১৬ জুলাই ২০২২

কবি রহমান মিজানুর এর কবিতা "মধুমাস"





মধুমাস 

রহমান মিজানুর


আমরা তো আম খাই
মুড়ি দিয়ে মাখিয়ে,
আঁটি চাটি আয়েশে
মুখটারে বাঁকিয়ে।
দুনিয়ার সেরা স্বাদ
বুঝি এই আমেতে,
থাকাটা কি সম্ভব
সেই স্বাদে না মেতে?

কাঁঠালের আঁঠা মাখি
হাতে গোঁফে দাড়িতে,
বিশাল এ ফলটারে
নিয়ে এসে বাড়িতে।
টপাটপ গিলে খাই
কোষ; কী যে রসালো!
খাওয়া শেষে বিচি গুনি
বেশিটা কে খসালো!

চেহারাটা মাইক্রো
কাঁঠালের মতো,
স্বাদে গুণে অনুপম
বলি আর কতো?
রসে টইটুম্বুর 
টসটসে জেলী,
একবারে মুখে পুরে
জিহ্বায় খেলি!
ফলটারে চিনেছো?
গেজ করো কিছু,
নামে জিবে পানি আসে 
সেটা হলো লিচু।

নুন কাঁচালঙ্কায়
ভালমতো চটকে,
টসটসে কালোজাম
টুথপিকে লটকে
খেতে কিযে স্বাদ ভাই
চেখে যদি দেখতে,
আঙুলে চাটা ছেড়ে
ফেসবুকে লেখতে??


কবি রুকসানা রহমান এর কবিতা "ভেঙেছো আমায়"




ভেঙেছো আমায়

রুকসানা রহমান

তোমাকে খুঁজে ছিলাম কৃত্রিম লেন্সের মায়ার চোখের
স্বর্ণচাঁপা রাত্রির আলোক মিছিলে।
ভেবেছিলে ভেঙ্গেছো তো আমায়
এই দেখে আমি ঠাঁয় আমাতেই দাঁড়িয়ে...!?
শীতল স্হবিরতা ভেঙ্গে আমি নিজেকে গড়তে জানি।

জাগিয়ে রেখেছি তুমুল আঁধারে অনুপম আলোকে
আসবে আবার এসো, দিনগুলো,সন্ধ্যাগুলো
নিয়ে যাও
জ্যাোৎস্নার জলজঘ্রাণ, রাত্রি লেখা কবিতার রোমান্স স্বপ্নঘন ভাঙনের তমসার কিছু মুগ্ধতা।
তবুও কি ভাঙতে পারবে আমায়,যা কিছুতেই যায়না
ভাঙা...?
আমার ভিতরে যেখানে কেবলই আমি, প্রতিটি বাতাসে
আমিই এঁকে দেই খুলে দেই অনন্য পথ।
নদী কি কখনো ভাঙে,ঘুমায় প্রেম বেঁচে থাকে প্রেমিকের দেহে যেখানে আমিই আকাশ কবিতার।

চাঁদ বানভাসি তোমারই মতন বেখেয়ালি মেঘে
ভেসে যায় দারুণ স্রোতের টানে কখনো বজ্রপাতে
কি করে,ফের গড়বে নিজেকে।
এভাবে,ভাঙার খেলা খেলতে - খেলতে না জানি
নিজেকেই ভাঙবে যখন
তখন জলের শরীরে দেখো খোলা হাওয়ায়,আমি
বেজে উঠেছি আমার-আমিকে গড়ে।

কবি গোলাম কবির এর কবিতা "একদিন কল্পনায় মীর্জা গালিবের সাথে "




একদিন কল্পনায় মীর্জা গালিবের সাথে 

গোলাম কবির



 মসজিদের পথে যেতে যেতে একদিন 
 কল্পনায় মীর্জা গালিবের সাথে হলো দেখা।
 সে বললো তোমার সাথে আমাকেও 
 নিয়ে চলো মসজিদে। বললাম তাকে হেসে,
 " যাও তবে অজু করে এসো, 
 মাতলামি করো না আবার সেখানে গিয়ে। " 
সে তখন বললো, " ঐ অবস্থায় তো কল্পনায়
 যাই সর্বদাই, এখন যেতে চাই জাগরণে! "
 মসজিদের বারান্দায়  পা রাখতেই 
গালিব বললো, " এখানে যারা নামাজ
 পড়ছে ওদের একজনের ও তো অজু 
হয়নি আমার মতে! " আমি তাকে বললাম, 
" কেনো বল তো ভাই! " 
তখন সে রেগে গিয়ে বললো, 
" ওদের কারো হৃদয়ই তো পবিত্র নয়, 
  শুধু বাইরের অজুই কি 
যথেষ্ট তবে নামাজের জন্য? 
 এবং এইজন্যই তো এখানে নামাজ আছে,
 নামাজি আছে, রুকু আছে, সিজদা আছে
 শুধু তাতে আল্লাহর কাছে হাজিরা নেই,
 আছে শুধু সখ্য শয়তানের সাথে,
 অহংকারের চাদরে মোড়া! " 
বলেই সে আবার বের হয়ে গেলো 
মসজিদ থেকে, আমি অবাক বিষ্ময়ে 
তার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে
 রইলাম বটগাছের মতো স্থির হয়ে।

কবি তৃষা চামেলি এর কবিতা "কামনালতা দুলছে"





কামনালতা দুলছে
 তৃষা চামেলি

কামনালতা দুলছে
বকুল শাখায় রৌদ্রের কানামাছি খেলা
সজনের ডালে পুচ্ছ নাচাচ্ছে ফিঙে যুগল 
চিচিঙ্গা ফুলে প্রজাপতির মুখ
বয়সী বৃক্ষটি একলা দাঁড়িয়ে
ভাবতে থাকে এখানে একদিন নদী ছিলো
ভীষণ খরস্রোতা

গল্পগুলো তোলপাড়, মাথা তোলে সাহসী সময়
বৃক্ষটি পাহাড়কে হাত ধরে 
টেনে আনতো সুখের খেয়ায়
চাঁদের চোখে আঁকতো বেপরোয়া চুম্বন
কেঁপে চৌরির হতো প্রেয়সির ঠোঁট

নদীতে উত্তুঙ্গ শ্রাবণ ছিলো
সাম্পান ছিলো, ময়ূরপঙ্খী ছিলো
পারাপারে ছিলো অভিনব যাত্রীর দোলা
বৃক্ষটি আজ তটরেখায় বালুর পদচিহ্ন খোঁজে

কামনালতা দুলছে তবুও
ছুঁইছুঁই মন
টইটুম্বর অন্দরমহল

কামনালতা দুলছে, দুলছে, দোদুল দোদুল
বৈশাখী মেঘ ছিলো একদা তোলপাড়ের সন্ধিসুখ


মমতা রায়চৌধুরী এর ধারাবাহিক উপন্যাস উপন্যাস টানাপোড়েন ১৮৬






উপন্যাস 

টানাপোড়েন ১৮৬
কেমন একটা যন্ত্রণা 
মমতা রায় চৌধুরী

রেখা রাত্রে খাওয়া দাওয়া সেরে শুতে গিয়েছিল নিজের ঘরে দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে
 ছিল। এমনভাবে শুয়ে ছিল যে ঘুমোনোর ভঙ্গিতে মনে হয়েছিল যে সে এখনো ঘুমিয়ে পরেনি ভেতরে ভেতরে একটা চাপা টেনশন কাজ করছিলো। মনে মনে ভাবছিল ইউএস জি রিপোর্ট টা ঠিক আছে তো? মনের থেকে যদিও এই ভাবনাটা সরিয়ে দিতে চাইছিল ,।সব সময় পজিটিভ ভাবার চেষ্টা করছে ,কিছু হবে না ।কিছু হবে না  সব ঠিক হবে। এমন সময় মনোজ এসে রেখা রেখা বলে ডাকলেও যখন সাড়া দিল না তখন মনোজ রেখার গায়ের উপর একটু ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এতে রেখা খুব বিরক্ত হয়েছিল ।তারপর বলেছিল" কি করছো এসব ।সরে যাও গায়ের ওপর থেকে ।আমার একদম ভালো লাগছে
 না ।"
কিন্তু মনোজ রেখার কথা শুনেও গা থেকে সরে যায়নি অনেকক্ষণ রেখাকে জড়িয়ে 
ধরেছিল ।মনোজ ও তাহলে ভেতরে ভেতরে রেখাকে নিয়ে টেনশনে আছে ?কে জানে।
 হঠাৎ তুতু কিউ কিউ আওয়াজ করে উঠলো আসলে বেচারা মনোজের এই পরিস্থিতি দেখে সে কিছু বুঝে উঠতে পারে নি ।তারপর রেখা তার অপত্যস্নেহে বলে উঠলো' কী হয়েছে সোনা ?কি হয়েছে বলো তো ?তুতু ওর দিকে তাকিয়ে থাকে সেই আওয়াজ করে যাচ্ছে। রেখা তখন খাট থেকে নেমে এসেওকে বুকের কাছে টেনে 
নেয় । ওরাইতোএখন রেখার মনের একটা আকাশ জুড়ে আছে ।তার সন্তান না হওয়ার যন্ত্রনা ,কষ্ট , নিঃসন্তানের অভাব বোধ যে  তাড়িয়ে নিয়ে বেরিয়েছে সব সময় কুকুর তাড়া করেছে।  এদেরকে পেয়ে অনেকটা শান্ত হতে পেরেছে রেখা। এরা মানুষের মত কথা বলতে পারে না কিন্তু ভালোবাসাতে কোন খাদ নেই। ঠিক একই অনুভূতি অনুভব করে রেখা এদের কাছ থেকে।
মনোজ বলল "আজকাল তুমি তুতুকে একটু বেশি প্রশ্রয় দিচ্ছে অন্যদের থেকে। আর আমার কথা তো ছেড়েই দিলাম।"
রেখা বললো 'খুব হিংসুটে হয়ে যাচ্ছ তো তুমি? তুতুর সঙ্গে তোমার হিংসে ? ভাগ্যিস কোন ছেলের সঙ্গে প্রেম করছি না।'
মনোজ হেসে বলল ,'তাহলে তোমার ভেতরে ভেতরে ইচ্ছেটা আছে কি বলো?"
"সব ইচ্ছে কি আর পূর্ণ হয় বলো?"
"আর তোমার যে কথা ।কিসের থেকে কি বলো না?"
"আচ্ছা ভালো কথা পার্থর সঙ্গে তোমার কথা হয়েছে?"
"কি ব্যাপারে বলতো?"*
*হয়েছে কিনা দেখা বলো ?
"হ্যাঁ হয়েছে ওই চৈতির বাবার ব্যাপারে তো?"

"হ্যাঁ।"
'হ্যাঁ ,কথা হয়েছে।"
*তাহলে তো বলার কোনো ব্যাপারই নেই।"
"তুমি টেবিল ল্যাম্প অফ করে দাও আমি শুয়ে পড়লাম।"
"তবে আজকে যেন তুমি ফোন ঘাটতে থেকো 
না ।প্রতিদিন ফোন ঘাট আর  আমার চোখে আলো পড়ে ,এতে ঘুমের ডিস্টার্ব হয় ,ঘুমোতে পারি না।"

মনোজ  আজ আর ফোন  ঘটলো না। মনোজ ও ভিতরে ভিতরে রেখার জন্য চিন্তিত। আজকাল রেখাকে দেখলেই মনে হয় সত্যিই ও ক্লান্ত। কেমন একটা যন্ত্রনা সব সময় মনের ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই রেখা ঘুমিয়ে পড়ল।
মনোজ ঘুমন্ত অবস্থায় রেখাকে দেখলো" কি সারল্য মাখা স্নিগ্ধ মুখ। মনোজ অনেকক্ষণ রেখার দিকে তাকিয়ে থাকলো তারপর আস্তে আস্তে ওর কপালে এঁকে দিল স্নিগ্ধ চুম্বন।
এরপর মনোজও ঘুমিয়ে পড়ল।

এক ঘুমে রেখার সকাল হয়েছে। নরম একটা আলো যেন জানলা দিয়ে এসে ঢুকে পড়েছে মনোজদের সারা ঘরে। রেখার ঘুম ভেঙেছে কিন্তু উঠতে ইচ্ছে করছে না। আজকে তো স্কুল নেই সকাল সকালে ওঠার তাড়াও নেই ।তবে বেলার দিকে যেতে হবে তাই ,একটু আলসেমি করে বিছানায় শুয়ে থাকল। দিনের শুরুতেই যেন রেখার শরীর মনে এক আশ্চর্য আলস্য আলস্যের কারণ রেখার জানা নেই ।তবে সে বুঝতে পারে তার শরীরের ক্লান্তির জন্যই হয়ত বা মনেরও একটা ক্লান্তি আছে। রেখা এবার উঠল আস্তে আস্তে সকালের নরম আলো সারা ঘরে ছড়িয়ে দেবার জন্য  জানলার গোলাপি সর্টেনের  পর্দাটা সরিয়ে দিল। দু:সাহসী রোদের কনা ছুঁয়ে গেল তার ঘুম জড়ানো চোখের পাতায় , গাল থেকে সারা শরীরে।
স্নিগ্ধ আলোয় যেন ফুরফুরে হয়ে গেল রেখা।সে জানলার কাছে চেয়ার টেনে নিয়ে গেল তারপর বসে গেল কবিতা লিখতে।  কবিতার শব্দগুলো নিয়ে এই সময় ভালো খেলা করতে পারবে। পঁচিশে বৈশাখ রবি ঠাকুরের জন্মদিন  তাঁকে নিয়ে কবিতা লিখবে না এটা হতেই পারে না ।রবি ঠাকুর আমাদের সারা শরীর মন চেতনায়  তাই রবি ঠাকুর কে উপেক্ষার ঝুলিতে এ দুঃসাহস রেখার নেই। রবি ঠাকুর মনের ভেতরে এক আশার আলো জাগিয়ে তোলে। লিখে ফেলল রবি ঠাকুরকে নিয়ে কবিতা।
নিজের লেখা কবিতা পড়ে নিজেই মুগ্ধ। এবার একটু ফ্রেশ করে নিয়ে পাঠিয়ে দিল সম্পাদকের কাছে।
সম্পাদক সঙ্গে সুপ্রভাত আর হাসির ছবি দিয়ে মেসেজ পাঠালেন।
রেখাও সুপ্রভাত জানিয়ে দিল।
সম্পাদক লিখলেন "আজ এত তাড়াতাড়ি ম্যাডাম ,.মুড খুব ভালো মনে হচ্ছে?"
হ্যাঁ হ্যাঁ সকাল-সকাল রবির কিরণ ছটা এসে পড়লে যে চোখে মুখে ।কোমল নরম কিরণে মনের শরীরের সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। তাই রবি ঠাকুরের জন্য এই সকাল বেলাটা নিজেকে নিয়োজিত করেছে।'
সম্পাদক এবার ফোন করলেন বললেন "রবি ঠাকুর ছাড়া যেন আমরা চলতে পারি না, তাই না!"
"একদম ঠিক বলেছেন।আর কদিন পরেই রবি ঠাকুরের জন্মদিন ।আমার প্রাণের দেবতা, আমার ভালোবাসার দেবতা নিজেকে যে ভালো রাখতেই হবে।
তাঁর ভিতরেই আমাদের অস্তিত্ব।'
"খুব ভালো ম্যাডাম সারাটা দিন আপনার ভালো কাটুক এই কামনা করি।"
আপনারও।
Ok ম্যাডাম রাখছি।
একদম।
"এমন সময় কিউ কিউ কি উ  আওয়াজ করলো তুতু।"
রেখা বলল" আহা রে লেখার জন্য তুতুর কথাই ভুলে গেছে ওর হিসি পেয়েছে ।
রেখা তুতুকে বলল "'ও বাবা তোমার কথা ভুলে গেছি ।চলো, চলো ,চলো বাইরে।"
দরজা খুলতেই ছুটে গেল তুতু।
 রেখা দেখল তুতুর খুব জোরে বাথরুম পেয়েছিল।
রেখা দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে  বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে গোপালভোগ চাপিয়ে দিল।
তারপর রান্নাঘরে ঢুকলো চা করতে। রেখা খেয়াল করল ঘড়ির কাঁটা তো আজকে বেশ খানিকটা এগিয়ে অথচ মাসির এখনো পাত্তা নেই ।' মাসি আসবে তো কাজে,?
কে জানে?'
এসব ভাবনার ছেদ ঘটাল রেখার ফোন। ফোন বেজে গেল। রেখা ফোনটা ধরতে ধরতেই কেটে গেল। এবার রেখা চাটা ছেঁকে নিতে নিতে আবারও ফোন বাজলো "কোন সে আলোর স্বপ্ন নিয়ে যেন আমায়…।"
রেখা এসে ফোনটা ধরল বলল" হ্যালো'"
"কি রে ননী কেমন আছিস?"
"এইতো চলছে। রেখার ইউএসজীর কথা কাকিমাকে জানালো না ।জানালেই টেনশন শুরু করে দেবে।
কথাটা ঘুরিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করো তোমরা কেমন আছো কাকিমা?"
"আমার কথা বলিস না মা পায়ে ব্যথা, কোমরে ব্যথা এসব আমার সঙ্গে যাবে রে ।এসব নিয়ে আর ভাবি না।'
"ডাক্তার দেখিয়েছো?""
"দেখিয়ে ছিলাম অনেক আগে।
"আবার তো দেখাতে হবে কাকিমা ফেলে রাখার জিনিস। দেখো হাঁটুর রিপ্লেসমেন্টের কথা বলে কিনা।?"
"কাকিমা ও মাসের টাকাটা পেয়েছো?"
"হ্যাঁ পেয়েছি।"
কার সঙ্গে ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিলে?


"সোমু,এসেছিল?"
"জানিস ননী, সোমু মনে হচ্ছে অনেক চেঞ্জ হয়ে গেছে।"
"কিরকম?"
"এবার যখন ডাক্তার দেখাতে যাব বললাম নিজে থেকেই ডেট ঠিক করল তারপর এসে নিয়ে গেল ।ডাক্তারের যা ওষুধ পত্র লিখলেন ,ডাক্তারের ফিজ সব ওই দিল।'
"আসলে ওর ওপর দিয়ে তো কম ঝড় যায়নি কাকিমা  আমরাই হয়তো বুঝতে ভুল করেছি ওকে।"
"জানি না রে মা  শুধরে গেলেই ভালো। তবে এতটা খারাপ হবে আমাদের শিক্ষা-দীক্ষা কি বিফলে যাবে মা?"
"আমারও তাই মনে হয় কাকিমা পরিবারের শিক্ষা দীক্ষা রুচিবোধ এত ঠুনকো নয় যে তাসের ঘরের মতো ভেঙে চৌচির হয়ে যাবে। তাইতো ঝড়ঝঞ্জা এসেছে কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে নিঃশেষ হয়ে যাবে না কাকিমা।"
"ওই আশাতেই তো বেঁচে আছি মা। তবে তোর কাকু এখনো মেনে নিতে পারেননি।
আমি তো মা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন কাকিমা।"
"সব ঠিক হয়ে যাবে। অত চিন্তা ক'রো না।"
তোর দাদা টাই…. আর একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।"
রেখা বুঝল সন্তানের যন্ত্রণা কাকিমা কে কুরে কুরে খাচ্ছে। তাই বলল "কাকিমা দেখবে একদিন দাদাও নিজের "ভুল বুঝতে পেরেছে।"
"দিনটা কবে আসবে? সব শেষ হয়ে যাবার পর, বুঝে কি হবে মা?"
ফোনের ভেতরে বুঝতে পারলেও কাকিমার গলাটা কেমন ধরা ধরা লাগছে একটা কষ্ট যন্ত্রণা কাকিমার সমস্ত হৃদয় জুড়ে সেটা কান্নার আকারে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
"কিছু শেষ হবেনা ।শুধু একটু ধৈর্য
 ধরো ।ঈশ্বর এভাবেই আমাদের বড় বড় বিপদের মধ্যে দিয়ে ধৈর্যের পরীক্ষা নেন।"
"তুই কত বড় হয়ে গেলি ননী ।তোর কথা শুনে সত্যিই মন প্রাণ জুড়িয়ে যায়।"
"আয় না ,এখন তো তোদের গরমের ছুটি পড়েছে ,দুদিন থেকে মা।"
"হ্যাঁ ।কিন্তু দেখ না ,আজকেও আমাকে একটা  স্কুলের কাজে যেতে হবে কলেজে একটা প্রোগ্রাম আছে।"
"ঠিক আছে দেখিস ,পারলে 
আসিস ।রাখছি তাহলে মা ।ভালো থাকিস।"
"তুমিও ভালো থেকো আর ভোলা কাকাকে বোলো যেন টো টো করে ঘুরে 
না বেরিয়ে বাড়ি থেকে তোমাদের দুজনকে একটু দেখভাল করে।


"ওকেই আর কোন বলি মা, ওর ও তো বয়স হচ্ছে। "
ফোনটা রাখার পর রেখা মনে মনে ভাবছে আমাদের পরিবার শুধু নিজেদের কথা নয় অন্যের কথা ও সমানভাবে গুরুত্ব দিয়ে ভাবে। এটাই শিক্ষা এটাই সংস্কৃতি এটাই রীতি স্যালুট করি আমার পরিবারকে

১৫ জুলাই ২০২২

কবি দেবব্রত সরকার এর কবিতা "এ কোন যাদু"





এ কোন যাদু

দেবব্রত সরকার


আঘাত গুলো এ ভাবেই তৈরি হয় 
যখন মনের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু না বলা অক্ষর বসে যায় 

তোমার সাথে হয়তো দেখা এক পলকের তাই বলে ভালো লাগবে না তা হয় না
যখন কোন চোখ তার দুর্বল অনুভূতি আর এক চোখকে ধরা দেয় তখনই তার ভালোবাসার জন্ম হয়।

এমন কোন মানুষ আছেন যে দীর্ঘদিন দেখার পর ভালোবেসেছেন

কারণ ভালোলাগাটাই একপলকের আর ভালোবাসাটা বিরতির ।
প্রেমটা জন্মান্ত্রের আর দর্শনটা না জানা মুহূর্তরের মত ।

১৪ জুলাই ২০২২

মমতা রায়চৌধুরী এর ধারাবাহিক উপন্যাস উপন্যাস টানাপোড়েন ১৮৫




উপন্যাস 


টানাপোড়েন ১৮৫
হু হু করা ডাক
মমতা রায়চৌধুরী

অকারণেই রেখার মনটা আজ হু হু করছে । কিছু কিছু সময় থাকে যখন এর কোনো অর্থই খুঁজে পাওয়া যায় না।  তখন কোনো কিছুতে সাড়া দিতে ইচ্ছে করে না ।
লাইফ কেয়ারে ইউ এস জি টেস্ট করে ফিরে আসার পর ই রেখার ফোন বেজেছে।কিন্তুএত কাজের চাপ ছিল যে ফোন ধরার সময় পায় 
নি । আবার সময় পায় নি বললেও ভুল
 হবে । ওই যে বললাম অকারণের হৃদয়ের হুহু  তান  কিছুটা ।যাই হোক এখন আবার কয়েকবার ফোন বাজল। এবার তো ফোনটা রিসিভ করতেই হয়, যে কলতান শুরু করেছে ফোন বাবাজি । শ্যামের বাঁশি বলে কথা।
বিকেলে চায়ে চুমুক দিতে দিতে টেবিল থেকে ফোনটা নিয়ে দেখল স্কুল থেকে বড়দি ফোন করেছেন।
রেখা মনে মনে ভাবল আজকে বড়দি তো রেগে  যাবেন। আগের ফোনগুলো বড়দিরই ছিল।
ছি:, ছি :,ছি: এটা ঠিক করেনি রেখা সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে বলল' হ্যালো"
অপরপ্রান্ত থেকে গম্ভীর গলায় একটু বিরক্তির সুরে বললেন "কি ব্যাপার রেখা তোমাকে এতবার ফোন করছি তুমি ফোন তুলছো না ?ভাবতে পারছ যে আমি তোমাকে জরুরি কাজের জন্য ফোনটা করেছি হাসি ঠাট্টা মজা করার জন্য নয়।

রেখা ভাবল যা রেগে আছেন এখন মিষ্টি মিষ্টি করে কথা বলতে হবে বলতে বড়দির সাথে।
"না , বড়দি আসলে আমি একটু ব্যস্ত ছিলাম তাই ফোনটা ধরতে পারিনি সরি।"
আমিও সেটাই ভাবছিলাম মরে তো তুমি ফোন রিসিভ করো যাই হোক কাজের কথায় আসি।
"হ্যাঁ,বড়দি বলুন।"
"আগামীকাল কলেজে একটা এস.ডিও অফিস থেকে প্রোগ্রাম অ্যারেঞ্জ করেছে।"
"কি প্রোগ্রাম বড়দি?"
"সেটাই তোমাকে বলছি ,একটা বসে আঁকো প্রতিযোগিতা আছে।"
'আমাদের স্কলের অংশগ্রহণের কথা বলা হয়নি সেখানে টিচার চেয়ে  পাঠিয়েছেন ।আমি তোমার নাম দিয়েছি ।'
"এখন তো স্কুল ছুটি বড়দি। আমার পক্ষে এত দূর থেকে এগিয়ে প্রোগ্রাম অংশগ্রহণ করা একটু টাফ ব্যাপার হবে আপনি লোকাল কারক কে বলুন না?"
"রেখা আমি জানি স্কুল ছুটি আর সবাইকে সব কাজ দিয়ে হয় না এটা তুমি জানো তো?
"সেসব ঠিক আছে বড়দি কিন্তু আমারও তো সুবিধা অসুবিধা থাকতে পারে?'
''সে তো পারেই। কিন্তু আমি তোমার উপর ভরসা করি।
কটার সময়?
কাল সাড়ে তিনটে যেতে বলেছে ন।
কি করতে হবে?
কিছু না ওখানে হয়তো জাজমেন্টের জন্য রাখতে পারেন।
"আসলে বড়দি কখন ছাড়া পাব ট্রেনের ব্যাপার।"
"জানি রেখা  অসুবিধে হবে ,তবু স্কুলের কথা ভেবে তোমরা যদি এগিয়ে না আস কি করে হয় বলো?"
"আপনি তো যে কাজ বলেন আমি সে কাজ করি বড়দি।"
"আমি জানি তো আর সেই জন্যই তো ভরসা করা যায় বলেই তোমার কাছে বারবার সাহায্যের হাত বাড়াই।"
"আর তাছাড়া এস ডি ও অফিস তোমাকে ভাল চেনে এবং ওখানকার সৌভিক দা' তোমার নাম করছিলেন।"
"ওই যে কন্যাশ্রীর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম তখন নোডাল টিচার ছিলাম তারপর থেকেই এইচডি অফিসের যোগাযোগটা একটু বেশি হয়েছে ।
না রেখা সবার পরিচিত এক রকম হয় না কাজের উপর নির্ভর করে আরও অনেকে কন্যাশ্রী নটি যাচ্ছিল এটুকু আমি হলফ করে বলতে পারি তোমার মতো দায়িত্ব নিয়ে কয়জন করেছে বলতে পারো?'
বড়দি নিজের কাজের কথা নিজে মুখে কি করে বলি বলুন ।সে তো মূল্যায়ন করবেন আপনারা। স্কুলে এসেছি, যে কাজ দেবেন সেটা সঠিকভাবে পালন করার চেষ্টা করব।"
"জানি তো সেই জন্যই তো মূল্যায়ন করছি। কোভিদ পরিস্থিতিতে তুমি যেভাবে কন্যাশ্রীর বিষয়ে কাজ করেছ বিশেষত মেয়েদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে এটা প্রশংসার যোগ্য।"
"বাড়িতে না গিয়ে তো উপায় ছিল
 না ।যোগাযোগ করতে পারছিলাম না।"
"সেই জন্যই তো বলছি সবাইকে কাজের দায়িত্ব দিলেও সেটা সঠিকভাবে করতে পারে না।'
"আর সৌভকদা তো আমাকে একদিন বলেই দিলেন আপনাদের যোগ্য কন্যাশ্রী নোডাল টিচার রেখা চৌধুরী। উনি যেভাবে আমাদেরকে সেই সময় সাহায্য করেছেন বিভিন্ন তথ্য দিয়ে তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।'
রেখা হাসতে শুরু করল আর বললো 'অবশ্যই আমাকে কিছু টিচার এজন্য কথাও শুনিয়েছিলেন, বলেছিলেন যে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করতে হচ্ছে? অনেকটা কটাক্ষের ছলে। যাক সেসব বিতর্কে আমি যেতে চাইছি না দিদি।"
"ঠিক আছে। তাহলে ওই কথাই রইল তুমি অবশ্যই পৌঁছে যেও কাল, ঠিক আছে।"
"হ্যাঁ, দিদি যাব আসলে শরীরটাও ঠিক যাচ্ছে না তো দিদি।"
"তোমাকে তো জিজ্ঞেস করাই হয় 
নি। দেখেছো, তুমি কি টেস্ট করাতে গিয়েছিলে?"
"হ্যাঁ ডাক্তারবাবু হোল এবডোমেন ইউএসজি করতে বলেছেন।"
"ও তাই বুঝি? করিয়েছো?"
" হ্যাঁ দিদি, আজকেই করিয়েছি …সেজন্যই তখন ফোনটা ধরতে পারিনি।'
' ওহ সরি রেখা ,তোমাকে আমি সেই সময় ডিস্টার্ব করেছি"।
"তাহলে কি তোমার অসুবিধা হবে? কি বল? তাহলে অন্য টিচারকে বলবো?"
"না থাক, আপনি চাইছেন যখন আমি যাব।"
"না খুব অসুবিধে হলে তাহলে আমাকে অন্য টিচার দেখতে হবে   তবে তোমার উপর আশাভরসা টা আমার বেশি। এবার তুমি যেটা বলবে সেটাই হবে।*
"না বড়দি আপনি দিয়ে দিন আমার নাম।'
Ok
"ভালো থেকো।"
"হ্যাঁ বড়দি  ,আপনিও ভালো থাকবেন।"
সবেমাত্র ফোনটা রেখেছে ঠিক সেই সময় শুধু দেখছে পেছনে এসে কিউ কিউ 'করছে।'
"কি হয়েছে তোর ?কটা বাজে ?খিদে পেয়ে গেছে।'
" ঠিক আছে, চলো খেতে দেব।"
তুতু লেজ নাড়ছে আর কিউ কিউ আওয়াজ করছে।
রেখা ওর মুখের কাছে নিজের মুখটা নিয়ে ভালো করে আদর করে দিলো তারপর বলল 'গায়ে গন্ধ হচ্ছে, স্নান করতে হবে। কালকে তোমাদের সকাল-সকাল স্নান করিয়ে দেব কেমন?'
তুতু কি বুঝলো রেখার কথা কে জানে ফ্যালফ্যাল করে রেখার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল তারপর আরেকবার কিউ কিউ আওয়াজ করলো।
রেখা আর কালবিলম্ব না করে রান্নাঘরে গিয়ে ভালো করে মেটে দিয়ে ভাত মেখে ভাত নিয়ে ওদেরকে খেতে দিতে
 গেল।
 ওদেরকে রেখা  ভাত দিচ্ছে আর বলছে  সবাই চুপ করে বসো ।আমি সবাইকে দেব। কি সুন্দর সব নিজের নিজের ডিসের কাছে সবাই বসে রইল। রাস্তা দিয়ে এইসময় কজন লোক যাচ্ছিল তারা দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এরা তো রাস্তার কুকুর না দিদি? রেখা বলল "প্রথমে আপত্তি আছে আপনাদের কথাতে" কুকুর' শব্দটা ব্যবহার করবেন না  ।
 ভদ্রলোক বললেন "আসলে আমি এভাবে বলতে চাই নি  ওরা যে শ্রেণীতে পড়ে সেই শ্রেণী টাকে উল্লেখ করেছি আর ভুল হবে না আপনি ওদেরকে সন্তানস্নেহে লালন পালন করেন তো বুঝতে পেরেছি।'
রেখা বলল 'হ্যাঁ দাদা ,একদম
 তাই ।ওদের নাম আছে। আপনারা নাম ধরে ডাকবেন, দেখবেন কি সুন্দর লেজ নাড়ে আর সাড়া দেয়। "
"ও তাই বুঝি?"
অনেকক্ষণ ভদ্রলোক ওদের দিকে তারিয়ে তারিয়ে। খাবার দেয়া উপভোগ করল তারপর বলল 'একটা প্রশ্ন করব?'
রেখা কৌতূহলে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল" বলুন না কি বলবেন?"
আপনি নিজে হাতে রান্না করেন না..?
কথাটা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই পার্থ বলল "বৌদি নিজের হাতে রান্না করেন ।দেখছেন না নিজের হাতে খাবার পরিবেশন করছেন  'হ্যাঁ এবার এদিক ওদিক কোথাও গেলে তখন কাউকে বলে যান। তখন তারা খাবারটা দিয়ে দেন।"
"খুব ভালো এরকম মানবিক কজন হতে পারে বলুন।&"
"ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন।"
রেখা একগাল হেসে বলল "ঈশ্বর সকলের মঙ্গল করুন। তারপর পার্থর দিকে তাকিয়ে বলল "কি ব্যাপার পার্থ হঠাৎ তুমি এদিকে।".
"পার্থ বলল" দাদা নেই?'
ও তো  কিছু জিনিস আনতে গেছে মার্কেটে।"
"কিছু বলবে?"
*একবার চৈতির বাবাকে দেখতে যেতে পারবে কিনা সেটাই জিজ্ঞেস করতাম।*
"ঠিক আছে, তুমি নামায় রাত্রের দিকে একবার এসো ,আর না হলে ফোন করে নিও।'
'ঠিক আছে বৌদি "তাই হবে।"
"মাসিমা কেমন আছেন,?'
"এমনি ঠিকই আছে  এখন বয়স হচ্ছে তো এটুকু তো লেগেই থাকবে।'
"মা তোমার কথা বলছিলো একবার যেও না বৌদি মায়ের সঙ্গে দেখা করে এসো।"
"সময় পাচ্ছি না ।তারমধ্যে দেখো আজকে আবার বড় দি ফোন করেছিলেন  এদিকে সামার ভ্যাকেশন অথচ কালকে যেতে হবে ।তবু নিজের স্কুল নয় ওখানকার একটা কলেজে।'
"ওমা তাই নাকি?"
"তাছাড়া আর কি বলছি।"
ও তো শুনলেই বলবে ছুটির দিনগুলোতে ও তোমাকে ডেকে নিতে
 হয় ।"
পার্থ হেসে বলল" দাদা তো ঠিকই বলেছে?
" ঠিক আছে বৌদি আসছি  রাত্রে পারলে আসব।"

"ঠিক আছে তাই এসো ।রেখা পার্থর চলে যাওয়া দিক আর গোধূলি বেলার ম্লান   আলোর দিকে তাকিয়ে থাকলো ।মনে হল যেন সুর্য ডুবুডুবু এ যেন গঙ্গাসাগরে ডুবে যাওয়া মৃত মুনিয়া পাখির মত লাগছে। রেখা তার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে দেখল মনটা যেন কেমন হঠাৎ করে হু হু করে উঠলো।

কবি শহিদ মিয়া বাহার এর কবিতা "মেরু রেখার ওপ্রান্তে হারাই"



মেরু রেখার ওপ্রান্তে হারাই

শহিদ মিয়া বাহার


আমি হাত রাখি শিল্পচারী অনামিকায় 
কি এক মায়ার ছায়া লাগে
ভেজা ভেজা বিকেলের ধূসর করতলে
যেন ছুঁয়েছে এ হাত, বহুদিনকার চেনা-চেনা  মোহ-মোহ  নীল কাবেরীর সুবর্ণ জল--!

তোমার মেরুরেখার ওপ্রান্তে
নেশা নেশা জোৎস্না নামে অবিকল দেবতার মত---
আমি জানু পেতে বিছিয়ে দেই 
               সান্ধ‍্য প্রদীপের আলোয় 
           নিমগ্ন প্রণতির জলপদ্ম বিহার--!

তুমি চুম্বকমতি মোহিত ময়ূরাক্ষী সই,
আকর্ষণ মগ্নতায়---
জারুল পাতার মুরলী সুরের তানে 
বিবশ কর উত্তর আর দক্ষিণ মেরু আমার!
আমি নির্জীব লৌহ দন্ডের মত বায়বিক আকর্ষণে ছুটে যাই 
তোমার মেরুকণার গহীন সাকী পেয়ালায়
আবেশ ধারকের বিদ‍্যুৎ প্রবাহের মতোন, 
প্রদোষ প্রহর, নিদ্রাহীন নিশুতি যাপনে--!

তুমি আশ্চর্য আলোর মত রাসায়নিক চোখ মেলে বেঁধে রাখ আমায়
গভীর মোহনেশা বিক্রিয়ার অনুসঙ্গ প্লাবনে--
আমি জারিত হতে হতে বিজিত সত্তা হারাই 
তোমার দৃষ্টির উপত‍্যকা, অরণ‍্যে
যেখানে জোনাকিরা কূল হারায় অনিরুদ্ধ যন্ত্রনায়--- ঘোর তমসায়!

আর কতদূর নিয়ে যাবে হে চুম্বকদেবী  
সীমান্ত কেটে কেটে
            গভীর তমিস্রায় আমায়--!?

কবি মহিউদ্দিন আহমেদ এর কবিতা "মানিক বন্দোপাধ্যায় '




মানিক বন্দোপাধ্যায় 

(চতুর্দশপদী)
 
মহিউদ্দিন আহমেদ 


তোমার প্রতি ডাল পাতা রন্দ্রে মূর্ত মাটির ঘ্রাণ,
ধরিত্রীর বুকে কি অভূতপূর্ব এক বৃক্ষ তুমি !
জীবনের বালুচর ভরিয়ে আনো পদ্মার বাণ,
স্বপ্ন তরীতে আঁকো জীবন-কাব্য ধন্য জন্মভুমি।
কি করে বেঁধে ফেলো ক্ষুধা ক্লিষ্ট দারিদ্র্য চিত্রকথা ?
নিকষ আঁধারে পথ দেখিয়ে আদিম রত্ন ধন,
বুকের গভীরে অনিন্দ্য কাব্যিক  আপামর-ব্যথা,
অবাক নয়নে পাপড়ি মেলে জনতা জনার্দন।

স্বপ্নের বীজ বুনে চলো খুঁজে নিয়ে নির্জন দ্বীপ,
ধূলিমাখা জীবনে গেঁথে অবিনাশী পদ্যের ঘ্রাণ,
কূয়াশা-পর্দা ঠেলে প্রকৃতি ভালে দিয়ে লাল টিপ,
পথহারা নদীতে জেগে উঠে দুর্বার কলতান ।
মশালে তোমার দেখে পথ বিভ্রান্ত সব পথিক,
দুর্দান্ত বাতিঘর তুমি আঁধার জগৎ-মানিক ।

কবি এইচ আলিম এর দুটি কবিতা "তখন পুরুষ হয়ে উঠি" ও "জলপথের পথিক"





তখন পুরুষ হয়ে উঠি

এইচ আলিম

তোমার ঠোঁটের ভাজ, 
নাকের গড়ন আর-
চোখের ভাষা পড়তে পড়তে
পুরুষ হয়ে উঠি।

পুরুষ হলে, তুমি কি-
গোলাপেরমত লাল হয়ে যাও?
আমার লাল কিম্বা কালোতে কিচ্ছুই 
আসে যায় না। আমি চাই-
তুমি প্রকৃতিরমত প্রশস্ত হও
প্রশস্ত হতে হতে
বুকের বনভূমিতে বসত গড়ে তোল। 

অথচ, সেদিন তোমার উড়োচুলের
ঢেউ দেখেই প্রেমে পড়ে গেলাম।
তোমার হাতের মেহেদি রঙ
চোখের কাজল, 
কানের ঝুমকো,
কলাপাতা জামা, 
কালো রঙের জুতা,
কাচের চুড়ি, নেইল পলিশ
চুলে ভরা ভাজ করা কাঁধ
কফিমগে লিপিস্টিকের ছোঁয়া
দেখতে দেখতে আবারো-
আবারো মন পুরুষ উঠি।






জলপথের পথিক

এইচ আলিম



একদিন তোমাকে দক্ষিণের 
টিপের কথা বলেছিলাম বলে
তুমি লাল রঙের টিপ পড়ে এলে। 
লাল টিপ পড়লে আমার সূর্যের কথা মনে হয়। 
বারবার যেন জ¦লে উঠি ক্রোধে,
বনে আগুন জ¦ললে ভেতরে পুড়ে যাওয়া
কঙ্কালের কয়লা দেখি। কি উত্তাপ তার। 
তাপিত কয়লায় সব হেরে যায় আমার,
সকালের নাস্তা, দুপরের ভাত, রাতের রুটি
সব হারিয়ে যায়, 
তথাপি তুমি কালো শাড়িতে লাল টিপ দিলে। 
আমার শোকের বিষয় জেনে তুমিও মুচকি হাসো
তুমিও হাসতে হাসতে নতুন আয়নাতে দেখ
কলমিফুলের পড়ে থাকা পাপঁড়ি।
সব ভুলে যাও কি করে, 
সব মুছে দাও কি করে,
হৃদয় পটে আঁকা ছবিও
মুছে দিলে দামী টিস্যুতে?
এবার ফিরে যাও লাল টিপের কালো শাড়িতে
আমি জলপথের পথিক... 
জলবিহীন হাঁটি সবুজবনে। 

কবি সুশান্ত হালদার এর কবিতা "বালখিল্য সমাচার" 





বালখিল্য সমাচার 

সুশান্ত হালদার 


সব ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া যায় না 
যেমন বাবার ঋণ,মায়ের জঠরের ঋণ,দেশ ও মাটির ঋণ
দেশ বলতে বাতাস মাটি জল বৃক্ষ আকাশ পশুপাখির কলতান 
মানুষকে ইচ্ছে করেই উহ্য রাখলাম,কারণ 
মানুষ হলো সেই জীব
যারা শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদারে ভুলে গেছে সব অতীত ইতিহাস 

তোমাকে ভালোবেসে বলেছিলাম নক্ষত্রের আদলে মুখ তোমার 
রাশিফলে যদি বিচ্যুতি হয় কক্ষপথ আমার 
নেটওয়ার্কবিহীন পৃথিবী যদি ডুবে যায় সমুদ্র তলে সিংহভাগ 
টানা বৃষ্টিতে যদি অবশিষ্টাংশও খুঁজে পাওয়া না যায় আর 
তবে কী ভুলে যাবে আমার দেয়া সব উপচার
যে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ঘুরেছে কক্ষপথে সংঘর্ষ এড়াবার 

তিন তিনবার প্রদক্ষিণ শেষে এখন নক্ষত্র খুঁজি না আর 
সাড়ে তিন হাত মাটি পেলেই ভুলে যাব পৃথিবীর এইসব বালখিল্য সমাচার!

কবি রহমান মিজানুর এর কবিতা "মধুমাস"




মধুমাস 

রহমান মিজানুর


আমরা তো আম খাই
মুড়ি দিয়ে মাখিয়ে,
আঁটি চাটি আয়েশে
মুখটারে বাঁকিয়ে।
দুনিয়ার সেরা স্বাদ
বুঝি এই আমেতে,
থাকাটা কি সম্ভব
সেই স্বাদে না মেতে?

কাঁঠালের আঁঠা মাখি
হাতে গোঁফে দাড়িতে,
বিশাল এ ফলটারে
নিয়ে এসে বাড়িতে।
টপাটপ গিলে খাই
কোষ; কী যে রসালো!
খাওয়া শেষে বিচি গুনি
বেশিটা কে খসালো!

চেহারাটা মাইক্রো
কাঁঠালের মতো,
স্বাদে গুণে অনুপম
বলি আর কতো?
রসে টইটুম্বুর 
টসটসে জেলী,
একবারে মুখে পুরে
জিহ্বায় খেলি!
ফলটারে চিনেছো?
গেজ করো কিছু,
নামে জিবে পানি আসে 
সেটা হলো লিচু।

নুন কাঁচালঙ্কায়
ভালমতো চটকে,
টসটসে কালোজাম
টুথপিকে লটকে
খেতে কিযে স্বাদ ভাই
চেখে যদি দেখতে,
আঙুলে চাটা ছেড়ে
ফেসবুকে লেখতে??

-

কবি আহমেদ কামাল খোকন এর কবিতা "গৃহবাসিনী"






গৃহবাসিনী 

আহমেদ কামাল খোকন


সে বড় চঞ্চল হাতে এটা সেটা করে,
মাটির চুলোয় আগুনের উত্তাপ, তার বুকের উত্তাপ পুড়িয়ে দেয়, সংকর আগুনে পুড়ে যায় যৌবন।
সম্পর্কের সমন্বয় সাধনে, অল্প বয়সি দুটি পায়ের হঠাৎ বয়স বাড়ে, তবুও পদক্ষেপ চালিয়ে নিতে হয়।
চন্দ্রগ্রহনের মতই ধীরে ধীরে, চোখের উপর ছায়াবাজীর ভেলকি দেখায়, অদৃশ‍্য পুতুল নাচের নেপথ‍্য কুশিলব।
কিছু গান সেই কবে শুনেছিল, কোন্ ভালো সময়ে!
ভালো সময় আর আসে না, পুরনো সুর বাঁজে না এখন আর।

কত জন! বেদেনি সেজে ঘুরে বেড়ায়, বোষ্টমী সাজে কেউ  কেউ, সে কোনো একটা টিপের দাবি নিয়ে, খিড়কির বাইরে, একদম পা ফেলতে পারে না!

কোনো যাযাবর, কোনোদিন, তৃষ্ণায় দুয়ারে দাঁড়ালে, তাকে ডেকে বলবে বালিকা, ওহে পথিক! তোমার পথ কি একলা চলার ? কতটা সংকীর্ণ? পাশে নিতে পারবে?

চাইলেও সে যেতে পারবে না, চেনা জানা সীমানার বাইরে যেতে হয় না, মননে এমনই শক্ত সে বোধ! কে কবে প্রোত্থিত করে দিয়েছে, কেউ জানে না, সে কোত্থাও যাবে না।
সে কখনো খোলা আকাশ দেখবে না, কার বাগানে কি ফুল ফুটেছে জানবে না, কার ললাট, কোন্ ঠোঁটের স্পর্শে কেঁপেছে, এমন বিহ্বল সময় সে ছোঁবে না।
সে এক অদেখা খোলসে বন্দি, আত্ম-নিমগ্ন গৃহবাসিনী।
সে কোত্থাও যাবে না।