১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

মমতা রায়চৌধুরী'র উপন্যাস "টানাপোড়েন"৪

অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করবার মতো আকর্ষণীয়  মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন" পড়ুন ও অপরকে পড়তে সহযোগিতা করুন  




টানাপোড়েন 

দ্বন্দ্ব


                                    জকে বিপাশাকে ব্যাংকে যেতেই হবে। রোজই দীপকের কাছে ঝাড় খেতে হয়। কথা শুনতে শুনতে কানটা ঝালাপালা হয়ে গেল। 'আমি না থাকলে তোমার যে কি হবে? কে জানে? কি করতে লেখাপড়াটা শিখেছিলে? নাকি টুকে পাশ? ' এরকম হাজারোতর অভিযোগ। এজন্য বিপাশা ঠিক করেছে আর দীপকের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকবে না। এবার নিজেকে প্রমাণ করার সময় এসেছে ।সে দেখিয়ে দিতে চায় ইচ্ছে করলে সব পারা যায়। কিন্তু কিছু কিছু সময়  মেয়েরা  সবকিছু  একজন বিশ্বস্ত কারও  ঘাড়ের উপর চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে দিন যাপন করতে চায়। আর সেটা দীপকের কাছে একটা উপহাসের পাত্র..? শুধু তাই নয় আজকাল ওর বন্ধুবান্ধব সকলের সামনেই যেন কেমন একটা অপদস্ত করতে চায়। একদিন তো ওর বন্ধু বিমল  বলেই ফেলল -'কি যে বলিস না? বৌদি পারবে না কেন? আসলে কোনদিন তো ঘরের বার হয়নি একা একা। হয়তো মনের ভেতর একটা ভয় কাজ করে এজন্য। ' আজকে বিপাশা একটা রেকারিং বই খুলতে গেছে ব্যাংকে। তাও নিজের হাত খরচের টাকা বাঁচিয়ে সেটা মাসে মাসে জমাবে ঠিক করেছে এবং বছর শেষে দীপককে সে একটা চমক দিতে চায়। যেমন ভাবনা তেমনি কাজ।ব্যাংকে গিয়ে কি ঝক্কি-ঝামেলা রে বাবা কতক্ষন সে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ব্যাংকের ম্যানেজারের হাজারো প্রশ্ন? তার সঠিক জবাব দেয়া। ডকুমেন্টস সাবমিট করা। এরমধ্যে ফটো আনতে ভুলে গেছে। সে ভাবলে  বাড়ি যাবে কেন ?তার থেকে এখন তো কম্পিউটারের যুগ স্টুডিওতে গিয়ে কি সঙ্গে সঙ্গে ছবি পাওয়া যাবে না, নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। যা ভাবা তাই কাজ। ফটো নিয়ে এসে ব্যাংকে আসতে দেখা যায় সে যেখানে লাইন দিয়েছে সেখানে অন্য কেউ জায়গা করে নিয়েছে।কাজে কাজেই আবার তাকে শেষে গিয়ে দাঁড়াতে হয়। সে প্রথমে  তার নিজের জায়গায় দাঁড়াতে গিয়েছিল বটে কিন্তু সেখানে তাকে দাঁড়াতে দেয়া হয়নি। সে ঝগড়াও করে নি ।তাই তো তার যুক্তি ছিল সে তো লাইন ব্রেক করেই গেছে ।তাই তার পেছনে গিয়েই দাঁড়ান উচিত। ওদিকে টুবলু টুকাই এর স্কুল থেকে ফেরার সময় হয়ে গেল। বাড়িতে ফিরে এসে ছেলেরা দেখতে না পেলে কি কান্ড করবে কে জানে? লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কয়েকবার ভগবানকে ডেকে নিল। আসলে বিপদে পড়লেই তো ভগবানকে ডাক দেয়া। বিপদের মধ্যে দিয়ে যেটুকু ডাকা যায়। সারাদিন তো আর ডাকা যায় না ঈশ্বরকে। সেদিন ঈশ্বর তার কথাটা শুনেছ। সাড়ে চারটের মধ্যে সে বাড়ি ফিরে আসতে পেরেছে। টুবলু টুকাই ফিরেছে। ওদের খাবার টেবিলে খাবার দিয়ে ওদের স্কুলের সমস্ত টিচারদের কথা, হোমওয়ার্কের কথা সমস্ত কিছু শুনছিল? টুবলু টুকাই কেমন অবাক হয়ে গেল। এসব কথা তো তার বাবা ,আসলে তার মা তো কখনো শুনতে চায় নি।

আজকে কোন টিচার হোম ট্যাক্স করার ওপর গুড লিখেছেন ইত্যাদি ইত্যাদি।

বিপাশা বলল  'আজ থেকে ওদেরকে‌ বাংলা বিষয়ের দায়িত্বটা ওর মা নেবে।'

 ছেলেরা বলল  -'না,মা। বাবাই তো বরাবর এসব বিষয়গুলো দেখে। তোমাকে আর কিছু দেখতে হবে না ।তুমি বরং যেমন রান্নাবান্না করো ঠিক সে রকমই ক'রো। '

বিপাশা অবাক হয়ে গেল এ যেন ছেলেদের কথা নয় অন্য কারওর শেখানো কথাগুলো তোতাপাখির মতো আওড়াচ্ছে। বিপাশা একটু হেসে বলল  -

'কেন রে, আমি তো বাংলায় এম এ ।আমি তোদের বিষয়গুলো দেখতে পারি না'।

 দুই ভাই দু'জনের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলো ।তারপর বললো  'না মানে ,তুমি বুঝবে নাকি?

 বিপাশা কেমন অবাক হয়ে গেল ।ছেলেগুলোর মনেও যেন গেঁথে গেছে ,ওদের মা রান্না ছাড়া আর কিছুই পারে না। বিপাশার মনেও জেদ চেপে গেল । এবার কড়া শাসনের ধাঁচে বলল -

 'আমি যেটা বলছি আজ থেকে সেটাই হবে।'

 ছেলেরা চুপ করে গেল। বিপাশা আরো বলল "শোন,আজ থেকে সন্ধ্যে ছটায় তোমাদের পড়তে বসতে হবে। রাত নটা অব্দি পড়বে। আধঘণ্টার ব্রেক। টিভি দেখা বন্ধ।'এই বলে বিপাশা নিজের কাজে চলে গেল। টুবলু টুকাইয়ের কাছে আজকে যেন ওদের মা অচেনা ।যেন অন্য কারোর মা। সন্ধ্যে হল। দীপকের ফিরতে ফিরতে রাত্রি আটটা হবে। তার আগে ছেলেদেরকে হোমট্যাক্সগুলো কমপ্লিট করতে হবে। বিপাশা আর ছেলেদের কাছে বসে খাতাগুলো চেক করছে। তখনই নজরে আসে, বাংলা বিষয়ের উপর হোম ট্যাক্স পড়েছে' তোমার জীবনের সেরা দিন।' সম্পর্কে লিখে আনা। আজ বিপাশা নিজে বলে গেল আর ছেলেরা তা নোট ডাউন   করল। অন্যান্য বিষয়গুলিও দেখল। শুধুমাত্র সাইন্সের গ্রুপগুলোকে ওর বাবার জন্য রেখে দিল। দীপক বাড়ি ফিরে দেখল ছেলেরা যে যার পড়ার টেবিলে। একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল -' কিগো, আজকে কী নতুন টিচার রেখেছো নাকি?

 বিপাশা বলল -' কেন? 

না ,ছেলেরা এই সময় তো পড়ার টেবিলে থাকে না। 

বিপাশা দৃঢ়স্বরে বলল -'এবার থেকে থাকবে।'

 দীপক বলল -' তুমি বলছো একথা?

কেন ,তোমার সন্দেহ আছে নাকি? বিপাশা বলল।

 হ্যাঁ, তা তো আছেই। তুমি নিজের উপরই কতটা বিশ্বাস রাখো ,সেটা তো পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য। '

সেই খোঁচা মারা কথা। বিপাশা হজম করে নিল আর ভাবলো সবুরে মেওয়া ফলে। খাবার টেবিলে খাবার দেয়া হলো ।

দীপক দেখল- আজকের রান্নায় একটু অন্যরকম। তন্দুরি চিকেন ,নান পরোটা। দীপক মনে মনে একটু খুশি হলো। কিন্তু প্রকাশ করলো না। বিপাশা ভেবেছিল  'আজকে একটা বেস্ট কম্প্লিমেন্ট ওর কপালে জুটবে। কিন্তু না। শেষে নিজেই জিজ্ঞেস করল ' কিগো ,কেমন হয়েছে?

 হ্যাঁ, খারাপ হয়নি। বলে দীপক উঠে গেল।

 বিপাশা টেবিল পরিষ্কার করে নিয়ে ছেলেদেরকে খাবার টেবিলে ডাকলো। ছেলেরা খাবারটা দেখে অবাক হয়ে গেছে আর খুব তৃপ্তি সহকারে খাচ্ছে।  শেষে থাকতে না পেরে বলেই ফেলল ছেলেরা -', মা কি সুন্দর বানিয়েছ তুমি? আমরা তো ভাবতাম তুমি শুধু বাঙালিরান্না গুলোই ঠিকঠাক পারো। এখন দেখছি মা তুমি এই খাবারগুলো ভালো বানাতে পারো। তুমি আমাদের বেস্ট মম'। 

তাই ?বিপাশা  ছেলেদেরকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে একটু আদর করে দেয়।

এভাবে দিন চলতে থাকে। 

এরপর আসলো সেই বার্ষিক ফলাফল। তাতে দেখা গেল বিপাশা যে বিষয়গুলো ছেলেদেরকে নিজে দেখাতো তাতেই সবথেকে বেশি নম্বর উঠেছে। বাবার দেখানো বিষয়গুলোতে কম পেয়েছে। মনের ভেতরে যে দ্বন্দ্ব ছিল ,যে টানাপোড়েন ছিল, তাদের মায়ের কাছে পড়ে তারা কতটা নম্বর পাবে? একটা সন্দেহ কাজ করেছিল। দীপক ও অবাক হয়ে গেছে। দীপকের থোতা মুখ ভোঁতা হয়ে গেছে। সব বিষয়ে বিপাশাকে আন্ডার এস্টিমেট করার অভ্যাস হয়ে গেছিল। এবার দীপক একটু বিপাশাকে সমঝে চলে। এইতো কদিন আগে দীপকের অফিসে পার্টি ছিল সেখানে প্রথম বিপাশাকে নিয়ে যায় এবং সেখানে বিপাশা এত সুন্দর একটা রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন করে ,তাতে সকলে প্রশংসায় পঞ্চমুখ। দীপক নিজেও জানতো না বিপাশা এত ভালো গান করতে পারে। অথচ চিরকাল বিপাশাকে অন্য সকলের স্ত্রীদের কাছে ছোট করে দেখে এসেছে। ইদানিং বিপাশা টিউশন শুরু করেছেএবং বছর শেষে তার যে ম্যাচুরিটি টাকাটা সেটা দিয়ে দীপক এর জন্য একটা ভালো গিফট কিনেছে। আস্তে আস্তে দীপক দেখছে তার স্ত্রী আজকাল অনেক কিছুই তার সাথে শেয়ার করে না সে অবাক হয়ে যায় এবং বলে সে কি করে টাকা জমালো। বিপাশা জবাব দেয় -' হাত খরচের টাকা বাঁচিয়ে ,আর টিউশন পড়িয়ে। আজকাল ছেলেরা মায়ের প্রতি বেশি ভরসা করে ।এখানেও দীপকের কেমন একটা ঈর্ষা কাজ করে। বিপাশা বুঝে পায়না যখন সব কিছু দীপকের উপর ছেড়ে দিয়েছিল। তখনো তাকে মর্যাদা দেয় নি। আবার এখন যখন সে নিজে স্বনির্ভর হতে চাইছে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাইছে ।তাতেও সে খুশি হতে পারছে না। তবে বিপাশা স্থির করে নিয়েছে ।এভাবে কারোর মন জেতা যায় না। আগে ভুল করেছে। এবার সে যেটা করছে সেটাই করবে। এইতো সেদিন ওর বন্ধু বিমল এসে বলল-

বৌদির মত যদি আমার বৌ টা হতো।দীপ তুই ভাগ্য করে পেয়েছিস।

আগের মত হলে হয়তো ক্রিটিসাইজ করত।কিন্তু এখন আগের মত বিপাশাকে কিছু বলতে পারে না বলে গা টা সারাক্ষণ  রাগে রিরি করে জ্বলতে থাকে।মেয়ে মানুষের এতটা ওড়া ভালো নয়।ছেলোগুলো এখন মায়ের নাওটা হয়েছে।আগেই ভালো ছিল ডমিনেট করা যেত।এখন তো অসহ্য লাগে।

বিপাশা জানে যে ওর স্বামী ওকে কোনদিনই পছন্দ নয় কিন্তু স্বামীর কাছে প্রিয় হয়ে ওঠার জন্য স্বামীর যা যা ভালো লাগে সে সবকিছু করার চেষ্টা করেছে কিন্তু নিট ফল জিরো। সব সময় মনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলেছে কিভাবে দীপকের প্রিয় হয়ে ওঠা যায়। এতদিন তো দীপক বিপাশাকে অনেক আন্ডারএস্টিমেট করেছে ওর দ্বারা কিছুই হবে না। যখন বিপাশা ঘুরে দাঁড়াতে চেয়েছে ও কিছু করতে পারে সেটা প্রমাণ রেখেছে তাহলে কেন দীপকের মনে এত দ্বন্দ্ব? নাকি দীপক নিজেই জানে না সে কি চায়? সহজ-সরল বিপাশা আজ ঘুরে দাঁড়িয়েছে ঠিকই মনের সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে। কিন্তু দীপকের মনের দ্বন্দ্ব কি কাটাতে পেরেছে?



ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন" ৪ ক্রমশ

সঞ্জয় আচার্য





মনা রাখাল


ধুলোতে বাজিয়ে নুপূর চলে গেছে দূর


আহা-হা-হা বাঁয়ে বাঁয়ে—মনা রাখালের দুপুর।



চৈতি মাঠ তারই শোকে পড়ে আছে অভিমানে


ঠিকানা বিহীন ফকিরের মতো এক কোণে।



যে পথে মনা  রাখালের ছায়া পেরিয়ে গেছে


সেই পথে


মেঘের কারুকাজ ভাঙে আর গড়ে।



তারই মাঝে এ পৃথিবী চেয়ে থাকে, কান পাতে


কবে কোন নিভৃত অবসরে


গোরুর ক্ষুরের শব্দ ভেসে আসে সাঁঝের প্রহরে।

aaaabcd

abcd



 

অনুবাদক - সজল কুমার মাইতি


 



এই হোক তোমার বাসনা 

মূল রচনা  - খলিল জিব্রান


প্রেমের কোন আলাদা বাসনা নেই 

প্রেমেই তার পূর্ণতা,

প্রেমই অন্তরের বাসনা

প্রেমেই তার পূর্ণতা।

প্রেমের ধারা ঝরতে থাকে 

ছুটে বেড়ায় নদীর বেগে,

তার সুরের ধ্বনি 

ভেসে বেড়ায় নিশিরাতে।

প্রেমের সেই পেলবতা

যন্ত্রণা তার অনেক,

বিদীর্ন হৃদয় প্রেমে আজ

হৃদয়ক্ষরন আনন্দে ও স্বেচ্ছায়।

অন্য এক নতুন দিনের মতো

ভালবাসায় ডানা মেলে,

ভাঙুক ঘুম নতুন উষার আলোয়

দুপুর শেষে প্রেমের ধ্যানে মগ্ন শুধু থেকো।

দিনের শেষে ফিরে এসে 

শুদ্ধ চিত্তে ভক্তিরসে নিদ্রা গ্রহণ,

হৃদয়ে থাকুক কেবল  প্রিয়ার স্মৃতি 

ঠোঁটে শুধুই সংগীতের স্তুতি।






[ খলিল জিব্রানের জন্ম হয় 1883 সালে লেবাননে। তার জীবনের অনেকটা সময় আমেরিকায় কেটেছে। তিনি একজন লেখক ও শিল্পী। আরবি ও ইংরেজিতে তার অনেক সাহিত্যকৃতি রয়েছে। 1923 সালে তার বিখ্যাত রচনা  ' দি প্রফেট' এর জন্য তিনি খ্যাতির শিখরে পৌঁছন। 1931 সালে তার মৃত্যুর মাধ্যমে এক বিরল প্রতিভার অবসান হয়।]

মূল রচনা 

Let These Be Your Desires

Khalil Gibran

শ্যামল রায়



কোন একদিন


কোন একদিন তোমাকে ছুঁয়ে দেখবো

কোন একদিন তোমার দু ঠোঁটে ঠোঁট দেব

দেখবো কতটা গভীরতা আছে

আমাকে নিয়ে তোমার অন্তরে।

কোন একদিন নদী পেরিয়ে পাহাড় যাব

তুমি পাশাপাশি থাকবে

হেঁটে যাবো দুজনা , উড়বে আঁচল

তোমার আঙ্গুল গুলো শুধুই আমার আঙুলে থাকবে।

কোন একদিন মাঠ পেরিয়ে সকাল খুঁজে নেব

ঠিক দেখতে পাবো পৌঁছে গেছি ঠিকানায়

সেখানে শুধু আমি আর তুমি

কোন হিসেব থাকবেনা, থাকবে শুধুই দুজনার ভালোবাসা।

কোন একদিন বাধা বিঘ্ন পেরিয়ে বলবো

তুমিতো আমার প্রেমিকা

কত স্বপ্ন দেখি, কত ঝগড়া করি

আবার সমান্তরালভাবে মিশে যাই ভালোবাসায়। 

কোন একদিন নদীর পাড়ে এসে দাঁড়াই

জলস্রোত আঙুলগুলোয় ছুঁয়ে দেখি।

কোন একদিন তুমি আমার হয়ে উঠবে

ঘরের বিছানা গুলো এলোমেলো হবে

তুমি সকালবেলায় ডাইনিং টেবিলে এসে বসবে

চায়ের কাপে মুখ দিয়ে বলব শুধুই আমরা দুজন

শুধুই উষ্ণতার জন্য, ভালোবাসাবাসিতে বাঁচবো।


গোলাম কবির


 মানুষের দু'চোখ 


ভালবাসলে মানুষের দু'চোখ 
কতো আকাশছোঁয়া স্বপ্ন দেখে, 
তখন কতো কাজ - যা আগে 
অসাধ্য মনে হতো একসময়, 
তা এখন হাতের মুঠোয় 
সূর্যকে ধরে রাখার মতো 
অলীক কল্পনা হলেও সহজ মনেহয়। 
ভালবাসা পেলে কখনো মানুষের
দু'চোখ আনন্দে হেসে ওঠে, 
কেউ কেউ তো নিজের যা কিছু আছে
 বিলিয়ে দিয়ে দু'চোখে নামায় ভাতঘুম। 
দুঃখ পেলে মানুষের দু'চোখে জমে মেঘ,  
জমতে জমতে কখনো ভীষণ বন্যা কিংবা  জলোচ্ছ্বাস হয় আবার কারো কারো 
দূ'চোখ মনেহয় একদমই পাথর হয়ে যায়। 
কারো কারো অন্য মানুষের সুখ
মোটেই সহ্য হয়না। 
ওর দু'চোখ তখন কেবলই ইর্ষা কিংবা 
হিংসার আগুনে দপদপ করে জ্বলে পুড়ে
 ছাই হয়ে হয় নিজেই শেষ হয়
অথবা হালাকু খানের মতো 
মানুষের সবকিছু ধ্বংস করে ।


 

মোঃ ইমরান হোসেন


প্রশ্ন


আমাকে তুমি কি কখনো খুঁজেছ ডুবুরি যেমনি খোঁজে?

কতবার করে আমায় পড়েছ পড়ার মতন করে!

দেখেছ কি কভু রাতের আঁধারে জমানো চোখের   জল?

শপথ করে কি রেখেছ তোমার ছড়ানো কথার দল?


হিশেব কাঁথায় নকশা এঁকেছ, দিয়েছ তাসের জোড়া

মনে করে দ্যাখো না বলা কথায় কত জনমের ব্যথা!

নাচিয়েছ তুমি তোমার চাওয়ায় পুতুল যেমনি নাচে

শুনোনি কখনো একলা মানুষ কেমন করে সে বাঁচে!


পরাজয় বলে একটি শব্দ বাজে নি তোমার কানে

আমাকেই আবার পরাজিত করে, ছুটেছ জয়ের পানে

পুরোনো ব্যথায় ছিটিয়েছ নুন, দেখতে চেয়েছ কি হয়

আঘাতের বানে বিক্ষত হিয়া, কাঁপেনি তোমার হৃদয়!


হৃদ - মন্দিরে জমানো মেঘের বৃষ্টি যখন নামে

রেখেছ কি তুমি আমার দেহকে তাল পাতার-ই তলে?

কত রাত আমি নির্ঘুম থেকেছি, ভেবেছি তোমার কথা

কতটুকু কাল আমার জন্য ছেড়েছ চোখের ধারা!


আষাঢ় শ্রাবণে নদীর পাড়ের মানুষ হারায় সবি

নদীর জলেতে শান্তি খুঁজেছ চালিয়ে তোমার তরী।


মোহাম্মাদ আবুহোসেন সেখ

আমাদের দেশ


এই দেশেতে জন্ম আমার,এই মাটিতে ঘর

এই মাটির দাম হলো,সোনার দামে দাম।

এই দেশেতে থাকবো মোরা,রাম-রহিম মিলে

মোদের দেখে শিক্ষা নেবে,ভিন্নদেশের লোকে।

তুলবো না কথা জাতিভেদের,মিলবো কাঁধে কাঁধে।

এদেশের একমুঠো মাটি নিলে,ছেড়ে দেবোনা তাকে।


১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১

মমতা রায়চৌধুরী'র উপন্যাস "টানাপোড়েন" ৩

অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করবার মতো আকর্ষণীয়  মমতা রায়চৌধুরী'র ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন" পড়ুন ও অপরকে পড়তে সহযোগিতা করুন  


টানাপোড়েন

সম্পর্ক

মানিক , তোর বাবার প্রেশারের ওষুধ, সুগারের ওষুধ শেষ হয়ে গেছে ।অফিস থেকে ফেরার পথে একবার নিয়ে আসিস  বাবা? মানিক কোন উত্তর না দিয়ে টাইটা বাঁধছিল আর বউকে তাড়া দিচ্ছিল " কিগো দাও টিফিন টা। যা আজ খুব লেট হয়ে যাবে।' ছেলের এই হন্তদন্ত ভাব দেখে মনীষাদেবী একটু ইতস্তত করতে লাগলো আর একবার বলবে কিনা? কিন্তু বলতে তো হবেই। তিন দিন হল ঔষধ শেষ হয়ে গেছে। তুই শুনতে পাচ্ছিস মানিক। হ্যাঁ শুনতে পেয়েছি। একবার সোমদত্তাকেও তো ফোনে বলতে পারো বাবার ওষুধের কথা। সব সময় আমাকে কেন বল মা? মনীষাদেবী ছেলের অফিস যাবার পথে আর কোন কথা বাড়ান না। আজকাল মানিকের ভেতরে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করছে সব সময় সোমদত্তাকে নিয়ে ।ওর বোনকে  হিংসে করে? কথা না বাড়িয়ে ছেলের পথের সামনে থেকে সরে দাঁড়ায়। ভেবে পায় না কি করবে? অথচ এ বাড়ির পুরোটাই ছেলের নামে লিখে দেয়া হয়েছে। লিখে দেবার আগে পর্যন্ত বাবা-মাকে কি কেয়ারই না করত মানিক। আজকাল খাবার টেবিলে একসঙ্গে তো বসাই হয় না। আগে খাবার টেবিলে সব সম্পর্ক যেন জড়ো হতো। বাবার পাতের মাছের মাথা ছেলের পাতে , ছেলের থেকে মেয়ের পাতে, সেখান থেকে মায়ের পাতে। এই ভাবেই পাত বদল হতে থাকত ভালো ভালো খাবার জিনিস গুলো ।তারপর সবাই একসঙ্গে সেই মাছের মাথাটা ভাগ করে খেত তাতে যেন রান্নার স্বাদ দ্বিগুণ হয়ে যেত। এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে মনে হল , নিশিত বাবুকে  কি বলবে? এমন সময় বৌমা হাঁক দেয় " মা আজকে দুপুরে রান্নাটা আপনি করে নেবেন। আমার সময় হবে না ।আমি একটু বেরোবো। কথাটা কানের ভেতরে ঢুকলো , তবুও  সাড়া দিলেন না মনীষাদেবী ।পরে ঝাঁঝের সুরে এসে বলল-আজকাল এত ধ্যাতলা হয়েছেন কেন? একবার বললে সাড়া দেন না। হ্যাঁ বৌমা শুনেছি। শুনলেই ভালো। বলেই গটগটিয়ে চলে গেল সুরমা। আজকাল প্রায় দিনই ছেলে অফিসে চলে যাবার পর বৌমা বেরিয়ে যায় ,ফিরে আসে ঠিক ছেলের অফিসের ছুটি হবার আগে। মনীষাদেবী ভাবেন তাদের সময় তাদের স্বামী অফিসে চলে গেলে সারাদিন ঘরের কাজ কম্ম আর ছেলেমেয়েদের স্কুল থেকে ফেরার পর কি টিফিন দেবে ,এইসব চিন্তায় মশগুল হয়ে থাকতেন। মনীষাদেবী ভাবেন এখন সময় পাল্টেছে এদের গতিবিধিও পাল্টেছে। কিন্তু রোজ মানিক বেরিয়ে যাবার পরই কেন বেরোতে হয় বৌমাকে । ছেলে বৌমার সম্পর্ক ভালো আছে তো? নাকি সবটাই মেকি।এই ভাবনাটা আজকাল প্রায়ই ভেতরে ভেতরে মনীষাদেবীকে খেতে থাকে।একথাটাও ভেবেছিলেন একবার ছেলেকে বলবেন? কিন্তু ছেলে কি মায়ের কথা বিশ্বাস করবে? রোজ কোথায় যায় বৌমা ,এ প্রশ্ন মনীষা দেবীর। সাতপাঁচ না ভেবে রান্নাঘরের দিকে মনীষাদেবী ছুটলেন আর ভাবতে লাগলেন কি সুখের সংসারটাই ছিল। যখন সংসারে বউ হয়ে ঢুকেছিলেন, শাশুড়ি মা কত আদর করে কাছে ডেকে রান্না-বান্না সব শিখিয়েছিলেন ।কখনো বাপের বাড়ি ছেড়ে আসার কষ্টটা মনেই হয়নি। আর নিশিথবাবু তো অফুরান ভালোবাসেন। বাচ্চারাও ছোট ছিল। প্রত্যেকে মা অন্ত প্রাণ ছিল। দুই ভাই বোন একে অপরকে সব জিনিসটাই ভাব করে ,ভাগ করে,তারা নিজেদের  মত করে নিত। এই তো মানিক যখন ক্লাস টুয়েলভ পরীক্ষা দেবে তখন ওর প্রচন্ড জ্বর। টেস্ট পরীক্ষা। ভয়েতে ওর বুক শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। তখন ওর পাশে মনীষাদেবী আশ্বাসবাণী শুনিয়েছেন, অভয় দিয়েছেন, সারারাত ছেলের পাশে বসে থাকতে হয়েছে। শরীর খারাপ বলে নয়। পড়ার সময়গুলোতে মা কাছে না থাকলে ওর যেন পড়া মনেই থাকতো না। কত রাত জেগেছেন ।তবু সেগুলো কষ্টের মনে হয় নি। আজ একটা বেসুরো কথা বড্ড মনে লাগে। আজ কাল মায়ের রাত জাগার প্রয়োজন হয় না ।আজ মানিক বড় অফিসের বড় পোস্টে আছে। আজ মানিকের গাড়ি হয়েছে। আজ মানিকের মান সম্মান বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু মা বাবার প্রতি দায়িত্ব কর্তব্যগুলো যেন একটু শিথিল হয়েছে কোন এক সম্পর্কের কারণে। সোমদত্তাও আজকাল মায়ের খবর নেয় না। বাবা কেমন আছে জানতেও চায় না। ওর রাগ হয়েছে দাদার নামে সব বাড়িটা লিখে দেবার জন্য। মেয়ের রাগ হওয়াটাই স্বাভাবিক । তবুও মানিক বোনের সাথে হিংসা করে।তবে কি দ্রুত সময় বদলে মানুষের মানসিক দিক পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে? আজ মানিক মাকে ছাড়া চলতে পারে। আজ অফিস থেকে এসে মাকে ডাকার প্রয়োজন মনে হয় না। এই তো কবে যেন ,তা প্রায় মানিকের বিয়ের দুবছর আগে ।একবার মনীষাদেবী  তার নিজের দিদির বাড়ি বেড়াতে গেছিল, আর সেই ছেলে ফোনের পর ফোন করে মা কে বিরক্ত করেছে। তখন দিদির বাড়ির সবাই বলত ভাগ্য করে একটা ছেলের জন্ম দিয়েছিস মনি । আজকে সবকিছুই কেমন যেন ইতিহাস মনে হয়। হঠাৎই নিশিথ বাবুর ডাকে সম্বিত ফেরে 'মনি ,আজকেও কি সুরমা বেরিয়ে গেল? রোজ কোথায় যায় একবার জানতে চাওনি? একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনীষাদেবী নিশিথ বাবুর কাছে এসে দাঁড়ান। রান্না হয়ে গেছে তোমাকে খেতে দিয়ে দিই। এসো দুজনে একসাথে খাব নিষেধ বাবু বলেন। আর কি সেই বয়স আছে গো? মনিষাদেবী বলেন। কাছে যেতেই নিশিথ বাবু মনীষাদেবীর হাত দুটো ধরে বলেন ,এসো এসো সখা আমার ঘরে এসো।'মনীষাদেবী কোন উত্তর দেন না চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন। নিশিথ বাবু বলেন আমি ঘরে থাকি বলে কি আমি কিছু বুঝতে পারি না মনি? সব পারি? তুমি আজকাল খুব কষ্ট পাও না?তোমার ছেলে আজকেও কোন ওষুধ আনবে না। মনীষাদেবী বলেন ' আমার ছেলে ওরকমই নয়, আনবে না ,কেন? যত বাজে কথা। আনলেই ভালো।
মনীষাদেবী ভাবছে সম্পর্ক গুলো সব যেন দূরে চলে যাচ্ছে। ভাই-বোন, বাবা-মা প্রত্যেকের বাঁধন যেন আলগা হয়ে গেছে। বিশ্বাস অবিশ্বাস দোলাচলে জীবন দাঁড়িয়ে আছে। মনীষাদেবী আড়ালে চোখের জল ফেলেন আর ভাবেন ভগবান আমাদের চাওয়া-পাওয়া তো কিছু নেই সব সময় আমার সন্তানদের ভালো রেখো। সব সম্পর্ক গুলো যেন মধুর বন্ধনে আবদ্ধ থাকে, ভগবান দেখো।





ধারাবাহিক উপন্যাস "টানাপোড়েন" ৩ ক্রমশ

জয়তী মৈত্র কাঞ্জিলাল


বাড়ি 


স্মৃতি জমে পুরনো দালান 

ব্যথা ঘিরে রাখে অভিমান 

দরজার মলিন কপাটে 

কড়া দুটো বড় বেশি ম্লান।  


এল শেপ ব্যালকনি জুড়ে 

রূপকথা আজও মৃদুস্বরে 

জ্যোৎস্না আঁচল পেতে দিলে 

ধূসর পরীরা খেলা করে। 


কৈশোর মুছে গেছে কার

জীবন তো বহতা নদী 

পিছু ফিরে দেখে না যে কেউ 

হারানো সে নামে ডাকো যদি।।

মুন চক্রবর্তী


 স্বপ্ন সাজে


কিছু ভালোলাগা জমিয়ে রেখেছে কোনো এক প্রহর

সাগরের সীমনায় দাঁড়িয়ে আছে কোনো এক প্রকাশ

জীবন ছন্দের মৌমাছির জমিয়ে রাখা মধুর সন্ধানে 

পত্র লেখা

জল প্রপাতের না বলা কত কথা শোনার অপেক্ষায় তানপুরা 

ছদ্মবেশী মেঘ তারা দেখার দূরবীনে প্রেমের নদী কাশফুলে

গভীর রাতের নির্জনতায় গজল শব্দ বাহারী অজানা দেশের স্বপ্নে--!

দীপান্বিতা রায় সরকার



দাগ 


এই নিস্প্রভ আবহ, রোদ ফুরলে যেমন জমে যায়... 

দীর্ঘশ্বাসের মতো,  যেমন কোনও ছন্দ বিরাগ... 


ঘুমের ভিতর ঘুম তলিয়ে জোৎস্না হাপিস,

চৌহদ্দীর চতুর্দিকে মৃত্যুর দাগ 


রোদ ফুরলে যেমন জমে,  রাত্রির শোক 

ঝড়ের বুকে শিখার মতো সব থেকে যায় 


নদীর  উপর জল থেমে যায়, বাঁক বদলে

এত নিঃসঙ্গতা, বলো, আমি  কোথায়, 

শুধু একটি দাগ ছড়া

zssaew

 jhyeyf