২৯ এপ্রিল ২০২২

কবি জাহাঙ্গীর আলম জীবন এর কবিতা "বিবর্ণ স্বপ্ন"





বিবর্ণ স্বপ্ন
জাহাঙ্গীর আলম জীবন 



আমরা  বেশীর ভাগ মানুষই
জীবনের টানাপোড়নে আবদ্ধ 
কখনও এটা আবার কখনও ওঠা 
সমস্যাত লেগেই আছে ; থাকবে। 

সংসার, বিয়ে, অসুস্থতা আর ব্যস্ততার চিন্তা করতে গিয়ে নিজের 
কথাই ভুলতে হয়। তার পরেও অনেকের মন ভরে না! 

কখনও মনে হয় ;সাংসারিক দায়িত্ব আর জীবনের অশুভ অধ্যায়গুলো যদি না থাকতো 
তাহলে দিব্যি একটানা পড়ে যেতাম..

একটি জীবনে কত চাওয়া 
স্বপ্ন হাজার। সময়ের স্রোতে 
স্বপ্ন ভেঙ্গে বিবর্ণ হয়ে যায়
তবুও স্বপ্ন; স্বপ্নই দেখে যায়।

মমতা রায়চৌধুরী এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৬৫





উপন্যাস 


টানাপোড়েন ১৬৫
কুসংস্কারের বেড়াজালে
মমতা রায়চৌধুরী 




রাত্রে শুয়ে শুয়ে চৈতির মার কথাগুলো ভেবে যাচ্ছিল রেখা।' সত্যিই যদি এরকম কিছু 
হয় ,সত্যিই যদি চৈতির শ্বশুর বাড়িটা ভোলা ঠাকুরের জন্য ঠিক হয়ে থাকে। তাহলে কি একবার রেখা চেষ্টা করবে? আবার মনে মনে ভাবছে এসব কুসংস্কার ।একজন শিক্ষিতা মেয়ে এসব বিশ্বাস করে কি করে? "আসলে মনের ভেতরে ভয় থেকে সৃষ্টি হয় এসব। কিংবা দীর্ঘদিন পরিশ্রম প্রচেষ্টার ফলে যখন কিছু না মেলে তখন বোধহয় ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিতে হয় এবং যে যা বলে সেটাকেই তখন বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। এসব ভাবছে  রেখা।মনোজ  ওঘরে খেলা দেখছে আজকে  টিভির কাছ ওকে  থেকে নড়ানো যাবে না। কে কে আর  খেলা।
হঠাৎই কতগুলো মেসেজ ঢোকার আওয়াজ হলো ।মনের ভাবনায় ছন্দ পতন ঘটল। ফোনটা টেবিলের উপর ছিল রেখা তাড়াতাড়ি উঠে ফোনটা চেক করলো। 
"ওমা একি একটা মেসেজ ফরওয়ার্ড করা হয়েছে। তাতে লেখা হয়েছে তারাপীঠ মন্দিরের পূজারী ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে স্বপ্নাদেশ পেয়েছেন। তিনি বলেছেন সকলকে গীতা পাঠ আর প্রার্থনা করতে এবং এই মেসেজ যে 30 জনকে পাঠাবে তার মনের আশা পূরণ হবে, আর যে অবহেলা করবে তার পাঁচ বছর খারাপ সময় যাবে।
রেখার ব্যাপারটাতে বেশ ইন্টারেস্টিং লাগলো ।আজকে হচ্ছেটা কি ?ঠাকুরের কথা ,সেটাও একটা মনের ভেতরে করবে কি করবে না। একেবারে করবে না বলে ঝেড়ে মুছে ফেলতে পারছে না আবার করবে বলেও মনে থেকে সঠিক সায় পাচ্ছে না।
ম্যাসেজটা পড়ার পর রেখার মনের ভেতরে একটা টানাপোড়েন মেসেজটা পাঠাবে কি ,পাঠাবে না ।বেশ কয়েকবার নিজের মনকে প্রশ্ন করল তারপর ভাবল 30 জনকে না পাঠানোর ই  বা কি
 আছে ?পাঠালে তো ক্ষতি হচ্ছে না। যদি ভালো কিছু হয়। আশায় এই প্রত্যাশায় আমরা সকলে বাঁচি। কতক্ষণ সময় লাগবে 30 জনকে মেসেজটা ফরোয়ার্ড করতে  ,করেই ফেলি।'
রেখা ওর পরিচিত সার্কেল এর মধ্যে মেসেজটা ফরওয়ার্ড করেছে। একজন কমবয়সী ভাই ছিল সে সঙ্গে সঙ্গে মেসেজ করেছে 'দিদি,' এটা ছেলেমানুষি ছাড়া আর কিছু নয়'  
প্রথমদিকে মেসেজটা ওই ভাইটার কাছ থেকে পাওয়ার পর রেখে একটু লজ্জিত হয়ে 
গেছিল ।সত্যিই তো ,একজন শিক্ষিত মেয়ে কি করে মেসেজগুলো ফরওয়ার্ড করে। তারপর মনের ভেতরে একটা আত্মবিশ্বাস তৈরি হল ।
বলল" কেন এত কিছুর পরেও তো একটা অদৃশ্য শক্তি আছে ,সেই শক্তি হচ্ছে ঐশ্বরিক শক্তি।
 তাই রেখা লিখল 'ভাই আমরা প্রত্যেকেই ধর্মভীরু আমরা প্রত্যেকেই নিজের নিজের মঙ্গল চাই নিজের মরে যাওয়া স্বপ্ন আশাগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই।'
পরক্ষণেই ভাইটি মেসেজ করল
"তাহলেও দিদিভাই…।"
রেখা লিখল" কিছু ইচ্ছেগুলোকে না হয় খাম বন্দি করে রাখি আর কিছু ইচ্ছেগুলোকে না হয় নীল খামে মুক্তি দিই। ধরে নাও সেরকমই কিছু।""
এবার সেই ভাই হাসির চিহ্ন দিয়ে পাঠাল।
রেখাও হাসির আর ভালবাসার চিহ্ন পাঠালো।

এর পরবর্তীতে আর একটি ম্যাসেজ ঢুকলো একজন লিখেছে আমার কোনো আশা নেই।'
রেখা লিখল আশা নেই এ কথা কেন বলছো আশার জন্যই তো আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের খোঁজখবর নিই। কেমন আছো ?স্বপ্ন দেখাই ।তোমাকে আমি ভাল করে চিনি। তুমি নিজে একটি স্কুলে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত আছ। তাহলে তোমার আশা যদি না থাকবে তাহলে তুমি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত থেকে এতগুলো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করার প্রচেষ্টা করতে না?'
'সেও তখন হাসি চিহ্ন দিয়ে পাঠালো।'
আর একজন পাঠালো সত্যিই কি আমরা এগুলোতে বিশ্বাস করি? এটা কুসংস্কার ছাড়া কিছু নয়।'
রেখা বলল' হ্যাঁ ,তার মনেও সেটাই আছে কুসংস্কার তবু আমরা সবকিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করতে পারিনা ।ধরে নাও আমি আমার সেই ইশ্বরের প্রতি বিশ্বাস নিয়ে এই মেসেজটা ফরোয়ার্ড করেছি ।তোমাদের ইচ্ছে হলে তোমরা কাউকে মেসেজ ফরোয়ার্ড করতে পারো, না পারবে সেটা তোমাদের ব্যাপার আমি কিন্তু আমার ঐশ্বরিক শক্তি কে স্বাগত জানিয়েছি এবং আমি এই পৃথিবীর রূপ রস গন্ধে আরও কিছু দিন কাটিয়ে যেতে চাই ।আমার মনের সুপ্ত বাসনাগুলো আছে,যে স্বপ্ন গুলো আছে সেই স্বপ্নগুলো কে পুনরুজ্জীবিত দেখতে চাই । যদি হয় এ,ই প্রত্যাশায় ভালো থাকা।
সে তখন টেক্সট করে ভালোবাসার হাসির চিহ্ন দিয়ে পাঠায়।
আসলে রেখা যার কাছ থেকে মেসেজটি পেয়েছে তিনি একজন স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব।তবে তিনি স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব বলেই যে তার কথা বিশ্বাস করতে হবে ,সেই বিশ্বাস থেকেকিন্তু রেখা করেনি রেখার মনে হয়েছে মনের ভেতরে কোথাও না কোথাও একটা জায়গা আমাদের দুর্বল আছে ।সেই দুর্বল জায়গা থেকেই তৈরি হয় আমাদের খিদে আর সেই খিদের নিবৃত্ত করার জন্য আমরা অনেক কিছু অবলম্বন করে থাকি।
আরেকজন মেসেজ লিখেছেন ম্যাডাম আমরা কম্পিউটার ইন্টারনেটের যুগে দাঁড়িয়ে আছি সেখানে দাঁড়িয়ে আপনার কাছ থেকে এই রকম একটা মেসেজ প্রত্যাশা করি নি।
এসএমএস পাঠায় জানি। আপনার মনে প্রশ্ন উদয় হাওয়াই স্বাভাবিক কিন্তু একটা কথা বলি কুসংস্কারে মানুষের আস্থা প্রদর্শনের নানা কারণ রয়েছে কিন্তু?
ভদ্রলোক মেসেজ করেছেন যেমন।
যেমন ধরুন না বিজ্ঞানের কিছু কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে এটা আপনি মানেন তো?'
'সেটা তো রয়েছেই।'
রেখা বলল তাহলে আমি কিছু উদাহরণ দিই যেমন ধরুন চাষী,বিজ্ঞানের কাছ থেকে আগাম কিছু জানতে পারেনা ,কোন বছর ফসল কেমন হবে?
ভদ্রলোক বললেন একদম সঠিক।
 যেমন ধরুন খেলা হচ্ছে সেই খেলায় বিজ্ঞান কখনো বলে দিতে পারে না যে কোন দল জয়ী হবে?"
"এটাও সঠিক।"
তাছাড়া দেখুন বিজ্ঞান কখনো ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না ,এটা মানেন তো?'
'হ্যাঁ,সেটাও ঠিক।'
রেখা বললতাহলে দেখুন এই অনিশ্চয়তার ক্ষেত্রে কিন্তু বিজ্ঞানের আপাতত পরাজয়। এখান থেকেই সূত্রপাত হয় দৈব বিশ্বাস তথা দৈব নির্ভরতা।এটা মানেন তো?হ্যাঁ সেটাও ঠিক।
আমরা প্রত্যেকেই জানি যে মানব সভ্যতার সূচনা লগ্ন থেকে  কুসংস্কারের ধারা বয়ে চলেছে কুসংস্কার কিন্তু এগিয়ে চলেছে বিজ্ঞানের সঙ্গে সমান্তরালে পথ ধরে।
'হ্যাঁ তা অবশ্য ঠিক।'
আর এই কারনেই এই কুসংস্কার কিন্তু কখনই দেখা যায় যে বিজ্ঞানের হাত ধরে সমাজের বুকে প্রগতি এসেছে কিন্তু সেই প্রগতির পথে কিন্তু কখনোই কুসংস্কার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না এই কুসংস্কার বলতে পারেন ব্যক্তির কাছে একটা  প্রশান্তি স্বরূপ।
এই ধরুন না আপনার বাড়িতে বা আমার বাড়িতে যদি কেউ কঠিন রোগে আক্রান্ত হয় আমরা ডাক্তারের পরামর্শ নেই ঠিকই কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে আমরা কি করি?
লোক বললেন আমরা ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করি মাথা ঠুকে রোগমুক্তির জন্য।
রেখা বললো দেখুন আপনি কিন্তু তাহলে এদিক থেকে আবার কুসংস্কারে আবদ্ধ হয়ে গেলেন।
আসলে কুসংস্কার কিন্তু কখনোই বিজ্ঞানের পথচলাকে থামিয়ে দেয় না।
তবে কিন্তু দাদা আমি কখনোই বলছি না যে আপনি  কুসংস্কারকে প্রাধান্য দিন। আসলে আমাদের মনের ভেতরে একটা দুর্বল জায়গা রয়ে গেছে এই দুর্বল জায়গাটা কেই আমাদের সরাতে হবে। সেটা একমাত্র পূর্ণ বিজ্ঞানচেতনা আর এই বিজ্ঞান চেতনার যত প্রসার ঘটানো যাবে কুসংস্কারের দুষ্টু শনির থেকে আমরা মুক্তি পাব।
ভদ্রলোক বললেন 'আমি তো সেটাই বলছি।"
আমিও সেটাই বলছি মানুষের অজ্ঞতা ও শিক্ষাকে কুসংস্কার হাতিয়ার করে।
ম্যাডাম আপনিতো শিক্ষিতা আপনাকে কি করে গ্রাস করল।
রেখা বললো আমরা প্রত্যেকেই না আসলে এই দুষ্টু ক্ষতের জালে আটকে আছি এতটাই ভেতরে ঘা করে দিয়েছে ,সেই ঘা শুকাতে আমাদের সময় লাগবে ।তবে আমি কখনো এটা বলব না যে কুসংস্কার সমাজের বুকে অক্ষত 
থাকুক ।আমাদের এই কুসংস্কারকে সমাজ থেকে নিজের মন থেকে দূর করতে হবে। তাহলেই এক সুস্থ প্রগতিশীল সমাজের জন্ম হবে।
স্বামী বিবেকানন্দের মতে "প্রকৃত শিক্ষাইপারে মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তার বিকাশ সাধন করতে আর এই প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে জীবন পথে চলতে সাহস আর আত্মবিশ্বাস জোগাবে।"
তাহলে আপনি কি বলছেন আপনার ভেতরে আত্মবিশ্বাসের অভাব?
দাদা আগেই বললাম ভেতরে অনেকটা ক্ষত তৈরি হয়ে গেছে সেটা হারাতে বেশ কিছুদিন সময় লাগবে আমার যে ব্যথা যন্ত্রণা  এই কথাটা বিজ্ঞান যদি পূরণ করে দিতে পারতো তাহলে বোধহয় খুব তাড়াতাড়ি এই কুসংস্কারের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পেতাম।
একটা কথা বিশ্বাস করি আমি কিন্তু ঈশ্বরকে বিশ্বাস করি ।ঈশ্বরকে দেখা যায় না ছোঁয়া যায় না উপলব্ধি করতে হয়। আমি সেই জায়গা থেকেই এটাকে সাপোর্ট করেছি কিন্তু আমি কাউকে জোর করে বলব না ,কেউ সেটাকে সাপোর্ট 
করুক ।সেটা নিজের নিজের মনের ব্যাপার।
তাই আমি কথাটা বারবারই কিন্তু বলছি "superstition is the religion of feeble mind'
বিভিন্ন প্রকার ভয় থেকেই এই কুসংস্কারের সৃষ্টি। আর এই ভয়টা কেই আমাদের জয় করতে হবে।
নইলে কুসংস্কারের বেড়াজালে  আমরা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যাব।

কবি মোঃসেলিম মিয়া "ঈদ বোনাস"






ঈদ বোনাস 
মোঃসেলিম মিয়া 




মুসলিম দের ধর্মীয় উৎসব বড় দুটি ঈদ,
ঈদুল ফিতর ঈদুল আজহা ত্যাগের মহিমায় গায় গীত! 
গরীব দুঃখীর কষ্ট অনুধাবণে সিয়াম সাধনে রত---
পূর্ণ দিবস অভূক্ত থেকে ক্ষুধা তৃষ্ণায় কত!
ধনী গরিব নেই ভেদাভেদ এটাই মর্ম বাণী ---
ইসলামের শশীতলে আসল ঠাঁই মানি।
সত্যিকারের ইসলাম ভাই  সাম্যের কথা বলে,
যাকাত ফিতর উৎসব বোনাসে
সঠিক নিয়ম কি মানে?
গরীবের হক বিলিয়ে দিতে 
বিধিনিষেধ  জারি, 
যুগে যুগে নবীর আদেশ শ্রষ্ঠার দেওয়া বাণী! 
মানব কুল  চলছে মেনে নিস্তার পেতে সকল ভুল,
ঈদ ভাতা উৎসব বোনাস সম্প্রীতিতে সামাজিক রুল।
প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে ঈদ বোনাসে বৈষম্য কতো রীতি, 
ঈদের সময় ঘনিয়ে এলে মাথায় খেলে ভীতি! 
শিল্পপতি আছেন যারা ভীষণ মনে কষ্ট, 
ব্যবসায় শুধু লস আর লস কিসের বোনাস প্রাপ্য?
অজুহাতের তিনহাত খোঁজে 
পাশ কেটে তাই  চলে,
গরীবের সিঁদ কেটে ভাই রাজ প্রাসাদটি গড়ে!
ইসলাম কি এটাই বলে বোনাস ছলাকলা? 
 ঈদ আনন্দে ভাগ বসাতে বোনাসে কেণ ধাওয়া!!!

২৭ এপ্রিল ২০২২

মমতা রায় চৌধুরী এর ধারাবাহিক উপন্যাস ১৬৪





উপন্যাস 

টানাপোড়েন ১৬৪
আকাঙ্ক্ষিত বস্তুর জন্য
মমতা রায় চৌধুরী





আজ স্কুল থেকে তাড়াতাড়ি ফিরেই ফ্রেশ হয়ে গোপালের ভোগ চাপিয়ে, গোপালকে শয়ন দিয়ে
তাড়াতাড়ি চা বানাল। চা খেতে খেতে পেপারটা উল্টাতে লাগলো ।আজকাল পেপার পড়ার সময়ই পাওয়া যায়  না। পেপারের সম্পাদকীয় কলম টা খুব সুন্দর লিখেছেন। মন ভরে গেলো। অনেকদিন পরে একটা সুন্দর লেখা পেল। এরপর পাতা উল্টাতে উল্টাতে কবিতা। কবিতা পড়তে গিয়ে কবির নামই দেখা হয়নি। কবির নাম দেখে পছন্দ হবার নয়। একটি সত্যিকারের নাম ,না ছদ্মনাম? কে জানে?  তবে নামে কি এসে যায়, গোলাপকে যে নামেই ডাকা হোক তার সুগন্ধ তো ছড়াবেই।
এই কবির কবিতা প্রথম পড়ল রেখা।
মনে পড়ে গেল রেখার ও  কতলেখা   বাকি রয়ে গেছে, লেখা পাঠাতে হবে ।এদিকে অন্য আরেকটি পত্রিকার সম্পাদক পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে নতুন বছরের কবিতা লিখতে বলেছেন। বেশ কয়েকটি পত্রিকায় লেখা পাঠানোর আছে।তাই কালবিলম্ব না করে লিখতে বসে গেল। রেখা যখন লিখতে বসে,তখন কোথা থেকে যে শব্দগুচ্ছ মনের ভেতরে তৈরী হতে থাকে নিজেও জানেনা ।কলম আপন তালে এগিয়ে চলে, কবিতার ক্যানভাসে ছবি আঁকে।
এভাবে দুটো পত্রিকার জন্য রেখা লেখা কমপ্লিট করে ফেলে। আর নিজের লেখা নিজেই পড়ে অবাক হয়ে যায়। এমন সময় কলিং বেলের আওয়াজ "ওম জয় লক্ষী মাতা…।"
রেখা জানে নিশ্চয় মনোজ এসেছে।
খুব উৎসাহ নিয়ে দরজা খোলো।
কিন্তু না মনোজ নয়। চৈতির মা।
সত্যি কথা বলতে কি রেখা মোটেও এইসময় চৈতি র  মাকে এক্সপেক্ট করেনি আর আসাতে খুশিও হয় নি ।কারণ চৈতির মা আসা মানেই বেশ কিছুক্ষণ সময় নষ্ট হবে আর রেখার একচুলও সময় নষ্ট করার মত সময় তার কাছে নেই। তো কিছু করার নেই , সৌজন্য তো দেখাতেই হবে।
রেখা বলল আরে দিদি আপনি?
চৈতি মা এক গাল হেসে বলল একটু বিরক্ত করতে আসলাম না দিদি?
রেখা বলল কি যে বলেন না ।মানুষ মানুষের বাড়ি যায় কি বিরক্ত করতে ।নিশ্চয়ই আপনার কোন দরকার আছে নইলে আপনি তো আজকাল এদিকে আসেন না।
আর তা অবশ্য ঠিকই।
কতদিন পর আসলেন ।ভীষণ ভালো লাগছে।
কথাটা রেখা বলল বটে কিন্তু মন থেকে মোটেও সায় দেয়নি কথাটা বলার জন্য।
"ভেতরে এসে কথা বলুন।"
চৈতির মা বলল "অনেকদিন থেকেই ভাবছি 
যাব ।আশা আর হয়ে ওঠে না। আজকে একটু সময় পেলাম, তাই ভাবলাম যাই একটু গল্প করে আসি।"
"তা বেশ করেছেন পাড়া-প্রতিবেশী না আসলে কি যোগাযোগ থাকে?
চৈতির মা বললো 'আপনিতো কখনোই যান না।"
রেখা মনে মনে ভাবল লোকের বাড়ি জ্বালাতে যাওয়া সময়ে-অসময়ের জ্ঞান নেই ।কোন মুখে এসব কথা বলে। তবুওএক গাল হেসে বলল "আসলে সময় পাই না তো?'
ড্রইং রুমে নিয়ে বসাল  তারপর বললো " দিদি চা করে আনি।'
চৈতির মা বলল "আবার চা করতে যাবেন?"
আমি বাড়ি থেকে চা খেয়ে এসেছি।
রেখা বলল লোকের বাড়িতে গেলে তাকে অন্তত চা দিয়ে হলেও আপ্যায়ন করা উচিত।
চৈতির মা হেসে উঠলো।
"জানেন দিদি কি হয়েছে পাড়ায়?
রেখা মনে মনে ভাবল এবিপি আনন্দ ।সব খবর এর কাছে । যার যা  তথ্য লাগবে পাওয়া যাবে।
"কি করে জানবো দিদি, আমি তো পাড়াতে কারো বাড়িতে যাই না,?'
এমন ভাবে বললো চৈতির মা হাসিমুখটা মুহুর্তের মধ্যে পানসে হয়ে গেল।
পরমুহূর্তেই আবার হাসিটা ফিরিয়ে এনে বলল "আসলে দিদি ,আমরা একটু যাই এবাড়ি ওবাড়ি কথা বলি আমাদের তো আর বাইরে বেরোনোর জায়গা নেই।"
রেখা মনে মনে ভাবল তবে কি চৈতির  মার মনে কষ্ট দিয়ে ফেললো কথাটা বলে।"
রেখা এই কথাটা বলতে চায় নি ,যাতে চৈতির মার মনে আঘাত লাগে।
চৈতির মা একগাল হাসি নিয়ে বললো' জানেন দিদি আরে যার বউটা মারা গেল সুইসাইড করে।'
রেখা কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল" হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ।"
"কেন কি হয়েছে?'
"কি হয়নি বলুন?''ok'
রেখা অবাক হয়ে বলল 'মানে?'
"আরে ওই ছেলের তো নিজের  বৌদির সাথেই লটর পটর।"
রেখা বললো' কি যে বলেন না!"
আমি জানি বিশ্বাস করবেন না কিন্তু খোঁজ নিলেই জানা যাবে।
রেখা মনে মনে ভাবে খেয়ে কাজ নেই নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো।
চৈতির মা আরো বললো' আরে সেই ব্যাপারটা জেনে ফেলে ছিল বলেই তো বউটা সহ্য করতে পারে নি।'
রেখা বলে 'কি সাংঘাতিক,!'
"হ্যাঁ দিদি, তাছাড়া  আর বলছি কি?'
ছেলেটাকে দেখে তো সেরকম চালাকচতুর ই মনে হয় না।
"তাহলেই বুঝুন পেটে পেটে কত বুদ্ধি।"
আর ভালো লাগছে না এসব কথা শুনতে অথচ কত লেখা বাকি রয়েছে লিখতে হবে।"
'বলতেও পারছে না।'
রেখাও মুখে হাসি নিয়ে "দিদি, একটু বসুন আমি চা করে আনছি।'
''চা  করবেন? আচ্ছা আনুন।'"
রেখা চা করতে গেলে চৈতির মা বলল "এবার সেল থেকে কিছু কেনাকাটা করেন নি দিদি?'
'না সময় পায়নি।'
আরে আমাদের কল্যাণীতে দেখুন কত সেল বসেছে  নাকি কাঁচরাপাড়া থেকে করেন?"
"আমি তো বরাবর কাঁচরাপাড়া থেকেই করি।"
চৈতির কি খবর দিদি?
"ও দিদি চৈতির মনে হচ্ছে একটা ভালো খবর দিতে পারব?"
"তাই নাকি? বাহ বেশ ভালো খবর।"
এখনো সে রকম কিছু হয়নি তবে ডাক্তার বলেছেন যে খুব শিগগিরই ভালো খবর দিতে পারবে।
মনে মনে ভাবি গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল।
'এমন ভাবে বললেন যেন মনে হচ্ছে সুখবর হয়েই গেছে।'
'এই তো সামনের সপ্তাহে আসবে এখানে ডাক্তার দেখাতে।'
রেখা চা করে এনে চৈতির মার হাতে চায়ের কাপটা ধরিয়ে দিলো সঙ্গে কিছু স্নাক্স।
দেখুনতো দিদি শুধু শুধু চা করতে হলো। কষ্ট দিলাম এসে।"
"রেখা মুখে মিষ্টতা নিয়ে বলল' কি যে বলেন না দিদি। চা খাওয়াতে পারব না?"
তবে মনে মনে একটু বিরক্তই হয়েছে।
চৈতির মা একগাল হাসি নিয়ে বললো" সে তো আমি জানি দিদি।'
আপনাদের বাড়িতে আসলে কমা? আপ্যায়ন তো করেন না।"
"এখন কেমন আছে চৈতি,? বাড়িতে সমস্যা মিটেছে?"
কানের কাছে একটু ফিসফিস করে এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল" মিটবে না কেন আমি তো ঠাকুরবাড়ি করেছি।'
একটু অবাক হয়ে বললো 'মানে?'
"মানে আমি মদনপুরে ভোলা ঠাকুরের বাড়ি গিয়েছিলাম । ওনকে সব কিছু বলেছি  উনি তো তাবিজ কবজ করে দিয়েছেন?:
রেখা মনে মনে ভাবছে কোন যুগে বাস করি এখনো আমরা তাবিজ-কবজ এইসবের বিশ্বাস থেকে নিজেকে কাটিয়ে উঠতে পারছি
না  কুসংস্কারের বলি।'
'তা কি মনে হচ্ছে  ভোলা ঠাকুরের দেয়া তাবিজ-কবজে এই চৈতি এখন ভালো আছে?"
চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলল তো কি ?শান্তি হয়েছে ওর শাশুড়ি দর্জাল এখন দেখুঙ্গা মাটির মানুষ হয়ে গেছেন পুরো।
'ওমা তাই নাকি?'
রেখা আবার পরক্ষনেই মনে মনে ভাবল "তাহলে কি সত্যি সত্যি কাজ হয় ?তাহলে একবার কি পরীক্ষা করে দেখবে তার শাশুড়ি মা তার সাথে কেন এরকম ব্যবহার করে ?চৈতির মাকে কি ব্যাপারটা খুলে বলবে ?তবে শিক্ষিত মনে বাসা যে  কুসংস্কারকে টেনে নিয়ে আসছে এটা কি ঠিক ?'
চৈতির মা কিছুটা আঁচ করে বল" দিদি কিছু সমস্যা আছে নাকি ?আমায় বলুন আমি তাহলে নিয়ে যাবো আপনাকে ভোলা ঠাকুরের কাছে।"
"সেরকম সমস্যা হলে পরে বলব,"
কেন শুনেছি তো আপনার শাশুড়ি মা সেরকম  সুচারু   একবার দেখবে নাকি গিয়ে ?এটা কিন্তু সত্যি কথাই হান্ড্রেড পার্সেন্ট কাজ করে।'
রেখাও কেমন একটু অন্য মনস্ক হয়ে গেল। সত্যি সত্যি তাই মনের ভেতরে একরাশ ভালোবাসার সমুদ্র অপেক্ষা করছে ।শাশুড়ি মার স্নেহ পাবার জন্য কত চেষ্টাই করেছে কোনো কিছুতেই কাজ হয়নি  রেখার মা মারা যাবার পর ভেবেছিল শাশুড়ি মাকে মায়ের মত আপন করে নেবে ।চেষ্টাও করেছে রেখা আপন  হতে। পারে
 নি ।"একবার চেষ্টা করে দেখবে কিনা 'কিন্তু এই কথা যদি মনোজ জানতে পারে তাহলে তো আর রক্ষে নেই ।কী করবে ?সে নিজেই জানে না। আজ কি সত্যি সত্যি শিবরাম চক্রবর্তী দেবতার জন্ম গল্পটি পড়েছিল ।সেই গল্প পথের ধারে পড়ে থাকা পাথরটি একসময় কিভাবে শিবলিঙ্গে পরিণত হয়ে গেছে ।তাই নাকি পাতাল ফুঁড়ে শয়ন মহেশ্বর বেরিয়ে এসেছে ।তার কাছেই মাথা নত করতে হয়েছে শেষ পর্যন্ত মানুষ কখনো কখনো সত্যিই এমন দুর্বল হয়ে যায় ,যখন সেই শিক্ষিত মনটাকেও গিয়ে মাথা নোয়াতে হয়।
"ও দিদি আজ আর বসবো না  অন্যদিন আসব অনেক সময় নষ্ট করলাম আসছি।'
রেখা যেন কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেল বলল.ঠিক আছে দিদি আসুন আর যাবার সময় আবার বলে গেল দিদি আমাকে বলবেন কিন্তু ।আমি বলছি আমার মেয়েকে দিয়ে উপকার পেয়েছি।"
রেখার মন কেমন হয়ে গেল ।সেও চায় তারও কোলজুড়ে একটা বাচ্চা আসুক ।তার সংসারে শান্তি বিরাজ হোক ।তবে কিছুতেই ভোলা ঠাকুরের কাছে যাবে কত ডাক্তার বুদ্ধি করেছে ডাক্তার তো কখনো বলেনি সে মা হতে পারবে 
না ।তাহলে কি সত্যি সত্যি ঠাকুরের এমন ম্যাজিক আছে যার জন্য সে পৃথিবীর সব থেকে শ্রেষ্ঠ ডাক শুনতে পাবে ।তার নারীসত্তা পরিপূর্ণতা পাবে।" জীবনে তো কম টানাপোড়েন চলেনি। তাই সেও তার ক্ষতবিক্ষত হৃদয়টাকে শান্ত রেখে
কখন যেন অজান্তেই গোপালকে স্মরণ করে ভোলা ঠাকুরের উদ্দেশ্যে দুই হাত তুলে নমস্কার করল আর মনে মনে চাইলো তার সেই আকাঙ্ক্ষিত বস্তুটি।

কবি আইরিন মনীষা এর কবিতা "বেদনার বালুচরে"





বেদনার বালুচরে
আইরিন মনীষা 

বেদনার বালুচরে আছি একাকী 
বেঁচে থাকা দায়
ভালো থাকার আয়োজনেb নেই
আর  কোনো সায়।

ভাঙা মনে নেই আজ
আর কোনো শান্তি
ফেলে আসা দিন যেনো
শুধুই এক ভ্রান্তি।

সুখ পাখি রয়ে গেলো
এখনো সেই অধরা
ক্লান্ত শ্রান্ত মনে  তাই
নেই শান্তির  পসরা

দিন যায় রাত আসে
চোখে নেই ঘুম
ফেলে আসা দিনে যেনো 
স্মৃতি কথার ধুম।

আশা নেই তবু দেখি
স্বপ্নের এক ভোর
খুলে যদি কভু আবার
খুশি মাখা দোর।

কবি শাহীন সুলতানা এর কবিতা "কখনো সমুদ্র কখনো পাহাড়"





কখনো সমুদ্র কখনো পাহাড়
শাহীন সুলতানা 




কখনো কখনো তোমাকে জলের মতো পড়ে ফেলি... 
যেন...শান্ত, স্থির, কমনীয় শিশিরের মতো স্নিগ্ধ তুমি। 
আবার কখনো বিশাল অচলান্ত পর্বতের মতোন 
আবিষ্কার করি। জানি, পর্বত ও সমুদ্র ধারণ করে; 
তবুও সে কাঠিন্য ভেদ করে জলের সন্ধান করা
দুঃসাধ্য বটে !

হয়তো আমারই ক্ষুদ্রতা !  মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে.. 
কোনো এক জ্যোৎস্নার রাতে তোমাকে ভেঙেচুরে 
চুরমার করে একেবারে ঢুকে পড়ি বুকের গহীনে... যেখানটিতে তুমি নীল পদ্মের গাছ লাগিয়েছিলে... ওখানটাতে একটা গোলাপের চারা লাগিয়ে দিই।

কবি এম, এইচ রহমান এর কবিতা "শাব্দিক ফুল"





শাব্দিক ফুল
এম, এইচ রহমান



হঠাৎ পথের দ্বারে কুড়িয়ে পেয়েছিলাম- সেদিন,সাদা কাগজের মাঝে সাদামাটা-
হাতের লেখা কয়েক টুকরো শাব্দিক ফুল।

সযত্নে একত্রিত করে শব্দের মালা গেঁথে-
খুঁজে পাই নির্ভুল একটি বাক্যের মূল।

মৃত্যুপথযাত্রী কেউ লিখেছিলো-
এই নশ্বর ধরাধামের বুকে খুঁজে না পেয়ে- তোমায়,বেলা শেষে অনশ্বর ধরাধামেই পাড়ি জমালাম-

স্বর্গীয় উদ্যানে দাঁড়িয়ে থেকো তুমি-
হাতে নিয়ে কোন স্বর্গীয় ফুলের মুকুল"

Hffvn

LOVE

২৬ এপ্রিল ২০২২

শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক পর্ব একশত তম সম্পন্ন হয়ে শেষ হল।





(কবি ও লেখক শামীমা আহমেদ এর ধারাবাহিক পর্ব একশত তম সম্পন্ন হয়ে শেষ হল।  লেখিকাকে সম্মান জানাই স্বপ্নসিঁড়ি সাহিত্য পত্রিকার পক্ষ থেকে । আপনার আগামীদিন কুশল কামনা করি । অজস্ৰ পাঠক আপনার লেখার অনুগ্রাহী হয়ে উঠুক । 
আবারও স্বপ্নসিঁড়ি পত্রিকা আপনার লেখার আশায় রইলো । 
ভালোবাসাসহ সম্পাদক দেবব্রত সরকার ।)




শায়লা শিহাব কথন 
অলিখিত শর্ত 
( শেষ পর্ব ) 

শামীমা আহমেদ 




শায়লাকে তার বাইকে নিয়ে শিহাব  ঝিগাতলার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেও কিছুদূর গিয়ে সে তার সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনলো। সে একটু নিজের বাসায় যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করলো। বাইকের পেছনে বসা শায়লার কাছে শিহাব আজ এক নতুন পৃথিবী হয়ে ধরা দিলো। শায়লা তার মনের ভাবনায় রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়ে রইল। সে বারবার শিহাবের পিঠের উপর আলতো করে নিজেকে ছুঁয়ে দিচ্ছিল আর ডান হাত দিয়ে বেশ শক্ত করে শিহাবকে জড়িয়ে ধরে তার সাথে বেঁধে রাখলো। শায়লার মনে হলো, যেন সে আকাশে সাদা মেঘের মত হালকা হয়ে উড়ছে। শিহাব উত্তরা থেকে  বেরুনোর আগেই সিদ্ধান্ত পালটে নিয়ে বাইক ঘুরিয়ে তার বাসার দিকে এগুলো। শায়লা অবাক হলো! শিহাবের মাথায় হেলমেট থাকায় কথা বলাও সম্ভব হচ্ছিল না। শায়লা শিহাবের কথা বলার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।বাইক শিহাবের বাসার গেটে থামতেই শায়লা বুঝতে পারলো শিহাব হয়তো কোন বিশেষ  প্রয়োজনে বাসায় এসেছে। শিহাব উচ্চরবে হর্ণ দিতেই কেয়ারটেকার বিল্লাল মেইন গেট খুলে দিলো। বিল্লাল বেশ অবাক দৃষ্টিতেই তাকিয়ে রইল। এই ভর দুপুরে তার স্যার কোথা থেকে এলো, গত রাতে যেভাবে বেরিয়ে গিয়েছিল ! সেতো ভেবেছিল কোন খারাপ খবর কিন্তু এখন দেখছে পিছনে লাল শাড়িতে একজন মহিলা আবার স্যার চকচকা নতুন পাঞ্জাবি পরা। নিশ্চয়ই কোন ঘটনা ঘটেছে।সে শিহাবের কাছ থেকে কথা শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে রইল। শিহাব বাইকের স্টার্ট থামাতেই শায়লা নেমে তার পাশে দাঁড়ালো। শিহাব বিল্লালের চোখ দেখে বেশ বুঝতে পারছে তার মনের ভেতর অনেক জিজ্ঞাসা। সে তার কৌতুহল নিবৃত্ত করতে স্পষ্ট করে  জানালো,বিল্লাল, এ হচ্ছে তোমার ম্যাডাম, মানে আমার বিয়ে করা বউ। গতকাল আমাদের বিয়ে হয়েছে। বিল্লাল হয়তো রিশতিনার সাথে মিলাতে চাইছে কিন্তু তার খটকা লাগছে। তার কাছে এবার বিষয়টি পরিষ্কার হলো। তাহলে এই ম্যাডামের  জন্যই বিদেশী ম্যাডামকে স্যার ফিরায়া দিছে। বিল্লাল দুয়ে দুয়ে চার মিলে যাওয়াতে এবার শান্ত হলো। সে শায়লাকে সালাম দিয়ে তার হাতে শিহাবের ফ্ল্যাটের চাবি দিয়ে বললো,তাইলে এখন থাইকা এই চাবি আপনার কাছেই থাকবো নয়া ম্যাডাম।শায়লাকে সে লিফটের দিকে এগিয়ে নিলো। শিহাবও এগিয়ে গেলো। বিল্লাল আশ্চর্যান্বিত হয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ওরা দুজনে লিফটে উঠে, শিহাব বাটন চার'এ প্রেস করলো।দুজনে খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো। শিহাব শায়লাকে হাতের বাঁধনে জড়িয়ে নিলো।লিফটের ভেতরের আয়নায় দুজন দুজনকে দেখছিল। শায়লা শিহাবের কাঁধে মাথা রাখলো।  শিহাবের মুখে হাসির ঝিলিক ভেসে উঠলো!  সে শায়লাকে মৃদু টানে আরো শক্ত করে বেঁধে নিলো। এবার দুজনে হাতের বাঁধনে দুজনকে স্পর্শ করে নিলো। কিছুটা ক্ষণের এই স্পর্শ  যেন আরো গভীরের বন্ধনে বেঁধে নিলো। কত পাওয়া না পাওয়ার দ্বিধা দ্বন্দ্বের  আজ অবসান হলো।দুজনে দুজনকে নিবিড় ভাবে জড়িয়ে নিলো। চার তলায় লিফট থামতেই দুজন বেরিয়ে  এলো। শিহাব শায়লাকে ইশারায়  তার  নিজের হাতে ঘরের চাবি দিয়ে শিহাবের ফ্ল্যাটের দরজার তালা খোলার জন্য বুঝালো। শায়লা ভেতরে এক  অভাবনীয়  আনন্দে শিহাবের বুকে মুখ লুকালো। শিহাব শায়লার  মুখ তুলে চোখের ভাষায়  এই ঘরের অধিকার বুঝিয়ে দিলো। শায়লা চাবি  দিয়ে লক খুলতে লাগলো। শিহাব বিষয়টি খুব আনন্দ নিয়ে দেখছিল।শায়লা আজ তার নিজের হাতে ফ্ল্যাটের তালা খুলছে! শিহাবের কাছে তা যেন এক অনন্য প্রাপ্তি। কোনদিন এই ব্যাপারটি  আসলেই সত্য হবে শিহাব তা কল্পনাও  করতে পারেনি, তা শুধু স্বপ্নই দেখেছে। শায়লা দরজা খুলে শিহাবকে ভেতরে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানাতেই শিহাব  মুখে হাসি ছড়িয়ে নিজের ঘরে প্রবেশ করলো। অনেক দিনের চেনা ঘরে আজ তার অন্যরূপে প্রবেশ ! আজ আর  ঘরে সে  একাকী  নয়।আজ সাথে শায়লা আছে। আর সে  আজীবনের জন্য থাকবে। শিহাব ঘরে ঢুকতেই শায়লা দরজা লাগিয়ে ফিরলো। শিহাব ড্রইংরুম পেরিয়ে বেড রুমে ঢুকে শায়লাকে ভেতরে ডাকলো। শায়লা শিহাবের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো, শিহাব শায়লার দিকে তাকিয়ে বললো, শায়লা তুমি জানোনা গতকাল সন্ধ্যা থেকে রাত অব্দি কি এক অনিশ্চয়তার মধ্যে কেটেছে। সব শেষে  তোমাকে পাওয়া আমার জীবনের সব দুঃখকে ভুলিয়ে দিয়েছে। আমি তোমাকে পেয়ে ভীষণ সুখী হতে চাই,ভীষণ। আমাদের বাকি জীবনে থাকবে শুধু হাসি আনন্দের ছড়াছড়ি। আমাদের মাঝে থাকবে না কোন দুঃখবোধ আর ভুল বুঝাবুঝি। শায়লা শিহাবকে আশ্বস্ত করলো,তুমি নিশ্চিন্ত থাকো শিহাব, আমি তোমার বাকী জীবন সুখ আর ভালোবাসার রঙে রাঙিয়ে দিবো। শিহাব শায়লাকে কাছে টেনে নিতেই শায়লা বলে উঠলো, তবে আরেকটা খুবই জরুরি কথা ভুলে গেলে চলবে না শিহাব। শিহাবের চোখে জিজ্ঞাস্য ভেসে উঠলো! জরুরি  কি কথা ? আমার কোন ভুল হলো ? শায়লা এবার শিহাবের দিকে রাগত চোখে তাকালো।
কেন ? আরাফের কথা। আরাফকে আমাদের কাছে নিয়ে আসতে হবে। সে কথা ভুলে গেলে ? 
শিহাব একেবারে থমকে গেলো। আরাফের প্রতি বরাবরই শায়লার এমন মায়াভরা ভালোবাসা শিহাবকে অনেকটাই নিশ্চিন্ত করে। শায়লা আবার বলে উঠলো, জানো শিহাব, আরাফকে আমার ভীষণ কাছে পেতে ইচ্ছে করে।কেমন মায়াকাড়া মুখটা ! আরাফের কথায় শিহাবের ভেতরে চঞ্চলতা খেলে গেলো। সে শায়লাকে বললো, আরে নাহ,তা ভুলবো কেন ? তাহলে চলো,আজই আরাফকে নিয়ে আসি। শায়লা মাথা ঝুঁকিয়ে তাতে সায় দিলো। কিন্তু আরাফের জন্য কিছু কেনাকাটা করতে হবে। আরাফের জন্য আমি নিজে হাতে ঘর সাজাবো। শায়লার কথায় শিহাবের ভেতরে শায়লার প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ অনুভুত হলো।
তবে এখন একটা আব্দার আছে !  
শায়লা চমকে উঠলো !  এখন আবার কি আবদার ? শিহাবের চোখের দৃষ্টিতে দুষ্টুমির আভাস। এবার শায়লা নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইছে। শিহাব তাকে বেশ শক্ত করে ধরে বললো,আরে, অন্য কি ভাবছো তুমি! এখন ওসব কিছু চাই না, সেটা আজ রাতের জন্য তোলা থাকবে। আমার নিজের ঘরে তোমার আমার প্রথম বাসর, সেটা কি এমন বর্ণহীন হবে। সেটার জন্য অন্যরকম প্রস্তুতি নিতে হবে। এখন আপাতত আমি তোমার হাতের ছোঁয়ায় এক কাপ চায়ের স্বাদ নিতে চাইছি। আর বাকীটা তোলা থাকবে রাতের জন্য।
উহ ! এই কথা ! শায়লা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। তক্ষুনি তার মনের অর্ধেক অংশ রান্নাঘরের দিকে ছুটে গেলো। মেয়েরা বোধহয় এমনি হয়।স্বামীর কোন চাওয়া পুরণ করতে এক নিমেষে জাদু করে তা হাজির করতে চায়।
শায়লা রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলো। দরজায় কলিংবেল বেজে উঠলো।  শিহাব উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো।
দরজায় কেয়ারটেকার দারোয়ান দাঁড়িয়ে হাতে একটা পোস্টাল প্যাকেট। শিহাবকে দেখিয়ে বললো, স্যার এইমাত্র এইটা আসলো।আপনি বাসায় আছেন তাই নিয়া আসলাম। শিহাব প্যাকেটটি গ্রহন করলেও  বিল্লালের কাচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে থাকায় শিহাব  তার হাতে একটা একশত টাকার নোট  দিলো। কিছু কিনে খেয়ো, বলতেই বিল্লালের মুখে বিশাল এক হাসি খেলে গেলো ! তবে শিহাব বেশ চিন্তিত মুখে প্যাকেটটি হাতে নিয়ে উলটে পালটে দেখতে লাগলো। দ্রুতই তা খুলে ফেললো। ভেতরের  কাগজ খুলতেই শিহাব ভীষণ চমকে উঠলো !  
রিশতিনা শিহাবকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়েছে।এবং লিখেছে খুবই আরজেন্ট ! তবে কি গতরাতে রোমেলের কলের কথাগুলো সত্য ছিলো।রিশতিনা ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে তারপর সুইসাইড  করেছে ? যদিও শিহাবও এমনটিই ভাবছিলো। কাল পরশুর মধ্যেই রিশতিনাকে ডিভোর্স দেয়ার প্রসেস শুরু করবে। ভালোই  হলো রিশতিনাই  তা করে দিলো। হঠাৎই  প্যাকেট টি থেকে একটা পোস্টাল কার্ড বেরিয়ে এলো। শিহাব দেখলো সেখানে টেমস নদীও নদী তীরের সুন্দর প্রকৃতির দৃশ্য।  শিহাব  অপরদিকে তা উল্টাতেই রিশতিনার বাংলা হাতের লেখায় কিছু লেখা দেখতে পেলো। শিহাব ড্রইং রুমের সোফায়  বসলো। কার্ডটি হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলো, কার্ডটিতে আজ থেকে পাঁচদিন আগের তারিখ দেয়া। তবে কি শায়লা এখনো দেশে ? এখানে থেকে ডিভোর্স প্রক্রিয়া চালাচ্ছে ! সম্ভবত রোমেল তাকে সব্রকম সহায়তা করছে। শিহাব কার্ডটি পড়তে লাগলো, শিহাব,তোমাদের নতুন জীবনের জন্য অভিনন্দন জানাই।তুমি তোমার মনের মত কাউকে খুঁজে পেয়ে তাকে জীবন সঙ্গী করতে যাচ্ছো এতে আমি যত কষ্টই পাইনা কেনো তবুও আমি আনন্দিত। তোমাকে আমি সুখী করতে পারিনি কিন্তু অন্য কারো মাঝে তুমি সুখ খুঁজে পেয়েছো, এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া। শুধু অনুরোধ আমার সন্তান, আমার রিয়াজকে তোমরা বাবামায়ের পূর্ণ স্নেহ দিয়ে বড় করবে। আমি দূর থেকে এতেই পূর্ণ হবো।
ডিভোর্স পেপারে দ্রুতই সাইন করে দিও। এরপর আমার ভিন্ন জীবনের শুরু,আর তা হতে পারে নতুন অন্য কারো সাথে অথবা অনন্ত জীবনে মহাকালের দিকে। তোমরা ভালো থেকো।রিশতিনা।
শিহাব বেশ কয়েকবার লেখাগুলো পড়লো।রিশতিনার জন্য মনটা কেঁদে উঠলো। তবে সে নিরুপায়।আর পিছনে গিরতে চায় না সে।তবে হ্যাঁ,রিশতিনার রিয়াজ,শিহাবের আরাফ আজ শায়লার সবচেয়ে আগ্রহের একজন। সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারি। শিহাব কার্ডটি প্যাকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে বেড রুমে চলে এলো। সে ওয়ারড্রোবের উপরে তা রেখে বারান্দায় গিয়ে বসলো। শিহাব গভীর ভাবনায় রিশতিনার অতীত স্মৃতিতে হারিয়ে গেলো। 
শিহাবের রান্নাঘরের বিশাল জানালাটি শায়লার ভীষণ পছন্দের। সেদিকে তাকিয়ে আকাশে মেঘের ওড়াওড়ি দেখতে দেখতে শায়লা উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।শায়লার তার মায়ের কথা খুব মনে পড়তে লাগলো। শায়লার চোখ অজান্তেই জলে ভরে উঠলো। 
সে ভাবলো, কল করে মায়ের সাথে  কথা বলবে।নিশ্চয়ই তার জন্য খুব  কান্নাকাটি করছে। শায়লা নিজেকে সামলে নিলো।সে   চা বানানোর জন্য  চুলার দিকে এগিয়ে গেলো।কেটলিতে চায়ের পানি বসিয়ে ট্রেতে দুটো চায়ের কাপ সাজয়ে নিলো। ফুটন্ত পানিতে সামান্য  চিনি দিয়ে শায়লা টিব্যাগ পাশেই দেখতে পেলো। দুই কাপে দুটো টি ব্যাগ রেখে শায়লা গুড়া দুধের খোঁজে কিচেন ক্যাবিনেট খুলতেই তা সামনেই পেয়ে গেলো। শায়লা  তা নামিয়ে নিয়ে একটা চায়ের চামচ হাতে নিলো।  ফুতন্ত পানি টিব্যাগের কাপে ঢেলে নিয়ে শায়লা গুড়া দুধের কৌটা খুলতেই বেশ চমকে গেলো !  একটা গোলাপী রঙের কাগজ সেখানে ভাজ করে রাখা। শায়লা ভীষণ অবাক হলো ! সে কাগজটি দ্রুতই বের করে ভাঁজ খুলে নিলো। ভেতরে বেশ সুন্দর হাতের লেখায় একটা চিরকুট!  এবং তা শায়লাকে সম্বোধন করেই লেখা ! শায়লার চোখ বিস্ময়ে বিস্ফারিত হলো। সে গোগ্রাসে লেখাটি
পড়তে লাগলো। শায়লা, আমি রিশতিনা। লেখাটি পেয়ে হয়তো অবাক হচ্ছেন।এখানে এইভাবে পেয়ে। আপনাকে পেতে আমি আর কোন পথ খুঁজে পেলাম না।তাই এভাবে। আর শিহাবে চা খুব পছন্দের, আমি জানি, আপনাকে যখন চা বানাতে বলবে তখন এটা দেখতে পাবেন। সেদিন  জিগাতলার বাসায় আপনার উপস্থিতি আমি বুঝতে পেরেছি আর রোমেল ভাইয়ার কাছ থেকে আপনার নামটি জেনেছি। আপনাকে পেয়ে শিহাবের মন থেকে আমার নামটা মুছে গেছে,সে আমাকে ভুলে গেছে, আর এতেই আমি বুঝে নিয়েছি আপনার ভালোবাসার শক্তি আমার চেয়েও বেশী।তাই তো আমি নিশ্চিন্ত হলাম।তবে আপনাদের কাছে আমার রিয়াজ, মানে আপনাদের আরাফকে রেখে গেলাম।শুধু অনুরোধ রইল, রিয়াজকে মায়ের আদর স্নেহ ভালোবাসায় বড় করবেন। আমি যেখানেই থাকি আমি এতেই সুখ খুঁজে পাবো।আপনাদের নতুন জীবনের জন্য অভিনন্দন রইল।
শায়লা চিঠিটা পড়ে কিচ্ছুক্ষণ  একেবারে নীরব,নিথর  নির্বাক হয়ে রইল। নিজেকে অপরাধী ভাবতে লাগলো।আরাফকে তার মায়ের সংস্পর্শ থেকে বঞ্চিত করলো। পরক্ষণেই সে ভাবলো, কিন্তু সেওতো আরাফকে ভালোবাসে।আরাফের কথা মনে পড়তেই তার শিহাবের কথা মনে পড়লো !  তার চায়ের কথা খেয়াল হলো। শায়লা চিঠিটি ক্যাবিনেটের ড্রয়ারের ভিতর রেখে চায়ের ট্রে নিয়ে  ঘরে গিয়ে শিহাবকে খুঁজতে লাগলো। শিহাবকে ঘরে না পেয়ে সে বারান্দায় এগিয়ে যেতেই দেখলো,শিহাব বেশ বিষন্ন মুখে বারান্দায় বসে আছে। শায়লা চায়ের ট্রে টেবিলে রেখে, শিহাবের কাছে জানতে চাইলো,তার কিছু হয়েছে কিনা ? 
শিহাব গভীর ভাবনা থেকে এ জগতে ফিরে এলো। শায়লা তার হাতে চায়ের কাপ তুলে দিতেই  শিহাব শায়লার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল।যেন বোবা কান্নায় ভেতরে কিছু একটা বয়ে যাচ্ছে। শায়লা বুঝতে পারছে না, তার ভেতরেও কেন এমন একই অনুভুতি বয়ে যাচ্ছে। সে শিহাবের মাথায় হাত বুলিয়ে অস্ফুট স্বরে জানতে চাইলো, তোমার কি হয়েছে ?  আমাকে কি বলা যায় ? তুমি কিছু একটা নিয়ে কষ্ট পাচ্ছো। এবার শিহাব শায়লার কাছে তার মনের আবেগের কথাকতা যেন উগড়ে দিলো। শায়লা,  রিশতিনা অনুরোধ করেছে আমরা দুজন যেন আরাফকে বাবা মায়ের আদরে বড় করে তুলি। তাতেই সে সুখী হবে।
শায়লা বেশ অবাক হলো ! এ কথা শিহাব কিভাবে জানলো ? তবে কি শিহাব তার চিঠির কথা জানে ? তবুও শায়লা শিহাবের কাছে জানতে চাইলো, এ কথা কখন বলেছে ? সে কি এখন কল করেছিলো ? 
না, সে আমাকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়েছে আর তোমার আমার নতুন জীবনের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছে। 
শায়লা শিহাবের খুব  ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ালো।শিহাবের মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করলো। তুমি ভেবোনা, আরাফ আমার কাছে  সন্তান হয়েই থাকবে। চা খেয়ে চলো, স্মরা আরাফকে আজই আমাদের কাছে নিয়ে আসি। আজ আমরা রাতে একসাথে বাইরে খাবো।আরাফকে নিয়ে সারাদিন ঘিরে বেড়াবো। আরাফকে অনেক খেলনা কিনে দিবো। নতুন পোশাক কিনে দিবো। শায়লার কথাগুলোতে শিহাব যেন প্রাণ ফিরে পেলো।তার চোখ সুখ স্বপ্নে চকচক কতে উঠলো!  সে শায়লার বুকের মাঝে নিজেকে  আড়াল করে নিলো।আরাফের মত সেও একজন শিশু হয়ে শায়লার মাঝে আশ্রয় খুঁজছে।
শায়লা চায়ের ট্রে রান্নাঘরে রেখে ক্যাবিনেটের ড্র‍্যার খুলে চিরকুটটিকে বলে এলো, রিশতিনা তোমার রিয়াজ, আজ থেকে আমারও রিয়াজ হয়ে, এক মূল্যবান  মানিক রতনের আদরে থাকবে। 
শিহাব নবশক্তি নিয়ে বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকতেই ওয়ারড্রোবের উপরে রাখা প্যাকেটটির দিকে তাকিয়ে, মনে গভীরে ভেবে নিলো, রিশতিনা আরাফকে নিয়ে তুমি একেবারেই ভেবোনা। শায়লা ওর জন্য চিরকাল মা হয়েই থাকবে। 
রান্নাঘর থেকে শায়লা বেরিয়ে এসে শিহাবকে ওয়ারড্রোবের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শিহাবকে স্বাভাবিক কর‍্যে বলে উঠলো, তুমি কিন্তু এখন সেই মেরুন রঙের শার্টটি পড়বে।
শিহাবও নিজেকে ভাবনা থেকে সরিয়ে এনে বললো, আমরা এখন আর বাইক নিয়ে বেরুচ্ছি না। আমরা উবারে যাবো। আসার সময় আরাফ থাকবে আমাদের সাথে।তার কত জিনিসপত্র আনতে হবে।
শায়লা শিহাবের দিকে এগিয়ে গিয়ে হাত ধরতেই শিহাব এক টানে শায়লাকে তার বুকের মাঝে মিশিয়ে নিলো।





                                            (সমাপ্ত)
                                            ধন্যবাদ

মমতা রায় চৌধুরী ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ১৬৩




LOVE

কবি আমির হাসান মিলন এর কবিতা "নীল ইচ্ছে"




নীল ইচ্ছে

আমির হাসান মিলন 


কোন আলো কি এসেছিলো এখানে 
বিষণ্ণতার কুৎসিত অন্ধকার মাড়িয়ে ? 

জানি উত্তর পাবো না , 
হয়তো ইচ্ছে করেই বলবে না! 

চোখে আমার লাল রক্তের উদ্ভাস, 
আজ বুকের ভিতর অহরহ ভাঙ্গনের আওয়াজ   
যা কিছু বাঁচার প্রেরণা যোগাতো আমায় , 
সব কিছু বিলুপ্ত হবার পথে 
গলে গলে যাচ্ছে  নর্দমার দিকে। 

আজ নয়তো কাল মৃত্যু ধীরে ধীরে পাথরের মতো 
পর্বতের উঁচু শৃঙ্গ হতে গড়িয়ে পড়বে নিচে  
নৈশব্দের যাঁতাকলে মিশে যাবে জীবনের সব কোলাহল। 

তুমি জানলে না নীলাঞ্জনা , 
ওরাই কেঁদে-সেধে এই পরিণতি চেয়েছিলো।

কবি নাহিদা আক্তার রুনা এর কবিতা  "আমাকে পেয়েছিলো কেউ"





আমাকে পেয়েছিলো কেউ
নাহিদা আক্তার রুনা 



আমাকে পেয়েছিলো কেউ 
খুব করে পেয়েছিল বহুদিন, 
তোমার মতোই বলেছিল কেউ
রাতের পেঁচার ডাকে 
জ্বলে উঠা তারার সাক্ষীতে,
হাত দুটো ধরেছিলো কেউ।
ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠা ক্ষণ
সাক্ষী ছিলো ঝরাপাতার বন,
সাক্ষী ছিলো পৌষালী চাঁদের মায়া 
ঝাউগাছের পা ছোঁয়া ছায়া,
খুব করে উড়েছিলো আলো
ঝিঁঝি পোকারা গান গেয়ে গেলে
বুকের সেতার বাজে এলোমেলো,
সবুজ ঘাসের বিছানো গালিচায়
আমাকে পেয়েছিলো কেউ।
খুব করে পেয়েছিলো বহুরাত
তোমার মতোই ভাঙা সুরে, 
ঢেউয়ের মতোন পা চুমে দিয়ে
সমুদ্রের বুকে ডেকেছিলো কেউ।
অতঃপর দিগন্তের ওপার থেকে
কে নিলো তারে ডেকে,
পড়ে রইলো পৌষালি চাঁদ 
আর ভাঙা কিছু রাত,
পড়ে রইলো ঝরা পাতা ঝিঁঝিঁর ডাক
ট্রেনের সেই হুইসেল,বুকের সেতার।
তোমারই মতো বলেছিল কেউ 
আমৃত্যু আকাশের বুকে নীলের মতো
ধরে রাখার প্রতিজ্ঞা যতো,
প্রতিজ্ঞারা উড়ে গেছে পাখি হয়ে 
সুরভিত ক্ষণ পেরিয়ে।
সে কথা তুমি বলোনা আর 
এখনো চোখে সমুদ্রের ঢেউ,
আমাকে পেয়েছিলো কেউ
বহুদিন বহুরাত।

কবি রাজেশ কবিরাজ এর কবিতা "দুঃখও "




দুঃখও
রাজেশ কবিরাজ

আমি সব সময় দুঃখকে আপন ভেবেই 
ঠাঁই দিয়ে রেখেছি মনের আসনে,
এখন দেখি দুঃখ ও আমাকে পর ভেবে 
ফাঁকি দিয়ে চলে যাচ্ছে অনেক দূরে !
আমি সেই একা আগের মতই -
নিজের সাথে কথা বলি আপন মনে ।
আসলেই আমার তো আপন বলে
কোন প্রিয় মানুষ ছিল না কোনদিন,
যে তারা দুঃখ দেবে আমাকে অতি যত্নে !
আমার বিপদে ছুটে আসবে তারা,
আমাকে বলবে কি হয়েছে তোমার ?
ভালোবেসে আমাকে নেবে বুকে টেনে !
আমার একটা পরিপূর্ণ দিন কাটে বোবার মত,
নিঃশব্দে  রাত পার হয়, হৃদয়ে 
জমে থাকা হাজার কষ্ট বরফের মতো বুকের ক্ষত ;
প্রকাশ করতে পারিনা সবার সামনে ।
সেই সহজ অধিকার আমার নেই ,  তাই 
তাকে অতি যত্নে লুকিয়ে রেখেছি খুব গোপনে ।