দেখতে পাচ্ছে না। রেখা তার ভেতরের প্রবলেমটা খুঁজে পায় না কিন্তু খুঁজে ফেরে।  প্রকাণ্ড শার্সিওয়ালা চওড়া জানলার কাছে এসে রেখা পর্দা সরিয়ে নীচটা দেখার চেষ্টা করে। নিচে একটা মস্ত পার্ক। পার্ক এ লোকজন হাঁটছে। দুই কিশোর- কিশোরী পাশাপাশি বসে হাতে হাত রেখে কি যেন সব প্রেম আলাপ করছে। রেখা ভাবছে দেখো কদিন পর সেটার ভেতরে কতটা বিশ্বাস থাকে আর কতটাই বা ভালোবাসা থাকে?



ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন" ১ ক্রমশ

পরাণ মাঝি



কর্পোরেট কান্না


কর্পোরেট তোমাকে দেখেছিলাম রাতের নিয়ন আলোয় 


তুমি কাঁদছিলে একান্ত আঁধারে 

কিন্তু কেউ দেখতে পায়নি 


এরকম অনেকেরই কান্না দেখেছি , আওয়াজ শুনতে পাইনি 


না না এসব আন্দাজের কথা বলছি না 


এই তো সেদিন একা একা পার্কে বসে সিগারেট টানা মেয়েটিকে দেখে বলেছিলাম 


তুমি ও আমার সমানুপাতিক


কবি দেবাশিস সাহার এক গুচ্ছ এক লাইনের কবিতা


 


এক লাইনের কবিতা


১.গাছ আমার পূর্ব জন্মের মা। 


২.এতো ঈশ্বর আমাদের কোন কাজে লাগে? 


৩.  প্রেমের পথ সর্বদা মেঘলা। 


৪.  তোমার বীজতলা জুড়ে নানা রঙের পায়ের ছাপ। 


৫.  একটাই গ্লাস- কখনো দুধ কখনো মদ


৬.  তোমার সমুদ্রে আমি এক অন্ধ নাবিক 


৭.অন্ধকারে গাছ মায়ের প্রেমিক


৮.কবিরাজের স্পর্শ পেলে গাছ ঈশ্বর


৯.       কয়েনের ওপিঠে তুমি তাই দেখা হলো না 


১০.চাকাহীন গাড়ির নাম নদী 


১১.জোছনা সরে গেলে শংখ লাগে বিছানায়


১২.  সর্ম্পক একটি সাঁকো  


১৩.সর্ম্পকের বুকে নানা রঙের ঢেউ


১৪.   ডুবুরি অথচ পথহারা তোমার সমুদ্রে


১৫.  তুমি- কারো জায়া কারো মায়া


১৬. বহু রঙের আমি নিজেই মিছিল


১৭.   সানাই বাজলে পুড়ে যায় মনখারাপ


১৮.   কোনো কোনো পুরুষ ঘুম হন্তারক কেউ কেউ ঘুমের ঔষধ


১৯.  ঠোঁট লেখে চিঠি তুমি বলো চুম্বন


২০.   গন্ধের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকে খিদে। 

২১। এতো ঈশ্বর  আমাদের কোন কাজে লাগে

২২।পাতাদের গ্রামে জেগে থাকে আমাদের আত্মা

২৩।মা - একটি রক্ষাকবচ

২৪.মৃত্যু র ডাক নাম জীবন

২৫.অন্ধ রাস্তা দিয়ে গড়িয়ে  যাচ্ছে ভালোবাসার রং

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

সানি সরকার


কুহক যখন তোমাকে গ্রাস করছে তোমার অজান্তেই 



ভোরের গোধূলিকে বলো, ভালো আছ? 

ভোরের গোধূলি জানে, প্রতিটি মুহূর্ত… 

কেন যে ভুলে যাও 

শুধু ভালো থাকার জন্যে ভালো থাকা না! 


এই যে দশ দিক তার চারপাশে 

তুমি যে সেখান থেকে অসংখ্যবার গন্ধ নিচ্ছ 

এবং মনে করছ, বুকের ভেতরের পাখিটি বুঝি মুক্ত হয়ে গেল… 

কিন্তু না! 


যে বৃক্ষের নিচে শ্বাস নিচ্ছ ইদানীং 

যে যে বৃক্ষ তোমাকে পথের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ দিল 

তাঁরা হাসলেন খুব, না প্রাণ না, 

মনে মনে হাততালি দিতে দিতেই 

ক'য়েক পাক চক্কর কেটে নিলেন দ্রুত-ই 

কারণ নির্মাণ সফল হয়েছে  


আমি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ, কারণ 

ওঁরা একেকজন সফল চলচ্চিত্র নির্মাতা… 

একজন মানুষকে প্রতিটি ক্রিয়েটর 

কখনও রাক্ষস কিংবা ঝোলার বেড়াল বানাতে পারেন 

এখানে মনে রাখা উচিৎ, ওঁর কাজই হল নির্মাণ করা 

তা মিথ্যে হোক বা সত্যি 


এখানে বলে রাখা ভালো, যদি সিনেমার ভাষায় দ্যাখো, তবে 

এই জগৎ-সংসারে পর্দার আড়ালের মানুষটিকে কেউ চেনেন না 

ওঁরা ইচ্ছে মতো প্রতিটি চরিত্রের একেকটি নাম 

            ও ট্যাটু এঁকে দেন 


এইখানে তুমি যদি সাধক-শিল্পীটি হও 

যে কোনও গন্ধ শোঁকার পরে একশ আটবার না  

সত্যি ও মিথ্যের জ্যামিতিটি সমাধান করতে 

ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে সচেতনভাবে তুমি মাত্র ষাট পাক ঘুরবে 


এখন তোমার সামনে শান্ত-স্থির কেদারা ও বিজ্ঞাপনের হাতছানি 

এবার তোমার নাভিকুণ্ডলীর কাছে জিজ্ঞেস করো, 

আসলে তুমি কেমন আছ এবং ভবিষ্যতে কেমন থাকতে চাইছ 

কারণ ভোরের গোধূলির কাছে কখনও মিথ্যে বলতে নেই 

একজন সত্যিকারের মানুষ, নিজেকে কখনও 

মিথ্যে করেও মিথ্যে বলতে পারেন না


সালমা খান


নাগেশ্বর বৃক্ষ 


পুরোনো দীঘির জলে কবে কার নাগেশ্বর বৃক্ষ ছায়া দেখে তার প্রিয় হারানো,

আমারি মতো সেও ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে প্রতিক্ষার পথ চেয়ে ।

অদূরে হয়ে ফিরছে এই যে পথ,

আরো শতবর্ষ ছিলো হেঁটে যাবার,

ধীরলয়ে যেমন হেঁটে যাবার

ভেবেছি একদিন তোমার হাতপাশে আমারি হাত রেখে ছন্দবদ্ধ হবে সকল বৈরাগ্যপনা ,

সে স্বপ্নাতুর অভিলাষ ফিকে হয়ে গেলে আমার আর ভালো লাগে না।

ডাক দিয়েছি,তুমি পৌঁছে গেছো মৌনি ধাপে

আমিও হালকা ওমের মতো চৌহদ্দি ছাড়লাম,

নেমে গেলাম জলের মতো।

 পথে পথে শামুকের খোল,পাথরের তীক্ষ্ণ ঢেলা বুঝতে কি পারো ,

ঢালুর অংশের আধভাঙা ফাটলে প্রত্নজীব শ্যাওলা?

পুজো নিয়ে তোমার মোহগ্রস্ত ঘুম এখনো ভাঙেনি

ভাবছো আমজনতা খেয়ে নেবে সংক্রামিত প্রসাদ বাতিল নিরামিষের গরাস!

রোজ সকালে আয়না তুলে ধরি মুখ ,

স্মৃতির কৌটা খুলে কপালে আঁকি লাল বৃত্তের সুখ।

কি নিদারুণ ভাবে আমার সিঁথির সিঁদুরে টকটকে রোদ্দুর গুড়ো

লেপ্টে দিলে যা আমার কপাল বেয়ে 

নেমে এলো মৃত্যু ,

আমি মৃত্যুর জন্য নৈশব্দিক একটা কবিতা লিখবো।

এক লক্ষ জোনাকির নিমন্ত্রণ দেবো সেদিন

ঝিঝি  পোকারা গুনগুন করে গান ধরবে মৃত্যুর সময় 

ঝিরি ঝিরি বাতাস বইতে থাকবে,

ক্রন্দন ভরা বাতাসের তীব্রতায় চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখে ছড়িয়ে পড়বে

হলুদ শাড়ি পড়ে থাকবো সেদিন

কপালে টিপ আঁকবো,কাজল দেবো গাঢ় করে,যখন চোখ দুটো চিরতরে বন্ধ  হয়ে যাবে।

জলের কাছে নিমন্ত্রণ পাঠাবো ,

জলের ফোঁটায় সারা মুখে ছড়িয়ে পড়বে।

তখন কান্নার শব্দকে দেব ছুটি

অন্ধকার রাত ব্যাথিত হয়ে দেখবে আমার শেষযাত্রা।

সীমাহীন রুপান্তর তুমি

মালবিকার চোখে চোখ পড়ে না।

তুমি অন্ধ পথে থৈ থৈ, 

চোখ আছে তবুও চোখের মনি নেই।

মাসুদ করিম


চঞ্চল হরিনী


সেই মেয়েটি থাকে সদা

হাঁসি খুসি মনে,

সারা পাড়া মাতিয়ে রাখে

সোহাগ ভরা মনে।

পাড়ার সবাই দশ্যি বলে

যেন চঞ্চল হরিনী,

দুষ্টমিতে বেজায় পটু তবুও

সবারি আদরিনী।

মা বলেন ডেকে খুকি সোনা

এবার ঘরে আয়,

মায়ের পানে মুখ বাঁকিয়ে দুষ্ট

মেয়ে দৌড়ে পালায়।

সারা বেলা দৌড়ে বেড়ায় খুকি

চঞ্চল হরিনীর মত,

আমের ঢালে জামের ঢালে

করে দুষ্টমি আছে যত।

বাবা ডেকে বলেন মাগো নেমে

এবার বাড়ি যাও,

খুকী এবার দুষ্টমিতে বায়না ধরে

বাবা আমটি পেড়ে দাও।

বাবা হেসে বলেন মাগো এবার বেলা হলো শেষ,

খুকী এবার মুখ ঘুরিয়ে বসল বেঁকে

রাগ করেছে বেশ।


গোলাম কিবরিয়া ( শরীফ)


দেহ


পড়ন্ত বিকেলে রৌদ্রের বুকে 

ঘুমিয়ে পড়িছে দেহ,

অনামিকা নড়ে, স্মৃতি মনে পড়ে-

বাঁচাবে আমারে কেহ? 


দৃশ্যপট 


বৃদ্ধ আসিলো জমির অফিসে -

সাথে আছে ওয়ারিশ, 

ভাগ বাটোয়ারা, হয়ে গেছে সব,

স্বাক্ষরে কুর্নিশ। 


সকলের মুখে প্রাপ্তির হাসি -

আশার মশাল জ্বলে, 

বৃদ্ধের মুখে বিদায়ের গান -

হৃদয়ে স্মৃতির থলে। 


জমি আপনার? নাম কি যে তবে? 

দিয়াছেন সজ্ঞানে? 

সাব রেজিস্ট্রার - পরখ করিতে, 

তাকায় তাহার পানে। 


আরে সাহেব -


জমিতো আমার , ভাবিতে ভাবিতে -

জীবন করেছি পার ;

জীবনের কূলে এসে দেখি আজ -

নেই সাথে কিছু আর। 


স্বাক্ষর হলো, টিপসই ও দিলো, 

লুকায় চোখের জ্বলে, 

"আজ থেকে আর, রইলো না তার  -

কিছুই নিজের বলে। "


যাক বাঁচা গেলো, মনে মনে ভাবে -

তুষ্টিতে থাক সবে, 

এখন তো আর বলবেনা কেউ -

"বাবা" যে মরবে কবে? 


বছর দুয়েক পর -


বাবার হইলো ভীষন অসুখ -

সারিবেনা কোনও ভাবে ;

ডাক্তার বলে, বিদেশ গমনে -

বোধ হয় কাজ হবে। 


এই বার সবে, চোখাচোখি করে, 

এই ক্ষনে কি যে করে ! 

"তাহার তো ঢের হয়েছে বয়স -

এমনিতে যাবে মরে। "


"বিদেশ যাইতে প্রচুর খরচ -

জমি বেচে দেব পুরো? 

কি লাভ আছে! যতদিন বাঁচে -

বাড়িতে থাকুক বুড়ো। "


অবশেষে বাবা বুঝিতে পারিলো -

চোখে  ক্লান্তির ছোঁয়া, 

তবু দুই হাত, তুলে সারা রাত ;

করিলো সবারে দোয়া। 


মুয়াজ্জিনের  মধুর ধ্বনিতে 

প্রতিদিন বাবা জাগে, 

আজ তো জাগেনি বাবার দেহটা, 

নিথর হয়েছে আাগে। 


গোধুলিতে এসে  হিসেব  মিলায় -

দুপুরের রোদে কত কষ্ট ;

এখানেই জিতে গেলো বসুধার রং, 

শেষমেষ আঁধার প্রকোষ্ঠ।


সাহানারা সেখ(টুম্পা)


সম্পর্ক 


এ রমণী কোন রমণী?

নিজেকে জননী বলে,করে দাবি!

অন্য স্বামীতে আসক্ত হয়ে,

অবৈধ সম্পর্কে করে মাতামাতি।

ধিক্কার দি সেই তনয়কে ও

যে অন্নের ভেলাতে ভাসে।

এমন করে এই সংসারে

নাশহীন হয়ে নেমে আসে।

ক্ষমার যোগ্য নয়তো তারা

সমাজ কুলসিত করার কারিগর।

চক্ষুর ওই কালো পর্দা অন্নে খোলার চেয়ে 

নিজে খুলে ফ‍্যাল।

অন্ধকার সংসার থেকে,আলোর জগতে বিরাজ কর।


এস, আলম


কাশফুলে  স্মৃতি দোলে 


    কাশফুলে আজ হারিয়ে যাবো
    থাকবে না আর ছায়া, 
    কাঁদিসনে কেউ আমার ব্যথায় 
    রাখবে স্মৃতির মায়া । 

    আসবো আবার শরৎ এলে  
    যৌবনা কাশফুলে, 
    দেখবে সেথায় মেঘের ভেলায় 
    মনের আগল খুলে । 

    আসবে সুজন দেখবে স্বজন 
    নদীর কূলে গেলে, 
    বেতাল স্রোতে ভাসিয়ে যাবো 
    দেখিবে দুচোখ মেলে । 

    আমায় ক'জন করবে সোহাগ 
    ভালোবাসার সাথে, 
    ক'জন আবার মায়ায় বেঁধে 
    রাখবে প্রেমের হাতে । 

    দেখবে যখন কাঁদবে গগন 
    করবে স্মৃতি স্মরণ, 
    শরতকালে বদল দিনে 
    আবার হবে মরণ । 


 

১২ সেপ্টেম্বর ২০২১

দুর্গাদাস মিদ্যা


 


আবার কবিতা 


কবিতার কথা যতবার ভাবি ততবার  শব্দেরা ছুটি পেতে চায়। 

মাঝে  মাঝে মুষড়ে পড়ে হতাশায়। 

 দিন নেই রাত নেই 

এখন তখন নেই 

কবিরা শব্দ নিয়ে কাটা  ছেঁড়া করে

তারপর কবিতা রচনায় বাহবা কুড়ায়। 

পালা পার্বণ নেই 

 সময় অসময় নেই 

সাদা পাতা শুধু ভরায় আমাদের রক্ত মাংসে

ভালো কবিতা লেখা হলে

 কবির পকেটে সম্মান উঠে আসে। 

আইরিন মনীষা


অসময়ে এলে তুমি


দুই যুগ পরে কেন এলে তুমি
জবাব কি দিবে তুমি আমার জানা নেই,
অসময়ের এক সারথী হয়ে ঝরাপাতার কাছে তুমি
কেনই বা আসলে বৃষ্টি ভেজা এই সন্ধ্যা গগনে? 

আমার সমস্ত আশা আকাঙখা দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে
গিয়েছিলে ফিরে তুমি একদিন এমনই এক সন্ধ্যায়,
আমার স্বপ্ন গুলো ভেঙে খান খান হয়েছিলো
প্রচণ্ড বেগে ঢেউয়ের তাণ্ডব বয়ে গিয়েছিলো সুকুমার মনে। 

অনেকদিন পক্ষাঘাত গ্রস্থ হয়ে পড়েছিলাম বিছানায়
অশ্রু গড়িয়ে পড়তে পড়তে এক সময় দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ফেলি,
খাওয়া দাওয়া ভুলে গিয়েছিলাম বলে শরীরটাও জীর্ণ শীর্ণ 
এক বিষাক্ত অতীতের সাক্ষী হয়ে এখনো বেঁচে আছি।

তুমি তো ঘর সংসার সবই করলে মনের খেয়ালে
আর সুখেই ত ছিলে আমি যতটুকু জেনেছি, 
কিন্তু আজ হঠাৎ কি মনে হলো তোমার 
আমার কাছে চলে এলে উদভ্রান্তের মত হয়ে?

তবে কি তুমি অনুশোচনার অনলে পুড়ে ছারখার হয়ে 
আমার কাছে শুধু ক্ষমা প্রার্থনা করতে এসেছো??
তা বেশ তাও দিলান তোমাকে কারণ এর,চেয়ে বেশি কিছু নেই
যা আমি তোমাকে দিয়ে একটু প্রশান্তির ছোঁয়া দিতে পারব।

কোথায় ছিলো তোমার প্রতিশ্রুতি সেদিন 
যেদিন আমার স্বপ্ন সাধ ধূলিস্যাৎ করে চলে গিয়েছিলে? 
তাইতো হয়নি আমার আর সংসার দুটা আত্মার মিলনে
তবে হ্যাঁ এখন এতিমদের নিয়ে ভালোই আছি আমি আমার মতই।


 

মমতা রায়চৌধুরী'র গল্প "আলো"




আলো


                    ষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী নিযুক্তা বরাবরই চুপচাপ স্বভাবের। কারো সাথে কোন কথা বলে না। শ্রেণী শিক্ষিকা রেজিনা বেশ কিছুদিন ধরেই নজর রাখছেন। অনেক কথা বলানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু একদম চুপ। একদিন ক্লাস শেষে মেয়েটিকে ডেকে অনেকক্ষণ মাথায় হাত দিয়ে আদর করলেন। আর বললেন -'আজকে কি দিয়ে ভাত খেয়ে এসে ছিলে ?মা ভালো রান্না করেছিল? মেয়েটি এই কথা শুনে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে আর হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে।  রেজিনা আরো কাছে টেনে নেন। তখন সে বলে 'আমার মা নেই। বাড়িতে সৎ মা। ঠিকমতো খেয়ে আসতে পারি না।' তখন দিদিমণি বললেন-' মিড ডে মিল খাচ্ছ তো'? ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায়।ওই টুকুই আমার পেটে থাকে।। বাড়িতে গিয়ে কি করো? সমস্ত কাজ আমাকে দিয়ে করানো হয়। আমার একটা ছোট ভাই আছে ,।তাই যেটুকু মা খাবার দেন ওটুকু আমার ভাইকেই আমি দিয়ে দি। এজন্য আমি পড়া করে আসতে পারি না দিদিমণি। কিন্তু আমার ইচ্ছে হয় আমি সবকিছুতে অংশগ্রহণ করি। আমি আঁকতে খুব পছন্দ করি। রেজিনা জিজ্ঞেস করেন-
                      
                                    'তুমি আঁকতে পারো।' আপনি। দেখবেন? দেখি দেখি। রেজিনা অবাক হয়ে যায় ।এ তো রেজিনার ছবি। তুমি এতো ভালো আঁক। তুমি কি কারোর কাছে আঁকা শিখতে?ছোটবেলায় মা শিখিয়েছিলেন কিন্তু এখন আর আঁকার কোন জিনিস হাতের কাছে নেই আর সময়ও পাইনা। ঠিক আছে শোনো এবার স্কুলে কোন আঁকার প্রতিযোগিতা হলে তাতে তুমি দেবে। কিন্তু দিদিমণি ওদের সাথে তো আমি অত ভালো করে আঁকতে পারবো না, তুমি যা পারো তাই আঁকবে। মেয়েটি খুব উৎসাহিত হয় ।এরপর আস্তে আস্তে মেয়েটির লেখাপড়ায়  মনোযোগী হয় আর ছুটি শেষে দিদিমণির সঙ্গে তার সমস্ত কথা শেয়ার করে। দেখতে দেখতে সমস্ত দেশ এক অতিমারি সংকটের মধ্যে পড়ে। ফলে স্কুল-কলেজ সমস্ত কিছু বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে রেজিনা নিযুক্তাকে নিয়ে ভাবতে বসে। কি খাচ্ছে মেয়েটি ,কে জানে ।এই মোচড় রোজিনাকে তিলে তিলে খায। সে আর ভাবতে পারে না। আজ যদি রেজিনার মেয়েটা বেঁচে থাকত তাহলে নিযুক্তার বয়সী হত। রেজিনার মরা গাঙে নতুন করে জোয়ার আসে।এ কদিনেই মেয়ে টি রেজিনার মনে অনেক গভীরে জায়গা করে নিয়েছে। তাই তার কাছে যে ক্লাস রেজিস্টার এর খাতার কপি ছিল তা খুলে বসে। কিন্তু রেজিনা দেখে তাতে রোল নম্বর আছে কিন্তু কোন ফোন নম্বর নেই। আরেকটু নেড়েচেড়ে দেখেন ঠিকানা আছে।
                             
                                রোজিনা একটু হতাশ হয় এই পরিস্থিতিতে ফোন নম্বরটা পেলে খুব ভালো হতো ।কিন্তু বাড়ি যাওয়া কি ঠিক হবে? মনের ভেতরে যে খচখচানি শুরু হয়েছে তাই সাতপাঁচ না ভেবে নিজেই স্কুটি করে তার বাড়ি পৌঁছে যান। সেখানে গিয়ে দেখেন মেয়েটি বাসন মাজছে আর মা দাওয়ায় বসে ভাত খাচ্ছে। ছোট ভাই নিযুক্তার পাশে বসে আছে। নিযুক্তার জন্য কিছু বিস্কিট ,ফল ,লজেন্স নিয়ে গেছিলেন। বাড়িতে দিদিমণি আসাতে ওর সৎ মা একটু অবাক হয়ে যায় এবং নিজের সাফাই গাইতে থাকে। তার নিজের প্রচন্ড জ্বর তাই মেয়েটি নিজের থেকেই বাসন মাজছে। রেজিনার বুঝতে কিছু বাকি থাকে না। কিন্তু রেজিনা  দিদিমণিকে দেখে নিযুক্তার মুখে এক অমলিন হাসি। সমস্ত অন্ধকার তার মুখ থেকে সরে যায়। সে দিদিমণিকে এসে জড়িয়ে ধরে। দিদিমণি বলেন " এ তোমার ভাই -বলেই তাকে কোলে তুলে নেন। তুমি লেখাপড়া ঠিকঠাক করছো তো? হ্যাঁ দিদিমনি। কিন্তু তোমার তো ফোন নেই ।তাই তুমি জানতেও পারছ না স্কুলের সমস্ত বিষয়।জান তো এবছর আমাদের একটা ভার্চুয়াল রবীন্দ্র জয়ন্তী উৎসব পালিত হচ্ছে। মানে ফোনেতেই তোমাদের সমস্ত অনুষ্ঠান হবে ।তাই যে যা পারে নিজের সাধ্যমত কবিগুরুকে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করবে। আর তুমি তো আঁকো  ভালো । তাই তুমিও এতে অংশগ্রহণ করবে। দিদিমণি ,আমি কি করে ছবি পাঠাবো? ঠিক আছে তোমাদের বাড়িতে কি একটাও ফোন ..বলেই তার মায়ের দিকে তাকাল। হ্যাঁ ,আছে তো? আসলে স্কুলে দেয়া হয় নি। আমাকে দিয়ে দিন , আমি গ্রুপে এড করে দেবো। ওকে একটু একটু অনলাইনের ক্লাসগুলোতে ফোনটা দেবেন তারপরে নিয়ে নেবেন। ঠিক আছে দিদিমণি। রেজিনা এইটুকু আশ্বস্ত পেয়ে চলে যান। তারপর যথারীতি আসলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ তাতে তার আঁকা পাঠানো হয়। স্কুলের তরফ থেকে যে গুলোকে বাছাই করা হয় এবংএফ বি তে পোস্ট করা হয়। কিন্তু তাতে নিযুক্তার  কোন ছবি সিলেক্ট হয় না। রেজিনা দিদিমণি আশাহত না হয়ে নিজের ফেসবুক একাউন্টে নিযুক্তার ছবি দিয়ে কবিগুরুর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করলেন। আর ক্যাপশন করলেন রবির আলোয় সকলেই আলোকিত হোক । আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও, মনের কোণের সব দীনতা মলিনতা ,ধুইয়ে দাও।'প্রথম দিন স্কুলের প্রোগ্রামের ছবি যখন এফ বি তে পোস্ট হয়। তাতে নিজের ছবি দেখতে না পেয়ে সে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে । নিযুক্তার  সৎ মা রেজিনা দিদিমণিকে ফোন করে এবং বলে তার মেয়ে আজ পাঁচদিন ধরে জ্বর, শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। রেজিনা সঙ্গে সঙ্গে ছুটে যান নিযুক্তার বাড়িতে।  বাড়িতে নিযুক্তা দিদিমণিকে দেখে খুব খুশি হয় আর বলে সে আঁকতে পারে না , সে কিছুই করতে পারবে না কিন্তু রেজিনা ফেসবুকে যখন তার আঁকার ছবি দেখালেন। জ্বরের ঘোরে যেভাবে সে বক ছিল। নিজের হাতে আঁকা ছবি দেখে সে অত্যন্ত আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। সে বলে আমি পারবো দিদিমণি আমিও কিছু করতে পারব তার দুচোখ বেয়ে জল ঝরতে থাকে। রেজিনা বলেন, ' তুমি খুব পারবে, তুমি অনেক বড় হবে"। আমি সেরে উঠব তো দিদিমণি, বলেই দিদিমণিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। সে আসলে করোনা আক্রান্ত কিন্তু দিদিমণি নিজের দায়িত্বে নিযুক্তাকে হসপিটালে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করেন ,তার পাশে থাকেন এবং সে আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে ওঠে। তারপর সে বলে আপনি আমার কাছে গুরুমা আপনার আলো আমার জীবনে পড়েছে ,আমি আর অন্ধকারে থাকবো না। আমি খুব ভাল করে লেখাপড়া করব। তখন দিদিমণি বললেন ' আসলে আমাদের মনের অন্ধকার যিনি দূর করেন, আমাদের অন্তরে সর্বদা প্রজ্জ্বলিত রয়েছেন। তিনি হলেন ঈশ্বর আর আমাদের গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। উনি পথ দেখিয়েছেন। মনে রেখো শুধু লেখাপড়া করলেই হবে না ।একজন ভালো মানুষ তৈরি হতে গেলে ন্যায়পরাযণতা, সততা, সৎ চরিত্র গঠন,গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধা, আর্তজনের সেবা এই সমস্ত নৈতিক গুণগুলো থাকতে হবে। তাহলেই তুমি প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠবে। তবেই তোমার ভেতরে প্রকৃত আলোর প্রকাশ ঘটবে। সেই স্বচ্ছ আলোতেই ঘুচে যাবে সমস্ত মনের কালিমা। নিযুক্তা এত ভারী ভারী কথা বুঝতে পারলো না বটে ,তবে সে বলল আমি পারবো দিদিমণি সেই আলোকে আলোকিত হতে। রেজিনা নিযুক্তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলেন -এ কান্না সুখের কান্না। রেজিনা জানেন বাস্তব কঠিন তাই নিজেকেও সংখ্যালঘু শিক্ষিকা বলে তাকে কম অপমানিত হতে হয়নি। কিন্তু সর্বদা আলোর দিশা দেখিয়েছেন ওই একজনই।