উপন্যাস
টানাপোড়েন ২০৫
মনোজের টেনশন
মমতা রায়চৌধুরী
কাল সকাল সকাল স্কুলে যেতে হবে ওখান থেকে কলেজের অনুষ্ঠান ,তাই খামোখা মেজাজ বিগড়ে লাভ নেই ।শান্ত মনে ঘুমোতে যেতে হবে।
তবে একটা কথা ঠিক এরা যত আমার সাথে লড়াই করবে আমার উপন্যাসের চরিত্র ততবেশি কার্যকরী হবে, কাহিনীর ঘনঘটা থাকবে । এ রা
বুঝতেই পারছে না ,আখেরে আমারই লাভ হচ্ছে।
তবুও এত তীর্যক বাক্যবাণ সত্যি বুকে বিঁধে যায়।
কালবৈশাখী ঝড় দেখে তো প্রথমে ভয়ই লাগে এরপরই তো পৃথিবীতে বৃষ্টির ঝরনা হয়ে নেমে আসে। পৃথিবী শস্য-শ্যামলা হয়ে ওঠে , ধরিত্রীবাসী ও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তীব্র দাব, দগ্ধ থেকে। তাই রেখা ভাবল না ভয় নয়, বরং ধৈর্য ধরতে হবে।
"ওরে মেঘ দেখে তুই করিস নে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে"।
"আমাকে সান্তনা দেবার একটাই পথ যে পৃথিবীতে সব মানুষ সমান হয় না। ধৈর্য ধরতে হবে ফল নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। "ধৈর্য ধরো রেখা, ধৈর্য ধরো।
মা বলতেন "সবসময় সৎপথে থাকবি সঠিক কর্ম করবি, দুঃখ বেশি আসবে, কিন্তু লাভ তোরই হবে?"
এসব ভাবতে ভাবতেই আলমারিটা গুছাচ্ছিল
আর মনোজ এর উপর খুব রাগ হচ্ছিল। মনোজ আলমারি থেকে যে জিনিসটা নেবে সেটা তো সঠিক জায়গায় রাখবেই না বরং তার সঙ্গে বাকিগুলোকে মিশিয়ে রেখে দেয়। কোন কাজটাই ঠিক করে করবে না। এখন সেসব গোছাতে ও এখনো আধঘন্টা সময় লাগবে।
এরমধ্যে মনোজ হাঁক দিল "কি গো এক কাপ চা হবে?"
রেখা একটু বিরক্ত হয়ে বলল" কি গো একটু পরে ডিনার করবে, এখন চা?"
হাতের ইশারায় পরিমাণটা অল্প দেখিয়ে মনোজ বলল 'একটু খাই খুব ইচ্ছে করছে।"
"তোমার ইচ্ছেগুলোর মূল্য দিলে তো সেটা শরীরের পক্ষে ভালো নয় বল?"
"আচ্ছা ঠিক আছে, আজকে দাও না।"মিনতির সুরে বলল।
মনোজ এমনভাবে রেখাকে রিকোয়েস্ট করল রেখা চা না করে পারল না।
রেখা চা করতে রান্নাঘরে গেল ।এর মধ্যে তুতু রেখার পেছনে পেছনে গেলো।
মনোজ বলল" দেখো তোমার পিছু নিয়েছে
কে ?"
রেখা পেছন ফিরে তাকিয়ে বলল "তুমি আমার পেছনে পেছনে আসছো কেন? তোমাদের তো খাইয়ে দিয়েছি বাবা "
রেখার পেছনে পেছনে যেতে যেতে আবারো কিউ কিউ আওয়াজ করছে, তখন রেখা বুঝল হয়তো ওর হিসু পেয়েছে ,মনোজকে বলল "অ্যাই কলাপসিবল গেট টা খুলে দাও, তুতু বাইরে যাবে?"
মনোজ বলল "তোদের জ্বালায় একটু বসে শান্তি নেই আয়, আয়, আয়।"
মনোজ গেটটা খুলতেই রেখা বলল" যাও ,যাও গেট খুলে দিয়েছে। গেটের আওয়াজ পেয়ে তুতু ছুটলো ।মনোজ তাকিয়ে দেখল সত্যি ,সত্যিই ও ছুটে গিয়ে রাস্তার ধারে গিয়ে বাথরুম করল।
মনোজ বললো "বাপরে কি ট্রেনিং দিয়েছো গো?
রেখা বলল ট্রেনিংআর কোথায় দিতে পেরেছি গো ,তাই যদি হতো তাহলে কি রোজ এত অশান্তি হতো বাড়িতে ।,"
"ছাড়ো তুমি ওদের কথা ,যার দেখতে নারি তার চলন বাঁকা। ওরা ওদের কে সহ্য করতে পারে না তাই ওরা যদি একটু এদিক ওদিক ওদের ছায়া দেখতে পায় ,তাতেই ওদের জ্বলন শুরু হয়ে যায় এই বলতে বলতে গেটটা লাগাচ্ছে। এমন সময় ফোন বেজে উঠল।
রেখা বলল 'দেখো তোমার ফোন বেজে উঠেছে।এই যে তোমার চা রইল ।'
" দেখনা ফোনটা কে করেছে?"
" আরে বাবা ,তোমার ফোন তুমি ধরো ।"
এরমধ্যে রিং হয়ে কেটে গেল কেটে গেল ।
মনোজ বলল "যার দরকার সে আবার করবে কোন চিন্তা নেই। এবার চায়ে চুমুক দিল। কি আরাম পাচ্ছি ।"
" হঠাৎ এত চায়ের নেশা হচ্ছে কেন? "
"আর বোলো না, অফিসে সরকার দা চাখোর মানুষ যতবার চা খাবে আমার কাছে নিয়ে এসে দিয়ে যাবে।"
এবার আবার মনোজের ফোন রিং হতে লাগলো মনোজ ফোনটা তুলে বলল" হ্যালো "
অপরপ্রান্ত থেকে বলল "হ্যালো ,কিরে মনু বলছিস?"
" হ্যাঁ বলছি ।কে মা ?প্রণাম নিও ।"
"হ্যাঁ বাবা, তোরা ভালো আছিস সবাই ।"
"হ্যাঁ ভালো আছি তোমার শরীর কেমন?"
" এইতো চলছে এখন বয়স হচ্ছে বুঝতেই পারছিস ।আচ্ছা শোন আমরা পরশুদিন যাব আমরা বলতে তোর দিদি ,আমি যাব ।এখন তোর জাইবু যাবে কিনা এখনো জানা হয়নি ।"
"ঠিক আছে। তাই হবে।"
রেখা বলল "কার ফোন গো?"
'কার আবার মায়ের ফোন। মায়েরা পরশুদিন আসছে ।'
রেখা বলল"কোন আসবে কখন খাবার খাবে সেটা তো শুনতে হত?'
"ঠিক আছে কালকে জেনে নেব।"
"আবার আরো কথা শুনতে হবে ।বাড়িতে এমনি টিকতে পারছি না ওদের নিয়ে ।এবার আবার কি হবে কে জানে?"
মনোজ বলল' অত চিন্তা করলে হয়না ।ভালো কাজ করলে প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়েই করতে হয় ।সেটা মাথায় রেখো।"
"সবই তো বুঝি কিন্তু আমিও তো রক্ত মাংসে গড়া মানুষ কতক্ষণ সহ্য করব?"
'আমরা প্রত্যেকেই রক্ত মাংসে গড়া মানুষ। তবু তার মধ্যে তো ব্যতিক্রমী থাকে। তুমি তো ব্যতিক্রমী। তোমাকে তো এটা মানতেই হবে বল।"
"ঠিক আছে তুমি চা খাও তারপরে কিন্তু ডিনার লাগাবো।"
"আমি এত তাড়াতাড়ি ডিনার খেতে পারব
না ।"
"কিন্তু তুমি তো জানো আমার কালকে স্কুল আছে কতক্ষন বসে থাকবো বলো? তাছাড়া আমার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না ।'
"এটা কি হলো সেদিন তুমি পিন্টুকে বলো
নি ।"
' হ্যাঁ বলেছি তো ।ডাক্তারবাবুর সময় ছিল না।
" ও আচ্ছা।"
"ঠিক আছে তুমি খেয়ে শুয়ে পড়ো। আমার খাবারটা টেবিলে ঢাকা দিয়ে রেখো, আমি আমার সময় মত করে খেয়ে নেব।"
"তুমি রাগ করে বলছো?"
"না না রাগ করবো কেন?'
এটা তো সত্যি কথাই সারাদিন বাড়িতে থাকলে তো একটু বিশ্রাম পাওনা ।তারপর লেখার চাপ বেড়েছে শরীরকেও তো একটু খাদ্য দিতে হবে।'
"এবার ডাক্তার আসলে কিন্তু আবার দেখিয়ে নিও।'
"হ্যাঁ সে তো দেখাবো ই।"
রেখা খেতে খেতে বলল' তবে একটা কথা বলি শোনো ।"
মনোজ শুনছে কিনা কোন রেসপন্স করলো না রেখা বলল " টিভির সাউন্ড একটু কমাও না গো একটা কথা বলছি তো তোমাকে ।'
"হ্যাঁ ,কী বলছিলে বলো ।"
*বলছি টিভির সাউন্ড টা একটু কমাও।"
"হ্যাঁ কমিয়েছি ।কি বলছিলে বলো।'
" বলছি এবার কিন্তু মাসি বলেছে, মাসিকে যদি মা ঐ রকম কোন কথা বলে মাসি কিন্তু কাজ করবে না?"
"না কাজ করবে না করুক অনেক কাজের লোক পাওয়া যাবে।"
"অনেক কাজের লোক পাওয়া যাবে প্রত্যেকের সঙ্গে যদি এরকম করে তখন তুমি কাকে পাবে?"
'সে তো বুঝতে পারছি কি বলবো বলো তো?"
"মাকে বলবে ও রকম যেন কোন কথা না বলে?'
"তুমি কি জানো না যে আমি তাকে বলি কি বলি না। ওদের স্বভাব ওটা ও কাজ করেই যাবে।
" ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে "জানো না?"
তুমি তোমার সাথে ভালো করে পরিমনি সবুজ মাসিকে একটু বুঝিয়ে ব'লো না ,মায়ের যতো বয়স হচ্ছে। একটু মানিয়ে নিতে।'
রেখা এবার একটু রেগে গেল ।ক্রুদ্ধ হয়ে বলল "এই তুমি কি ভাবো বলতো সবাই মানিয়ে
নেবে ।শুধু তোমার মা পারবে না মানাতে, তাইতো?"
মনোজ বলল" অকারনে তুমি রেগে যাচ্ছ।"
"আচ্ছা শোনো আমি তো বুঝিয়ে বলবই
মাকে । তুমিও একবার মাসিকে বোলো, মা এর কথাটা যেন না ধরে?"
বকবক করতে করতেই আবার মনোজের ফোন বেজে উঠলো ।
রেখা গজগজ করতে করতে টেবিল থেকে বাসন টা তুলে নিয়ে রান্নাঘরের সিংক এর উপর রাখলো।
মনোজ ফোনটা তুলে বলল "হ্যালো"
"হ্যাঁ বাবা মনু ,বলছি' শোন না, তোর জাইবু যেতে পারে ওখানে গিয়ে কিছু টেস্ট করাবে ।কদিন হয়তো থাকবে সেরকম একটু ব্যবস্থা করে রাখিস বাবা.।
ঠিক আছে।
রেখা কোন কথা না বলে ঘরে গিয়ে হাতে পায়ে একটু ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে নিলো আর মুখে নাইট ক্রিম ।তারপরে শুয়ে পড়ল।
মনোজ বুঝলো রেখার অভিমান হয়েছে আর কথা বাড়ালো না।
মনোজ মনে মনে ভাবল রেখার শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না তারপর এতগুলো লোক আসবে। তাদের আবার নানারকম বায়নাক্কা, পান থেকে চুন খসলেই রেখাকে কথা শুনতে হবে। কদিনের জন্য রাঁধুনি রেখে রান্না করালে সেটাতেও দশ ঘরের বউ থাকতে বাইরের লোকের হাতে রান্না
"কি করবে ? "এই ভেবেই মনোজের ভেতরে ভেতরে টেনশন শুরু হয়ে গেল.