৩১ ডিসেম্বর ২০২১

কবি সঞ্জয় আচার্য এর কবিতা




৮০র গ্রাম:বিকেল


যুবতী আলপথ হেঁটে আসে অগ্রহায়ণের খামার বাড়িতে
কৃষানীর বাড়া ভাতে ঝুমকো গাঁদার পাশে,

দু’পাড়ের ঝুঁকেপড়া ধানের ছায়ায়
শিশির খাওয়া আগাছাও চায়
বেড়ে ওঠা ঋতুস্রাবে পেটপোরা পুষ্টি
চাতালের ঘুম।

ওদিকের হাত আসনে বুনে রাখা বিগত যৌবনা
আকর্ষ ধরে উঠে যাওয়া বল্লরী বেদনা
কবে যেন ফেলে এসে আবার আজ
                             আত্মলিপি খুঁজে খুঁজে
ফিরে যেতে চায় আটচালা গল্পগাথায়,

দাওয়ায় বসেছে ভেবে দেখি এবং বসেছিল
পাড়াতুতো দুই প্রৌঢ়া বিকেল।



সঞ্জয় আচার্য
20 A/3 শীল লেন, ট্যাংরা
কোলকাতা 700015
9830437268

৩০ ডিসেম্বর ২০২১




অলীক সমীকরণ
সুমী শারমীন

অদ্ভুত এক রঙের মানুষ কাঁদায় বারো মাস
পৌষ ফাগুনী খেলায় মাতে,আমার দীর্ঘস্বাস।

কাছে থেকেও ডাকে না সে , করে অবহেলা
অভিমানের কষ্ট পুষে,হারাই আমার খেলা।

হারতে চাইনা,ছাড়তে চাইনা,নিত্য দিনের মতো
বন্দী পাখির ঝাপটানো ডানা,অন্ধকারের মতো।
 
বুঝবে না জানি,শুধু হয়রানি, তবু্ও আকাশ কাঁদে
ব্যাথার কষ্ট, সুখের আশায়,নিত্যদিনের ফাঁদে।

পারিনা এড়াতে,ছেড়ে যেতে চাই,চেনা পথ ঘাট সব
মনের মাঝেতে বসবাস করে,তারই সব কলরব।
 
হাত রাখতেই সব ভুলে যাই,সেই তো রঙের মানুষ 
সারাটি জীবন কাঁদি তার তরে,উড়াই রঙিন ফানুষ।

মমতা রায়চৌধুরী/ ৮১




উপন্যাস 


টানাপোড়েন ৮১
অনুভূতির উপলব্ধি
মমতা রায়চৌধুরী



সারাটা  শীতের দুপুর   মনে এক অসহ্য যন্ত্রণা ;হ,কষ্ট ।কাকে বলবে রেখা?
মনোজকে বলার মতো নয়। কেন যে নয়, সেটাও বুঝতে পারছে না রেখা।
 কাকিমা (মীনাক্ষী দেবী) যখন বললেন 'রূপসার কথা মানে বিপাশার দিদির কথা ।তখন থেকে শুনেই রেখা ভেতরে ভেতরে যন্ত্রণায় দগ্ধ হচ্ছে। কত কষ্ট করে হারু জেঠু দুই সন্তানকে মানুষ করেছেন ।সে তো চোখের সামনেই সবাই দেখেছে। এত অভাব এর মধ্যেও মেয়ে দুটিকে কখনো কষ্ট দেন নি। যতটুকু সামর্থ্য, সেই অনুযায়ী মেয়েদের যথাযোগ্য পড়াশোনা থেকে শুরু করে সমস্ত কিছু শেখানোর চেষ্টা করেছেন। সুপাত্রস্থ ও করেছেন। রূপসার বর খুব ভালো মানুষ ছিলেন। অথচ তাকেই ভগবান পৃথিবী থেকে সরিয়ে নিলেন।
বিপাশা যতটা কোয়ালিটি সম্পন্ন মেয়ে ছিল বিয়েটা ঠিক তেমন হয় নি ।হয়তো বর ভালো একটা চাকরি করতো এইটাই। মানুষ হিসেবে ভালো নয়। ওর বর‌ও তো প্রতারণার কেসে জেল হাজতে।রেখা কাকিমার কাছ থেকে ঘটনাটি শোনার পর থেকে কেমন যেন হয়ে গেল। কাছের মানুষ, ভালোবাসার মানুষ যদি ছেড়ে চলে যায় ,কেমন হতে পারে সে উপলব্ধি ?রেখা ভাবতে পারে না ।ভয়ে আতঙ্কে রূপসাদির ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা সব যেন ভিড় করতে থাকে রেখার চোখেমুখে।
মনে পড়ে বিপাশাকে ভালোবাসতো রেখাদের পাড়ারই একটি ছেলে। বিপাশা বুঝতে পেরেও সেই ডাকে সাড়া দিতে পারে নি।
ভালোবাসাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। হয়তো এখন কোন এক সন্ধ্যা বেলায় বা গোধূলিলগ্নে বিপাশা ভাবতে থাকে সেই মুহূর্তের কথা ।
আজ ঘুরে ফিরে অলস শীতের দুপুরে মনে পড়ছে কত কথা। একবার একদিন শীতের সময় ঘোষেদের চাষের জমি পাশেই ,সেখানে দল বেঁধে যেত ছোলা শাক, মটরশুটি আর ধনেপাতা তুলতে ।তার জন্য অবশ্য ঘোষ জেঠু তাড়াও দিয়েছেন কিছুদিন ।
তারপর একদিন ঘোষ জেঠু বললেন 'না  হয় খাবি তো দুটো ধনেপাতা নিয়ে যা না ।'
হেসে আরো বলতেন 'কিন্তু বদলে  কুলমাখা আমাকে দিতে হবে ,মনে রাখিস।'
সেদিনের এক বিকেল বেলায় হঠাৎ বিজয়দা পাকড়াও করে বিপাশাকে একেবারে তেজোদীপ্ত ভঙ্গিতে এসে সাইকেল নিয়ে দাঁড়াল পথ আটকে।' যদিও বিপাশার দৃপ্ত ভঙ্গিতে আরষ্ট হয়ে যায় বিজয়দা কি কথা বলতে আসলো ?সব কোথায় যেন আটকে গেল ।
বিজয়দা শেষে বললো' অনেকগুলো কুল আছে নিবি তোরা?'
আমরা কুল নেব কি নেব না ,সে উত্তরের অপেক্ষা না করেই, সব ঢেলে দিয়ে পালিয়ে গেল ।
কিন্তু রেখার স্পষ্ট মনে পড়ে সেদিনের সেই বিজয়দার চাহনিতে ছিল আলাদা একটা মাদকতা ,ভালোবাসার প্রথম অনুভূতি ,উপলব্ধি।
এভাবে কেটে গেছে কত সুন্দর সোনালী মুহূর্ত ।রুপসাদির তো  তুলনা নেই ।যা কিছু আমাদের ভালোলাগা ,খেতে চাওয়া,আবদার সব রূপসদি তার দাবি মেটাত।তাই ভাবতে পারা যাচ্ছে না রুপসাদির জীবনের এই ঘটনা ।মনের দিক থেকেও যতটা ভালো মানুষ ছিল ,তেমনি আন্তরিকতা সম্পন্ন ।না ছিল কোন অহংবোধ ।হারুদার বাড়িতে নতুন কোন কিছু রান্না হলেই এনে হাজির করত। 
রুপসাদি হেসে বলতো 'তোরা একটু টেস্ট করে দেখ।' 'আমরা জানতাম হারুদার বাড়িতে কতটা অভাব কিন্তু ওই সামান্য জিনিসের ভেতরেও যেন কত ভালোবাসার মিশ্রণ ছিল ।'
হারু কাকাও বলতেন হেসে'  প্রাণ চায় অনেক অনেক তোদেরকে খাওয়াতে কিন্তু আমি পারি না। যেটুকু আছে আয় সবাই মিলে ভাগে ভাগ করে খা ।তোরাও তো আমার মেয়ের ই  মতো।'
উফ অসাধারণ চাটনি করত রূপসাদি ক্যাপসিকামের।
সেই ক্যাপসিকামের চাটনি আমি রুপসাদির কাছ থেকে রেসিপি নিয়ে আজকাল বাড়িতে বানাই ।ক্যাপসিকামের চাটনির সেই স্বাদ রূপসাদির মত আসে না। কিন্তু তবুও এর মধ্যে যেন ফিরে পাওয়া যায় সেই কৈশোরবেলার দিনগুলির মিষ্টি মধুর স্মৃতি। 
রেখা ভাবে 'এখন যে আমরা অন্য শ্রাবণের জলে ভিজি ।অন্যভুবনে এখন আমাদের বসবাস।'
হঠাৎই ফোন বেজে ওঠে' একা একা এই বেশ থাকা আলো নেই কোথাও ।সব মেঘে ঢাকা...।'
হঠাৎই  ভাবনায় দোলা লাগে...।'
মনোজ এসে বলে কি গো তোমার ফোন বাজছে তুমি আজ কোন ভাবনায়?'
রেখা বলল 'হ্যাঁ ফোন বাজছে।'
মনোজ বলল 'কার ফোন দেখো । কাকিমার ফোন আসার পর থেকেই তোমার কেমন যেন মুড অফ হয়ে গেল।'
রেখা বলল' হ্যাঁ দেখছি‌'।
মনোজ বলল 'কে ফোন করেছিল?'
রেখা বলল'পত্রিকার সম্পাদক।'
মনোজ বলল 'এ বাবা তোমার লেখার কতদূর কি হলো?''
রেখা বলল'এরমধ্যে পত্রিকার সম্পাদক তাড়া দিয়েছেন লেখা পাঠানোর জন্য।'
মনোজ বলল 'সে তো ঠিকই'। তুমি পাঠিয়ে দাও।'
রেখা বলল' হ্যাঁ কবিতা  ক'টা পাঠাবো।'
মনোজ বলল' আর নতুন করে আরও লেখ।'
রেখা বলল'এতটা ঘেটে আছি না?
কোন কথাই মাথায় আসছে না ।'
মনোজ বললো 'দেখো জীবনে এই দুঃখ ,কষ্ট ,যন্ত্রণা চিরস্থায়ী হয় না ।ওই নিয়ে বেশী নিজেকে হারিয়ে ফেলো না।'
রেখা বলল 'সারাক্ষণ কেমন একটা বিষন্নতা গ্রাস করে আছে মনেপ্রাণে ।কেন কি জন্য তার কৈফিয়ত দিতে পারব না।'
 মনোজ এসে ব্যালকনিতে রেখাকে  দুই 'হাত ধরে চেয়ার থেকে টেনে তোলে । আর বলে 'নতুন করে ভুলে যাওয়া নাম ধরে ডেকো না। হারানো স্বপন চোখে এঁকো না ।'
রেখার উদাসী বাউল  মনটা  কোন সাত সমুদ্র পেরিয়ে অজানা দেশে হারিয়ে যেতে চাইছে ।সেই মনের হদিশ কি পাবে?'
মনোজ  বলল 'কি ব্যাপার গো? তুমি  এখানে এসে বসে বাইরের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছ, কি হয়েছে তোমার?""
রেখা বলল' অন্য কেউ ছিলো ভাবনায়?'
মনোজ বললো 'হ্যাঁ।'
রেখা বললো  'হ্যাঁ, সত্যি। 
মনোজ বলল 'তাই তো ভাবছি।'
রেখা বললো তু'মি ছাড়া আর কেউ থাকতে পারে না?:
মনোজ বলল 'এতদিন তো ,তাই জানতাম।'
রেখা বললো 'দেখো প্রত্যেকেরই কিছু কিছু একান্ত মুহুর্ত থাকে ।নিজস্ব উপলব্ধি অনুভূতি থাকে।'
মনোজ বলল' হ্যাঁ সেটা ঠিক।'
রেখা বলল 'মাঝে মাঝে নিজেকে হারিয়ে যেতে হয় ।আত্মসমালোচনায় ডুবে যেতে হয় ।নিজেকে আবিষ্কার করতে হয়।'
মনোজ বললো 'কিন্তু আজকাল তোমার ভেতরে একটু বেশিই টানাপোড়েন হচ্ছে, আর তুমি আজকে কি রিংটোন লাগিয়েছ। গানটা তুমি চেঞ্জ করো।'
রেখা বলল' তোমাকে আগেই বললাম মনের একান্ত অনুভূতি উপলব্ধিতে আছে।'
মনোজ বলল 'কোথায় শীতের অলস দুপুরে দুজনে কাছাকাছি বসবো, ভালো ভালো কথা বলব ।মিঠে রোদ্দুর গায়ে মাখবো তা নয়?'
রেখা শুধু ম্লান হেসে মনোজের দিকে তাকিয়ে থাকে।

শান্তা কামালী/৫৩ তম পর্ব




বনফুল 
(৫৩ তম পর্ব ) 
শান্তা কামালী

অহনা অনেক্ক্ষণ চিন্তায় বিভোর ছিলো, অহনা ও একটু বেশি সময় দিতে পারতো, কিন্তু অনার্স ফাইনাল পরিক্ষার জন্য পারেনি। সৈকতের মাস্টার্স শেষ পরিক্ষার আগের দিন আন্টির এই অবস্থা... আল্লাহ পাকই ভালো জানেন সৈকতের পরিক্ষা কেমন হলো?
তিন সপ্তাহে'র মধ্যেই রেজাল্ট বেরোবে। 

পরদিন সকালে উঠে নাস্তা খাওয়া শেষ করে রেডি হয়ে বেরিয়ে গেলেন অলিউর রহমান। যাওয়ার আগে স্ত্রী রাহেলা খাতুনের মাথায়  হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন কাপড় কেনাকাটার জন্য যাচ্ছি। রাহেলা খাতুন স্বামীকে হতে দিয়ে ইশারায় বুঝাতে চেষ্টা করলেন যেন সবকিছু ভালো দেখে নেন... । 
অলিউর রহমানও সম্মতি জানালেন। অলিউর রহমান বড় একটা শাড়ির দোকানে ঢুকে লেহেঙ্গা পছন্দ করলেন যার দাম প্রায় পয়তাল্লিশ হাজার টাকা,দ্বিতীয় শাড়ি বার হাজার টাকায়......। 
সবকিছু এভাবেই মিলিয়ে মিশিয়ে  কিনেছেন। 
কেনা কাটা শেষ করে, সৈকতের বড়ো মামার বাসায় গিয়ে বললেন বৃহস্পতিবার সকালে যেন উনি উপস্থিত থাকেন। সৈকতের মা'য়ের ইচ্ছায় সবকিছু হচ্ছে, সঙ্গে করে সৈকতের বড়ো মামানিকে নিয়ে আসার কথা বললেন অলিউর রহমান  সাহেব।তার কারণ খালি বাসায় তো সৈকতের আম্মুকে রেখে যাওয়া যাবে না। বউ বরন করার জন্য ও তো একজন মহিলা দরকার। ছোট শালা আর নিজের দুই ভাইকে ফোনেই সব বুঝিয়ে বলেছেন, যেন বৃহস্পতিবার দিন সকালে সবাই উপস্থিত থাকেন।


চলবে...

রাবেয়া পারভীন/





দুরের বাঁশি 
(৪র্থ পর্ব)  
রাবেয়া পারভীন



-ম্যাম বৃষ্টিতে ভিজছেন কেন? 
 সিস্টারের ডাকে  সম্বিৎ ফিরে  আসে লাবন্যর। শুভর ভাবনায় একদম ডুবে গিয়েছিল সে,  কখন যে ভোরের উদীয়মান সূর্যটা  ডুবে গিয়ে আকাশ মেঘলা হয়ে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়তে  শুরু করেছে টেরই পায়নি। সিস্টারের দিকে তাকিয়ে  অপরাধীর মত একটু হাসে লাবন্য।
তারাতারি  বারান্দা  থেকে  সড়ে এসে কেবিনে ঢুকল। সিস্টার  তোয়ালে দিয়ে ওর চুল মুছে দিতে দিতে বলল
-মেডাম আপনার কিন্তু ঠান্ডার অসুখ । যান ভিজা জামাটা বদলে আসুন  ওষুধ  খেতে হবে। সকালের নাস্তাও তো পড়ে রয়েছে দেখছি।
লজ্জা পেয়ে  লাবন্য  ওয়াশরুমে গেল । কাপড় বদলে এসে  বিছানায় বসল। সিস্টার নাস্তার প্লেট এগিয়ে দিল  তারপর  ঔষধ। মিষ্টি করে হেসে বলল 
-  আপনাকে আজকে অনেক ফ্রেস লাগছে  মেডাম,  একদম ভালো হয়ে গেছেন। ডাক্তার সাহেব  এলে হয়ত আজকে রিলিজ করে দিবে আপনাকে।
নার্স মেয়েটাকে  বেশ ভালো লেগেছে লাবন্যর। ওর সাথে আলাপ করতে ভালো লাগছিলো। ওর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন  করল
 - আচ্ছা সিস্টার  আপনার নাম  কি ?  
- আমার নাম  গায়ত্রী। 
নামটা শুনে  লাবন্য চকিতে একবার মেয়েটির সিঁথির দিকে তাকালো।   সেখানে সিঁদুরের। কোন চিন্হ নেই। মেয়েটির বয়সও কম মনে হচ্ছেনা।  তবে কি বিধবা?   কৌতুহল চেপে রাখতে পারলোনা সে। জিজ্ঞেস করলো  
- সিস্টার। আপনি  এখনো বিয়ে  করেন  নি ?  
মৃদু হেসে  সিস্টার বলল
- না মেডাম। এখনো করিনি।
- কিছু না মনে করলে জানতে পারি কেন।?  
- সে অনেক কথা।
- একটু বলুন না প্লিজ !
সিস্টার হেসে বলল
- আসলে  একজন কে আমি ভালোবাসি । ছোটবেলা থেকেই প্রেম। সে  আমার পিসির  দেবরের  ছেলে।
- তো  আপনাকে উনি ভালোবাসেনা ?  
- হ্যাঁ হ্যাঁ  বাসে তো। বল্লাম না  ছেলেবেলার প্রেম  
- তাহলে  বিয়ে করছেন না কেন ?
- ও তো কলকাতায় থাকে।  আগে ঢাকায় থাকতো আট বছর আগে পিসিরা কলকাতায় চলে গেছে।  তারপর ওখানে যাওয়ার পর  অসিমের মা মারা গেছেন। সংসার চলছিল না তাই  অসিম বিয়ে করে কলকাতারই মেয়ে। এটুকু বলে মাথা নীচুকরে নিজের চোখের জল লুকাতে চেষ্টা করল  গায়ত্রী ।  এপ্রোনের পকেট থেকে  টিস্যু পেপার নিয়ে নিজের চোখ মুছল। তারপর। ক্রস্ত হয়ে বলল
- মেডাম। দশটা বেজে গেছে এখনি ডাক্তার  চলে আসবেন। আমি গেলাম। 
এগিয়ে যচ্ছিলো গায়ত্রী , খপ করে  ওর  ডান হাতটা চেপে ধরল  লাবন্য , ততক্ষনে  ওর চোখও চিক চিক করছিলো। বাস্পরুদ্ধ কন্ঠে বলল
 - সরি সিস্টার !  আমি বুঝতে পারিনি। মাফ করবেন।
একটু হাসতে চেষ্টা করল  গায়ত্রী।
- আরে না,  কিযে বলেন  মেডাম।
সিস্টার বেরিয়ে যাবার পরে  কেন  যেন শব্দ  করে কেঁদে ফেলল লাবন্য ।  ওর কানে বাজতে লাগলো  "সেতো কলকাতায় থাকে "। অসীম নামের ছেলেটি কলকাতায় গিয়ে ভুলে গিয়েছে  গায়ত্রী কে  আর গায়ত্রী  এখানে মনপ্রান  ঢেলে দিয়েছে  রুগ্ন মানুষের সেবায়। কিন্তু ভালোবাসার  প্রদ্বীপটি  ঠিক জ্বালিয়ে রেখেছে বুকের ভিতরে। আপন মনে  নিজেকেই শুধায় লাবন্য  শুভও  কি দুরে কোথাও গেলে তাঁকে ভুলে যাবে?  প্লিজ শুভ কখনো এমন কোরোনা  তাহলে ঠিক মরে যাবো আমি। ঠিক তখনি কেবিনের দরোজায়  টোকা পড়ে
- ভেতরে  আসবো ?


চলবে....

আইরিন মনীষা 





প্রতীক্ষার প্রহর


খুব করে জানতে চাই 
কেমন আছো তুমি,
সেই এক বিকেলে আসি বলে চলে গেলে
হয়নি দেখা আর তোমার সাথে কিংবা কথাও হয়নি। 

বকুল ফুলের মালা গুলো শুকিয়ে গেছে
যেন তোমারই অপেক্ষার প্রহর গুনছে এখনো, 
কতদিন দেখিনি তোমার ডাগর কালো চোখের চাহনি
যেখানে আমি হারিয়ে যেতাম এক অথৈ সমুদ্রে। 

কতদিন হাঁটা হয়নি নদীর তীরে হাত ধরাধিরি করে
দেখা হয়নি শরতের বিকেলের কাঁশফুলের সৌন্দর্য, 
কতদিন যাইনি সমুদ্রের প্রশস্ত বালুকা রাশিতে
দেখিনি ভিজিয়ে নগ্ন পদ যুগল সাগরের নোনা জলে। 

বড় সাধ জাগে আবার ও সেই বৈশাখী মেলা দেখতে
বিরহী প্রহরে আজ মনটা বড়ই উতলা হয়ে আছে, 
সময় যে আর কাটে না একাকী আমার
কবে পাবো তোমার দেখা আবার। 

মনে পড়ে খুব সেদিনের কথা
যখন তুমি আমার দীঘল কালো চুলে সাঁতার কাটতে,
আমার খুব করে পেতে চাই সেই মধুময় ক্ষণ
যখন তুমি আমার পাশে বসে হারানো দিনের গান গাইতে।

আমার বিরহী প্রহরে তুমিই একমাত্র সঙ্গী
যার সাথে বেলা অবেলায় কেটে যায় আমার ক্ষণ,
মিলনের দিগন্তে ভাসবো বলে প্রতীক্ষার প্রহর গুনছি
শুনছ কি তুমি আমার অব্যক্ত কথা গুলো ? 

এসো না আবার দুজন হারিয়ে যাই
সেদিনের কাছে যখন শুধু আমি আর তুমি
একান্ত সান্নিধ্যে না বলা কথার ফুলঝুড়িতে 
খুঁজে পেতাম স্বর্গের আছে যত সুখ। 

এখনো বাতাসে কান পেতে থাকি
তোমার আসার মাহেন্দ্রক্ষণ এর প্রতীক্ষায়,
রাত জেগে বিচরণ করি আমার স্বপ্নিল ভুবনে
যেখানে তুমিই আরাধ্য আমার স্বপ্নের সেই রাজকুমার। 

আমার করি ডোরে থাকা কাকাতুয়া ও আছে 
তোমার পথ পানে চেয়ে, 
তোমার নাম ধরে সে বেশ ডাকে 
আর আমাকে শুধায় তোমার গুনগান। 

আমার বাগানের ফুল গুলো ও প্রহর গুনছে
এই বুঝি তুনি এসে কাননে পদ ধুলি দিলে,
কাননের কুসুম কলি ও যেন নতুন ভোরের প্রতীক্ষায়
তোমার আগমনি বার্তা পেয়ে ফুটবে বলে। 

কাটে না সময় লাগে না ভালো 
তোমার বিহনে কি করে সময় কাটে আমার বলো ?
আর কত কাল অপেক্ষার প্রহর গুনলে 
তুমি আমার মন কাননে প্রস্ফুটিত হবে একান্তে ?

শামীমা আহমেদ /পর্ব ৪৪



শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত 
(পর্ব ৪৪)
শামীমা আহমেদ 


শিহাব আজ অন্য এক শিহাব রূপে নিজেকে তৈরী করে নিচ্ছে।বিগত জীবনের পটভূমি বদলে নেবার মাহেন্দ্রক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে সে। আর পিছুটানে নিজেকে ফেরাবে না স্মৃতিকাতরতায় আবেশিত হয়ে।আজ, এইতো আর কিছুটা  সময় পরই শায়লার সাথে তার দেখা হবে,ভিন্ন ভাবনায়,ভিন্ন আঙ্গিকে, একই পথ রেখায় চলবার অঙ্গীকারে হবে অনেক কথা বিনিময়  হৃদয়ে  ভালবাসা সঞ্চিত রেখে, 
অপ্রাপ্তির তালিকাটিকে ক্ষুদ্র করে দিতে।

যদিও এর আগেও কয়েকবার তাদের দেখা হয়েছে কিন্তু আজকের দেখা হওয়াটায় অন্য এক ধরনের ভাললাগা,অন্য একটি জীবনের শুরুতে নিজেদের এক হওয়া। একটি সুদূরের বোঝাপড়ায় আগামীর স্বপ্নের বাস্তব রূপ দেয়ার আলাপচারিতা। আজ তাই শিহাব এ প্রসঙ্গ ছাড়া  আর কোন কিছুই ভাবনায় আনতে চাইছে না। সে চট করে লাঞ্চ সেরে সব গুছিয়ে নিলো।আজ লেইট লাঞ্চ হলো।শিহাব সকালে গুলশান মেনজ স্যালুনে গিয়েছিল।একটু নিজেকে তৈরি করে নিতে আর কিছু টুকটাক শপিং করার প্রয়োজনে। 
শিহাব আয়নায় নিজেকে দেখছে। আজকের নতুন কেনা শার্টের সাথে প্যান্ট ম্যাচ করিয়ে নিচ্ছে।আজ হলুদাভ ঘি রঙা একটা শার্ট কেনা হয়েছে। শিহাব তাই কফি ব্রাউন একটা প্যান্ট ম্যাচ করিয়ে নিলো। চুলগুলো নিত্যদিনের সজ্জাতেই থাকবে বলে মনস্থির করে নিলো।ঘড়িতে তাকিয়ে সে ঝটপট তৈরি হয়ে গেলো।চকচকে ব্রাউন কালার সু'পেয়ার পায়ে গলিয়ে, ব্রাউন শেডেড রোদচশমাটা পকেটে পুরে নিলো।একরাশ  সুগন্ধি ঢেলে শিহাব বেরিয়ে পড়লো।এখনো প্রায় অনেকটা সময় বাকী শায়লার আসবার। তবুও,, ঐ যে অপেক্ষায় থাকার আনন্দটা নিতে তাই সে দ্রুত ছুটছে!খুব মনে পড়ছে সেই উঠতি বয়সে তরুণীদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টায় নিজেকে রোমিও করে তোলার দিনগুলির কথা! হায়,কি এক পাগল করা সময়ইনা গেছে তখন! শিহাব যেন সেই সময়টাতেই ফিরে গেছে আজ!
এমন অসময়ে ভর দুপুরে স্যার এত সেজেগুজে কোথায় যাচ্ছে,এ ভাবনায় কেয়ারটেকার বেলালের চোখ কপালে উঠেছে! সে  গ্যারাজ খুলে দিয়ে ঠাটা পড়া মানুষের মত দাঁড়িয়ে রইল।
দ্রুতই বাইক নিয়ে শিহাব পার্কের গেটে চলে এলো।পার্কের ঢোকার মুখে একটা বড় গাছের নীচে ছায়াতে বাইক থামিয়ে দাঁড়ালো। পার্কটিকে এখন আর চেনাই যায় না।ভেতরের আগের নকশা ভেঙে আবার নতুন করে গড়া হয়েছে।অনেক গাছপালার সাথে  নানান ধরনের নান্দনিক সজ্জাও দেয়া হয়েছে। এখনো প্রায় দুপুরই বলা চলে।পার্কের দর্শনার্থীর সমাগম হয়নি একেবারে।শুধু গুটিকয়েক স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়ে জুটি বেঁধে আড়াল হয়ে বসে আছে।শিহাব ভাবলো আসলেই, এই বয়সের প্রেমটা এমনি হয়।যেমন প্রচন্ড আবেগ, তেমনি ধরা পড়ার ভয়!
আজ সে নিজেও  কিছুক্ষন পর এমনি একটি জুটিতে বাঁধতে যাচ্ছে।যেখানে দুজনার চোখে মুখে ভাবনায় থাকবে আগামীর স্বপ্ন।
শিহাব হাতে মোবাইল নিয়ে শায়লাকে কল দিলো।শায়লা এক রিংয়েই কলটা রিসিভ করলো! বুঝাই গেলো কতটা কাঙ্ক্ষিত ছিল এই কলটি।শিহাব হেসে ফেললো শায়লার ছেলেমানুষী দেখে। 
শায়লা তুমি কি তৈরি? 
এখনই চলে এসেছো? আমারতো আরেকটু সময় লাগবে।
কোন সমস্যা নেই।সময় নাও।আমি অপেক্ষা করছি। শায়লা কেবল শাড়ি পরে চোখে আইলাইনারের টানটা দিয়েছে।শায়লার হাত কাঁপছিল। নীল শাড়িটা আজ দিনের আলোয় খুবই সুন্দর দেখাচ্ছে।শায়লা কপালে ছোট্ট একটা কালো টিপ পরে নিলো।মেরুন রঙের লিপস্টিকে ঠোঁট দুটো রাঙিয়ে নিলো।শায়লার মন আজ যেন বাঁধাহীন। কোন কিছুই তাকে বাঁধছে না। খুবই রিল্যাক্স মুডে সে। যদিও সে আজ জীবনের এক কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি। শায়লা সামান্য উচ্চতার একজোড়া কালো জুতা পায়ে পরে নিলো। ড্রেসিং টেবিলে রাখা সুগন্ধি মেখে হাত ব্যাগটি হাতে নিয়ে আয়নায় নিজেকে  দেখে দুবার হাঁটার প্র‍্যাকটিস করে নিলো। নিজেকে দেখে নিজেই অবাক হচ্ছে! আজ অনেকদিন পর শায়লা এভাবে কারো জন্য  সাজলো। কেউ তার জন্য সত্যিকার তেমনিভাবে অপেক্ষায় আছে।
বাসা লক করে শায়লা নিচে নেমে এলো।বাইরে বেশ রোদ।কি আর করা শিহাব যেভাবে চেয়েছে।শিহাবের প্রতি বরাবরই তার এরকম নির্ভরতা।
শিহাব বাইকে বসে অপেক্ষায়  থেকে শায়লার এফবি প্রোফাইলে ঘুরাঘুরি চলছে।সেই প্রথম দিনের পরিচয়ের কথা মনে পড়ছে।মাঝে চলে গেছে অনেকগুলো দিন মাস সময়। কতনা অনুভুতি আবেগ উৎকন্ঠার দিনাতিপাত।সব শেষ করে দিতে চেয়েও আবার সেখান থেকেই নতুন করে শুরু করা।শিহাব তাই ভাবছে  নিয়তি কোথা থেকে কোথা টেনে নেয়! পথে উৎসুক মানুষজন এমন হ্যান্ডসাম লুকের একজনকে দেখে একবার হলেও উঁকি দিচ্ছে।এদিকটায় প্রায়ই নাটকের স্যুটিং হয়।শিহাবকে আবার নাটকের পাত্রপাত্রীই ভাবছে কিনা! অবশ্য ভুল কেন,বাস্তবে লুকটাতো তেমনি! শিহাব সানগ্লাস চোখে সবই খেয়াল করছে।একটা রিকশায় দুইটি টিনএজার মেয়ে বেশ খোলামেলা অভিব্যক্তিতে শিহাবকে ফ্লাইং কিস ছুড়ে দিলো! শিহাব একেবারে চমকে গেলো! হায় ওরা কি বুঝে যে বয়সে আমি ওদের গণ্ডিতে পড়ি না। আজকাল এরা বেশ সাহসী।অনুভুতি প্রকাশ ভীষণ স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড। 
দুইজন গৃহিণী শিহাবের দিকে তাকিয়ে থেকে তা প্রায় আরেকটু হলে গাড়ির সামনেই পড়তে যাচ্ছিল। উচ্চ হর্ণের শব্দে এ যাত্রা বেঁচে গেলো! শিহাব হাসবে না দুঃখ প্রকাশ করবে বুঝতে না পেরে মুখকে পাথর বানিয়ে রাখল।
দূর থেকে  রিকশায় নীল শাড়ি পরা একটি মেয়ে এগিয়ে আসছে।শিহাব এবার সতর্ক হলো। এবার আবার  না জানি কোন অভিজ্ঞতা হয়! আসলে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটায় সত্যিই একটু অস্বস্তি লাগছে।নীল শাড়ির রিকশা তার খুব কাছে চলে এসেছে।শিহাব এবার ভাল করে তাকালো।রিকশায় শায়লা বসে আছে।সাগর নীলা শাড়িটিতে যেন নীলাকাশের ছায়া! শায়লাকে অপূর্ব লাগছে! প্রতিবার দেখা হওয়ায় শায়লা কোন না কোনভাবে চিন্তিত থাকতো কিন্তু আজ চোখে মুখে যেন আনন্দ ঠিকরে পড়ছে! 
কি হলো চিনতে পারোনি?
শায়লার প্রশ্নে শিহাবের পলক পড়লো।
রিকশার কাছে এগিয়ে গিয়ে বললো,সত্যিই  তোমাকে আমি চিনতে পারিনি।তোমাকে  অপূর্ব লাগছে! আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি!
বেচারে রিকশাওয়ালা এদের প্রেমালাপের মধ্য কাবাব মে হাড্ডি হয়ে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে।আরে,,ভাড়াডা চুকাইয়া দিলেই তো সে পালাইতে পারে! 
শায়লা পার্স থেকে রিকশাভাড়া মিটিয়ে নেমে এলো। খোলা চুল বারবার মুখের উপর  উড়ে উড়ে আসছে আর শায়লা তা সরিয়ে দিচ্ছে।
শিহাবের ভেতরে কি যেন কী ঘটে যাচ্ছে!
শিহাব নিজেকে সামলে নিলো।ভালবাসার অনুভবের শুরুর ক্ষণটা যদি আজীবন  ধরে রাখা যেত! এ এক অপার্থিব  অনুভুতি! শিহাব শায়লাকে বাইকের দিকে এগিয়ে নিলো।কিছু মুরুব্বি গোছের খালাম্মারা সন্দেহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ফেরিওয়ালা তাদের ডাক থামিয়ে মনে হচ্ছে সুটিং দেখছে! 
সামনের ছয়তালা ভবন থেকে কয়েকজন বারান্দায় এসে স্থির হয়ে আছে,ভাবটা এমন নাটকের শেষটা দেখতে হবে!!
শিহাব বুঝলো চারিদিকে উৎসুক চোখ তাদের ঘিরে ধরেছে,শীঘ্রই লোকালয় ছেড়ে পালাতে হবে! 
শায়লা জানতে চাইল,কেমন লাগলো অপেক্ষা করতে?
হু, খুবই অস্বস্তিকর লাগছিল তবে তুমি আসার পর ভালোলাগাটায় তা ছাপিয়ে গেছে।
তাই, আর আমি যে এমন কত অপেক্ষায় থেকেছি!
হু,আজ সব অপেক্ষার অবসান হবে শায়লা।
আমি তোমাকে সেই ভরসাটাই দেবো যেখানে শুধু পাওয়ার আনন্দটাই থাকবে।শিহাব শায়লার অজান্তেই হাত বাড়িয়ে শায়লার হাত ধরলো।শায়লা চমকে উঠলো!
শিহাব শক্ত করে শায়লার হাত ধরে বললো বাইকে উঠে বসো। শিহাব শায়লার হাত ধরেই বাইকে বসিয়ে শাড়ি গুছিয়ে দিলো।চালকের আসনে নিজে বসে নিলো।পিছনে শায়লার দিকে তাকালো বুঝাতে,আমাকে শক্ত করে ধরে রেখো কিন্তু।সে আর বলতে! অনেক অঘটন ঘটার পর আজ শায়লা, শিহাবকে হারানোর ভয় কাটিয়ে উঠেছে।আর সে ছাড়ছে না। শিহাব হেলমেট পরে লুকিং মিররটা সেট করে বাইকে স্টার্ট দিলো।বাইক চলতে শুরুর মূহুর্তে শায়লা শিহাবের পিঠে আছড়ে পড়লো।শিহরিত ভাললাগায় আবেশিত হলো দুজন।
বাইক ছুটছে তিন'শ ফিটের সেই খোলা যায়গায় যেখানে শিহাবের মন খারাপ থাকলে কখনো একা, কখনোবা বন্ধুদের নিয়ে প্রায়ই চলে আসে।তবে আজকের আসাটা ভিন্ন।আজ সাথে শায়লা আছে। উৎকন্ঠিত শায়লার ভরসাস্থল হয়ে আজ সে শায়লাকে তার ভালোবাসার কথা শোনাবে।


চলবে...

২৯ ডিসেম্বর ২০২১

রুকসানা রহমান





গেঁথেছো সকল মগ্নতা


ভেঁজা রোদের ছায়া ধরে ফিরে যাওয়া ক্লান্ত দুপুরের
রাত্তি কি জানে, মমতা স্পর্শ পাগল খেলার ছায়ার
হৃদয়ে তুমি-আমি মেপে -মেপে পথ চলার ছন্দে
চোখস্মৃতি ভালোবাসার আনাগোনা।

তবে কি আজও সময়ের হাতে হয়তো রাখা হয়নি হাত
শরীরের ভাঁজে আটকে থাকা নীল খাম
জীবন মেপে দেয় অপেক্ষা...

অন্ধকারে শুনি ওষ্ঠের নিপুণ কথার উপচে পড়া ঢেউ
স্নানের বাথটবে বিষাদ নগ্নতায় বকুল ভাসে মোহরাত  জীবনের বুকে অনুভব রাতজাগা স্বপ্নের ঘর।

এভাবেই মাখামাখি হোক হাওয়ার স্পর্শে
নির্ভুল সংলাপে সত্যি - মিথ্যের মিলনের রথে
ফসলের মাঠ ইচ্ছার ব্রতের সাঁকো পেরিয়ে
উল্লাসে মাখামাখি লাঙ্গলের ফলায়
গেঁথেছো সকল মগ্নতা...

রাবেয়া পারভীন/৩য় পর্ব




দুরের বাঁশি 
রাবেয়া পারভীন
(৩য় পর্ব)


সৌন্দর্য  এবং ব্যাক্তিত্ব এই দুয়ের সংমিশ্রণ শুভকে  ভিষন আকর্ষনীয়  করে তুলেছিল  লাবন্যর কাছে । প্রতিটিক্ষন  মনের চোখ দিয়ে খুঁটিয়ে খু্টিয়ে  দেখত  আর মুগ্ধ  হতো। শুভ কথাবার্তায় বেশ সাবলীল। যা বলে খুবি সহজ ভঙ্গিতে। তাই খুব সহজেই  সে বলল কথাটা।  
- লাবন্য  আপনাকে  মিস করছি 
একটু পরেই আবার বলল
- আচ্ছা  আমরা একে অপরকে  তুমি করে বলতে পারিনা ?  
ভেতরে ভেতরে ভিষন  চমকালো  লাবন্য । শুভ কি  তাহলে লাবন্যর  দূর্বলতাটা  টের পেয়ে গেছে ?   নাকি নিজের ভালোলাগার কথা বলছে ?
তবুও   নিজেকে সামলে নিয়ে  লাবন্য  বলে
- কেন  আপনি তে কি সমস্যা ?
- সমস্যা  আছে তো  কেমন জানি দুর দুর মনে হয়। 
এটাই চাইছিল সে  কিন্তু বলতে পারছিলনা । হেসে বলল -ঠিক আছে  তাহলে তুমি হলে   তুমি । লাবন্যর বলার ভঙ্গিতে এবার শুভও হেসে ফেলে। বলে
- একদম। এই কথাটাই বলতে চাইছিলাম ।
তারপর  দুজনেই হাসে।  হঠাৎ  কোথা থেকে যেন একটা সুখের দমকা বাতাস এসে  মাতাল করে দেয় লাবন্যকে। আপন মনে বার বার বলে  
- আমার স্বপ্নের রাজকুমার। আমি তোমাকে পেয়েছি । তোমাকে ভেবে কতরাত  নির্ঘুম কেটেছে আমার। সেই তুমি আজ এলে। লাবন্যর। একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরে চুমু খায় শুভ। লাবন্যকে  বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলে
- এখন থেকে আর কোন রাত তোমাকে একা থাকতে দেবনা আমি। সারাক্ষন ছায়ার মত  তোমার পাশেই থাকবো আর তোমাকে ভালোবাসায় ভরিয়ে দেব।


চলবে...

খাদিজা





প্রেম আমার
 

মহাসাগরের গভীরতার মতো তোমার প্রেমে আমি ডুবতে থাকি-
নিজেকে হারিয়ে ফেলি, 
বসরাই গোলাপের সুগন্ধি আমায় টানে না, 
না গালিবের গজল-
আমি ডুবতে থাকি। 

তোমাকে হারাবার বেদনা যখন অসহনীয় বিষাদের গর্ত, 
যুদ্ধক্ষেত্রে কেটে যাওয়া হাতের মতো।
আকাশের নীলে আমি ভেসে যাই-
ভাসতে থাকি কোন অজানার পানে ;
পরিযায়ী পাখিদের মতো -
নিজেকে হারাই। 

উজল রবির প্রভায় আমি দগ্ধ হই না-
ফসল তোলার পরে খড়কুটো পুড়িয়ে দেবার মতো, 
হৃদয়ের গহীনে থাকা সূর্যটা আমায় পোড়ায় অনুক্ষণ-
আমি মরতে থাকি। 

অতঃপর এক মধুর লগনে তুমি আমার হলে-
সাগরের গভীর হতে তুলে নিলে,
আকাশের নিলীমা হতে খুঁজে নিলে, 
ঠাঁই দিলে প্রেমের দেউলে,
বুকে চেপে ধরে বেলোয়ারি রাগে ভাসালে, 
ওষ্ঠাধর ছুঁয়ে দিলে ভীরু কপোতীর গালে-
বাঁচালে আমায় !

শান্তা কামালী/৫২ পর্ব




বনফুল
(৫২ পর্ব ) 
শান্তা কামালী

মনিরুজ্জামান কিছু দাবিদাওয়া করেননি বলে অলিউর রহমান কিছু দিবেন না তা আবার হয় নাকি!  ওনার একমাত্র ছেলে বলে কথা.... 
অহনাদের বাসায় আসার সময় গাড়িতে আধমন মিষ্টি নিয়ে এসেছেন। অহনাদের বাসায় সামান্য চা নাস্তা খেয়ে বেরিয়ে ড্রাইভারকে বললেন  নিউমার্কেটে যাওয়ার জন্য। মনিরুজ্জামান যতই বলুক কোনো দাবিদাওয়া নেই। সৈকত যে ওনার একমাত্র ছেলে....। অলিউর রহমান বেশ ক'টা দোকান ঘুরে একটা স্বর্ণের সেট পছন্দ করলেন বার বড়ি সামথিং  কার্ড দিলেন... । 
পেমেন্ট বুঝে নিয়ে স্বর্ণ প্যাকেট করে দিলেন দোকানদার। 
অলিউর রহমান সোজা বাসায় চলে আসলেন। সরাসরি স্ত্রী রাহেলা খাতুনের ঘরে ঢুকে প্যাকেট খুলে জিনিস দেখাতেই রাহেলা খাতুন স্বামীর প্রতি খুব খুশি হলেন।কিন্তু দুজনের কেউই এই বিষয় টা কাউকে বললেন না। 
 সৈকত রাতে মাকে খাবার এবং ঔষধ খাইয়ে,বাবাকে নিয়ে  বসে রাতের খাওয়া শেষ করলো।
তারপর  নিজের রুমে এসে মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলো অহনা ওকে  তেরো বার ফোন করেছে। সৈকত ফোন ব্যাক করে বললো অহনা তুমি ফোন দিয়েছিলে, কিন্তু আমি..... 
অহনা বললো হুমম আমি বুঝতে পেরেছি, তুমি রুমে ছিলেনা....। 
সৈকত তুমি কি জান আঙ্কেল আজ আমাদের বাসায় এসে আগামী  বৃহস্পতিবার আমাদের বিয়ে ঠিক করে গেছেন?
অহনার মুখে সব শুনে সৈকত আশ্চর্য যায়।বাবা তাকে কিচ্ছু বললেন নি!
সৈকত বললো অহনা এখন ফোন রেখে ঘুমাবো  সকালে উঠে আম্মুকে খাওয়ার আগে পরের ঔষধ গুলো দিতে হয়। তাড়াতাড়ি না ঘুমালে সকালে উঠতে পারি না....
 অহনা আর কোনো কথা না বাড়িয়ে শুধু গুডনাইট বলে ফোন কেটে দিলো।



চলবে...

শামীমা আহমেদ /পর্ব৪৩




শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত (পর্ব৪৩)
শামীমা আহমেদ 



সকালে খুব নীরবেই ভাইবোনের নাস্তা পর্ব শেষ  হলো।তবে রাহাত বেশ বুঝতে পারছে শায়লা তাকে যেন কিছু  বলতে উসখুস করছে। টেবিলে মা আছে তাই শায়লার কথাটা বলা হচ্ছে না। বুঝতে পেরে রাহাত চায়ের মগ হাতে ড্রয়িং রুমে চলে এসে বেশ লাউডে টিভি অন করলো।আর শায়লাকে মোবাইলটা টেবিল থেকে দিয়ে যেতে অনুরোধ করলো।শায়লা নিজের চায়ের মগ ও রাহাতের মোবাইল নিয়ে ড্রয়িং রুমে চলে এলো। সোফায় পাশাপাশি ভাইবোন বসলো।
রাহাতই নীরবতা ভাঙল।
আপু কি কিছু বলতে চাচ্ছো?বলো,কী বলতে চাও?
না মানে 
কী? শিহাব ভাইয়ার কথা কিছু বলবে?
হ্যাঁ,শিহাব বলেছে তোমার আর মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে রাখতে কিন্তু মাকে কিভাবে বলি?
কোন ব্যাপারে আপু।আমাকে আগে বলো শুনি।
না মানে, শিহাব বলছিল ও ওর পারিবারিক ব্যাপারে আমার সাথে কিছু কথা বলতে চায়, তাই আজ বিকেলে আমাকে একটু  বাইরে কোথায় বেড়াতে নিয়ে যেতে চাচ্ছে।তা,আমি কি যাবো?
হ্যাঁ আপু, অবশ্যই যাবে।তোমাদের এখন বেশি বেশি কথা বলা দেখা করা উচিত।সব ব্যাপারে খোলামেলা কথা বলো।কোন কিছু আড়ালে না রেখে সামনের দিনগুলো কিভাবে সুন্দর হয় সেভাবে আলোচনা করো।
কিন্তু মাকে কিভাবে বলবো?
কোন অসুবিধা নেই আপু।আমারতো জানা থাকলো।আর তাছাড়া আজ বিকেলেতো মা থাকছে না।আমি আর মাতো নায়লার বাসায় যাচ্ছি। মা জানতে পারবে না। তুমি তাড়াতাড়ি ফিরে এসো।
আপু,শোন,
কি বলবে?
আজ আমার দেয়া নতুন শাড়িটা পরে যেও।
খুবই বাধ্য মেয়েটি হয়ে শায়লা মাথা ঝুকিয়ে বললো,ঠিক আছে।
রাহাত খুব সহজেই শায়লাকে শিহাবের সাথে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দিলো।শায়লা অবাক হলেও রাহাত নির্বিকার রইল। রাহাত ইতিমধ্যে শিহাব সম্পর্কে  সব ধরনের খোঁজ খবর নিয়েছে।আর তা জানতে চারিদিকে লোক পাঠিয়ে ছিল।শিহাবের বর্তমানের উত্তরার বাসা,উত্তরার অফিস, গাজীপুরের ফ্যাক্টরি, 
জিগাতলার বাসা,বাসায় কে কে থাকে, শিহাব এলাকার কোন বাড়ির মেয়েকে বিয়ে করেছিল, বিয়ে ও তার পরবর্তী জটিলতা,এখন কে কোথায় থাকে,শিহাবদের গ্রামের বাড়ি, শিহাবের চালচলন, বন্ধুবান্ধব কারা,কাদের সাথে চলাফেরা, যাবতীয় সবকিছুর খোঁজ রাহাত নিয়েছে। এটা বোধহয় ভাইদের বিরাট একটা দ্বায়িত্ব থাকে বোন বিয়ে দিতে গেলে।
নায়লার বাসায় নেবার সবকিছু শায়লা গুছিয়ে দিলো। মাকেও তৈরি করে দিলো। দুপুরের পরপরই রাহাত আর মা  সব প্রস্তুতি শেষ করলে রাহাত একটা উবার কল দিলো এবং খুব দ্রুতই তা চলে এলো।
মাকে নিয়ে রাহাত নায়লার বাসার উদ্দেশ্য রওনা দিলো।
শায়লা শিহাবের ফোনের অপেক্ষায় রইল।মোবাইল  হাতে নিয়ে খালি বাসায় এ ঘর ওঘর পায়চারী চলছিল। দুপুর তিনটায়  শিহাবের কল এলো। তক্ষুনি শায়লার মনের ভেতর কী এক ফল্গুধারা বয়ে গেলো! এক নিবিড় অনুভবে মোবাইলটিকে আলতো করে গালে ছুঁয়ে নিলো যেন শিহাবের কন্ঠস্বরের সাথে তার স্পর্শও অনুভব করলো!
শায়লা কি করছো?
এইতো মা আর রাহাত একটু আগে নায়লার বাসায় গেলো। আমি একা। 
উহু, তুমি একা নও। এইতো আমি আছি!
---কই দেখতে পাচ্ছি নাতো!
একটু চোখ বন্ধ করে আমাকে ভেবে নাও।
শায়লা চোখ বন্ধ করতেই সেই যে দুজনে শপিংএ যাওয়ায় শিহাব কালো শার্ট পরা চোখে সানগ্লাস সাঁটা ছিল সেদিনের সেই মুখটি ভেসে উঠলো! মূহুর্তেই শায়লা  অন্য এক ভুবনে হারিয়ে গেলো!
ওপ্রান্তে শিহাব বলেই চলেছে,
জানো শায়লা, আজ নিজেকে অনেক ফ্রেশ করে নিলাম।বাইক চালাতে চালাতে বহুদিন  নিজের দিকে আর খেয়াল দেয়া হয়নি ।একটা নতুন শার্ট কিনলাম।আমার আবার কেনাকাটার বাতিক আছে, বুঝেছো।পরে আবার বিরক্ত হইয়ো না যেনো।
শায়লা হেসে ফেললো!
আজ তোমার সাথে দেখা হবে তাই নিজেকে তোমার মত করে তৈরি করে নিলাম।
---আমি কি কখনো বলেছি তুমি আমার মত হয়ে এসো, তুমিতো সবসময়ই সুন্দর, তোমার পাশেই বরং আমি বেমানান। 
এবার শিহাব বেশ রাগতঃ,কন্ঠে বলে উঠলো, আর কোনদিন এ ধরনের কথা বলবে না।শায়লা তোমার সাথে পরিচয় না হলে জীবনটা আমার আর স্বপ্ন দেখতো না।তোমার সরলতা আমাকে নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছে।আমার অতীতের কষ্ট মুছে দিয়েছে। জীবনকে উপভোগ করার চেয়ে উপলব্ধিটাই যে বেশি আনন্দের তুমিই সেটা বুঝিয়েছো।
শায়লা নীরবতায় শিহাবকে অনুভব করছে।
শায়লা কিছু বলো!
সারাজীবন  অপ্রাপ্তির শায়লার জীবনে যে এতটা সুখ পাওনা হয়ে ছিল তা শায়লার  নিজেরও জানত না।কোন স্বপ্নের ওপার থেকে শিহাব উড়ে এসে এমন করে তার মনের খাঁচায় বন্দী হবে তা জানা ছিল না।
শায়লা শুধু বললো, শিহাব আমি হয়তো তোমাকেই এতদিন খুঁজেছি। তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম।
শিহাব ছোট্ট করে শুধু বললো,হু,আমি আছি, থাকবো তোমার হয়ে।ঠিক আছে আজ দেখা হচ্ছে।অনেক কথা হবে। তোমার আমার যত না বলা কথা আজ দুজন দুজনেরটা শুনবো।
এখন আমি শাওয়ার নিবো। সামান্য লাঞ্চ করবো। ঠিক সাড়ে চারটায় আমি উত্তরা পার্কের কাছে থাকবো।আর হ্যাঁ,আমি সেখানে পৌঁছে তোমাকে কল দিলে তুমি বাসা থেকে বেরুবে।আমি চাইনা ওখানে তুমি একা একা দাঁড়িয়ে থাকো।
শায়লা আচ্ছা বলতেই শিহাব বলে উঠলো,সবসময় তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করেছো আজ আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করবো।অপেক্ষা করার মাঝে প্রাপ্তির আনন্দটা লুকিয়ে থাকে।আমি আজ অনেকদিন পর সেই আনন্দটা পেতে চাই শায়লা।
শায়লা ওপ্রান্তে সাড়াহীন। শুধু চোখভেজা কান্নার একটা চাপা শব্দে মোবাইল যন্ত্রটি ভারী হয়ে উঠলো।


চলবে...



উপন্যাস 

টানাপোড়েন ৮০

হৃদয়াকাশ

মমতা রায় চৌধুরী


রেখার চোখে শুধু জল আর জল। এ কোন নজর লাগল তার সন্তানদের প্রতি। অবজ্ঞা, অবহেলা উপেক্ষা ছাড়া আর কিছুই জোটে না ওদের ।তাই রেখা ও মনোজ 'ওদেরকে একটা আলাদা জীবন দিতে তার পরিবারের সাথে লড়াই করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। একটা উটকো ঝামেলা হয়ে গেল কোথা থেকে একটা কুকুর এসে  কামড়ে দিয়ে গেল।
একটু আগে মন্টু ডাক্তার এসেছিল ভ্যাকসিন দিয়ে গেলো ।তবে হ্যাঁ ডাক্তারবাবু খুব ভালো। কি জানি কেন উনি ভ্যাকসিনের কোন টাকাই নিলেন না।
মনোজ যখন বলল 'ডাক্তার বাবু আপনাকে কত দিতে হবে?'
মন্টু ডাক্তার বললেন ' কিছু না।'
মনোজ অবাক হয়ে বলল 'সে কি ডাক্তারবাবু আপনার ভিজিট , ভ্যাকসিনের দাম নেবেন না?'
ডাক্তারবাবু বললেন 'না, না ।আপনারা যে রাস্তার কুকুরগুলোকে এত ভালবাসেন ,রোজ ওদেরকে খেতে দেন ।ওরা তো অনাদরে-অবহেলায় বড় হয়। কে এত ভালবাসে বলুন তো?
মনোজ বলল'ডাক্তারবাবু এদেরকে নিয়ে রোজ আমার পরিবারের ভেতরে অশান্তি, বাইরে রাস্তায় খেতে দিলে অশান্তি ।তবুও আমার স্ত্রী কিন্তু এগুলোকে একদমই গায়ে মাখে না।'
ডাক্তারবাবু বললেন 'ওদেরকে ভালবাসুন ।ওরা আপনাদের জন্য জীবন দিয়ে দেবে। মানুষ বেইমান। এরা নয়।'
মনোজ বলল'তবে আপনি যে কাজটা করলেন ডাক্তারবাবু এটা তো আপনার মহানুভবতার প্রকাশ।'
ডাক্তারবাবু বললেন 'দেখুন ,আমাদের পেশাটাই হচ্ছে সেবার কাজ। কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী আমাদের কেউ মূল্য নিতে হয়। কিন্তু আপনারা আমার চোখ খুলে দিয়েছেন।'
মনোজ বলল 'কিভাবে ডাক্তার বাবু?'
ডাক্তারবাবু বললেন 'এই যে আপনারা যদি ওদের জন্য এত কিছু করতে পারেন? তাহলে আমি সামান্য একটু ওদের জন্য সেবা করতে পারি না?'
মনোজ বলল' সবাই যদি এরকম হত পৃথিবীটা কত সুন্দর হতো।'
ডাক্তারবাবু বললেন' পৃথিবীতে তো সবাই একরকম হবে না ,এরকম দু-চারজন মানুষই তো থাকবেন তাই না?'
মনোজ বলল' হ্যাঁ ,তা অবশ্য ঠিকই বলেছেন আপনি।'
ডাক্তারবাবু বললেন 'আসুন না আমরা যে কজন ই পারি আমরা ওদের জন্য কিছু করি।'
মনোজ বলল 'একদম ডাক্তারবাবু।'
রেখা অবাক হয়ে বলল' ডাক্তারবাবু এরকম বললেন।'
অথচ এই ডাক্তারবাবুর নামে কতজন কত বাজে কথা বলেছেন। ডাক্তারবাবু হচ্ছেন চামার ,চশমখোর । ছিঃ ছিঃ। ভাবতেই কেমন কষ্ট হচ্ছে।
মনোজ বলল 'মানুষকে না সবসময় বাইরে থেকে দেখে বিচার করা যায় না। দেখ না যাকে চশমখোর ,চামার ইত্যাদি বলে অভিহিত করেছেন লোকে ।আজ তার ভেতরটা দেখো  এক মহানুভবতা ।
রেখা বললো' ঠিকই বলেছ।'
মনোজ বললো 'মিলি  এখন কি করছে? ঘুমাচ্ছে?
রেখা বলল 'হ্যাঁ দেখলাম যে ঠাণ্ডায় কাঁপছে। আমি আবার কিছু ওর গায়ে চাপা দিয়ে আসলাম।'
মনোজ  বললো 'দেখো জ্বর-টর যদি আসে তাহলে ওকে আবার একটু ওষুধ খাওয়াতে হবে।'
রেখা বলল "আমাদের মিলিটা দেখো কত বোঝে আমিও ওর কাছে গিয়ে বললাম 'মা তোমার শীত করছে? চোখটা মেলে তাকালো , যেই বললাম শুয়ে পড়ো ,মাথাটা একদম কাত করে দিয়ে শুয়ে পড়ল।'
মনোজ বলল 'জানো আজকে কি কান্ড করেছে?
রেখা বললো ' কি?'
মনোজ বলল  'বাচ্চারা মিলিটাকে যেই দেখতে পেয়েছে ,ওদের তো আটকে রাখা হয়েছে। লিলিটা একবার দেখি এমন চিৎকার শুরু করলো সঙ্গে পাইলট, তুলি ,ওরাও।'
রেখা বলল' লিলি যখন চেঁচায় না, একবার দেখবে  গ্রীলটা ধরে  চিৎকার করবে আবার একবার ভেতরে গিয়ে চিৎকার করবে।'
মনোজ বলল' এবার তুমি চিন্তা মুক্ত হয়েছ রেখা?'
রেখা বলল' হ্যাঁ । ভ্যাকসিন না হলে আমি চিন্তা মুক্ত করতে পারছিলাম না। থ্যাংকস গড।'
মনোজ বলল 'এবার কি এক কাপ ব্ল্যাক কফি পাব ম্যাডাম?
রেখা হেসে বলল 'একশোবার পাবে।'
রেখা রান্নাঘরের দিকে গেল কফি বানাতে এমন সময় ফোন আসলো। রিং হল'আমি তো সুখেই আছি..।'
রেখা রান্নাঘর থেকে কফিটা কাপে ঢালতে ঢালতে বললো 'কি ব্যাপার আজকাল তুমিও রিংটোন চেঞ্জ করছো?'
মনোজ বলল 'বাহ, তুমি করতে পারো ,আমি করতে পারি না?'
রেখা বলল 'অফকোর্স পারো।'
রেখে  হাসতে হাসতে বলল' তো ফোনটা ধরো?'
এর মধ্যে ফোন কেটে গেল।
রেখা রান্নাঘর থেকে দুকাপ কফি নিয়ে এসে ডাইনিং এ টেবিলের ওপরে রাখল মনোজ পাশে সোফাতে বসেছিল। বলল 'এসো এখানে খাবে ?না তোমার কাছে গিয়ে দেবো?'
মনোজ বলল' এখানে এসো।'
রেখা বলল' ইস সসস'।
মনোজ বলল 'একি সোনার আলোয় জীবন ভরিয়ে দিলে বন্ধু। কাছে থেকো, কাছে থেকো।'
রেখা বলল' কি ব্যাপার এত রোমান্টিক?'
সত্যিই মনোজের হৃদয়াকাশ আজ প্রেমেতে ভরপুর।
মনোজ বলল 'সেই কবে থেকে আমি হেঁটে চলেছি পৃথিবীতে। অপেক্ষায় অধীর দু'চোখ কেউ রবে এ পথে ।ভাবি নি কখনো আমি ।তুমি আমার সেই তুমি। 'তোমায় দেখে চোখের পাতায় বড় সুখে সে চোখে জল ভেসে যায়। জলে ভালোবাসি আমি তোমাকে।'
রেখা বলল' ভালো গান গাইছো?
মনোজ বলল 'কেন গানটা ভালো না?'
রেখা বলল 'অফকোর্স ভালো।'
রোমান্টিকতায় যেন রসভঙ্গ হলো।
এরমধ্যে আবার ফোন বেজে উঠলো আমি তো সুখেই আছি।'
রেখা বললে 'এবার ফোনটা ধরো।'
মনোজ ফোনটা রিসিভ করে বলল ' হ্যালো।'
কিরে কি করছিস?
মনোজ বলল 'এই তো ভাই চলে যাচ্ছে।'
সুরঞ্জন বলল ' শরীর ঠিক আছে?'
মনোজ  বলল' হ্যাঁ ,আগের থেকে অনেক বেটার।'
সুরঞ্জন বলল'হ্যাঁ রে, রেখা লিখছে তো নিয়মিত? অসাধারণ লেখে।'
মনোজ বললো' ও  যা চাপের ভেতরে আছে, কি করছে, কে জানে?'
সুরঞ্জন বলল'-শিখা তো ওর  বহুৎ বড় ফ্যান।'
মনোজ বলল' রেখাকে জানিয়ে দেবো।'
ওদিক থেকে মাধু বলল বৃষ্টিকে নিয়ে আসতে হবে ওর ছুটি হয়ে গেছে।
সুরঞ্জন মনোজ এর সাথে ফোন করে কথা বলতে বলতেই বলল হ্যাঁ এই তো যাচ্ছি। আচ্ছা, রাখি রে মনোজ। ভালো থাকিস।'
মনোজ বলল' তুইও ভালো থাকিস আর ফোন করিস মাঝে মাঝে।
 সুরঞ্জন বলল ' ঠিক আছে। তুই ও মাঝে মাঝে ফোন করিস।'
এরমধ্যে রেখার ফোন বেজে উঠলো। মনোজ নিজের ফোন কলটা কেটে ,দেখছে রেখার ফোন বেজে যাচ্ছে ।রেখা ধারেপাশে কোথাও নেই। রিংটোনে গান বাজছে
'তুমি কি এমনি করে থাকবে দূরে ,আমার এ মন মানে না..।'
মনোজ বলল' রেখা ,রেখা ,তোমার ফোন বেজে যাচ্ছে।'
রেখা ছাদের থেকে শুনতে পেয়ে বলল ফোনটা ধরো আমি কম্বলটা রোদে দিতে এসেছি ।ঘরে তো একটু ও রোদ ঢোকে না।'
মনোজ ফোনটা ধরতে গিয়ে ফোনটা কেটে গেল।
আমাদের এখান থেকে নেমে এসে বলল কে ফোন করেছিল?
মনোজ বলল' খেয়াল করি নি।'
রেখা বলল' মিস কল টা দেখো না?'
মনোজ বলল' হ্যাঁ ,দেখছি।'
রেখা বলল 'পেলে ?কে করেছে?'
মনোজ বলল' তোমার কাকিমার ফোন?'
রেখা চিন্তিত ভাবে বলল' কাকিমার?'
মনোজ বললো 'ফোনটা ধরাব?'
রেখা বলল-'হ্যাঁ, ধরাও তো?'
মনোজ নম্বরটা ডায়াল করল।'রিং হয়ে গেল ' কি দিয়ে পূজিব ভগবান তোমায়...।'
মনোজ বলল 'এই নাও ফোন ধরো, রিং হচ্ছে।'
রেখা রিসিভ করে বলল 'হ্যালো'।
কাকিমা বললেন' ভালো আছিস সবাই।'
রেখা বলল'এই আছি।'
রেখার কাকিমা বললেন'ননী, একটা খারাপ খবর আছে রে?'
রেখা বলল'কি খবর?'
কাকিমা বললেন'বিপাসার জামাইবাবু মারা গেলেন।'
রেখা অবাক হয়ে ব্যাঘ্রভাবে বলল 'কিভাবে ?কবে?'
কাকিমা বললেন ' গতকাল। স্ট্রোক।'
রেখা বললো 'কি অবস্থা ভাবো ?এদিকে বিপাশার বর জেলে আছে। ভাবা যাচ্ছে না।'
কাকিমা বললেন' সত্যিই ওদের দুই বোনের কপালটা এতটাই খারাপ যে ,কি হবে? কে জানে?'
রেখা বলল' তোমরা সবাই ভালো আছে তো?'
কাকিমা বললেন 'ওই আছি ।'
রেখা বললো'মানি অর্ডার টা পেয়েছ?'
কাকিমা বললেন 'হ্যাঁ পেয়েছি।'
রেখা বলল'কাকুর ট্রিটমেন্ট করে করাও।'
কাকিমা বললেন 'তুই আমার পেটের মেয়ে নয় তবুও যা..।'
রেখা বলল' ও, তাহলে তুমি আমাকে মেয়ে বলে ভাবো না তাই তো।
কাকিমা বললেন ' না মা এসব বলতে নেই আর ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন।'
ওদিকে মনোজ বলতে লাগলো মিলি একটু খেতে দাও।
রেখা বলল ' হ্যাঁ দিচ্ছি ।'
কাকিমা বললেন   আমি ফোনটা রাখছি পরে কথা হবে ননী। ভালো থাকিস।'
ফোনটা কাটার পর কাকিমা ভাবতে লাগলেন হৃদয়ের টান। রেখা তার নিজের মেয়ে নয় তবুও আজ তার হৃদয়ের অনেকটা জায়গা জুড়ে। তার নিজের মেয়েকে নিয়ে সবসময় টানাপোড়েন।
এদিকে রেখা ভাবতে লাগলো মিলি র যদি কিছু হয়ে যেত, তাহলে রেখার হৃদয়াকাশ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যেত।