৩০ নভেম্বর ২০২১

মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন" ৫৬

কান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক।  তার নিত্যদিনের  আসা  যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কথা  নিয়ে  কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন  চলবে...





টানাপোড়েন (৫৬)
মানবিকতা

মীনাক্ষী কাকিমার রণরঙ্গিনী মূর্তি দেখে রেখা আশ্চর্য হয়ে গেছে। কাকিমার ভেতরে রেখা শুধুই অপার স্নেহ ভালোবাসা আর ক্ষমার এক মহা সমুদ্র দেখতে পেয়েছে ,সেখানে যে প্রতিবাদী, মারমুখী মূর্তি লুকিয়ে থাকতে পারে ?আজকের লালদার  হাত থেকে বুলু জেঠিমাকে বাঁচানোর এরকম সহৃদয়তার, মানবিকতা র প্রকাশ ।সত্যিই প্রশংসনীয়।
কি আশ্চর্যের ব্যাপার কাকিমা বুলু জেঠিমাকে যা বলছে তাই শুনছে। একটু খাবার নিয়ে কাকিমা বলু জেঠিমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে কাছে গিয়ে বললেন''আমার লক্ষী দিদি 'এই খাবারটুকু একটু খেয়ে নাও।'বুলু জেঠিমা কি করুন দৃষ্টিতে কাকিমার দিকে তাকালেন ।তারপর মাথা নেড়ে না করতে লাগলেন।কাকিমা বললেন' কেন তোমার খিদে পায় নি?'বুলু জেঠিমা মাথা নিচু করে থাকলেন।
কাকিমা আবার বললেন  'তোমার খিদে পেয়েছে একটু খাও।'বুলু জেঠিমার ভাব ভঙ্গিতে মনে হল খিদে পেয়েছে ।কিন্তু সাহস পাচ্ছেন না খেতে।একবার এদিক একবার ওদিক তাকাচ্ছেন।
রেখা ভাবল 'তবে কি বলু জেঠিমাকে এভাবে না খাইয়ে রাখা হয় এবং তাকে পাগল করে দেবার একটা প্রচেষ্টা চলছে।'
কাকিমাও নাছোড়বান্দা কাকিমা বললেন ' তুমি খাও কেউ কিচ্ছু বলবে না। আমরা আছি।'
ওদিকে লালদা আর লালদার বউ দু'জনার মুখটা দেখলে মনে হচ্ছে তারা খুবই বিরক্ত। তারা মোটেই সন্তুষ্টি লাভ করছে না।ওদেরকে কাকিমা থোরাই তোয়াক্কা করছে।কাকিমা নিজে হাতে করে বুলু জেঠিমাকে খাওয়াতে লাগলেন।খাওয়ার শেষে বুলু জেঠিমা কাকিমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল।প্রতিবেশীরা গেটের বাইরে থেকে বলছে  'দেখলেন দিদি ,বা কেউ বলছেন দেখলেন বৌদি ।মানুষটা কতটা শান্ত। কিভাবে খাওয়ার পর ঘুমিয়ে পড়তে চাইছে। ,'এখন তো মনে হচ্ছে এসব কিছু এরা নিজেরাই বানিয়েছে। এজন্যেই এরা কাউকে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দেয় না। বাড়ির সমস্ত কিছু জানা হয়ে যাবে বলে।
কাকিমা বললেন  'এই বাড়ির সাথে আমাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আর আজকের প্রজন্মের এরা কি জানে? আমরা প্রত্যেকে এক হয়ে এর প্রতিবাদে সামিল হব। দেখি কি করে ছেলে আর ছেলের বউ?'
প্রতিবেশীদের মধ্যে মধু কাকা আর মালতি জেঠিমা বললেন  'একদম ঠিক এর একটা হেস্তনেস্ত হওয়া দরকার।
'কাকিমা বললেন' আপনারা সবাই আমার সঙ্গে আছেন তো?'সকল প্রতিবেশী হাত তুলে বললেন 'আমরা আছি ।আমরা এই গ্রামে এরকম অন্যায় কাজ হতে দেব না।'
কাকিমা বললেন 'আপনাদের কাছ থেকে আমার এটুকুই চাওয়ার ছিল।'এরপর কাকিমা বললেন  লাল দাদাকে উদ্দেশ্য করে 'লাল কোন ডাক্তারকে দিয়ে দিদির চিকিৎসা করাচ্ছো?'
লালদা যেন শুনেও না শোনার ভান করছে।
কাকিমা আবার চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলেন ' লাল ,লাল ।আমি তোমার সঙ্গে কথা বলছি। তার উত্তর দাও।কোন ডাক্তারকে দেখাচ্ছ?'
লাল বললো 'ডাক্তার ঘোষ কে'।
কাকিমা বললেন 'ডাক্তার ঘোষ?কেন তোমরা তো বললে যে দিদির মাথায় সমস্যা হয়েছে ।তাহলে ডাক্তার ঘোষকে দেখাচ্ছ কেন?উনি কি কি ওষুধ দিয়েছেন সে সবগুলো আমাদের কাছে ফেলো।'
লাল বলল 'ইদানিং ওষুধ বন্ধ আছে কাকিমা?'
কাকিমা বললেন ' তাহলে আগের ওষুধগুলো কি খাইয়েছো ?তার তো প্রেসক্রিপশনে আছে নিশ্চয়ই ?সেগুলো কোথায়?'
লাল এর বউ বলল  'কাকিমা ওষুধের প্রেসক্রিপশন মা ছিঁড়ে ফেলেছে।'
কাকিমা সব বুঝতে পারলেন এর ভেতরে একটা যোগ সাজস আছে।কাকিমা বললেন ' ঠিক আছে ।তুমি এবার দিদিকে যে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে আমাকে সঙ্গে নেবে'।
লাল চুপ করে রইলো।
কাকিমা আবার বললেন 'শুনতে পাচ্ছ তো? এবার বলো দিদির কোন ঘরটা শোয়?'
লালের বৌ পরী বলল 'শেষের ঘরটায়।'
কাকিমা অবাক হয়ে বললেন ' সে কি কথা !বুলুদির ঘর তো ওটা নয়?'পরী বলল 'এখন মাকে ওখানেই রাখা হয়।'
কাকিমা  বললেন  'কেন ডাক্তার ওখানে রাখতে বলেছেন?'পরী চুপ করে থেকে আমতা আমতা করে বলল ' না মানে ,মায়ের এরকম অবস্থা...।
কাকিমা বললেন  'বৌমা তোমরা তো এবাড়িতে   ক'দিন হলো এসেছো ?আমাদের সাথে এই পরিবারের একটা নাড়ীর সম্পর্ক।'এতক্ষণ পর লাল বললো  'আমরা জানি কাকিমা।'
কাকিমা বললেন ' সবই যখন জান, তাহলে এভাবে আর বলূদির সঙ্গে ব্যাবহারটা করো না। আমাদের খুব খারাপ লাগে।'পরী বলল  'কাকিমা সব সময় আপনি আমাদের দোষারোপ করে যাচ্ছেন ।আমরা কি করেছি?'কাকিমা পরীর দিকে এমনভাবে তাকালেন তাতে মনে হলো যে তিনি চোখেতেই মারণ বানটা মারলেন।কাকিমা বললেন ''কথাগুলো ঠিক করে ব'লো বৌমা।'
রেখা কাকিমাকে যত দেখছে, তত অবাক হয়ে যাচ্ছে সহজ-সরল ,সাদাসিধে,আমার কাকিমারএইরূপ।'রেখা মনে মনে বলল 'কাকিমা ইউ আর গ্রেট।'পরী বলল'আসলে কাকিমা, মায়ের ওই দিকটায় সুবিধে ওই জন্যই?'.
কাকিমা বললেন' আর বুলুদির ঘরটায় বুঝি তোমরা আছো?'পরী, লাল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।
কাকিমা বললেন 'আচ্ছা ,একটা কথা বল তো নীলকে তোমরা জানিয়েছ সব ।'
লাল বললো 'দাদাকে জানাবো সেরকম তো ঠিকানা আমাদের কাছে নেই ।'
কাকিমা বললেন 'সে  কী ?কোনো ঠিকানা তোমাদের দেয় নি?'আবারও লাল মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।ষকাকিমা বললেন ঠিক আছে লাল এবার একটা কাজ করো তো তোমরা। আমার মনে হয় বুলুদিকে তার ঘর টাতে রাখাই ভালো ।যদি সত্যিই তার মাথার কোন সমস্যা হয়ে থাকে, নিজের ঘরটাতে অন্তত শান্তিতে কিছুদিন বাস করুক কেমন?'লাল ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো।।কাকিমা বললেন তা বেশ । মধুরা তাহলে আমরা আজকে ওখানেই শুয়ে দি কেমন?পরী বলল  'আজকে শোয়াবেন কাকিমা? সব বিছানাপত্র মায়ের ওখানে আছে।(হাত দিয়ে দেখালো)
কাকিমা বললেন 'তো কি হয়েছে ।তোমাদের ঘরে বুঝি বিছানাপত্র নেই?পরী বললো না মানে..।
কাকিমা বললেন ' ও বুঝতে পেরেছি ,।ওই বিছানায় বুলুদিকে শোয়ানো যাবে না তাই তো?'পরী তখনও চুপ করে দাঁড়িয়ে ‌রইলো।কাকিমা বললেন  'চিন্তা নেই ।তোমাদের বিছানাটা নামিয়ে নাও ।আমরা বাকি কয়েকজন লোককে দিয়ে বুলুদির বিছানা'টাই  নিয়ে নিচ্ছি। তাহলে তো কোনো অসুবিধা নেই?পরী দেখল বেকায়দায় পড়ে গেছে তখন বলল ঠিক আছে কাকিমা যেটা ভালো বোঝেন।কাকিমা বললেন  'এই তো বাবা এই যে কথাগুলো বললে খুব ভালো লাগলো ।এভাবেই কথা বলবে বড়দের সাথে কেমন?''
রেখা ভাবল  'কাকিমা কি করছে ?একের পর এক রান করে যাচ্ছে অফ কাকিমা তুমিতো সেঞ্চুরি করে ফেলবে।এবার কাকিমা বাইরের মধু , পরান কাকা আর আমাদের ভোলা কাকাকে ডাকলেন।
মধু ,পরান ,ভোলা তোমরা . একটু এদিকে এসো তো বুলুদির স্টোর রুম থেকে যা বিছানাপত্র আছে একটু একটু এনে দাওনা?মধু পরান এবং ভোলা সঙ্গে সঙ্গে বলল " হ্যাঁ ,এই বৌদি যাচ্ছি আমরা নিয়ে আসছি।
মধু কাকা পরান কাকা আর ভোলা কাকা সবাই মিলে সেই বিছানাপত্র নিয়ে আসলো বুলু জেঠিমার ঘরে।
কাকিমা বললেন এই বিছানায় কি নোংরা হয়ে আছে বিছানায় শোয়া যাবেনা ভোলা এগুলো রোদ খাওয়াতে হবে। রাখো রাখো ওখানেই রাখো।"
কাকিমা এবার লাল পরীর দিকে তাকিয়ে বললেন "আর কোনো বিছানা নেই।"লাল পরীর দিকে তাকিয়ে ইশারায় কি যেন বলল।পরী বলল  'হ্যাঁ আছে আসলে ওই বিছানা তো লোকজন আসলে লাগবে?
কাকিমা বললেন হ্যাঁগো বৌমা কথা বলতে ঠোঁটে একটুও বাধে না বলো তোমার জীবন সবসময় সরস্বতী মা ভর করে আছেন তাইনা?
পরী বলল কেন কাকিমা আমি কি এমন বলেছি?
সেইতো কি আর এমন বলেছ কবে কবে লোক আসবে তার জন্য বিছানাপত্র তুমি যত্ন করে রেখেছো আর বাড়ির যে মানুষটি গৃহলক্ষী তার বিছানা নেই সেদিকে তোমার ধ্যান নেই।
পরী বলল না মানে ওই বিছানায় চালককে শুতে দেয়া যাবে?কাকিমা বললেন কেন গো এমন কি হয়েছে যে বুলু দিকে ছোঁয়া পর্যন্ত যাবে না তার বিছানাপত্র স্পর্শ করা যাবে না কি হয়েছে গো?পরী চুপ করে রইলো।কি মাল আলীর দিকে তাকিয়ে বলল লাল কোন ঘরে বিছানা আছে বল এদের দিয়ে আনিয়ে নিই।
লাল অপরের ঘরটাকে ইঙ্গিত করল।
পরী লাল এর দিকে কটমট করে তাকিয়ে তাকালো আর বললো কাকি মা ওই ঘরটা আমার বাবার বাড়ির লোকজন আসলে ওই বিছানাপত্র লাগে ওই বিছানাপত্র তো আমি দিতে পারবো না।
কাকিমা বললেন  'তা বেশ আর আর কোন ঘরে বিছানা আছে বলো এ বাড়িতে  তো রুম অনেকগুলো।
পড়ি তখন ও চুপ।লাল বলল কাকিমা তাহলে পাশের ঘরটা থেকে বিছানায় গুলো নিতে পারো।
কাকিমা বললেন ঠিক আছে ভোলা মধু পরান তোমরা যাও বিছানাটা একটু নিয়ে সরে বিছানাটা বাইরে একটা সাইট করে রাখো কালকে ভোলা এসে রোদে দেবে। ভোলা ,মধু, পরান বলল 'চল ,চল ,চল । যাই গিয়ে নিয়ে আসি।'কাকিমা লাল আর পরীর দিকে তাকিয়ে বললেন 'দেখো বৌমা ।কালকে ভোলাকে পাঠাবো। ওকে যেন আবার কোন বাঁধা দিও না ।(জনতার দিকে তাকিয়ে)এই যে এরা সবাই কিন্তু সাক্ষী রইল কেমন ।
বাইরের সব লোকজন বলল হ্যাঁ হ্যাঁ আমরা সব শুনে নিলাম।
কাকা বলেন তা বেশ। এর মধ্যে মধু পরান ভোলা বিছানাপত্র নিয়ে আসলো। বলল
বৌদি কোথায় রাখবো।
মা বললেন রাখবে কি গো ভালো করে পেতে দাও।
মধু পরান ভোলা সকলেই বলে ঠিক আছে।
কাকিমা বললেন এবার মোদিকে নিয়ে গিয়ে শোয়াবো।ইতিমধ্যে বুলু জেঠিমার একটু ঘুম ঘুম এসেছে কি শান্ত স্নিগ্ধ লাগছে বুলু জেঠিমাকে কাকিমার কোলে যেন একটা আলাদা শান্তির আশ্রয় পেয়েছে ন।বুলু জেঠিমাকে ধরে শোয়ানো হলো বুলু জেঠিমা তখনো কাকিমার আঁচলটা ধরে। বুলু জেঠিমা কেমন অসহায় ভাবে একবার কাকিমার দিকে তাকালেন।কাকিমা বুলু জেঠিমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন কোন ভয় নেই দিদি আমরা সবাই তোমার পাশে আছি।অনেকদিন পর বুলু জেঠিমার ঘর দেখে কাকিমা চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো জেঠিমা এত সৌখিন ছিলেন তার ঘরে সমস্তকিছুই চেঞ্জ করে দেয়া হয়েছে।এর মধ্যেই ফোন বেজে উঠলো দুর্গে দুর্গে দুর্গতিনাশিনী মহিষাসুরমর্দিনী।
কাকিমা বললেন উনি তোর ফোন বাজছে মা ধর তো?
উনি বললেন হ্যাঁ এইতো ধরছি।রেখা ফোনটা বের করে রিসিভ করে বলল ' হ্যালো'।ওদিক থেকে কাকার স্বর ভেসে আসলো বললেন 'কি রে ননী?'
রেখা বলল হ্যাঁ কাকা কি হয়েছে?
কাকা বললেন না কিছু হয়নি সন্ধ্যে হয়ে গেলো তোরা কেউ এখনো ফিরলি না কতদূরে গেছিস?
রেখা এবার কাকিমার মুখের দিকে তাকাল আর ইশারায় বললো' কি বলবে?'কাকিমা ইশারায় বুঝিয়ে দিলো এক্ষুণি যাবে।রেখা বলল  'এই তো এক্ষুনি যাচ্ছি।'কাকা বলল  'ঠিক আছে।'কাকিমা লাল আর পরীর দিকে তাকিয়ে বললেন' দেখো কত শান্তভাবে শুয়ে আছে দিদি। তোমরা ওর দিকে একটু খেয়াল রেখো দেখবে এমনি সুস্থ হয়ে যাবে।এবার থেকে আমরা প্রতিদিন পালা করে কেউ না কেউ এসে দেখে যাবো ঠিক আছে ।তাতে তোমাদের কোন সমস্যা নেই তো?মধু কাকা বলে উঠলো সমস্যা থাকলে শুনবে কে?কাকিমা বললেন' তোমরা শুনে নিলে তো বৌমা ?তাহলে প্রত্যেকে একবার করে এবার খবর নিতে আসবে ঠিক আছে।কাকিমা বললেন চলো চলো এবার আমরা সবাই আসি।সবাই গেট দিয়ে বেরোনোর সময় কাকিমার নামে ধন্য ধন্য করতে লাগলেন।পরী  বলল নিজের ঘর সামলাতে পারেন না পরের ঘরে..।কথাটা তখনও জীবে আটকে আছে কাকিমা পেছনে ফিরে পরীর দিকে এমন ভাবে তাকালেন তাতে আর কথা বলার কোনো সাহস হলো না।এরপর ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে এগিয়ে চলল রেখা এবং অন্যান্যরা।কাকিমা রেখাকে বললেন 'হ্যাঁ রে ননী কিছু মনে করিস না ।আজকে তোকে ঘোরানো গেল না।রেখা বলুন না কাকিমা গ্রাম তো আমি ঘুরতে পারবো অন্য দিন যখন আবার আসব কিন্তু বুলু জেঠিমার যেটুকু পাওয়ার দরকার ছিল আজকের দিনে সেই টুকুর ব্যবস্থা করে দিয়ে তুমি যে কি ভালো কাজ করলে ,কাকিমা কি বলে বোঝাবো।'কাকিমা বললেন ' হ্যাঁ রে মনের ভিতরে খুব কষ্ট হয় জানিস তো কাছের মানুষদের এরকম কষ্ট পেতে দেখলে মেনে নিতে পারলাম না ।হয়তো কিছু আপত্তিকর কথা বলেছি না?
রেখা বললো  'না কোনো আপত্তিকর কথা বল নি 'একদম যথার্থ কাজ করেছো।'
রেখা কাকিমাকে জড়িয়ে ধরে বলল' কাকিমা আমি গর্ববোধ করছি যে তুমি আমার কাকিমা ।তোমার ভেতরে এইযে মনুষ্যত্ববোধ ,মানবিকতা এখনো জেগে আছে ।এইরকম একটা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও তুমি নিজেকে ধরে রেখেছো আজ তো আমরা জানি দাদা বা বোন তোমাদের সাথে কি ব্যবহারটা করেতারপরেও নিজেকে এভাবে ধরে রেখেছো অন্যের মুখাপেক্ষী করে না রেখে সব সময় নিজের প্রচেষ্টায় এখনো তোমাদের যে আত্মবিশ্বাস এর জন্য স্যালুট জানাই ।তবে কাকিমা একটা কথাই বলবো যদি কখনো কোনো কিছুর জন্য তোমাদের আমার প্রয়োজন হয় আমাকে অবশ্যই জানিও। আমি কিন্তু তোমাদের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেব।কাকিমা বললেন রেখাকে কাছে টেনে ' হ্যাঁ রে ননী ,আমি কি আর জানি না তোর মানসিকতা কেমন? তুই আমাকে বলে বোঝাবি মা?'কাকিমা আরো বললেন  'ননী, পারলে সারা জীবন অসহায় মানুষ ,শুধু অসহায় মানুষ নয়, জীবজন্তুর পাশেও এভাবেই পাশে থাকিস ।মনুষ্যত্বের অপমৃত্যু হতে দিস না রে মা ,ঈশ্বর তোর ভালো করুন।'

ccfb

LOVE

২৯ নভেম্বর ২০২১

কবি আমিনা তাবাসসুম এর কবিতা



  
কটা পাখির জন্য এই রাত 



একটা পাখির জন্য এই রাত

এই মাত্র হুইসেল বাজিয়ে যে বাসটি বেরিয়ে গেল
অন্ধ দাঁড়কাক, অর্ধমৃত কাচের সিঁদুর
আর নোংরা গলির খানাখন্দে পড়ে থাকা
পানের পিক তার তোয়াক্কা করে না

আসলে সব আলো কুরেকুরে 
অন্ধকার গিলতে থাকে
আর প্রতিটা অন্ধকারের গভীরে
সকাল বিকেল সন্ধ্যে
নিয়ম করে ফুঁসে ওঠে 
               চিরন্তন দোজখ।

উম্মে হাবীবা আফরোজা




রক্তিম সূর্যের দেশ


ধরেত্রির বুকে বিশ্ব মানচিত্রে আঁকা স্বাধীন এই দেশ,
আমার প্রিয় বাংলাদেশ।

উন্নত শির লক্ষ প্রাণের স্মৃতিসৌধের স্বাধীন এই দেশ,
আমার প্রিয় বাংলাদেশ।

বীর শহিদের আত্মত্যাগের শহিত মিনারের স্মৃতিস্তম্ভের এই দেশ,
আমার প্রিয় বাংলাদেশ।

অমুর একুশ,৭১-এর ফাগুন রাঙা ফুল শিমুলের, শাপলা ঝিলের সজ্জিত এই দেশ,
আমার প্রিয় বাংলাদেশ।

ইলশে মজা পান্তা ভাতের,
বর্ষবরণ হাল খাতার,
নবান্ন উৎসবের এই দেশ,
আমার প্রিয় বাংলাদেশ।

মুক্ত বাতাসে উড়ন্ত লাল সবুজ পতাকার এই দেশ,
আমার প্রিয় বাংলাদেশ।

ময়ুর পঙ্খী হাওয়ার পাল তোলার নৌকার নদীর দেশ,
আমার প্রিয় বাংলাদেশ।

দোয়েলের মুখে মিষ্টি সুরের গানের এই দেশ,
আমার প্রিয় বাংলাদেশ।

পূব আকাশে উদিত রক্তিম সূর্যের উজ্জ্বল রঙের এই দেশ,
আমার প্রিয় স্বাধীন বাংলাদেশ।

শামরুজ জবা




দীর্ঘশ্বাস
 

পড়ে আছে আকাশ একা
সীমানাহীন অন্ধকার,
নীরব-নিথর মাটির বুকে
শব্দবিহীন হাহাকার। 

ব্যথার ফাঁদে বন্দিনী চাঁদ
বুকের ভাঁজে দীর্ঘশ্বাস,
সবুজ ঘিরে ফুল- ফসলে
কুহেলিকার উপহাস। 

ঝরছে পাতা শাখা থেকে
কেউ রাখে সেই খবর,
কত হাসি চোখের পাতায়
কান্না জলে দেয় কবর। 

এই পৃথিবী চলছে শুধুই
স্বার্থবাদের ব্যঞ্জনায়,
মহাকালটা সাঁতার কাটে
রক্ত নদীর মোহনায়।

যাচ্ছে তবু কালের চাকায়
সময় ছুটে ঊর্ধ্বশ্বাস,
নিঃসঙ্গতায় বুকের ভেতর
আমার জমে দীর্ঘশ্বাস।

মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন" ৫৫

কান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক।  তার নিত্যদিনের  আসা  যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কথা  নিয়ে  কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন  চলবে...
 





টানাপোড়েন (৫৫)

সমানুভূতি


'আ.আ.আ. মেরে ফেলল'-পাশের বুলু জেঠিমাদের বাড়ি থেকে  চিৎকারটা আসছে। রেখা ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল। হন্তদন্ত হয়ে ছাদ থেকে নেমে এসে ডাকতে শুরু করলো,  'কাকিমা, কাকিমা ও কাকিমা?'
কাকিমা রান্নাঘর থেকে গলা বাড়িয়ে বলল  'কি হল রে ননী।'
রেখা বলল 'তুমি এখনো রান্নাঘরে?'
কাকিমা বললেন  'আর বলিস না সাড়ে তিনটে বাজে। এখনো তো লক্ষী আসলো না?'
রেখা বলল'তাই বলে তুমি এখন বাসন মাজতে বসবে?'
কাকিমা বললেন'না মেজে উপায় আছে? সকাল হোলেই তো বাসনের দরকার হবে।'
রেখা বলল ' তাহলে তুমি আমাকে বলতে পারতে?'
কাকিমা বললেন'না ননী ,তোরা শ্বশুর বাড়িতে কত কাজ করিস। বাপের বাড়িতে এসে একটু রেস্ট নিবি না।'
রেখা বলল  'যদি মেয়েরা বড় হয়ে মায়েদের কাজেই না লাগে ,তাহলে কি ভালো দেখায়?'
কাকিমা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে  চিবুক  ধরে আদর করে বললেন  'লক্ষী মেয়ে কত সুন্দর ভাবনা।  বুকের মধ্যে টেনে নিলেন।'
রেখা বলল ' কাকিমা ,আমি না তোমার মধ্যে আমার মায়ের গন্ধ পাচ্ছি।'
দু চোখ বেয়ে জল পড়তে লাগলো।
কাকিমা ওর চোখের জল মুছে দিতে দিতে বললেন ' ভাবনা কিসের মা ।আমরা তো এখনো বেঁচে আছি।'
রেখা বলল 'কাকিমা, যখন বাড়িতে একা থাকি তখন খুব মায়ের কথা মনে হয়। অনেক অনেক দেখতে ইচ্ছে করে মা কে। মায়ের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে।'
কাকিমা বললেন  'সে তো করবেই মা ।তোমার জন্মদাত্রী ।তার জন্য তো তোমার কষ্ট হবেই।'
কাকু ঘর থেকে বললেন  'তোমাদের রান্না খাওয়া দাওয়া হলো। এবার তো ননীকে  নিয়ে বেরোবে একটু।'
কাকিমা বললেন 'হ্যাঁ বেরোবো। আর বোলো না একটু দেরি হয়ে গেল। লক্ষ্মী কাজে আসে নি।'
কাকু উদগ্রীব হয়ে বললেন  ' লক্ষী কামাই বেশি করে না ।করলেও তোমাকে বলে যায়। আজকে তাহলে কি কিছু হল?'
কাকিমা বললেন  'কে জানে আমিও তো সেটাই ভাবছি।'
রেখা বলল  'কাকিমা তোমাকে যে কথাটা বলার জন্য ছুটে এসেছিলাম ।'
কাকিমা বললেন ' কি কথা রে?'
রেখা বলল 'বলছি  তুমি কোন চিৎকারের আওয়াজ শুনতে পেয়েছো ?'
কাকিমা বললেন'হইচইয়ের আওয়াজ একটা কানে আসলো বটে কিন্তু আমি অতটা আমল দিই  নি জানিস ননী ?তখন আমার রান্নাঘরেই ধ্যান ছিল।'
'রেখা বলল  'ওই আওয়াজটার কথাই বলছি ।আমি তো ছাদে ছিলাম ।স্পষ্ট আসছিল আওয়াজটা।'
কাকিমা বললেন  'তোর কি মনে হয় কোন দিক থেকে আসছিল আওয়াজটা।'
রেখা বলল  'বুলু জেঠিমাদের  বাড়ি থেকে।'
কাকিমা বললেন  'কি রকম আওয়াজ বল তো?'
রেখা বললো  'মনে হচ্ছিল যেন অসহায় ভাবে কোন আর্তনাদ।'
কাকিমা বললেন 'সে কিরে?'
রেখা বলল  'হ্যাঁ ,কাকিমা'।
কাকিমা বললেন  'ড্যাম সিওর গাধাটা ঠিক দিদিকে..?'
রেখা বলল  'কে গো কাকিমা? কার কথা বলছো?'
কাকিমা বললেন ' আজ যদি ওরা দিদিকে  কেউ কিছু করেছে ,আমার হাত থেকে ওরা পার পাবে না। এটা দিনকে দিন আর সহ্য করা যাচ্ছে না।'
রেখা বলল  'কেন কাকিমা ওরা  কি করে বুলু জেঠিমাকে?'
কাকিমা বললেন  'ভেবেছিলাম কথাটা তোকে বলব না ।কষ্ট পাবি।এখন দেখি বলতেই হচ্ছে।'
রেখা বললো  'কি কথা?'
কাকিমা বললেন ' সে অনেক কথা মা।বুলুদি, উনি মানসিক ভারসাম্য হারান নি। অনেক মেন্টাল টর্চার করা হয়েছে রে।'
রেখা বলল  "সেকি কথা কাকিমা?'
কাকিমা বললেন  'এই ছোট ছেলে আর ছোট ছেলের বউটা যে কি ধুরন্ধর ,কি বলবো তোকে?'
রেখা বলল  'তাই?'
কাকিমা বললেন  'হ্যাঁ ,রে মা ।আমার তো মনে হয় নীলাঞ্জন এর সঙ্গে ওরা এমন কিছু করেছে ,যার জন্য নীলাঞ্জন বাড়িতে আসে না।'
রেখা বললেন 'কেন এরকম করেছে?'
কাকিমা বলছেন ' সবই সম্পত্তি বুঝেছিস?'
দাদা মারা গেলেন এইসব চিন্তা করতে করতে।
এখন বুলুদিকে এরা পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে চাইছে।'
কাকিমা  বললেন 'আচ্ছা, চল মা ।তোকে  একটু ঘুরিয়ে নিয়ে আসি ,।জেঠিমাকে দেখবি বলছিলি?'
রেখা বললো  'চলো কাকিমা।'
কাকিমা কাকুকে উদ্দেশ্য করে বললেন ' কি গো একটু খেয়াল রেখো ।আমি দরজা লক করে দিয়ে যাচ্ছি ।তোমার কাছে একটা চাবি আছে না ,ওটা রেখো তোমার কাছে। একটু ননীকে নিয়ে ঘুরে আসি।'
কাকু  বললেন'  'সেই ভালো।'
কাকিমা বললেন ' চল রে ননী‌'।
গেট লক করে বেরোতে যাচ্ছেন ,ঠিক সেসময় ভোলা হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল 'ছোট বৌদি ছোট বৌদি?'
কাকিমা পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখেন' ভোলা।
কাকিমা বললেন  'কিরে ভোলা এত হাঁফাচ্ছিস কেন ?কি হয়েছে?'
ভোলা বলল 'বুলু বৌদিদের বাড়ি থেকে প্রচন্ড আওয়াজ আসছে ।কাউকে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না ।মনে হচ্ছে বুলু বৌদিকে  মারছে।'
রেখা তো একে বারে অবাক হয়ে গেল।
কাকিমা একটু রেগে গিয়ে বললেন  'চল তো দেখি ?ওদের কিছু না বলে বলে ,ওদের বড্ডো বাড় বেড়েছে।'
কাকিমা দ্রুতবেগে হাঁটতে লাগলেন সঙ্গে ভোলা এবং রেখা ও।
কাকিমা গেটের কাছে গিয়ে থমকে গেল ।গেট লক করা। বাধ্য হয়ে তখন কাকিমা লালের উদ্দেশ্যে চেঁচাতে  লাগলেন।
কাকিমা ঊর্ধ্বস্বরে চিৎকার করে ডাকতে লাগলেন 'লাল ,লাল গেট খোল।'
এতক্ষণ চিৎকার-চেঁচামেচিতে গেটের কাছে লোক জড়ো হয়ে গেছে।
ঘরের থেকে আওয়াজ আসলো  'কাকিমা, মা আজকে বড্ড বাড়াবাড়ি করছে ।তাই গেট খুলছি না।'
কাকিমা বললেন 'ঠিক আছে। দরজা খোলো আমরা ভিতরে ঢুকবো'।
অলরেডি গেটের সামনে প্রচুর লোকের ভিড় জমে গেছে।
পরী এসে গেট খুলে দিল। কাকিমা দ্রুতগতিতে ভেতরে ঢুকলেন।
কাকিমা ভেতরে ঢুকেই লালকে বললেন'কি হয়েছে এত চিৎকার করছে কেন বুলু দি।'
বুলু  জেঠিমা ভয়ে ভয়ে কাকিমার পেছনে এসে দাঁড়ান।
লাল (লালমোহন) বলল 'রোজ রোজই পাগলামি দেখতে আর ভাল লাগছে না।'
কাকিমা বললেন  'বুলুদি তো এরকম ছিল না। তোমরা  দিদিকে এরকম অবস্থায় এনেছো। এখন বলছ রোজ রোজ পাগলামি?'
লালের হাতে একটা লাঠি ছিল । কাকিমা লালের হাত থেকে লাঠিটা নিয়ে বললেন  'এবার তোমার পিঠে পড়বে লাঠি।'
বুলু জেঠিমা হাততালি দিয়ে বললেন 'বেশ হবে। বেশ হবে।'
রেখার চোখে যেন ঝিলিক খেলে গেল।
মীনাক্ষী কাকিমা বললেন'ভালো করে তোমার মায়ের টিটমেন্ট করাও আর একটা কথা শুনে রাখ ।এরপর যদি আবার কখনো এই দিদির গায়ে হাত তুলতে দেখি বা শুনি ।তাহলে কিন্তু আমরা আইনের দ্বারস্থ  হবো।"
প্রতিবেশিদের সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন ' কি আপনারা সবাই সাক্ষী দেবেন তো?'
সকলে উচ্চস্বরে বলে উঠলেন 'হ্যাঁ ,হ্যাঁ ,দেবো দেবো।'
মীনাক্ষী কাকিমা বললেন ' আগে গ্রামে শাসন ছিল ।মুরুব্বীরা ছিলেন গ্রামে বিচার হতো ।এখন সে সব উঠে যাচ্ছে বলে ,আজকের প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা সব ভুলে যাচ্ছে ।তাই যা খুশি তাই করে বেড়াচ্ছে। কিন্তু এটা কিছুতেই হতে দেয়া যায় না'।
মাঝখান থেকে লাল এর বউ পরী বলে উঠলো 'এটা তো আমাদের পারিবারিক ব্যাপার। আপনারা এর ভিতরে ঢুকছেন কেন?'
মীনাক্ষী কাকিমা বললেন 'ঢোকার দরকার হতো না ,পরিবারের মধ্যেই ব্যাপারটা সীমাবদ্ধ রাখলে। হঠাৎ হঠাৎ এত চিৎকার করছেন দিদি কি কারণে ?সেগুলো প্রতিবেশী হিসেবে আমাদেরও দেখা উচিত?
আর প্রতিবেশী হিসেবে সেই কাজটাই করার চেষ্টা করছি।'
অন্যান্য প্রতিবেশীরা বললেন  'একদম ঠিক। একদম ঠিক । না হলে সব অনাচার বেড়ে যাবে।'
মীনাক্ষী কাকিমা আরো বললেন ' শোনো লাল। তোমার দাদা নীলকে সব ব্যাপারে জানিয়েছ তো ,নাকি সে ধোঁয়াশার মধ্যেই আছে?'
লাল চুপ করে রইলো।
 কাকিমার এই মারমুখীমূর্তি একদিকে যেমন মরিয়া অন্যদিকে মারিয়া ও বটে -এই মহামারী রূপ রেখার  চোখে  প্রথম।
যেন কাকিমার মধ্যে সেই দুর্গতিনাশিনী দুর্গা মায়ের মূর্তি প্রত্যক্ষ করল।
কাকিমা তো ভালই কিন্তু কাকিমার ভেতরে প্রতিবেশীদের প্রতি সহানুভূতি ,সমানুভূতি -এটা দেখে রেখার গর্বে বুক ভরে উঠলো আর ভাবল সে এই পরিবারে মেয়ে। এঁদের জন্য শ্রদ্ধায় মাথা নত করতে ইচ্ছে করলো। রেখার মনে বারবার সেই গানটি অনুরণিত হতে লাগল' দুর্গে ,দুর্গে ,দুর্গতিনাশিনী ।মহিষাসুরমর্দিনী...?'

এপার ওপার ইছামতী







২৮ নভেম্বর  ২০২১ মহাবোধি সোসাইটি হলে  উদযাপিত হলো এপার ওপার ইছামতী পত্রিকা  শঙখ ঘোষ  সংখ্যার প্রকাশ অনুষ্ঠান।  প্রধান অতিথি ছিলেন কলকাতা  বিশ্ববিদ্যালয়ের  স্বনামধন্য  অধ্যাপক  ড. সনৎকুমার  নস্কর।  সভাপতিত্বে ছিলেন লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরির  প্রতিষ্ঠাতা  চালক শ্রী সন্দীপ দত্ত  মহাশয়। 




এবারের পত্রিকা  সংখ্যাটি ২০২১ বৈশাখ  ও শারদ যুগ্ম সংখ্যা। কবি শঙখ ঘোষ  সম্পর্কিত অজস্র  প্রবন্ধ এবং গল্প কবিতা আনমনে পর্যায়ের লেখায় সমৃদ্ধ। অনুষ্ঠান টিও অত্যন্ত মনোজ্ঞ ছিলো। মুখ্য সম্পাদক শ্রীমতী চৈতালী ব্রহ্মের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে  কবিতাপাঠ  আবৃত্তি গানে ভরে উঠেছিলো এই সন্ধ্যাটি। 






পত্রিকাটি এরপর পাওয়া যাবে ধ্যানবিন্দু কলেজ স্ট্রীটে। এছাড়া এই ফোন নম্বরে ফোন করলে কলকাতা ও কলকাতার বাইরে কুরিয়ার ও হবে। 

আইরিন মনীষা





নিঃসঙ্গতা 


আজ কতদিন হয়ে গেলো 
একাকীত্বের সাথে আমার নির্লিপ্ত বসবাস
যেখানে ধুসর বিবর্ণ আকাশের হাতছানি 
এভাবেই বেদনায় আশাহত অন্যায্য সহবাস। 

রঙ্ধনুর সাত রঙ আজ বড়ই ফিকে
যেখানে আর রাঙেনা আমার অধরা স্বপ্নের পালক,
একসাথে পথ চলার সেই আকাঙখিত আশার প্রতীক্ষায়
নিঃসঙ্গতার পথ চলায় আমিই আমার চালক। 

নগ্ন পায়ে শিশিরের সাথে স্পর্শ 
যেখানে ছিলে তোমার অবাধ বিচরণ, 
বিমুগ্ধ নয়নে আমার হাত দুটি ধরে হাঁটতে
শিহরণে যেথায় তোমাতেই চাইতাম বাঁচতে। 

বাদল দিনের রিমঝিম ছান্দিক বারিধারায় 
কি দারুণ এক সুখানুভুতি হাতছানি দিতো,
যেথায় আমার আরাধ্য হারানো দিনের গান
বাজতো গ্রামোফোনে যেথায় আমার মন কেড়ে নিতো।

বসন্তের মাতাল সমীরণে সেই উদ্দীপনা 
এখনো আমায় কাছে টানে একান্ত একাকীত্বে
ভুলা কি যায় তারে মধুময় স্মৃতি মাখা ক্ষণ
আমার নিঃসঙ্গতার সঙ্গী তব বিরহী বিস্মৃতির   সম্ভিতে।

bxcv

LOVE

লেখক শান্তা কামালী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "বনফুল"৩২

চোখ রাখুন স্বপ্নসিঁড়ি সাহিত্য পত্রিকার পাতায় লেখক শান্তা কামালী'র  নতুন ধারাবাহিক  উপন্যাস "বনফুল" 
 




বনফুল
৩২ পর্ব


জুঁই বাসায় ফিরে হাত মুখ ধুয়ে বাবা-মায়ের  সাথে ঘন্টা খানেক বসে কথাবার্তা বললো।
ওয়াজেদ সাহেব মেয়ের খুশি দেখে ভিতরে ভিতরে নিজেও খুব খুশি হলেন । ঘড়িতে দশটা বাজতেই জুঁই ময়নাকে ডেকে বললো খাবার পরিবেশন কর।ময়না ওভেনে সব খাবার গরম করে পরিবেশন করে বললো আপা, খালাম্মা খালুকে নিয়ে টেবিলে আসেন।বাবা-মার সঙ্গে খাওয়া শেষ করে গুডনাইট বলে জুঁই উপরে উঠে গেলো।
 নিজের কিছু কাজকর্ম সেরে পলাশকে ফোন করলো জুঁই। ওপাশ থেকে পলাশ বললো আই মিস ইউ..... জুঁই।
 সেম টু ইউ...বলে  জুঁই বললো আজ আর বেশি কথা বলবো না, ঘুমাবো....। 
আমি ফোন না দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লে তুমি চিন্তা করতে তাই ভাবলাম ফোন দিয়ে ঘুমাতে যাই। 
পলাশ বললো থ্যাংকস জুঁই, গুডনাইট।
জুঁই ও বললো গুডনাইট।

 ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে সৈকত। সব বন্ধু বান্ধবরা এসে ভীড়  করে মিষ্টি এবং অন্যান খাবার খেয়ে যে যার বাড়িতে চলে গেলো। বাড়িতে মেহমানরা থাকার কারনে সৈকত আর ফোন দিতে পারেনি অহনাকে। ভীড়  কমার সাথে সাথেই সৈকত নিজেন রুমে ঢুকে অহনাকে ফোন দিলো। স্যরি অহনা, অনেকটা সময় ব্যস্ত থাকায় তোমাকে ফোন দিতে পারিনি।এইমাত্র বন্ধু বান্ধবরা গেছে, তাই তোমাকে ফোন দিতে পারছি। 
অহনা বললো স্যরি বলার কিছু নেই।
সৈকত বললো দ্যাটস লাইকে এ গুডগার্ল।
 অহনা বললো সারাদিন তোমার উপর অনেক ধকল গেছে এখন ঘুমাও। কালকে কথা হবে , গুডনাইট। 
সৈকতেও গুডনাইট বলে ফোন কাটলো।
চলবে....

শামীমা আহমেদ





শায়লা-শিহাব কথন
অলিখিত শর্ত 
(পর্ব ২২)
শামীমা আহমেদ 

শায়লার সাথে পরিচয়ের পর থেকেই শিহাবের মনে কেমন যেন একটা পরিবর্তন হয়ে যায়।কোলাহল হৈ চৈ বন্ধু আড্ডা পার্টি কিছুতেই আর ভাললাগাটা আসেনা। নীরবতাই বেশি উপভোগ করে। কেমন যেন সঙ্গীহীন জীবনে একাকীত্বের কষ্টটা পেয়ে বসেছে।একটা না পাওয়া বোধের অনুভুতি সারাক্ষন  ভেতরে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। শিহাব বুঝতে পারছে না কেন এমন হচ্ছে।হঠাৎ করে শায়লা যেন তার হৃদয়ের শান্ত দীঘিতে কিসের আলোড়ন তুলে দিলো! ঘুমন্ত মনটাকে জাগিয়ে তুললো। সে তো ছিল একরকম।সব স্মৃতি ঢেকে রেখে স্বাভাবিক জীবনে চলছিল। কিন্তু আজকাল ইচ্ছে অনিচ্ছেগুলোও মনের অনুমতির কাছে ঘুরপাক খেতে থাকে।কতদিনের অভ্যস্ত জীবনযাপনে কেমন যেন পাল্টে যাওয়ার হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। দিনরাত্রি  অন্যরকম একটাভাবনায় ডুবে থাকা। যেখানে বারবার শায়লার মুখটাই ভেসে উঠে!
ঘুরে ফিরে শায়লার কথাগুলোই কানে বাজে। রিশতিনার সাথে হাতে গোনা কিছু দিনের জীবনযাপন। রিশতিনার সবটুকু বুঝে উঠার আগেই সে হারিয়ে যায়।তারপর বহুদিন আর কোন মেয়েই তার ভাবনায় আসেনি।জীবনের উপর এমন ঝড় বয়ে যাবে তা কখনো শিহাব ভাবেনি।মা, ভাবীর শত চেষ্টাও তার মনকে ভুলাতে পারেনি।কিন্তু শায়লার মত এমন  সহজ সরল অচেনা একটি মেয়ে কেমন করে এতটা ভাবনার গভীরে চলে এলো? সে প্রশ্ন শিহাব নিজেকে বারবার করেও তার কোন উত্তর পায় না।তবে কি কেউ কারো শুন্যতাটা পূরণ করতে পারে? তবে কি শায়লাকে রিশতিনার জায়গায় ভাববে শিহাব?শায়লা কি রিশতিনার ভিন্নরূপে এসেছে?
শিহাবের এলোমেলো ভাবনায় আজ মনটা অস্থিরতায়।আজ আর অফিসে যেতে মন চাইছে না আর তেমন কোন জরুরী কাজও রেখে আসেনি।যদিও প্রতিক্ষণই যোগাযোগে থাকতে হচ্ছে। শিহাব অফিস এসিস্ট্যান্টকে কল দিয়ে  জানিয়ে দিলো সে আজ অফিসে যাচ্ছে না। কোন জরুরী প্রয়োজন হলে যেন কল করে। তাছাড়া বাইকটারও একটি সারভিসিং দরকার।কমতো ডিউটি দিচ্ছে না।আজ দুপুরের পরে বেরিয়ে ওয়ার্কশপে দিয়ে আসবে।আর বিকেলটা  বন্ধুদের সাথে কাটিয়ে দিবে।মাঝে মাঝে রুটিনের বাইরে যেতে শিহাবের ভালোই লাগে।তবে এটা মনে হয় সবার জন্যই প্রয়োজন।
শিহাব চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। বারান্দার টবে বেশ ফুল ফুটেছে!  একেবারেই খেয়াল করা হয়নি।সেই সকালে বেরিয়ে গিয়ে রাতে ফেরা।সে খুব শখ করে টবের গাছগুলো লাগিয়েছে। শিহাব চারতলায় সিঙ্গেল ফ্ল্যাটে থাকে।উপরে বা পাশেও আর কোন ভাড়াটিয়া নেই।বেশ নিরিবিলি থাকা যায়।অবশ্য এগুলো দেখেই বাসাটা তার ভালো লেগে যায়।

মোবাইলটা ঘরে বিছানায় ছিল।হঠাৎ মোবাইলের রিং টোন কানে এলো। শিহাব ঘরে এসে মোবাইল হাতে তুলে নিলো। শায়লার কল। শায়লাকেই ভাবছিল এতক্ষন।তবে ভাবনার শায়লা একরকম আর বাস্তবে অন্যরকম।কারন ভাবনায় শায়লাকে শিহাব অনেকখানি ভেবে নিয়েছে,  বাস্তবের শায়লার তা অজানা। 
কেমন আছেন?
শায়লার প্রশ্নে শিহাব সঠিক করে বলতে পারছে না আসলে সে কেমন আছে।শায়লার ভাবনায় কতখানি ডুবে আছে।
এইতো ভালো আছি।
অফিসে কখন এলেন?
শিহাব দেখলো দুপুর একটা বাজছে।শায়লাকে জানালো, নাহ! আজ অফিসে যাইনি।
কেন শরীরটা খারাপ করেছে কি? শায়লার উদ্বিগ্নতায় জিজ্ঞাসা।
না না তেমন কিছু না।আজ তেমন একটা কাজ নেই।তাছাড়া মাঝে মাঝে একা থাকতে ভালোই লাগে।কিছু বলবেন?
না, সকাল থেকে কোন মেসেজ পাইনি, তাই ভাবলাম কেমন আছেন জেনে নেই।
শিহাবের জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে,এই জানতে চাওয়াটা কি এমনিতেই নাকি আমাকে ভাবনাটা মন থেকে চাওয়া।অবশ্য তা আর জানা হয়না।
শিহাব বলে উঠলো, আপনি আর আমি একদিন কোন একটা খোলা জায়গায় ঘুরতে যাবো।আপনার কোন আপত্তি নেইতো?
শায়লা প্রায়ই একটা স্বপ্ন দেখে।খুব দূরে খোলা একটা যায়গায় সে আর একটি ছেলে  হাঁটছে।স্বপ্নে শায়লার খুব চেষ্টা থাকতে সে মুখটি দেখবার।কিন্তু তা কখনোই স্পস্ট হয়না।তবে কি সেখানে শিহাবই থাকে?
কি হলো বললেন না? যাবেন একদিন ঐ খোলা যায়গাটায়।যেখানে আমি একা একা প্রায়ই যাই।
শায়লা আনমনা হয়ে যায়।কল্পনায় বহু দূর চলে যায়। সে আর শিহাব হাত ধরে একটা ছোট্ট নদীর তীরে দুজনে বসে আছে।নদীটার পানি তীর ছুইছুই করছে। মাঝে মাঝে শায়লা শিহাবের কাঁধে মাথা রাখছে। শিহাব তার চমৎকার কন্ঠে একটা গানের কলি গাইছে।কিন্তু ঘুম ভেঙে শায়লা আর কখনোই সেই গানটির কতজা মনে করতে পারে না।কাজের ফাঁকে কিংবা অবসরে খুব চেষ্টা থাকে গানটি স্মরণে আনবার।
শিহাবের ডাকে শায়লার সম্বিৎ ফিরে এলো।আর কিছু না ভেবেই বলে উঠল, হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই যাবো। কবে যাবেন বলেন?
আমি জানাবো। আপনার মায়ের অনুমুতি নিয়ে রাখবেন।আর সেদিন আমি আপনাকে আমার জীবনের সব কথা খুলে বলবো।
যদি চোখে জল ধরে রাখতে পারেন তবে বুঝবো আপনি খুব কঠিন মনের একজন মানুষ। আর যদি আমার দিকটা ভাবেন তবে দেখবেন কেমন করে একটা মানুষের সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়েও বেঁচে থাকতে হয়।
শায়লা  কথাগুলো শুনছিল আর এক অজানা আশংকায় চিন্তিত হয়ে উঠছিল।মনে মনে বলে উঠলো, না শিহাব আমি তোমার কোন অতীত শুনতে চাইনা।অতীতের তুমিটা অন্যকারো হয়েছিলে কিন্তু বর্তমানের এই তুমিটাকেই আমার ভালো লাগে। এই তুমিটাই আমার কাঙ্খিত। 
শায়লা চোখ বন্ধ করে শিহাবের মুখটা ভেবে নিল।
শিহাব ওপ্রান্তে শায়লার সাড়া পাওয়ার অপেক্ষায়। 
চলবে....

রাবেয়া পারভীন





স্মৃতির জানালায় 
(ম পর্ব)


মেয়েটি উচ্চকন্ঠে ডাকল,
- বাবলু এই বাবলু
ডাক শুনে একটি আট নয় বছরের ছেলে এসে ঘরে ঢুকল।ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বোঝা গেল ছেলেটি  মেয়েটির ভাই। কাছে এসে ছেলেটি মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল  
- কেন ডেকেছো আপা ?
- কাজেম কো বলো আমাদের কে চা নাস্তা দিতে।
-আচ্ছা
বলে বলে ছেলেটি বেরিয়ে গেল। মাহতাবের দিকে তাকিয়ে মেয়েটি বলল
- আব্বা এলে যে আপনার কথা বলব,  আপনার নামটাই তো জানা হলোনা।
আবার ঢোক গিলে মাহতাব
-আমার নাম মাহতাব উদ্দীন। 
- আমার নাম শবনম।  আপনি কোথায় থাকেন ?  
-বকসীবাজার  মেসে থাকি।
-গ্রাম থেকে এসেছেন বুঝি ?
-হ্যাঁ 
- কে কে আছেন  বাড়ীতে ?
- বাবা  আর দুই বোন।
-আর মা ?  
- মা নেই ,  অনেক আগেই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।
বলতে গিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো মাহতাবের। এতক্ষনে তাঁর মনে হলো বুকও বুঝি শুকিয়ে  যাচ্ছে। আস্তে  করে বলল
-আমাকে  এক গ্লাস  পানি দিবেন ? 
- এক্ষুনি আনছি।
শবনম উঠে পানি আনতে গেল  এবং ফিরে এলো কাজের ছেলেটিকে সাথে  নিয়ে। ছেলেটির হাতে নাস্তার ট্রে। শবনম  ট্রে  টা নিজের হাতে নিয়ে মাহতাবের সামনে  টি টেবলের উপর রাখলো। কাজেম কে বলল 
- কাজেম তুই শিপলু বাবলু কে  ডেকে নিয়ে  আয়
মাহতাব পানির গ্লাস নিয়ে ঢকঢক করে পানি খেল। শবনমের সাবলীল ব্যাবহার  তার ভয় কমিয়ে দিচ্ছিল। সে স্বাভাবিক  হয়ে বসে শবনমের হাত থেকে সেমাই এর প্লেট নিয়ে খেতে লাগল। দুটি ছেলে এসে ঘরে ঢুকল,  একজনকে আগেই দেখেছিলেন  বাবলু, পাশের জন সম্ভবত  শিপলু। বয়স তের চৌদ্দ  হবে। শবনম পরিচয় করিয়ে দিল
- এরা আমার ছোট দুই ভাই  শিপলু আর বাবলু। শিপলু ইনি তোমাদের একজন ভাইয়া,  আব্বার ছাত্র।
ছেলেগুলি  মাহতাবকে ছালাম দিয়ে নাস্তা খাওয়ায় মনোযোগ দিল। এখন মাহতাবের আর মনেই হলোনা  এই বাড়ীতে সে প্রথম এসেছে। মনে হচ্ছে এদের অনেকদিন  ধরে চেনে। কত যেন আপন। চা খাওয়া শেষ হলে সেদিনের মত উঠে পড়ল মাহতাব। শবনমের কাছে বিদায় নিল। বলল
- আমি তাহলে আজকে যাই, স্যাররকে বলবেন
-ঠিক আছে যান,  আবার আসবেন। অনেক ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে ফেলেছি কিছু মনে করবেন না।
মৃদু হেসে বাসা থেকে বেরিয়ে এলো মাহতাব। রাস্তায় হাটতে হাটতে মনে হলো এতোক্ষন ধরে ঘটে যাওয়া  ঘটনাটি যেন বাস্তব নয় স্বপ্ন। কিছুক্ষন আগে দেখা মেয়েটিকে  সে কি সত্যিই দেখেছে?  নিজের গায়ে চিমটি কাটলো সে। তারপর নিশ্চিত  হলো স্বপ্ন নয়  এতোক্ষন যা ঘটেছে সব সত্যি। তারপর কতদিন পেরিয়ে গেছে কখন যে শবনমের সাথে  তার বন্ধুত্ব হয়ে গেছে গিয়েছিলো বুঝতেই পারেনি।
 চলবে.....

২৮ নভেম্বর ২০২১

মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন" ৫৪

কান্ত মনেই লিখে চলেছেন লেখক।  তার নিত্যদিনের  আসা  যাওয়া ঘটনার কিছু স্মৃতি কিছু কথা  নিয়ে  কল্পনার মোচড়ে লিখছেন ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন  চলবে...



টানাপোড়েন (৫৪)

মনজানলা 


                                                                       বৃষ্টিটা কমাতে একটু হাঁফ ছেড়ে যেন রেখা বাঁচল। অথচ এই বৃষ্টির জন্য এক সময় আকুলি- বিকুলি করতো। এখনো মাঝে মাঝে মন আনচান করে।অনেকদিন পর গ্রামে এসে এই বৃষ্টি যেন সবকিছু মেচাকার করে দিচ্ছে। মনে পড়ে একবার বৃষ্টির সময় ঘোষদের বাড়িতে দুর্গাপুজোর পাশাপাশি দুই বোনের পুজো হত মানে কোজাগরী পূর্ণিমায় লক্ষ্মী পূজোর সঙ্গে সঙ্গে সরস্বতীর ও বন্দনা হ'ত । ছেলে মেয়েদের ভিড় জমত। এ রকমই একবার সরস্বতী পূজার অঞ্জলি দিতে ঘোষ বাড়িতে গেছিলো রেখা।সেখানে অন্যান্য ছেলেদের মতো নীলুও গেছিল। নীলু তো যাবেই ,যেখানে রেখা গেছে।
বাড়ি ফেরার সময় হঠাৎই বৃষ্টি ।বড় আমগাছটার নিচে আশ্রয় নিয়েছিল দু'জনা। সেদিন যেন মনে হচ্ছিল বৃষ্টিটা না থামলেই ভালো হয়।
নীলু বলেছিল ' হ্যাঁ ,রে ।তুই তো ভিজে গেছিস? তোর ঠান্ডা লেগে যাবে। এক কাজ কর তুই আমার শার্ট টা নে।'
রেখা বলল'কেন তাহলে তো তুমি ভিজে যাবে?'
নীলু বলেছিল'আমরা পুরুষ মানুষ আমাদের ঠান্ডা সহ্য হয়। আর তোর তো আবার ঠান্ডার ধাত আছে?'
দু'দিন পরে স্কুলে  যেতে পারবি না।'
রেখা বলল  'স্কুলে যেতে পারব না, তাতে তোমার কি?'
নীলু বলল ' তার মানে?'
রেখা বলল  'তার মানে আবার কি ?আমি বাড়িতে রেস্ট নেবো।'
নীলু বলল ' তোর প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসগুলো কে করবে শুনি?'
রেখা বলল  'সে তোমাকে অত ভাবতে হবে না।'
নীলু বলল  'না ,আমি ভাববো না ।তো কে ভাবতে শুনি ?আমি তোর ভালো বন্ধু হই না?'
রেখা বলল  'হ্যাঁ ,তা ঠিকই বলেছ?
নীল বলল  "আমি যেটা বলছি তোর ভালোর জন্যই বলছি। তোকে পড়াশোনা করে বড় হতে হবে।'
রেখা বলল  'আর তুমি?'
নীল বলল'আমাকেও বড় হতে হবে। পড়াশোনাতে নিজেকে সব সময় নিয়োজিত করতে হবে। কিন্তু একটা সমস্যা আমার হয়?'
রীতা বলল 'কী?'
নীল বলল 'তোকে দেখার'
এমন সময় আরও ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হল, সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকাতে লাগলো।  হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকানোতে রেখা ভয় পেয়ে গেল। আর ভয়েতে নীলুদাকে জড়িয়ে ধরল। নীলুও কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিলো।
নীলু বলেছিল' ননী তুই ভয় পাচ্ছিস? ভয় পাস না ।আমি আছি তো?
রেখা ও যেন পরম একটা আশ্রয় পেয়েছিল নীলুর বুকে।
একটু যখন বৃষ্টি কমতে শুরু করল ।তখন নীলু বলল  'চল বাড়ি চল।'
রেখা বলল 'আজকে বাড়িতে গেলে মা বকবে?'
নীলু বলল ' কেন রে?'
রেখা বলল  'অনেকটা দেরি হয়ে গেছে তো?'
নীলু বলল  'বকবে না ছাই, আমি যাবো তোর সাথে কাকিমাকে গিয়ে ...।'রেখা নীলুর কথা শেষ করতে না 
দিয়েই বলল ' তোমার সাহস কতদূর আছে ,আমার জানা আছে ।মায়ের সামনে গিয়ে তোতলাতে থাকো।'
নীলু বলল ' হ্যাঁ রে ।কাকিমাকে দেখলে  ভয় লাগে।'
রেখা বলল ' আমার মা কি বাঘ? না ভাল্লুক? যে তোমার ভয় লাগে ।খেয়ে ফেলবে?'
নীলু বললো ' না ,কাকিমার ভেতরে এমন একটা জিনিস আছে,কি আছে ,জানি না ।কাকিমার সামনে কথা বলতে সাহস হয় না। সামনে গেলেই কেমন সবকিছু গুলিয়ে যায়।'
রেখা বলল  'ওরে আমার বীরপুরুষ রে ,অনেক হয়েছে ।যাই ,আমি বাড়িতে গিয়ে বকাটা শুনি।'
নীলু বলল ' চল ,চল, চল তাড়াতাড়ি বাড়ি চল।'
সেদিন বাড়িতে পৌঁছানোর পর রেখাকে অনেক বকুনি খেতে হয়েছে।
বাড়িতে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে রেখার মা বললেন 'এতক্ষণ কোথায় ছিলে?'
রেখা বলল 'ঘোষ জেঠুদের বাড়ি।'
রেখার মা বললেন 'তাহলে ভিজলে কি করে?'
রেখা বলল 'এই তো আসার সময় বৃষ্টিটা পেলাম।'
রেখার মা বললেন  'বৃষ্টির মধ্যে আসলে কেন  ঘোষ দাদাদের বাড়ি থাকতে ?আমরা গিয়ে নিয়ে আসতাম।'
রেখা চুপ করে দাঁড়িয়েছিল।
রেখার মা আরো বললেন ‌'এখন বড় হচ্ছো ।যেখানে সেখানে একা একা যাবে না। দরকার হলে আমরা তোমাকে নিয়ে যাব।'
রেখার মা বললেন 'পার্বতী দি কিছু পাঠায় নি প্রসাদ?'
রেখা জানে এখানে মিথ্যে কথা বলা যাবে না ।আদতে পার্বতী জেঠিমা প্রসাদ নিয়ে আসার কথা বলেছিলেন ।কিন্তু আমি ভুলে গেছি।'
রেখার মা বলল " কিরে উত্তর দিচ্ছিস না?'
রেখা বলল ' নিয়ে আসতে বলেছিলেন কিন্তু আমি তাড়াহুড়োয় বেরিয়ে চলে এসেছি।'
রেখার মা বললেন ' হ্যাঁ, সে তো ঠিকই ।যেগুলো কাজের মধ্যে পড়ে ,সেগুলো তুমি ভুলে যাও। আর যেগুলো অকাজ সেগুলো করে ঘুরে বেড়াও।'
রেখা বলল 'হ্যাঁ ,সত্যি বলছি।'
রেখার মা বললেন  'ওরে ,আমার সত্যিবাদী যুধিষ্ঠির '।
রেখা যখন রুমের দিকে যাচ্ছে তখন ওর মা বললেন 'শোন ।বলছি এবার আলপনাটা কেমন হয়েছে রে?'
রেখাও খুব গদগদ ভাবে এসে মাকে বললো'  খুব সুন্দর হয়েছে মা।'
রেখার মা বললেন 'প্রায় ২০০ বছরের পুরানো পুজো,।দুর্গাপূজা যেমন হয় তেমনি আবার এই দুই বোনের পুজো হয় সাড়ম্বরের সাথে।'
রেখা বলল' ও মা দুটো ঘট বাঁধা হয় কেন?'
রেখার মা বলল  ' দুটো পুজো  ,তো দুটো  ঘট হবে না?'
রেখার মা বললেন 'ভোগ খেয়েছিস তো?'
রেখা বলল  'হ্যাঁ মা।'
রেখার মা বলল  'কি কি ভোগ দিয়েছেন রে?'
রেখা বললো ' ওই  তো মা ।প্রতিবার যা দেয়া হয় ফলমূল ,লুচি ,সুজি সবকিছুই।'
রেখার মা বলল   'হ্যাঁ রে। বিদেশ থেকে ঝুমুরা এসেছে?'
রেখা বলল  'হ্যাঁ ।মনে হয় ।প্রচুর লোকজন তো?'
রেখার মা বলল ' 'ঠিক আছে। যাও গিয়ে আগে চেঞ্জ করো।
 ঠান্ডা লেগে যাবে।'
রেখা বলল  'হ্যাঁ মা।'
আজ সবই স্মৃতি।
আবার সেই ছাদে উঠে চারিদিকটা দেখতে লাগলো ।ওই তো আমবাগান দেখা যাচ্ছে।
রেখা ছাদে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দুচোখ ভরে গ্রামটা একটু দেখে নিচ্ছে। এমন সময় কাকিমা এসে বললেন 
''কি করছিস ননী?'
রেখা বলল 'আচ্ছা কাকিমা। ঘোষজেঠুদের আগের মতো সাড়ম্বরে পূজা হয় ,ওই দুই বোনের পুজো'?
কাকিমা বললেন 'আগের মত আশেপাশের গ্রামের মানুষদের আর সেরকম নেমন্তন্ন করা হয় না ,আর্থিক অসঙ্গতির জন্য।'
রেখা বলল   'ও তাই বুঝি?'
কাকিমা বললেন 'আগে যে খিচুড়ি প্রসাদ খাওয়ানো হতো এখন সেটা দাঁড়িয়েছে শুধু প্রসাদ বিতরণে।'
রেখা বলল 'আচ্ছা কাকিমা এখনো কি গো জেঠুদের সেই পুকুরেই প্রতিমা বিসর্জন হয়?'
কাকিমা বললেন ' তোর সব মনে আছে? হ্যাঁ এখনো সেই পুকুরেই হয়।'
কাকিমা বললেন 'চল ,চল, ননী ।খেয়ে নিবি।
বিকেলে তো বেরোবো  তোকে নিয়ে?'
রেখা বেরোনোর আনন্দে বললো  'চলো ,চলো 'কাকিমা। 
রেখার মন এখন শ্রাবণ মাসের ভরা নদী ।টুইটুম্বুর করছে স্মৃতির ভান্ডার। মন জানলায় বারবার উঁকি দিচ্ছে।
তাই পুরনো স্মৃতিকে আরেকবার ঝালাই করে নিতে চাইছে।
রেখা বলল 'কাকিমা বুলু জেঠিমার আর খবর পেলে।'
কাকিমা বললেন  'না রে , ভোলা  এসে তো কিছু খবর দেয় নি।,'
রেখা বলল' ও'।
কাকিমা বললেন'বেশ ,চিন্তার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো।'
রেখা বলল ' আচ্ছা কাকিমা ,নীলুদা কি একদমই আসে না?'
কাকিমা বললেন "এখন কেন আসে না সেটাই বুঝতে পারি না। ওদের কিছু একটা হয়েছে ভাইয়ে-ভাইয়ের।'
কাকিমা কথাটা বলেই নিচে চলে গেল খাবার বাড়তে সঙ্গে রেখা কেউ বলে গেল তাড়াতাড়ি নামতে।
রেখা শুধু মনে মনে ভাবছে আর কি কোনদিনই নীলু দার সঙ্গে দেখা হবে না?
রেখার আরো ভাবছে  'নীলুদার সেই কথাগুলো কোথায় গেল? একবারও কি আমার কথা মনে পড়ে? নাকি বিদেশে গিয়ে মেমসাহেব দেখে সবকিছুই ভুলে গেছে। অথচ রেখা কেন ভুলতে পারে না। রেখার আজ যেন 'পল পল দিল কে পাস তুম রেহতি হো', আঁচড় কাটছে হৃদয়ের ক্যানভাসে।